কিন্তু শ্রমিকেরা নদী তীরেও খনন করছে না?
হ্যাঁ জাহাপনা। তারা বিশাল বড় বড় গর্ত খুঁড়ছে। এগুলোর মাঝে চুনা-বালি দিয়ে তৈরি মন্ড ভর্তি আবলুস কাঠের বাক্স ফেলা হবে যেন যমুনা নদীর জোয়ার ভাটার সময়ে কোন সমস্যা না হয়।
মাথা নাড়লেন শাহজাহান। সবকিছুই ভেবে রেখেছে উস্তাদ আহমাদ।
বর্তমানে আমাদের এখানে বিশ হাজার শ্রমিক কাজ করছে। এখানে তাদের থাকার জায়গা। নির্মাণ স্থানের দক্ষিণ দিকে হাত তুলে দেখালো স্থপতি। কুঁড়েঘরের সাথে বণিকদের জন্য চারটি সরাইখানা আছে। প্রতিদিন তাদের উট আর ঘোড়ার গাড়ি এসে পৌঁছায় আর মাঝিরা যমুনা নদীতে বার্জে করে নিয়ে আসে মালপত্র। পরলোকগত সম্রাজ্ঞীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তারা তাদের শহরের নাম রেখেছে মমতাজবাদ। আমি আশা করি এতে আপনার কোন সমস্যা নেই জাহাপনা।
না, ঠিক আছে। কিন্তু আমাকে বলো যে যা দরকার তার সবকিছু আছে এখানে? যথেষ্ট বালিপাথর এসেছে?
হ্যাঁ, এরই মাঝে ভালো একটা মজুদ গড়ে উঠেছে, আপনি তখনো দক্ষিণে ছিলেন; তাই আমি দশ মাইল লম্বা একটি রাস্তা তৈরি করার জন্য শাহজাদা দারার অনুমতি নিয়েছি। যেন স্থানীয় খনি থেকে সঁড়ের দল সহজেই পাথর বোঝাই গাড়ি টেনে আনতে পারে। আপনি কি রাজমিস্ত্রীদের কাজ দেখতে চান, জাহাপনা? এখানে তুলার চাঁদোয়ার নিচে কাজ করছে একটি দল।
সাদা ধুতি পরনে আর কপালে হিন্দুদের লাল তিলক দেয়া একজন মধ্যবয়স্ক লোক ঝুঁকে কাজ করছে বিশাল বড় এক টুকরা চৌকোনা বেলেপাথরের উপর। আর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে দুটি অল্প বয়স্ক ছেলে, চেহারা দেখে পরিষ্কার বোঝা গেল যে লোকটার ছেলে এরা। শাহজাহান কাছে এগিয়ে যেতেই দেখতে পেলেন যে লোকটা পাথরের টুকরাটার উপর পেরেকের মত কিছু জিনিস এক সারিতে বসিয়ে দিচ্ছে হাতুড়ির বাড়ি মেরে। হঠাৎ করেই সম্রাট আর উস্তাদ আহমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ঝটকা মেরে সোজা হয়ে গেল।
আমরা বিরক্ত করার জন্য আসি নি। কাজ চালিয়ে যাও। বলে উঠলেন শাহজাহান।
সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে অতিথিদের দিকে তাকিয়ে আবারো কাজ করা শুরু করল লোকটা। পাথরের উপর কাজ করতে করতে ঘাম ঝরছে তার পেশীবহুল হাত বেয়ে। বেশ কয়েক মিনিট পরে এক ছেলের হাতে ধরিয়ে দিল হাতুড়ি, সে-ও একইভাবে ঘা মারতে লাগল তারপর হঠাৎ করেই নিখুঁতভাবে কেটে গেল পাথর। বড় একটা কাঠের টুকরো ব্যবহার করে কনিষ্ঠজন একপাশে নিয়ে গেল একটি টুকরো। সন্তুষ্টির ভঙ্গিতে সদ্যকাটা টুকরাটার উপর আঙুল বুলালো রাজমিস্ত্রী। এরপর ভালো একটা বাটালি তুলে নিয়ে খুব যত্নের সঙ্গে কিনারাগুলো মসৃণ করে তুলতে লাগল।
রাজমিস্ত্রীরা তাদের বাটালি দিয়ে পাথরের উপর কাজ করছে আর একেবারে অ্যালবাস্টারের মত মসৃণ না হওয়া পর্যন্ত পলিশ করছে এর উপরিভাগ।
ব্যাখ্যা করে জানালো উস্তাদ আহমাদ। প্রতিটি ব্লক প্রস্তুত হয়ে গেলে জায়গামত তুলে নিয়ে যাওয়া হবে; এরপর ঠিকভাবে নিরাপদে চুল-বালির লোহার পাত আর বন্ধনী দিয়ে জুড়ে দেয়া হবে। এদের মাঝে একটি ফাটলও খুঁজে পাবেন না আপনি।
কিন্তু মনোযোগ দিয়ে রাজমিস্ত্রীর কাজ দেখছেন শাহজাহান। পাথরের মাঝে ত্রিকোণা করে একটি গর্ত খুড়ছে লোকটা। কী করছো তুমি?
