ঠিক কাজটিই করেছ তুমি। যেমনটা তুমি নিজেই বলেছ। কুৎসা ছড়াতে সময় লাগে না আর পাখা গজাতেও তর সয় না। যাই হোক, এ নিয়ে আর ভাবতে হবে না তোমাকে।
শাহজাহান প্রস্থান করলে পর খানিক দাঁড়িয়ে রইল রোশনারা। পিতা যখন এত বড় বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা, এখন উপলব্ধি করতে পারল রোশনারা যে এই সময়ে জহানারার বিষয় তোলা উচিত হয়নি। কিন্তু তারপরেও পিতার প্রতিক্রিয়াতেও অবাক না হয়ে পারেনি রোশনারা। শাহজাহানকে মনে হল রোশনারা আর জাহানারা উভয়ের সম্পর্কেই সন্দিহান হয়ে উঠেছিলেন কিন্তু সে নিজেই বা কেন এত বিস্মিত হচ্ছে? পিতার চোখে কোনরকম ত্রুটি নেই জাহানারার। এমনকি সে নিজেও কোন ভুল করেনি…পিতাকে যাই জানিয়েছে, পুরোটুকুই নির্জলা সত্যি আর যদি জাহানারা নিজের পদমর্যাদা সত্ত্বেও এহেন বোকামি করতে পারে, তাহলে যে কোন শাস্তিও জাহানারার প্রাপ্যই বলতে হবে। নাসরীন তো ইতিমধ্যে এও জানিয়েছে যে নিকোলাস সবসময় পত্র লিখে জাহানারার কাছে, যদিও কোন চিঠি পড়ার সুযোগ করে উঠতে পারেনি নাসরীন–নিজের রত্নভাণ্ডারে তালাবদ্ধ করে রাখে চিঠিগুলোকে। যাই হোক, সবসময় চোখ রাখছে নাসরীন। হয়ত কোন একদিন নাসরীন যথেষ্ট প্রমাণ হাজির করতে পারবে যা দেখিয়ে পিতাকে জানানো যাবে যে জাহানারার উপর আরো মনোযোগ আর শিক্ষা দেয়া উচিত। পিতা হিসেবে নিজের জ্যেষ্ঠ পুত্র-কন্যাদ্বয়ের কোন অপরাধে আমল দেন না শাহজাহান আর তাই জাহানারা আর দারা দুজনেই পিতার হৃদয়ে নিজেদের অবস্থান নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী। ফলে দুজনেই মর্জিমতন আচরণ করে যেন কনিষ্ঠ ভাই-ভগিনীরা কোন ব্যাপারই না। কিন্তু, ঠিক আছে অপেক্ষা করুক তারা…
*
এত হুট করে তোমাদের সবাইকে তলব করা হয়েছে, কেননা কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলে অনেক দেরি হয়ে যেত। নিজের সভাসদদের উপর চোখ বোলালেন শাহজাহান। নিদ্রাতুর চেহারা আর তাড়াহুড়োয় গায়ের উপর চাপানো পোশাক দেখেই বোঝা গেল যে মাত্রই বিছানা ছেড়ে এসেছে। এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না যা এই মাত্র পড়লেন। অথচ দুটি পত্র সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে লেখা হলেও এসে পৌঁছেছে আধা ঘণ্টা আগেপরে। বহুদিন ধরে অপেক্ষা করে আছেন যে সংবাদ পাবেন নিরাপদে অক্সাসের অপর পাড়ে পৌঁছে সমরকন্দের দিকে এগিয়ে চলেছে সেনাবাহিনী। কিন্তু বাস্তবে তেমনটা কিছুই ঘটেনি। তার বদলে প্রতি চিঠি বয়ে এনেছে একের পর এক অজুহাত–নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, তাই অপেক্ষা করছে সেনাবাহিনী… রসদবাহী জম্ভগুলোর খাবার কমে গিয়েছে, তাই তারা অপেক্ষা করছে যথেষ্ট মজুদের জন্য… বিদেশী ভাড়াটে সৈন্যরা অনভ্যস্ত খাবার আর পরিবেশে জ্বরের কবলে পড়েছে… অক্সাসের অপর পাড়ে উজবেকদের দেখা যাচ্ছে অপেক্ষা করছে যেন পার হতে গেলেই আক্রমণ করবে মোগলদের উপর তাই অন্যত্র দিয়ে পার হবার ভণিতা করতে হতে পারে সেনাবাহিনীকে।
