*
হে প্রশান্ত আত্মা!
প্রফুল্লচিত্তে স্বীয় প্রভুর দিকে প্রত্যাবর্তন কর,
প্রভু তোমার উপর সন্তুষ্ট এবং তুমিও প্রভুর উপর সন্তুষ্ট থাক।
তুমি আমার বান্দাদের (গোলামদের) সান্নিধ্যে গমন কর।
এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।
ইয়া আইয়্যাতুহান নাফসুল মুতমাইন্নাতুর জিয়ী ইলা রাব্বিকি রাদ্বিয়াতাম মারদ্বিয়াহ্ ফাঁদখুলী ফী ইবাদি ওয়াদ খুলী জান্নাতি। (আল-কোরআন; সুরা : ফজর : আয়াত-৩)
কী মনে হয় আব্বাজান? আমি এবং দারা কোরান থেকে সঠিকটিই নির্বাচন করতে পেরেছি? এটা সহজ কাজ ছিল না। নত স্বরে জানালো জাহানারা।
মাথা নাড়ালেন শাহজাহান। আগ্রাতে ফিরে আসার সাথে সাথেই তিনি তার জ্যৈষ্ঠ সন্তানদের বলেছিলেন শব্দ বাছাই করতে। ফটকের কাঠামোর চারপাশে খোদাই করার জন্য, এ পদ সম্পূর্ণভাবে উত্তম। দর্শনার্থীদেরকে মনে করিয়ে দিবে যে তারা একই সাথে একটি পবিত্র স্থান আর একটি পৃথিবীর স্বর্গে প্রবেশ করছে।
আমি আমানত খানকে নির্দেশ দেব শব্দগুলো খোদাই করে তারপর যেন পাথরকাটা কারীদের কাছে দেয়া হয় মসৃণ করে তোলার জন্য।
তিনি একজন সত্যিকারের কলাকার। তাঁর ক্যালিগ্রাফি বেশ প্রাণবন্ত।
এই কারণেই তাকে সিরাজ থেকে ডেকে পাঠিয়েছে আমি।
শাহজাহান টেবিলের উপর তাকালেন। পুরো ভবনটির কাঠের একটি মডেল রাখা আছে সেখানে। চারটি সাদা মিনার মার্বেল মঞ্চের চারপাশে বেশ উৎসাহব্যঞ্জক। সম্রাটকে বুঝিয়ে বলার সময় উত্তেজিত উস্তাদ আহমাদ এদের নাম রেখেছে স্বর্গের সিঁড়ি, এগুলো নাকি নকশার মাহাত্ম বাড়িয়ে তুলবে। এ মডেলটার দিকে তাকিয়ে থেকেই সন্তুষ্ট হয়ে যান শাহজাহান। কিন্তু এরপরই হাসি মুছে গেল মুখ থেকে।
অনেক বছর লেগে যাবে এ সমাধির প্রস্তুত হতে, তারপরই কেবল মাত্র বরণ করে নেবে তোমার আম্মাজানের শরীর। এর মাঝে কাজের তদারকি আর বিল পরিশোধ করা এটুকুই করতে পারি আমি।
আপনি কি চান আমি বিল দেখাশোনা করি? সাম্রাজ্যের প্রথম শাহজাদি হওয়া সাপেক্ষে আমার কিছু দায়িত্ব আছে।
আমি তোমাকে এ পদবী দিয়েছি কারণ এটি তোমার মায়ের ছিল; তোমার উপর কাজের বোঝা ফেলার জন্য নয়।
আপনি যখন দাক্ষিণাত্যে ছিলেন, তখন আপনার হয়ে যেসব যোগাযোগ আর আবেদন শোনার কাজ করেছি তার চেয়ে তো দুরহ হবে না। এটা আমাকে কিছু করার সুযোগ করে দেবে। দারাকে তো অনেক কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে–আমিও কেন বেশি করতে পারব না?
