মাথা নাড়লেন শাহজাহান। ভালোই কাজ করেছে তোমার কারিগরেরা। নিচতলায় পৌঁছে আবারো আওরঙ্গজেবের দিকে তাকালেন, তোমার কী মনে হয়?
বেশ সুন্দর। কিন্তু মনে হচ্ছে অর্থের ব্যাপারে কোন মাথাব্যথা ছিল না।
বিস্মিত হল দারা। যেমনটা তোমাকে বলেছিলাম, আমার দ্বিতীয় পুত্র সিপিরের জন্ম উপলক্ষে এ নতুন প্রাসাদ নির্মাণের জন্য অর্থ এবং জমি দিয়েছেন আব্বাজান।
যদি আমাদের ভ্রমণ শেষ হয় তাহলে আমি আপনার অনুমতি নিয়ে দুর্গে ফিরে যেতে চাই।
পিতার দিকে তাকালেন আওরঙ্গজেব। বোরহানপুরের দক্ষিণে কর আদায় সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে একটা রিপোর্ট এসেছে আজ সকালে। আমি এখনো পড়া শেষ করিনি।
এবার উত্তর দিল দারা। ভ্রমণ এখনো শেষ হয়নি। তুমি তো আমায় ভূগর্ভস্থ কক্ষ দেখোইনি। আলোগ্লো থেকে আনা আয়নার সারি দিয়ে মুড়ে দিয়েছি চারপাশ আর আমার নকশাবিদ বেশ কয়েকটি হাওয়া সুড়ঙ্গ তৈরি করেছে যেমনটা পারস্য আছে। ফলে গ্রীষ্মকালেও শীতল থাকবে। আব্বাজান এটা পুরোপুরি তৈরি হয়ে এলে আপনাকে দেখাতে নিয়ে যাবো–অন্দরসাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি এখনো। তাই চারপাশে ধুলা আর নোংরা, কিন্তু আমি চাই আগ্রা ত্যাগের আগে দেখে যাক আওরঙ্গজেব।
মাথা নাড়লেন শাহজাহান আর প্রায় ঘুরেই তাকাচ্ছিলেন এমন সময় অদ্ভুত স্বরে কথা বলে উঠল আওরঙ্গজেব না, আমি যাবো না।
আওরঙ্গজেব। পুত্রের দিকে তাকালেন শাহজাহান। তোমার দাক্ষিণাত্যের সমস্যা নিশ্চয় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে পারে।
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে আওরঙ্গজেব উত্তরে জানালো, না, যেমনটা বলেছি, আমি ভূগর্ভস্থ কক্ষ দেখতে চাই না আর আবারো অনুমতি চাইছি চলে যাবার জন্য।
হতভম্ব হয়ে গেলেন শাহজাহান, নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। দৃঢ়তার স্পষ্ট ছাপ আওরঙ্গজেবের অভিব্যক্তিতে। কী হয়েছে তার? দারাকে তিনি এত সুন্দর একটি উপহার দিয়েছেন তাই কি অসন্তোষ হয়েছে সে? যদি তাই হয়, তাহলে মোটেই ভালো হয়নি ব্যাপারটা। সব পুত্রদের প্রতিই তিনি একেবারে মুক্তহস্ত। বালখিল্যতার কোন ইচ্ছেই নেই তার। আদেশ দিলেন,
আমি চাই ভাইয়ের অনুরোধে ঘরটি দেখতে যাবে তুমি।
আব্বাজান, আমাকে নির্দেশ দেয়ার আগে দয়া করে ভেবে দেখ কেন নইলে আপনাকে অমান্য করতে বাধ্য হব আমি।
ক্রমেই রাগ বাড়তে লাগল সম্রাটের। তোমার এমন আচরণের কিছুই বুঝতে পারছি না আমি। ভাইয়ের সাথে অভদ্রতা আর আমার সাথে অবাধ্যতা করছ তুমি। পিতা হিসেবে আমি বলছি না যে দারার কথা মত কাজ কর, তোমার সম্রাট হিসেবে আদেশ দিচ্ছি।
তাহলে প্রজা হিসেবে প্রতিবাদ করলাম আমি!
