একটু থেমে চারপাশের মুখগুলোর দিকে তাকালেন শাহজাহান। কেউ কেউ প্রশংসা করছে, কারো মুখে সন্দেহের আভাস, কিন্তু বেশিরভাগই বিস্ময়ে থ হয়ে গেছে। কাউকেই নিজের সিদ্ধান্ত জানাননি তিনি, এমনকি দারাকেও নয়। বহুদিনের সযত্নে লালিত উচ্চাকাঙ্খ এটি। প্রায় সময়েই, নিদ্রাহীন অবস্থায় অন্ধকারে শুয়ে শুনতে থাকেন ভৃত্যের মুখে নিজের পূর্বপুরুষের লেখনী। সেই বালক বয়স থেকেই ভালোবাসেন বাবরনামা সিংহাসনের সন্ধানে আসা তরুণ ঘোড়সওয়ার শাহজাদা। কঠিন পরিস্থিতিতেও বিশ্বাস না হারানো; যত বিশালই হোক না সেই বিপদ, রোমাঞ্চিত করে তুলত শাহজাহানকে। তবে সবার উপরে দাগ কাটত বিশেষ একটি ঘটনা সমরকন্দ শাসন করার জন্য বাবরের দৃঢ় মনোভাব নিজের জীবদ্দশায় যা একবার নয় তিন তিনবার আক্রমণ করেছিলেন তিনি। যখন থেকে উজবেকদের সমস্যার কথা শুনছেন, তখন থেকেই এ আক্রমণের প্রতি আগ্রহী হয়েছেন শাহজাহান।
আশ্চর্য হয়ে গেছ, সবাই। বলে চললেন শাহজাহান। ভুলে গেছ যে মোগলরা হিন্দুস্তানে আসার আগে আমরা অক্সাসের ওপরেই শাসন করতাম। আমার পূর্বপুরুষ তৈমুর সমরকন্দকে নিজের রাজধানী তৈরি করেছিলেন আর পর পিতামহ বাবর এটি দখলও করেছিলেন। তাই ঐসব ভূমির উপর জন্মগত অধিকার আছে মোগলদের।
কিন্তু বাবর, সমরকন্দ ধরে রাখতে পারেননি, যত চেষ্টাই করুন না কেন। শেষপর্যন্ত উজবেকরা তাকে পরাজিত করেছিল। বলে উঠল দারা।
কারণ, তিনি সংখ্যায় কম ছিলেন। তার পেছনে বিশাল কোন সাম্রাজ্যের সম্পদ ছিল না, যেমনটা আছে আমার। এছাড়াও তাঁর শত্রুরা একত্রিত হয়েছিল শাইবানী খান নামে যুদ্ধবাজ উজবেক নেতার অধীনে। এখন এই মুহূর্তে উজবেকদের এ ধরনের কোন নেতা নেই।
আমি আপনার বক্তব্য বুঝতে পারছি, আব্বাজান। আলোচনায় অংশ নিল আওরঙ্গজেব। অক্সাস পার হয়ে যাওয়াই আমাদের ভাগ্য। আর যদি সফল হই তাহলে সমরকন্দ থেকে শুরু করে দাক্ষিণাত্যের শেষপর্যন্ত শাসন করব আমরাই–এতটা এমনকি তৈমুরও পারেননি।
মাথা নাড়লেন শাহজাহান, কক্ষের মাঝে একমাত্র আওরঙ্গজেবকেই মনে হল বুঝতে পেরেছে তার প্রস্তাব, আর এ নিয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে–যদিও এতে মনঃক্ষুণ্ণ হলেন তিনি। সম্ভবত অন্যেরা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি।
তুমি নিশ্চিত যে পাঠানো প্রতিবেদনগুলো সম্পূর্ণ সত্য? খানিকটা চিন্তিত হয়ে পড়ল দারা। আমাদেরকে যেভাবে জানানো হয়েছে উজবেকরা কি সত্যিই এতটা হানাহানিতে লিপ্ত নিজেদের সাথে? আর যদি তা হয়ও, তারা যদি ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে বিদেশী আক্রমণ ঠেকাতে একজোট হয়ে ওঠে?
