তাকে জানাও যে আমার কন্যা প্রায় অচেতন অবস্থায় আছে। দুর্ঘটনার পর থেকে তার ঠোঁটের মাঝে কয়েক ফোঁটা পানি মিশ্রিত আফিম গিয়েছে শুধুমাত্র ব্যথা কমাবার জন্য, বিশেষ করে পট্টি বাঁধার সময়।
ডাক্তার জোর দিয়ে বলছে যে যত শীঘ্রি সম্ভব শাহজাদীকে খাবার খাওয়াতে হবে নরম করে দেয়া ফল বিশেষ করে কলা– কিন্তু বিশেষ যত বেশি বার সম্ভব পানি খাওয়াতে হবে। শরীরে তরল দরকার।
আধ ঘণ্টা পরে ফরাসী ডাক্তারের কাঁধে হাত রাখলো নিকোলাস। খাজাসারা যেভাবে নির্দেশ দিয়েছে ঠিক সেভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এরপর একজন খোঁজা-মৃসণ চেহারা, লাবণ্যময়–দুই বিদেশীর মাথার উপর সবুজ ব্রোকেডের কাপড় পরিয়ে দেয়। ঠিকঠাক বেঁধে যতক্ষণ পর্যন্ত না সন্তুষ্টি আসে যে হ্যাঁ, একজন বিদেশীও হারেমে প্রবেশের পর কিছু দেখতে পাবে না। নিকোলাসের ঘাড়ে সুড়সুড়ি লাগালো রেশমি কাপড়ের স্পর্শে। যাই হোক, খাজাসারার নির্দেশে আস্তে আস্তে পা ফেলে সামনে বাড়লো দুজনে। খোঁজা ভৃত্যের কাঁধে হাত রেখে চলেছে ডাক্তার।
কয়েক বছর আগে একবার হারেমে এসেছিলাম আমি। ফিসফিস করে জানালো ফরাসী ডাক্তার, গুজরাটের মোগল শাসনকর্তার অন্দর মহলে। তার বহু স্ত্রীর একজনের ধারণা হয়েছিল যে তাঁকে বিষ খাওয়ানো হয়েছে। আসলে বেশি খেয়ে ফেলেছিল সেই নারী আর আমি শুধু পেট পরিস্কারের ওষুধ দিয়েছিলাম। কিন্তু তার হাতের পালস খুঁজে পেতে যে কী কষ্ট হয়েছিল তা কখনোই ভুলবো না আমি। হাতের মাঝে এত মুক্তার মালা জড়ানো ছিল যে প্রথমে তো আমি খুঁজেই পাইনি পালস্ ।
ডাক্তার মুচকি হাসতেই নিকোলাস দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেল। একই সাথে চিৎকার করে সাবধান করে দেয়া হল যে দুজন বিদেশী এগিয়ে আসছে। তাই হারেমের অন্তপুরবাসিনীরা যেন দৃষ্টিসীমার আড়ালেই থাকে।
সামনে এগোতে গিয়ে জুতার নিচে নরম কার্পেটের স্পর্শ পেল নিকোলাস। আরো পাওয়া গেল ধূপ-ধুনার চনমনে মিষ্টি গন্ধ। আরো কয়েকবার এঁকেবেঁকে মোড় নিয়ে এগোতে দিয়ে আরো কয়েকটি দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেল। কিন্তু বৈচিত্র্যময় এই হারেমে প্রবেশ নিয়ে কল্পনাগুলো মনমত হল না। ভারতে আসার পর থেকে যৌন আনন্দের এ ক্ষেত্র সম্পর্ক বহু রসাত্মক কাহিনী শুনে এসেছে সে। যাই-হোক আবারো মনে পড়ে গেল আহত আর সম্ভবত মৃত্যুপথযাত্রী শাহজাদীর কথা। শাহজাহানের সব ছেলেমেয়েদের মাঝে জাহানারা আর তার ভাই দারা শুকোহকেই একেবারে তাদের বাল্যকাল থেকে চেনে নিকোলাস। জাহানারা বেশি আগ্রহী ছিল নিকোলাসের নিজের দেশের প্রথা নিয়ে প্রশ্ন করার ব্যাপারে–কেমন করে বাস করে নারীরা আর কেমন করেই বা একজন নারীই হয়ে উঠেছে এর সর্বময় শাসনকর্তা।
