ঝটকা মেরে বাম পাশে সরে গিয়ে তাঁবু ঘুরে এগিয়ে গেলেন বন্দুকের গুলি ভরার কাজে ব্যস্ত থাকা বিজাপুরি বন্দুকধারীর দিকে। মানুষটার ডান বাহু ছুঁয়ে ফেলল তার ফলা; ফলে হাত থেকে বন্দুক আর বারুদ ঢোকাবার শিক ফেলে দিয়ে চিৎকার করে দৌড় লাগালো বিজাপুরি। আবারো আঘাত হানলেন শাহজাহান। বন্দুকধারীর পিছন দিক উন্মুক্ত হয়ে দেখা যেতে লাগল হাড়। ঘুরতেই দেখতে পেলেন হলুদ পাগড়ি পরিহিত এক বিশালদেহী লোক ডান হাতে সড়কি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা উল্টো করে রাখা গাড়ির গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে। ঠিক সেই সময়ে পাশ দিয়ে যাচ্ছিল এক মোগল সৈন্য, মানুষটা সর্বশক্তি দিয়ে হাতের সড়কি ঢুকিয়ে দিল ঘোড়ার পাকস্থলিতে। পড়ে গেল ঘোড়া, নিজের উরুর ফাঁকে আটকে ফেলল মোগল সৈন্যকে। নিজেকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করছে মোগল সৈন্য এমন সময় হলুদ পাগড়ি মাথায় বিজাপুরি সৈন্য লাফ দিয়ে চড়ে বসল তার উপর। দুই হাতে মাথার উপর তুলে ফেলল ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত গড়াতে থাকা সড়কিটাকে। এতটাই মগ্ন নিজের কাজে যে লোকটা শাহজাহানকে দেখতে পেল না এগিয়ে আসতে, যতক্ষণে দেখতে পেল অনেক দেরি হয়ে গেছে ততক্ষণে। নিজের ঘোড়ার পিঠে নিচু হয়ে লোকটার ঘাড়ে তলোয়ার চালালেন সম্রাট, অর্ধেক কাটা মাথা নিয়ে নিজের রক্তের পুকুরেই খপ করে পড়ে গেল বিজাপুরি সৈন্য।
কিন্তু হঠাৎ করেই যেন দুলতে লাগল শাহজাহানের পৃথিবী। নিজেকে অনুভব করলেন যেন শূন্য। ভাসছেন, তারপর ধপ করে পড়ে গেলেন ভেজা মাটিতে। আহত অবস্থায় ঘোড়ার খোঁজে চারপাশে তাকিয়ে দেখতে পেলেন জন্তুটা হাঁটু গেড়ে বসে আছে মাটিতে। উল্টে রাখা গাড়ির সাথে ধাক্কা খেয়েই এ কাণ্ড ঘটেছে নির্ঘাৎ। কয়েক ফুট দূরত্বে পড়ে আছে তাঁর তলোয়ার। হ্যাঁচোড় পাচোড় করে হাঁটুর উপর ভর দিয়ে অস্ত্র পর্যন্ত গেলেন; কিন্তু সেই মুহূর্তের পেছনে হালকা করে ধাক্কা মারল এক জোড়া জুতা সুদ্ধ পা, তাঁকে ফেলে দিল গভীর কাদা মাটিতে। নাক মুখ ভরে গেল কাদা পানিতে। নিঃশ্বাসের জন্য হাঁসফাঁস করতে লাগলেন তিনি। চেষ্টা করলেন উঠে দাঁড়াতে কিন্তু অনুভব করলেন একটা হাত টেনে ধরল শিরস্ত্রাণ, চুলের মুঠি ধরে বাধ্য করল আবারো পানির মাঝে মুখ ডুবিয়ে রাখতে। দমবন্ধ হয়ে প্রায় মারা যাবার জোগাড়, ফুসফুসে মনে হল আগুন ধরে গেছে। নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে চেষ্টা করলেন আক্রমণকারীর হাত ছাড়াতে কিন্তু লোকটা বেশ শক্তিশালী, প্রতিবার নিশ্বাস নেবার চেষ্টাতে বরঞ্চ নাকে মুখে ঢুকতে লাগল আরো বেশি কাদা পানি। মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করলেন সম্রাট। কাপড়ের ভেতর হাত ঢুকিয়ে খুঁজতে লাগলেন দ্বিতীয় ছুরি। পেয়ে যাবার পর শক্ত হাতে ধরলেন হাতল। অন্ধের মত চালালেন উপর দিকে শত্রুর উদ্দেশে। শূন্য বাতাস কেটে গেল ছুরির ফলা। কানের পর্দা ফেটে মনে হল রক্ত পড়তে থাকবে আরেকটু পরে, আবার চেষ্টা করলেন তিনি। এবার ফলা গিয়ে বিদ্ধ হল কোন একটা পেশীর মাঝে। বিস্মিত উচ্চস্বরের চিৎকার শোনা গেল, সাথে সাথে চুলের মুঠি ধরে রাখা হাতটাও আলগা হয়ে গেল।
