সম্রাটের কাছ থেকে আরো কয়েকটা আদেশ নিয়ে এসেছি আমি। শাহজাহানের চিন্তায় বাধা দিল মাখদুমী খান। আপনার কর্মচারীরা ইতিমধ্যেই রাজকোষের চাবি দিয়ে দিয়েছে; কিন্তু আপনার, ব্যক্তিগত রত্ন আমাকে দিয়ে দিতে হবে যেহেতু এরকম অবসর জীবনে আর এগুলো প্রয়োজন হবে না আপনার। বিশেষ করে, মহান তৈমুরের সোনার আংটি আছে আপনার কাছে। আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন আপনার সব রত্নের মাঝে আংটিটি আছে কিনা, তা যাচাই করে নেয়া হয়।
না! আমি কিছুই দেব না–এমনকি ছোট্ট একটা হীরা বা মুক্তাও না। আর যদি আমার পুত্র তৈমুরের আংটি চায় তাহলে তাকে নিজে এসে আমার আঙুল থেকে কেটে নিতে হবে! আত্মপ্রত্যয়ে জ্বলে উঠল শাহজাহানের চোখ জোড়া, ডান হাতের মাঝখানের আঙ্গুলের উপর চেপে ধরলেন বাম হাত, মধ্যমাতে পরে আছে গর্জে ওঠা বাঘ খোদাইকৃত ভারী আংটিটা। আমার পুত্রকে জানিয়ে দিও যে আইনগত সম্রাটের কাছ থেকে এমন চুরি করাতে সে মামুলি একটা চোর বৈকি আর কিছু নয়। আর নিজেকে যতটা সৎ মুসলিম হিসেবে দাবি করে তার নিশ্চয়ই জানা আছে যে এ জীবনে না হলেও পরবর্তী জীবনে এর ন্যায্য পাওনা পাবে সে।
আমি আপনার প্রত্যাখানের কথা আপনার পুত্রকে জানিয়ে দিয়ে পরবর্তী নির্দেশও জেনে নেব।
তাঁর প্রতি উজবেক সেনার অভিব্যক্তিতে আলোচনা শুরু হবার পূর্বের তুলনায় একটু বেশিই শ্রদ্ধার ভাব লক্ষ্য করলেন শাহজাহান। উঠে দাঁড়ালেন, সচেতন আছেন যে বন্দি হওয়া সত্ত্বেও রাজকীয় ক্ষমতার শৌর্য এখনো বহন করছেন তিনি, যা পিতামহ আকবর বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন টিকিয়ে রাখতে।
একটু দ্বিধা করলেও, মোলায়েম স্বরে বলে উঠল সুবাদার, আপনি ভাবছেন আপনি এখনো সম্রাট কিন্তু আজ সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের দিকে যদি নিজের ছাদ থেকে তাকিয়ে দেখেন, তাহলে বুঝতে পারবেন যে সময় আর ঘটনা প্রবাহ কাউকে ছাড় দেয় না।
তুমি কী বুঝাতে চাইছ?
কিন্তু পরিষ্কারভাবে বোঝা গেল যে যা বলার ছিল বলে ফেলেছে মাখদুমী খান। কক্ষ ছেড়ে বের হয়ে যাবার আগে প্রায় না দেখার মত করেই মাথা নত করে কুর্নিশ করল উজবেক সেনাপ্রধান।
পুরো দুপুর ধরে অসম্ভব হট্টগোল হল শাহজাহানের আবাসস্থলের ওপারে যমুনার তীরে। প্রথম দিকে কোন মনোযোগ দিলেন না তিনি। সমস্ত চিন্তা জুড়ে রইল মৃত পুত্রের কথা, আর জীবিত দৌহিত্র আর পুত্র যারা বেঁচে থাকলেও গোয়ালিওরে অন্তরীণ। সিপিরকেও কি পোস্ত খাওয়াবার আদেশ দিয়েছে আওরঙ্গজেব? মনে হল এ সময় জাহানারা সাথে থাকলে ভালো হত… মেয়েটার সদুপদেশ আর সহজাত বোধের বড় বেশি প্রয়োজন এসময়, যখন অন্ধকার এসে ঢেকে ফেলেছে পুরো পরিবারকে। এমন একটা কারণে সবকিছু বিষবাষ্পে দূষিত করে ফেলেছে যা তিনি এখনো ভাবতে পারছেন না। উচ্চাকাঙ্খ অন্য জিনিস–এর ফলেই মোগলরা প্ররোচিত হয়েছিল মহান আর ভয়ানক সব কাণ্ড ঘটাতে কিন্তু আক্রোশ আর প্রতিহিংসাপরায়ণতা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।
