ঘুরে তাকিয়ে, নিচু মার্বেলের সাদা টেবিলের উপর রুপালি কাপ দেখতে পেয়ে নিজের ডান হাতের তর্জনী চুবিয়ে দিয়ে চুষে দেখল, কোন সন্দেহ নেই, পপি ফুলের কটু স্বাদ, এমনকি গোলাপের সুগন্ধি মেশানো শরবতে মেশানো হলেও, যায়নি।
কেউ একজন ইচ্ছেকৃতভাবে তাকে নেশা করিয়েছে। এটাই একমাত্র ব্যাখ্যা। জাহানারা ভালোভাবেই অনুমান করতে পারল যে কে এই ব্যক্তি। রোশনারা কোন সুযোগ রেখে যেতে চায়নি আর তাই বৃদ্ধা এই নারীকে নেশা করিয়েছে যে কিনা প্রায় তার সারা জীবন দেখভাল করেছে। তুমি একেবারে নিশ্চিত যে ভয়ের কোন কারণ নেই?
দীর্ঘস্থায়ী কোন ক্ষতি হবার কথা না। কয়েক ঘণ্টার মাঝেই চেতনা ফিরে পাবে, কিন্তু মাথাব্যথা থাকবে আর দুর্বল ও অসুস্থও বোধ করবে।
এখানেই থাকো। জেগে ওঠার সাথে সাথে আমাকে খবর পাঠাবে। এই কথা বলেই ঘুরে দাঁড়িয়ে কক্ষ ছেড়ে এলো জাহানারা। কেমন করে পিতাকে জানাবে এসব খবর? তারপরেও জানাতে হবে আর যত দ্রুত সম্ভব…
কয়েক মিনিট পরে, হাঁপাতে হাঁপাতে পিতার কাছে গেল জাহানারা।
কী হয়েছে? এত শীগ্রি ফিরে এলে কেন?
দ্বিধায় পড়ে গেল জাহানারা, কিন্তু সত্য লুকানোর আর কোন পথ নেই যে আবারো নিজের রক্ত-মাংস দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার। হয়েছেন পিতা। রোশনারা দুর্গ ছেড়ে মুরাদের কাছে চলে গেছে। এই চিঠি লিখে গেছে… ক্ষমা চাইছি। কী ঘটেছে তাড়াতাড়ি জানার জন্য খুলে সেলেছি আমি।
শাহজাহান রোশনারার চিঠি হাতে নিয়ে পড়ে দেখলেন সংক্ষিপ্ত বার্তাটা। তারপর দলামোচড়া করে মাটিতে ফেলে দিলেন কাগজটা।
মনে হচ্ছে মৃত হিন্দু নারীর দেহ বহনকারীদের দলে লুকিয়ে দুর্গ ছেড়ে গেছে সে। আর…।
হাত তুললেন শাহজাহান। কীভাবে সে এটা করেছে তা কোন বিষয় নয়। আস্তে করে বলে উঠলেন শাহজাহান। গওহর আরার কি খবর?
এখনো এখানেই আছে।
খুশি হয়েছি আমি। আর কিছু না বলে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন কন্যার কাছ থেকে যেন তার চেহারা না দেখা যায়। ভেবেছিল রেগে উঠবেন তিনি; কিন্তু তার বদলে অনুভব করল পিতার গভীর বিমর্ষতা। ভালোই বুঝতে পারল জাহানারা। কেননা সে নিজেও ঠিক একই জিনিস অনুভব করছে। কেমন করে এতটা বিভেদ তৈরি হয়ে গেল তাদের পরিবারে? কোন পরিবারে এহেন বিচ্ছেদ–বিশেষ করে একটি রাজপরিবারে কখনো সত্যিকারে সারবে? হয়ত না।
*
আমার শিবিরে স্বাগতম। তুমি আর আমি একত্রে মিলেমিশে এখন এই আনন্দ উদ্যাপন করতে পারব যে আমি আগ্রাতে ফিরে এসেছি। মুরাদের পিঠে চাপড় মেরে বলে উঠল আওরঙ্গজেব।
তোমার রক্ষীবাহিনীকে আলাদাভাবে খাবার পরিবেশন করার আয়োজন করেছি আমি। কিন্তু আমরা দুজনে একসাথে আহার করব। আমার তাঁবুতে।
তোমার আমন্ত্রণ পাবার সাথে সাথে ছুটে এসেছি আমি। রোশনারাও অভিনন্দন পাঠিয়েছে। ভালোই হয়েছে তাই না, সে দুর্গ থেকে বের হবার পথ করে নিয়ে আমার সাথে এসে যোগ দিয়েছে।