গায়ের উপর থেকে ধাক্কা দিয়ে লোকটাকে ফেলে দিয়ে একপাশে গড়িয়ে গেলেন শাহজাহান। হাঁ করে মুখ খুলে নিঃশ্বাস নিলেন প্রাণ ভরে। শত্রু লম্বা আর ভারী শরীর-মাটিতে গড়াগড়ি খেতে খেতে হাত দিয়ে চেপে ধরেছে বুকের বাম পাশের ক্ষত। আরো কয়েকবার গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন ম্রাট, এগিয়ে গিয়ে ধাক্কা দিলেন। লোকটার পাকস্থলী বরাবর, তারপর জোর করে মাথা চেপে ধরলেন ঠিক সেই কাদা পানির মাঝে যেখানে একটু আগে যুদ্ধ করেছেন তিনি। মানুষটার দুই পায়ের ফাঁকে বসে কাদা মাটির ভেতরে যত শক্ত করে সম্ভব ধরে রাখলেন মাথা। ইচ্ছে মতন হাত-পা ছুঁড়ে নিজেকে বাঁচাতে চাইল বিজাপুরি সৈন্য। কিন্তু ধরে রাখলেন শাহজাহান। কয়েক মুহূর্ত ভয়ংকরভাবে লাথি চালাল মানুষটার পা জোড়া, তারপরই নিস্তেজ হয়ে পড়ল শরীর। উঠে দাঁড়িয়ে তলোয়ার নিলেন সম্রাট। এরপর খানিক দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে গেলেন উল্টে থাকা গাড়ির কাছে। বুঝতে চাইছেন যুদ্ধের কী অবস্থা।
জাহাপনা, আপনি ঠিক আছে তো? যুদ্ধের মাঝে আমি আপনাকে হারিয়ে ফেলেছি। নিজের ঘোড়া থেকে ঝুঁকে এলো অশোক সিং।
আমার নতুন ঘোড়াটাও আহত হয়ে পড়ে গেছে।
আপনার হাত দিন, জাহাপনা, আমার পেছনে উঠে আসুন।
যদিও যুদ্ধ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, তারপরেও মাটিতে থাকার চেয়ে ঘোড়ার পিঠে থাকাটাই নিরাপদ, ঠিকই বলছে অশোক সিং, ভাবলেন শাহজাহান, যদিও চারপাশে ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহগুলো বিজাপুরি সৈন্যদের প্রতিরোধ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। দেখতে পেলেন, একটা তাঁবু থেকে বের হয়ে এসেছে চারজন হলুদ পোশাক পরা সৈন্য। হাতের অস্ত্রও ফেলে দিয়েছে। এর একটু দূরেই এক বিজাপুরি সৈন্যকে হত্যা করেছে মোগল অশ্বারোহী, যার তলোয়ার এখনো তার বর্শার মাথার সাথে ঝুলছে রসদবাহী গাড়িতে।
জাহাপনা, বেশ কয়েকজন বন্দি আটক করেছি আমরা। আপনার নির্দেশ কি এখনো পূর্বের মতনই আছে?
হ্যাঁ। হত্যা করো। কিন্তু তাড়াতাড়ি আর নিখুঁতভাবে।
চারপাশের ধ্বংসলীলার দিকে তাকিয়ে ম্রাট ভাবলেন, মমতাজের মৃত্যু আর তাঁর অসম্ভব যাতনার চেয়ে এ সৈন্যদের মৃত্যুযন্ত্রণা তো কিছুই না। শত্রুর মৃত্যুতেও কোন আনন্দ খুঁজে পেলেন না, শুধু এটুকুই স্বস্তি যে যুদ্ধ শেষ হয়েছে, আর তিনি জয়ী হয়েছেন। অবশেষে তিনি এবার আগ্রাতে ফিরে যাবেন ভালোবাসার স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলার জন্য ভালোবাসার নারী মমতাজ।
