আওরঙ্গজেব ফিরে এসো। পুত্রের দিকে এগোতে থাকা দামোদারকে দেখে চিৎকার করে উঠলেন শাহজাহান। নিশ্চিতভাবে এখনি ঘোড়ার উপর থেকে ছুঁড়ে ফেলা হবে ছেলেটাকে।
দূর থেকে ভীত চোখে তাকিয়ে আছে পনেরো বছর বয়সী আওরঙ্গজেব। এক হাতে চেষ্টা করছে ঘোড়া নিয়ন্ত্রণ করতে, অন্য হাতে চেষ্টা করছে নিজের বর্শা টেনে নিতে। কিন্তু তার আগেই পৌঁছে গেল দামোদার। কাঁধের কাছে আঘাত করল ঘোড়াকে ডান দাঁতের মাথা দিয়ে, ডাক ছেড়ে আওরঙ্গজেবকে ফেলে দিল ঘোড়া। কোনভাবে নিজের ভারসাম্য বজায় রেখে পায়ের উপর দাঁড়াল আওরঙ্গজেব, হাতে টেনে নিল তলোয়ার। এই ফাঁকে পরিচারকেরা এসে আতশবাজি ফুটাতে লাগল দামোদারের সামনে যেন দিকভ্রষ্ট হয় প্রাণীটার মনোযোগ। বিস্বাদ ধোঁয়ায় ছেয়ে গেল বাতাস, বিস্ফোরণের ফলে খানিকটা দ্বিধায় পড়ে গেল দামোদার।
শাহ সুজা না! চিৎকার করে উঠলেন শাহজাহান। এখনো নিজের ঘোড়াকে সামলানোর চেষ্টা করতে করতে দেখতে পেলেন যে নিজের বর্শা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ধোয়ার দিকে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র। সাথে সাথে পিছু নিল অশোক সিং। শাহ সুজা ছুঁড়ে মারলো নিজের অস্ত্র কিন্তু দামোদারের মোটা চামড়ায় কোন আঘাতই করতে পারলো না বর্শা–ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারপাশে মাটিতে পড়ে থাকা কিছুর সাথে হোঁচট খেয়ে টালমাটাল হয়ে ঘোড়া পিঠ থেকে ফেলে দিল আরোহীকে। ফলে মাটিতে পড়ে গেল শাহ সুজা, ও নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে অশোক সিং পৌঁছে গেল ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়া দুই শাহজাদা আর উন্মাদ হাতির মাঝখানে। কিন্তু তারপরই এত জোরে গর্জন হল যে কেঁপে উঠল পুরো ধরিত্রী। নিজের মাহুতকে ফেলে দিল জলপা। বেচারা এতক্ষণ ধরে চেষ্টা করছিল জলপাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। দামোদারের তৈরি করা দেয়ালের ফোঁকর গলে এগিয়ে এলো প্রতিপক্ষের দিকে। ফিরে তাকিয়ে এ অবস্থা থেকে মুহূর্তখানেকের জন্য মাটিতে যেন জমে গেল দামোদার, মাথা নিচু, তারপর আবারো কী হল সাহস হারিয়ে মরিয়া হয়ে চিৎকার করেই নেমে গেল নদীতীরে যমুনার কাছে। পিছু নিল জলপা। সামনে থেকে সরে গেল দর্শকেরা।
ঘোড়া থেকে নেমে ছেলেদের কাছে দৌড়ে গেলেন শাহজাহান। দুজনেরই ধুলায় মাখামাখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে; জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিলেও দেখে বোঝা গেল আঘাত লাগে নি কারোরই। নিরবে চোখের পাতা বন্ধ করে মুহূর্তখানেক কৃতজ্ঞতা জানালেন শাহজাহান। এরপরই বুকে টেনে নিলেন দুই পুত্রকে।
তোমরা দুজনেই বেশ সাহস দেখিয়েছ। তোমরা সত্যিই বাহাদুর। তুমিও অশোক সিং।
