দ্য ওয়ার্ড ইয মার্ডার

০১. শেষকৃত্যের পরিকল্পনা

দ্য ওয়ার্ড ইয মার্ডার – অ্যান্টনি হরোউইটয
রূপান্তর : সায়েম সোলায়মান
প্ৰথম প্ৰকাশ আগস্ট ২০২০

১. শেষকৃত্যের পরিকল্পনা

বসন্তের উজ্জ্বল এক সকাল। ঘড়িতে মাত্র এগারোটা বেজেছে। প্রায় সাদা সূর্যের- আলো যেন প্রতিজ্ঞা করেছে, আজ এমন এক উষ্ণতা বিলিয়ে দেবে, যা সচরাচর দেয় না। ফুলহ্যাম রোড পার হলেন ডায়ানা ক্যুপার, গিয়ে ঢুকলেন ফিউনারেল পার্লারে।

বেঁটেখাটোই বলা চলে তাঁকে। কাজের মানুষ বলতে যা বোঝায় ঠিক যেন সে- রকম। স্থির সংকল্পের ছাপ আছে দুই চোখে, রূঢ়ভাবে কাটানো চুলে, এমনকী হাঁটাচলার ভঙ্গিতেও। কেউ যদি তাঁকে হেঁটে আসতে দেখে, তা হলে পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াবে… চলে যেতে দেবে। তারপরও তাঁকে দেখলে দয়া-মায়াহীন বলে মনে হয় না। তাঁর বয়স ষাটের ঘরে। চেহারা মনোরম, গোলাকার। পরনের কাপড় দামি। ফেকাসে রেইনকোটের ভিতরে দেখা যাচ্ছে গোলাপি জার্সি আর ধূসর স্কার্ট। পুঁতি আর পাথর দিয়ে বানানো ভারী একটা নেকলেস গলায়। ওটা দামি হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। কিন্তু হীরার যে-ক’টা আংটি পরে আছেন তিনি, সেগুলো নিঃসন্দেহে মূল্যবান

ফিউনারেল পার্লারটার নাম কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্স। একটা টেরেসের শেষপ্রান্তে অবস্থিত ওটা। বিল্ডিঙের সামনের দিকে এবং পাশে ক্ল্যাসিকাল ফন্টে পেইন্ট-করে লেখা আছে নামটা; ফলে কোনো পথচারী যে-কোনো দিক দিয়েই আসুক না কেন, দেখতে পাবে ওই নাম। ‘কর্নওয়ালিস’ আর ‘সন্স’ শব্দ দুটো যাতে একত্রিত হতে না-পারে সেজন্য ও-দুটোর মাঝখানে, সদর-দরজার উপরে বসিয়ে দেয়া হয়েছে ভিক্টোরিয়ান একটা ঘড়ি। চলছে না ঘড়িটা… মাঝরাতের ঠিক এক মিনিট আগে, মানে ১১:৫৯ বেজে থেমে আছে।

নামটার ঠিক নিচে লেখা আছে:

Independent Funeral Directors:
A Family Business since 1820.

বাড়ির তিনটা জানালা মুখ করে আছে রাস্তার দিকে। দুটোতে পর্দা ঝুলছে। তৃতীয়টায় পর্দা নেই, তবে সেটার পাশের দেয়ালে বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে কারও উদ্ধৃতি: মানুষের জীবনে দুঃখ যখন আসে, একাকী কোনো গুপ্তচরের মতো আসে না, বরং বিশাল এক বাহিনীর মতো আসে। বাড়ির সব কাঠ… জানালার ফ্রেম, সামনের দিক, সদর-দরজা… গাঢ় নীল আর হালকা কালো রঙে রঞ্জিত।

সদর দরজাটা খুললেন মিসেস ক্যুপার। দরজার পুরনো ধাঁচের স্প্রিং মেকানিযমের সঙ্গে যুক্ত একটা ঘণ্টা বেজে উঠল জোরে, একবার। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখতে পেলেন, ছোট একটা রিসিপশন এরিয়ায় হাজির হয়েছেন। একধারে দেখা যাচ্ছে দুটো সোফা, নিচু একটা টেবিল, আর বইয়ে-ঠাসা কয়েকটা শেল্ফ। যেসব বই শুধু সাজিয়ে রাখা হয় কিন্তু পড়া হয় না, সেগুলোয় একজাতের দুঃখী-দুঃখী ভাব থাকে; ওই বইগুলোতেও সে-রকম একটা ভাব আছে। আরেকদিকে দেখা যাচ্ছে সিঁড়ি– উপরতলায় গেছে। অনতিদূরে যেন বিছিয়ে আছে সরু একটা করিডর।

মিসেস ক্যুপারের উপস্থিতি টের পাওয়ামাত্র হাজির হলো এক মহিলা। স্থূল শরীর তার, পা দুটো মোটা আর ভারী, পরনে কালো চামড়ার জুতো… সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে। স্নিগ্ধ আর বিনয়ী হাসি দেখা যাচ্ছে চেহারায়। সেই হাসি যেন নিঃশব্দে বলে দিচ্ছে, পলকা আর কষ্টকর একটা ব্যবসা পরিচালনা করা হয় কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্স-এ, তবে সুস্থিরভাবে এবং দক্ষতার সঙ্গে করা হয় কাজটা। মহিলার নাম আইরিন লয। রবার্ট কর্নওয়ালিসের পার্সোনাল অ্যাসিস্টেন্ট। একইসঙ্গে কাজ করছে রিসিপশনিস্ট হিসেবে।

‘গুড মর্নিং,’ বলল সে। ‘আমি কি আপনাকে সাহায্য করতে পারি?’

