ইমারত সমূহ? তুমি কি বলতে চাও একের বেশি?
হ্যাঁ। আমাকে দেখাতে দিন জাহাপনা। নিজের বহুল ব্যবহৃত সবুজ চামড়ার থলে থেকে ভাঁজ করা এক বিশাল কাগজ বের করল উস্তাদ আহমাদ। খুলে টেবিলের উপর বিছিয়ে দিল কাগজটি।
আমি সবকিছুই একে এনেছি, যাতে করে আমার প্রস্তাব আপনি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেন। সমাধিস্তম্ভটি দুটি মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে থাকবে–বড়টি থাকবে সমাধির জন্য, এর চারপাশে ছোট আরেকটি ভিত্তিমূল থাকবে।
সমাধির দুই পাশে এই যে কাঠামোগুলোকে চিহ্নিত করেছ এগুলো কিসের?
পশ্চিম দিকে তিন গম্বুজওয়ালা একটি মসজিদ আর পূর্ব দিকে একই ধরনের একটি কাঠামো তীর্থযাত্রীদের বিশ্রামস্থান আর জবাব প্রতিধ্বনি–মসজিদের প্রতিধ্বনি হিসেবে পুরো সমাধিস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে। আমার নকশাতে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর দেখুন জাহাপনা, পুরো আবহকে সম্পূর্ণ করার জন্য দক্ষিণ-উত্তর দিকের প্রবাহের শেষ মাথায়, সমাধির ঠিক বিপরীতে একটি দক্ষিণাংশের ফটক দ্বার নির্মাণের প্রস্তাব করছি আমি। প্রবেশ করার সাথে সাথে দশণার্থীরা সমাধিস্থানকে এমনভাবে দেখতে পাবে যে, অনন্তহীন আকাশের বুকে ভাসছে এটি।
শাহজাহান তাকিয়ে রইলেন উস্তাদ আহমাদের ড্রয়িংয়ের দিকে। মনশ্চক্ষে আদর্শ একটি ভারসাম্যের চিত্র দেখতে পেলেন। এরপরেও সবকিছু নির্ভর করবে সমাধির নকশার উপরে, যেটি শুধুমাত্র একটি চক্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। সমাধি স্তম্ভের কী হবে?
নিজের ব্যাগ থেকে সিল্কে মোড়ানো একটি বান্ডেল বের করল স্থপতি। এটি দেখানোর আগে আমার চিন্তাগুলো আপনাকে বলার সুযোগ দিন। কয়েকদিন আগেই দিল্লিতে সম্রাট হুমায়ুনের সমাধি দর্শন করেছি আমি। অবাক হয়ে ভেবেছি কেমন হয় যদি পরলোকগত সম্রাজ্ঞীর স্মৃতিস্তম্ভটিও হুমায়ুনের মত অষ্ট স্তম্ভ পরিকল্পনা মত হয়? কিন্তু থাকবে আলোয় পরিপূর্ণ যেন একজন নারীর স্মৃতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়। জায়গাটা নিয়ে আমি একের পর এক পরীক্ষা করে দেখেছি; শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে ভিত্তি হবে ত্রিকোণাকার আর এর লম্বমান কোণাগুলো অষ্ট স্তম্ভের সৃষ্টি করবে। মধ্যিখানে অবস্থিত একটি অষ্টভুজ, চেম্বারের মাঝে শুয়ে থাকবে শবাধারটি আর চারপাশে আটটি পরস্পর সম্পূর্কযুক্ত চেম্বার থাকবে দুই লেভেলে। বাইরের সম্মুখ ভাগে থাকবে দুই তলা খিলানওয়ালা কুলঙ্গি। কিন্তু যথেষ্ট কথা হয়েছে জাহাপনা, আমাকে এবার দেখাবার অনুমতি দিন।
নিজের ব্যাগ খুলে কয়েকটি কাঠের ব্লক বের করে আনল উস্তাদ আহমাদ। এগুলো দিয়ে সাবধানে তৈরি করল একটি অষ্টভুজ কাঠামো। দেখুন জাহাপনা–চারপাশের প্রতি পাশে থাকবে প্রবেশপথ, যাদের উঁচু মাথা বাকি খোলা জায়গা খুঁড়ে ঊর্ধ্বে উঠে যাবে। মাটি থেকে গম্বুজের মাথার উচ্চতা হবে ২৪০ ফুট।
আর গম্বুজটি?
