মাননীয়া আমি…
বলে যাও।
গোধূলি বেলায় বার্তাবাহক ফিরে এসে জানায় যে দুর্গ থেকে নিরাপদে মৃত নারীর দেহ বের করে নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে আমাদেরকে। আমরা সবকিছু প্রস্তুত করে রেখেছিলাম আর আপনি মহান জাহাপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে যাবার পরপরই চারজন সাদা পোশাকধারী হারেমের পরিচারক দুর্গ থেকে মৃতদেহ বাইরে নিয়ে গেছে…; মুখের উপর হাত চাপা দিল খাজাসারা। নিশ্চয় এভাবেই ঘটেছে পুরো কাণ্ডটা। আপনার ভগিনী কোন এক নারীর ছদ্মবেশ নিয়েছে নিশ্চয়। তাদের সবারই মুখ ঢাকা ছিল ওড়নায় আর তাদেরকে চেক করে দেখার কথা আমার মাথাতেই আসেনি…
কোন ফটক ব্যবহার করেছে তারা?
বার্তাবাহকের ব্যবহার করা পাশের ফটক শহরের দিকে মুখ করে থাকা ছোট ফটকটা।
তো এই কারণেই সে আর পিতা যমুনার দিকে তাকিয়ে থাকলেও কিছুই দেখতে পায়নি, ভাবল জাহানারা। যখন তারা দাঁড়িয়ে কথা বলছি, রোশনারা পালিয়ে গেছে… কীভাবে করল এমন একটা কাজ? আর কত বড় সাহস বিবেকের কথা লিখেছে যখন আসলে তার কোনই বিবেক নাই? কিন্তু এরপরই নতুন চিন্তা এলো মাথায়।
শাহজাদী গওহর আরার কী খবর? তাকে শেষবার কখন দেখেছ তুমি?
সারাদিন মাথা ব্যথায় নিজের ঘরেই শুয়েছিলেন তিনি। এটাই জানিয়েছে তাঁর পরিচারিকা আর তাদেরকে অবিশ্বাস করার কোন কারণ নেই আমার… আমি শপথ করে বলছি দায়িত্বের ব্যাপারে আমি সবসময় সচেতন।
কিন্তু শুনছিল না জাহানারা। শশব্যস্ত পায়ে আঙিনার ওপাশে ছোট বোনের কক্ষের দিকে চলল, সাথে পিছনেই খাজাসারা। গওহর আরাও নিশ্চয়ই পিতাকে ছেড়ে যায়নি, নাকি? আইভরি রঙা দরজাগুলো বন্ধ, ঠিক যেমন রোশনারার গৃহের দরজা বন্ধ ছিল। দুরুদুরু বক্ষে খুলে ফেলল, জাহানারা। গরাদের উপর পর্দা নামানো আর অল্প কয়েকটা বাতি জ্বলছে। কোন একটা লতা জাতীয় গন্ধে–সম্ভবত কোন সুগন্ধি ফুল– ভরে আছে বাতাস–অন্ধকারে চোখ সইয়ে আসতেই ডিভানের উপর শুয়ে থাকা একটা দেহ নজরে এলো জাহানারার এরপর শুনতে পেল জড়ানো কণ্ঠস্বর। কে? আমার মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে?
