পিতা পুত্রের এ দূরত্ব বলা যায় শীতল সম্পর্ক বেশ অপ্রতিভ একটি ব্যাপার। দারার সাথে কথা বলতে যদিও তিনি কোন সংকোচ বোধ করেন না; কিন্তু গুরুগম্ভীর আর মৌন স্বভাবের আওরঙ্গজেবের সাথে কী কথা বলবেন সেটাই ভেবে পান না। হতে পারে এর কারণ যে তিনি তাকে কমই দেখেছেন। আওরঙ্গজেবও ঠিক শাহ সুজার মতই সম্ভবত কারণের ভিন্নতা থাকতে পারে–যত শীঘ্র সম্ভব আগ্রা ত্যাগে উৎসাহী ছিল। শাহজাহানও এ ব্যাপারে একমত প্রকাশ করেছিলেন। তারপরেও মনে হয় আওরঙ্গজেব আরেকটু বেশি সময় রাজদরবারে কাটালেই ভালো করত। জ্যেষ্ঠ ভাইয়ের কাছ থেকে শিখতে পারত কেমন করে সহজাতভাবেই সন্তুষ্ট করতে হয় অন্যদেরকে।
হঠাৎ করেই পদশব্দের আওয়াজ পেয়ে চোখ মেলে তাকালেন, কে এখানে?
আমি আব্বাজান। জাহানারার কণ্ঠ শুনলেন শাহজাহান। অন্ধকার থেকে পেছনে কয়েকজন সৈন্যসমেত বের হয়ে এলো জাহানারার পাণ্ডুর দেহাবয়ব। নারীদের জন্য তৈরি পর্দার ফাঁক দিয়ে আপনাকে দেখেছি সমাধি ছেড়ে আসতে। চিন্তা হচ্ছিল।
একা এসেছ তুমি?
রোশনারা আসতে চেয়েছিল আমার সাথে কিন্তু আমি জানিয়েছি যে এর প্রয়োজন নেই। আমার কয়েকজন সেবাদাসী আর আপনার কয়েকজন ভৃত্য নিয়ে নদী পার হয়ে এসেছি।
তাদেরকে বলো দূরে গিয়ে অপেক্ষা করতে। অনুগ্রহ করে বল…যোগ করলেন শাহজাহান। সন্দেহ করলেন জাহানারা হয়ত আপত্তি করতে চাইবে।
কিন্তু আমাকে নিশ্চয় থাকতে দেবে, তোমার সাথে?
দ্বিধা ভরে মাথা নাড়লেন সম্রাট। দ্রুত নিচে নেমে প্রহরীদের সাথে কথা বলে ফিরে এসে বসল জাহানারা।
মাত্রই আমি তোমাকে নিয়ে, তোমার ভাইবোনদের নিয়ে ভাবছিলাম….কেমন করে সবকিছু বদলে গেল তোমার আম্মাজান মারা যাবার পরে।
আমরা সবাই বেশ ছোট ছিলাম তখন, দারা আর আমি একটু বড় হয়েছিলাম, বাকিরা তো সবাই ছোট ছিল।
আর এখন তোমরা সকলে নারী-পুরুষ হয়ে গেছ, আমি বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। যখন আমি তরুণ ছিলাম সময় যেন চিরকালের মত একই থাকত–চির গ্রীষ্মকাল। অথচ এখন মনে হয় ঋতুগুলো আসছে আর যাচ্ছে। এমনকি আমার লাগান এই গাছের ফলগুলোও মনে হচ্ছে চোখের পলকে দ্রুত বড় হয়ে, পেকে পড়েও যাচ্ছে।
কিছুই না বলে নদী থেকে আসা ঠাণ্ডা বাতাসের হাত থেকে বাঁচতে শালটা আরেকটু ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিল জাহানারা।
সম্ভবত, আমাকে কোথায় সমাস্থি করা হবে তা ঠিক করার সময় এসে গেছে। বলে চললেন শাহজাহান।
আব্বাজান…
কেন, এ ব্যাপারে কথা বলা যাবে না? মৃত্যু এসে আমাদের সবাইকেই নিয়ে যাবে। প্রায়ই আমার মাথায় আসে তোমার মায়ের অনুরূপ একটি সমাধি নির্মাণের চিন্তা। এই জ্যোৎস্না উদ্যানেই হবে, তবে সাদা মার্বেল দিয়ে নয়, কালো মার্বেল দিয়ে। এমনকি দুজায়গার মাঝে সংযোগ স্থাপনের জন্য একটা রুপালি সেতুর ভাবনাও আছে; যেন রাতের বেলা আমার আত্মা নদী পার হতে পারে মমতজের সাথে মিলিত হবার জন্য…কিন্তু সম্ভবত এটা একটু বেশিই আকাশকুসুম হয়ে যাচ্ছে, একজন মোগল সম্রাটের জন্যও।
