রাগে কাঁপতে থাকলো জাহানারার কণ্ঠস্বর। যদি আমরা নিজেরাই এ ধরনের সংকীর্ণ নিচুমনা কথার প্রভাবে পড়ে যাই তাহলে শুধু যে মায়ের স্মৃতিকে অপমান করব তা না আমাদের বেশির ভাগ প্রজার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো।
আমি দুঃখিত। আমি তোমাকে উত্তেজিত করতে চাইনি…চলো অন্য কোন কিছু নিয়ে কথা বলা যাক। বিছানার কাছে হাঁটু গেড়ে বসল আওরঙ্গজেব। যখন আমি প্রথম ফিরে এসেছি তখন তুমি বলেছিলে যে একজন বিদেশী চিকিৎসক তোমাকে সাহায্য করেছে অলৌকিক এক মলম দিয়ে। কে সে?
নিকোলাস ব্যালান্টাইনের একজন বন্ধু–নিকোলাসই তাকে নিয়ে এসেছিল। অসম্ভব শক্তি আছে লোকটার–একজন অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও, শেষ অংশটুকু যোগ না করে পারল না জাহানারা।
আওরঙ্গজেবের কালো চোখ জোড়া দেখে মনে হল যে সেও বুঝতে পেরেছে ভালো। আওরঙ্গজেব ভালোই বলেছে; কিন্তু যদি সে ঠিক বলে থাকে যে দারা মাঝে মাঝে বিধর্মীদের প্রতি ঝুঁকে যায়, তাহলে তো সে নিজেও সংকীর্ণমনা আর অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে।
দুই ঘণ্টা পরে চলে গেল আওরঙ্গজেব। ঘরের চারপাশের কুলঙ্গিতে তেলের বাতি জ্বেলে দিতে শুরু করল সেবাদাসীর দল, সম্রাটের আগমন, ঘোষণা শুনতে পেল জাহানারা। কয়েক মুহূর্ত পরেই কক্ষে প্রবেশ করলেন শাহজাহান একা। জাহানারার দেখভালের জন্য এক কোণায় বসে থাকা হামিককে জানালেন চলে যেতে। হাকিমের পেছনে জোড়া দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই হঠাৎ করে সন্ত্রস্ত বোধ করতে লাগল জাহানারা। মনে পড়ে গেল পিতার আচরণ। ভাবতে লাগল কক্ষে তাদের সাথে কেউ থাকলে কতই না ভালো হত।
বিছানার কাছে না এসে জানালার কাছে হেঁটে গেলেন শাহজাহান। তাকিয়ে রইলেন গোধূলির দিকে। শব্দ বলতে শুধুমাত্র বাইরের আঙিনাতে নিম গাছের কাছে থাকা ময়ূরের ব্যাকুল ডাক। এরপর ধীরে ধীরে জাহানারার দিকে ঘুরে তাকালেন। কিন্তু কথা বলার আগে কেটে গেল আরো বেশ কিছু মুহূর্ত। কর্কশ শোনাল কণ্ঠস্বর। কতবার যে আমি ভেবেছি তোমার কাছে আসব ক্ষমা চাইতে অন্তত বুঝিয়ে বলতে…কিন্তু এই সাহসটুকু না করতে পারার আগপর্যন্ত বুঝি নি যে আমি একটা কাপুরুষ। এখন দেখ আমি এসেছি, যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার…শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না…
না.. দয়া করে…পিতার যন্ত্রণাক্লিষ্ট চেহারা দেখে ভয় উধাও হয়ে গেল জাহানারার মন থেকে। সেই রাত নিয়ে আর কথা বলব না…আমাদের দুজনেরই উচিত ভুলে যাওয়া। উঠে বসল জাহানারা, মানসিকের চেয়েও শারীরিক ব্যথায় ককিয়ে উঠল বেশি। কেননা পোড়া ক্ষতগুলোর জন্য শরীর টানটান করতে এখনো ব্যথা হয়।
তোমার হৃদয় অনেক দয়াবান। আমার জন্য প্রায় মরতে বসেছিলে তুমি…কেননা পিতা-কন্যার সম্পর্কের সব সীমা লঙ্ঘন করেছি আমি। এ কারণেই বলতে হবে আমাকে…আমি ভাবতে পারছি না যে সে রাতে আমাকে যেভাবে দেখেছিলে তারপরে আর কখনো আমার দিকে তাকাতে পারবে কিনা। আমি কোন অজুহাত দিতে চাই না। কিন্তু ঘুমের জন্য আফিম নেয়াতে আমি দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম। অন্য দুনিয়ায় চলে গিয়েছিলাম আমি…অর্ধ-চেতনার বশে ভেবেছিলাম তুমি মমতাজ এবং ফিরে এসেছ আমার কাছে…আমি ভেবেছিলাম যে আমি মমতাজকে পেতে চলেছি। আমি বুঝতেই পারিনি যে এটা তুমি, যতক্ষণে পেরেছি অনেক দেরি হয়ে গেছে আর পালিয়ে গেছ তুমি।
আপনি ভেবেছিলেন আমি আম্মাজান?
