আবারো দলবদ্ধ হও চিৎকার করে নিজের লোকদের আদেশ দিলেন শাহজাহান, সারি ঠিক করে একত্রিত হও। গাছের আড়ালে হয়তো আরো বিজাপুরি সৈন্য লুকিয়ে থাকতে পারে, তিনি চান না তার সৈন্যরা তাড়াহুড়োয় কোন ফাঁদে পা দিক।
ডান এবং বাম পাশ থেকে, দৃষ্টিসীমার বাইরে শুনতে পেলেন মোগল সৈন্যদের সাথে বিজাপুরি সৈন্যদের যুদ্ধের শব্দ। যদিও ঠিকভাবে বলতে পারবেন না যে কীভাবে কী হচ্ছে, কিন্তু বিশ্বাস করেন যে তাঁর সৈন্যরা নিশ্চয়ই তাদের জন্য দেয়া নির্দেশ স্মরণে রেখে নিয়ম বজায় রাখবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে চারপাশের ন্যূহ ঠিক রেখে সামনে এগিয়ে চলা, শত্রুকে ধাওয়া করে একটা জায়গায় আবদ্ধ করে ফেলা যেখান থেকে তাদেরকে ধ্বংস করা সহজতর হবে।
বিজাপুরি অশ্বারোহীরা বুঝতে পারলো যে তারা সংখ্যায় নগণ্য, তাই খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করাটা উচিত হবে না। তার পরিবর্তে পেছনে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষ থেকে বেঁচে যাওয়া দুই/তিনজনকে নিয়ে এরই মাঝে ঘোড়া ঘুরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে গহীন জঙ্গলে।
তাদের পেছনে নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে শাহজাহান উপলব্ধি করলেন যে সামনে তেমন গভীর নয়, গাছের চেয়ে ঝোঁপঝাড় বেশি, মাটিতেও সূর্যের আলো এসে পড়েছে যেখানে সেখানে, তবে মাটি বেশ ভেজা। প্রথম প্রথম বিজাপুরিদের পদচিহ্ন দেখে অনুসরণ করা কঠিন হল না। ভাগ্য সহায় থাকলে এভাবেই তারা মূল শিবিরে পৌঁছে যেতে পারবেন। প্রখর হল সূর্যের আলোর উজ্জ্বলতা, কাদার মাঝে আয়নার মত প্রতিফলিত হচ্ছে, গরম হয়ে উঠেছে বাতাস, শাহজাহানের দুই কাঁধের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম বিন্দু। কানের কাছে পিনপিন করছে মশার দল, চারপাশে তাকালেন সম্রাট, কে জানে কোন ঝোঁপ কিংবা পড়ে থাকা গাছের আড়ালে কোন বিজাপুরি লুকিয়ে আছে কিনা হঠাৎ আক্রমণের উদ্দেশ্যে, দেখা গেল না কাউকে।
হঠাৎ করেই সামনের দিকে ঝুঁকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল শাহজাহানের ঘোড়া। আরেকটু হলেই ফেলে দিচ্ছিল তাঁকে। রীতিমত যুদ্ধ করে ঘোড়াকে শান্ত করলেন সম্রাট। কিন্তু আবারো চলার চেষ্টা করতেই টলমল করে উঠল অবোধ প্রাণীটা। হাত তুলে নিজের দুপাশের সৈন্য সারিকে থামার নির্দেশ করে ঘোড়া থেকে নামলেন শাহজাহান। এরপর হাত ঢুকিয়ে দিলেন ঘোড়ার সামনের ক্ষুরের লোমের মাঝে। বাম ক্ষুর স্পর্শ করতেই ব্যথায় ককিয়ে উঠল ঘোড়া। আমার ঘোড়া চলার শক্তি হারিয়েছে। অশোক সিংকে ডেকে বলে উঠলেন ম্রাট। অপেক্ষা করছেন আরেকটা বাড়তি ঘোড়া আসার, এমন সময় পঞ্চাশ গজ দূরে নিচু পাহাড়ের উপর দেখতে পেলেন উদয় হল এক