তাহলে বলতে হয় যে সে একটা বোকা। আমার দাদাজান বুঝতে পেরেছিলেন যে সাম্রাজ্যকে একত্রে বেঁধে রাখতে হলে আর এর সমৃদ্ধি সাধন করতে হলে সকল প্রজার প্রতি সমান আচরণ করতে হবে অশোক সিংয়ের মত হিন্দু আর মুসলিম, সকলের জন্য। তুমি নিজে যেমন একবার আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলে যে আমার বিশ্বস্ত আর আস্থাবান সভাসদ ও সেনা প্রধানদের মাঝে হিন্দু রয়েছে, আমাদের ধমনীতে বয়ে চলেছে রাজকীয় রাজপুত রক্ত।
একই কথা বলে দারাও আর এখানেই তাদের বিরোধ। শেষবার, দারার প্রাসাদ দর্শনের এক কি দুইদিন আগে, দুজনের প্রায় মারামারি লেগে যাবার দশা যখন আওরঙ্গজেব বলে বসে যে আমাদের উচিত হিন্দু মন্দির নির্মাণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা।
সম্ভবত দুইজনেই ভুলে গিয়েছিল যে আমিই এখনো সম্রাট আর আমিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব যে, আমার সাম্রাজ্যের উচ্চ পর্যায়ে কারা কাজ করবে আর কোন ধরনের ধর্মীয় দালান নির্মাণে আমরা অনুমতি প্রদান করব।
আমি আপনাকে ক্ষিপ্ত করে তোলার জন্য বলিনি। আমি শুধুমাত্র আমার ভাইদের মাঝে কোন সমস্যা হয়েছে তা বুঝিয়ে বলতে চেয়েছি।
তুমি যেটাকে ব্যাখ্যা বলছ, সেখানে তো কিছুই নেই যে আওরঙ্গজেব কেন ভাবছে দারা তাকে হত্য করতে চায়?
আওরঙ্গজেব এখন জানে যে সে অসঙ্গত আচরণ করেছে। কিন্তু তার মত করে দেখার চেষ্টা করুন। দারা সবসময় সতর্ক থাকে না। ছোটবেলা থেকেই আওরঙ্গজেবকে প্রলোভনে ফেলে মজা করতো দারা। এখন এই মধ্যবয়সেও সে জানে যে কোথায় টোপ ফেললে আওরঙ্গজেব দারাকে নিজের শত্রু ভাবা শুরু করবে, সন্দেহ গড়ে তুলবে আর দারার প্রতিটি কাজের বাঁকা অর্থ খুঁজবে…কিন্তু আওরঙ্গজেব জানিয়েছে যে সব কিছুই এখন অতীত আর সে একটা ভুল করেছে ভূগর্ভস্থ কক্ষ নিয়ে। আবারো আপনার আস্থা অর্জন করতে চাইছে। আমিও বিশ্বাস করি এটা সত্যি।
চুপ করে রইলেন শাহজাহান। জাহানারা কি ঠিক বলছে? দারার প্রাসাদের সেই ঘটনার পর থেকে দুর্গের মাঝে একেবারে নিঃশব্দ হয়ে আছে আওরঙ্গজেব। যদিও তার উপর খুব সূক্ষ্মভাবে নজরদারির ব্যবস্থা করেছেন সম্রাট, সন্দেহমূলক কিছুই পাওয়া যায়নি। কোন ধরনের রাজদ্রোহ বা সম্রাটের উত্তরসূরী হিসেবে দারার নাম ঘোষণার পর কোন অসন্তোষেরও আভাস পাওয়া যায়নি। আওরঙ্গজেব হয় খুব পাকা অভিনেতা অথবা সত্যিকার অর্থেই অনুতপ্ত হয়েছে।
আব্বাজান। অনুগ্রহ করে জানান যে আপনি তাকে ক্ষমা করেছেন। আর নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ দেন। অন্তত আপনার দরবারের সভায় যোগ দেবার অনুমতি প্রদান করেন, যেমন দারা আর মুরাদ অংশ নেয়। আওরঙ্গজেবকে এভাবে দূরে সরিয়ে রেখে দরবারের চোখেও তাকে খাটো করছেন। আমরা সবাই জানি যে ও অহংকারী প্রকৃতির; তাই আপনার কাছে প্রকাশ না করলেও এতে আহত হচ্ছে আওরঙ্গজেব।