হ্যাঁ, আমি তাকেই স্বপ্নে দেখছিলাম আর বাস্তবের সাথে মিলিয়ে ফেলছিলাম। আর কখনোই এমনটা ঘটবে না, আমি শপথ করছি। তোমার দুর্ঘটনার পর থেকে এক ফোঁটা মদ বা একদানা আফিমও ঠোঁটে ছোঁয়াইনি আমি।
অন্তত এতে খুশি হয়েছি আমি।
কিন্তু ক্ষমা করতে পারবে আমাকে…যা করেছি শুধু তাই না, ভয়ংকর অবস্থাটার জন্য? মাথা নিচু করলেন শাহজাহান। আমি নিজেকেই দোষারোপ করছি যে সভাইদেরকে হত্যার আদেশ দিয়েছিলাম বলে তোমার আম্মাজান মৃত্যুবরণ করেছেন, তেমনি আমার কৃতকর্মের জন্যেই আহত হয়েছ তুমি–উপর থেকেই এ শাস্তি পেয়েছি আমি।
চুপ করে রইল জাহানারা। এখন বুঝতে পারছেন কীভাবে ঘটল ঘটনাটা। পিতার কোন অনৈতিক কর্ম নয় এটা বরঞ্চ এমন এক দুঃখ যা থেকে এখনো বের হয়ে আসতে পারেননি বা মেনেও নিতে পারেননি। যদি এখন জাহানারা না বলে যে সে ক্ষমা করেছে, নিজেকেও যদি তা বোঝাতে না পারে সেই রাতের ঘটনা কুরে কুরে খাবে তাদের দুজনকেই। আগুন লাগার আগে তার সবচেয়ে বড় দুঃশ্চিন্তা ছিল যে চারপাশের জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন পিতা। যদি এখন থেকে জাহানারা ফিরিয়ে দেয় তাহলে আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন শাহজাহান।
মুখে হাসি ফোঁটালো জাহানারা আর সাধারণভাবেই জানালো, হ্যাঁ, আমি ক্ষমা করেছি। মুহূর্তখানেক পরেই অনুভব করল যে আগ্রহভরে তার হাত ধরলেন শাহজাহান। বহু কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল সে চেষ্টা করল কেউ যাতে আবেগপ্রবণ না হয়ে ওঠে তাই তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আগুন লেগে যাওয়া রাত নিয়ে আর কখনো কথা বলব না আমরা–এতে শুধুমাত্র ব্যথাই বাড়বে। এর চেয়ে বরঞ্চ সামনের দিকে তাকানো যাক! আগে যেভাবে দেখতাম, সেভাবে তোমার কাছে আসা আর্তি-অনুরোধ পাঠিয়ে দেবে না আমার কাছে?
আবারো তোমার সাহায্য পেলে কৃতজ্ঞ হব আমি।
পিতার আচরণে স্বস্তি দেখতে পেয়ে আরো যোগ করল জাহানারা। যখন আমি আবার আগের মত ঠিকঠাক হাঁটতে পারব– চিকিৎসকেরা জানিয়েছে যে আর বেশি দেরি নেই–নৌকা করে আমাকে নিয়ে যাবেন মায়ের সমাধি দেখে আসতে? কতটা উন্নতি হয়েছে দেখতে চাই আমি। শুধু আপনিই তাকে ভালোবাসতে না, আব্বাজান, আমরাও বাসতাম।
