দুই ঘণ্টা পরে ঘামে সিক্ত শরীর নিয়ে উঠে বসলেন শাহজাহান। হাতের উপর মাথা রেখে অন্ধকারকে ধন্যবাদ জানালেন। এই-ই ভালো। যদিও জানালার ফাঁক গলে চুঁইয়ে পড়া ঝাপসা আলোতে বোঝা গেল যে ভোরের আর খুব বেশি দেরি নেই। নিজের আনন্দ মেটার সাথে সাথেই তাড়িয়ে দিয়েছেন কলিমাকে; কিন্তু এখনো তার সুবাদ ঘুরে বেড়াচ্ছে শয্যা মাঝে। পাশে রাখা মার্বেলের টেবিলে রুপার পাত্র থেকে পানি ঢেলে নিলেন এক কাপ, শেষ করে ফেললেন এক চুমুকে। ভয়ঙ্কর স্বপ্নটা দেখে জেগে ওঠার পর এখনো কাঁপছে শরীর। এর সাথে কলিমার কোন সম্পর্কই নেই। দেখতে পেয়েছেন যমুনার তীরে ভূতের মত উঠে গেছে। মমতাজের সমাধি, যদিও মার্বেলের বিশুদ্ধতা যথাযথ আছে। নিজের সৃষ্টির দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে প্রবেশ দ্বারে দাঁড়িয়ে, কিন্তু তখনই তীক্ষ্ণভাবে ভেঙে পড়তে লাগল সাদা গম্বুজ–ঠাণ্ডা পাথরের কোন টুকরো নয় ঠিক যেন কোন নারীর বক্ষ। মমতাজের বক্ষ। হঠাৎ করেই আতঙ্কিত চোখে দেখতে পেলেন ফিনকি দিয়ে রক্ত উজ্জ্বল লাল রক্ত ছুটতে শুরু করল গম্বুজের মাথা থেকে, ধেয়ে আসতে লাগল বেগুনি রঙের ছোট নদী…
অন্য আরেকটা দৃশ্য এসে ঢেকে ফেলল সমাধিকে সন্তান প্রসবের যন্ত্রাণাতে গুঙ্গিয়ে উঠছে মমতাজ, ভিজে গেছে রক্ত আর ঘামে, চিৎকার করছে বাচ্চাটা এসে যেন সমাপ্তি ঘটে ব্যথার…এরপর আবারো রক্ত, এবার গড়িয়ে পড়ছে জল্লাদের খড়া থেকে, মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল তাঁর সত্তাই শাহরিয়ারের কর্তিত মস্তক…দৃশ্যপট বদলে গেল আবারো; জানি স্বামী খসরুর মৃত্যুর ভার সইতে না পেরে জ্বলন্ত কয়লার দিকে এগিয়ে গেল মুখে তুলে নিতে…একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল লাল-সোনালি আভার দিকে…সাবধানে বেছে নিল ছোট একটা কয়লার টুকরা…তুলে নিল…মুখের কাছে এনে অনুভব করল এর তীব্র তাপ, এরপরই চোখ বন্ধ করে মুখ খুললো…চিৎকার করে গিলে ফেলল। এরপর জানির ঝলসানো মাংসের গন্ধ এসে লাগল নাকে, কাঁপতে কাঁপতে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন হতভম্ব শাহজাহান।
বড় বেশি মৃত্যু আর ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে গেছে তার পরিবারে। মোগলরা কী করেছে যে এরকমটা হল? আল্লাহতায়ালা মোগলদের অসীম ক্ষমতা আর সমৃদ্ধির বর প্রদান করলেও এতটুকু শান্তিতে থাকার ফুরসত দেননি, যা কিনা একেবারে তুচ্ছ একটি পরিবারেরও অধিকার আছে পাবার। তার নামের অর্থ পৃথিবীর শাসক, অথচ এই অন্ধকারে বসে মনে হল তাঁকে নিয়ে উপহাস করছে শব্দ দুটো।
*
