কী বলেছে সে? সেই কি কামান দাগা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে?
হ্যাঁ। লিখেছে আমার মত এত বৃদ্ধ আর অথর্ব এক লোক বাস করছে এমন দুর্গে বোমাবর্ষণ শুরু করাটাই উচিত হয়নি মুরাদের। যাই হোক, এর মানে এই না যে সে আমাদের ভালো চায়। তার দাবি এটা তার দায়িত্ব, আমার প্রতি–যে কিনা শাসন করার বা দুর্গ নিয়ন্ত্রণ করার উপযুক্ত নই আর–আর সাম্রাজ্যের প্রতি, আমাকে বাধ্য করা যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আত্মসমর্পণ করে ফেলি, তাহলে পুনরায় শৃংখলা স্থাপন করতে পারবে সে। এছাড়াও, সে দাবি করছে যে উপায়ও সে খুঁজে পেয়েছে তা করার।
কীভাবে?
দুর্গের পানির প্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে। এক বিদ্রোহী দুর্গের পানির বাঁধ খুলে দিয়েছে, ফলে যমুনার পানি ঢুকে পড়াতে আর বিশুদ্ধ পানি পাবো না আমরা। বাকি আছে আমাদের জন্য বহুদিনের অব্যবহৃত অল্প কয়েকটা কুয়া… সে আশা করছে এই গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে মনোবল হারাবে আমার সৈন্যরা।
আমি বুঝতে পারছি না… আশা করেছিলাম এতদূর এসেও হয়ত পিছু হটে যাবে তারা দুজন…।
লজ্জাবোধ বা অপরাধের কোন অনুভূতিই নেই তাদের।
দারা সম্পর্কে কিছু বলেছে আওরঙ্গজেব?
না। আশা করছি যে আওরঙ্গজেব আগ্রাতে ফিরে এসেছে কারণ দারা তাকে কৌশলে এড়িয়ে যেতে পেরেছে।
আমি চিঠি লিখব ভাইদের কাছে… যুক্তি দিয়ে বোঝাব আওরঙ্গজেব আর মুরাদকে।
তারা শুনবে না আর বিশ্বাসঘাতকদের কাছে অনুনয় করে নিজেকে ছোট করতে তোমাকে দেব না আমি।
আমি অনুনয় করব না…আমিও তাদের সমকক্ষ… ।
তার পরেও আমি মানা করব। আমিই এখনো সম্রাট। মেরুদণ্ডহীনের মত দুর্গে বসে পুত্রদের জন্য অপেক্ষা করব না আমি যে তারা পরবর্তী কোন পদক্ষেপ নেবে আমার জন্য। দুনিয়ার কাছে প্রচার করেছে আমি এতটাই বৃদ্ধ আর অসুস্থ যে শাসন করার উপযুক্ত নই, কিন্তু তাদেরকে আর আমার প্রজাদেরকে এর বিপরীত চিত্র দেখাবো আমি।
কী করতে চান আপনি?
