এই পরামর্শ ভালোই হয়েছে, যদিও তাঁর পুরাতন সঙ্গীর মুখখানা ব্যথায় জর্জরিত হয়ে আছে। লাহোরে হারানো হাতের ক্ষত কখনোই পুরোপুরি সারবে না।
তাহলে তাই হোক। প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে দেব আমি।
পরবর্তীতে অভিযানের বিশদ আলোচনা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক মতৈক্যের পর উপদেষ্টারা আর সেনাপতিরা চলে গেলে পর খানিকক্ষণ একা বসে রইলেন শাহজাহান। ভাবতে ভালো লাগছে যে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন তিনি। মমতাজের সমাধি নির্মাণের ব্যস্ততা সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার ব্যাপারে অবহেলা করতে দেয়নি… তারপরেও সভা চলাকালীন যদিও তিনি সক্রিয় আর কর্মতৎপর ছিলেন তারপরেও কোথায় যেন রেশ ছিল না। মনে পড়ে গেল প্রাচ্য দেশ থেকে একজন ভ্রমণার্থীর কাছে দেখা পুতুল শোর কথা। চামড়ার টুকরা কেটে নারী-পুরুষের অবয়ব দিয়ে কাঠির মাথায় গেঁথে পুতুলগুলোকে লুকিয়ে রাখা হয় সিল্কের পর্দার পিছনে, একসারি তেলের বাতি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। অভিনয় চলাকালীন শুধু তাদের ছায়া দেখা যায়। এরকমটাই অনুভব হচ্ছে এখন–তার ছায়া সম্রাট নড়াচড়া করছেন দর্শকের মনোরঞ্জনের জন্য।
এখন থেকে সবসময় কি তাহলে এমনই হবে? নিজের দায়িত্ব সচেষ্টভাবে পালন করতে চাইছেন কিন্তু অভিনয় হয়ে যাচ্ছে? এরকমই মহৎ হবার আকাংখা ছিল একসময়। নিয়ম মেনে চলা আর প্রচেষ্টার মাধ্যমে একে ফিরে আসতে বাধ্য করবেন তিনি।
১.৮ আগ্রা দুর্গের আঙিনাতে
১.৮
আগ্রা দুর্গের আঙিনাতে বিশেষভাবে তার জন্য তৈরি মঞ্চের রক্তলাল চাঁদোয়ার নিচে বসে আছেন শাহজাহান। সামনে সেনাপতি আর সভাসদদের দল। শুনছেন করতালের ঝনঝন আর ঢাকের বাজনা। দুই বছর আগে মমতাজের মৃত্যুর পর এই প্রথম দুর্গের মাঝে সংগীত আয়োজনের অনুমতি দিয়েছেন তিনি। এছাড়াও এবারই প্রথম নিজের সাধারণ সাদা শোকের কাপড় ছেড়ে পরিধান করেছেন দামি পোশাক আর রত্ন। উজ্জ্বল সবুজ ব্রোকেডের আলখাল্লা, কোমড়ে পেঁচানো রত্নখচিত কোমরবন্ধনী, গলায় রত্নের হার আর কব্জিতে ও রত্ন পাথরের সমাহারে নিজের কাছেই কেমন যেন লাগছে। কোন আনন্দই পাচ্ছেন না এত জাঁকজমকের মাঝে। কিন্তু আজ দারা শুকোহর বিবাহের দিন আর যেমনটা আসফ খান স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, মমতাজ থাকলেও এটিই চাইত যেন ম্রাট রাজাকীয় জৌলুস নিয়ে বাড়িয়ে দেন জ্যৈষ্ঠ্য পুত্রের বিবাহ উৎসব।
দুর্গের বাইরে অবস্থিত ভিড়ের জনতার হর্ষধ্বনি আর সংগীতের মূর্ঘনায় তিনি বুঝতে পারলেন যে এগিয়ে আসছে বর ও তার ভাইয়ের। এক ঘণ্টা আগে শাহ সুজা, আওরঙ্গজেব আর মুরাদ যমুনার তীরে প্রাসাদে গেছে, যেটি তিনি বিবাহ উপহার হিসেবে দিয়েছেন দারাকে। এখন নিশ্চয়ই ফিরে আসছে চার ভাই। জমকালো কালো ঘোড়র উপর বসে আছে দারা, তার সামনে সোনালি ওড়না পরিহিত শতখানেক পরিচারক। সবার হাতে রত্নপাথর সোনা, রুপা আর চুড়ো করে রাখা রঙিন মশলা ভর্তি গোলাকার ট্রে–কমলা পেশতা আর হলুদ রক্ত লাল ডালিম, বেগুনি ফিগ আর সবুজ পেয়ারা। সবকিছুই তুলে ধরছে বর কনের সমৃদ্ধশালী ভবিষ্যতের চিহ্ন।