এটা সত্যি। দারার উপর দায়িত্বের বোঝা বাড়িয়েছেন তিনি, যেমন সেনাবাহিনীর যন্ত্রপাতির পুনর্মূল্যায়ন করা। জাহানারার ভূমিকা হতে হবে আরো সঙ্গত–এমন কাজ যা একজন নারী হারেমে বসে করতে পারে, যেমন মমতাজ করত–কিন্তু এটা বোঝার মত বুদ্ধি তার আছে। ঠিক আছে আমি পারিশ্রমিক তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব আর যদি চাও অন্য দায়িত্বও অর্পণ করব। আমি তোমাকে তোমার আম্মাজানের আইভরি সিলও পাঠিয়ে দেব যেন আমার হয়ে রাজকীয় ফরমান জারি করতে পারো।
সম্রাট দেখতে পেলেন খুশি হয়ে উঠেছে জাহানারা। সত্যি কথা বলতে দারার সাহায্যের মত জাহানারার সাহায্য পেলেও খুশি হবেন। তিনি। খোলামেলা ভাব আর সহজাত বুদ্ধির ক্ষেত্রে তারা উভয়েই সমান। এতে অবশ্য বিস্মিত হবারও কিছু নেই। কিন্তু কী হবে তাঁর জ্যৈষ্ঠ্য কন্যার ভবিষ্যত? আকবর নিয়ম করে গেছেন যে সম্রাটের কন্যারা বিবাহ করতে পারবে না। যেন সিংহাসনের দাবি নিয়ে পরিবার সমূহের মাঝে রক্তপাতের সম্ভাবনা কমে যায়। হিন্দুস্তানে মোগলদের প্রথম দিককার ইতিহাস কলুষিত হয়ে আছে এমন সব কাহিনীতে। কিন্তু তারপরেও রাজকীয় কন্যারা কেন তাদের ভাইদের মত একই আনন্দ ভোগ করতে পারবে না?
মমতাজ থাকলে ঠিক বের করে ফেলতেন যে এহেন নিয়মের শুভ দিক কোনটি…কিন্তু হতে পারে এর কোন দিক নেই। রাজবংশের স্থায়িত্বই হচ্ছে প্রধান বিষয়, যেমন আকবর–জ্ঞানী এবং মানবিক ছিলেন তিনি বুঝে গেছেন। মুগ্ধ নয়নে মডেলের দিকে তাকিয়ে থাকা জাহানারাকে দেখলেন শাহজাহান। কন্যাদেরকে খুশি করার জন্য অন্য উপায় বের করবেন তিনি।
জাহানারা, তোমার কথাতে আমার মনে পড়ে গেছে যে তোমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। যদি তুমি স্বাধীন গৃহকন্না চাও তাহলে আমি তোমাকে আলাদা প্রাসাদ দিতে পারি। বেশ সুন্দর একটি আছে–যেটি ব্যবহার করতেন তোমার নানাজানের বাবা গিয়াস বেগ। তুমি রাজি?
এক মুহূর্ত ভাবল জাহানারা। হ্যাঁ ধন্যবাদ কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম… কয়েকটা সংবাদ আছে। সাত্তি আল-নিসা আমাকে জানিয়েছে নিকোলাস ব্যালান্টাইন আগ্রাতে ফিরে এসেছে, বাজারে আছে।
নিকোলাস? সিংহাসনে আসীনের পরপর শেষ এই তরুণ ইংরেজকে দেখেছিলেন শাহজাহান। সে না কোথায় ব্যবসায়িক কাজে গিয়েছিল… কাবুল অথবা সম্ভবত হেরাতে? পরবাসে থাকাকালীন বিপদের দিনগুলোতে তার পারিবারিক বন্ধু হিসেবে বিশ্বস্ততার উদাহরণ ছিল নিকোলাস। এমন কি পিতা জাহাঙ্গীরের দরবারে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে চেষ্টা করেছে শান্তি স্থাপনের জন্য। আমি নিকোলাসের সাথে দেখা করতে চাই। সে আমাদের সে সময়কার বন্ধু যখন আমাদের বন্ধুসংখ্যা ছিল নগণ্য।
পরের দিন নিজের সামনে কুর্নিশরত নিকোলাস ব্যালান্টাইনকে দেখে শাহজাহানের মনে হল যে সে পূর্বের চেয়ে বেশ মোটা চওড়া হয়ে গেছে। আটোমোটো চামড়ার টিউনিক ভেদ করে ফুটে বের হতে চাইছে কাঁধ, আর এই বিদেশীর পরনের বিদেশী প্যান্টালুন ভেদ করে বের হয়ে রয়েছে পায়ের পেশী। কিন্তু মাথা তুলতেই দেখা গেল যে নিকোলাসের চোখ জোড়া ঠিক আগের মতই তীক্ষ্ণ আর নীল। মাখন রঙা এলোমলো চুল, তপ্ত ভারতীয় সূর্যের নিচে প্রায় সাদা হয়ে গেছে পুড়ে।
