সবাই এসে পৌঁছালে শুরু করলেন শাহজাহান। কিভাবে এ অনুপ্রবেশকারীদের চিরতরে শেষ করে দেয়া যায় সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি। বলপূর্বক শিকারি প্রাণীর মত আমাদের জমিতে উদয় হয়েছে, এখন তাদের মোকাবেলাও একইভাবে করব আমরা। ঠিক যেভাবে আমার পূর্বপুরুষেরা অনুর্বর ভূমিতে শিকার করতেন, আবদ্ধ জায়গায় আটকে ফেলে, তেমনিভাবে আমরাও শত্রুকে চারপাশ থেকে ফাঁদে আটকে ফেলব যেন পালাবার পথ না থাকে। গুপ্তচর মারফত প্রাপ্ত সংবাদে জানা গেছে যে শত্রুরা প্রায় পাঁচ মাইল দূরে দক্ষিণ দিকে ঘন জঙ্গল মত এলাকায় আছে। অশোক সিং, আমি চাই তুমি আমাদের অশ্বারোহীদের মাঝ থেকে শ্রেষ্ঠ পাঁচ হাজার জনকে নির্বাচন করে সবার পেছনে একজন করে বন্দুকবাজকে নেয়ার আদেশ দাও। এরা জঙ্গল ঘিরে ফেলবে–গুপ্তচর খবর দিয়েছে এটি প্রায় ছয় মাইল বিস্তৃত। একে অন্যের মাঝে চার গজ দূরত্ব রেখে অগ্রসর হবে তারা।
আপনি বিজাপুরি সৈন্যদেরকে অতর্কিতে আক্রমণ করতে চান?
প্রথম দিকে হ্যাঁ, তাই, কিন্তু আমাদের ফাঁদ পাতা শক্তিশালী হয়ে গেলে আমি চাই শত্রুরা জানুক যে আমরা আসছি। আমাদের সৈন্যরা গাছপালার ভেতরে প্রবেশ করার পর, যখন চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলব আমরা, আমি ইশারা করলেই চিৎকার চেঁচামেচি এমনকি বাদ্য বাজানো শুরু করবে মোগল সৈন্যরা। চারপাশ থেকে শব্দ পেয়ে শত্রুরা বুঝতে পারবে যে পালানোর পথ নেই, আমরা একসাথে তাড়া করব তাদের ঠিক যেমন শিকারে গিয়ে করে থাকি; এরপর শুরু হবে আক্রমণ। এর মাঝেও যদি কেউ আমাদের ব্যুহ ভেঙে বেরিয়ে যেতে সমর্থ হয় তাহলে জঙ্গলের কিনারে থাকা বন্দুকবাজ সহ অশ্বারোহী তার ভবলীলা সাঙ্গ করবে। পরিষ্কার হয়েছে পুরো ব্যাপারটা?
আমরা কি বন্দি নিব, জাহাপনা? জানতে চাইল অশোক সিং।
না, কোন বন্দি নয়। অশোক সিংকে বিস্মিত হতে দেখে শাহজাহান ব্যাখ্যা করে বললেন, তোমরা রাজপুতেরা যুদ্ধে কোন দয়া চাও না, মৃত্যু পর্যন্ত লড়াই কর। কিন্তু রাজপুতরা সম্মানীয় যোদ্ধা। যদি তারা কখনো আমার মিত্র না হয়ে শত্রু হয়–আশা করি কখনো এমনটা হবে না যে দয়া চাইবে আমি তাকে ছেড়ে দেব। কিন্তু এই বিজাপুরিরা আমার ভূমিতে রক্ত আর বিশৃঙ্খলা ছাড়া আর কিছুই আনেনি, আমার স্ত্রীর জীবনও কেড়ে নিয়েছে। আত্মসমর্পণের প্রতিটি সুযোগ নষ্ট করেছে আর তাই দয়া ভিক্ষা পাবার অধিকারও হারিয়ে ফেলেছে–যদি তারা তা চায়ও।
অশোক সিং কিছুই বলল না, কিন্তু কথা বলে উঠল আওরঙ্গজেব। আব্বা হুজুর, আক্রমণের সময় আমি সঙ্গী হতে পারি?
