দ্রুত নিজের সেনাপতিদেরকে সর্বশেষ নির্দেশ জানিয়ে দিলেন শাহজাহান। বনের চারপাশে তোমাদের সৈন্যদের পাঠিয়ে দাও। উত্তরের কিনার থেকে যারা ঢুকবে আমি তাদের সাথে যোগ দেব আর সেখান থেকেই নির্দেশ পাঠাবো। আওরঙ্গজেব, তুমি এখানেই থাকো। বিক্রম দাসপুত্রের নিরাপত্তার রক্ষার দায়িত্ব ভার তোমাকে দিলাম আমি।
মাথা নাড়ল সেনাপতি। নার্ভাস ভঙ্গিতে তাকাল আওরঙ্গজেবের দিকে। যেন তরুণ শাহজাদাকে নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ে নিজের ক্ষমতার ব্যাপারে সন্দিহান সে। বুঝতে পারলেন শাহজাহান। আওরঙ্গজেব আমি কি তোমার প্রতিশ্রুতি পেতে পারি যে তুমি এখানেই থাকবে, যুদ্ধে অংশ নেবে না? মুহূর্তখানেক দোলাচলে দুলে উঠে মাথা নাড়ল তাঁর পুত্র।
দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে ঘোড়া নিয়ে আগে বাড়লেন শাহজাহান, বনের চারপাশে জড় হওয়া অশ্বারোহীদের সাথে যোগ দিলেন। অশ্বারোহী সৈন্যদের পেছনে বসে থাকা বন্দুকবাজদের পিঠে রাখা তাদের লম্বা ব্যারেলঅলা অস্ত্র আর বারুদ ঢুকানোর শিক, কাঁধে ঝুলছে বারুদের ব্যাগ। গাছ থেকে এত বেশি পানি ঝরে পড়ছে যে মনে হচ্ছে এখনো বৃষ্টি হচ্ছে, এর নিচ দিয়ে এগিয়ে গেলেন শাহজাহান ও তাঁর সৈন্যরা। গলা বেয়ে বুকবর্মের নিচে ঢুকে পড়ছে পানির ধারা, জঙ্গলের মাটি ভেজা, পিচ্ছিল। জায়গায় জায়গায় ঘোড়ার পা দেবে যাচ্ছে কাঁদার মাঝে। আরো ঘন হচ্ছে ঝোঁপঝাড়।
গভীর মনোযোগ দিয়ে চারপাশে কান পাতলেন ম্রাট। কিন্তু ঘোড়ার খুরের শব্দ আর মাঝে মাঝে তাদের ডাক ও নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। বিজাপুরিরা এখনো দূরে আছে তাই এগিয়ে আসা আক্রমণকারীদের শব্দ শুনতে পায়নি, কিন্তু খুব বেশি দূরেও নেই।
তলোয়ার উঁচু করে মাথা ঘুরিয়ে রাজাপুতদের উদ্দেশে প্রাচীন রণহুঙ্কার ছাড়ল অশোক সিং, অগ্রসর হও, সূর্য চন্দ্র আর আগুনের সন্তানেরা, সম্মান অথবা মৃত্যু। চারপাশে সৈন্যরা শুরু করে দিল চিৎকার, অস্ত্রের ঝনঝনানি, বাদ্য বাজানো। পুরো জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ল শব্দের মূৰ্ছনা, সাম্বা হরিণ সতর্ক হয়ে চিৎকার শুরু করল, গাছের আশ্রয়ে থেকে আতঙ্কে কিচিরমিচির করে উঠল কবুতব আর ঘুঘুর দল। সময় হয়ে গেছে, বন্দুকবাজরা ঘোড়া থেকে নেমে মাটিতে বসে অস্ত্র প্রস্তুত করে রাখল যেন অশ্বারোহী সৈন্যদের ধাওয়া খেয়ে কোন বিজাপুরি সৈন্য বের হবার চেষ্টা করলেই গুলি করা যায়। উত্তেজিত বক্ষ নিয়ে চারপাশে পড়ে থাকা পাতার দিকে তাকালেন শাহজাহান, ডান হাতের আঙুলগুলো সজোরে চেপে বসল তলোয়ারের বাটের উপর।
