চারপাশে কারা আছে ভুলে গিয়ে, পড়া শেষ হতেই আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন শাহজাহান, বিজয়ীর সালাম হিসেবে উর্ধ্বে তুলে ধরলেন বজ্রমুষ্টি। বিশাল সব প্রাসাদ আর মাদ্রাসা, ফলের বাগান, স্বর্ণ-প্রবাহিত নদী নিয়ে সমরকন্দ তাঁর হবে–বহুদিনের সযত্নে উচ্চাকাঙ্খ। এমনকি তাঁর পিতামহ মহান আকবরও এমন দুঃসাহসী পরিকল্পনা করার কথা চিন্তা করেননি। দেড়শ বছর পরে মোগলরা আবারো দাবি করছে তাদের পিতৃপুরুষের ভূমি। এ নিয়ে লিখবে তার জীবনীকারেরা, তারই ময়ূর সিংহাসনে বসে গর্বিত বোধ করবে বংশধরেরা। এর চেয়েও বড় কথা নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করছে মুরাদ। আওরঙ্গজেব অথবা দারা কেউই এতটা ভালো করতে পারতো না।
তো এখন নিজের সভাসদদের সাথে বসবেন তিনি। তবে তার আগে পরিবারের সাথে ভাগাভাগি করতে চান এই সুসংবাদ। কয়েক মিনিট পরেই হারেমের বিশাল গিল্টি করা কাঠের দরজা মেলে ধরল খোঁজাদের দল। শাহজাহান প্রবেশ করতেই মাথা নিচু করে কুর্নিশ করল রাজপুত প্রহরীরা। দারা, তিনি জানেন শিকার করতে বাইরে গেছে, কিন্তু আশা করলেন জাহানারাকে খুঁজে পাবেন এখানে প্রায়ই নিজের কনিষ্ঠ ভগিনীদের দেখতে আসে সে। কিন্তু রোশানারার ঘরে আসতেই নিরাশ হলেন সম্রাট, একাকী বসে আছে রোশানারা। পিতার দিকে তাকিয়ে হাসল।
মুরাদের সেনাবাহিনীর কাছ থেকে অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ এসেছে। বাল্ক দখল করে নিয়েছে তারা আর শীঘ্রই অক্সাস পার হয়ে কয়েক দিনের মাঝেই সমরকন্দ পৌঁছে যাবে।
বেশ ভালো সংবাদ। আমাদের সাম্রাজ্যের কোন শত্রুই আর রইবে না! আনন্দ উদ্যাপনের জন্য ভোজের আয়োজনের নির্দেশ দেবে?
না… এখনো না। সমরকন্দের সংবাদের জন্য অপেক্ষা করা যাক আর এর পরেই এত বিশাল সমারোহে আনন্দ উদ্যাপন করা হবে যা আগে কখনোই দেখেনি হিন্দুস্তান আর মোগলেরা।
আমাদের সেনাবাহিনীর সফলতার সংবাদে খুশি হয়ে উঠবে আওরঙ্গজেব। গুজরাটে তার কাছে পত্র লিখব আমি–আর বাংলাতে শাহ সুজার কাছেও যেন তারা দুজনেই আমাদের আনন্দ সহভাগিতা করতে পারে?
না, আমার জন্যই ভোলা থাক এ দায়িত্ব। কিন্তু জাহানারা কোথায়? তাকেও জানাতে হবে।
তার নিজের প্রাসাদে। সাত্তি আল-নিসা গওহর আরাকে সেখানেই নিয়ে গেছে আজ।
সভাসদদেরকে সংবাদটা জানাবার পর আমি নিজেই সেখানে যাবো তাহলে।
কক্ষ ত্যাগের জন্য ইতিমধ্যে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে শাহজাহান। এমন সময় শুনতে পেলেন রোশনারা বলে উঠলো, আব্বাজান আমি জানি না সময়টা সঠিক কিনা : কিন্তু একটা ব্যাপার ঘটেছে যা আপনার জানা দরকার সম্ভবত।
এমন কিছু একটা ছিল রোশনারার কণ্ঠে যা ঠিক ভালো শোনাল না। ফিরে তাকালেন সম্রাট। কী হয়েছে?
