ইতিমধ্যেই জড়ো হতে শুরু করেছে কৌতূহলী জনতার ভিড়। কী ঘটছে দেখার হাজারো চেষ্টা সত্ত্বেও শামিয়ানার একপাশ থেকে শুরু করে অন্যপাশে গোলাকার বৃত্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যের দল তাদেরকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে উত্তেজিত চিৎকার চেঁচামেচি। বহুদিন আগেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে–এমনকি তার হত্যাকাণ্ডের আগেই কতটা খামখেয়ালী হতে পারে জনগণ, কতটা অস্থির তাদের স্মৃতি আর বিশ্বস্ততা। অসংখ্যবার ঘোড়া ছুটিয়ে সৈন্যপ্রধান হিসেবে আগ্রা দুর্গে এসেছেন তিনি আর তাঁর পরিচারকেরা উল্লসিত জনতার উপর গইনার টুকরো স্বর্ণ ছুঁড়ে দিয়েছে, শাসকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রজারা। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা উৎসাহী মুখগুলোর মাঝে একজনও কি ভাবছে যে তাদের সত্যিকারের সম্রাট বিশ্বাসঘাকতার স্বীকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক ওপারে? হয়ত না। আনন্দ আর স্বল্প মূল্যের মণি প্রিয় শিশুদের মত, কোথা থেকে আসছে সে পরোয়া না করে সবাই নিমগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছে অনাগত প্রদর্শনী আর সম্ভবত আওরঙ্গজেবের অকাতরে দান করা অর্থের জন্য।
কোন পরিকল্পনা আঁটছে আওরঙ্গজেবে? খুব বেশি সময় লাগল না উত্তর পেতে। নিম্ন অববাহিকা থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো বিশাল বড় একটা, সমান্তরাল তলা বিশিষ্ট বজরা; এমন নকশা আর কখনো দেখেননি শাহজাহান। যে ডজনখানেক মাঝি বজরার দাঁড় বাইছে, তাদেরকেও চিনতে পারলেন শাহজাহান। সাধারণত দুর্গের দেয়ালের মাঝে সম্রাটের ব্যবহারের জন্য নোঙ্গর করে রাখা নৌকার মাঝি ছিল এরা। পড়ন্ত দিনের সূর্যের আলোয় চকচক করছে শূন্য পিঠ। বহুকষ্টে দাঁড় বাইছে লোকগুলো, শুধুমাত্র যে ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ করতে হচ্ছে তা নয়, নৌকার ঠিক মাঝখানে লম্বা, ভারি কিছু একটা ঢেকে রাখা হয়েছে অয়েল ক্লথে মুড়ে। এতটাই ভারী যে পানির মাঝে অনেকটাই ডুবে গেছে নৌকাটা। তীর থেকে বেশ দূরে থাকতেই সৈন্যরা দৌড়ে গিয়ে মাঝির ছুঁড়ে দেয়া রশি ধরে ফেলে নৌকাটাকে টেনে তুলে আনল কর্দমাক্ত তীরে।
এবার অন্য সৈন্যরাও উঠে গেল নৌকাতে। একজন ছুরি বের করে ভারী জিনিসটাকে জায়গা মত আটকে রাখা মোটা দড়ি কাটতে শুরু করে দিল। কয়েক মিনিট লাগল দড়িটা কাটা শেষ হতে আর অন্যরা সবাই মিলে অবশেষে অয়েল ক্লথটাকে সরিয়ে ফেলল। এতক্ষণ কি লুকিয়ে রাখা হয়েছিল দেখতে পেয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল শাহজাহানের। বারোটি পান্না খচিত পিলার ধরে রাখা গম্বুজঅলা ছাদের সবুজ রঙ জ্বলতে লাগল সূর্যের আলোয়। রত্মখচিত ময়ূর আর পিলারের উপরকার রুবি, হীরা, পান্না আর মুক্তাখচিত গাছগুলো দেখাচ্ছে অবিশ্বস্য রকমের উজ্জ্বল।
