হঠাৎ করেই সেনাপতির শব্দের কোন একটা অংশ আঘাত করল শাহজাহানকে। অন্তত এটা বলল, কেন শুধুমাত্র আওরঙ্গজেবের কথা বললে তুমি? বিদ্রোহে তার মিত্র, আমার পুত্র মুরাদের কী খবর?
অবাক হয়ে গেল মাখদুমী খান। আপনি জানেন না?
কীভাবে কিছু জানবো এরকম বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বাস করলে?
আমি ভেবেছি হয়ত কোন পরিচারক আপনাকে জানিয়েছে… আগ্রাতে ফিরে আসার খানিক পরেই আওরঙ্গজেব শাহজাদা মুরাদকে বন্দি করার আদেশ দিয়েছে।
কোন অভিযোগে?
গুজরাটে আপনার সুবেদার থাকাকালীন অর্থমন্ত্রী আলী নাকীকে হত্যা করেছিলেন তিনি। আওরঙ্গজেবের মতে, এটি মানুষ এবং আল্লাহ উভয়ের চোখেই অপরাধ, আর নিজ ভাই হওয়া সত্ত্বেও এমন অপরাধের শাস্তি না দিয়ে পারেন না তিনি।
প্রায় হেসেই ফেলছিলেন শাহজাহান। তিনি ভেবে ভেবে সারা হচ্ছিলেন যে প্রতিদ্বন্দ্বীকে কীভাবে সড়াবে আওরঙ্গজেব তার কপটতা শ্বাসরুদ্ধকর আওরঙ্গজেব নিজে দারার হত্যাকাণ্ডের আদেশ দেয়ার পর ভণিতা করছে ভাইয়ের হাতে একজন কর্মকর্তা খুন হওয়ায় বিস্মিত সে। মুরাদ বাধা দেয়নি?
তিনি বুঝতেই পারেননি যে কী ঘটছে, যখন বুঝেছেন বহু দেরি হয়ে গেছে। আওরঙ্গজেব তাকে তার নিজের তাঁবু থেকে এক মাইল বা সেরকম দূরত্বে নিমন্ত্রণ করেছিলেন একত্রে আনন্দ উদযাপনের জন্য। নিজে কোন রকম পানাহারের বিরুদ্ধে কঠোর হলেও ভাইকে নির্দেশ দিয়েছেন ইচ্ছেমত পান করতে। এরপর এক দেহপসারিণীকে ডেকে পাঠিয়েছেন ভাইকে মালিশ করে দেহসুখ দিতে। নগ্ন অবস্থায় প্রহরী বিহীন ভাইয়ের শিবিরে থাকাকালীন আওরঙ্গজেবের প্রহরীরা এসে বন্দি করেছে শাহজাদা মুরাদকে।
একা, নির্বোধের মত দারার ভূগর্ভস্থ কক্ষে যেতে ভয় পেয়েছিল আওরঙ্গজেব। একইভাবে মুরাদও কেন সাবধান হল না একাকী আওরঙ্গজেবের তাঁবুতে যেতে, এটা জানার পরেও যে বড় ভাইকে খুন করেছে আওরঙ্গজেব, আপন মনে ভাবলেন শাহজাহান। মুরাদের নিজের সৈন্যরা নিশ্চয় কী ঘটেছে জানার পর তাকে বাঁচাতে চেয়েছিল?