‘হ্যাঁ,’ বললেন মিসেস ক্যুপার। ‘আমি একটা শেষকৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করতে চাই।’

‘সম্প্রতি মারা গেছেন, এমন কারও পক্ষে কি এখানে এসেছেন আপনি?’

‘না। আমি আসলে আমার জন্যই এসেছি।’

‘ও আচ্ছা।’ চোখ পিটপিট করেনি আইরিন লয… করবেই বা কেন? নিজের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করতে চাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না… অনেকেই চায়। ‘আপনার কি অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?’

‘না। অ্যাপয়েন্টমেন্ট যে করতে হবে, জানা ছিল না।’

‘আমি তা হলে দেখে আসি মিস্টার কর্নওয়ালিস ফ্রি আছেন কি না। প্লিয… বসুন। চা বা কফি কিছু খাবেন?’

‘না, ধন্যবাদ।’

বসলেন ডায়ানা ক্যুপার। করিডর ধরে অদৃশ্য হয়ে গেল আইরিন লয। ফিরে এল কয়েক মিনিট পর। তার পেছনে দেখা যাচ্ছে একজন লোককে। ফিউনারেল ডিরেক্টরদের মতো কালো স্যুট আর কালো টাই পরে আছে ওই লোক। কিন্তু এমন একটা ভাব খেলা করছে তার চেহারায় যে, দেখলে মনে হয়, এখানে থাকার কারণে নিঃশব্দে ক্ষমাপ্রার্থনা করছে যেন। গভীর অনুশোচনার ভঙ্গিতে একহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরেছে আরেক হাত। কিছুটা কুঁচকে আছে চেহারাটা, বিষাদের ছাপ পড়েছে সেখানে। পাতলা হয়ে-আসা চুল যদি আরও ঝরে যায় তা হলে টেকো হয়ে যাবে সে। দাড়ি আছে, তবে দেখলে মনে হয় পরীক্ষামূলকভাবে রেখেছে সেটা এবং সে- পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছে। রঙিন কাঁচের চশমা যেন চেপে বসেছে নাকের উপর, চোখ দুটো আড়াল করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে সেটা। লোকটার বয়স চল্লিশের মতো। আইরিনের মতো সে-ও হাসছে।

‘গুড মর্নিং,’ মিসেস ক্যুপারকে বলল লোকটা। ‘আমার নাম রবার্ট কর্নওয়ালিস। শুনলাম একটা শেষকৃত্যের পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চান।’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনাকে কি চা বা কফি খেতে বলা হয়েছে? প্লিয… এদিকে আসুন।’

করিডর ধরে সেটার শেষপ্রান্তের একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো মিসেস ক্যুপারকে। এটাও একটা রিসিপশন এরিয়া, তবে আগেরটার সঙ্গে পার্থক্য আছে। এখানে বইয়ের বদলে সাজিয়ে রাখা হয়েছে সারি সারি ফোল্ডার আর ব্রশিউর। সেগুলো যদি খোলা হয় তা হলে দেখা যাবে বিভিন্ন রকমের কফিন ও শবযানের (গতানুগতিক অথবা ঘোড়ায়-টানা) ছবি এবং সেসবের মূল্যতালিকা। শবদাহের ব্যবস্থাও আছে, আর সে-উদ্দেশ্যে দুটো শেল্ফে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কয়েকটা শবাধার। ঘরের একদিকে মুখোমুখি বসিয়ে রাখা হয়েছে দুটো আর্মচেয়ার। একটা চেয়ারের পাশে দেখা যাচ্ছে ছোট একটা ডেস্ক। ওই ডেস্কের পেছনে গিয়ে বসল কর্নওয়ালিস। রূপালি একটা মন্ট ব্ল্যাঙ্ক কলম বের করল। একটা নোটপ্যাডের উপর রাখল সেটা।

‘শেষকৃত্যানুষ্ঠানটা আপনার নিজের,’ শুরু করল সে।

‘হ্যাঁ,’ হঠাৎ করেই প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছেন মিসেস ক্যুপার, কাজের কথায় চলে যেতে চাইছেন সরাসরি। ‘আমার মনে হয় ওই ব্যাপারে কোনো সমস্যা নেই আপনাদের এখানে।’

