স্মরণ সভার আচার অনুষ্ঠান পালন করলেন মন দিয়ে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক প্রার্থনা শেষ হতেই আবারো ডুবে গেলেন স্মৃতির মাঝে। দুঃখের তীক্ষ্ণ শলাকা এসে আঘাত করল হৃদয়ে, তীব্রভাবে অনুভব করলেন যে একাকী হতে চাইছে মন। সমাধি ছেড়ে দ্রুত পিছন দিকে হেঁটে গেলেন দক্ষিণের প্রবেশদ্বারে। চাঁদের আলোয় ঝাপসা দেখাচ্ছে সাদা মার্বেলের ছাত্রি। প্রহরীরা উঠে দাঁড়ালেও থামলেন না। হনহন করে হেঁটে নিচে নদী তীরে নোঙর করে রাখা বজরার দিকে এগিয়ে চললেন। নাবিকেরা বুঝতেই পারেনি যে এত তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন সম্রাট। দৌড় দিয়ে নামিয়ে দিল বজরায় ওঠার তক্তা। উল্টো দিকের বাগানে নিয়ে চলো আমাকে। আদেশ দিলেন সম্রাট।
মমতাজের সমাধি নির্মাণের কাজ তখন অর্ধেকও হয়নি এমন সময় তাজমহলের ঠিক অপর পাশে যমুনার তীরে নিজের মালিদেরকে দিয়ে মাহতাব বাগ নামে উদ্যান তৈরি করেন শাহজাহান–চন্দ্র আলোর উদ্যান। রাতের বেলা প্রস্ফুটিত হয় এরকম তীব্র সুগন্ধঅলা সব ফুলের চারা রোপণ করা হয় এ উদ্যানে। অনেক অনেক বছর আগে শাহজাহানের পিতৃপুরুষ বাবর একদা ক্রীড়াভূমি গড়ে তুলেছিলেন এ স্থানে। এখন এটি ব্যবহৃত হচ্ছে সম্রাট শাহজাহানের একান্ত ব্যক্তিগত স্থান হিসেবে। একাকী হেঁটে বেড়ান আত্মমগ্ন শাহজাহান, গভীরভাবে ধ্যান করেন স্মৃতিসৌধ নিয়ে।
যমুনার ঢেউয়ের তালে তালে অল্প অল্প দুলছে বজরা, তারপরেও দাঁড়িয়ে রইলেন শাহজাহান। বজরা তীরে নাক দিতেই নেমে যাবার । তক্তার জন্য অপেক্ষা না করেই তীরে নেমে গেলেন। এগিয়ে গেলেন নদীর দিকে, মুখ করে তাকিয়ে থাকা ছোট মার্বেলের আচ্ছাদনের দিকে। এর নিচে বসে স্তম্ভের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে বন্ধ করে ফেললেন চোখ। ভেসে এলো শুধু তীরে পানির আছড়ে পড়ার মৃদু শব্দ।
কিছুক্ষণের জন্য মন জুড়ে রইল শুধুই মমতাজ। সেই রাতে মমতাজের চাহনি যখন বুঝতে পেরেছে আর বেশিক্ষণ বেঁচে রইবে না, কখনো ভুলতে পারবেন না। শাহজাহান–অথবা সেই সাহস, শেষ মুহূর্তে সময়গুলোতে একসাথে সহভাগিতা করেছেন দুজনে… মাঝে মাঝে মনে হয় শুধুমাত্র তখনই, বিচ্ছেদের সেই মুহূর্তে সত্যিকারভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে কতটা গভীরভাবে ভালোবাসেন এই নারীকে। বিবাহের পর থেকে বছরের পর বছর মমতাজের শর্তহীন ভালোবাসাকে চিরস্থায়ী হিসেবে নিয়েছেন তিনি অন্ধকার মুহূর্তগুলোতে শক্তি শুষে নিয়েছেন এ ভালোবাসা থেকে। মমতাজের সৌন্দর্য আর মিষ্টি চরিত্র, মাংস আর পানীয়ের মতই টিকিয়ে রেখেছে তাঁকে। কিন্তু কখনো কি মমতাজের নিঃস্বার্থপরতা আর কষ্টসহিষ্ণুতার প্রশংসা করেছিলেন তিনি? মমতাজের শেষ মুহূর্তের উদ্বিগ্নতাও ছিল তাঁকে আর তাঁর সন্তানদের নিয়ে। আর এখানেই সম্ভবত মমতাজের কাছে হেরে গেছেন তিনি। পরিবারের হৃদয়ের স্পন্দন ছিল মমতাজ…তার কাছেই নিজ হৃদয়ের অনুভূতি আর চিন্তা তুলে ধরতেন ছেলেমেয়েরা। সমব্যথিতা অবচেতনেই মিশে ছিল মমতাজের চরিত্রে। কেন তিনিও একই হতে পারেন না? মাঝে মাঝে মনে হয় নিজ সন্তানেরাই যেন আগন্তুক তার কাছে। এর কারণ কি এটাই যে, নিজের পিতার সাথেও তাঁর সম্পর্ক বিদ্বেষপূর্ণ ছিল? অথবা এই কারণে যে একজন ম্রাট হিসেবে সাম্রাজ্যের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ও জনগণের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে আর তাই নিজের সন্তানদের জন্য সময় ব্যয় করা যাবে না?
