খুব ভালো। তোমার সামনে কার্পেটের উপর রেখে পিছিয়ে যাও। প্রহরী, চোখ রাখবে তার উপর। লোক পিছিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন শাহজাহান, এরপর প্রহরীরা চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল বার্তাবাহক লোকটাকে। সাবধানে রেশমের থলেটার কাছে গিয়ে তুলে নিলেন। বিশাল চেহারা সত্ত্বেও তেমন একটা ভারী নয়। কার্পেটের উপর রেখে দিয়ে ঝুঁকে সিল্কের রশিটা খুলে ফেলেলেন শাহজাহান। ভেতরে পাওয়া গেল আরেকটা থলে। তবে নিকৃষ্টমানের, গোলাকার মুখের কাছে পাতর রশি দিয়ে বাঁধা। সাবধানে এটাও তুলে নিলেন শাহাজাহান। রশির সাথে ভাঁজ করা এক টুকরো কাগজ। তুলে নিয়ে খুলে ফেললেন শাহজাহান : ধর্মদ্রোহীতার একমাত্র শাস্তি মৃত্যু। আল্লাহর ইচ্ছাই পূর্ণ হয়েছে আর বেহেশতের উদ্যানে সকলেই আনন্দে মেতেছে।
কাগজটাকে একপাশে রেখে ব্যাগ খুলে ফেললেন শাহজাহান। সাথে সাথে নাকে এসে লাগল অস্বস্তিকর মিষ্টি গন্ধ–একবার এ গন্ধ পেয়েছেন তিনি, মৃত্যুর গন্ধ তাই ভুলে যাননি–বমি ঠেলে এলো মুখে। ব্যাগের ভিতরে পাওয়া গেল আরো একটা ব্যাগ। এবার কালো সিল্ক দিয়ে মোড়ানো। কাঁপা কাঁপা হাতে সিল্ক খুলে ফেললেন। আর অবশেষে কিছু একটা বের হয়ে গড়িয়ে পড়ল কার্পেটের উপর : দারার খণ্ডিত মস্তক, কুৎসিত, মৃত চোখ জোড়ার চারপাশে নড়ছে ক্রিম রঙা পোকা, মুখ আর রক্তাক্ত নাকের ভেতরে বাইরে যাওয়া-আসা করছে কীটগুলো।
বহুদূর থেকে মনে হল ভেসে এলো জাহানারার আর্তচিৎকার, বেশ কিছু সময় ধরে গলিত কাঠামোটার দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলেন শাহজাহান। প্রায় না শোনার মত করে বলে উঠলেন, আমি আর সহ্য করতে পারছি না। শেষ হোক এবার। দরজাগুলো খুলে দাও…
২.১২ শাহজাহান অবাক হয়ে গেলেন
২.১২
শাহজাহান অবাক হয়ে গেলেন যখন আওরঙ্গজেবের পক্ষ থেকে আগ্রা দুর্গের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা নিজে এলো তার কাছে। তিনি ইতিমধ্যেই শুনেছেন যে লোকটা উজবেক খলিল উল্লাহ খানের সৈন্য, যে কিনা সেনাপতির সাথে সামুগড়ের যুদ্ধে দারাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এখন তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে মাখদুমী খান। লম্বা, মাখদুমী খানের ডান ভ্রর নিচে সাম্প্রতিক সময়ে কেটে যাবার গোলাপি দাগের চিহ্ন ধূসর দাড়ি। অভিবাদন জানানোর কোন চেষ্টা করল না লোকটা আবার একই সাথে শাহজাহানের স্থির দৃষ্টির দিকে তাকাতেও পারল না। অন্য পাশে সরিয়ে রেখেছে চোখ জোড়া।
আমার পাঠানো বার্তা কেন অগ্রাহ্য করেছ? উত্তর দাও! আমার কন্যারা কোথায়? জানতে চাইলেন শাহজাহান।
