.
১.৭
নিচু একটা পর্বতের মাথায় পৌঁছেই সৈন্য সারিকে থেমে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন শাহজাহান। চোখের উপর হাত দিয়ে ছায়া তৈরি করে উত্তরে তাকালেন আগ্রার দিকে। মধ্যাহ্নের তাপে দুর্গের পরিচিত বালিপাথরের দেয়াল ঠিকরে বের হচ্ছে লাল আভা। পর্বতের পাদদেশ থেকে শুরু হওয়া সমভূমির মাঝখানে অবস্থিত শহরের বাইরের দিকে দেখা গেল সৈন্যদের বিশাল লম্বা এক সারি–কেউ ঘোড়ার পিঠে, আবার কেউবা হাতির পিঠে এগিয়ে আসছে মোগল সম্রাট ও তার বিজয়ী সেনাবাহিনীকে ঘরের উদ্দেশ শেষ মাইলটুকু সঙ্গ দেবার জন্য।
যথাযোগ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই দুর্গে পুনঃপ্রবেশ করবেন তিনি। ফটকের সামনে বাদ্য বাজানো হবে, দেয়ালে উড়বে সবুজ পতাকা কিন্তু তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে কোন ফুল ছোঁড়া হবে না, কিংবা সোনা রুপা মুদ্রার বৃষ্টি, কোন নর্তকী বা শিল্পীর নাচ গান হবে না, এসব হত যদি মমতাজ এখনো তার পাশে থাকতেন। যখন থেকে দারা আর জাহানারা মমতাজের মৃতদেহ আগ্রা নিয়ে এসেছে, তখন থেকেই তিনি অপেক্ষা করে আছেন এই মুহূর্তটির জন্য। এখন দুঃসহ বেদনাদায়ক মনে হল এই চিন্তা যে রাজকীয় গৃহে ফিরে এসেছেন তিনি, দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে অপেক্ষায় আছেন দুঃখী সম্রাজ্ঞী যিনি কিনা আর কখনো তাদেরকে দেখতেই পারবেন না।
তারপরেও এটি সম্রাটের দায়িত্ব, এটি তাকে করতেই হবে। জ্যোতির্বিদরা জানিয়েছে যে প্রত্যাবর্তনের জন্য আজকের দিনটির মত শুভ দিন আগামী কয়েক সপ্তাহে আর পাওয়া যাবে না। তার কাছে এ ধরনের বিষয়ের কোন গুরুত্ব না থাকলেও জনগণের কাছে আছে। যদিও তিনি ম্রাজ্ঞীকে হারিয়েছেন, এটি আচরণে প্রকাশ করতে হবে যে সৌভাগ্য দেবী এখনো তাঁর এবং রাজবংশের সাথেই আছে। আর এই বার্তা সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার জন্য পুত্রদের সাথে নিয়ে দুর্গের শহরের রাস্তায় হালকা চালে ঘোড়া নিয়ে ঘুরে বেড়াবেন। দারা শুকোহ্ শহর থেকে সৈন্য দলের সাথে এগিয়ে আসছে। অন্যদিকে শাহ সুজা, আওরঙ্গজেব আর মুরাদ পিতার মত শোকের সাদা পোশাক পরিহিত হয়ে সবুজ লাগামঅলা সাদা ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে আছে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করার জন্য।
অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন হয়ে যাবার সাথে সাথে যমুনা হয়ে মমতাজের সমাধিতে যাবেন তিনি। উস্তাদ আহমাদের পাঠানো সংবাদ ছিল কেমন ভাসা ভাসা টাইপের। চোখ সরু করে দুর্গের পিছনে নদীর বাঁকের দিকে তাকালেন শাহজাহান, চেষ্টা করলেন নির্মাণ স্থানটা দেখতে কিন্তু দিগন্তের কাছে ধূসর ছায়ায় ঢেকে আছে সবকিছু।
