.
২.২
আব্বাজান, আপনাকে কিছু কথা বলতে চাই …
কী হয়েছে জাহানারা? কোন সমস্যা নেই তো? তোমার স্বাস্থ্য…?
প্রায় প্রতিদিনই পালকিতে করে দুর্গে আসে জাহানারা। তারপরও পিতার কাছে পাঠানো অনুরোধ যেন তার সাথে তারই প্রাসাদে দেখা করেন শাহজাহান–পেয়ে অবাক হয়েছিলেন সম্রাট।
আমি ভালো আছি, আমার সম্পর্কে কিছু নয়, আওরঙ্গজেবের সম্পর্কে।
তো সে তোমাকে বলেছে তার সম্পর্কে ওকালতি করতে, তাই না?
না, সে জানেও না যে আমি তা করছি। কিন্তু পরিবারের মাঝে কোন ভুল দেখতে পেলে আমি অগ্রাহ্য করতে পারি না তা। আমি আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, কিন্তু সম্ভবত আমি এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি, যা আপনি পাচ্ছেন না।
নম্রভাবে হলেও এহেন পরিহাসে আঘাত পেলেন শাহজাহান।
আমি স্বচ্ছভাবেই দেখতে পেরেছি সব। আওরঙ্গজেবের উচিত নিজেকেই দোষ দেয়া। আমি ভেবেছিলাম যে সে একজন পুরুষ, কিন্তু তার আচরণ তো সে কথা বলে না।
আমিও মানছি তা…. আর আমার ধারণা আওরঙ্গজেব নিজেও এখন বুঝতে পারছে। তার সাথে অনেক সময় কাটিয়েছি আমি, শুনেছি ওর আবেগপ্রবণ সব কথা, চেষ্টা করেছি যুক্তি দিয়ে বোঝতে, সে স্বীকার করেছে যে মূখের মত কাজ করেছে। শুধু চেয়েছে আপনার কাছে প্রিয় হতে। এখন মিনতি করছে আপনি যেন তাকে দাক্ষিণাত্যে ফিরে যেতে অনুমতি দিন…
আমি একজন যোগ্য পদমর্যাদার কর্মকর্তা খুঁজে পেয়েছি, তাই তার আর প্রয়োজন নেই।
আব্বাজান যখন আমি অসুস্থ ছিলাম আর আপনি আমার বিছানার পাশে বসে থাকতেন, মাঝে মাঝেই আমি শুনেছি যে আপনি আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করতেন যে আমি জীবন ফিরে পেলে আপনি যে কোন কিছু করতে রাজি। আমাকে পুনর্জীবন দান করেছেন আল্লাহ্, আর আমি তিনি নন–এখন এই দয়া চাইছি আপনার কাছে।
জাহানারা…
হা! আওরঙ্গজেব মন খারাপ করে আছে। ক্ষমা করে দিন তাকে, একসময় যেমন আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন আপনি। অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্তি দিন তাকে।
তারপর?
নতুন কোন কাজে নিয়োগ দিন। যদি দাক্ষিণাত্যে নাও হয়, অন্য কোথায় যেখানে সে তার মেধাশক্তি কাজে লাগাতে পারবে। এসবের অপচয় হবে না আর সে নিজেও দিনে দিনে তিক্তবিরক্ত হয়ে উঠবে না। মোটেই অসন্তুষ্ট করবে না আপনাকে। আর এটা শুধু আমার মন্তব্য নয়, আমি দারার সাথেও কথা বলেছি। যদিও প্রথমে সে নিজেও আওরঙ্গজেবের ব্যাপারে ক্ষুব্ধ ছিল–আওরঙ্গজেবের ভ্রান্ত ধারণার কথা নিয়ে কিন্তু তারপর জানিয়েছে যে শত্রুতার কোন ইচ্ছে নেই তার আর যদি আওরঙ্গজেব অনুতপ্ত হয় তাহলে সব ভুলে গিয়ে আওরঙ্গজেবের নতুন জীবন দেখতে রাজি সে।
কেন দারাকে এত অপছন্দ করে আওরঙ্গজেব? এটা কি শুধুই। হিংসা?