শাহজাদী গওহর আরা নিজ ইচ্ছেতেই যমুনার তীরে প্রাসাদে অবস্থানরত শাহজাদী রোশনারার কাছে চলে গেছেন। আপনার অন্য কন্যা রাজকীয় হারেমে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন।
যত শীঘ্রি সম্ভব শাহজাদী জাহানারার সাথে দেখা করতে চাই আমি। আমাকে নিশ্চিত হতে হবে যে তার পদমর্যাদা অনুযায়ী আচরণ করা হচ্ছে। তার সাথে।
আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে আপনার কন্যা ভালো আছেন আর তার সাথে কোন দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে না। এটা আমার বলার কথা নয় যে কখন আপনারা একে অন্যের সাথে দেখা করতে পারবেন। আপনার পুত্র আওরঙ্গজেব আপনাকে যা জানাতে বলেছেন দয়া করে তা শুনুন। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে আপনি এখানেই আপনার গৃহে অবরুদ্ধ থাকবেন। আরো নির্দেশ দিয়েছেন যেন আপনার নিরাপত্তার জন্য বাইরে দিন-রাত প্রহরী নিযুক্ত থাকে।
আমার দরজায় সর্বদাই প্রহরী থাকে নিরাপত্তা রক্ষার জন্য। আমার ধারণা, আমাকে কোথাও যেতে বাধা দেবার জন্যই এমনটা করা হচ্ছে?
কিছুই বলল না মাখদুমী খান।
আর আমার পরিচালক আর কর্চিদেরকেই বা কেন পরিবর্তন করা হয়েছে? আমি চিনি না বা বিশ্বাস করি না এমন আগন্তুক আমার সেবা করুক চাই না আমি।
এসব জাহাপনারই আদেশ…।
জাহাপনা বলতে কাকে বোঝাতে চাও? কার কথা বলছ?
সম্রাট আওরঙ্গজেব।
এরকম তো কেউ নেই। আমি শাহজাহান, হিন্দুস্তানের সম্রাট, আর কেউ নয়।
আমি শুধুমাত্র জাহাপনা, সম্রাট আওরঙ্গজেবের বার্তা বহনকারী। আমি আপনার সাথে তর্ক করব না। কর্কশভাবে বলে উঠল মাখদুমী খান।
অসম্ভব ইচ্ছেশক্তির জোরে এখন পর্যন্ত শান্তভাবে ধীরে ধীরে কথা বলছেন শাহজাহান। নিজের অন্তরের বিষাদকে ঢেকে রেখেছেন। প্রায় তিন সপ্তাহের কাছাকাছি হয়ে গেল দেখেছেন দারার গলিত মস্তক আর জেনেছেন ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডের বাস্তবতা। দুর্গের আত্মসমর্পণের আদেশ দেয়ার পরপরই নিজ কক্ষে ফিরে এসেছেন। ভেবেছেন নিজের জীবন শেষ করে দেবেন। কিন্তু শুধুমাত্র জাহানারার চিন্তা, যে কিনা তিনি জানেন তাঁর মতই মর্মবেদনায় ভুগছে আর যাকে এভাবে ছেড়ে যেতে পারেন না তিনি, তার জন্যই থেমে গেল হাত। কিন্তু যত দিন যেতে লাগল, অগ্রাহ্য করার দৃঢ় মনোভাব–আর চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা–তার কুচক্রী পুত্রদ্বয়কে, শক্তি সঞ্চয় করতে লাগলেন শাহজাহান-। ধীরে ধীরে অধৈর্য হয়ে উঠতে থাকলেও অপেক্ষা করছেন আওরঙ্গজেব আর মুরাদকে সামনা-সামনি দেখতে পাবার মুহূর্তটুকুর জন্য। বারেবারে অনুশীলন করছেন তাদেরকে কী বলবেন। কিন্তু একজনও আসছে না তার কাছে। এর পরিবর্তে যেমন বিশ্বাসঘাতক তেমনি কাপুরুষ, পুত্রদ্বয় শুধুমাত্র সৈন্য পাঠিয়ে দখল করে নিয়েছে দুর্গ।