এক্ষেত্রে মহান জাহাপনা অসম্ভব চতুরতার পরিচয় দিয়েছেন। উজবেক লোকটার চেহারায় এমন এক হাসি দেখা গেল বোঝা গেল যে আওরঙ্গজেবের বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করছে সে। শাহজাদা জানতেন যে সকাল হবার আগপর্যন্ত তার ভাইকে খোঁজ করা হবে না। আর আগেই নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন যেন একই রকম দেখতে চারটি হাতি প্রস্তুত করে রাখা হয় ও পর্দা দিয়ে ঘিরে রাখা হবে হাওদাগুলো। বেশিরভাগ তাঁবুতে সবাই ঘুমিয়ে আছে, এমন সময় তিনি শাহজাদা মুরাদকে মদের ঘোরে আচ্ছন্ন করে বসিয়ে দেন একটা হাওদাতে। এরপর আওরঙ্গজেব ভাইদের যেসব সৈন্যদেরকে অর্থ ও উন্নতির লোভ দেখিয়েও নিজের দলে টানতে পারেনি তারা যেন মুরাদকে অনুসরণ করতে না পারে এই উদ্দেশে অন্ধকার থাকতেই প্রতিটি হাতিকে কম্পাস ধরে ভিন্ন ভিন্ন দিকে পাঠিয়ে দেয়া হয় প্রহরী সহ। বস্তুত পক্ষে, মুরাদকে বহনকারী হাতি চলে যায় দক্ষিণ দিকে, গোয়ালিওর দুর্গে। যতক্ষণে তার বিশ্বস্ত কয়েকজন প্রকৃত ঘটনা জানতে পারে ততক্ষণে পিছু নেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে আর তারা তাই সহজেই স্বীকার করে নেয় পরাজয়।
গোয়ালিওর… চূড়ার উপরে থাকা বিশাল দুর্গ, উজ্জ্বল রঙের দেয়াল আর অসংখ্য কামান রাখার গম্বুজ সমেত একটা দুর্ভেদ্য জেলখানা। মোগলদের অনেক শক্রই এর গভীর নালাগুলোতে উধাও হয়ে গেছে, আর কখনো দিনের আলো দেখার সুযোগ পায়নি।
আমি শুনেছি যে তিনি আপনার দৌহিত্র সিপিরের কাছের একটা কামরাতে বন্দি। বলে চলল সুবাদার।
সিপির? দারার কনিষ্ঠ পুত্র তাহলে এখনো বেঁচে আছে… আপন মনেই আল্লাহকে ধন্যবাদ জানালেন শাহজাহান।
হ্যাঁ, আওরঙ্গজেব এখনো তার ভাগ্য নির্ধারণ করেননি।
মুরাদ? তাকে নিয়ে কী করবে?
জাহাপনা জানিয়েছেন, যে ভাই তার সাথে ধর্মদ্রোহী দারার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে তার রক্ত দেখতে চান না তিনি। তাই, হত্যা করা হবে না। এর পরিবর্তে প্রতিদিন তাকে পোস্ত খাওয়ানো হবে।
একদৃষ্টে উজবেক লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলেন শাহজাহান। দুজনেই জানেন এর মানে কী। পপি থেকে তৈরি আফিমের এক ধরনের দুধময় রস এই পোস্ত, যাকে এটি খাওয়ানো হয় সেই ব্যক্তি প্রথমে তোতলা, নির্বোধ হয়ে তারপর ধীরে ধীরে এতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে মৃত্যুবরণ করে। এটা এত ভয়ংকর একটা পরিসমাপ্তি এর চেয়ে যুদ্ধের ময়দানে ধ্বংস হয়ে যাওয়াও ভালো ছিল।
এক মুহূর্তের জন্য ছেলেবেলার মুরাদের কথা মনে পড়ে গেল শাহজাহানের–অসম্ভব সুদর্শন, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর আর দুঃসাহসী যে কোন পুরুষ গর্বিত হবেন এমন পুত্র পেয়ে। তারপরেও এটাই তার ভাগ্যলিপি প্রথমে আপন পিতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, এরপর আপন ভাই কর্তৃক চক্রান্তের শিকার হয়ে ধীর মৃত্যু, যেটি কিনা শরীর আর চেতনা উভয়কে ধ্বংস করে ফেলবে। মুরাদের দুর্দশা আর পুত্রকে সাহায্য করতে না পারার নিজের অক্ষমতার কথা মনে হতেই এমন একভাবের উদয় হলো শাহজাহানের মনে, যা ক্রোধের সাথে কোনভাবেই খাপ খায় না। হতে পারে এক পুত্রের প্রতি পিতার অনুভূতির প্রমাণ এটি, বিশেষ করে যাই ঘটুক না কেন, সন্তানকে রক্ষা করার প্রবণতা… সন্তান যতই অধঃপতনে চলে যাক না কেন। সম্ভবত নিজ মনে তাঁর পিতা জাহাঙ্গীরও একই রকমটাই অনুভব করেছিলেন তাকে নিয়ে।