দ্বিধায় পড়ে গেলেন শাহজাহান। তিনি নিজেও যখন প্রথম যুদ্ধে গিয়েছেন তখন আরো খানিকটা ছোট বয়সী ছিলেন। ঠিক আছে। কিন্তু সত্যিকারের যুদ্ধে অংশ নিতে পারবে না।
আব্বা হুজুর…।
না! আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করব না। হয় তুমি নিরাপদ দূরত্বে থাকবে নতুবা আসবেই না সাথে।
এই ব্যাপারে না। আমি আপনাকে জানাতে চেয়েছি যে বিজাপুরিদেরকে ছাড় না দেয়ার আপনার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সঠিক হয়েছে। তারা এর যোগ্য নয়। আর বিশ্বাসঘাতকতার পুরো মূল্য পরিশোধ করতে হবে এখন।
ভালো। মাথা নাড়লেন শাহজাহান। বয়সে তরুণ হওয়া সত্ত্বেও নিজের দৃঢ় মতামত ব্যক্ত করতে কখনো পিছপা হয় না আওরঙ্গজেব। নিজের বিশ্বাসের প্রতি অটুট ভক্তি আছে তার, হোক সেটা ন্যায় অথবা অন্যায়। ভাইদের সাথে তর্কযুদ্ধের সময়ও নিজের সঠিক অবস্থান ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর সে, এক্ষেত্রে যদি প্রয়োজন হয় নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাতও ব্যবহার করে।
এক ঘণ্টা পরে, তিন মাইল অতিক্রম করে চলে এসেছে প্রধান সারি। যদি সবকিছু ভালয় ভালয় হয়–চারপাশে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি থামারও কোন লক্ষণ নেই–মধ্যাহ্নের মাঝেই ঘন জঙ্গলে পৌঁছে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে।
কাঁধের উপর দিয়ে পিছন ফিরে তাকালেন সম্রাট, দেখতে পেলেন খুব বেশি দূরে নেই আওরঙ্গজেব। টিউনিক আর রুপালি বুকবর্ম পরিহিত আওরঙ্গজেবের মুখমণ্ডলে গভীর মনোযোগের ছাপ। পিচ্ছিল পথে নিজের ঘোড়া ছোটানোতে মনোযোগ দিলেন শাহজাহান, চারপাশে কাদার ছিটে উঠতে লাগল, স্টিলের তৈরি ঘোড়ার শিরস্ত্রাণের ছিটে লাগল আর রত্নখচিত শিরস্ত্রাণের নিচে ম্রাটের মুখমণ্ডলেও পড়ল ছোট ছোট দাগ।
শীঘ্রই অবশ্য থেমে গেল বৃষ্টি, সামনে দক্ষিণ দিকে ঘন জঙ্গলের দেখা পেলেন শাহজাহান। এক ঘণ্টার চারভাগের এক ভাগ সময়ের মাঝেই রায় সিংয়ের নেতৃত্বে একদল সৈন্যও উদয় হল একই পথে।
সবকিছু ঠিক আছে, জাহাপনা। ভেজা শরীরে লম্বা চুল উড়িয়ে সংবাদ দিল গুপ্তচর। বিজাপুরিরা এখনো জঙ্গলের ভেতরে আর যতদূর আমি বলতে পারি যে আমাদের উপস্থিতি সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই তাদের। এখন বৃষ্টি থেমেছে তাই রান্না করার আগুন জ্বেলেছে– দেখুন।
পরিষ্কারভাবে দেখা গেল যে জঙ্গলের মাঝে বেশ কয়েক জায়গা থেকে হালকা ধোয়ার সর্পিল রেখা দেখা যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে বিজাপুরিরা একটা জায়গায় জড় হয়ে না থেকে পুরো জঙ্গলে ছড়িয়ে আছে। যদি তারা খেতে চায় তাহলে জলদি করাই ভালো–এটাই তাদের শেষ খাওয়া হতে চলেছে। নজর রাখো। সন্দেহজনক কিছু দেখতে পেলেই সাথে সাথে খবর পাঠাবে। নচেৎ ঘিরে ফেলার সাথে সাথেই জঙ্গল ঢুকে পড়ব আমরা।