তাকে খাটো বা নীচ দেখানোর কোন উদ্দেশ্য নেই আমার। আমি শুধু তাকে একটা শিক্ষা দিতে চেয়েছি। সে যে ধরনের আচরণ করেছে। তাতে এটাই প্রাপ্য। যদি, তোমার কথানুযায়ী ও নিজের ভুল বুঝে থাকে, তাহলে ঠিক আছে দরবারের সভায় যোগ দেবার অনুমতি দেয়া হবে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে তার উপর। যদি আচরণে পরিবর্তন এনে থাকে তাহলে তার জন্য নতুন পদেরও ব্যবস্থা করব আমি। যদি তা না হয় তাহলে আমার কাছ থেকে সহৃদয়তার আর কোন আশা নেই …।
*
চার মাস পরে, ব্যক্তিগত দর্শনার্থীদের বিশাল কক্ষে সান্ধ্য বাতি জ্বেলে দিয়ে গেছে ভৃত্যেরা। সভাসদদের সামনে যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন শাহজাহান। এদের মাঝে দারা, আওরঙ্গজেব আর মুরাদও আছে। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে মনোযোগ সহকারেই সব ধরনের আলোচনা শুনেছে আওরঙ্গজেব। কিন্তু নিজে থেকে তেমন কিছু না বললেও বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রায় খোশামোদের মত করেই একমত হয়েছে দারার বিভিন্ন যুক্তির সাথে। কর, ছোটখাট প্রজা রাষ্ট্রের বিদ্রোহ দমন কিংবা উত্তর থেকে দক্ষিণে পুরো সাম্রাজ্যকে একসাথে বেঁধে রাখা গ্রেট ট্রাংক রোডের উন্নয়ন প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্কে মেতেছে সভাসদদের দল। হতে পারে যে দুই ভাইয়ের মাঝে ধূমায়িত বিষেদগার আসলে উঠে গেছে। অন্তত শাহজাহান সেরকমটাই আশা করলেন। হঠাৎ করেই একটা সুযোগ নিজে থেকেই এসে ধরা দিয়েছে তার রাজবংশের কাছে, যা হয়ত আর কখনো ঘটবে না–অন্তত তাঁর জীবদ্দশায় তো নয়ই। আর দুই পুত্রের বোকার মত তর্কের খাতিরে তিনি নিজের অথবা জ্যেষ্ঠ সেনাপতিদের মনোযোগ নষ্ট হতে দেবেন না।
মাথা তুলে, শুরু করলেন সম্রাট। এটা আমার কোন সাধারণ দৈনন্দিন সভা নয়। যুদ্ধ-সভায় বসেছি আমরা। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কাবুল আর বাদাকশান থেকে আমার প্রাদেশিক শাসনকর্তারা সংবাদ পাঠাচ্ছে যে, অক্সাস নদীর পেছনে উজবেক গোত্রেরা নিজেদের মাঝে মারামারি করে সন্ত্রাস কায়েম করে রেখেছে নিজেদের ভূমিতে। আর এই বিশৃঙ্খলাই আমাদের জন্য সুযোগ।
আপনি কী বলতে চান জাহাপনা? জানতে চাইল সব সময়কার মত সোনালি রেশমী টিউনিক পরিহিত অশোক সিং।
আমার কথার অর্থ হচ্ছে, উজবেকদের হাতে এখন নিজেদেরকে প্রতিরক্ষার মত অবস্থা নেই। যদি আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারি, তাহলে উত্তরে পৌঁছে বাল্ক দখল করে নিতে পারব। ব্যবসায়ের জন্য মূল্যবান এই শহর দখল করতে পারলে কাবুলে থাকা আমাদের ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত লাভবান হবে। কিন্তু বাল্ক হবে শুধুমাত্র সূচনা। একবার বাল্কে পৌঁছতে পারলে অক্সাস নদী পার হয়ে মাত্র ১৭০ মাইল দূরে থাকা সমরকন্দ দখল করে নিতে পারব। ভাগ্যদেবীর এনে দেয়া এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে সোনালি শহর হয়ে যাবে আমাদের…
