কক্ষের এ মাথা ও মাথা পায়চারি শুরু করলেন শাহজাহান। দারাকে বলছ যে ক্ষমতালোভী, উচ্চাকাংখী–কিন্তু নিজেই ঝুঁদ হয়ে আছ এতে– ভাইয়ের প্রতি হিংসার মনোভাব পোষণ করছ, এমনকি এটাকে অস্বীকার করার চেষ্টা করলেও এটাই সত্যি।
হতে পারে আমি হিংসা করছি, যদিও আপনি যে কারণে ভাবছেন, সেই কারণে নয়। যখন দারা আর আমি মেহরুন্নিসার কাছে থেকে বড় হচ্ছিলাম, তখন আমি বুঝতে পারতাম যে আপনি দারাকেই বেশি ভালোবাসেন। এখনো মনে আছে লাহোর প্রাসাদের খাল থেকে উদ্ধার করতে আসার সময় কি করেছিলেন আপনি…কেমন করে দারার নাম ডেকেছিলেন আগে, আমার নয়–ওকে বাঁচিয়ে তোলাটাই আপনার প্রধান চিন্তা ছিল।
এটা পাগলামী। আমি তোমাদের দুজনকেই ভালোবাসি। আগেও বাসতাম। তুমি ততটাই আমার পুত্র, যতটা দারা। অপলক ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন শাহজাহান।
বলছেন ঠিকই আপনি, কিন্তু এটা সত্যি নয়। যদি তাই হত, তাহলে দারাকেও কোন একটা প্রদেশে পাঠিয়ে দিতেন, যেমনটা পাঠিয়েছেন আমাকে আর শাহ সুজাকে। এর পরিবর্তে তাকে দরবারে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছেন, যেমন করে মা মুরগি আগলে রাখে প্রিয় ছানাকে। কী করেছে সে এ পর্যন্ত? লড়াই করেছে যেভাবে আমি করেছি? নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে সাম্রাজ্যের জন্যে? না। কেননা আপনার চোখে ওর জীবন এতটাই মূল্যবান যে ক্ষতির মুখে ফেলা যাবে না। এর বদলে যমুনার তীরে নিজের প্রাসাদে নিরুপদ্রব জীবন কাটাচ্ছে সে। তার হারেমের যে কোন নারীর মতই বখে যাওয়া, আহ্লাদে মাখা জীবন।
চুপ কর! আর শুনতে পারব না আমি। যা কিছু তুমি বলেছ আমাকে নিয়ে আর দারাকে নিয়ে, সবকিছুই তোমার ভ্রান্ত কল্পনা, কিন্তু বিপজ্জনক। কী ঘটবে যদি দরবারে এ খবর ফাঁস হয়ে যায় যে সম্রাটের দুই পুত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে–এমনকি একজন আরেকজনকে হত্যা করার পরিকল্পনা করছে? শুধু ভেবে দেখো যে, কেমন করে এ ঘটনার ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করবে সীমান্তের ভেতরে আর বাইরে থাকা আমাদের শত্রুরা…কতটা অনিষ্ট ঘটাতে চাইবে তারা। আমি তোমাকে বলছি আওরঙ্গজেব, ভাইয়ের বিরুদ্ধে একতরফা এ অভিযোগের এখানেই ইতি ঘটাও। একই সাথে আমার বিরুদ্ধে আনা তোমার অভিযোগেরও।
পায়চারি থামিয়ে পুত্রের দিকে তাকালেন শাহজাহান।
আওরঙ্গজেব কিছুই না বললেও মুখের দৃঢ় অভিব্যক্তির অর্থ ভালোভাবেই বুঝতে পারলেন সম্রাট। ছেলের এই পাগলামো মনোভাবের প্রতি ক্রোধান্বিত হবার পাশাপাশি তিনি এটাও ভেবে চিন্তিত হলেন যে, আওরঙ্গজেব নিজেকে এতটাই অপাংক্তেয় আর ব্রাত্যভাবে যে পিতা হিসেবে তাঁকেই শক্ত হতে হবে, দুর্বলতা দেখানো যাবে না আর এই আচরণ এখানেই খতম করতে হবে। নয়ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে এর পরিণতি? আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি নিশ্চিত হচ্ছি যে তোমার যৌক্তিক চিন্তাধারা ফিরে আসেনি, ততক্ষণ পর্যন্ত দাক্ষিণাত্যে আমার রাজপ্রতিনিধি হিসেবে আর দায়িত্ব পালন করছ না তুমি।
