দরবারে স্বাগতম, আমি শুনেছি তুমি বাজারে উঠেছে। যদি চাও তো আমার কর্মচারীরা দুর্গের মাঝেই তোমার জন্যে থাকার বন্দোবস্ত করে দেবে।
ধন্যবাদ, জাহাপনা।
আগ্রায় কী মনে করে?
সত্যি কথা বলতে আমি আপনার দরবারে চাকরি খুঁজতে এসেছি।
তুমি না ব্যবসায়ী হবে মনস্থির করেছিলে?
হ্যাঁ, কিন্তু সুবিধা করতে পারি নি। আপনার সেবা করে যে অর্থ উপার্জন করেছিলেন তা দিয়ে কাবুলে গিয়ে বড় বাজার থেকে পারস্যের কার্পেট আর চাইনিজ সিল্ক কিনে জাহাজে যাবার পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্তে খুর্দ-কাবুল পাসের সংকীর্ণ রাস্তায় আমাদের ক্যারাভানের উপর আক্রমণ করে খিলজিরা। প্রাথমিক আঘাতেই হত্যা করে বহু বণিককে। আমরা কয়েকজন মাত্র প্রাণে বেঁচে গেছি, তাও হাচোর-পাচোড় করে পাহাড়ের দিকে উঠে গিয়ে অর্ধ আলোয় পাথরের আড়ালে আশ্রয় নিতে পারায়। খিলজিরা আমাদের খচ্চর সহ মলামাল লুট করে ফেলায় আমাদের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। খানিকটা বেদনাতুর মুখে হাসলো নিকোলাস।
কিন্তু হতাশ হলেন শাহজাহান। নিকোলাসের কথায় স্মরণ হল যে কাবুলে তাঁর সুবেদার ও পাসের কাছাকাছি গোত্র অধিবাসীদের মাঝে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনতির কথা জানিয়েছে–এদের মাঝে আছে আফ্রিদি, কাফির আর খিলজিরা।
এরপর কী করছো?
এরপর আমি দক্ষিণে কান্দাহার গিয়ে হেলমন্দ নদী পার হয়ে পারস্যে পৌঁছাই। কিছুদিনের জন্য শাহের সেনাবাহিনীতে যোগদান করি।
কখনো তোমার নিজের দেশে ফিরে যাবার কথা মনে হয়নি?
মাথা নাড়ল নিকোলাস। না, আমার জন্য খুব বেশি কিছু নেই সেখানে। পিতা-মাতা মারা গেছে–বাবার সম্পত্তি পেয়েছে বড় ভাই। এছাড়াও…আমি এ দেশকে ভালোবাসি–স্যার টমাসের সাথে যখন থেকে এসেছি, তখন থেকেই আর তাই পারস্য থেকে এখানে ফিরে এসেছি। আমি দেশে যেতে প্রস্তুত নই–অন্তত এখন তো নয়ই।
স্যার থমাস রো…টেকো মাথার ইংরেজ রাষ্ট্রদূতের কথা শাহজাহান প্রায় ভুলেই গেছেন, যার কর্চি ছিল নিকোলাস।
নিকোলাস, তুমি সবসময় আমার প্রতি বিশ্বস্ত ছিলে। তাই আমার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সেনাবাহিনী হেডকোয়ার্টারে দলনেতা হিসেবে নিয়োগ দিলাম তোমাকে। পরিচিত বেশ কিছু চেহারা খুঁজে পাবে সেখানে। শাহের সেনাবাহিনী সম্পর্কে তোমার জ্ঞান বিশেষ করে অস্ত্র সম্পর্কে –কাজে লাগবে। আমার যেটা সন্দেহ যে বস্তুত আমি জানিই আমার সাম্রাজ্যের প্রান্তের ভূমি দখলের উচ্চাকাঙ্খ আছে তাঁর। সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি দেখভালের জন্য দায়িত্ব দিয়েছি আমার জ্যেষ্ঠ পুত্রকে। তুমি তাকে সাহায্যে করতে পারবে।