একাকী ঘোড়সওয়ার। সূর্যের আলো পড়ে চকচক করে উঠল শিরস্ত্রাণ। বিজাপুরিদের সাহায্যে এগিয়ে আসা সেই সেনাপতির হাতে উড়ছে সোনালি হলুদ সিল্কের ব্যানার-বিজাপুরের রং নির্ঘাৎ শান্তিচুক্তির পতাকা। ফুসফুসের সমস্ত জোর খাঁটিয়ে চিৎকার করে উঠল সেনাপতি, আমি আমাদের সেনাপ্রধানের কাছ থেকে একটা বার্তা এনেছি। জাহাপনা, আমরা জানি যে আপনার বাহিনী আমাদেরকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে। উভয় পক্ষেই আর রক্তপাত না ঘটিয়ে আমরা আত্মসমর্পণ করতে চাই।
তোমার স্মৃতিভ্রম হয়েছে বিজাপুরি। উত্তর দিলেন শাহজাহান। আগে একবার আত্মসমর্পণের প্রস্তাব ভঙ্গ করেছ তোমরা, মৃত্যুবরণ করেছে নিরপরাধ লোক। আজ আর কোন দর কষাকষি হবে না। শান্তিচুক্তি পতাকার নিরাপত্তা পাবার কোন অধিকার নেই বিশ্বাসঘাতকদের, তাই আমি ধরার আগেই চলে যাও। মানুষটা তাড়াতাড়ি ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যেতেই আকাশের দিকে তাকালেন শাহজাহান। সূর্যের অবস্থান দেখে বোঝা যাচ্ছে যে এখনো তেমন বিকাল হয়নি। যদি আল্লাহ চান তো সূর্যাস্তের মাঝেই বিজয়ী হবেন তিনি।
চল্লিশ মিনিট পরে শত্রুর বন্দুক থেকে ন্যাকড়া পেঁচানো বল এসে আঘাত করতেই শাহজাহান বুঝতে পারলেন যে শত্রুসৈন্যদের মূল ঘাঁটির অবস্থানের কাছে চলে এসেছেন। তার কাছ থেকে কয়েজ গজ বাম পাশে এক তরুণ রাজপুত্ৰ সৈন্যের উরুতে লাগল প্রথম বল। রক্ত ঝরতে লাগল ক্ষত থেকে। কাত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে গেল তরুণ। আরেকজন অশ্বারোহী চিৎকার করেই উপুড় হয়ে পড়ে গেল নিজের ঘোড়র উপর, হাত থেকে পড়ে গেল বর্শা। তৃতীয় আঘাত লাগল একটা ঘোড়ার গলাতে, পরপর দুবার ধীরে ধীরে পড়ে গেল ঘোড়াটা, তার আগে সময় দিল নিজের আরোহীকে নিরাপদে লাফ দিয়ে সরে যাবার জন্য। মুহূর্তের জন্য সারা শরীর কেঁপে উঠল অবলা জীবটার, তারপর ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল কাদা মাটিতে, অবশেষে স্থির হয়ে গেল।
নিচু হয়ে থাকো। গর্জন করে আদেশ দিলেন সম্রাট, আগে বাড়লেন ঘোড়া নিয়ে। খোলা ঝোঁপের মাঝ দিয়ে বড়সড় একটা তাবু দেখতে পেলেন, বুঝতে পারলেন এর পেছনেই আছে বেশির ভাগ বিজাপুরিরা। ব্যারিকেড হিসেবে উল্টো করে ফেলে রেখেছে রসদবাহী গাড়ি। কিন্তু চারপাশ থেকে ঘিরে থাকায় বুঝতে পারছে না এর চেযে অবস্থান ভাল করা যায় কীভাবে অথবা কোথায় আশ্রয় নেয়া যায়। চারপাশ থেকে কেবল শোনা যাচ্ছে এগিয়ে আসা মোগল সৈন্যদের রণহুঙ্কার। প্রতিরক্ষা ব্যুহ এখনো ঠিক আছে আর তিনি যেভাবে পরিকল্পনা করেছেন সেভাবেই চারপাশ থেকে এগোচ্ছে সৈন্যরা একসাথে ভাবতেই অভিযান শেষ করার তাড়নাতে নতুন করে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলেন শাহজাহান।
