নীরবে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইল দুই ভাই-বোন। জাহানারা বলে উঠল, আমি কাউকে একথা বলিনি। কিন্তু বোরহানপুরে, আম্মাজান যখন ব্যথায় শুয়ে আব্বাজানের আসার অপেক্ষা করছেন, তখন আমাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছে যেন তাঁর মৃত্যু হলে আমি যেন আব্বাজানের উপর নজর রাখি আর কোন অনর্থ থেকে দূরে রাখি। আমি নিশ্চিত না যে কী বুঝিয়েছেন বা আমি কী করব। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে আম্মাজান আব্বাজানের চরিত্র ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে মায়ের পরামর্শ আর সহায়তা বিশেষ করে মানুষের প্রকৃতির প্রতি অন্তদৃষ্টি ছাড়া আব্বাজান সমস্ত শক্তি সাহস, ক্ষমতা আর সম্পদ সত্ত্বেও দিকভ্রষ্ট হয়ে যাবেন–নোঙ্গর ছেড়ে ভেসে যাবে তরী। আমাদেরকে তাকে রক্ষা করতে হবে আর পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে হবে দারা..তার নিজের জন্য আর সাম্রাজ্যের জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে।
*
আগ্রা দুর্গের প্রধান আঙিনায় গাছের সাথে ঝুলছে হাজার হাজার জ্বলন্ত রঙিন লণ্ঠন। একেবারে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মেরুন ভেলভেটের বিশাল তাঁবু। সপ্তাহখানেক পরিশ্রম করে শ্রমিকেরা এটি নির্মাণ করেছে আঠারো দিনব্যাপী নওরজ উৎসবের জন্য–আকবর প্রবর্তিত নতুন বছর উদ্যাপন উৎসব। ভেতরে সবটুকু ভূমি ঢেকে দেয়া হয়েছে মোটা নরম সিল্কের কার্পেট আর সোনা, মুক্তা ও দামি পাথরের তৈরি অ্যামব্রয়ডারী করা ব্রোকেডের পর্দা দিয়ে। উৎসব শুরু হবার পর থেকে প্রতি রাত্রে শাহজাহান তাঁবুতে দরবার বসিয়ে অভিজাতদের কাছ থেকে উপঢৌকন আর শুভেচ্ছা গ্রহণ করেন অথবা তাদের ঝিকমিকে প্যাভিলিয়নে ঘুরে বেড়ান। আজ সন্ধ্যাটা অবশ্য একটু ভিন্ন হবে। আজ রাতে রাজকীয় মীনা বাজার বসবে। অভিজাতদের স্ত্রী ও কন্যরা চমৎকার সিল্ক আর ক্ষুদ্র অলঙ্কারের পসরা সাজিয়ে নিজেরাই ব্যবসায়ী বনে যায়। খুব কমই হয় এরকম যখন দরবারের নারীরা সিল্কের পর্দা ফেলে বাইরে আসে আর পুরুষেরা সরাসরি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তাদের সৌন্দর্যমাখা মুখের দিকে।
এরকমই এক উষ্ণ রাতে রাজকীয় মীনা বাজারে মমতাজকে প্রথম দেখেছিলেন শাহজাহান..রাজকীয় তাবুর সোনালি সামিয়ানার নিচে দাঁড়িয়ে অনুতপ্ত হয়ে ভাবলেন কেন রোশনারকে আবারো মীনা বাজার করার অনুমতি দিয়েছেন। মেয়েটা তর্ক করছিল যে রাজগৃহস্থালীর নারীদের জন্য এটাই বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মীনা বাজার অম্ন মধুর নানা স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়েছে যা ভুলে গেলেই ভালো হত… কীভাবে নিজের দোকানের পেছনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিল চৌদ্দ বছর বয়সী মমতাজ, চুলে জ্বলজ্বল করছিল মুক্তা আর হীরা… চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল মিষ্টি ডোনমিনের সুবাস…ছোট একটা ফুলদানির জন্য তাঁর হাতে শাহজাহান তুলে দিয়েছিলেন উজ্জ্বল সোনার মোহর।
কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে হবে তাঁকে। সম্রাটের পরিদর্শনের মাধ্যমেই শুরু হবে মীনা বাজারের আনুষ্ঠানিক সূচনা। উঠে বসলেন অপেক্ষারত সুসজ্জিত পালকিতে। আটজন পেশীবহুল তাতার হারেমের নারী পরিচারকের কাঁধে চেপে বাতাসে ভেসে উঠলেন সম্রাট। আগে আগে চলল খাজাসারা, পাহারা দেয়ার জন্য পাশেপাশে থাকল মসৃণ চেহারা খোঁজারা; শাহজাহান শুরু করলেন মীনা বাজার পরিভ্রমণ। পারস্যবাসী দাদীর কাছ থেকে শেখা গোলাপের মুখরোচক ব্যঞ্জন বানিয়েছে জাহানারা। এর সুগন্ধের সাথে সাথে সম্রাট চোখে দেখলেন রাজবাজীর বয়স্ক পরিচারকদের তৈরি চিনি আর মাখনের মিষ্টি।
আঙিনার অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ অংশে পৌঁছলেন শাহজাহান। এখানকার দোকানগুলোতে পসরা সাজিয়েছে সভাসদ আর কর্মকর্তাদের পত্নী আর কন্যরা। প্রশংসাসূচক বাক্য আর দর কষাকষির ভান করতে করতে এগোবার সময় সম্রাটের মনোযোগ চলে গেল পণ্যের দিকে নয়, নারীদের দিকে। কয়েকজনকে চিনতে পারলেন কিন্তু বাকিদেরকে কখনো দেখেননি, যেমন বেগুনি সিল্কের রোব পরিহিত লম্বা এক নারী, বেণী করা চুলে গেঁথে রেখেছে গাঁদা ফুল। একজন রমণীর তুলনায় কাঁধ দুটো চওড়া হলেও কোমর বেশ সরু। কালো চোখ জোড়া সাহসের সাথে তাকিয়ে রইল সম্রাটের দিকে। দোকানের মালিক হিসেবে অন্য নারীদের চেয়ে তার পসরার দিকেই মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইলেন শাহজাহানের।
কে এই নারী? খাজাসারার কাছে জানতে চাইলেন সম্রাট।
কলিমা বেগম। লাহোরে আপনার শাসনকর্তার স্ত্রী। আপনি দাক্ষিণাত্যে থাকাকালীন দুজনে বিবাহ হয় কিন্তু স্ত্রী হিসেবে তেমন প্রিয় নয়। পাঁচ বছর আগে বিয়ে করা স্ত্রীকে নিজের সাথে লাহোরে নিয়ে গেছে লাহোরের শাসনকর্তা কলিমাকে রেখে গেছে। আপনি কি তার দোকান ঘুরে দেখতে চান জাহাপনা?
না, কিন্তু আজ রাতে তাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দেবে।
সে একজন বিবাহিত নারী, জাহাপনা…
এটা তোমার দেখার বিষয় নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজে আগ্রহী, আমার আদেশ মতই কাজ করবে।
এক বা দুই ঘণ্টা পরে নিজেকেই শুধোলেন শাহজাহান যে তিনি কেন করলেন এমনটা। গত বিশ বছরে যে হারেমের দিকে তিনি আগ্রহ দেখাননি সেখান থেকে কাউকে পাঠানোর জন্য খাজাসারাকে আদেশ দেয়া এক কথা আর তাঁর কোন এক প্রাদেশিক শাসনকর্তার স্ত্রীকে ডেকে পাঠানো তো পুরো ভিন্ন কথা। কি হয়েছে তাঁর নিজের দুঃখ ভোলার জন্য এমন কাজ এতটাই অর্থহীন যেমন রাস্তার কোন এক কুকুরীর উপর চড়াও হয় কুকুর?… না….খাজাসারাকে জানাতে হবে যে তিনি মত বদলেছেন।
