স্বপ্নের মাঝে দেখতে পেলেন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন দক্ষিণের বিশাল ফটকদ্বারে, বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছেন উজ্জ্বল সমাধিসৌধের দিকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও তিনি যেন নড়াচড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন, কেবল দেখতে পেলেন প্রভাতের আলোয় গোলাপি আলো ছড়াতে লাগল সাদা মার্বেল, তপ্ত দ্বিপ্রহরের সূর্যের নিচে হীরার মত উজ্জ্বল আর আঁধার ঘনিয়ে আসতেই হয়ে গেল বেগুনির মত মোলায়েম, মুক্তোরমতন গম্বুজের ছায়া চেপে ধরল চারপাশ থেকে। এরপর ভেলভেটের ন্যায় অন্ধকার চিরে লণ্ঠনের আলোয় জ্যোত্সলোকিত ফটকদ্বারে উদয় হল এক নারী। চেহারা না দেখতে পেলেও তিনি জানেন এ নারী মমতাজ….
ধীরে ধীরে বাগানের মাঝে দিয়ে হাঁটতে লাগলেন, নিঃশ্বাসের সাথে পাচ্ছেন চম্পা ফুলের ভারী সুবাস। অনুসরণ করে চললেন সমাধির দিকে প্রবাহিত হওয়া রুপালি জলের ধারার মার্বেল চ্যানেল। যতই তিনি এগোতে লাগলেন, জীবন ফিরে পেল মার্বেলের ঝরনার সারি। বাতাসে ছুঁড়ে দিতে লাগল উজ্জ্বল রত্নের ন্যায় জলবিন্দু। শাহজাহানের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে প্রবেশপথে অপেক্ষারত মমতাজের দিকে। মনেপ্রাণে চাইছেন আরো দ্রুত ছুটে যেতে কিন্তু কথা শুনছে না পা জোড়া, এমনকি নিঃশব্দে হাত উঁচিয়ে যখন মমতাজ ডেকে উঠলো তখনো তিনি ছুটতে পারেননি। মমতাজের মুখ এখনো ছায়া ঘেরা কিন্তু গলার চারপাশে থাকা রত্ন ছড়াতে লাগল আলো, কোমর আর কব্জিতেও রত্নের সমাহার। আর কয়েক কদম এগিয়ে গেলেই পত্নীর কাছে পৌঁছে যাবেন তিনি, কিন্তু হঠাৎ করেই কাঁপতে কাঁপতে হারিয়ে গেল নারী শরীরের অবয়ব।
হতাশ হয়ে সিঁড়ি বেয়ে ধূসর সমাধিতে উঠে গেলেন তিনি, স্পর্শ করলেন দুগ্ধ মসৃণ মার্বেল, ভাবলেন শীতলতার ছোঁয়া পাবেন। এর পরিবর্তে স্বচ্ছ পাথর হয়ে গেল সিল্ক আর মানব মাংসের ন্যায় উষ্ণ মমতাজের দেহ। মনে হল বহু বছরের প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে, পাথরে চেপে ধরলেন নিজের ঠোঁট। সমাধিসৌধ হয়ে গেল স্বয়ং মমতাজ। চারপাশে শুধু মমতাজের রত্নের সমাহার, যেগুলি তিনি পছন্দ করতেন জীবিত থাকাকালে। এমেরাল্ড, রুবি, অ্যামেথিস্ট, কোরাল ঠিক তেমনিভাবে আলোকিত হয়ে আছে সাদা মার্বেলের উপর ঠিক যেমনি এগুলো উজ্জ্বলতা ছড়াতো তার দেহে। শাহজাহান হাত বাড়িয়ে সমাধি আলিঙ্গন করতে চাইলেন, কিন্তু নিজের শয়নকক্ষের গাঢ় অন্ধকার ছাড়া আর কিছু নেই সেখানে।
উঠে বসে নিজের চারপাশে তাকাতে লাগলেন। হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন। বিছানা থেকে নেমে হেঁটে গেলেন গরাদবিহীন জানালার কাছে, চোখ রাখলেন অন্ধকারে, ঝাপসাভাবে দেখা যাচ্ছে তাপ্তি নদীর বহমান রেখা, মনে পড়ে গেল তিনি আগ্রা আর অস্থায়ী সমাধিতে শুয়ে থাকা মমতাজের কাছ থেকে বহু দূরে। চারপাশ থেকে চেপে ধরা এই বিরান ভূমিতে কেমন অদ্ভুত লাগল নিজেকে। মমতাজের মৃত্যুর