এটার চেয়েও খারাপ সংবাদ আছে। তার থেকে বড় কথা এবারের পত্র লিখেছে আমার পুত্র যা ছাড়িয়ে গেছে অশোক সিংকেও।
আববাজান,
এই পত্র যখন আপনি পড়ছেন ততক্ষণে আমি আর আপনার সেনাবাহিনী বাল্ক ছেড়ে হিন্দুস্তানের পথে রওনা হয়ে যাবো। শহর ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। অক্সাসের ওপরে উজবেকদের ঢেউয়ের মত আঁছড়ে পড়ার সংবাদ পেয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি কাবুল ফিরে যাবার, কেননা পরবর্তীতে যে বিশাল ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে তার ঝুঁকি এড়ানো যাবে তাহলে। আমি চাইনি আমাদের অসংখ্য সৈন্যের রক্তপাত ঘটুক আর আমার বিশ্বাস যে আমার সিদ্ধান্ত বুঝতে পেরে একমত হবেন আপনিও।
–আপনার দায়িত্ববোধ সম্পন্ন পুত্র মুরাদ।
দায়িত্ববোধ সম্পন্ন পুত্র! – নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না শাহজাহান।
আমার অবাধ্য হয়েছে সে। জানত যে তার একমাত্র দায়িত্ব হচ্ছে তৎক্ষণাৎ সমরকন্দের পথে রওনা হওয়া। এর পরিবর্তে আবিষ্কার করেছে নিত্যনতুন অজুহাত আর হাত ফসকে গেছে নিশ্চিত বিজয়। আর এখন যতটুকু অর্জন করেছিল সেটাও টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে বিনা যুদ্ধে। তাকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি। কিন্তু জরুরি প্রশ্ন হচ্ছে উত্তরে অশোক সিংকে কোন নির্দেশ পাঠাবো যে যতক্ষণ পর্যন্ত না নতুন কোন সেনাপ্রধান নিয়োগ দিচ্ছি ততক্ষণ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর দায়িত্বে কে থাকবে? তোমাদের কী পরামর্শ? অপেক্ষা করলেন শাহজাহান। কিন্তু এবারেও কথা বলল না কেউই। তো কারো কিছু বলার নেই?
কিন্তু চারপাশে নিজের সভাসদদের দিকে তাকিয়ে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকেই সম্রাট উপলব্ধি করলেন এ অপরাধ যতটা মুরাদের ঠিক ততটাই তার। আওরঙ্গজেবকে শিক্ষা দিতে চেয়ে অনভিজ্ঞ এক তরুণকে পাঠিয়ে দিয়েছেন বহু দিনের সাধনার লক্ষ্য সমরকন্দের দিকে। কিন্তু কখনো ভাবেন নি যে মুরাদ তাঁকে এতটা বাজেভাবে হতাশ করবে।
জাহাপনা, অবশেষে নীরবতা ভাঙ্গলেন একজন বর্ষীয়ান উপদেষ্টা।
এই বছর অভিযানে আর সফল হবার সম্ভাবনা নেই–অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে, শীঘ্রই উত্তরের মুখে বরফ পড়ে হিন্দুস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে আপনার সেনাবাহিনীকে। তাহলে কাবুলেই কেন তাদেরকে শীতকাল কাটানোর নির্দেশ দিচ্ছেন না? এরপর শুকনো দিন এলে আবারো উত্তরের দিকে এগিয়ে যাবে তারা সম্ভবত হিন্দুকূশের ভেতর দিয়ে ভিন্ন কোন রাস্তা ব্যবহার করতে হবে যেন চমকে যায় আমাদের শক্ররা।
খানিক চুপ করে থেকে মাথা নাড়লেন শাহজাহান।
ঠিক আছে, এটা সঠিক। একটা প্রচেষ্টা বিফল হয়েছে সে কারণে হাল ছাড়ার কোন মানে হয় না। বিশেষ করে যখন এত বড় সেনাবাহিনীকে গড়ে তুলতে ও সশস্ত্র করতে প্রচুর ব্যয় হয়েছে। আমি এখনো বিশ্বাস করি যে সফল হবার পেছনে বহু যুক্তি আছে আমাদের। এছাড়া এত সহজে হাল ছেড়ে দেবার মানে হল শত্রুর চোখেও হীন হয়ে যাওয়া। উজবেক বা পারস্য সকলেই ভাবতে উৎসাহী হবে যে নিজেদের দন্ত হারিয়ে ফেলেছে মোগল সেনাবাহিনী। চারপাশে প্রকৃতই নিদ্রাভেঙ্গে জেগে উঠেছে উপদেষ্টারা। বিড়বিড় করে সকলেই একমত হল সম্রাটের সাথে।
