কিন্তু তাদেরও তৈরি থাকার কথা যদি হঠাৎ যুদ্ধ শুরু হয় সে কারণে। আমরা কি তাদের অঞ্চলে পরিদর্শক পাঠাচ্ছি যেন তারা সঠিক সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন রাখছে কিনা বা কর সংগ্রহ করছে কিনা তা তদারক করে আসতে?
হ্যাঁ। কিন্তু জমিদারেরা নিশ্চয়ই ঘুষ দিচ্ছে তাদেরকে। আমি আসলান বেগকে বলেছিলাম যেন আজমীর পরিদর্শনের রেকর্ডগুলে পরীক্ষা করে দেখা হয়। এতে বের হয়ে এসেছে যে মাত্র তিন মাস আগে মোগল রাজকর্মকর্তারা সেখান থেকে ঘুরে এলেও কোন ভুলের কথা লিখেনি।
এদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া উচিত যেন উদাহরণ হিসেবে কাজে দেয় আর আজমীরের শাসনকর্তাকেও শাস্তি দিতে হবে। অন্তত তার অনুমতিতেই এরকম দুর্নীতি হতে পারছে। আর সবচেয়ে খারাপ দিক সে নিজেও এতে জড়িত ছিল। আব্বাজান কিছু না করলেও আমি এ ব্যাপারটা নিজে দেখব। যেমনটা তুমি বলেছ একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যেন কেউ এটা ভাবার সাহস না পায় যে সম্রাটের মনোযোগ অন্য কোথায় অথবা তাঁর শাসন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে। নতুবা অর্ডার রাজার মত বিদ্রোহের কবলে পড়ব আমরা …শাহ সুজা আর আওরঙ্গজেব কী বলে এসব কিছুর ব্যাপারে?
আমি জানি না। আমি তাদের কাছেও চিঠি লিখেছি। কিন্তু আওরঙ্গজেব তো বেশ ব্যস্ত। গত কয়েক বছর ধরে তো সে আগ্রাতেই নেই। অর্ডা বিদ্রোহ দমনের জন্য তার অভিযান বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে আর বেশি সময়ও লাগছে যা আব্বাজান বা অন্য কেউই ধারণা করতে পারেনি। এখন দাক্ষিণাত্যে তার বিজয় সত্ত্বেও পুরো অঞ্চল এখনো এতটা বিশৃঙ্খল হয়ে আছে যে, স্থানীয় সমস্যা নিয়ে ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। এদিকে আবার সীমান্তবর্তী সমস্যাও আছে। শাহ সুজা পুরোদমে বাংলা সামলাচ্ছে। গঙ্গা ব-দ্বীপে আরকানীজরা আমাদের বণিকদের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।
অমি শুনেছি আব্বাজান নাকি শাহ সুজাকে ওড়িশার শাসনকর্তার দায়িত্ব ও প্রদান করেছেন?
হ্যাঁ। শাহ সুজা চেয়েছে আর আব্বাজানও একমত হয়েছেন, আমি কিছুই জানতে পারিনি। আমি এর বিরুদ্ধেই পরামর্শ দিতাম। যদিও সে এ ধরনের নিয়োগের শক্তি আর মর্যাদা বেশ উপভোগ করছে; কিন্তু আমার মনে হয় এতটা দায়িত্বপূর্ণ আর পরিশ্রমের কাজ সামলানোর ক্ষমতা নেই শাহ সুজার অথবা হতে পারে যে আমিই তাকে ভুল ভেবেছি।
দারার হাত ধরে হাসল জাহানারা। আমি খুশি হয়েছি যে তুমি আগ্রাতে ফিরে এসেছ। আমি তোমার অভাব অনুভব করছিলাম। খুব কম লোকই আছে এখানে যাদের সাথে আমি এই কথাগুলো বলতে পারি…কখনো কখনো সাত্তি আল-নিসা আর রোশনারা কিন্তু আমি বাড়িয়ে বলছি না পিতার সাথে আমার মত এত সময় কাটায় না। এখন তো সে বেশ খুশি কেননা রাজকীয় মীনা বাজার পুনরায় চালু করতে চেয়েছে রোশনারা আর আব্বাজানও একমত হয়েছে। কিন্তু অনেক হয়েছে। এখন তোমার কথা শুনতে চাই। সুরাটে ভ্রমণ সফল হয়েছে?