দারার দ্বিখণ্ডিত গলিত মস্তক পাঠানো ইচ্ছেকৃত দ্বেষ। কেন আওরঙ্গজেব তাঁকে এতটা ঘৃণা করে আর এসবের সূচনাই বা কবে থেকে? যখন দারার ভূগর্ভস্থ কক্ষ দেখতে যাবার তাঁর আদেশ অমান্য করেছিল তখন কি ইতিমধ্যেই পিতার প্রতি এত বিষিয়ে উঠেছিল তার মন? সে সময় তিনি এতটাই ক্রোধান্বিত ছিলেন যে পুত্রের অদ্ভুত আচরণের পিছনের কারণ সম্পর্কেও ভেবে দেখেননি… সে কি সত্যিই ভেবেছিল যে দারা তাকে খুন করতে চাইছে আর তার পিতাও এতে সায় দিচ্ছে। নিশ্চয় না। কিন্তু আওরঙ্গজেবের সন্দেহ আর নিরাপত্তার অভাব বোধ দিনে দিনে আরো ঘনীভূত হয়েছে যা শাহজাহান কখনো চিন্তাই করেননি। দারার প্রতি দুর্ব্যবহার আর তাকে হত্যা করাটা ছিল আওরঙ্গজেবের বহুদিনের হিসেব। ঠাণ্ডা মাথায়, শীতল হৃদয়ে প্রতিশোধ নিয়েছে পিতা আর ভাইয়ের প্রতি যাকে সে অবজ্ঞা আর ঘৃণা করত। এটি ইশারা করছে যে তার পথে হুমকী হয়ে ওঠা সকলকে খতম করে ফেলবে আওরঙ্গজেব। প্রথম দারা, তারপর মুরাদ। এরপরে কার পালা? হয়ত শাহ সুজা–যেখানেই সে থাকুক না কেন–আর তার দৌহিত্র সুলাইমান। সামুগড়ের যুদ্ধের পর দারা আগ্রা ছেড়ে চলে যাবার পর সুলাইমানকে নিয়ে অনেকটা আশা করেছিলেন শাহজাহান। অপেক্ষা করেছেন শুনতে পাবেন যে সেনাবাহিনী নিয়ে আগ্রাতে ফিরে এসেছে সে কিন্তু কিছুই হয়নি। দারাকে হত্যা করার মাধ্যমে আওরঙ্গজেব একটুও দ্বিধা করেনি তার জ্যৈষ্ঠ পুত্র, সিংহাসনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীকে শেষ করে দিতে। তাই পরিষ্কারভাবে যুদ্ধের ময়দানে হোক অথবা ভাড়াটে গুপ্তঘাতক দিয়েই হোক, সুলাইমানের তাঁবুতে আঘাত করতে পিছপা হবে না সে। একভাবে না একভাবে নিজের পথ ঠিকই করে নেবে আওরঙ্গজেব।
গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে রইলেন শাহজাহানপুরোটাই তিক্ত আর অন্ধকার–শেষপর্যন্ত বাইরের চেঁচামেচি আর হট্টগোল এতটাই বেড়ে গেল যে অবহেলা করার উপায় রইল না। ছাদে যাবার কোন ইচ্ছেই নেই তাঁর যেখান থেকে তাঁকে হয়ত দেখা যাবে। কিন্তু খোদাই করা জালি পর্দার ফাঁক দিয়ে কী ঘটছে বেশ ভালোই দেখতে পাবেন। প্রায় দুইশ ফুট দূরে যমুনার অপর দিকে সৈন্যরা বড়সড় সবুজ রঙের সিল্কের একটি মঞ্চের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে, কিনার পুরো সোনালি। মঞ্চটা দাঁড়িয়ে আছে সবুজ আর সোনালি ডোরা কাটা, চিকন কয়েকটা থামের সাহায্যে। প্রতিটি কোনাতে কাপড়কে টানটান করে বেঁধে রাখার জন্য যে সোনালি দড়ি ব্যবহার করা হয়েছে তাতে সেলাই করে দেয়া হয়েছে উজ্জ্বল রত্ন। শামিয়ানার নিচের ভূমিতে সৈন্যরা পেতে দিয়েছে। বহুমূল্যবান কার্পেট; এছাড়া নদী আর মঞ্চে মাঝামাঝি রাস্তার উপর সারিবদ্ধভাবে আরো কার্পেট পেতে দেয়া হয়েছে যেন মসজিদে জায়নামাজ পাতা হয়েছে। মঞ্চের উভয় পাশে হামাগুড়ি দিয়ে বসে থাকা বাঘের আকৃতির আর প্রায় সেই সাইজেরই ধূপদান জ্বালানো হয়েছে। বাঘগুলোর ভোলা মুখের চোয়াল থেকে এরই মাঝে বের হতে শুরু করেছে সাদা ধোঁয়ার চিকন একটি রেখা। ভেতরে নিশ্চয়ই সুগন্ধি স্ফটিক জ্বালানো হয়েছে।