আগে একত্রে প্রায়ই তারা গল্প করতেন যে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে কাশির যাবেন। আর কখনোই যেতে পারবেন না একসাথে সেখানে– কখনোই ঘুরে বেড়ানো হবে না বেগুনি ক্রোকাসের মাঠে অথবা তুষার ছাওয়া পর্বত থেকে আসা হিম বাতাস অনুভব করতে পারবেন না আর না পারবেন পদ্মেভরা হ্রদে নৌবিহারে যেতে। কিন্তু রাতের আধারের দিকে তাকিয়ে মমতাজ আর নিজের কাছে শপথ করলেন; খুব দ্রুত সমাপ্তি টানবেন এই যুদ্ধের আর স্বচক্ষে সমাধি নির্মাণের দেখভালের জন্য আগ্রা ফিরে যাবেন।
*
একটি ছোট্ট পাহাড়ের উপর তৈরি করা রক্তলাল বর্ণের তাঁবুর নিরাপদ শামিয়ানায় নিচে দাঁড়িয়ে চারপাশে নিচু অঞ্চল জরিপ করে দেখলেন শাহজাহান। এই তাঁবুই বর্তমানে তার কমান্ড সেন্টার হিসেবে কাজ করছে। বর্ষার আকাশ থেকে অবিশ্রান্ত ঝরে পড়ছে বৃষ্টিকণা। ভারী বৃষ্টির ফলে এরই মাঝে তাঁবুর চারপাশে কাদা জমে গেছে। তিন সপ্তাহ আগে শেষ হয়েছে খরার কাল। তারপর থেকেই ক্রমাগত বৃষ্টি। সব জায়গাতে মাটি এতটাই শুকিয়ে খটখটে হয়ে গিয়েছিল যে দ্রুত এত পানি শুষে নিতে পারেনি। কয়েক জায়গায় বন্যার তোড়ে ভেসে গেছে মানুষ আর পশু যারা কিনা কিছুদিন আগেই হাহাকার করেছে পানির জন্য। গাছে গাছে আর ঝোঁপঝাড়ে কুড়ি মেলতে শুরু করেছে সবুজ পাতা। ছোট ছোট কমলা গোলাপি রঙের জংলি ফুলও দেখা যাচ্ছে, গান গাইছে হাজারো পাখি। সর্বত্র শুরু হয়ে গেছে প্রাকৃতিক জীবনের জয়গান; এতসব কিছুর মাঝে বিষণ্ণ কেবল মোগল সম্রাট, প্রতিনিয়ত উদ্বেগে ভুগছেন শেষ এই পরাজয়ের আশংকায়।
প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও বোরহানপুর থেকে দ্রুত প্রস্থানের উদ্দেশ্যে নিচের সেনাবাহিনী নিয়ে এই পানিতে ডোবা মনুষ্যবর্জিত অঞ্চলে এসেছেন। কেননা বিশ্বাসযোগ্য সূত্র থেকে সংবাদ পাওয়া গেছে যে বিজাপুরি সৈন্যদের শেষতম বড়সড় একটি দল মাত্র দুই দিনের দূরত্বে একটি বন্য এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। এখন বহু চিন্তা-ভাবনার পর মমতাজের মৃত্যুর পর থেকে অসংখ্য নিঘুম রাতের মত আরো একটি রাত পার করে আক্রমণের পরিকল্পনা করেছেন শাহজাহান।
সেনাপতিদেরকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। চিৎকার করে পরিচারককে জানালেন। শীঘ্রই সকলে পৌঁছে গেলে পর ভৃত্যদের দেয়া নিচু টুলে বসে পড়ল সবাই শামিয়ানার নিচে। বৃষ্টি সত্ত্বেও অশোক সিং বরাবরের মতই স্বর্ণের কারুকাজওয়ালা মেরুন টিউনিক আর উপরের কোট গায়ে দিয়ে রঙিন আর অভিজাত বেশ নিয়ে হাজির হয়েছে। গাঢ় কৃষ্ণ বর্ণের গোঁফ পরিষ্কারভাবে আঁচড়ানো আর সুগন্ধিও মেখেছে তাতে। কিন্তু অন্য সেনাপতিদের অবস্থা কাদাতে একেবারে নাজেহাল। একপাশে দাঁড়িয়ে আছে আওরঙ্গজেব। পিতার কাছে আর্জি জানিয়ে শাহ সুজার পরিবর্তে এই অভিযানে এসেছে সে। কিন্তু শাহ সুজাকেই নিয়ে আসার ইচ্ছে ছিল শাহজাহানের। যদি না ছেলেটা তার সহিসের নির্দেশে অসমর্থ ঘোটুকী নিয়ে পোলো খেলতে গিয়ে কাঁধের হাড় নাড়িয়ে নিত।
