কাবুল থেকে উত্তরদিকে দীর্ঘ যাত্রার শেষ অংশে এসে সংকীর্ণ গিরিপথগুলোর একটির মধ্যে পৌঁছাতেই এই অতর্কিত হামলা হল মোগলদের অগ্রগামী সৈন্য দলের উপর। হিন্দুকুশের ভেতরে এঁকেবেঁকে ছড়িয়ে থাকা পর্বতের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে মোগল বাহিনী। গ্রীষ্ম হলেও এখনো ঢেকে আছে তুষারে। কয়েক জায়গায় তো গিরি সংকট এতটাই সরু যে পাশাপাশি খুব বেশি হলে তিনজন অশ্বারোহী পথ চলতে পারে। মাথার উপর ঝুলে থাকা চূড়া উঠে গেছে দুইশ ফুট পর্যন্ত। আর তাই প্রায় সবসময়েই পথ চলতে হচ্ছে ছায়ার মাঝে। সম্ভবত এ কারণেই মোগল চরেরা মাথার উপরে পাথরে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা উপজাতিদের দেখতে পায়নি। তাই হঠাৎ করেই নির্ভুলভাবে মোগলদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকগুলো।
আততায়ীদের না দেখতে পেয়ে আর পুরো সারি জুড়ে ধুপধাপ করে সতীর্থ সৈন্য পড়ে যেতে থাকায় আঁকাবাঁকা পথ ধরেই যত দ্রুত সম্ভব ছুটে চলল মোগল সৈন্যরা। শত্রুর নিশানা এড়াতে এই সংকীর্ণ পথে যত দ্রুত সম্ভব পড়ে গেল আরো মোগল কিন্তু একই সাথে এসে পড়ল বাকিরা, মানুষ আর ঘোড়া উভয়েই শ্বাস ফেলছে বহুকষ্টে এই পাথুরে সমভূমিতে পৌঁছে। কিন্তু সান্ত্বনা এই যে অন্তত মোগল সৈন্যরা একটু একত্রিত হতে পারবে।
অবশেষে শত্রুদের দেখা পেল তারা–লাল-সবুজ ডোরাকাটা আলখাল্লা পরিহিত একদল অশ্বারোহী যোদ্ধা। ভেড়ার চামড়া দিয়ে তৈরি পোশাক আর মাথায় কালো উলের টুপি পরা তুর্কমান অপেক্ষা করছে নিজেদের বিশালদেহী মাংসল ঘোড়ার পিঠে বসে; নিশ্চিত যে সরু গিরিপথ থেকে বের হবার সাথে সাথে মোগল সৈন্যদেরকে খতম করে দেবে তাদের বন্দুকধারীরা।
মাথার উপর অস্ত্র ঘুরিয়ে, রণহুঙ্কার ছাড়তে ছাড়তে এগিয়ে আসা তুর্কমানদের দেখতে পেয়ে অশোক সিংয়ের প্রায় হাজার রাজপুত আর নিকোলাসের পাঁচশ ভাড়াটে বিদেশী সৈন্য উন্মাদের মত চেষ্টা শুরু করল সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে এদের উপর ভার পড়েছে আওরঙ্গজেবের সৈন্যদের পৌঁছানোর আগে পথ প্রস্তুত করা। চারপাশের বিশৃঙ্খলার মাঝে নিকোলাসের কানে আসল রাজপুত অফিসারদের চিৎকারের শব্দ। নিজেদের সৈন্যদের একত্রিত করতে চাইছে তারা কিন্তু তার আগেই চলে এলো তুকমানরা। চওড় খঙ্গ দিয়ে কচুকাটার মত হত্যা করতে লাগল মোগল সৈন্যদেরকে, ঘোড়ার পা-টানিতে দাঁড়িয়ে লম্বা ব্যারেলের বন্দুক তুলে ছুঁড়তে লাগল আগুনের বল। জিজেল নামেই এগুলো পরিচিত সাথে আছে বাঁকানো জোড়া ধনুকের তীর।
মৃত ঘোড়াটার ওপাশে গিয়ে চারপাশে তাকাল নিকোলাস, ডান হাতে এখনো ধরা আছে তলোয়ার। তার নিজের ঘোড়া তাকে ফেলে রেখেই উধাও হয়ে গেছে। যতটা বুঝতে পারছে যুদ্ধের অবস্থা এখনো ভারসাম্যপূর্ণ; কিন্তু ক্ষতিটা বেশি মোগলদের পাল্লাতেই।
