‘পুলিশের সঙ্গে ইতোমধ্যে কথা বলেছি আমি,’ শুরু করল কর্নওয়ালিস।
‘হ্যাঁ, স্যর।’
কর্নওয়ালিসকে ‘স্যর’ বলে সম্বোধন করল হোথর্ন… ঘটনাটা ইন্টারেস্টিং মনে হলো আমার। একটা ব্যাপার খেয়াল করেছি, সাক্ষী বা সন্দেহভাজন অথবা তদন্তের কাজে সহায়তা করতে পারে এ-রকম কোনো লোকের সঙ্গে যখন কথা বলে সে, তখন ওই লোকদের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কায়দায়। খুব সাদামাটা হয়ে যায় তখন, তোষামুদে একটা ভাব কাজ করতে থাকে ওর ভিতরে। এবং, যতদূর মনে হয় আমার, ইচ্ছাকৃতভাবে করে কাজটা। ওর সেই সাদামাটা আর তোষামুদে ভাবের কারণে, আত্মসংবরণের স্বাভাবিক যে-তাগিদ থাকে কোনো মানুষের ভিতরে, সেটা কমবেশি নষ্ট হয়ে যায়। তা ছাড়া, আমার মনে হয়, হোথর্নের ওই ভাব আসলে একটা মুখোশ… সেটার কারণে লোকে ঠাহর করতে পারে না, ঠিক কী ধরনের লোক সে। ঠাহর করতে পারে না, ওই মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থেকে লোকের কর্মকাণ্ডের চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে সে। বিনয় বা ভদ্রতা আসলে ওর জন্য একজাতের সার্জিকাল মাস্ক! সার্জনরা যেমন হাতে স্কালপেল নেয়ার আগে ওই মাস্ক পরেন, ওর কাজও অনেকটা তেমন।
–
‘যেদিন যেভাবে মারা গেছেন মিসেস ক্যুপার,’ বলল হোথর্ন, ‘সেটা খুবই অস্বাভাবিক। আর সে-কারণেই আমাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে এই কেসে… পুলিশের কাজে সহায়তা করার জন্য। আপনাদের সময় নষ্ট করছি… আমি আসলে খুবই দুঃখিত…’ ক্রুর হাসি হাসল। ‘যদি সিগারেট খাই, তা হলে কি কিছু মনে করবেন?’
‘আসলে…’
কিন্তু দেরি হয়ে গেছে ততক্ষণে। ইতোমধ্যেই দুই ঠোঁটের মাঝখানে একটা সিগারেট গুঁজে দিয়েছে হোথর্ন। এবং ইতোমধ্যেই জ্বলে উঠেছে ওর লাইটার। ভ্রূ কুঁচকে গেছে আইরিন লযের, দস্তানির্মিত একটা পিরিচ ঠেলে দিল সে হোথর্নের সামনে… যাতে ওটা অ্যাশট্রে হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
হোথর্ন নাকমুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে কর্নওয়ালিসকে বলল, ‘মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে সেদিন দেখা হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে যা-যা কথা হয়েছে আপনার, সেগুলো আরেকবার বলবেন?’
হোথর্নের কথামতো কাজ করল কর্নওয়ালিস। যা বলল, তার প্রায় সবই মিলে গেল এই উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়ের সঙ্গে।
লোকটার কথা শেষ হওয়ার পর হোথর্ন জানতে চাইল, ‘মিসেস ক্যুপার কতক্ষণ ছিলেন আপনার সঙ্গে?’
কিন্তু কর্নওয়ালিস কিছু বলার আগে আইরিন বলে উঠল, ‘পনেরো মিনিটের কিছু বেশি।’
‘আপনাদেরকে পারিশ্রমিক বাবদ ঠিক কত টাকা দেয়ার কথা ছিল মিসেস ক্যুপারের?’
‘তিন হাজার এক শ’ সত্তর পাউন্ড,’ এবারও জবাব দিল আইরিন।
‘তিনি কি টাকাটা ক্রেডিট কার্ডের সাহায্যে পরিশোধ করেছেন?’