নিশ্চিত যে অন্তত তিনটা বাদ্য একসাথে বেজে উঠল দারা ও তাকে অনুসরণ করে আসা ভাইদেরকে স্বাগত জানাতে। মঞ্চের কাছে এগিয়ে আসার সময় সিংহাসনের পাশে দেয়ালের উপরে পর্দা ঘেরা জায়গার দিকে একটু তাকাল দারা, জানে যে সেখান থেকে তাকিয়ে আছে দুই সহোদরা। বিবাহের প্রস্তুতি দায়িত্ব গ্রহণের জন্য যথেষ্ট উৎসুক জাহানারার আবদার রক্ষা করেছেন শাহজাহান। বিবাহ ভোজের জন্য সোনালি পাতায় মোড়ানো বাদাম আর শুকনো ফল দিয়ে তৈরি পোলাও থেকে শুরু করে উজ্জ্বল পোশাকের রাজস্তানী নর্তকীরা, গভীর রাতকে আলোকিত করে তোলার জন্য মধ্যরাতে আতশবাজির প্রদর্শনী সহ সবকিছুর পরিকল্পনা করতে দেখে অবাক হয়ে ভেবেছেন সম্রাট যে আত্মবিশ্বাস আর অধিকারবোধে পূর্ণ হয়ে কত দ্রুত বেড়ে উঠছে তাঁর কন্যা।
সময় এসেছে দারার মাথায় বরের জন্য তৈরি মুক্তোর মুকুট পরিয়ে দেওয়ার। অন্য দিনের চেয়েও দ্রুত খোঁড়াতে খোঁড়াতে এলো আসলান বেগ, সামনে বাড়িয়ে ধরল ভেলভেট কুশনে রাখা মুকুট, উঠে দাঁড়ালেন শাহজাহান। দুই হাতে মুকুটটিকে ধরে উঁচু করে ধরলেন, যেন সকলে স্পষ্ট দেখতে পায়, তারপর পরিয়ে দিলেন পুত্রের মাথায়। আমি এখানে উপস্থিত সবাইকে বলছি যেন তারা দেখে যে আমি আমার প্রিয়তম জ্যেষ্ঠ পুত্রকে আশীর্বাদ করছি তার চাচাত বোন আমার সৎভাই পারভেজের কন্যা নাদিরার সাথে বিবাহ উপলক্ষে। মহান আল্লাহ তাদের এই মিলনকে আশীর্বাদিত করুন, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বহু সন্তান ও একসাথে বহু বছর আনন্দে কাটানোর বর প্রদান করে। এরপর দারার কাঁধ ধরে উপস্থিত সভাসদদের দিকে মুখ করে ঘুরিয়ে দিয়ে সম্রাট বলে উঠলেন, আমি আরো কিছু ঘোষণা দিতে চাই। এতদ্বারা আমি আমার পুত্রকে বারো হাজার ঘোড়ার সেনাপ্রধান রূপে নিয়োগ দান করছি। এই বয়সে আমার পিতাও আমাকে এই একই পদ পুরষ্কার দিয়েছিলেন।
দারার পিঙ্গলবর্ণ চোখ জোড়াতে খুশির আভা দেখতে পেলেন শাহজাহান। শীঘি শাহ সুজাও হয়তো বিবাহ করবে, তাকেও সম্মানিত করবেন তিনি; কিন্তু হয়ত একই সন্তুষ্টির সাথে নয়। দারা সবকিছু, একজন পুত্র–একজন মোগল শাহজাদা যেমন হওয়া উচিত। দারা একজন দক্ষ তলোয়ারবিদ, প্রশংসিত মুষ্টিযোদ্ধা যে কিনা নিজের চেয়েও ভারী লোকদের সহজেই হারিয়ে দেয়। একই সাথে বিদ্যানুরাগী দারা তার দাদাজান জাহাঙ্গীরের মতই বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক জীবন নিয়ে অত্যন্ত আগ্রহী। অন্যদিকে শাহ সুজার প্রধান আকর্ষণ হল আনন্দের পিছু নেয়া– একজন তরুণের জন্য যদিও স্বাভাবিক, কিন্তু তাঁর মোগল পূর্বপুরুষদের বেশির ভাগেরই মৃত্যু হয়েছে শত্রু হস্তে নয়, বরঞ্চ নিজেদের দুর্বলতার কারণে। এদের মাঝে একজন নাদিরার পিতা। তরুণ বয়সেই মদ্যপ পারভেজ মৃত্যুবরণ করেছিল।