‘সমস্যা তো নেই-ই, বরং কারও ব্যক্তিগত কোনো চাহিদা থাকলে সেটা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখি আমরা। আজকাল পূর্বপরিকল্পিত অথবা ফরমায়েশি শেষকৃত্য প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের ব্যবসার। ক্লায়েন্ট যা চায়, তা তাদেরকে দেয়াটা আমাদের কর্তব্য। এখন আমাদের মধ্যে যে-আলোচনা হবে, সেটা শেষ হওয়ার পর আমাদের সব শর্ত যদি মেনে নেন আপনি, তা হলে সে-অনুযায়ী একটা ইনভয়েস দেয়া হবে আপনাকে। সেক্ষেত্রে, বন্ধু বা আত্মীয় বলতে যাঁরা আছেন আপনার, ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না তাঁদের। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বিশেষ সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার পর তাঁরা সবাই বলবেন, যা-কিছু হয়েছে, আপনার ইচ্ছা-অনুযায়ীই হয়েছে।’

মাথা ঝাঁকালেন মিসেস ক্যুপার। ‘চমৎকার। তা হলে কাজ শুরু করে দেয়া যাক, কী বলেন? …আমি চাই, কার্ডবোর্ডের কফিনে দাফন করা হবে আমাকে।

নোট নেয়া শুরু করতে যাচ্ছিল কর্নওয়ালিস, কিন্তু থমকে গেল। তার কলমের নিব যেন কাগজের উপর ভেসে-আছে বাতাসে। ‘কিছু মনে করবেন না, ম্যাডাম, আপনি কি পরিবেশ-বান্ধব কোনো শেষকৃত্যানুষ্ঠানের কথা ভাবছেন? সেক্ষেত্রে আমি পরামর্শ দেবো, রিসাইকেল-করা কাঠের কফিন ব্যবহার করতে পারেন। অথবা কার্ডবোর্ডের বদলে উইলো গাছের বাঁকানো কাঠও ব্যবহার করতে পারেন।’

‘কেন?’

‘কারণ কখনও কখনও দেখা গেছে, কার্ডবোর্ডের কফিন খুব একটা ভালো ফল দেয় না। তা ছাড়া… কিছু মনে করবেন না…উইলো কাঠ কিন্তু কার্ডবোর্ডের চেয়ে খুব বেশি দামি না। আর…ওটা দেখতেও অনেক আকর্ষণীয়।’

‘ঠিক আছে। এবার আসুন, কোন্ জায়গায় দাফন হতে চাই আমি, সে-ব্যাপারে কিছু কথা বলা যাক।

‘জী, ম্যাডাম, বলুন। ‘

‘ব্রম্পটন সেমেট্রি-তে, ঠিক আমার স্বামীর কবরের পাশে।’

‘তিনি কি কিছু দিন আগে মারা গেছেন?’

‘না, বারো বছর আগে।’ হ্যান্ডব্যাগ খুললেন মিসেস ক্যুপার, এক তা কাগজ বের করে নামিয়ে রাখলেন ডেস্কের উপর।

কাগজটার দিকে তাকাল কর্নওয়ালিস। ‘দেখা যাচ্ছে আপনি আগেই অনেক কিছু ভেবে রেখেছেন এই ব্যাপারে। যা লেখা আছে এই কাগজে, সেটার কিছুটা অংশ ধর্মীয়, বাকি অংশ… কী বলবো… মানবতাবাদী। ‘

একচিলতে হাসি দেখা দিল মিসেস ক্যুপারের ঠোঁটের কোনায় ‘একটা ধর্মসঙ্গীত, আর বিটসের একটা গানের কয়েকটা লাইন। একটা কবিতা, একটা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, আর কিছু প্রশংসাবাক্য। তবে খেয়াল রাখবেন, ওগুলো যেন বেশি বড় হয়ে না-যায়।’

‘ঠিক আছে…

.

নিজের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছিলেন ডায়ানা ক্যুপার, এবং সেটা দরকার ছিল তাঁর জন্য। কারণ ওই পরিকল্পনা করার ঘণ্টা ছয়েক পর, সেদিনই, খুন করা হয় তাঁকে।

তিনি যখন মারা যান, তখনও তাঁর ব্যাপারে কিছুই জানি না আমি। কীভাবে মারা গেছেন তিনি, সে-ব্যাপারেও কিছু শুনিনি। সম্ভবত পত্রিকার হেডলাইনটা নজর কেড়ে নিয়েছিল আমার… খুন হয়েছেন অভিনেতার মা… কিন্তু যে-ছবি আর যে-গল্প ছাপা হয়েছিল, সেগুলোতে ওই মহিলার ব্যাপারে যতটা না আলোচনা করা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল তাঁর সেই জনপ্রিয় অভিনেতা-ছেলেকে। যে-সময়ের কথা বলছি, তখন নতুন একটা আমেরিকান টিভি সিরিযের মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছে সে। একটু আগে যে- কথোপকথন উল্লেখ করেছি, সেটা প্রকৃতপক্ষে কাল্পনিক, কিন্তু পুরোপুরি বানোয়াট না। কারণ কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্স-এ শেষপর্যন্ত যেতে হয়েছিল আমাকে, কথা বলতে হয়েছিল রবার্ট কর্নওয়ালিস এবং আইরিন লযের সঙ্গে। (আইরিন, কর্নওয়ালিসের চাচাতো বোন।)

