যাই হোক, অন্তত ব্যথাটা ধীরে ধীরে কমে গিয়ে মাথা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। যদিও এর সাথে অন্য সমস্যাও জুড়ে যাচ্ছে। আগুন লেগে যাবার রাতে শাহজাহানের আচরণের স্মৃতি এতটাই তাজা আর তিক্ত যে মনে হল মাত্র তিনদিন আগেই ঘটেছে এমনটা ছয় সপ্তাহ আগে নয়…সে সময় একমাত্র চিন্তা ছিল পালিয়ে যেতে হবে। মনে পড়ে গেল পা বেঁধে পড়ে গিয়েছিল কিছুর সাথে হোঁচট খেয়ে, যখন দৌড়ে পালাচ্ছিল, কিন্তু তারপরই সব অন্ধকার ছায়া আর সীমাহীন ব্যথা। পুরোপুরি চেতনা ফিরে পাবার আগের দীর্ঘ সময়টাতে ঝাপসা ঝাপসাভাবে মনে পড়ে যে পিতা এসে বসে থাকতেন তার বিছানার পাশে, হাকিমদের সাথে আলোচনা করতেন জাহানারার সুস্থতা নিয়ে। প্রথম প্রথম এতটাই দুর্বল ছিল যে বুঝতে পারত না তার কী হয়েছিল। কিন্তু টুকরো টুকরো আলোচনা শুনে অংশগুলোকে জোড়া লাগিয়ে বুঝতে পারে মসলিনের স্কার্টে আগুন ধরে গিয়ে মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে সে।
যখন নিশ্চিত হয়ে গেছে যে জাহানারা সুস্থ হতে আর বেশি দেরি নেই তখন খেয়াল করে দেখেছে যে শাহজাহান একাকী রুমে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। কেউ না কেউ সাধারণত দারা, মুরাদ, অথবা রোশনারা সাথে থাকত। যখন ঘুম আসে না, অন্ধকারে শুয়ে থেকে বারংবার মনে পড়ে যায় সেই ভয়ঙ্কর রাতের স্মৃতি। চেষ্টা করে কোন একটা ব্যাখা খুঁজে পেতে যেন সবকিছু সত্ত্বেও পিতার প্রতি সে ভালোবাসা অনুভব করে, তার সাথে যেন সমঝোতা করতে পারে। কী হয়েছিল যে নিজ কন্যার সাথে এহেন আচরণ করলেন তিনি?
কারো সাথে যদিও সে আলোচনা করেনি যে কী হয়েছিল-বৃদ্ধ আর বিশ্বস্ত সাত্তি আল-নিসা, ভাইরা কিংবা রোশনারা কারো সাথেই না…এমনকি তার বোনও বিশ্বাস করতে চাইবে না, যদি বিশ্বাস করেও বুঝতে পারবে না।
আজ কেমন আছ জাহানারা? তোমাকে ভালো দেখাচ্ছে!
আওরঙ্গজেব কখন এসেছে শুনেতেই পায়নি জাহানারা। হলুদ পোশাকের নিচে কিছু একটা নিয়ে এসেছে। হাসি লুকালো জাহানারা হয়ত আরেকটা উপহার। তার ভাইরা একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে যেন জাহানারা একটা ছোট্ট অসুস্থ শিশু তাই তাকে খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে হবে। গতকাল বাংলা থেকে আনা কোরাল আর মুক্তার তৈরি নেকলেস উপহার দিয়েছে শাহ সুজা।
প্রতিদিনই অনুভব করছি যে সুস্থ হচ্ছি।
ভালো। দেখো কী এনেছি তোমার জন্য। পোশাক থেকে স্বর্ণের পাখির খাঁচা বের করল আওরঙ্গজেব। বাঁকানো আইভরি দাঁড়ের উপর বসে আছে হালকা নীলাভ রঙের ঘুঘু, গলায় পেঁচানো পদ্মরাগমনির কলার।
অনেক সুন্দর। ধন্যবাদ ভাই।
এটা কী? হাতে বই তুলে নিয়ে পৃষ্ঠা উল্টে দেখতে লাগল আওরঙ্গজেব।
