দারা এ সমস্ত বদ অভ্যাস থেকে মুক্ত। যদি এভাবেই নিজেকে প্রমাণ করতে থাকে তাহলে শীঘিই হয়ত তাকে নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করবেন শাহজাহান। মমতাজ থাকলেও এটাই চাইতেন। আর দারার কনিষ্ঠ ভাইরাও এটাই আশা করে। ফলে স্থিতাবস্থা আর নিশ্চয়তা ফিরে আসবে, পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলোতে যেটির অভাবে ভীষণ রক্তপাতে বিশৃঙ্খল হয়ে গিয়েছিল সাম্রাজ্য। যদি তিনি এটা অর্জন করতে পারেন তাহলে নিজেকে নিয়ে গর্বিত বোধ করারও কারণ খুঁজে পাবেন। ভবিষ্যত প্রজন্মও তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। তার পরেও সম্রাট ভেবে দেখলেন যে তাঁর পরিবার পূর্বপুরুষ থেকে পৃথক তাঁর পুত্রেরা সকলেই আপন ভাই, সৎ ভাই নয়। আর তাই তাদের মাঝে বন্ধনও অনেক গভীর আর শক্তিশালী। দারার বয়স মাত্র উনিশ আর তিনি নিজেও একজন শাসক হিসেবে তরুণ। তাই সম্ভবত উত্তরাধিকারী নিয়ে এখনই এত তাড়াহুড়া না করলেও চলবে।
*
জাহাপনা, হাতির দল তাদের যুদ্ধ শুরু করার জন্য প্রস্তুত।
ঘোড়ার উপর বসে কপাল থেকে ঘাম মুছলেন শাহজাহান। এই ভেবে খুশি লাগছে যে ঘোড়ার পিঠে বসে এখনো ছেলেদের সাথে খেলতে পারেন তিনি। এই প্রতিযোগিতার নিয়ম হচ্ছে তিনশ গজ দূরে যমুনার তীরে রাখা তরমুজের মাঝে কে সবার আগে বর্শা নিক্ষেপ করতে পারবে।
আগ্রা দুর্গের চারপাশে জড়ো হওয়া ভিড়ের জনতার উন্মত্ত চিৎকারের মাঝে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দারা শুকোহ্র বিবাহের চতুর্থ দিনের আনন্দায়োজনে। শাহ সুজা আর আওরঙ্গজেব দুজনকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হারিয়েছেন সম্রাট। কিন্তু হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে আওরঙ্গজেবের সাথে। ভাইয়ের চেয়ে দুই বছরের ছোট হওয়া সত্ত্বেও অনেক এগিয়ে যায় শাহ সুজাকে ছেড়ে আর কৌতুকের সঙ্গে শাহজাহান খেয়াল করে দেখেছেন যে, পিতাকে হারাতে না পেরে বিমর্ষ আওরঙ্গজেব ধুলার মাঝে ছুঁড়ে ফেলে দেয় নিজের দস্তানা।
নিজের ঘামে ভিজে যাওয়া ঘোড়াকে ঘোরাতেই সম্রাট শুনতে পান। যে ইতিমধ্যে বাজনা বাজানো শুরু হয়ে গেছে একটু দূরে নদীতীরে তাঁদের জন্যই বিশেষভাবে তৈরি ঘেরা জায়গায় হাতির সাথে যুদ্ধস্থানে। অশোক সিংয়ের সাথে ছুটতে ছুটতেই মাহুতকে ইশারা করেন শাহজাহান যেন হাতির কানের উপর থেকে সবুজ সিল্কের স্কার্ফ খুলে ফেলে যুদ্ধ শুরু করা হয়। খানিকটা সন্ত্রস্ত হয়ে ডাক ছাড়ে সম্রাটের ঘোড়া। মাটির দেয়ালের বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে গুঁড় উঁচিয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে হাঁক ছাড়ে হাতি দুটো। নিজের ঘোড়াকে ফিসফিসিয়ে সান্ত্বনার বাণী শোনান শাহজাহান। হাঁটু দিয়ে তো লাগান শক্তভাবে, টেনে ধরেন লাগাম। দেখতে পান যেন ইতিমধ্যেই তার একটু সামনে নিজ নিজ ঘোড়ায় চেপে বসে দেয়ালের প্রায় কাছে পৌঁছে গেছে আওরঙ্গজেব আর শাহ সুজা। এর আগের খেলাতে যে বর্শা ব্যবহার করেছিল তাই ঝুলছে তাদের লাগামের পাশে। দেয়ালের অপর পাশে আসফ খানের সাথে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে দারা।