ফুলহ্যাম রোড ধরে সোজা হেঁটে গেলে ওই ফিউনারেল পার্লার খুঁজে বের করতে মোটেও কষ্ট হয় না। ঘরগুলো, যেমনটা বর্ণনা করেছি ওই কাল্পনিক কথোপকথনে, ঠিক সে-রকম। অন্য বর্ণনাগুলো আমি লিখেছি প্রত্যক্ষদর্শীদের- বিবৃতি আর পুলিশ-রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে।

ঠিক কখন সেই ফিউনারেল পার্লারে ঢুকেছিলেন মিসেস ক্যুপার, সেটা জানা গেছে; কারণ দুটো সিসিটিভি’র রেকর্ডে দেখা গেছে তাঁকে… একটা রাস্তার, অন্যটা যে-বাসে সওয়ার হয়ে সেদিন সকালে বাসা থেকে ফুলহ্যাম রোডে গিয়েছিলেন তিনি, সে-বাসের। অদ্ভুত একটা খেয়াল ছিল তাঁর… সব সময় গণপরিবহন ব্যবহার করতেন। অথচ শোফার-সহ একটা গাড়ির ব্যবস্থা করাটা কোনো ব্যাপারই ছিল না তাঁর জন্য।

বারোটা বাজার মিনিট পনেরো আগে ফিউনারেল পার্লার থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। হাঁটতে হাঁটতে এগোন সাউথ কেনসিংটন টিউব স্টেশনের দিকে। সেখানে গিয়ে সওয়ার হন পিকাডিলি লাইনে, পৌঁছে যান গ্রীন পার্কে। সেইন্ট জেমস’স স্ট্রীটের ‘ক্যাফে-মুরানো’ নামের একটা দামি রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ সেরে নেন এক বন্ধুর সঙ্গে। ওই রেস্তোরাঁ, ফোর্টনাম অ্যান্ড মেসন-এর কাছে অবস্থিত। যা-হোক, খাওয়ার পর রাস্তায় বেরিয়ে আসেন, একটা ট্যাক্সি ডেকে উঠে পড়েন সেটাতে, সোজা গিয়ে হাজির হন গ্লোব থিয়েটারে। তবে কোনো মঞ্চনাটক দেখার জন্য যাননি সেখানে। তিনি ছিলেন ওই থিয়েটারের পরিচালনা পরিষদের একজন সদস্য, সেদিন অংশ নিয়েছিলেন বিল্ডিঙের একতলায় অনুষ্ঠিত একটা মিটিঙে, দুপুর দুটোর সময় শুরু হয়ে বিকেল পাঁচটা বাজার কিছুক্ষণ আগপর্যন্ত চলেছিল সে-মিটিং। ছ’টা বাজার পাঁচ মিনিট পর বাসায় পৌঁছান। ততক্ষণে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে, তবে তাঁর সঙ্গে একটা ছাতা ছিল, বাসায় ঢোকার আগে সদর-দরজার কাছে একটা ভিক্টোরিয়ান স্ট্যান্ডের ভিতরে রাখেন ওটা।

ত্রিশ মিনিট পর কেউ একজন তাঁর গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করে তাঁকে।

চেলসি’র ঠিক পরই, ব্রিটানিয়া রোডের টেরেসওয়ালা সুন্দর-একটা-বাড়িতে থাকতেন তিনি। রাস্তায় কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না, কাজেই খুনটা যখন হয়েছে তখন কে ওই বাড়িতে ঢুকেছে অথবা বেরিয়ে গেছে, সেটা জানারও কোনো উপায় ছিল না। আশপাশের বাড়িগুলোও ছিল জনশূন্য। প্রতিবেশী ওই বাড়িগুলোর একটার মালিক দুবাইভিত্তিক একটা কনসোর্টিয়াম। সে-বাড়িতে থাকার প্রশ্নই আসে না মালিকপক্ষের, তাই সেটা ভাড়া দেয়া হয়েছিল। তবে মিসেস ক্যুপারকে যখন খুন করা হয়, তখন কোনো ভাড়াটে ছিল না ওই বাড়িতে। প্রতিবেশী অন্য একটা বাড়ির মালিক অবসরপ্রাপ্ত এক উকিল এবং তাঁর স্ত্রী। খুনটা যখন হয়েছে তখন তাঁরা দক্ষিণ ফ্রান্সে অবকাশ যাপন করছেন।

সুতরাং মিসেস ক্যুপারের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে রহস্যজনক কোনো কিছু শুনতে পায়নি কেউ।