পিতার দিকে তাকিয়ে জাহানারা ভাবতে চাইলো যে তিনি কি সত্যিই ভেবে চিন্তে এসব বলছেন কিনা। ইদানীংকালের বিভিন্ন ঘটনার কথা মাথায় রাখলে অবশ্য এটা বলা শক্ত হয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলা থেকে যেভাবে দেখে এসেছে, পিতা ছিলেন দৈনন্দিন বিষয়ে আগ্রহী, প্রয়োেগবাদী আর যে কোন ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। এরপরেই খেয়ালী এক একাকিত্বের মেঘ এসে ঢেকে ফেলে চেতনা। অনেক কাল আগেই একেবারে হৃদয়ের গম্ভীর হতেই ক্ষমা করে দিয়েছে জাহানারা, যদিও পুরোপুরি ভুলতে পারেনি কেমন করে একটা ঘটনা ঘটায় পুড়ে গিয়েছিল সে। তারপরেও গত কয়েক বছরে আবারো কাছাকাছি এসেছে পিতাকন্যা। এখন পিতার দিকে তাকিয়ে চোখ ভরে গেল অশ্রুতে। শাহজাহানের বয়স আর মানসিক বিপর্যস্ততা স্পষ্টতই চোখে পড়ছে। যদি আবারো তিনি আগের মত নিজের সত্যিকারের রূপ ফিরে পেতে পারতেন।
*
আমি আপনার মতামত চাই, আব্বাজান। আমার মনে হয় আমার কারিগরেরা ভালোই কাজ দেখিয়েছে। তারপরও সময় আছে যে কোন পরিবর্তন করার।
আজ সন্ধ্যায় আসব আমি। তুমিও আসবে আওরঙ্গজেব। দাক্ষিণাত্যে ফিরে যাবার আগে দারার প্রাসাদ দেখার এটাই তোমার শেষ সুযোগ।
আমি দুর্গেই থাকতে চাই। দালানকোঠা তেমন টানে না আমাকে। এছাড়া রোশনারাকে দেখতে যাবো বলেও কথা দিয়েছিলাম।
এটা তো পরেও করতে পারবে। আমি চাই তুমি দারা আর আমার সঙ্গী হও। না চাইলেও গলার স্বর উঁচু হয়ে গেল শাহজাহানের। যেমনটা ইদানীং প্রায়শ ঘটছে, আজও তাঁকে ক্রোধান্বিত করে তুলেছে আওরঙ্গজেব। এখন যাও তোমরা দুজনেই। আমার আরো কিছু কাজ আছে।
দুই ঘণ্টা পরে যমুনার তীর ধরে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছেন শাহজাহান। দুই পাশে দারা আর আওরঙ্গজেব। পেছনে প্রহরীদের ছোট্ট দল। এখনো ধূলিধূসরিত আর কাঁচা দেখালেও মার্চের উষ্ণ সূর্যের আলোয় বেশ দৃষ্টিনন্দন দেখাচ্ছে দারার নতুন প্রাসাদ। আঙিনাতে ঘোড়া থেকে নামতেই হলুদ আর সোনালি উর্দিধারী দারার ভৃত্যেরা এগিয়ে এলো লাগাম ধরতে। আগ্রহ নিয়ে চারপাশে তাকাতে লাগলেন সম্রাট। হাওয়া বাতাস খেলছে এমন সব কক্ষের মাঝে দিয়ে নিচতলার ছাদে নিয়ে গেল দারা। এরপর মাঝখানের সমান্তরাল ছাদে, যেটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে গম্বুজের মত ছত্রি। নাদিরা আর নারীদের দল সান্ধ্যবাতাস উপভোগ করতে পারবে। ব্যাখ্যা করে জানালো দারা।
