কোথায় যাচ্ছো তুমি? যেও না…লাফ দিয়ে নামলেন শাহজাহান কিন্তু ধরার আগেই পিতলের বোল তুলে ছুঁড়ে মারল তাঁর দিকে, এসে আঘাত লাগল তার ডান কপালে। মুখের উপর গড়িয়ে পড়ল রক্তের ধারা। ব্যথায় কেঁপে উঠে পিলার ধরে নিজেকে সামলাতে চাইলেন তিনি। এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ করে ফেললেন চোখ।
আব্বাজান!
আবারো চোখ মেলে তাকিয়েই জাহানারাকে দেখতে পেলেন শাহজাহান। চোলির সামনের অংশ খুলে উন্মুক্ত হয়ে আছে সব। কী ঘটেছিল? মাথা নাড়তে লাগলেন যেন এইভাবে কেটে যাবে চেতনার মেঘ। মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন…কান্না ভেজা কাজল লেপ্টে থাকা চেহারাতে শোক আর প্রতিবাদের ভাষা…
থ হয়ে গেলেন যে তিনি কী করতে যাচ্ছিলেন, জাহানারা…আমি চাইনি…এক কদম এগিয়ে গেলেন সামনে, কিন্তু পিছিয়ে গেল জাহানারা, পেছন থেকে আসা ছাদের বাতাসে উড়তে লাগল তার গোলাপি মসলিনের স্কার্ট।
না…আর কাছে আসবেন না! অদ্ভুত শোনালো মেয়েটার গলা–উচ্চ আর রুক্ষ স্বর–ঘরে থেকে বের হবার দরজার দিকে তাকিয়ে আছে; কিন্তু পথিমধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন শাহজাহান। পিলার ছেড়ে এপাশে সরে দাঁড়াবেন শাহজাহান কিন্তু আবার কি মনে করে থেমে গেলেন। এভাবে কীভাবে যেতে দেবেন জানাহারাকে? আগে কথা বলতে হবে তার সাথে…
আমাকে বলতে দাও কী ঘটেছিল…
না! একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জাহানারা তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘুরে দাঁড়িয়ে দৌড়ে চলে গেলেন ছাদের দিকে।
জাহানারা…দৌড়ে পিছু নিলেন শাহজাহান। বাইরের মৃদু আলোতে প্রথমে কিছুই ঠাহর করতে পারছিলেন না, আলো জ্বলছে তেলের পাত্রে, কিন্তু তারপরেই একটা শব্দে বুঝতে পারলেন যে কোথায় আছে জাহানারা ছাদের একেবারে শেষ মাথার কাছে একটা সিঁড়িতে যেটা সরাসরি নেমে গেছে হারেমে। দাঁড়াও…
এক মুহূর্তের জন্য পিছু ফিরে তাঁকে দেখল জাহানারা, তারপর মসলিনের স্কার্ট তুলে ধরে দৌড়ে নামতে লাগল সিঁড়ি বেয়ে, হঠাৎ করেই পা হড়কে হোঁচট খেলো সামনের দিকে। হাত বাড়িয়ে চেষ্টা করল কিছু ধরে তাল সামলাতে। নিচে পড়ার সময় স্কার্টের প্রান্ত গিয়ে পড়ল তেলের শিখার উপর। আতঙ্কে জমে গিয়ে শাহজাহান দেখতে পেলেন কাপড়ে ছড়িয়ে পড়ল কমলা রঙা আগুনের জিহ্বা আর চিৎকার শুরু করে দিল তার কন্যা।
খানিকটা দৌড়ে, খানিকটা টলতে টলতে এগোতে লাগলেন শাহজাহান, কিন্তু তিনি পৌঁছবার পূর্বেই হারামের নারী পরিচারিকারা ছুটে আসলো সিঁড়ি বেয়ে, নিশ্চয়ই তারা শুনতে পেয়েছে মেয়েটার চিৎকার। কী ঘটেছে দেখতে পেয়ে দুজন হাঁটু গেড়ে ধপ করে বসে পড়ল জাহানারায় পাশে, একজন চেষ্টা করল খালি হাত দিয়েই আগুন নিভিয়ে দিতে–আরেকজন চেষ্টা করতে লাগল জ্বলন্ত স্কার্ট খুলে নিতে। খানিকটা কাজও হচ্ছিল, কিন্তু একজন ঠিক জাহানারার উপরেই ঝুঁকে পড়াতে আগুন ধরে গেল তার লম্বা চুলে, নিজের মাথা খামচে ধরে চিৎকার জুড়ে দিল সেও। এর প্রায় সাথে সাথে দ্বিতীয় জনের কাপড়েও আগুন ধরে গেল, উঠে দাঁড়িয়ে একটা ঝরনার দিকে এগিয়ে যেতেই হালকা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল আগুন, মনে হল মানব মশালে পরিণত হয়েছে পরিচারিকাটি।
