জাহাপনা, আপনি পুরুষদের মাঝে তেজী ঘোড়া। বলে উঠল বালুচি রমণী। আমন্ত্রণের ভঙ্গিতে আড়মোড়া ভেঙে বলল, আমি এতটা শক্তির কথা কখনো জানতাম না…
গড়িয়ে উঠে গেলেন শাহজাহান। তাকিয়ে রইলেন বিতৃষ্ণা নিয়ে রমনীর উপর নয় নিজের উপর।
কী হয়েছে? আপনাকে অসন্তুষ্ট মনে হচ্ছে, জাহাপনা? বিছানা থেকে উঠে গিয়ে সম্রাটের শরীরের সাথে চেপে ধরল নিজের নিরাভরণ দেহ। যেন হেনা রঞ্জিত বক্ষ অনুভব করেন তিনি। আমি কি আপনাকে সুখী করতে পারিনি?
নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও পুনরায় জেগে উঠলেন শাহজাহান আর রমণীর মোলায়েম হাসি জানিয়ে দিল যে সেও বুঝতে পেরেছে। সম্ভবত আপনাকে একেবারে অসন্তুষ্ট করিনি। হাত ঘুরে বেড়াতে লাগল সম্রাটের শরীরে। হঠাৎ করেই ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে রমণীর সুগন্ধি মাখা কেশগুচ্ছে মুখ ডুবিয়ে আবারও তার দেহে প্রবেশ করেন সম্রাট। খানিকটা বেশি সময় লাগল এবার, হাতের মাঝে মাথা রেখে উপুড় হয়ে শুয়ে রইলেন শাহজাহান। কাঁপছে এখনো শরীর কিন্তু শরীরের উদ্দীপনা মরে যেতেই অশ্রু গড়াতে লাগল চোখ বেয়ে। কী করেছেন তিনি? মমতাজের প্রতি পবিত্র ভালোবাসার সাথে কীভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন তিনি?
চলে যাও। মাথা না তুলেই বলে উঠলেন। অনুশোচনায় ডুবে গেলেন আবারো।
জাহাপনা?
আমি বলেছি যাও। তোমাকে আর কোন দরকার নেই।
*
খাওয়া-দাওয়া প্রায় নেইই আর তাঁর কর্চি জানিয়েছে যে মদ বর্জনের আইন সত্ত্বেও প্রায়ই মদের জন্য তলব করেন আর নির্দেশ দিয়েছেন যেন গজনী থেকে তাজা এনে দেয়া হয়। মাঝে মাঝে এর মাঝে আফিমও মিশিয়ে নেন… চারদিন আগে পরিচারকেরা এমন অবস্থায় পায় যে জনগণের সামনে প্রাত্যহিক ঝরকা বারান্দায় আসার মত অবস্থাও ছিল না। প্রায় টেনে আনতে হয় বারান্দায় আর দুই পাশে দুইজন কর্চি সাহায্য করে যেন তিনি আশীর্বাদ দিতে পারেন। মাঝে মাঝে সপ্তাহ খানেক ধরে মদ বা আফিম কিছুই স্পর্শ করেন না, কিন্তু তখনো এমনকি আসলান বেগও পারে না তাকে দিয়ে দরবারের কাজ করাতে। তার বদলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে তাকিয়ে থাকে দূরের কিছু একটার দিকে আর কেউ আসতে চাইলেন ভর্ৎসনা করে। আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমি যা পেরেছি করেছি। কথা বলেছি কিন্তু যেহেতু আমার সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করেননি তাই তেমন নজরও দেননি।
মাথা নাড়লো জাহানারা।
তোমার চিঠি পড়ে আমি বুঝতে পেরেছি যে তুমি কতটা উদ্বিগ্ন, তবে অবস্থা এতটা খারাপ হবে ভাবিনি।
কিছু সময়ের জন্য বাইরে ছিলে তুমি। আমি প্রায় প্রতিদিনই দেখতে গেছি আব্বাজানকে। আশা করেছিলাম যে অবশেষে নিশ্চয়ই নিজের শোক কাটিয়ে উঠতে পেরেছে–অন্তত পাঁচ বছর তো হয়ে গেছে যে আমাদের আম্মাজান মারা গেছেন–কিছু সময়ের জন্য এমনটাই মনে হয়েছিল। কিন্তু হয়ত আমি ভুল করেছি, তাই দেখেছি যা দেখতে চেয়েছি। অথবা সে ভেঙে পড়েছে…দিনে দিনে আরো বেশি বিমর্ষ হয়ে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে নিজেকে।
অন্তত আমাদের মায়ের সমাধি নির্মাণের প্রতিও কি কোন আগ্রহ নেই?