যে কোন সংকটময় কালই একত্রিত করে তোলে পরিবারকে, এতে কোন সন্দেহ নেই। জাহানারা সুস্থ না হয়ে ওঠা পর্যন্ত উদ্বেগময় মাসগুলোতে ছেলেমেয়ের উপস্থিতিতে স্বস্তি পেয়েছেন তিনি। কিন্তু তার পর থেকে কদাচিৎ আবার তাঁরা একত্রিত হয়েছিল–এমনকি মমতাজের মৃত্যুবার্ষিকীতেও নয়। ফলে কীভাবে তিনি তাদের সম্পর্কে জানবেন, বিশেষ করে পুত্রদের সম্পর্কে? বত্রিশ বছর বয়সী দারা, পিতার সব সময়কার সঙ্গী, দরবারে তেমন একটা অনুপস্থিত থাকেন না, কিন্তু মাত্র পনের মাসের ছোট শাহ সুজা? মৃত্যুবার্ষিকীর জন্যে আগ্রাতে ফিরে এসেছে কিন্তু পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে বাংলাতে নিজের প্রশাসকের দায়িত্বে ফিরে যেতে পারলেই খুশি হবে। যদি আগ্রাতে গত কয়েক সপ্তাহের তার আচরণ ভেবে দেখা যায়, তাহলে বলতে হবে যে সম্ভবত দরবার থেকে দূরে থাকার স্বাধীনতা উপভোগ করছে শাহ সুজা পিতার কাছ থেকেও দূরে নিজের প্রদেশের উন্নতির উচ্চাকাঙ্খও আছে হয়ত। শাহজাহানের পিতা সুলভ সমালোচকের দৃষ্টিতে এখনো শাহ সুজা রয়ে গেছে পূর্বেকার মতই অলস আর আনন্দপিয়াসী। তারপরেও কি বলা যায় না যে এগুলো বিত্তশালী পরিবারে জন্ম নেয়া তরুণের সহজাত প্রবৃত্তি যদিও এগুলো তার নয়?
ভ্রুকুটি করলেন শাহজাহান। তৃতীয় পুত্র এখনো তার কাছে এক বিস্ময়। যদিও কেউ তার সম্পর্কে লঘুতা বা চাপল্যের অভিযোগ আনতে পারবে না। আওরঙ্গজেবের বয়স প্রায় ত্রিশের কাছাকাছি। দাক্ষিণাত্য থেকে ফিরে এসেছে। চারিত্রিক দিক থেকে হয়ে উঠেছে আরো বেশি গম্ভীর আর আত্মমগ্ন। কদাচিৎ প্রকাশ করে নিজের ভাবনা যদিও শাহজাহানের সন্দেহ যে এর কোন কমতি নেই আওরঙ্গজেবের মাঝে। ঘন্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে ওলেমাদের সাথে ধর্মীয় বিষয় আলোচা করে আর নামাজ পড়ে। খাবার এবং পানের ব্যাপারে মিতাহারী আওরঙ্গজেব কখনো মাদকদ্রব্য স্পর্শ করেনি। শক্তি ব্যয় করে সামরিক দক্ষতা অর্জনে। এ ধরনের অত্যন্ত কঠোর, সাদাসিধা জীবন যদিও সমালোচনার কিছু নেই; কিন্তু একজন তরুণের ক্ষেত্রে কেমন যেন অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অনুতাপের বিষয় এই যে, আওরঙ্গজেব দারার মত সামাজিক নয়। দুজনেরই ধর্মীয় আর দর্শন বিষয়ে আগ্রহী। কিন্তু দারা অপেক্ষাকৃত বেশি কৌতূহলী আর ভোলা মনের অধিকারী– বিরুদ্ধবাদীদের সাথে তর্কে অথবা নিজের ধারণা বদলাতে সদা প্রস্তুত–অন্যদিকে আওরঙ্গজেব কেবলমাত্র তাদের সঙ্গই পছন্দ করে যারা তার মতই একই মতাদর্শের ধ্বজাধারী।