টানা দু’দিন লাপাত্তা ছিলেন তিনি… মানে, ওই দু’দিন কেউ দেখেনি তাঁকে, তাঁকে নিয়ে কিছু শোনেওনি। তাঁর বাড়িতে কাজ করত আন্দ্রিয়া ক্লুভানেক নামের এক স্লোভাকিয়ান ক্লিনার, সপ্তাহে দু’দিন যেত সেখানে, এক বুধবার সকালে খুঁজে পায় সে লাশটা।

লিভিংরুমের মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে ছিলেন ডায়ানা ক্যুপার। পর্দা বাঁধার কাজে যে-রকম দড়ি ব্যবহৃত হয়, সে-রকম একটা লাল রঙের দড়ি পেঁচানো অবস্থায় ছিল তাঁর গলায়। ফরেনযিক রিপোর্ট বলছে, খুনি এত জোরে টান দিয়েছিল ওই দড়িতে যে, মিসেস ক্যুপারের গলার হায়োয়িড বোন ভেঙে গিয়েছিল, সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল দুই চোখের কনজাঙ্কটাইভা।

দৃশ্যটা আন্দ্রিয়ার জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। বছর দু’-এক ধরে ওই বাড়িতে কাজ করছিল সে, বেশ পছন্দ করত মিসেস ক্যুপারকে। কারণ তার সঙ্গে শুধু ভালো ব্যবহারই করতেন না তিনি, বরং কখনও কখনও তাকে কাজ শেষে ডেকে নিয়ে দু’জনে একসঙ্গে কফিও খেতেন। যা-হোক, আন্দ্রিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, ফিকে লাল রঙ ধারণ করেছিল মিসেস ক্যুপারের চেহারা। বিস্ফারিত দুই চোখে তাকিয়ে ছিলেন তিনি নিষ্পলক-নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে। মুখের বাইরে বীভৎস ভঙ্গিতে বেরিয়ে পড়েছে জিভটা… দৈর্ঘ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ। যেন কিছু-একটা আঁকড়ে ধরার ভঙ্গিতে সামনের দিকে বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল একটা হাত, অভিযোগ করার ভঙ্গিতে উঁচু হয়ে আছে সে-হাতের একটা আঙুল। হীরার একটা আংটি ওই আঙুলে। বাসার ভিতরে তখন সেন্ট্রাল হিটিং চলছে, পচতে শুরু করেছে লাশ, দুর্গন্ধ বের হচ্ছে।

পুলিশের কাছে যে-বিবৃতি দিয়েছে আন্দ্রিয়া, সে-অনুযায়ী, তখন চিৎকার করেনি সে। অসুস্থও হয়ে পড়েনি। ধীরে ধীরে পিছিয়ে এসে বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে, তারপর নিজের মোবাইল ফোন থেকে কল দেয় পুলিশের নম্বরে। পুলিশ না- পৌঁছানো পর্যন্ত আর ঢোকেনি ওই বাড়ির ভিতরে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পর পুলিশ অনুমান করে নেয়, চৌর্যবৃত্তির শিকার হয়েছেন ডায়ানা ক্যুপার। তাঁর কিছু গহনা আর একটা ল্যাপটপ কম্পিউটার খোয়া গেছে। কিছু-একটা তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে সারা বাড়ির বেশিরভাগ ঘরে, এবং যেসব ঘরে খোঁজ চালানো হয়েছে সেগুলো তছনছ করে ফেলা হয়েছে। তবে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যার ফলে ধারণা করে নেয়া যেতে পারে, কেউ একজন জোরপূর্বক ঢুকেছে ওই বাড়িতে। যে-লোক হামলা চালিয়েছে মিসেস ক্যুপারের উপর, স্পষ্ট বোঝা গেছে স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে সে-লোকের জন্য দরজা খুলে দিয়েছেন তিনি। তবে লোকটাকে তিনি চিনতেন কি না, বোঝা যায়নি। তবে এটা বোঝা গেছে, ওই দড়ি ব্যবহার করে হঠাৎ করেই পেছন থেকে ফাঁস লাগানো হয়েছিল তাঁর গলায়, এবং ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে গিয়েছিলেন তিনি। বলতে গেলে কোনো বাধাই দিতে পারেননি হামলাকারীকে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায়নি ঘটনাস্থলে, ডিএনএ অথবা অন্য কোনো জাতের ক্লু-ও পাওয়া যায়নি। তার মানে অনুমান করে নেয়া যেতে পারে, ভালোমতো ছক কষেই হাজির হয়েছিল খুনি। কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছিল সে মিসেস ক্যুপারকে। বাড়ির লিভিংরুমে ভেলভেটের পর্দা আছে, আর সেগুলোর পাশে আছে হুক; ওই হুক থেকেই খুলে নিয়েছিল সে লাল-রঙের দড়িটা। তারপর চুপিসারে হাজির হয়ে যায় মিসেস ক্যুপারের পেছনে, হঠাৎ করেই ফাঁস লাগিয়ে দেয় তাঁর গলায়, এরপর সজোরে টেনে ধরে দড়ির দুই প্রান্ত। মারা পড়তে মিনিটখানেকের বেশি লাগেনি মিসেস ক্যুপারের।