হঠাৎ করেই মোলায়েম মোমবাতির আলোতে পিটপিট করে উঠল নিকোলাসের চোখ জোড়া। মাথা থাকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে কাপড়ের টুকরো। বড়সড় একটা রুমের মাঝে দাঁড়িয়ে নানানা ধরনের শিকড় বাকড় আর কর্পূরের গন্ধ পেল নিকোলাস আর ডাক্তার। চারপাশে তাকিয়ে খুঁজতে লাগল জাহানারাকে। বদলে দেখতে পেল তিন রমণী সিল্কের কাপড় ধরে রেখে আড়াল করে রেখেছে কোন একজনকে। এটাই নিশ্চয়ই আহত জাহানারার শয্যা।
মহামান্যার ক্ষত পরীক্ষা করার জন্য ডাক্তার এখন আসতে পারে। ঘোষণা করল খাজাসারা। কিন্তু দোভাষীকে পর্দার ওপাশেই থাকতে হবে। ডাক্তারকে নিজের কাঁধ থেকে চামড়ার ব্যাগ নামাতে দেখল নিকোলাস। এরপর নিজের নাকের উপর একজোড়া মোটা কাঁচের চশমা বসিয়ে দিল ডাক্তার। এরপর একজন দাসী পর্দা একটু তুলে ধরতেই ভেতরে ঢুকে গেল ডাক্তার। উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল নিকোলাস। মনে হল বহু যুগ পরে, কিন্তু হয়ত পনের বা বিশ মিনিটের বেশি হবে না উদয় হয় ডাক্তার।
তো? সাহায্য করতে পারবে তাকে? জানতে চাইল নিকোলাস।
পোড়া ক্ষতগুলো মারাত্মক আর পানি বের হচ্ছে–আমি মলম লাগিয়ে দিয়েছি আর দুই জগ ভর্তি করে রেখে যাবো যেন তার সেবাকারীরা পরে লাগিয়ে দিতে পারে। কিন্তু আমি যতটা ভয় পেয়েছিলাম অবস্থা ততটা খারাপ নয়। আমার ধারণা বেঁচে যাবে। পালস্ স্বাভাবিক, নিঃশ্বাসও ঠিক-ঠাকভাবে নিচ্ছে। কিন্তু সুস্থ হতে এখনো সময় লাগবে আর যত্নও প্রয়োজন।
সম্রাট তুমি যা চাও দিতে চেয়েছেন। কিছু চাও?
জানি আমি। এ মহান মানুষগুলোর ধারণা যে তাদের বিত্ত দিয়ে যে কোন কিছু বা যে কাউকে ক্রয় করা সম্ভব। কিন্তু এই ক্ষেত্রে শাহজাদীর তারুণ্য আর শক্তিই তার সবচেয়ে বড় সহায়ক হতে পারে, আমি নই।
*
আইভরি বাঁধাইকৃত বইটা নামিয়ে রাখার আগে আরো একবার কবিতাটা পড়ে দেখল জাহানারা। দারার নিজের লেখা কবিতাটা পড়তে বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠেছিল। অসম্ভব ভালো লেগেছে যেদিন চোখ মেলে তাকিয়ে দেখতে পেয়েছে শয্যাপাশে বসে আছে তার ভাই। জাহানারা হাসতেই, দারার চোখে চিকচিক করে উঠেছে কান্না–এই অশ্রু কী খুশিতে যে সে বেঁচে আছে নাকি সৌন্দর্যহানির দুঃখে, নিশ্চিত নয় জাহানারা। বিছানার পাশে রাখা ছোট্ট আয়নাটা তুলে নিয়ে নিজের মুখের সামনে ধরল শাহজাদী। বাম গালের চামড়ায় মসৃণ, উজ্জ্বল একটা লাল চিহ্ন গলা পর্যন্ত নেমে যেতে যেতে চওড়া হয়ে গিয়েছে। পেছন দিক বা বাম পা দেখতে কেমন লাগছে কোন ধারণাই নাই। এখনো বেশ দুর্বল তাই নিজে বাঁকা হয়ে দেখার সামর্থ্য নেই। কিন্তু অনুমান করতে পারছে।