সৈন্যদের প্রধান হয়ে তাদের সাথে লড়াই করতে যাব। দুর্গের সৈন্যরা এখনো বিশ্বস্ত আর আমাকে অনুসরণ করবে আমি নিশ্চিত। কথা বলতে বলতেই উঠে দাঁড়ালেন শাহজাহান। বহুদিন ধরে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে আছি। দারাকে ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে না পাঠিয়ে উচিত ছিল আমার যাওয়া। বুঝতে পারত তারা যে আমি আমার শক্তি হারাইনি, তবে এখনো তত বেশি দেরি হয়ে যায়নি। আর যদি আমি মারাও যাই, আত্ম গরিমা ফিরে পাবো আমি আর এরই মাঝে দারা আর সুলাইমান ফিরে এসে আমাকে হত্যার প্রতিশোধ নেবে।
আব্বাজান, অনুগ্রহ করে আপনি এমনটা করবেন না…
এটাই এখন একমাত্র পথ। আমি আমার কর্মচারীর কাছে আওরঙ্গজেব আর মুরাদকে দেয়ার জন্য একটা চিঠি রেখে দিয়েছি, লেখা আছে আমার শেষ ইচ্ছে তারা যেন তোমার সাথে সম্মান আর শ্রদ্ধামূলক আচরণ করে। যা কিছু ঘটে গেছে আর আমার প্রতি তারা যতই বিরাগ থাকুক না কেন, আমার বিশ্বাস এ দায়িত্ব তারা পালন করবে। তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
আমি ভয় পাচ্ছি না–অন্তত নিজের জন্য তো নয়ই, কিন্তু আপনার কথা ভেবে সাড়া হচ্ছি… আওরঙ্গজেব জানে আপনার প্রকৃতি। সে জেনে বুঝেই আপনাকে প্ররোচিত করতে চেয়েছে। ক্ষমা চাইছি, কিন্তু একটু বেশিই তাড়াহুড়ো করছেন, আব্বাজান।
হতে পারে, কিন্তু অন্তত কর্মক্ষম তো হয়ে উঠেছি। হয়ত যোদ্ধা সুলভ স্বাস্থ্য নেই, কিন্তু উদ্দীপনা ঠিকই আছে।
এক মুহূর্তের জন্য পত্নীর অনিন্দ্যসুন্দর মুখখানা ভেসে উঠল চোখের সামনে। অসংখ্য বার পত্নীকে রেখে যুদ্ধে গিয়েছেন, আবার তার কাছে ফিরেও এসেছেন। কখনোই মনে হয়নি মমতাজই মৃত্যুবরণ করে তাকে ছেড়ে চলে যাবে… কিন্তু এসবই বহুদিন আগের কথা আর সম্ভবত শীঘ্রিই স্বর্গে দেখা হবে দুজনের।
দরজায় করাঘাতের শব্দ পেয়ে উঠে দাঁড়ালেন শাহাজান, ওড়না টেনে নিল জাহানারা। কর্চি কি তলোয়ার নিয়ে ফিরে এসেছে? যদি তাই হয়, তাহলে দ্রুত কাজ করেছে এই তরুণ। কিন্তু দরজা খুলে যেতেই দেখা গেল দাঁড়িয়ে আছে দুর্গের সেনাপতি।
জাহাপনা, যুদ্ধ বিরতীর পতাকাতলে আরো একজন বার্তাবাহক এসে পৌঁছেছে আপনার পুত্রদ্বয়ের কাছ থেকে। জোর দিয়েছে যেন আপনি একাকী এটি দেখেন। বার্তাবাহকের দাবি, শাহজাদা আওরঙ্গজেব কিছু পাঠিয়েছে আপনার জন্য।
কী? আরেকটা পত্র?
না, জাহাপনা। মনে হচ্ছে কোন পার্সেল। পরীক্ষা করে দেখার জন্য আমার লোকদেরকে আদেশ দিলে বাধা দিয়েছে বার্তাবাহক। বলছে এটা শুধুমাত্র আপনার হাতে দিতে আর কাউকে দিতে চাইছে না সে। যদি আপনি চান, জাহাপনা, আমি আমার সৈন্যদেরকে আদেশ দেব তার কাছ থেকে নিয়ে নিতে।
না। অস্ত্র আছে কিনা তার সাথে খোঁজ করে, প্রহরী দিয়ে আমার কাছে নিয়ে এসো।
শাহজাহান আর জাহানারা একে অন্যের দিকে তাকালেও কিছু না বলে চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলেন। কয়েক মিনিট পরেই ফিরে এলো সেনাপতি, পেছনে এসেছে পরিষ্কার কালো পাগড়ি আর কর্মকর্তাদের সাধারণ আলখাল্লা পরিহিত, দাড়িঅলা আর লম্বা একজনকে নিয়ে আটজন প্রহরী। বিশাল বড় এক রেশমি থলে, সিল্কের রশি দিয়ে আটকানো কিছু একটা ধরে আছে লোকটা।
আমি বুঝতে পেরেছি আমার জন্য কিছু একটা নিয়ে এসেছ তুমি। কী, জিজ্ঞেস করলেন শাহজাহান।
আমার প্রভু আমাকে জানাননি শুধু এটুকুই যে যেন আপনার হাতেই দেই, অন্য কারো হাতে নয়।