হতে পারে কিন্তু এতে যে শুধু আওরঙ্গজেবেরই দোষ তা নয়। আমার পোড়া ক্ষত থেকে সেরে ওঠার পর থেকে আমি দেখেছি যে তাদের মাঝে মনোমালিন্য বেড়ে চলেছে। আমারও মনে হয়েছে যে আপনার দাক্ষিণাত্য পেয়ে নিজের উপর বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে দারা–যদিও আমি নিশ্চিত যে অবচেতনেই হয়েছে এমনটা। আওরঙ্গজেবের মাঝে রসবোধ নেই, যেটা সে নিজেও জানে আর তাই দ্রুত বুঝেও ফেলে যদি কেউ তাকে অবমাননা করে–ইচ্ছেকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবেও বিশেষ করে দারা। তাই এভাবেই শুরু হয় প্রতিদ্বনদ্বতা।
কিছু কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বাভাবিক আমি জানি। কিন্তু আওরঙ্গজেব এমনভাবে কথা বলেছে যে সে দারাকে ঘৃণা করে। বড় ভাই তার সম্পর্কে এমন কী করেছে যে এত গভীরভাবে আহত হয়েছে সে?
খানিকটা দ্বিধার পর জাহানারা জানালো, তাদের মধ্যকার ধর্মীয় ভিন্নতা।
ধর্মীয়? আমি জানি দারা সুফীবাদে আগ্রহী আর আওরঙ্গজেব মোল্লাদের সাথে প্রচুর সময় কাটায়, কিন্তু কখনো তো কল্পনাই করিনি যে ধর্ম কখনো এত বিরোধের কারণ হতে পারে।
ভুল করেছেন আপনি। দারার চরিত্র সম্পর্কে জানেন আপনি সহিষ্ণু আর সবকিছু নিয়েই কৌতূহলী… আওরঙ্গজেব আমাদের সুন্নি পণ্ডিত আর মোল্লাদের সব কিছু মেনে চলে আর বিশ্বাস করে যে এদেরকে অমান্য করাটা ধর্মদ্রোহিতা। তার মতে দারার দর্শন ধর্মদ্রোহিতার সামিল আর আমাদের শাসনকার্যের অন্তরায়। আমি প্রায়ই তাকে বলতে শুনেছি যে মোগল সাম্রাজ্যের সমস্যা হল কঠোর আর সত্যিকারের মুসলিম পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছি আমরা। দুর্নীতির জন্য আপনার কর্মচারীদের মাঝে হিন্দু আর শিয়াদেরকে দোষারোপ করে সে। আর বিশ্বাস করে যে আমাদের প্রশাসনকেও দূষিত করতে তুলছে এরাই। আমাকে এও জানিয়েছে যে, দাক্ষিণাত্যে থাকাকালীন অবৈধ সুদ আর অনৈতিকতার বহু উদাহরণ খুঁজে পেয়েছে যার পেছনে হাত রয়েছে আমাদের হিন্দু প্রজাদের জমিদারের হাতে দাসের মত নিঃশেষিত হচ্ছে পুরো গ্রাম। জমিদার তাদেরকে দারিদ্র আর ঋণের জালে জড়িয়ে রেখেছে।
এই ধরনের ক্ষেত্রে ধর্ম কোন ব্যাপার নয়, চরিত্রই আসল। যদি সে অপরাধের কথা জানতে পারে, তাহলে আমার রাজ প্রতিনিধি হিসেবে তার দায়িত্ব হচ্ছে এগুলোকে ঠিক করা।
অবশ্যই। আর আওরঙ্গজেবের মতে এ কাজটিই করতে চেয়েছে সে। কিন্তু তার মতে শাসনকার্যের একেবারে গভীরে পৌঁছে গেছে পচন। কট্টরবাদী মোল্লাদের উৎসাহে সে চায় প্রতিটি হিন্দুকে তার ভাষায় অবিশ্বাসীদের অপসারণ করতে হবে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে।
