প্রত্যূষের আলো কক্ষের মাঝে প্রবেশ করতেই সিদ্ধান্ত নিলেন যে নতুন দায়িত্ব নেবার আগে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে আওরঙ্গজেবকে।
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বভার দেয়া হবে, শাহজাদা মুরাদকে। আশ্চর্য হয়ে গেল সকলে আর মুরাদের চেহারায় ফুটে উঠল সত্যিকারের বিস্ময়। আমি জানি এটা তোমার জন্য প্রথম বড় কোন অভিযান মুরাদ। কিন্তু সময় এসেছে, তোমাকে শিখতে হবে যুদ্ধবিদ্যা আর আমি জানি যে আমাকে হতাশ করবে না তুমি। তোমাকে পরামর্শ দেয়ার জন্য আর প্রতিদিনকার সমস্ত কিছু ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিলাম অশোক সিং, তোমার উপর। নিজের সাহসের প্রমাণ দিয়েছ তুমি–আর নিজের সামরিক দক্ষতারও বহু বছর আগে যখন দাক্ষিণাত্যে একসাথে লড়াই করেছিলাম আমরা। আর ভালো কোন গুরু পাবে না আমার পুত্র।
কিন্তু আব্বাজান… এক পা সামনে এগিয়ে এলো আওরঙ্গজেব। আমাকে পাঠানো উচিত। মাত্র কি দেখাইনি যে আমিই একমাত্র বুঝতে পেরেছি তোমার উচ্চাশা? প্রমাণ দেইনি যে অর্ডার রাজার বিরুদ্ধে আমার প্রথম অভিযানের সময় থেকেই আমি একজন দক্ষ সেনাপ্রধান? দাক্ষিণাত্যের এককণা ভূমিও কি আমিও ছেড়েছি শক্তহস্তে? বিজাপুর আর গোলকুন্ডার শাসকদেরকে কি বাধ্য করিনি যুদ্ধক্ষেত্রে আমাকে ভয় পেতে আর মোগলদের সাথে চুক্তি করতে? আমাকে বাল্কে যেতে দাও আর দেখ আমাদের কামানের আঘাতে কত দ্রুত কেঁপে ওঠে এর দেয়াল….
না, আওরঙ্গজেব, আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি।
ভুল করেছ আর একদিন এর জন্য অনুশোচনাও করবে।
সারাটা কক্ষে সবার নিঃশ্বাস আটকে গেল বুঝতে পারলেন শাহজাহান। এই ধরনের অবাধ্যতার ভয়ই করেছিলেন তিনি। আওরঙ্গজেবকে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত সঠিকই হয়েছে আর তৎক্ষণাৎ আরো একটি সিদ্ধান্ত নিলেন ম্রাট কোন ধরনের পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই এ সিদ্ধান্ত তার পুত্র নিজেই ডেকে এনেছে নিজের উপর। আমি আবারো বলছি, আমি মনস্থির করে ফেলেছি। এছাড়া তোমার জন্য নতুন নিয়োগেরও ব্যবস্থা করেছি। আজকেই এটা ঘোষণা করার কোন ইচ্ছে ছিল না আমার; তোমাকে গুজরাট পাঠাচ্ছি। সেখানকার প্রাদেশিক শাসনকর্তা বেশ অসুস্থ আর বয়স্কও হয়ে গেছেন। তুমি এখন থেকে তার দায়িত্ব পালন করবে। তোমার অনেক কাজের মাঝে অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে জলদস্যুদের হাত থেকে আমাদের বাণিজ্যতরী আর তীর্থযাত্রীদের বহর কতটা নিরাপদে রাখছে ইংরেজরা, তার দেখাশোনা করা।
গুজরাট এক মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে গেল আওরঙ্গজেব। কিছুই না বলে সোজা তাকিয়ে রইল সামনের দিকে। অন্যান্য অনেক সভাসদের মতই দারা নিজেও তাকিয়ে আছে মেঝের কার্পেটের দিকে; যেন চাইছে না যে কারো সাথে চোখের দৃষ্টি আটকে যায়। অন্যদিকে মুরাদ একবার তাকাচ্ছে আওরঙ্গজেবের দিকে, একবার পিতার দিকে।
যদি আপনি তাই চান, তো ঠিক আছে আমি গুজরাট যাবো। অবশেষে বলে উঠল আওরঙ্গজেব, যদিও চোখের মাঝে জ্বলতে থাকা আগুন উপহাস করছে শব্দগুলোকে।
ঠিক আছে। কয়েকদিনের মাঝেই রওনা হতে হবে তোমাকে। এখন আবার মনোযোগ ফিরিয়ে আনা যাক বাল্ক অভিযানের প্রসঙ্গে আমি চাই যথাযথ রসদ আর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যাত্রা করুক আমাদের সেনাবাহিনী আর তাই হাতে সময় একেবারে অল্প।
.