কয়েক মাস আগে জাহানারাকে সেবাদাসী হিসেবে তরুণী এক গুজরাটী অভিজাত নারীকে পাঠিয়েছিলাম আমি, নাম নাসরীন। কর্মঠ হিসেবে জানি আমি এই নারীকে, তাই ভেবেছি আমার ভগিনীরও কাজে লাগবে। এখানে হারেমে নাসরীনের ফুপু আছে। যখনই ফুপুকে দেখতে আসে, আমার কাছেও আসে নাসরীন। এভাবে কয়েক সপ্তাহ আগে আমাকে এমন একটা কথা জানিয়েছে যা কিছুতেই মাথা থেকে তাড়াতে পারছি না–মুরাদ আর সেনাবাহিনী আগ্রা ত্যাগের খুব বেশিদিন আগের কথা না। নিকোলাস ব্যালান্টাইন, আমার ভগিনীর সাথে তার প্রাসাদে গিয়ে সাক্ষাৎ করে এসেছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক একসাথে ছিল তারা আর নাসরীন যদিও শুনতে পায়নি যে কী কথা হয়েছে তাদের মাঝে, তবে এটুকু দেখেছে যে উভয়েই বেশ আন্তরিক ছিল।
বিস্ময়াভিভূত হয়ে গেলেন শাহজাহান। নিকোলাস ব্যালান্টাইন আর জাহানারাকে কী নিয়ে আলোচনা করতে হয়েছে? আর কেমন করেই বা তাঁর কন্যা এতটা অন্ধ হয়ে গেল যে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রাসাদে এক পুরুষকে ডেকে পাঠাল?
আপনি রেগে গেছেন, আব্বাজান। আমার উচিত হয়নি কথাটা বলা।
জাহানারা নিজে কি তোমাকে কিছু বলেছে নিকোলাসের সাথে সাক্ষাৎ করা নিয়ে?
না, আর তাই আরও অদ্ভুত ঠেকেছে ব্যাপারটা।
তুমি কেন তাকে জিজ্ঞেস করোনি?
এত সরাসরি প্রশ্নে মনে হল আশ্চর্য হয়ে গেল রোশনারা। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল মনমরা হয়ে পড়ল; তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে জানালো আমি বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিলাম মনে হতে পারে যে আমি অনধিকার চর্চা করছি। এছাড়া, তাকে প্রশ্ন করার মত পদমর্যাদা নেই আমার। সাম্রাজ্যের সম্মানীত শীর্ষস্থানীয় নারী জাহানারা আর আমি তার ছোট বোন মাত্র।
রোশনারার মন্তব্যে দুঃখের আভাস পেয়ে খানিক আগে অনুভব করা উল্লাস মুছে গেল শাহজাহানের মন থেকে। আমাকে বলার পেছনে কারণটা কী? আর এত দেরিই বা কেন করেছ?
প্রথম দিকে আমি কী করব তাই বুঝতে পারছিলাম না, কিন্তু এরপর থেকেই ভগিনীর খ্যাতি নিয়ে ভয় হতে লাগল–বিশেষ করে সে তো এখন আর হারেমেও থাকে না। নিজের গৃহস্থালী সাজিয়ে নিয়েছে। দরবারে রসাত্মক কাহিনী ছড়িয়ে পড়া খুবই সোজা। আমি নাসরীনকে জোর করে বলে দিয়েছি যেন আর কাউকে না জানায় আর সেই দিনে উপস্থিত অন্য পরিচারিকাদেরকেও শপথ করিয়েছি যেন গোপনই থাকে এ কথা। এরপর সিদ্ধান্ত নিয়েছি আপনাকে জানাব কারণ আপনি শুধু আমাদের পিতাই নন, জাহানারাকেও বোঝাতে পারবেন… এই ধরনের আচরণ তার অবস্থানের ক্ষতি করতে পারে…