লম্বা লম্বা পা ফেলে গিয়ে ছেলের পেশীবহুর কাঁধ আঁকড়ে ধরলেন শাহজাহান।
কী হয়েছে তোমার? যেমনটা বলেছি কর নয়ত শাস্তি দেব।
হতে পারে; কিন্তু অন্তত নিজের জীবন বাঁচাতে পারব আমি। এ কক্ষের কথা শুনেছি আমি–একটা মাত্র দরজা দিয়ে ঢুকতে হবে, বেরোতে হবে। এর উদ্দেশ্যটাই বুঝতে পারছি না–হয়ত কোন ফাঁদ।
থ বনে গেল দারা। কী বলতে চাইছ তুমি? আমি তোমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করছি?
কীভাবে নিশ্চিত হব যে তুমি তা চাইছ না?
ধাক্কা দিয়ে আওরঙ্গজেবকে সরিয়ে দিলেন শাহজাহান। তুমি একটা ভণ্ড প্রতারক যদি এই অভিযোগ কর যে ভাই তোমাকে হত্যা করতে চাইছে। কক্ষটিতে যেতে জোর করব না আমি; কিন্তু এখনি সরে যাও আমার চোখের সামনে থেকে।
আঙিনাতে বের হয়ে যেখানে ঘোড়াগুলো বেঁধে রাখা হয়েছে, চিৎকার করে প্রহরীদের সেনাপ্রধানকে নির্দেশ দিলেন, অর্ধেক প্রহরী নিয়ে শাহজাদা আওরঙ্গজেবকে এখনি দুর্গে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। বাকিরা এখানেই অপেক্ষা করো।
ছেলের আচরণে আঘাত পেলেও আবারো কক্ষে ফিরে আসার সময় চেষ্টা করলেন গলার স্বর নিচু করতে। কোনমতেই চান না যেন বাইরের সৈন্যরা কিছু শুনে ফেলে। আওরঙ্গজেব, আগ্রা দুর্গে তোমার গৃহে ফিরে যাও, এক্ষুনি।
আব্বাজান, আমি…।
চুপ করো। তোমার অজুহাত শোনার কোন আগ্রহ নেই আমার। যাও! পুত্রের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালেন শাহজাহান। সূর্যস্নাত আঙিনার দিকে দ্রুত হেঁটে গেল আওরঙ্গজেব। একটু পরেই ঘোড়ার খুরের আওয়াজ পাওয়া গেল। রাগে রীতিমত কাঁপছেন বুঝতে পারলেন শাহজাহান। কুচক্রীকারীরা নিশ্চয়ই আওরঙ্গজেবের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে যে দারা তাকে মৃত দেখতে চায়। তার একগুয়ে অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বরের দৃঢ়তা এমন ষড়যন্ত্রের ফল। না হলে কেন এই দাবি করল যে সে জানে তার উপর বিপদ নেমে আসছে?
*
রাগে হতবুদ্ধি হয়ে কিছুক্ষণের জন্য প্রস্তরমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন শাহজাহান। দারার দিকে তাকিয়ে দেখেন, অনিন্দ্যকান্তি মুখখানা ঘুরিয়ে রেখেছে অন্য দিকে, যেন পিতার চোখে চোখ না পড়ে যায়।
আওরঙ্গজেব একটা ব্যাখ্যা চাওয়ার অধিকার আছে আমার। প্রথম আগ্রা দুর্গ তারপর পুত্রের গৃহে আসতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগলেও এখনো প্রশমিত হয়নি শাহজাহানের রাগ। মাথা ঠাণ্ডা হবার জন্য অপেক্ষা করলে ভালো হত, কিন্তু তৃতীয় পুত্রের এহেন অদ্ভুত আচরণের কারণ না জানা পর্যন্ত শান্তি পাবেন না তিনি।
সেই সময়ে যা বলেছি, তার চেয়ে বেশি কিছু বলার নেই আমার। অনড় আওরঙ্গজেবের অভিব্যক্তি।
তুমি পরিষ্কারভাবে বলেছ যে মাটির নিচের কক্ষে তোমাকে আমন্ত্রণ জানানোর পেছনে দারার কোন একটা উদ্দেশ্যে ছিল।