হ্যাঁ, নিকোলাস ব্যালান্টাইনকে সাথে নেবার তোমার পরিকল্পনাও ভালো ছিল। একজন দোভাষী হিসেবে খুব কাজে লেগেছে আর আলোচনাকে ভালোভাবে পরিচালনা করতেও আমাকে সাহায্য করেছে। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজি হয়েছে আমাদের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা রক্ষার্থে আর আরব সাগর হয়ে মক্কা পর্যন্ত আমাদের তীর্থযাত্রীদের জাহাজগুলোর জন্য তাদের জাহাজ সরবরাহ করতে। মোগলদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন সৈন্য নেই, কিন্তু ইংরেজদের মত সমুদ্রে কীভাবে লড়তে হয় আমরা জানি না। আমাদের হয়ে জলদস্যুদের মোকাবেলা করবে তারা।
সুরাট বণিকেরা নিশ্চয়ই বেশ সম্মানিত বোধ করেছে যে একজন মোগল শাহজাদা ব্যক্তিগতভাবে গিয়েছে আলোচনার জন্য।
মুচকি হাসল দারা। আমার মনে হয় বিস্মিতও হয়েছে। আমি বেশ শক্তিশালী একটা প্রদর্শনী করেছি–স্বর্ণ দিয়ে সাজানো একশ হাতি আর সবুজ পাগড়ি আর টিউনিক পরিহিত হাজার অশ্বারোহী, এই বিদেশীদেরকে মুগ্ধ করা সহজ–এত প্রাচুর্য দেখে হাঁটু পর্যন্ত ঝুলে পড়েছে চোয়াল।
ফলাফলে আব্বাজানও সন্তুষ্ট হবেন। আমাদের জাহাজে জলদস্যুদের আক্রমণে রেগে গিয়েছিলেন… থেমে গেল জাহানারা। কিন্তু আরো কিছু ব্যাপার আছে যা তোমার জানা উচিত… প্রায় প্রতিরাতেই হারেমে খবর পাঠান রমণীর জন্য। কখনো দুজন এমনকি তিনজনও। এমনকি সোনা আর মুক্তা খোদাই করে একটা আয়নাঘরও নির্মাণ করছেন যেন ভালোবাসাবাসির দৃশ্য চাক্ষুস করতে পারেন।
হাঁ করে তাকিয়ে রইল দারা। তুমি কীভাবে এসব জানো?
খানিকটা দুঃখের সাথে হাসল জাহানারা। হারেমে এটা বেশ পরিচিত মুখরোচক গল্প। আমি সাত্তি আল-নিসাকে বলেছিলাম খাজাসারাকে জিজ্ঞেস করতে, সেও নিশ্চিত করেছে এর সত্যতা। একই নারীর জন্য দুবার খবর পাঠান না তিনি আর যতক্ষণ একসাথে থাকেন তেমন একটা কথাও বলেন না। আরো বলেছে যে আব্বাজান নাকি বিপজ্জনকভাবে নিচ্ছে– বিশেষভাবে পছন্দ করেন ঘোড়া বানানো… প্রথমে শুনে তো আমি থ হয়ে গেছি। মাথাতেই আসেনি যে আমাদের আম্মাজানকে এতটা ভালোবাসার পরেও কীভাবে এমন করছেন…কিন্তু তারপরই খারাপও লেগেছে। মায়ের মৃত্যুর শোেক কখনোই কাটিয়ে উঠতে পারেন নি আব্বাজান আর এখন তাই যা পারেন করছে। মনে হচ্ছে যেন পুরুষ হিসেবে নিজের সক্ষমতার পরীক্ষা নিতে শুরু করেছেন যখন কিনা একজন সম্রাট হিসেবেই মনোযোগী হবার কথা।
