পিছনে অনুসরণ করে আসছে আর দুটি নৌকা। ত্রিশ জনের প্রায় প্রত্যেকে, জমকালো পোশাক পরিহিত সভাসদকে চিনতে পারলেন শাহজাহান। কয়েকজন আরঙ্গজেবের সেনাপতি আর অনুসরণকারী অভিজাত বর্গ; কিন্তু তাদের মাঝে এমন কয়েকজন আছে যাদেরকে তিনি তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত ভাবতেন। এমনকি কয়েকজন তো অবরোধের মুখেও দুর্গের প্রতিরক্ষা কাজে সাহায্য করেছিল। আওরঙ্গজেব তাদের সবাইকে কিনে নিয়েছে…নাকি তারা সাধারণভাবেই নিয়তির কাছে মাথা নত করে ফেলেছে?
দৃশ্যটা দেখে দুঃখিত শাহজাহান জালি পর্দা ছেড়ে চলে এলেন কক্ষের মাঝে, নিজের ছোট্ট শিকারি চিতাটা যেমন করে অশান্তভাবে খাঁচার ভেতরে আস্ফালন করে ঠিক তেমন বোধ করছেন এমন–পার্থক্য শুধু এই যে চিতাটা মাঝে মাঝে মুক্ত হয়ে দৌড়ে বেড়াবার স্বাধীনতা পায়। হয়ত আর কখনো মুক্তি পাবেন না তিনি…কিন্তু জানেন যে যা দেখবেন বেদনা শুধু বাড়বে। আবারো ঢাকের বাড়ি আর দামামার ধুমধুম আওয়াজে ফিরে গেলেন জালি পর্দার কাছে।
নৌকা থেকে নেমে রুপার দেহবর্ম পরিহিত আওরঙ্গজেব উত্তর পার্শ্বে বারো জন দেহরক্ষী নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সিংহাসনের দিকে। সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রেখে অনুসরণ করে চলেছে সভাসদদের দল। সিংহাসনের কাছে পৌঁছে, মুহূর্তের জন্য থেমে গেল আওরঙ্গজেব, মুখ তুলে তাকাল আত্যজ্বল শামিয়ানের দিকে। এরপর সোনালি সিঁড়িতে পা দিয়ে উঠে ঘুরে তাকাল, বসল। সভাসদেরাও সার বেঁধে দাঁড়াল তার সামনে। তারপর একটামাত্র ঢাকের বাড়ির সাথে সভাসদবৃন্দ ভূমি শয়ান হয়ে হাত দুপাশে ছড়িয়ে, মাটিতে মুখ ডুবিয়ে প্রাচীন প্রথানুযায়ী কুর্নিশ করল। আবারো বাজনার শব্দে উঠে দাঁড়াল তারা। এরপর আগে খেয়াল করেননি শাহজাহান এরকম এক দাঁড়িঅলা লোক এগিয়ে এলেন সামনে। সাদা আলখাল্লা আর কালো পাগড়ি পরিহিত লোকটাকে দেখে মনে হল মোল্লা। আওরঙ্গজেবের এক ইশরাতে সভাসদদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে আবৃত্তি করতে লাগলেন। শাহজাহান সাথে সাথে বুঝতে পারলেন নতুন মোগল সম্রাটের রাজত্বকালের ঘোষণা স্বরূপ প্রার্থনা দোয়া তেলোয়াত করছেন মোল্লা:
আল্লাহর আর্শিবাদ ধন্য হয়ে এবং অসীম শক্তিশালী চেঙ্গিস খান ও তৈমুর, মহান বাবর এবং হুমায়ুন, আকবর এবং জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের উত্তরাধিকারী হিসেবে…।
নিজের নাম শোনার সাথে সাথে ক্ষণিকের জন্যে দুচোখের পাতা শক্তভাবে বন্ধ করে রইলেন শাহজাহান।
…আমি ঘোষণা করছি যে, আওরঙ্গজেব হলেন হিন্দুস্তানের নতুন সম্রাট। তাঁর গৌরবোজ্জ্বল রাজত্বকালের আলোক শিখা ছড়িয়ে পড়ক জনতার উপর যেন তারা এবং তাদের উত্তরসূরীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাঁর নামে জয়ধ্বনি করবে আর সূর্যের আলোর মত তাঁর স্মৃতি পৃথিবী থেকে দূর করে দেবে সকল অন্ধকার। দীর্ঘজীবী হোক মহান শাসক।