আনন্দের সহিত তা করব আমি জাহাপনা। শাহজাদা দারার কথা বেশ মনে আছে আমার। এরপর খানিকটা দ্বিধাভরে নিকোলাস বলে উঠল, পারস্য থাকাকালীন সম্রাজ্ঞীর মৃত্যুর কথা শুনেছি আমি। সত্যি দুঃখিত।
মাথা নেড়ে আর কিছু বললেন না শাহজাহান। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে ইশারা করলেন যে সাক্ষাৎকার শেষ হয়েছে।
চব্বিশ ঘণ্টা পরে মার্বেল হলের চারপাশে নিজের পরিচিত মুখগুলোর দিকে তাকালেন সম্রাট। আগ্রায় ফিরে আসার পর এই প্রথম নিজের পুরো সভাসদদের উপদেষ্টাকে তলব করেছেন। হাত তুলে গুঞ্জন থামিয়ে আলোচনার আশাতে কথা শুরু করলেন শাহজাহান।
উত্তরের গোত্ররা ভাবছে যে তারা এরকম অবিশ্বাস্য আচরণ করে কাবুল আসা যাওয়ার পথে আমাদের বণিকদেরকে লুট করে নিতে থাকবে। তাদের দ্রুত সংগঠিত হওয়া অপরাধ সম্পর্কে শুনেছি আমি। এছাড়া শহরের সুবেদারের পাঠানো প্রতিবেদনও পড়েছি। সম্ভবত এ অপরাধীরা ভেবেছে দাক্ষিণাত্য নিয়ে আমি ব্যস্ত থাকাতে তারা পার পেয়ে যাবে…যদি তাই হয় তাহলে শীঘ্রিই নিজেদের ভুল বুঝতে পারবে তারা। আমি তাদের অভদ্রতা বরদাশত করব না। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের রাস্তা ঘাট নিরাপদ না হবে, বাণিজ্যের উন্নতিও ঘটবে না।
চারপাশে বিড়বিড় করে নিজেদের সম্মতি জানালো সভাসদবৃন্দ।
অশোক সিং, বলে চললেন শাহজাহান, দাক্ষিণাত্যে নিজের সাহস আর সতোর পরিচয় দিয়েছ তুমি। এই ভয় দূর করার ভারও তোমার উপর অর্পণ করছি আমি। দশ হাজার সৈন্যের সেনাপতি হিসেবে তোমাকে দায়িত্ব দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি–অশ্বরোহী আর বন্দুকধারী। পাসের মধ্য দিয়ে অগ্রসর এই দুবৃত্তদেরকে সমুচিত শাস্তি দেয়ার দায়িত্ব তোমার। প্রধানদেরকে হত্য করে দুর্গ গুঁড়িয়ে দাও, গ্রাম ভেঙে পশুর দল তাড়িয়ে দাও। তাদেরকে বুঝিয়ে দাও মোগল শাসন মেনে না নেবার একমাত্র বিকল্প হল ধ্বংস আর মৃত্যু।
আমার সন্দেহ যে পারস্যের শাহ গোত্র সমূহকে অর্থ দিয়েছে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার জন্যে। শক্তির প্রদর্শন তাঁকে প্ররোচিত করবে দ্বিতীয়বার ভাবতে। আস্তে করে বলে উঠল আসফ খান।
আমি নিশ্চিত যে এটাই সঠিক। মমতাজের পিতা শারীরিকভাবে বৃদ্ধ হতে থাকলেও মস্তিষ্ক পূর্বের মতই তীক্ষ্ণ আর সচল।
আগামী শীতকাল এসে অভিযানের সমাপ্তি ঘটানোর আগেই আমার বাহিনী একত্রিত করে নেব আমি। শুধুমাত্র একটা প্রশ্ন : কামান সাথে নিবো? কামান ছাড়া এগোনোটা দ্রুততর হবে। বলে উঠল অশোক সিং।
তোমার কি মনে হয় কামরান ইকবাল? জানতে চাইলেন শাহজাহান।
আমি এতে একমত। এগুলো শুধু গতি রোধ করবে। যদি কামান প্রয়োজন হয় কাবুলের সুবেদার জোগান দেবে।