খোঁজখবর করতে শুরু করে পুলিশ। এবং মিসেস ক্যুপার যে সেদিনই কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্স-এ গিয়েছিলেন, সেটা জানতে পেরে আশ্চর্য হয়ে যায়। বুঝতে পারে, জটিল একটা ধাঁধার সম্মুখীন হয়েছে তারা।

ব্যাপারটা ভাববার মতো। নিজের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করে সেদিনই হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ঘটনা বিরল… ও-রকম কোনো নজির নেই বললেই চলে। কাজেই পুলিশ অনুমান করে নেয়, পুরো ব্যাপারটা কাকতালীয় না। মিসেস ক্যুপারের সেই-ফিউনারেল-পার্লারে যাওয়া এবং ঘণ্টা ছয়েক পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার মধ্যে কোনো-না-কোনো যোগসূত্র আছে। তাঁকে যে খুন করা হবে, সেটা কি কোনোভাবে জানতে পেরেছিলেন তিনি? কেউ কি তাঁকে সেই ফিউনারেল পার্লারে ঢুকতে এবং সেখান থেকে বের হতে দেখেছে? তারপর সুযোগ বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাঁর উপর? তিনি যে ওই পার্লারে গিয়েছিলেন, কে কে জানত সেটা?

ব্যাপারটা আসলেই রহস্যজনক। এবং সে-রহস্য ভেদ করার জন্য একজন স্পেশালিস্ট প্রয়োজন। তবে যে-সময়ের কথা বলছি তখন ওই ব্যাপারে তেমন কিছু করার ছিল না আমার।

কিন্তু ঘটনা বদলে যেতে বেশি সময় লাগল না।

২. হোথর্ন

যেদিন সন্ধ্যায় খুন হলেন ডায়ানা ক্যুপার, সেদিনের কথা মনে করতে কোনো কষ্ট হয় না আমার। আমি তখন এক্সমাউথ মার্কেটে ‘মোরো’ নামের একটা রেস্টুরেন্টে আমার স্ত্রীর সঙ্গে ডিনার করছি। সেদিন বিকেলেই আমার প্রকাশকের কাছে ই- মেইলে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম নতুন উপন্যাসটা। ওটা লিখতে টানা আট মাস খাটুনি করতে হয়েছিল আমাকে।

উপন্যাসটার নাম দ্য হাউস অভ সিল্ক। এ-উপন্যাসে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনা হয়েছে শার্লক হোমসকে। আমি কখনও ভাবিনি, কিংবদন্তির গোয়েন্দা চরিত্রকে নিয়ে কিছু লিখবো। আমার কাছে একদিন হঠাৎ করেই হাজির হলেন কোনান ডয়েল এস্টেটের কয়েকজন কর্মকর্তা। হোমসের নতুন কোনো উপন্যাস লেখার দায়িত্ব দিতে চাইছিলেন তাঁরা কাউকে। সুযোগ পাওয়ামাত্র যেন ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমি। আমার বয়স যখন সতেরো, হোমসের কাহিনিগুলো পড়েছিলাম তখন। তারপর থেকে, সারাটা জীবন ধরে, ওই গল্পগুলো রয়ে গেছে আমার সঙ্গে। আমি মনে করি, হোমস, সমস্ত আধুনিক গোয়েন্দা চরিত্রের বাবা। কিন্তু শুধু সে-কারণেই ওকে ভালোবাসিনি আমি। ওর প্রতিটা কাহিনিই দুর্দান্ত ছিল… কিন্তু সেটাও ওই চরিত্রকে ভালোবাসার একমাত্র কারণ না। আসলে হোমস আর ওয়াটসনের সেই জগত্‍টা… সে-সময়ের থেমস নদীর ধারের লন্ডনটা– খোয়াবিছানো পথের উপর দিয়ে ঘর্ঘর শব্দে ছুটে-চলা চারচাকার সেই হ্যাঁনসাম ক্যাব, সেই গ্যাসল্যাম্প, আর পাক খেয়ে- খেয়ে ভাসতে-থাকা সেই কুয়াশা… সব কিছু যেন অমোঘ একটা আকর্ষণ জাগিয়ে তুলেছিল আমার মনে। ওসব যেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল আমাকে… ২২১বি বেকার স্ট্রীটে হাজির হয়ে সাহিত্য-ইতিহাসের সবচেয়ে-বড়-বন্ধুত্বটা প্রত্যক্ষ করার। সে- নিমন্ত্রণ কী করে প্রত্যাখ্যান করি?