হ্যাঁ, বেশির ভাগ দিনেই যান কাজের অগ্রগতি দেখতে, বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়ে আসেন বিশেষ করে মার্বেলের মাঝে রত্ন খোদাইয়ের সম্পর্কে। কিন্তু বেশিক্ষণ থাকেন না আর ফিরে আসার সাথে সাথেই আবারও একাকিত্বে ডুবে যান। যদি এখনই সাবধান না হন তাহলে নিজের শারীরিক বা মানসিক সুস্থতা খুইয়ে বসবেন নতুবা অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দেখা দেবে; কিন্তু নিজের বা সাম্রাজ্যের প্রতি যে বিপদ ঘনিয়ে আসছে যে সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই তার…
বিপদ? তোমার সত্যিই ধারণা যে অবস্থা আবারো এতটা খারাপ হয়েছে?
আমি নিশ্চিত নই, কিন্তু সম্ভবত তাই…আমি শুধু তোমাকে বলতে পারি যা দেখেছি এই কয়েকদিনের মাঝে। আবারো কাজে মনোসংযোগ করতে কষ্ট হচ্ছে আব্বাজানের। কামরান ইকবাল আর আমাদের নানাজী আসফ খানের পরপর মৃত্যুর ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে তাঁকে। অতীতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। এর চেয়েও বড় কথা, তারা দুজনেই খোলামেলাভাবে আব্বাজানের সাথে কথা বলতে পারতেন যখনই তারা দেখতেন যে কোন সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে–আর কীভাবে এই সমস্যার মোকাবেলা করা যায় দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই তাও বলতে পারতেন। তাদের তৎপরতা না থাকায় দাপ্তরিক নিয়োেগ আর কর সম্পর্কিত বিষয়ে মনোযোগ না দেয়ার জেদ করেছেন পিতা।
কিন্তু এগুলো কি দরকারী?
হ্যাঁ, এগুলোই একত্রে বেঁধে রেখেছে আমাদের সাম্রাজ্যকে। সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধির জন্য এগুলো জরুরি যে শুধুমাত্র সেনাপতি আর কর্মীদের বাহ্যিক বিশ্বস্ততা নয়–বরঞ্চ তাদের সত্যিকারের সমর্থন আর গভীর আগ্রহ। কিন্তু তাদের অভিযোগ আর আর্তি শোনার সময় নেই আব্বাজানের আর না তিনি প্রদেশগুলো থেকে পাঠানো প্রতিবেদন পড়ে দেখেন। যাই হোক, আমি পড়েছি আর দেখেছি যা ঘটতে যাচ্ছে…
কী বলতে চাও?
আমরা নীতিহীন শিথিল হয়ে যাচ্ছি। অভিজাতদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি তাদের উচ্চাকায় আমল না দিয়ে; একই সাথে তাদের কাজকর্মের উপর মনোযোগ না দিয়ে। যদিও তারা এখনো বাহ্যিকভাবে বিশ্বস্ত আছে আর এই পার্থক্যটুকু তেমন চোখেও পড়ছে না–আমরা যে স্বর্ণ দেই তার বিনিময়ে রাজকীয় কাজের জন্য সৈন্য বাহিনী টিকিয়ে রাখার মত আইন অবজ্ঞা করতেও দ্বিধা করছে না। যখন তুমি বাইরে ছিলে তখন আগ্রা দুর্গের সেনাপ্রধান আজমীরের প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে চিঠি লিখে জানিয়েছিল যেন তিন মাসের জন্য আমাদের লাহোর ভ্রমণের সময় রাজকীয় দরবারকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঁচ হাজার সৈন্য প্রেরণ করে। কিন্তু সেখানকার শাসনকর্তা প্রতি উত্তরে জানিয়েছে যে স্থানীয় জমিদারেরা এত দ্রুত এত পুরুষ জোগাড় করতে পারবে না।