আরেকটু আরাম পাবার জন্য নিজের জায়গা বদল করলেন শাহজাহান। গোধূলি বেলাতে হারেমে ফিরে গেছে মোটা কালো চুল আর অদ্ভুত হলুদ চোখের অধিকারিনী তুর্কি বেশ্যা। তাঁর শরীর নিংড়ে নিয়েছে এ রমণী অথচ মন তবুও অশান্ত। বহু রাত ধরেই ঘুমাতে পারছেন না তিনি। উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেলেন নিচু টেবিলের তালা লাগান ড্রয়ারের দিকে, চাবি ঘুরিয়ে বের করে আনলেন ছোট্ট মদের বোতল, এর ভেতরে ফেলে দিলেন ছোট্ট এক চিমটি অফিম। জানেন যে এই জিনিস দিয়ে মেহরুন্নিসা শেষ করে দিয়েছে তাঁর পিতাকে কিন্তু তাকে ন্দ্রিা যেতেই হবে। একটু পরেই চলে গেলেন সুবাস মাখা সুখের কোলে। তিনি এবং মমতাজ পাশপাশি শুয়ে আছেন আগ্রাতে তাদের প্রথম প্রাসাদের বাগানে জেসমিন ছাওয়া কুঞ্জবনে। হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলেন মমতাজের গাল, তাকিয়ে দেখলেন হাসলেন মমতাজ, আস্তে করে এগিয়ে এলো তার দিকে। আস্তে আস্তে তার চোলির পান্না বোতাম খুলতে শুরু করলেন শাহজাহান, আঁটোসাঁটো পোশাকের নিচে ভেলভেটের মত নরম বক্ষ।
দয়া করে জেগে উঠুন…সন্ধ্যা খাবারের জন্য কাপড় পাতা হয়েছে আর আমরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছি…ভুলে গেছেন?
একটা গলার স্বর কোন এক নারীর কণ্ঠ–ভেসে এলো শাহজাহানের বিবশ চেতনাতে। চোখ খুলে চেষ্টা করলেন মনোসংযোগ করতে, কিন্তু তার ডিভানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গোলাপি পোশাকের দেহটা ঝাপসা হল শুধু। এমনকি কাছে এগিয়ে এসে তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেও আলাদা করে চিনতে পারলেন না, মনে হল যেন কালো চুলের আড়ালে ঢেকে আছে অর্ধেক। দ্বিধাগ্রস্তভাবে আস্তে আস্তে উঠে বসলেন। মমতাজ? যদি মমতাজ তাঁর পাশেই শুয়ে থাকে তাহলে এমন হবে কীভাবে? কিন্তু দেহটা তাঁর আরো কাছে ঝুঁকে আসতেই কমলার মিষ্টি সুবাস পেলেন মমতাজের প্রিয় সুগন্ধিগুলোর একটি যা সে ব্যবহার করত। তার মানে মমতাজই। হাত বাড়িয়ে কোমল স্তনে রুক্ষ হাত রাখলেন শাহজাহান।
থামেন। কী করছেন?…অনুগ্রহ করে এমন করবেন না…
নারীদেহ ধাক্কা দেয়ার চেষ্টা করতেই আরো জোরে চেপে ধরলেন সম্রাট, ডান হাতেও কাজে লাগিয়ে উরুসন্ধিতে যেতে চাইলেন। নরম কাপড় ভেদ করে দৃঢ় মাংসপেশীর উষ্ণতা আর আবেদন টের পেলেন তার বিপরীত…মমতাজ কখনো তাঁকে কোন কিছুতে বাঁধা দেয়নি। এটা শুধুমাত্র তাকে প্ররোচিত করা জন্য একটা খেলা…
যুদ্ধরত নারীদেহের গলায় হাত পেঁচিয়ে শাহজাহান চেষ্টা করলো তাকে শুইয়ে দিতে, শরীরী গন্ধে নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন। তুমি জানো। তুমি আমার কাছে কতটা… ফিসফিস করে জানালেন, নারীদেহে আবদ্ধ হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে স্পষ্ট। মমতাজ সব সময় সাড়া দিয়েছে তার ডাকে। একেবারে প্রথম রাত থেকেই মমতাজ জানতো যে কীভাবে আনন্দ দিতে হয় ও গ্রহণ করতে হয় আর তাদের মাঝে সবসময় তাই ছিল। কিন্তু আরেকটু কাছে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ করে গড়ান দিয়ে ডিভান থেকে ছিটকে গেল নারী, মুখের উপর লুটিয়ে পড়ল কেশরাজি।
