কয়েকদিন পরে বোরহানপুরের প্রবেশদ্বার দিয়ে ভেতরে ঢুকে আলোকিত দরবার অঙ্গনে আসলান বেগকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পান। শাহজাহান, হাতে একটি চিঠি। জাহাপনা, গতকাল একজন অশ্বারোহী এটি নিয়ে এসেছে। মাননীয় জাহানারা এ চিঠির প্রেরক। আমি ভাবলাম আপনি নিশ্চয়ই আসার সাথে সাথে দেখতে চাইবেন এটি।
তৎক্ষণাৎ সীলমোহর খুলে ফেললেন সম্রাট।
‘আব্বাজান, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি আপনাকে জানাতে চাই যে, আমরা দশ সপ্তাহের ভ্রমণ শেষে নিরাপদে আগ্রা পৌঁছেছি আর ঠিক যেভাবে আপনি চেয়েছেন, যমুনার তীরে অস্থায়ী একটি সমাধিতে মায়ের মৃতদেহ রাখা হয়েছে। যতই আমরা শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম রাস্তার দুই পাশে মাথায় ধুলা মেখে ক্রন্দন করছিল সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জনতা। পুরো ভ্রমণ জুড়েই পারিপার্শ্বিক অবস্থা ছিল এরকম যেন দুঃখের নীল ছায়া গ্রাস করেছে আমাদের পুরো ভূমি। পরবর্তীতে সবিস্তারে সব জানিয়ে পত্র লিখব।‘
পত্রখানা পড়তে গিয়ে, আবারো নিদারুণ দুঃখের গাঢ় অন্ধকারে ছেয়ে গেল শাহজাহানের মন। সামরিক সফলতারও ম্লান হয়ে গেল মুহূর্তের মাঝে। যখন তিনি এবং মমতাজ আগ্রা থেকে যাত্রা করেছিলেন তখন ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি যে একত্রে থাকার দিন ফুরিয়ে এসেছে। পত্নীকে পাশে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েছিলেন তিনি। আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করার তার উচ্চাকাঙ্খও পূর্ণ হবে। আর এখন সম্রাট হিসেবে যত বড় বিজয় আসুক না কেন কী মূল্য আছে এসবের যখন একজন মানুষ হিসেবে তিনি হারিয়েছেন সব উষ্ণতা আর আনন্দ? একটা শীতল সমাধি নির্মাণের মাঝে দিয়ে কতটাই বা সান্ত্বনা খুঁজে পাবেন তিনি? তিনি মমতাজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন কখনোই হতাশায় ডুবে যাবেন না; কিন্তু এ প্রতিজ্ঞা কি রাখতে পারবেন?
১.৬ বোরহানপুরে স্বাগতম উস্তাদ আহমাদ
১.৬
বোরহানপুরে স্বাগতম উস্তাদ আহমাদ।
আপনার ডাক পেয়ে আমি সম্মানিত বোধ করছি, জাহাপনা। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছুটে এসেছি।
শাহজাহান তার সামনে মাথা নত করে রাখা লম্বা কৃশকায় শরীরের মানুষটিকে পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন। আশা করলেন যে অবশেষে এমন এক স্থপতিকে পেয়েছেন যে কিনা মমতাজের সমাধি নিয়ে তাঁর চিন্তাকে বাস্তবে মূর্ত করে তুলতে পারবেন। যে সমাধির কল্পনা তিনি মনশ্চক্ষে স্পষ্ট দেখলেও কেন যেন অসম্পূর্ণই থেকে যাচ্ছে। আমার শ্বশুর আসফ খান আমাকে পত্র মারফত জানিয়েছেন যে তুমি শাহ আব্বাসের জন্য অনিন্দ্যসুন্দর দালান নির্মাণ করেছ। যে কাজের ভার আমি দিতে চাই তা কোন পারস্যের শাহ আজ পর্যন্ত করেননি–আমার স্ত্রীর জন্যে এমন একটি সমাধি স্মৃতিসৌধ যেটির অতুলনীয় সৌন্দর্যের জন্য পরবর্তী প্রজন্মও সমানভাবে বন্দনা গাইবে এ যুগের বিস্ময় হিসেবে। এই চিন্তা কি তোমাকে ভগ্নোদ্যম করে দিয়েছে?