‘হ্যাঁ। পুরোটা।’
‘তিনি যখন এসেছিলেন এখানে, তখন তাঁর মেজাজমর্জি ঠিক কী রকম ছিল?’
‘আমাদের অন্য সব কাস্টোমারের মতোই,’ এবার মুখ খুলল কর্নওয়ালিস। ‘প্রথমদিকে কিছুটা অস্বস্তিতে ভুগছিলেন। তারপর আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে আসেন।’
‘আপনি বলেছেন, যা-যা চাহিদা ছিল ওই ভদ্রমহিলার, সব একটা কাগজে লিখে এনেছিলেন তিনি।’
‘হ্যাঁ।’
‘কাগজটা আছে আপনার কাছে?’
‘না। চলে যাওয়ার সময় ওটা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তবে আমি একটা কপি বানিয়ে নিয়েছি তাঁর সেই ফরমায়েশের।’
‘তিনি কি কোনো রকম তাড়াহুড়ো করছিলেন?’
‘আপনি বোধহয় জানতে চাইছেন, তাঁর ভাবভঙ্গি দেখে, তিনি বিপদে পড়েছিলেন কি না সেটা বোঝা যাচ্ছিল কি না। …না, সে-রকম কিছু মনে হয়নি আমার।’ মাথা নাড়ল কর্নওয়ালিস। ‘নিজের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পরিকল্পনা করাটা অস্বাভাবিক কিছু না, মিস্টার হোথর্ন। মিসেস ক্যুপার অসুস্থ ছিলেন না। তিনি এমনকী নার্ভাস বা ভীতও ছিলেন না। কথাটা ইতোমধ্যে জানিয়েছি পুলিশকে।’
‘তাঁকে ফোন করেছিলেন কেন আপনি?’
‘কী বললেন?’
‘মিসেস ক্যুপারের ফোন রেকর্ড আছে আমার কাছে। সেটাতে দেখা যাচ্ছে, যেদিন খুন হয়েছেন তিনি, সেদিন দুপুর দুটো পাঁচ মিনিটে তাঁকে ফোন করেছিলেন আপনি। তিনি তখন মাত্র হাজির হয়েছেন গ্লোব থিয়েটারে… বোর্ড মিটিং চলছিল সেখানে। আপনি মিনিট দেড়েক কথা বলেছেন তাঁর সঙ্গে।
‘ঠিক। তাঁর স্বামীকে যে-জায়গায় কবর দেয়া হয়েছে, সে জায়গার প্লট নম্বরটা দরকার ছিল আমার।’ একটুখানি হাসল কর্নওয়ালিস। ‘ওই জায়গা মিসেস ক্যুপারের জন্য নিবন্ধন করাতে হলে রয়্যাল পার্ক চ্যাপেল অফিসে যোগাযোগ করার দরকার ছিল। এই তথ্য আমাকে জানাননি মিসেস ক্যুপার। এখানে একটা কথা বলে রাখি। আমি যখন ফোন করলাম তাঁকে, তখন কথা কাটাকাটির আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলাম বলে মনে হয়েছিল। আমার কল রিসিভ করার আগে বোধহয় কারও সঙ্গে তর্কাতর্কি করছিলেন মিসেস ক্যুপার। তিনি আমাকে বলেছিলেন, পরে ফোন করবেন। কিন্তু সে-ফোন আর করা হলো না তাঁর।’
‘হুঁ। আপনারা দু’জনই কি সেদিন কথা বলেছিলেন মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে?’
‘রিসিপশন এরিয়ায় তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা হয়েছিল আমার,’ বলল আইরিন। ‘কিন্তু তাঁকে পথ দেখিয়ে এখানে নিয়ে আসার পরই চলে যাই আমি।’
‘আচ্ছা, এ-রকম কি হয়েছে… এখানে কিছুক্ষণের জন্য সম্পূর্ণ একা ছিলেন মিসেস ক্যুপার?
ভ্রূ কুঁচকে গেল কর্নওয়ালিসের। ‘কী অদ্ভুত প্রশ্ন! কেন জানতে চাইছেন কথাটা?’