ধৈর্য বজায় রাখতে চেষ্টা করছেন সম্রাট, বিলম্বের কারণগুলো বোধগম্য বলে বোঝাতে চাইছেন নিজেকে আর সমরকন্দের দিকে অভিযান চালাবার জন্য অনুকূল আছে এখনো আবহাওয়া। কিন্তু যত সময় যাচ্ছে সন্দেহ বাড়ছে যে তাঁর সাথে যেন কোন খেলা হচ্ছে। অশোক সিং নিজে কখনো এমনটা করবে না, কিন্তু ক্রমশই রাজপুত সেনাপতির লেখায় একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে সে তাই লিখছে যা মুরাদ তাকে লিখতে বলছে …
অশোক সিংয়ের বাক্যে একের পর এক সন্দেহসূচক শব্দ এমনকি অস্বস্তিরও আভাস পাচ্ছেন তিনি। প্রমাণ হয়ে গেছে ব্যাপারটা। নতুন ডাকে আসা প্রথম পত্রটি হাতে নিয়ে এখনো কাঁপছেন ম্রাট, জোরে জোরে পড়তে শুরু করলেন চিঠির বিষয়বস্তু :
জাহাপনা,
আপনার পুত্র আমাকে এই নির্দেশ দিয়েছে যেন আপনাকে জানিয়ে দিই যে মোগল সেনাবাহিনীর হাতে দক্ষিণে পিছু হটা ব্যতীত আর কোন পথ খোলা নেই। অক্সাস পার হওয়া এখনো সম্ভব হচ্ছে না। কেননা নিজেদের সাম্প্রতিক সব বিভেদ ভুলে একত্রে জড়ো হওয়া শুরু করেছে আমাদের শত্রুরা। তাদের লক্ষ্য একটাই প্রথম সুযোগেই আমাদেরকে নির্মূল করা। মাত্র এক সপ্তাহ আগেই উজবেক একদল অশ্বারোহী নদীর উধ্বভাগে বেশ কয়েক মাইল পার হয়ে এসে আক্রমণ করে আমাদের শিবিরের উপরে আর নির্বিচারে হত্যা করে প্রহরীদের। পরের দিন সকাল বেলা কাঁধ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন অবস্থায় খুঁজে পাই মৃত প্রহরীদেরকে; মুখ থেকে ঠেলে বেরিয়ে ছিল জননেন্দ্রিয়। মনোবল হারিয়ে আমাদের সৈন্যরা অভিযোগ করছে যে অচেনা এই ভূমিতে যুদ্ধ করার মত অবস্থায় নেই তারা। এছাড়া আবহাওয়াও আমাদের প্রতিকূলে চলে গেছে প্রথম তুষারপাত হয়ে গেছে; রুক্ষ শীতের সাথে টিকে থাকার মত রসদ নেই সৈন্যদের। আমরা তাই আপনার পুত্রের নির্দেশে পিছিয়ে এসে বাঙ্কে আপনার পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছি। ——-অশোক সিং।
শাহজাহান কথা বলা বন্ধ করতেই চারপাশে নেমে এলো ভারী নিস্তব্ধতা। কেউই তাঁর চোখের দিকে তাকাতে রাজি নয়। তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে তারা কী ভাবছে–যুদ্ধ করার মত কোন অবস্থাই নেই মুরাদের। আর ঠিকই ভাবছে তারা বিশেষ করে এইবার দ্বিতীয় পত্রটি লিখেছে মুরাদ নিজে।