আলোচনা শুরু হবার পর থেকে এই প্রথমবার শাহজাহান লক্ষ্য করে দেখলেন যে তীর নিশানাতে লেগেছে। দৃশ্যতই মূহ্যমান হয়ে গেল আওরঙ্গজেব।
আব্বাজান…।
না, এখনো শেষ করিনি আমি। অনির্দিষ্ট কালের জন্য আগ্রা দুর্গেই থাকবে তুমি। তোমার মানসিক অবস্থার এমন মুহূর্তে তোমাকে চোখের আড়াল করার ঝুঁকি নিতে চাই না আমি। আশা করি সামনের দিনগুলোতে নিজের বোকামি বুঝতে পেরে অনৈতিক অভিযোগ তুলে নেবে তুমি। ভাবতেও পারবে না যে আমাকে কতটা হতাশ করেছ তুমি।
নিজের খাস কামরায় ফিরে এসে খানিক বসে রইলেন শাহজাহান। এখনো ডুবে আছেন গভীর চিন্তায়। সময় হয়ে গেছে পরিবার আর বাইরের পৃথিবীকে জানিয়ে দেয়ার যে কোন্ পুত্রকে নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখতে চান তিনি আর সমস্ত সন্দেহের অবসান করার–অথবা অযাচিত আশার–কনিষ্ঠ কোন পুত্রের যদি কিছু থেকে থাকে। তিনি বেঁচে থাকতে থাকতেই নিজেদের অসন্তুষ্টি মিটিয়ে নেবে তারা। বিবাদের আশংকাও দমন করতে পারবেন তিনি।
দুই দিন পরে, দর্শনার্থীদের সামনে নিজের জমকালো ময়ূর সিংহাসনে বসে গর্ববোধ করলেন শাহজাহান। এ ধরনের জৌলুস আর কোন শাসকই বা সৃষ্টি করতে পেরেছিল? তাঁর আদেশ মত সেনাপতি আর সভাসদগণ নিজেদের শ্রেষ্ঠ পোশাক আর রত্ন পরিধান করেই হাজির হয়েছেন আজ। কমলা রঙের সিল্কের আলখাল্লা আর হীরেখচিত হাতলওয়ালা ছুরি কোমরে ঝুলিয়ে জ্বলজ্বল করছে অশোক সিং। নিজের শাসনামলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করতে এসেছেন সম্রাট, তাই এমনটি হওয়াই বাঞ্ছনীয়। দারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে একবার সেদিকে তাকালেন শাহজাহান। দারার দুপাশে শাহ সুজা আর মুরাদ। হাত তুলে নীরবতা কায়েম করলেন সম্রাট। যদিও বহু খিলানঅলা কক্ষটাতে এমনিতেই নেমে এসেছে নৈঃশব্দের চাদর।
আজ তোমাদের সকলকে ডেকে পাঠানোর কারণ হল দরবারে আমার প্রিয়তম জ্যেষ্ঠ পুত্র দারা শুকোহকে সম্মানিত করা। এই মর্মে আমি তাকে হিসার ফিরোজা জায়গীর ও লোহিত বর্ণের শিবিকা স্থাপনের অধিকার প্রদান করলাম। কথা শেষ করার আগেই দেখতে পেলেন চারপাশে শুরু হয়ে গেছে চকিত দৃষ্টি বিনিময়। সবাই জানে তিনি কী বুঝাতে চেয়েছেন। দারাকে মোগল সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেছেন। খুব বেশি সময় লাগল না নিজ খাস কামরায় রুদ্ধ আওরঙ্গজেবের কানে এ সংবাদ পৌঁছাতে। এর তাৎপর্যও বুঝতে পারল সে। সম্ভবত অবশেষে পার্থিব পৃথিবীর সত্যিকারের রূপ বুঝতে পারবে আওরঙ্গজেব, মেনে নেবে যে সিংহাসন কখনো তার হবে না। মিথ্যে আশার চারা উপড়ে ফেলে, ভ্রাতৃ বিদ্বেষের তিক্ততা রোধ করার জন্য দ্রুত কাজ করতে হবে শাহজাহানকে। যাই হোক আল্লাহর ইচ্ছেতে সঠিক সময়ে সঠিক কাজটিই করেছেন তিনি। নিজের নিবুদ্ধিতা বুঝতে পারবে আওরঙ্গজেব, স্বীকার করে নেবে যে দারার উপস্থিতিতে সে কখনোই পিতার আনুকূল্য পাবে না। এটাও উপলব্ধি করতে পারবে যে তার ক্ষতি করার কোন কারণই নেই দারার–কখনোই দুজনে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না– যদিও আওরঙ্গজেবের মত অহংকারী মানুষের পক্ষে হজম করা কঠিন হবে এ সত্য।
