মাথা নাড়লেও কিছু বলল না আওরঙ্গজেব।
কেন? চিৎকার করে উঠলেন শাহজাহান। উত্তর দাও।
যদি আমি বলিও আপনি বিশ্বাস করবেন না আমাকে। দারা আমার বিরুদ্ধে আপনার মনে বিষ ঢেলেছে।
আওরঙ্গজেব, আমার সাথে রহস্য করে কথা বলবে না।
খানিকক্ষণ দ্বিধা করে কাঁধ ঝাঁকালে তাঁর পুত্র। ঠিক আছে, আপনি যেহেতু বাধ্য করছেন…আগ্রাতে ফেরার পর থেকে আমি দেখছি দারা কতটা বদলে গেছে। দারা কখনোই নম্র ছিল না আর এখন তো রাজদরবারে ঠিক একটা ময়ূরের মতই সদর্পে ঘুরে বেড়ায়। যখন সাম্রাজ্যের দূরতম কোণে বসে আমি আর শাহ সুজা আপনার কাজ করার চেষ্টা করছি, দারা এখানে আহ্লাদে পরিপাটি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে…
তো তাহলে এই ব্যাপার নিয়ে তুমি হিংসা করছ!
প্রথমবারের মত হাসল আওরঙ্গজেব। হিংসা? না। আমি ঘৃণা করি দারাকে। ওর শুধু দেখনো ব্যাপারটা আছে, কোন সারবত্তা নেই। অনেক বছর ধরেই এটা সন্দেহ করেছি আমি। তার পুরো মনোযোগ কীভাবে শুধু নিজেকে জাহির করতে হয়। ও এমন ভাব করে যেন ইতিমধ্যেই তাকে আপনার উত্তরাধিকারী ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা তার ভাইয়েরা যেন কিছুই না। আমাদের বিশ্বস্ততা নিয়ে পরীক্ষার আগে ভেবে দেখা উচিত।
সাবধানে কথা বলো আওরঙ্গজেব…
আপনি আমার সত্যিকারের ভাবনা আর অনুভূতি জানতে চেয়েছিলেন। যা শুনলেন তা যদি পছন্দ না হয় তাতে তো আমার কোন দোষ নেই। যেমনটা আমি বলেছি দারা উদ্ধত আর উচ্চাকাঙ্ক্ষী…
কিন্তু তুমি যেমনটা দাবি করছ যে সে ভাবে তার ভাইয়েরা মূল্যহীন, তাহলে তোমাকে কেন হত্যা করতে চাইবে?
বাইরের পৃথিবীতে নিজেকে আপনার প্রিয়পুত্র হিসেবে জাহির করতে চায় দারা। আর আপনার স্বীকৃতি নিয়ে তার অবস্থানের ব্যাপারেও কোন ভয় নেই। কিন্তু গোপনে নিজের ভেতরে এ ভয়ে ভীত হয়ে থাকে যে, কোন একদিন আমরা কোন ভাই তাকে হয়ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আহ্বান করে বসব। সব সময় তো এটাই আমাদেরকে পথ দেখিয়েছে, রাজসিংহাসন নয়ত কফিন–আগেকার দিনে এটাই তো বলত সকলে, তাই না? আপনাকেও সিংহাসনের জন্য যুদ্ধ করতে হয়েছিল আর এই করতে গিয়ে নিজের দুজন সৎ ভাইকেও সরিয়ে দিয়েছিলেন পথ থেকে।
নিশ্চুপ রইলেন শাহজাহান। রাগ আর অপরাধবোধের মিশ্র অনুভূতি পাকিয়ে উঠছে বুকের মাঝে। বহু কষ্টে গলার স্বর সংযত রেখে বলে উঠলেন, এটা ভিন্ন ব্যাপার। আর কোন উপায় ছিল না আমার। আমি যা করেছি তা করেছি শুধুমাত্র এই কারণে যে নতুবা আমার সৎভাইয়েরাই আমাকে হত্যা করে ফেলত–বস্তুত তোমাকেও সম্ভাব্য শত্রুর হাত থেকে মুক্তি পেতে চাইত। কিন্তু এ সময় তো বহু আগেই পেরিয়ে গেছে। এ ধরনের বর্বোরচিত নীতি আমার পরিবারে সহ্য করব না আমি। আমার সকল পুত্রই আপন ভাই, বড় হয়ে উঠেছে যত্নশীল পিতা-মাতার ছত্রছাত্রায়, যারা একে অপরকে ভালোবাসে, প্রতিদ্বন্দ্বী স্ত্রী আর উপপত্নীদের কাছ থেকে আসা ভাই-বোন নয় যে একে অন্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে।