গলার স্বরে মনে হল গওহর আরাই, তারপরেও নিশ্চিত হতে হবে যে এটা কোন কৌশল নয়। কুলুঙ্গি থেকে তেলের বাতি নিয়ে কাছে এগিয়ে গেল জাহানারা। শিখার আভায় দেখা গেল বোনের পাতলা মুখমণ্ডল… অসংখ্য ধন্যবাদ আল্লাহ।
ওহ, তুমি, জাহানারা। আমি ভেবেছি বোধ হয় সাত্তি আল-নিসা। সারাদিন তাকে ডেকেছি। একমাত্র সে-ই জানে কীভাবে এই ব্যথা দূর করতে হয়, কিন্তু কাছাকাছি নেই সে।
শাহজাদী আজ সকালের পর থেকে সাত্তি-আল-নিসাকে দেখিনি আমি। জাহানারার পিছুপিছু রুমে আসা খাজাসারা বলে উঠল।
কাঁধের উপর দিয়ে ইশারা দিল জাহানারা যেন আর কিছু না বলে ফেলে। এখনি গওহর আরাকে রোশনারার পালিয়ে যাওয়া সম্পর্কে কিছু বলে লাভ নেই। বোনের দিকে ফিরে তাকাল। আমার খারাপ লাগছে যে তোমার শরীর ভালো না। আমি দেখছি তোমার জন্য সাত্তি আল-নিসাকে খুঁজে পাই কিনা।
আবারো খাজাসারাকে সাথে নিয়ে জাহানারা গেল মোটা কার্পেট পাতা দেয়ালে সিল্ক ঝোলানো করিডোরের শেষ মাথায় প্রায় তিন দশক ধরে বরাদ্দকৃত সাত্তি আল-নিসার কক্ষে–যখন থেকে সে মমতাজের বিশ্বস্ত পরিচারকের কাজ পেয়েছে। একমাত্র সাত্তি আল-নিসাকেই সে নির্ভয়ে বলতে পারবে যে কী ঘটছে, যদিও এখন পর্যন্ত রোশনারার পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু টের পায়নি সে। তার বোন কি হঠাৎ ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার সুযোগ নিয়েছে নাকি বহু আগে থেকেই এটির পরিকল্পনা করছিল?
পর্দা সরিয়ে কক্ষের মাঝে প্রবেশ করার সাথে সাথে বোঝা গেল যে কোথাও কোন সমস্যা হয়েছে। মেঝেতে বড় একটা সিল্কের পাশ বালিশের উপর উপুড় হয়ে আছে সাত্তি আল-নিসা, চারপাশে ছড়িয়ে আছে রুপালি ধূসর কেশরাজি। সে কি মূৰ্ছা গিয়েছে? এখনো এত পরিশ্রমী যে বয়সের কথা মনেই হত না। সাত্তি আল-নিসার পাশে হাঁটু গেড়ে তার হাত নিজের হাতে তুলে নিল জাহানারা। ঠাণ্ডা হাত, তালু ঘষার পরেও কোন প্রতিক্রিয়া নেই… এমনকি বুকেও ওঠা-নামার কোন চিহ্ন নেই। না, এটা হতে পারে না… সাত্তি আল-নিসার কাছে মুখ নামিয়ে নিতেই জাহানারার চোখ ভরে গেল জলে। এরপরই অনুভব করল অথবা তার মনে হল–নিজের ত্বকের গায়ে অত্যন্ত হালকা নিঃশ্বাসের উষ্ণতা। আস্তে করে সাত্তি আল-নিসার হাত নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালো জাহানারা। বেশ অসুস্থ হলেও আমার ধারণা এখনো বেঁচে আছে… দ্রুত সাহায্য করার জন্য কাউকে নিয়ে এসো। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা খাজাসারাকে চিৎকার করে আদেশ দিল জাহানারা।
কয়েক মিনিটের মাঝেই বেগুনি আলখাল্লা পরিহিত সঙ্গীকে নিয়ে এলো খাজাসারা, যার কপালে অদ্ভুত ট্যাটু আঁকা।
এই হল ইয়াসমীন। আরব থেকে এসেছে। হাকিম পিতার কাছ থেকে এ বিদ্যার কিছু দক্ষতা শিখেছে সে।
এক পাশে সরে গিয়ে ইয়াসমীনকে জায়গা দিল জাহানারা, সাত্তি আল-নিসার উপর ঝুঁকে নাড়ি পরীক্ষা করে এক চোখের পাতা তুলতেই দেখা গেল ঘন, প্রশ্বস্ত মণি।
কী হয়েছে তার? জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে? জিজ্ঞেস করল জাহানারা।
না, মাননীয়। আমার ধারণা আফিম খেয়ে গভীর ঘুমে মত্ত হয়ে আছে।
আফিম? তুমি নিশ্চিত? কখনো তার এই অভ্যাসের কথা শুনিনি আমি।