আব্বাজান, দেখেন, দারা এসেছে… চিন্তার সূতায় বাধা দিল শাহ সুজা।
পর্বতের নিচে তাকিয়ে দ্রুত ঘোড়া নিয়ে ছুটে আসা দেহ নজরে পড়ল। খুশি হয়ে উঠলেন সম্রাট। আল্লাহ মমতাজকে নিয়ে গেছেন; কিন্তু অনিন্দ্য কান্তি চার পুত্রের মাধ্যমে দীর্ঘজীবী হবে তাঁর রাজবংশ। কৃতজ্ঞ হবার জন্য অনেক কিছুই পেয়েছেন তিনি।
*
পরের দিন সকাল। শাহজাহান তাকিয়ে আছেন ধূসর, প্রায় বর্ণহীন আকাশের দিকে। দরবারে একজন ইতালীয় বণিকের নিয়ে আসা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রটি অনুযায়ী আজ হচ্ছে বছরের সবচেয়ে উত্তপ্ত দিন। যন্ত্রটি দেখলে বেশ কৌতূহল জাগে। একটা লম্বা কাঁচের টিউবের সাথে লাগানো আছে পানি ভর্তি কাঁচের বাল্ব। টিউবের উপর বেশ কয়েক সারি লাইন। ইতালিয়ান বণিকের কথানুযায়ী গ্যালিলিও নামেক একজন মানুষ এটি আবিষ্কার করেছেন। ইউরোপে নাকি এটি বেশ প্রচলিত। বণিক আসলান বেগকে দেখিয়ে দিয়েছে যে কীভাবে এটি ব্যবহার করতে হয়। এই জটিল প্রক্রিয়া দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছে দারা শুকোহ্, যদিও যন্ত্রটার কার্যকারিতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান সম্রাট। হিন্দুস্তানের সমভূমিতে প্রায় প্রতিটি দিনই তো গরম, তাই না?
বালিপাথরের মঞ্চ যেখানে আকৃতি পাচ্ছে সে দিকে চলেছেন শাহজাহান। উস্তাদ আহমাদ অপেক্ষা করছেন। বাতাসে ভেসে থাকা বিশী ধুলা গলার মাঝে যেতেই কাশতে লাগলেন তিনি।
জাহানারা আপনি যদি আমার সাথে ঐ দিকের উঁচু জায়গায় আসেন তাহলে চারপাশের দৃশ্য পরিষ্কারভাবে দেখতে পাবেন আর বাতাসও ভালো থাকবে। বলে উঠল উস্তাদ আহমাদ। উত্তাপে শক্ত হয়ে যাওয়া মাটির উপর দিয়ে উস্তাদ আহমাদের সাথে ছোট পাহাড়টার দিকে চললেন সম্রাট। ঠিক কথাই বলেছে তার স্থপতি–এখানে দৃশ্য ভালোই দেখা যাচ্ছে। বিশাল মঞ্চের চারপাশ পরিষ্কার দেখতে পেলেন তিনি–উস্তাদ আহমাদের হিসাব অনুযায়ী ৯৭০ ফুট লম্বা আর ৩৬৪ ফুট চওড়া এর উপরেই স্থাপিত হবে সমাধিসৌধ।
আমার এখনো ভাবতে অবিশ্বাস্য লাগে যে নদীর এত কাছে ভূমি কীভাবে এত ভার বইবে।
হেসে ফেলল উস্তাদ আহমাদ। জাহাপনা, আমি বারংবার হিসাব কষে দেখেছি। আর তাই পুরোপুরি নিশ্চিত যে আমরা ঠিকঠাকভাবেই নদীর তীর শক্তিশালী করেছি, এতেই কাজ হবে। আমি নদীর তীরের কাছাকাছি খনি খননের নির্দেশ দিয়েছি শ্রমিকদেরকে, ঢালু অনুযায়ী গভীরতা কম বেশি করা হবে। এরপর ইট আর চুনা বালি দিয়ে তৈরি মন্ড দিয়ে বাঁধানো হবে এদের পাড়, ভেতরে ভরে ফেলা হবে আরো মন্ড আর আলগা পাথরের টুকরা দিয়ে। এছাড়াও শ্রমিকদেরকে আরো আদেশ দিয়েছি খনির উপর মঞ্চকে ধরে রাখার জন্য খিলান বসানোর জন্য।