আপনার ধারণা আমরা আপন ভাই, এই কারণই আমাদেরকে একসাথে বেঁধে রাখবে? দারাকে জিজ্ঞেস করুন, সেও কি এটা মনে করে কিনা? হাবিল আর কাবিলের কথা ভুলে গেছেন? ভাইদের মাঝে যুদ্ধ তো নতুন কিছু নয়।
এখনো তুমি আমাকে কোন প্রমাণ দিতে পারনি যে দারা তোমাকে আঘাত করতে চায় তোমার ভয় পুরোপুরি অমূলক, মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তা ছাড়া কিছু নয়…
না। এর চেয়ে বেশি। যেমনটা আমি বলেছি, দারা সন্দেহ করে যে সময় এলে পর তার কোন ভাই হয়ত সিংহাসনের জন্য তার সাথে লড়াইয়ে নামবে। শাহ সুজা ক্ষমতা পছন্দ করলেও, এমনকি তার নিজের উচ্চাকাঙ্খ থাকলেও প্রকৃতপক্ষে অলস। মুরাদ এখনো ছোট এবং নিজেকে প্রমাণও করেনি। তাই এখন দারার একমাত্র ভয় আমাকে নিয়ে আর এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। সে জানে যে আমিও তার মতই সামর্থ্য রাখি–সম্ভবত তার চেয়েও বেশি। আমি নিশ্চিত যে দাক্ষিণাত্য থেকে রাজাদরবারে আমার ফিরে আসাটা ভালোভাবে নেয়নি সে। তার উদ্দেশ্য এতেই পূর্ণ হবে যদি আমি আর শাহ সুজার ক্ষেত্রে একই কথা খাটে– এখানে কেন্দ্রের প্রভাব আর আপনার কাছ থেকে দূরে থাকি। আর সব সময়ের জন্য আমি দূরে চলে গেলে তো আর কোন সমস্যাই রইল না। তার। সে জানে আমি তার ধ্যান-ধারণা সমর্থন করি না। সূফী রহস্যবাদের প্রতি তার আগ্রহ, আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের দুর্নাম করা। মাত্র এক সপ্তাহ আগেই আমাকে এক মোল্লা সাবধান করে দিয়েছে যে দারা নাকি বলেছে সাম্রাজ্যে আমার মত ধর্মান্ধ গোঁড়া লোকের প্রয়োজন নেই…
হাত তুললেন শাহজাহান। আওরঙ্গজেবের এসব ধারণা আর অভিযোগ শুনে মাথা এত গরম হয়ে উঠল যে, বুঝতেই পারছেন না কোত্থেকে থেকে শুরু করবেন।
তুমি ভুল বলছ। এটা তো প্রাকৃতিক একটা ব্যাপার যে তোমার আর দারার মাঝে ভিন্নতা আছে, এমনকি তোমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও। বয়সকালে তোমরা দুজনেই প্রায় সমকক্ষ থাকতে। কিন্তু তোমার এই অদ্ভুত অভিযোগ, ভিত্তিহীন সন্দেহ বরদাশত করব না আমি। কোন সে মোল্লা যে ভাইয়ের বিরুদ্ধে তোমার মন বিষিয়ে তুলেছে?
আমি বলতে পারব না। বিশ্বস্ত হয়েই আমাকে জানিয়েছে আর আমিও কখনো তার নাম প্রকাশ করব না।
অনেক হয়েছে তোমার এই ঔদ্ধতপনা আর অবাধ্যতা…কী করবে আর কী করবে না তা নিয়ে এমনভাবে কথা বলছ যেন তুমিই–আমি নই ম্রাট। দারার ভূগর্ভস্থ কক্ষ দেখতে যাবার আমার আদেশ অমান্য করেছ তুমি আর এখন বলছ যে নামটাও আমাকে বলবে না।