বামপাশে কমলা-পোশাকে সজ্জিত, হাতে লোহার ফলা লাগান বর্শা নিয়ে তুকমান বন্দুকধারীদের দিকে ছুটে যাচ্ছে রাজপুত সেনারা; পিছনে বড় বড় পাথরের আড়াল থেকে তীর ছুড়ছে ধনুবিদেরা। অস্ত্রের ঝনঝনানির মাঝেও শোনা গেল রাজপুত সৈন্যের চিৎকার; গলার মাংস বের হয়ে গেছে ভেদ করে ঢোকা তীরের আঘাতে। এরপর একে একে ঘোড়া থেকে পড়ে গেল দ্বিতীয় আর তৃতীয় রাজপুত; দুজনের শরীরেই লেগেছে বন্দুকের গুলি। সোজাসুজি সামনে তাকাতেই নিজের একদল সৈন্যকে দেখতে পেল নিকোলাস–ফরাসী আর ডেনমার্কের সৈন্য সংখ্যায় কম হলেও দুঃসাহসিকতার সাথে লড়ছে; চেষ্টা করছে চারপাশ ঘিরে থাকা তুর্কমান অশ্বারোহীদের চক্রটাকে ভাঙ্গতে। হঠাৎ করেই একজন, গম্বুজের মত শিরস্ত্রাণের নিচে সোনালি চুলের রাশি দেখা গেল, ঢুকে গেল তুর্কমানের ব্যুহ ভেদ করে। কিন্তু সাথে সাথেই গুলির আঘাতে পড়ে গেল ঘোড়ার পিঠ থেকে। এক মুহূর্তের জন্য পাদানীতে আটকে রইল, কিন্তু এরপরই টুকরো টুকরো হয়ে ছিঁড়ে গেল চামড়ার পাদানী। মাটির উপর কয়েক গড়ান দিয়ে অবশেষে স্থির হল হতভাগ্য ডেনিশ। লোকটাকে চিনতে পারল নিকোলাস। ডেনিস এই জলদস্যু বাংলার কাছে এসে জাহাজ ভেঙে যাবার পরে যোগ দিয়েছে ভাড়াটে সৈন্যদলে। একটা ঘোড়া খুঁজে বের করে নিজের লোকদের সাহায্য করতে এগিয়ে যাবার তাগাদা অনুভব করল নিকোলাস…
হঠাৎ করেই কানে এলো ঘোড়ার খুরের সম্মিলিত বাজনা। মাথা ঘোরাতেই দেখা গেল গিরিপথ দিয়ে বের হয়ে আসছে তরতাজা মোগল সেনারা, খোলা জায়গা পেরিয়ে যুদ্ধস্থানে পৌঁছে গেছে প্রায়। হলুদ সূর্য খচিত একগাদা কমলা রঙা ব্যানার বাতাসে উড়তেই বোঝা গেল যে অশোক সিং নিজে আছে এদের নেতৃত্বে। আরো নিশ্চিত হওয়া গেল দেহরক্ষীদের ভিড়ে লম্বা সাদা ঘোড়র উপর বসে থাকা, লোহার বর্ম গায়ে ঋজু রাজপুত অবয়বটা দেখে। চমকাতে লাগল সামনে বাড়িয়ে ধরা তলোয়ার, সন্ধ্যার মৃদু আলোতে জ্বলতে লাগল আগুনের মত। কিন্তু আর দেখার সুযোগ পেল না নিকোলাস। কোঁকড়া কালো দাড়িঅলা এক বিশালদেহী তুর্কমান ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে আসতে লাগল নিকোলাসের দিকে, নির্ঘাৎ তাকে দেখতে পেয়েছে আর পিষে মেরে ফেলতে চাইছে।
কাছেই একটা বর্শা পড়ে আছে দেখতে পেল নিকোলাস। তলোয়ার ফেলে একেবারে সময় মত হাতে তুলে নিল বর্শা। এক পাশে লফিয়ে পড়ে, অশ্বারোহীর পথ থেকে সরে গিয়ে আড়াআড়িভাবে বর্শাটা রেখে দিল ঘোড়ার খুড়ের নিচে। এগিয়ে আসতে থাকলে তুর্কমানের বাম পায়ে বিধে গেল বর্শা। নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে তুকমান, এমন সময় এক লাফে লোকটার উপর চড়ে বসল নিকোলাস, ছুরি বের করে দ্রুততার সাথে একেবারে ঢুকিয়ে দিল লোকটার গলায়।