মুহূর্তের মাঝে চিৎকারে কান পাতা দায় হয়ে পড়ল। হঠাৎ করেই খানিকটা বাম পাশে নিচু ঝোঁপঝাড় পেরিয়ে পরিষ্কারভাবে দেখতে পেলেন বেশ কয়েকটি তাঁবু আর ঘোড়া। বন্দুকধারীরা, নিচে নেমে যার যার অবস্থানে চলে যাও। সবাইকে জানিয়ে দাও, এ আদেশ। বলে উঠলেন সম্রাট। অশ্বরোহীর দল নির্দিষ্ট সারি বজায় রেখে অগ্রসর হবে কেউ যাতে ঢুকতে না পারে। তার বাম এবং ডান পাশে অশোক সিংয়ের ঘোড়সওয়ারা, হাতে প্রস্তুত বর্শা থকথকে কাদার মাঝে যত দ্রুত সম্ভব ঘোড়া হোটালো সকলে।
খোলা জায়গায় বের হয়ে আসার সাথে সাথে শাহজাহান অনুভব করলেন যে কিছু একটা ছুঁয়ে চলে গেছে তাঁর গাল। কালো রঙের উড়ন্ত তীর এসে পড়েছে তার খুব কাছে কাদার মধ্যে। চারপাশে তাকিয়ে দেখতে পেলেন ধনুধারীকে লম্বা চুলঅলা এক তরুণ–দূরত্ব ত্রিশ মাইল ও হবে না, দাঁড়িয়ে আছে একটা তাঁবুর সামনে আর নার্ভাস ভঙ্গিতে ধনুকে দ্বিতীয় তীর ঠিক করে নিচ্ছে। মাত্র একটা পদক্ষেপে শাহজাহান বের করে আনলেন নিজের জোড়া স্টিলের ফলার ছুরি, বাতাসে ভাসিয়ে দক্ষ হাতে ছুঁড়ে মারলেন। ছুরির মাথা গিয়ে ঢুকে গেল ছেলেটার গলার মাঝে; হাঁটু ভেঙে বসে খামচে ধরে আঙ্গুলের ফাঁক গলে বের হওয়া রক্ত আটকাতে চাইল হতভাগ্য তরুণ।
শাহজাহানের চারপাশে অশ্বারোহীরা চটপট এগিয়ে গেল বিজাপুরিদের দিকে। কিন্তু বড়জোর জনা ত্রিশেক বিজাপুরি সৈন্য দেখা গেল। সম্রাট তাকাতেই দেখতে পেলেন অশোক সিং নিজের ঘোড়ার উপর খানিকটা উপুড় হয়ে আরেকজন ধনুকবিদের মাথা কাঁধ থেকে আলাদা করে ফেলল অস্ত্রের একটা মাত্র কোপ দিয়ে; কাদা মাটিতে মাখামাখি হয়ে গড়াতে গড়াতে কাটা মাথা গিয়ে থামল একটা গাছের শিকড়ের মাঝে। ধড়বিহীন শরীরটা খানিকক্ষণ সোজা হয়ে থেকে আস্তে করে কাত হয়ে পড়ে গেল কাদার মাঝে। অন্য বিজাপুরি সৈন্যরা জঙ্গলের আরো গভীরে পালিয়ে যেতে চেষ্টা শুরু করে দিল। এদিকে আবার বারুদের গন্ধ আর বন্দুকের কড়কড় আওয়াজ শুনে শাহজাহান বুঝতে পারেন যে, নিশ্চয়ই কয়েকজন নির্বোধ বিজাপুরি চেষ্টা করেছিল বন্দুকধারীদের সৃষ্ট দেয়াল ভেঙে পার হতে। ঘোড়াগুলোকে মুক্ত করে তাঁবুগুলোতে আগুন ধরিয়ে দাও। চিৎকার করে উঠলেন তিনি। কিন্তু প্রায় সাথে সাথে শুনতে পেলেন আরেকটা চিৎকার বিজাপুরি সৈন্য এখানে আমার কাছে।
ঘোড়া ঘুরিয়েই পরিষ্কার জায়গার দূরতম কোণে ত্রিশ-চল্লিশ জনের সশস্ত্র অশ্বারোহী দল দেখতে পেলেন শাহজাহান। নেতৃত্ব দিচ্ছে লম্বা এক সৈন্য। আবদ্ধ জায়গায় আটকে পড়া সৈন্যদের চেয়ে তারা নিশ্চয়ই আরো ভালোভাবে প্রস্তুত হবার সময় পেয়েছে, কিন্তু এখানে কাদা মাটিতে মাখামাখি হয়ে আছে রক্ত।