সবার প্রথমে চোখ পড়ল দামোদারের উপর তীক্ষ্ণ দাঁত আর ভয়ংকর শুড়অলা বিশাল প্রাণী যেটির নামকরণ হয়েছে আকবরের বিখ্যাত যুদ্ধ হাতিগুলোর একটির নামানুসারে মনে হল আজকেও এটিই শ্রেষ্ঠ। নিজের মাহুতের তাড়া খেয়ে মাটির দেয়ালের কাছে গিয়ে খানিকটা দেয়াল ভেঙে আঘাত করল প্রতিপক্ষ জলপার উপর। শক্ত ধূসর কাঁধে আঁকাবাঁকা করে লম্বা ক্ষত সৃষ্টি হল। অশোক সিংয়ের পিতা আম্বারের রাজা দুটো হাতিই পাঠিয়েছেন দারার বিবাহ উপহার হিসেবে। আবারো আঘাত করার জন্য ছুটল দামোদার; কিন্তু এবার এগোতে গিয়ে ভাঙা দেয়ালের সাথে খানিকটা হোঁচট খেয়ে পড়ায় কাত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়, বাতাসে ভেসে বাচ্চাদের খেলনা পুতুলের মত উড়ে যায় মাহুত। কঠিন মাটিতে পড়ে প্রায় সাথে সাথেই মনে হল অচেতন হয়ে গেল মাথার চারপাশে লাল রক্তের পুকুর নিয়ে। নিজের সুযোগ এসেছে বুঝতে পারে জলপা, এছাড়া মাহুতও চড়ে বসে তাগাদা দিয়েছে কাঁধে। নিজের ক্ষত নিয়ে এগিয়ে যায় জলপা। লাল শুড় পেঁচিয়ে ভেঙে ফেলে অবশিষ্ট দেয়াল। এরপর মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে গুতো দিয়ে প্রায় ক্ষত করে ফেলে দামোদারের ডান কানে।
মাথার পাশ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, হাচোড়পাচোড় করে উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধের ডাক ছাড়ে দামোদর; কিন্তু এবার দ্রুত প্রতিক্রিয়া করে জলপা। নিজের বিশাল গম্বুজের মত মাথা নেড়ে ছুটে আসে দামোদারের দিকে, এবার প্রতিপক্ষকে আঘাত করে বাম পাশে। হঠাৎ করেই দমোদার যেন হাল ছেড়ে দেয়। যথেষ্ট হয়েছে। মাথা ঘুরিয়েই ছুটে আসতে থাকে দেয়ালের যে পাশে আওরঙ্গজেব আর শাহ সুজা দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে। হালকাভাবে নিজের ডান কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিতে চায়। দেয়ালের উচ্চতা পাঁচ ফুট আর বেশ মোটা, তাই দ্বিতীয় আঘাত করতে হল দামোদারকে, কিন্তু হল না। কিন্তু তৃতীয় আঘাতের সময়ে চাপ সহ্য করতে পারল না লাল মাটি। মাহুতহীন হাতি দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে পড়ল, এগিয়ে যেতে লাগল নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকদের দিকে।
হাতির আগমনে ভীত হয়ে আবারো ডাক ছেড়ে উঠল শাহজাহানের ঘোড়া। নিজের ঘোড়র উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে গিয়েই শাহজাহানের চোখে পড়ল যে ঘোড়া নিয়ে সামনে এগিয়ে আসছে আওরঙ্গজেব। চেষ্টা করছে উন্মাদ হাতি আর দর্শনার্থীদের মাঝে যেতে, বেশিরভাগেরই কাঁধে হোট ছেলেমেয়ে আর মনে হল যেন ভয়ের চোটে নিজের জায়গায় শিকড় গজিয়ে গেছে লোকগুলোর। আওরঙ্গজেবের কোন কিছু–সম্ভবত তার পাগড়িতে থাকা হীরা অথবা ঘোড়ার রত্নখচিত লাগামের ঝনঝন শব্দ–দামোদারের নজরে কাড়ল আর নিজের রক্তমাখা মাথা ঘুরিয়ে সেদিকে ছুটে গেল বিশাল জম্ভটা। শুড় পেঁচিয়ে গভীর ডাক ছেড়ে চিৎকার করে আগে বাড়লো।