আমার কর্মচারীদের পাঠানো সংবাদ বিশ্বাস করি আমি। একজন তো এমন বর্ণনাও দিয়েছে যে উজবেকদের এক গোত্র আরেক গোত্রের লোকদেরকে নির্বিচারে হত্যা করেছে। অন্তত পাঁচ হাজার লোক মৃত্যুবরণ করেছে। এদের মাঝে পুরুষদের পাশাপাশি নারী আর শিশুরাও আছে। রক্তক্ষয়ী জাতিগত বিবাদ এখন চরম আকার ধারণ করেছে। একে অন্যের উপরে প্রতিশোধ নেবার উপরেই বেশি মনোযোগী এখন তারা। তাই যতক্ষণে আমাদের দিকে নজর দেবার ফুরসৎ পাবে, বহু দেরি হয়ে যাবে। কিন্তু হ্যাঁ, ঘটনার অবশ্যই পরিবর্তন হতে পারে। আর তাই এখন আমাদেরকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
আপনি সম্পদের কথা উল্লেখ করেছেন, জাহাপনা। উত্তরে কত সংখ্যক সৈন্য পাঠাতে চান আপনি? জানতে চাইল অশোক সিং। বেশ বড়সড় আর সশস্ত্র সেনাবাহিনী প্রয়োজন হবে আমাদের। পাহাড়ের জীবনযাত্রা বেশ কঠিন আর আবহাওয়াও বৈরি।
সবকিছু নিয়ে সবিস্তারে পরে আলোচনা হবে। কিন্তু আমি বলব অন্তত পঞ্চাশ হাজার ঘোড়সওয়ার আর কামান নিয়ে দশ হাজার বন্দুকধারীর সাথে পদাতিক সৈন্যরাও যাবে, বান্ধের জন্য যাতে সমস্যা না হয়। এরপর অক্সাস পার হয়ে সমরকন্দ পৌঁছাতে আমরা যদি প্রয়োজন হয় তো, তারাও যাবে। এটি নির্ভর করবে উজবেকরা কতটা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তার উপর।
কিন্তু এ ধরনের বিশাল সেনাবাহিনী একত্রিত করার জন্য সময়ও দরকার। মনে করে দেখ যে অতীতের চেয়েও কতটা সময় বেশি চেয়েছে আমাদের প্রাদেশিক শাসনকর্তারা সৈন্য সমাবেশ করার জন্য… আমাদের অভিজাত সম্প্রদায় রাজকীয় ব্যবহারের জন্য সৈন্য প্রস্তুত করার রীতিতে আলগা ভাব নিয়ে এসেছে। জোর দিয়ে বলে উঠল দারা।
দারার এতটা চিন্তিত হবার বা প্রশ্ন করার কোন দরকার নেই। ভাবলেশ শাহজাহান। আমি জানি, কিন্তু সৈন্য পাঠাতে দেরি করলেই শাস্তি দেয়া হবে। এছাড়া, বিদেশী ভাড়াটে সৈন্য নিয়োগের ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি। ইতিমধ্যেই ইংরেজ নিকোলাস ব্যালান্টাইনকে দায়িত্ব দিয়েছি তিন হাজার ভাড়াটে সৈন্য নিয়োগ দেয়ার জন্য।
সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে কে থাকবেন? জানতে চাইল অশোক সিং। এই একই প্রশ্ন নিয়ে ম্রাট নিজেও বেশ বিচলিত হয়ে আছেন।
কক্ষের পেছন দিকে আওরঙ্গজেব উঠে দাঁড়িয়ে সোজা তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে, দেখতে পেলেন শাহজাহান। দাক্ষিণাত্যে একজন দক্ষ সেনাপতি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে আওরঙ্গজেব আর তাই এক্ষেত্রেও সেই হতে পারে নিশ্চিত পছন্দ, একথা তিনি নিজেও জানেন। প্রত্যক্ষ যুদ্ধের তেমন কোন অভিজ্ঞতা নেই দারার। শাহ সুজা বহু দূরে বাংলাতে আর ডেকে পাঠাতেও সময় লাগবে। অন্যদিকে মুরাদ এখনো তরুণ এবং কোন চেষ্টাও করা হয়নি তাকে নিয়ে এর আগে। রাত জেগে গভীরভাবে তিনি ভেবে দেখেছেন যে আওরঙ্গজেবকে কী এ দায়িত্ব দেয়া যায় কিনা। প্রায় সিদ্ধান্ত নিয়েও ফেলেছিলেন বিভিন্ন দিক থেকে এটাই হত যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত কিন্তু পুত্রের অযৌক্তিক আচরণের স্মৃতি এখনো মন থেকে মুছে ফেলতে পারেন নি তিনি। যতই ভেবেছেন ততই উদ্বিগ্ন উঠেছেন। মনগড়া একটা ধারণার জন্য তাঁর আদেশ অমান্য করার পরও কি আওরঙ্গজেবের ব্যাপারে ঝুঁকি নেবেন তিনি? অথবা আওরঙ্গজেবের কাল্পনিক বা উস্কানিমূলক কথাবার্তা যদি জ্যৈষ্ঠ কর্মচারীদের মাঝে মতভেদ তৈরি করে?