এটা আমার দায়িত্ব ছিল এগিয়ে আসাটা, জাহাপনা। দামোদারকে আমার পিতা দিয়েছেন উপহার হিসেবে।
আবারো পুত্রদের দিকে চাইলেন সম্রাট, আওরঙ্গজেব–তুমি একটু বেশিই হঠকারী। একটা হাতির সাথে যুদ্ধ করতে এগিয়ে আসা উচিত হয়নি। অপেক্ষা করা উচিত ছিল দেহরক্ষীদের জন্য।
কাঁধ ঝাঁকালো আওরঙ্গজেব। সময় ছিল না ততটা আর আমি জানি আমি হঠকারী নই। হ্যাঁ, জানতাম যে ঝুঁকি আছে; কিন্তু চেষ্টা করেছি দর্শকদের নিরাপদ রাখতে। যদি আমি মারা যেতাম কোন অসম্মান হত না। আমরা সকলেই একদিন মৃত্যুবরণ করব। দেখার বিষয় হল কেমন করে এর মুখোমুখি হই আমরা। কিছু না করাতেই বরঞ্চ লজ্জা বেশি।
কথা বলতে বলতে দারার দিকে তাকাল। বেড়ার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে দারা। কী বোঝাতে চাইলো আওরঙ্গজেব? এটাই কি যে তার বড় ভাই এগিয়ে আসার চেষ্টা না করায় একজন কাপুরুষ? যদি তাই হয় তাহলে এটা সঠিক হল না। দারা অনেক দূরে ছিল। কিন্তু নিশ্চয় এটা এরকম কিছু নয়–মুহূর্তটুকুর বাহাবা নেবার আশায় উদগ্রীব এক কিশোর ছেলের ভাবনা আর বড় ভাইয়ের দিকে কথার তীর ছোঁড়া থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম হয়েছে। শাহজাহানের তাই উচিত হবে না পারিবারিক পূর্ব বিদ্বেষের স্মৃতি স্মরণ করে এ ঘটনার মাঝে কোন অন্য উদ্দেশ্যে খোঁজা।
.
১.৯
চোখ বন্ধ করে একের পর এক ধাক্কা দিয়ে মাথা পেছনে হেলিয়ে প্রচণ্ড দেহসুখ অনুভব করলেন শাহজাহান। এরপর হাঁপাতে হাঁপাতে পড়ে গেলেন তার মতই ঘামে ভিজে থাকা বালুচি রমণীর নরম মাংসল শরীরের উপর। উন্নত বক্ষ আর গোলাকার অধর সহ অসম্ভব সুন্দরী এই নারী, ভাবলেন তিনি। ব্রাকেড কুশনের উপর ছড়িয়ে আছে হেনা লাগান উজ্জ্বল চুল। আর কাজলে রাঙানো চোখ জোড়া আত্মবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। রমণী বুঝতে পারলো যে সন্তুষ্ট হয়েছেন সম্রাট।
খাজাসারা, রাজকীয় হারেমের তত্ত্বাবধায়ক ভালোই পছন্দ করেছে। আপনার পছন্দ কী, জাহাপনা? তাকে জিজ্ঞেস করেছিল খাজাসারা। কৃশকায় নাকি মাংস? লম্বা বা বেঁটে? কালো নাকি ফর্সা? তাকিয়ে ছিল শাহজাহান। মমতাজের সাথে বিবাহের পর এত বছরে হারেম থেকে কোন নারীকে কখনো ডাকেনি শাহজাহান। অন্যান্য শাসকেরা মোগল সম্রাটের সন্তুষ্টি লাভের আশায় বিভিন্ন নারী পাঠিয়েছে তার কাছে কিন্তু এই কিছুদিন আগে ছাড়া এ সম্পর্কে ভাবেন নাই তিনি।
তুমি পছন্দ করে দাও। উত্তর দিয়েছিলেন শাহজাহান। আমার কিছু যায় আসে না।
মমতাজের মৃত্যুর পর বেশ কিছু সময় পার হয়ে গেলেও অন্য কোন নারীর প্রয়োজন বোধ করেননি তিনি। কিন্তু কয়েকদিন যাবৎ শারীরিক আকাক্ষা যেন সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছিল।
