মেয়েটা তাকে আরো একবার সুযোগ দিচ্ছে পরিবারের সাথে মিলিত হবার, বুঝতে পেরে চোখে জল এল শাহজাহানের। সেভাবেই উত্তর দিলেন, আমরা সবাই যাবো, অনেক দিন হয়ে গেল–অনেক দিনের চেয়েও বেশি–আমরা পুরো পরিবার একত্রিত হইনি।
২.০১ দ্বিতীয় পর্ব – সর্পদন্তের চেয়েও তীক্ষ্ম
২.১
আগ্রা, ১৬৪৭
সুবাসিত বাগানের মধ্য দিয়ে এগোতে লাগলেন শাহজাহান। গোলাপি আকাশের পটভূমিতে অশ্রুবিন্দুর ন্যায় গম্বুজের নিচে সাদা মার্বেলের জমকালো সমাধিস্তম্ভ দেখে মনে হল, ভাসছে। সুনিপুণ এই সৌন্দর্য দেখে দম বন্ধ হয়ে এল সম্রাটের। এর আগে আজকের দিনে মমতাজের ঘোড়শ মৃত্যুবার্ষিকীতে পাঠ করার জন্য কবিতা রচনা করে দিয়েছেন দরবারের একজন কবি।
পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশে তোমার দৃষ্টি দোলা দেয়
স্মৃতির ভার তোমার পদাঙ্ককে সংকোচন করে দেয়
মেঘে চোখের দৃষ্টিভ্রম করে দেয়,
খাঁটি পাথরের ঘর্ষণে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়
মদ ফটিকের ভেতর স্বচ্ছ দেখায়
যখন তারার থেকে আলো মার্বেলে প্রতিফলিত হয়
বাতির আনন্দ উৎসবে পুরো প্রাসাদ সুসজ্জিত হয়।
মমতাজের সবশেষ বিশ্রাম স্থানের অসাধারণ আকার আর উজ্জ্বলতা উভয়কেই তুলে এনেছেন কবি। চার বছর আগে দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকীতে, অস্থায়ী সমাধি থেকে নিয়ে আসা হয় মমতাজের মৃতদেহ। রত্নখচিত ফুল খোদাই করা সাদা মার্বেলের শবাধারে রাখা হয় মৃতদেহ। বাঁকানো লতাগুলো জীবনীশক্তি আর নবজন্মকে তুলে ধরেছে যেন তারা সত্যিই জন্মেছে এই মার্বেলের উপর। সাধারণ কালো মার্বেল দিয়ে সোজা-সাপ্টা করে লেখা হয়েছে এপিটাফ : এই অত্যুজ্জ্বল সমাধিটি আরজুমান বানু বেগমের, যাঁকে মমতাজ মহল উপাধিতে সম্মানীত করা হয়েছে। একাকী ঘণ্টাখানেক সমাধিগৃহে কাটান শাহজাহান। এরপর পাথরের সিঁড়ি বেয়ে মাটির নিচে সমাধিগৃহ ছেড়ে উঠে যান মৃত সম্রাজ্ঞীর উদ্দেশে শোক পালনের জন্য অপেক্ষারত তাঁর পরিবার আর সভাসদদের কাছে। এখনো ঠিক একই কাজই করবেন তিনি।
তাঁকে যারা সান্ত্বনা দিয়ে বলেছে যে সময়ের সাথে সাথে কমে যাবে যন্ত্রণা, তাদের কথা বিশ্বাস করলে এখন আশাহত হতেন তিনি। যদিও শাসনকার্যের ভারে কিছু সময়ের জন্য চাপে ছিলেন তিনি, কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে গেছে যে কী হারিয়েছেন। অনুভূতিগুলো এখনো এত তাজা যে মনে হচ্ছে প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করছেন সমাধি স্তম্ভে। তারপরেও কী হারিয়েছেন তা অনুভব না করতে পারার মানে এই নয় যে তিনি মমতাজকে ভুলে যাচ্ছেন, এই কাজটা কখনোই পারবেন না…অন্তত যা সৃষ্টি করেছেন খানিকটা আরাম মিলবে। এর চেয়ে সুন্দরভাবে আর কখনোই ফুটে উঠতো না তার ভালোবাসা আর হারানোর বেদনা।
এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি সমাধির কাজ। কারিগরেরা শেষ ছোঁয়া লাগাচ্ছে সীমানা দেয়ালের উপর সুন্দর করে বসানো লাল বালিপাথরের প্যাভিলিয়ানের উপর। এখানে সুর বাজাবে বাদকের দল। এছাড়াও সম্রাট নির্দেশ দিয়েছেন যেন মসজিদ আর অতিথিশালাগুলোকেও আরো চকচকে করে তোলা হয়। মাত্র গত মাসেই খাজনা আদায়কারীদের প্রধান কর্মকর্তা জানিয়েছে যে সমাধি নির্মাণের খরচ পৌঁছে গেছে পঞ্চাশ লাখ রুপিতে। ইঙ্গিত দিতে চেয়েছে যে এহেন খরচে কোন এক সময় দেউলিয়া হতে বসবে টাকশাল, কিন্তু মাঝপথেই তাকে থামিয়ে দিয়েছেন শাহজাহান–মোগল সামাজ্য এতটাই বিত্তবান আর শক্তিশালী যে, কোন কিছুই অসম্ভব নয় যেমন রত্নখচিত তাজমহল; সমাধিস্তম্ভকে জনগণ ইতিমধ্যেই মমতাজ মহল থেকে সংক্ষিপ্ত করে তাজমহল ডাকা শুরু করেছে।
ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য কত বড় এক উদাহরণ রেখে যাচ্ছেন শাহজাহান…যুগের পর যুগ মহিমা গেয়ে যাবে তার নির্মিত দালান সমূহ, হোক সেটা ব্যক্তিগত ক্ষতির সৌধ তাজমহল অথবা দিল্লিতে সাম্রাজ্যের শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা শহর শাহজাহানাবাদ। এতে সহজে তাঁর শাসনামল ভুলতে পারবে না ইতিহাস। পূর্বের যে কোন সময়ের তুলনায় দক্ষিণে মোগল সাম্রাজ্য বৃদ্ধি করেছেন আর কে জানে উত্তরে কতটা এগিয়ে যাবেন তিনি আর তাঁর উত্তরসূরীরা?
এ ভাবনার উদয় হতেই কাঁধের উপর দিয়ে পলক ফেলে দেখে নিলেন চার পুত্রকে সকলেই তাঁর মতই পরিধান করেছে শোকের শুভ্র পোশাক। ফটকদ্বারে একটা মাত্র বাজনার সাথে মৃদু তালে পা ফেলে পিতাকে অনুসরণ করছে। হেঁটে আসছে উত্তর দক্ষিণে বয়ে চলা পানির প্রবাহ আর মসৃণ বুদবুদঅলা মার্বেলের ঝরনার পাশ দিয়ে।
সমাধি স্তম্ভের কাছে পৌঁছতেই শুনতে পেলেন কালো আলখাল্লা পরিহিত মোল্লাগণ স্বর্গের উদ্যানে মমতাজের আত্মাকে গ্রহণ করার জন্য প্রার্থনা করছে। বালিপাথরের মঞ্চের কাছে পৌঁছে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন মার্বেলের তৈরি ছোট ভিত্তিমূল আর সমাধির মাঝখানের অষ্টভুজ প্রকোষ্ঠে। সোনালি ঝাড়বাতির আলোতে উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে। ঝুলন্ত সিল্কের দেয়াল আর ধিকিধিকি করে জ্বলা ধূনার ধোঁয়ায় বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে যেন স্ফটিকের কণা।
পালিশ করা জাফরি কাটা পর্দার সামনে তার জন্য সংরক্ষিত আসনে বসলেন শাহজাহান। একটি মাত্র পাথরের ব্লক কেটে তৈরি করা রত্নখচিত এ জাল ঢেকে রেখেছে নিচের সমাধি গুহাতে শুয়ে থাকা মমতাজের কফিনের অনুরূপ মার্বেলের স্মৃতিস্তম্ভ, পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ আরবীয় মুক্তা বিছিয়ে দেয়া হয়েছে এর উপর।