ভালো। আমি এখনই অশোক সিংকে সংবাদ পাঠিয়ে দিচ্ছি এই বলে যে, কাবুলেই শীতকাল কাটাবে সেনাবাহিনী। এছাড়া সেখানকার প্রশাসকের কাছেও প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাঠাচ্ছি তাদের জন্য যথাযথ আশ্রয় ও খাবারের সংস্থান করার।
আর নতুন সেনাপ্রধান, জাহাপনার সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। দ্রুতকণ্ঠে জানতে চাইল বর্ষীয়ান উপদেষ্টা।
গুজরাট থেকে শাহজাদা আওরঙ্গজেবকে ডেকে পাঠানোর ব্যাপারে মনস্থির করেছি আমি। এ দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিল সে। এখন তাহলে প্রমাণ করার সুযোগ দেয়া যাক যে সে এর যোগ্য আর আমার ভরসার।
২.০৪ এগিয়ে আসা বর্শার আঘাত
২.৪
এগিয়ে আসা বর্শার আঘাত থেকে বাঁচতে একপাশে সরে গেল নিকোলাস। মাত্র এক ইঞ্চির জন্য মিস করল তাকে বর্শার ফলা। বালি মাটিতে গিয়ে পড়ল কোন ক্ষতি না করে, কিন্তু তার শত্রু হামাগুড়ি দিয়ে লুকিয়ে পড়ল কয়েক ফুট দূরে পড়ে থাকা তার মৃত ঘোড়র পেছনে। লোকটা এখনো হাল ছাড়েনি।
নিজের ঘোড়ার উপর চড়ে বসল নিকোলাস। ইচ্ছে এগিয়ে গিয়ে পিষে মেরে ফেলবে অথবা তলোয়ার দিয়ে ধড় আলাদা করে দেবে শত্রুর। এমন সময় নিজের কোমরবন্ধনী থেকে লম্বা বাঁকানো ছুরি বের করল লোকটা। নিকোলাস প্রায় তার গায়ের উপর পৌঁছে গেছে, এমন সময় ছুঁড়ে মারল ছুরি। ঝাঁকি দিয়ে মাথা পিছনে ঠেলে দিল নিকোলাস কিন্তু ঠিক সময়মত হল না কাজটা। ফলে তীক্ষ্ণ ফলায় কেটে গেল গাল, রক্ত গড়াতে লাগল চেহারার অবশিষ্ট অংশ দিয়ে মুখের ভেতরে। ব্যথা ভুলে সামনে ঝুঁকে লোকটার দিকে আঘাত করল নিকোলাস। কিন্তু হিসেবে ভুল হয়ে গেল। উপজাতি লোকটা আবারো মৃত ঘোড়ার পিছনে হুমড়ি খেয়ে পড়তে শূন্য বাতাস কেটে গেল তলোয়ার। নিজের ঘোড়ার মাথা ঘুরিয়ে আবারো লোকটাকে আঘাত করতে উদ্যত হলেও তাল হারিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে না পেয়ে মাটিতে পড়ে গেল নিকোলাসের ঘোড়া। নিকোলাসের মনে হল উড়ন্ত গোলার মত করে ঘোড়া থেকে মাটিতে ছিটকে গেল তার মাথা।
পতনের ফলে ঘুরে উঠল মাথা। মুখ থেকে থু করে তিক্ত স্বাদের রক্ত ফেলে বহুকষ্টে উঠে দাঁড়াল নিকোলাস কিন্তু প্রায় সাথে সাথে পৌঁছে গেল শত্রু লোকটাও। ঘামের গন্ধ এসে ধাক্কা মারল নাকে, চৌকোণা ধাঁচের লোকটা মাটিতে ফেলে দিল নিকোলাসকে। হাসতেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো রসুনের টকটক গন্ধ, নিকোলাসের শাসনালীর উপর আঙ্গুলের চাপ বাড়িয়ে মোচড়াতে লাগল যেন প্রাণবায়ু বের হয়ে যায়। নড়াচড়া করে, লাথি দিয়ে নিজের উপর থেকে লোকটাকে ফেলে দিতে চাইল নিকোলাস, কিন্তু মানুষটা বেশ ভারী আর নিকোলাসের নিজের শক্তি প্রায় নিঃশেষিত হয়ে এসেছে শ্বাস নিতে না পারায়। ফুসফুসের ভেতরে মনে হল ঢুকে গেছে তপ্ত বালি। কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে চোখ জোড়া। হঠাৎ করেই রক্তের ফিনকি ছুটে এসে মুহূর্তের জন্য মনে হল অন্ধ করে দিল নিকোলাসকে, বজ্রমুষ্টি ছেড়ে দিল লোকটা। হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে তাকাতেই দেখা গেল কেউ একজন কেটে ফেলেছে নিকোলাসের আততায়ীর মাথা। রক্ষাকারী যেই হোক না কেন– ইতিমধ্যে হাওয়া হয়ে গেছে তারপরেও তাকে নিঃশব্দে ধন্যবাদ জানালো নিকোলাস। মৃতদেহকে একপাশে সরিয়ে রেখে হাঁটু গেড়ে উঠে বসল বাতাসের জন্য হাঁসফাঁস করতে থাকা নিকোলাস। চারপাশে তাকাল।