এক মুহূর্তের জন্য গর্বিত হয়ে উঠে শাহজাহান ভুলে গেলেন নিজের সব সমস্যা। তিনি, আর তিনি একাই সৃষ্টি করেছেন এই অনিন্দ্য সৌন্দর্য, সাম্রাজ্যের সম্পদ থেকে নিজে পছন্দ করে দিয়েছেন শ্রেষ্ঠ সব রত্ন। রাজা সলোমানের পর থেকে আর কোন শাসকের কাছে এমন একটি সিংহাসন নেই…নিজের রাজত্বের শুরুতে প্রথম যখন চিন্তাটা এসেছিল মাথায়, তখনো তিনি বেশ তরুণ ছিলেন আর অন্তর ছিল আশায় পরিপূর্ণ। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন আবার ফিরে গেলেন সেসব দিনে, যেন সামনে এখনো বাকি আছে গৌরবময় দিনগুলো, পাশে আছে তাঁর পরিবার, কিন্তু তারপরই ঝাপসা হয়ে গেল সব অনুভূতি। ভেঙে পড়েছে পরিবার। এই সিংহাসন আর তাঁর নয়। এই কুচক্রী পুত্র চুরি করে নিয়েছে তার কাছ থেকে। তাকিয়ে দেখলেন দুজন দাঁড়ী মিলে নিচু করে ধরল বজরার সামনের অংশটা। নিশ্চয় এই উদ্দেশ্যেই বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে নৌকাটা। সিংহাসনের পেছনে একদল সৈন্য দাঁড়িয়ে ধাক্কা দেয়া শুরু করল। অতিধীরে আর বহুকষ্টে ইঞ্চি ইঞ্চি করে এটি সামনে এগোতে লাগল। অবশেষে নৌকা থেকে তীরের কাছাকাছি আসার পর সিংহাসনটাকে দুপাশে রোলার লাগান কাঠের মঞ্চে রাখা হলো দেখতে পেলেন শাহজাহান। এরপর বিশ মিনিট ধাক্কা দেবার পর অবশেষে শামিয়ানার নিচে এনে রাখা হল সিংহাসন, এটির চকচকে, উজ্জ্বল, সম্মুখভাগ রাখা হয়েছে সরাসরি দুর্গের দিকে মুখ করে।
সূর্যাস্তের দিকে, মাখদুমী খান যেমনটা বলেছিল… দিগন্তের দিকে তাকিয়ে শাহজাহান দেখতে পেলেন আর খুব বেশি দেরি নেই সূর্যি মামার পাটে যেত। মনে হল তার মনের কথা বুঝতে পেরেই মুহূর্তখানেক পরে একসাথে বেজে উঠল বাদ্যের বাজনা, মনে হল দুর্গের কাছাকাছি কোন প্রাচীর থেকে। এরপর বিশাল রুপার দাঁড়ের রাজকীয় বজরা–তাঁর নিজের বজরা–ঠিক সেই দিক থেকে উদয় হল যেখান থেকে এসেছিল সিংহাসন বহনকারী বজরাটা। পুনরায় রং করে কারুকাজ করা হয়েছে, সামনে আর পেছনে উড়ছে মোগলদের সবুজ ব্যানার আর ডেকের উপর ছড়িয়ে রাখা হয়েছে গোলাপের পাপড়ি, মৃদু বাতাসে উড়তে লাগল গোলাপি তুষার কণার ন্যায়। জলযানের ঠিক মাঝখানে বড়সড় একটা সবুজ ছাতার নিচে সূর্যের তাপ থেকে বাঁচতে দাঁড়িয়ে আছে আওরঙ্গজেব। পরনে ক্রিম রঙা আলখাল্লা আর গলায় মুক্তার লম্বা মতো। মাথার উপরে সাদা বকের পালকওয়ালা রাজকীয় পাগড়ি আর আঙ্গুলে চমকাচ্ছে মণি-রত্ন। নিজেকে যেভাবে স্থির আর অচঞ্চল রেখেছেন, উন্নত শিরদাঁড়া থেকে শুরু করে উদ্ধত চিবুক সবকিছুতেই প্রকাশ পাচ্ছে গর্বিত আর ক্ষমতার আভা।