আমার চিহ্ন তৈরি করছি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ আর আমি চাই কোন একটা চিহ্ন রেখে দিতে যেন বোঝা যায় যে এটা আমার কাজ।
অন্যান্য রাজমিস্ত্রিরাও একই কাজ করছে, জাহাপনা, আমি বাধা দেয়ার কোন কারণ খুঁজে পাইনি।
আর আমিও তা করব না। নিজেদের কাজের প্রতি কারিগরদের এহেন গর্বে আমি খুশি হয়েছি। এটা রাখো। রাজমিস্ত্রীর হাতে কয়েকটা কয়েন তুলে দিলেন শাহজাহান তোমার দক্ষতা আর কাজের প্রতি আগ্রহের জন্য ধন্যবাদ।
এরপর ঘুরে তাকালেন, উস্তাদ আহমাদ, তোমার নকশা অসাধারণ একটা সৃষ্টি হয়েছে। তারপরেও কী যেন নেই?
জাহাপনা? বিরক্ত হবার বদলে বিস্মিত হলেন উস্তাদ আহমাদ।
সমাধির প্রবেশদ্বারে রত্ন পরিহিত মমতাজকে স্বপ্নে দেখার পর থেকে শাহজাহান ভাবছেন যে কেমন করে একে বাস্তবে রূপ দেয়া যায়। আমি সমাধির জন্য আরো গহনা চাই। মার্বেলের মাঝে রত্ন খোদাই করে দেয়া হোক। আমার চেয়ে এ সম্পর্কে ভালো তেমন কেউ জানে না। আমি নিজে শ্রেষ্ঠ রত্ন নির্বাচন করে দেব রাজকোষ থেকে। যদি কোন পাথরের পর্যাপ্ত মজুদ না থাকে সবুজ পান্না, হতে পারে অথবা নীলকান্ত মণি সীমানার বাইরে থেকে আমদানি করব আমি। আর এ কাজ করার সময় আমার কয়েকজন হিন্দু প্রজা আমার সাথে থাকবে, যারা আমি জানি এ কাজ করতে দক্ষ, এই কলাকে তারা বলে পাঞ্চিকূরা-পাথরে খোদাই করা। এছাড়া ইউরোপীয় কারিগরদেরকেও নিয়োগ করতে পারি আমি কৈশোরে পিতার দরবারে আসা দুজন ইতালীয়ের কথা মনে আছে আমার। তারা তাদের জন্মভূমির ছবি নিয়ে এসেছিল–ফ্লোরেন্স এই নামেই ডাকছিল–দেখতে মনে হচ্ছিল ছবি, কিন্তু আসলে অর্ধদামি পাথরের ছোট ছোট টুকরার সমাহার।
মার্বেলের উপর কোন ধরনের আকৃতি আপনি ফুটিয়ে তুলতে চান, জাহাপনা? সম্ভবত জ্যামিতিক নকশা?
না, ফুল, সবুজ পাতা আর লতানো চারা, এতটাই সত্যি হবে যেন মনে হবে যে সমাধির উপরেই জন্মেছে এগুলো, তাহলে আমার পত্নীর সমাধি জীবন্ত হয়ে উঠবে। আমি আরো কিছু কারুকাজ চাই। আমি চাই অন্য কারিগরেরা ঠাণ্ডা মার্বেলের মাঝে জীবনের স্পন্দন নিয়ে আসবে লম্বা আইরিস আর সরু উঁটার টিউলিপ বাতাসে দোল খাচ্ছে এমন দৃশ্য খোদাই করে; ঠিক যেমনটা হয় কাশ্মিরে। আমি জানি যে এটা করা সম্ভব।