মোল্লার সুমধুর কণ্ঠে নিজের ঘোষণা শেষ হতেই ডান হাত তুলল আওরজেব। সিংহাসনের পেছন থেকে এগিয়ে আসতে লাগল কর্চিদের সারি। সকলের হাতের ট্রে উপচে পড়ছে। চকচকে ভাব দেখে শাহজাহান অনুমান করে নিলেন যে তারা কী বহন করছে সোনার রুপী, জনতার উদ্দেশে নতুন সম্রাটের পক্ষ থেকে ঐতিহ্যবাহী উপহার। আওরঙ্গজেব মাথা নাড়াতেই, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল কর্চিরা। অর্ধেক এগিয়ে গেল ডান দিকে, আরেক দল বাম দিকে অপেক্ষারত দর্শনার্থীদের দিকে। সৈন্যদের কর্ডনের কাছে পৌঁছে বাতাসে ছুঁড়ে মারল ট্রে-র জিনিসগুলোকে, ফলে উপস্থিত জনতার উপর শুরু হল মুদ্রাবৃষ্টি, বন্য হুংকারে ছোটাছুটি শুরু করে দিল মানুষ, নতুন সম্রাটেরা দেয়া উপহার সুলভ মুদ্রার ভাগ পাবার জন্য। এরই মাঝে আরো কর্চিরা এসে পৌঁছল, সাথে নিয়ে এলো সিল্কের আলখাল্লা, সাধারণত সম্মান দেখানোর উদ্দেশ্যে যা কাউকে দান করা হয় আর ছোট ছোট থলে, কোন সন্দেহ নেই এগুলো ভর্তি অর্থ আর রত্নপাথর। একের পর এক সিংহাসনের সামনে এসে সম্রাটের সামনে হাঁটু গেড়ে বসা অভিজাতদের হাতে একেকটা করে থলে তুলে দিতে লাগল আওরঙ্গজেব। শাহজাহান চোখ সরু করে তাকিয়ে রইলেন লম্বাদেহী খলিলউল্লাহ খানকে এগিয়ে যেতে দেখে। আওরঙ্গজেব তাকে উপহার হিসেবে দিল একটি তলোয়ার, শেষ বেলার সূর্যের আলোতে চকচক করতে লাগল মণি-মুক্তি খচিত খাপ। ষড়যন্ত্রে অংশ নেবার পুরস্কার।
আওরঙ্গজেবের কাজ শেষ হতে কমে যেতে লাগল দিনের আলো। নদীর তীরে একটু পর পর জ্বলন্ত মশাল জ্বালানোর জন্য ছোটাছুটি শুরু করে দিল পরিচারকেরা। দুর্গের প্রাচীরের গুলি করার ফোকর থেকে পাওয়া গেল আতশবাজি পোড়ানোর হুশহুম শব্দ। আওরঙ্গজেবের মাথায় উপরের আকাশে জ্বলে উঠল সবুজ আর সোনালি তারা। অদেখা ঢাক বা বাদ বেজে উঠল। হাতে লণ্ঠন নিয়ে ভৃত্যের দল অপেক্ষা করতে লাগল সম্রাট ও তার সভাসদদের নৌকায় তুলে নেয়ার জন্য। রাজকীয় বজরাতে এত আলো জ্বলে উঠল যে চারপাশে যমুনার কালো পানি সোনালি আভা ছড়াতে লাগল।
বিস্মিত শাহজাহান ভাবতে লাগলেন যে এতসব আয়োজনের আসল মানেটা কী। দুর্গের ভেতরে ব্যক্তিগত দর্শনার্থীদের হল ছেড়ে নদীর তীরকে কেন আওরঙ্গজেব বেছে নিল নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করার মঞ্চ হিসেবে? এর এককটাই মাত্র উত্তর…আওরঙ্গজেব এমন একটা স্থান বেছে নিয়েছে যা দুর্গে তার পিতার আবাসস্থলের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত, কেননা সে চেয়েছে, যেমনটা মাখদুমী খান ইঙ্গিত করেছিল, পিতাকে দেখাতে যে সত্যিকারের সম্রাট এখন কে। জালির মাঝে দিয়ে শেষবারের মত তাকিয়ে শাহজাহান দেখতে পেলেন তাঁর পুত্র এখনো স্থির আর খাড়া হয়ে বসে আছে সিংহাসনে, তাকিয়ে আছে সরাসরি তাঁর দিকে, যেন সে জানেই যে পিতা তাকিয়ে আছেন আর অবশেষে এত বছর পরে পিতার পূর্ণ মনোযোগ পেয়েছে সে।