আমার দায়িত্ব ছিল, উপন্যাসের শুরুতেই নিজেকে লুকিয়ে ফেলা– কোনান ডয়েলের ছায়ায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। তাঁর যেসব সাহিত্যিক-ঢং ছিল, সোজা কথায়, সেগুলো অনুকরণ করা। এবং অনুপ্রবেশকারীদের মতো নিজস্ব কোনো কায়দায় কোনো বর্ণনা জুড়ে না-দেয়া। ওই উপন্যাসের প্রতিটা লাইন লেখার সময় ভেবেছি, কোনান ডয়েল নিজে যদি লিখতেন সেটা, তা হলে কীভাবে লিখতেন? মোদ্দা কথা, স্থান-কাল-পাত্র এবং ঘটনার বর্ণনা এমনভাবে দেয়ার চেষ্টা করেছি, যাতে আমার কোনো ছাপই যাতে না-থাকে ওই উপন্যাসে।

যে-সময়ের কথা বলছি, তখন আমি একজন কিশোর-সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত। এবং, সত্যি বলতে কী, মনে মনে আশা করছিলাম, দ্য হাউস অভ সিল্কউপন্যাসটা আমার সে-পরিচয় পাল্টে দেবে। কেন একজন কিশোর-সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত ছিলাম, তা-ও একটু বলি। অ্যালেক্স রাইডার নামের টিনএজার এক গুপ্তচরকে নিয়ে ২০০০ সালে একটা সিরিয লিখতে শুরু করি আমি। ওই সিরিযের জনপ্রিয়তাও বাড়তে শুরু করে একসময়, সারা বিশ্বব্যাপী বিক্রি হতে শুরু করে বইগুলো। শিশু-কিশোরদের জন্য বই লিখছিলাম ঠিকই, কিন্তু একইসঙ্গে এটাও টের পাচ্ছিলাম, আসলে যা লিখতে চাই আমি, সেটা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি আস্তে আস্তে। ওদিকে বয়সও থেমে নেই… পঞ্চান্নতে পা দিয়ে ফেলেছি। কাজেই অন্য কোনো দিকে সরে যাওয়ার একটা তাগাদা অনুভব করছিলাম আসলে। মনে আছে, তখন একটা সাহিত্য-উৎসবে অ্যালেক্স রাইডার সিরিযের দশম বই স্করপিয়া রাইযিং নিয়ে আলোচনা করার কথা ছিল আমার।

আরও একটা কাজ ছিল আমার হাতে তখন। ‘টিনটিন টু’ নামের একটা চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য সম্পাদনা করার জন্য ভাড়া করা হয়েছিল আমাকে। এবং কাজটা করেছিলেন প্রবাদপ্রতিম চিত্রপরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ স্বয়ং। সিনেমাটা পরিচালনা করার কথা ছিল পিটার জ্যাকসনের। তখন আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না, চিত্রজগতের সবচেয়ে বড় দু’জন পরিচালকের সঙ্গে কাজ করছি। কীভাবে ঘটে গেল ঘটনাটা, সে-ব্যাপারে আজও আমি নিশ্চিত না।

অস্বীকার করে লাভ নেই, বেশ নার্ভাস ছিলাম তখন। ওই চিত্রনাট্য কম-করে- হলেও বারোবার পড়ে ফেলেছি, নিজের সেরাটা ঢেলে দেয়ার চেষ্টা করছি ওই কাজে। বার বার ভাবছি, চরিত্রগুলো কি ঠিকমতো বর্ণনা করা হয়েছে? ঘটনার ধারাবাহিকতা কি ঠিকমতো সাজানো হয়েছে? যে-সময়ের কথা বলছি, তখন সপ্তাহখানেকের মধ্যে লন্ডনে একসঙ্গে হাজির হওয়ার কথা জ্যাকসন আর স্পিলবার্গের। তাঁদের সঙ্গে দেখা করার কথা আমার, তাঁদের শলাপরামর্শ নেয়ার কথা।

একদিন হুট করে বেজে উঠল আমার মোবাইল।

স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে দেখি, নম্বরটা অপরিচিত। ভাবলাম, জ্যাকসন বা স্পিলবার্গ কেউ ফোন করেছেন নাকি? সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করে দিলাম চিন্তাটা। তাঁদের কেউ সরাসরি ফোন করবেন না আমাকে। তাঁদের কোনো অ্যাসিস্টেন্ট হয়তো করতে পারে… লাইনে আমি আছি কি না সে-ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর ফোন দিতে পারে তাঁদের কাউকে। ঘড়ির দিকে তাকালাম। সকাল দশটা। নিজের ফ্ল্যাটের টপ ফ্লোরে, অফিসরুমে বসে আছি; রেবেকা ওয়েস্টের লেখা দ্য মিনিং অভ ট্রিযন বইটা পড়ছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ব্রিটেনের উপর লেখা ওই উপন্যাস একটা ক্লাসিক। বইটা বন্ধ করে তুলে নিলাম মোবাইল ফোন।