আমার শুধু মনে হচ্ছে জাহানারাও যদি থাকত, কিন্তু তুমি তো জানো তার ধরন। সাম্রাজ্যের কিসে ভালো হবে তার চেয়েও উপরে পিতার প্রতি বিশ্বস্ততাকে স্থান দিয়েছে সে… নিজের তাঁবুর দিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল আওরঙ্গজেব, যেখানে শতরঞ্জি দিয়ে ঢাকা মেঝের উপর পেতে দেয়া হয়েছে সিল্কের কুশন আর খাবার পরিবেশনের জন্য নিচু একটা টেবিলের উপর ইতিমধ্যেই পেতে দেয়া হয়েছে কাপড়।
মুরাদ বসে কয়েকটা তাকিয়ার গায়ে হেলান দিতেই একজন পরিচারক পিতলের পাত্রে পানি ঢেলে দিল হাত খোবার জন্য। এরপর আরেকজন নিয়ে এলো মদ। আমি ভেবেছিলাম তুমি মাদক নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছ আওরঙ্গজেব?
হেসে ফেলল আওরঙ্গজেব, তাই করেছি, কেননা ধর্মীয় সব নীতিতে বিশ্বাসী আমি। কিন্তু জানি তুমি নও। আর যেমনটা বলেছি, এখন সময় হয়েছে ভোজনরসিক আর হৃদয় খুলে দেবার, কঠোরতার নয়… আমি পান করব না; কিন্তু উদ্যাপনের নিমিত্তে তুমি যত চাও পান করতে পারো।
তোমার কি সত্যিই মনে হয় আমরা জিতে গেছি?
হ্যাঁ, ভেবে দেখ তুমি, দারা মৃত। আর কে আছে আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার? নিশ্চিতভাবে এটাই ভাবছে গুরুত্বপূর্ণ সব অভিজাত আর প্রজাবর্গ… এমনকি যারা দারার হয়ে যুদ্ধ করেছে তারাও এখন তাড়াহুড়া করে নিজেদেরকে আমাদের সমর্থক হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যস্ত। প্রায় প্রতিদিনই এ জাতীয় বার্তা পাচ্ছি আমি, তুমিও নিশ্চয়।
মাথা নেড়ে মুরাদ বলে উঠল, কিন্তু পিতা আর দুর্গের অবশিষ্ট সৈন্যরা? হাল ছেড়ে দেবার কোন চিহ্নই নেই এখনো।
আগেকার মত নেই আর পিতা। খুব বেশি সময় লাগবে না যুক্তি দিয়ে বুঝতে বিশেষ করে যখন শুনবেন যে সেনাবাহিনী নিয়ে আগ্রাতে ফিরে এসেছি আমি। আর যদি তা নাও হয় তাহলে কোন না কোন রাস্তা ঠিকই বের করে ফেলব বন্দি হতে বাধ্য করাতে।
কাপ থেকে লম্বা চুমুক দিয়ে গলায় মদ ঢালল মুরাদ, হাসতে হাসতে, পিছনে হেলান দিল। তাহলে তুমিই ঠিক বলেছিলে… আমার অবিশ্বাস সত্ত্বেও সবসময় বলতে যে আমরাই জিতব–এমনকি সামুগড়ের পরেও। যদিও দারার পেছনে ছিল পিতা আর রাজকীয় সেনাবাহিনীর বেশির ভাগ অংশ…
হ্যাঁ, কিন্তু নিজের সুযোগগুলো হেলায় হারিয়েছে সে, বিশেষ করে যখন অতি আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়েছিল। খলিল উল্লাহ খানের মত শক্তিশালী সমর্থককেও পরোয়া করার প্রয়োজন মনে করেনি–ধরেই নিয়েছিল যে সবাই তাকে অনুসরণ করবে। কিন্তু উত্তরে অভিযানের সময় থেকে খলিল উল্লাহ খানকে চিনি আমি, আর তাই জানতাম যে, কী বলা যায় উৎসাহী ছিল আমাদের সাথে যোগ দেবার প্রতি…