আমি বলব জোড়া গম্বুজের কথা। আবারো অনুমতি দিন বর্ণনা করার। এবার পকেট থেকে দুই টুকরো পালিশ করা অ্যালবাস্টার বের করল উস্তাদ আহমাদ। সম্রাট হুমায়ুনের সমাধির ভেতর এবং বাইরের গম্বুজ দুটোতে নিচু ড্রাম আছে। এখানকার ক্ষেত্রে আমি প্রস্তাব করছি এমন একটি অভ্যন্তরীণ গম্বুজ উঠে যাবে যেটি মাটি থেকে আশি ফুট উঁচু হবে আর বাইরের গম্বুজের আকৃতি হবে পেয়ারার মত, উপরে থাকবে সোনালি আভা। কথা বলতে বলতে উস্তাদ আহমাদ অভ্যন্তরীণ গম্বুজটিকে মডেলের অষ্টভুজ দেয়ালের মাঝে সাবধানে বসিয়ে চারপাশে বাইরের গম্বুজ বসিয়ে দিল। অবশেষে আমি পরামর্শ দেব চারটি ছবি, উন্মুক্ত মঞ্চ বসাতে, আপনার হিন্দু অনেক প্রতিবেশীর প্রাসাদে ব্যবহার করা হয়েছে, ঠিক যেন আংটির মাঝে প্রধান রত্নটির চারপাশে মুক্তোদানা।
সামনে রাখা মডেলটির দিকে হা করে তাকিয়ে রইলেন শাহজাহান। একেবারে নিখুঁত। এই লোকটা কেমন করে তার চিন্তাগুলোকে এত সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে যখন কিনা তিনি নিজেও নিজেকে বোঝাতে পারছিলেন না? সন্দেহ নিয়ে তাকিয়ে রইল উস্তাদ আহমাদ, বুঝতে পারছে না সম্রাটের নীরবতার অর্থ কী।
আমি সম্রাজ্ঞীর সমাধি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্যে তোমাকে আমার স্থপতি নিয়োগ করলাম। এখনি আগ্রাতে ফিরে যাও। যা দরকার–অর্থ উপকরণ, শ্রমিক সব দেয়া হবে তোমাকে।
জাহাপনা! আমার আরেকটি প্রশ্ন আছে। কোন উপকরণ ব্যবহার করব আমরা? বালিপাথর?
আশেপাশের ইমারতগুলোর জন্য সম্ভবত তাই, কিন্তু সমাধি সৌধের জন্য ব্যবহার করতে হবে বিশুদ্ধ সাদা মার্বেল–আমি ইতিমধ্যে আম্বারের রাজাকে জানিয়েছি যে তার অধীনস্থ মাকরানা খনির সবটুকু ক্রয় করব আমি; এছাড়া তাকে এও জানিয়েছি যেন নিরাপদে মার্বেলগুলো দুইশ মাইল দূরে আগ্রাতে পৌঁছে দেয়া হয়।
প্রথমবারের মত বিস্মিত দেখালো উস্তাদ আহমাদকে। এর আগে কেউই মার্বেল দিয়ে এত বিশাল কিছু নির্মাণ করেনি…ব্যয় তো…
খরচের কথা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। পৃথিবীতে স্বর্গ তৈরি করে দেবার প্রতিজ্ঞা করেছ, এটাই তোমার একমাত্র ভাবনা হবে।
কয়েক মাসের মাঝে এই রাতেই গভীর নিদ্রায় মগ্ন হলেন শাহজাহান। কেমন করে মৃত্যুপথযাত্রী মমতাজের শেষ ইচ্ছে পূরণ করবেন সেই উদ্বেগ দূর করে দিয়েছে উস্তাদ আহমাদের নিপুণ নকশা।