দারার লেখা কয়েকটা কবিতা। সুরাটে যাবার পথে একজন সূফী সাধকের সাথে দেখা হয় আর তার সান্নিধ্যেই আর শিক্ষায় উৎসাহী হয়ে এ সকল পদ্য রচনা করেছে দারা। সেই সূফী সাধককে আগ্রতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে দারা যেন তারা আরো আলোচনা করতে পারে।
দারা কেন এত আগ্রহী হল? আর দেখ কী লিখেছে এখানে :
আমি আনন্দিত হয়েছি যে প্রতিটি মানুষই তার নিজস্ব পথে খুঁজে ফেরে সৃষ্টিকর্তাকে।
আওরঙ্গজেবের অবজ্ঞা ভরা কণ্ঠে বিস্মিত হয়ে গেল জাহানারা।
দারা সঠিক লেখেনি? আত্মিক জ্ঞানের সন্ধান করা তো আমাদের সকলেরই দায়িত্ব…আত্মিক শান্তি…যে পথেই আমরা তা পারি না কেন।
মোল্লা আর তাদের লেখনি? তারাই তো আমাদের পথপ্রদর্শক আল্লাহর কাছে। তাদেরকে আর তাদের বিচারকে অবহেলা করে নিজস্ব পথে চলা শুধুমাত্র বিশ্বাসঘাতকতা, আর বিপথগামীতাই নয়–এটা ধর্মদ্রোহীতা।
তাই? দারা মনে করে আলোকিত জ্ঞান অন্বেষণের পথে বাধা হচ্ছেন কয়েকজন মোল্লা–তারা সৃষ্টিকর্তা আর মানুষের মাঝে দাঁড়িয়ে যায় নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য। আমিও এ ব্যাপারে একমত।
এটা একেবারে যাচ্ছে-তাই চিন্তা। ঠাস করে বইয়ের মলাট বন্ধ করে জাহানারাকে ফিরিয়ে দিল আওরঙ্গজেব। যখন তোমার শরীর আর মন শক্তি ফিরে পাবে তুমি বুঝতে পারবে।
সম্ভবত। অথবা যেহেতু আমি তোমার চেয়েও একেবারে কাছ থেকে অনুভব করেছি মৃত্যুকে, তুমি স্বীকার করবে যে আমি হয়তো অস্তিত্বের সত্যিকারের আচরণ বুঝতে পারি। আমাদের বিশ্বাস তোমার মত নয়, শুধু এই কারণেই দারা আর আমার উপর রাগ করো না…
আমি কখনোই তোমার সাথে রাগ করি না। কিন্তু দরবারে ফিরে আসার পর থেকে দেখছি যে দারা কতটা উদ্ধত হয়ে গেছে আর কীভাবে অন্যদের মতামতকে অশ্রদ্ধা করছে। একজন শিশু হিসেবেও ভালো ছিল, সব সময় ভাবতো যে ওই সবচেয়ে ভালো জানে আর আমাদেরকে বলে দিত যে কী করতে হবে। কখনো বুঝতে পারেনি যে নিজে কী করছে। যখন থেকে আমি দক্ষিণে গেছি, সময় পেয়েছি মুসলিম বিভিন্ন রাজ্য গোলকুন্ডা, বিজাপুর আর আহমেদনগরকে কাছ থেকে দেখার। তাদেরকে দমিয়ে রেখে আমাদের রাজত্বের অধিকারে আনার জন্য আমাদেরকে শক্তি দেখাতে হবে কিন্তু শুধু সামরিক শক্তি বলে, সত্যিকারের বিশ্বাসের পালনকারী আর অনুসরণকারী হিসেবে ধর্মীয় শক্তি দিয়ে। আমাদের পিতার বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহের অন্যতম একটি কারণ ছিল যে পিতার মাঝে তিন ভাগই হিন্দু অংশ আর বিবাহ করেছে একজন শিয়া মুসলিমকে…
আমাদের পিতা একজন সম্রাট। তাঁর জন্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলার তাদের কোন অধিকার নেই। ঠিক একইভাবে আমাদের মা, সুন্নি অথবা শিয়া যাই হোক না কেন, তিনি একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম আর সকলের প্রতি দয়ালু…