২.৩
একমাত্র আপনার সাথেই কথা বলতে পারি এখন আমি। বিপদের সময় যেমনি, তেমনি সমৃদ্ধির সময়েও আমাদের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন আপনি। জাহানারা এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে সে নিকোলাস ব্যালান্টাইনকে যমুনার তীরে তার প্রাসাদের আঙিনাতে দেখা করতে বলেছে। কিন্তু বেশ কয়েক ঘণ্টা গভীরভাবে চিন্তা করার পর মনে হয়েছে এটাই যুক্তিযুক্ত। মাফ চাইছি। আপনি নিশ্চয়ই তৃষ্ণার্ত। সেবাদাসীর দিকে ফিরে জানালো, বরফ দিয়ে শরবত নিয়ে আসো।
এরপর মধ্যাহ্নের তপ্ত সূর্যালোক থেকে বাঁচতে তৈরি শামিয়ানার নিচে, নিজের বিপরীত প্রান্তে রাখা স্থূপীকৃত তাকিয়ার উপর বসার জন্য ইশারা করল নিকোলাসকে।
আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি, মাননীয়?
কয়েকদিনের মাঝেই পিতার সেনাবাহিনী উত্তরে যাত্রা করবে আর আপনিও তাদের সাথে যাবেন।
হ্যাঁ। বিদেশী সৈন্যদের প্রধান হিসেবে। নিজের বিস্ময় লুকাতে ব্যর্থ হল নিকোলাসের অভিব্যক্তি।
আমি একটু খোলামেলাভাবেই বলতে চাই যে আমি মুরাদকে নিয়ে চিন্তিত। এটা হতে যাচ্ছে আমার ভাইর প্রথম কোন গুরুত্বপূর্ণ অভিযান। কিন্তু নেতৃত্ব দেবার পূর্ব অভিজ্ঞতা বা এসম্পর্কিত কোন প্রশিক্ষণ নেই তার। আমার বিশ্বাস যে আব্বাজান বেশ বড়সড় একটা ভুল করেছেন তাকে এ কাজে নিয়োগদান করে, কিন্তু একথা বলতে পারব না আমি।
উত্তরাঞ্চল সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞ অশোক সিং। কয়েক বছর আগে কাবুলের চারপাশের গোত্রসমূহকে ঠাণ্ডা করেছিল সে। আর শাহজাদাকেও দিক নির্দেশনা দিতে পারবে।
তিনি নিশ্চয়ই চেষ্টা করবেন। কিন্তু মুরাদকে চেনেন না আপনি। আমার পিতা যখন সম্রাট হন তখন মুরাদ ছোট্ট একটা শিশু আর মা মারা যাবার সময়েও বেশ ছোট ছিল। বড় হয়ে উঠেছে হারেমে। সুদর্শন চেহারা আর চঞ্চলতার জন্য অতিরিক্ত মনোযোগ পেয়ে বখে গেছে। মুরাদ বোকা নয় কিন্তু নিজের মত করে চলতে চায় আর একটু অবাধ্য…এমনকি মাথা গরমও করে ফেলে। ওর এই দিক সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই আমার পিতার। মুরাদ তাঁকে ভয় পায়–তাঁর উপস্থিতিতে সবসময়েই শ্রদ্ধাবনত আর বাধ্য থাকে কিন্তু তার সত্যিকারের প্রকৃতি সম্পর্কে আমি জানি। দরবার থেকে একবার দূরে যেতে পারলেই মুরাদের মাথায় চড়ে বসবে ক্ষমতার ভূত। একইভাবে হয়ত তাকে অতি উৎসাহী করে তুলবে। যদিও আমার পিতা একমত হবেন না, কিন্তু আমার ধারণা অশোক সিং–তিনি যদিও এখন সৎ বিশ্বস্ত সেনানায়ক-অচেনা আর অযাচিত পরিস্থিতিতে মুরাদের প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারবেন কিংবা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