এরই মাঝে এগিয়ে এসেছে অন্য সেবাদাসীরাও। সবাই মিলে পানি ঢালতে লাগল জাহানারার উপর। পানি ঢেলে নিভিয়ে দিল আগুনের শিখা, তারপর নজর দিল বাকি দুজনের উপর। কিন্তু শাহজাহান তাকিয়ে আছেন কেবল নিজ কন্যার দিকে। হাঁটু গেড়ে বসে পোড়া কাপড়ের টুকরা সরিয়ে ফেলতে লাগলেন, ভয় পাচ্ছেন যে কী দেখবেন তা ভেবে।
উপুড় হয়ে শুয়ে আছে জাহানারা, পিঠের কিছু অংশ আর বাম পা মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে আর অনিন্দ্য সুন্দর চুলের বেশির ভাগই ভস্ম হয়ে গেছে। পোড়া মাংসের গন্ধ নাকে ঢুকতেই হাঁপাতে লাগলেন সম্রাট।
হাকিমেরা আসছে, জাহাপনা। শুনতে পেলেন বলে উঠল কেউ একজন। ধোঁয়া আর শোকাচ্ছন্ন চেহারায় নেমে এলো অশ্রু জল, উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই শক্তপোত হাত এগিয়ে এলে তাকে সাহায্য করতে। মিনিটখানেক পরে দুজনে হাকিম এসে ঝুঁকে পড়ল জাহানারার উপর। শ্বাস পড়ছে কিন্তু পোড়া ক্ষতগুলো বেশ খারাপ। অবশেষে বলে উঠল হাকিম দ্বয়ের একজন।
কোথায় নিয়ে যাবো, জাহাপানা? নিজের প্রাসাদে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো শাহজাদীকে? জানাতে চাইল অন্য হেকিম।
না…দুর্গের ভেতরে রাজকীয় হারেমে তার জন্য মহল তৈরি কর। সেবাদাসীদের দিকেও সব রকম খেয়াল রাখবে–জাহানারাকে সাহায্য করার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে তারা আদেশ প্রদান শেষে শাহজাহান। তাকিয়ে দেখতে পেলেন যে হাকিমের নিদের্শানুযায়ী বাকি সেবাদাসীরা এসে পানিতে ভেজা তুলার চাদর দিয়ে ঢেকে দিল জাহানারা আর অন্য দুই নারীকে। তারপর সাবধানে তুলে নিল শিবিকাতে।
ছাদের থেকে নামার সময় আস্তে আস্তে তাদের পিছু নিলেন শাহজাহান। পলকের জন্য যমুনা নদীর দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল মমতাজের অর্ধনির্মিত সমাধি। মায়ের মত আবার কন্যাকেও মৃত্যুবরণ করতে দিও না। প্রার্থনা করতে লাগলেন শাহজাহান। এর বদলে আমাকে শাস্তি দাও, আমি এরই যোগ্য।
.
১.১০
জাহানারা বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে উঠতেই কাছে ঝুঁকে এলেন শাহজাহান। খানিকটা কেঁপে উঠল চোখের পাতা। কিন্তু তারপরই আবার স্থির হয়ে চুপচাপ শুয়ে রইল অসুস্থ কক্ষের আলো-আঁধারীতে। অবস্থার যদিও তেমন অবনতি হয়নি তারপরও উদ্বিগ্ন হয়ে আছে হাকিমেরা। খুব কম সময়েই পুরোপুরি চেতনা থাকে জাহানারার আর গোলাপি বর্ণের পোড়া ক্ষতগুলো ড্রেসিংয়ের পরেও ভয়ঙ্কর লাগে দেখতে। গত দশ দিন ধরেই চলছে এরকম। যতটা পারেন কন্যার বিছানার কাছেই সময় ব্যয় করছেন শাহজাহান। দর্শনার্থীদের সামনে কেবল সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দেখা দিয়ে আসেন। মাথা নামিয়ে বসে আছেন সম্রাট। বারে বারে মাথায় ভাসছে সে রাতের স্মৃতি। অফিমের ঘোরে জাহানারাকে মমতাজ ভেবে ভুল করেছিলেন। আর নিজ কন্যার প্রতি এমন অপরাধ করতে যাচ্ছিলেন যা খোদা এবং মানুষ উভয়ের চোখেই জঘন্যতম অপরাধ। তিনি নিজেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন না, তাহলে কীভাবে আশা করেন যে জাহানারা তাঁকে ক্ষমা করবে?