না। এই ধরনের একটি চ্যালেঞ্জ কোন সত্যিকার কলাকারই দূরে ঠেলে দিতে পারে না।
পরিষ্কার হয়ে গেল যে উস্তাদ আহমাদ কোন স্র মানুষ নন; কিন্তু এই ভালো, ভাবলেন শাহজাহান। অন্য যাদের সাথেই তিনি কথা বলেছিলেন–যেমন তাঁর প্রধান স্থপতি–সবসময় ব্যস্ত থাকত তিনি যা বলতেন তাতেই প্রশ্বস্তি আর সম্মতি জানাতে, নিজেদের থেকে খুব কম পরিকল্পনার কথাই জানাত তারা। হাত নেড়ে স্থপতিকে লম্বা নিচু টেবিলে বসার ইশারা করলেন সম্রাট। আমার জন্য কী ভাবনা আছে?
আমার মনে হয় পারস্যরা কীভাবে তাদের বাগান নির্মাণ করে, তা জানা আছে আপনার?
আমি চিত্রকলা আর ড্রয়িং দেখেছি। আমি জানি তারা এগুলোকে বলে পারিদায়েজা।
ঠিক তাই জাহাপনা, স্বর্গের উদ্যান। সমান্তভালভাবে দুটি পানির প্রবাহ ছুটে চলে উত্তর থেকে দক্ষিণে এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে, স্বর্গের পবিত্র নদীসমূহের অনুকরণে। পরলোকগত সম্রাজ্ঞীর সমাধিও এভাবেই স্থাপিত হবে।
কিন্তু ইতিমধ্যেই আমি পত্র মারফত জানিয়েছি যে আমি চাই সমাধি নির্মিত হবে বাগানের ঠিক মধ্যিখানে। তোমার কাছে নতুন কোন পরিকল্পনা নেই? নিজের কণ্ঠের বিরক্তি লুকিয়ে রাখতে পারেননি শাহজাহান। কিন্তু উস্তাদ আহমাদ কোন ভ্রূক্ষেপ করল না।
আছে, জাহাপনা। আমি বিশ্বাস করি যে সমাধি বাগানের মধ্যিখানে হবে না–এর পরিবর্তে অর্থাৎ বাগানকে ছাড়িয়েও সমাধি হয়ে উঠবে প্রধান দর্শনীয়। আমার পরিকল্পনুযায়ী যমুনার তীরে আপনি যে জমি ক্রয় করেছেন তা এ কাজের জন্য পুরোপুরি আদর্শ।
উস্তাদ আহমাদের দিকে তাকিয়ে ছবিটা ভাবতে চেষ্টা করলেন শাহজাহান। অশোক সিং পরামর্শ দিয়েছেন তিনি যেন তার পিতা আম্বারের রাজার কাছ থেকে এ জায়গাটা নিয়ে নেন। যমুনা নদীর তীরে ডান হাতি কোন নিয়েছে, আর এ স্থান দুর্গ থেকে একেবারে কাছে খুব বেশি হলে দেড় মাইল দূরত্ব। সমাধি অট্টালিকার প্রাচীর থেকে দেখা যাবে তাই নয় শুধুমাত্র, চাইলে নৌকাযোগেও আসা-যাওয়া করা যাবে। বলে চলল স্থপতি, নদীতীরে নিচে বাগান রেখে একটি মঞ্চে সমাধি নির্মাণের প্রস্তাব করছি আমি।
কিন্তু নদীতীর কি এর ওজন বইতে পারবে? আমার নির্মাতারা বলেছে যে মাটি বালিময় আর হালকা, এছাড়া নদীর গতিপ্রবাহও ভাঙনের কারণ হতে পারে।
এই ক্ষেত্রে যমুনা নদীর বাঁক স্রোতের শক্তি কমিয়ে দেয়। এছাড়া ইমারত সমূহকে ধরে রাখার জন্য তীরে আরো কিছু কাজ করতে হবে।