‘টনি?’ একটা কণ্ঠ জানতে চাইল।

নিশ্চিত হয়ে গেলাম, স্পিলবার্গ অথবা তাঁর কোনো সহকারী ফোন করেনি। কারণ খুব কম লোকই আমাকে টনি নামে ডাকে। সত্যি বলতে কী, নামটা পছন্দ করি না আমি। আমার আসল নাম অ্যান্টনি। বন্ধুরা কেউ কেউ বলে, অ্যান্ট।

‘হ্যাঁ, বলছি,’ বললাম আমি।

কেমন আছেন, মেইট? আমি হোথর্ন।’

সে ওর নামটা বলার আগেই ওকে চিনতে পেরেছি। স্বরবর্ণের নীরস উচ্চারণ, কথার সেই অদ্ভুত টান– কিছুটা লন্ডনবাসীদের মতো, আবার কিছুটা উত্তরাঞ্চলের মানুষদের মতো… এবং সবচেয়ে বড় কথা সেই ‘মেইট’ শব্দটা। হোথর্ন ছাড়া আর কারও ট্রেডমার্ক না এসব।

‘মিস্টার হোথর্ন,’ বললাম আমি, ‘আপনার ফোন পেয়ে ভালো লাগছে।’

আমাদের যখন পরিচয় হয়েছিল, তখন জানতে পেরেছিলাম, ওর নামের প্রথম অংশটা ড্যানিয়েল। কিন্তু ওই নাম ব্যবহার করতে কেমন যেন অস্বস্তি লাগে আমার। সে নিজেও তেমন একটা ব্যবহার করে না নামটা। অন্য কাউকেও ওটা ব্যবহার করতে শুনিনি কখনও।

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, হোথর্নের কণ্ঠ অধৈর্য। ‘সময় আছে আপনার হাতে?’

‘কেন, কী হয়েছে?’

‘আপনার সঙ্গে দেখা করা যায় কি না ভাবছিলাম। আজ বিকেলে কী করছেন?’ এ-রকম কথাবার্তাও হোথর্নের ট্রেডমার্ক। আগামীকাল অথবা আগামী সপ্তাহে দেখা করতে পারবো কি না ওর সঙ্গে, সেটা জিজ্ঞেস করছে না সে; বরং যেইমাত্র আমাকে প্রয়োজন হয়েছে ওর, সঙ্গে সঙ্গে সে-প্রয়োজন মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ ওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হলে এখনই করতে হবে আমাকে, এবং সেটা ওর প্রয়োজন অনুযায়ীই।

একটু আগেই বলেছি, সেদিন তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ ছিল না আমার হাতে, কিন্তু সেটা হোথর্নকে বলতে যাবো কেন? তাই বললাম, ‘আসলে… আমি ঠিক নিশ্চিত না…

‘যে-ক্যাফেতে দেখাসাক্ষাৎ করতাম আমরা একসময়, আজ বিকেল তিনটার সময় সেখানে আসতে পারবেন?’

‘জে অ্যান্ড এ?’

‘হ্যাঁ। আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করার আছে আমার। যদি সময় দিতে পারেন, খুব ভালো হয়… কৃতজ্ঞ থাকবো আপনার প্রতি।

জে অ্যান্ড এ ক্যাফেটা ক্লার্কেনওয়েলে… আমি যেখানে থাকি সেখান থেকে হেঁটে যেতে দশ মিনিটের মতো লাগে। অনুরোধটা এড়িয়ে যাওয়ার মতো যুৎসই কোনো অজুহাতও মনে পড়ল না চট করে। তা ছাড়া… সত্যি বলতে কী… প্ৰচ্ছন্ন একটা আগ্রহ বোধ করতে শুরু করেছি হঠাৎ করেই।

‘ঠিক আছে,’ বললাম আমি, ‘তিনটার সময় দেখা হবে।’

‘খুব ভালো, মেইট। দেখা হবে।’

লাইন কেটে দিল হোৰ্থন।

আমার সামনে কম্পিউটারের স্ক্রীনে টিনটিনের চিত্রনাট্য। ওটা বন্ধ করে দিলাম আমি। হোথর্নকে নিয়ে ভাবছি।

ইনজাস্টিস নামের একটা পাঁচ-পর্বের টেলিভিশন সিরিযের জন্য একবার কাজ করছিলাম আমি, সে ঘটনার আগের বছর হোথর্নের সঙ্গে পরিচয় হয় আমার। ওই সিরিযে একটা গোয়েন্দা চরিত্র ছিল, তাকে হোথর্নের আদলে তৈরি করি আমি– ভয়ঙ্কর, বর্ণবাদী, রগচটা এবং আক্রমণাত্মক। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, হোথর্ন মোটেও সে-রকম কেউ না। অন্ততপক্ষে বর্ণবাদী তো না-ই। তবে আমার কাছে সব সময়ই বিরক্তিকর মনে হয়েছে ওকে। মনে হয়েছে, আমি যে-রকম, সে ঠিক তার উল্টো।

ওই সিরিযে প্রোডাকশন সুপারভাইযারের দায়িত্বে যিনি ছিলেন, তিনিই হোথর্নের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন আমাকে। তখন জানতে পারি, হোর্থন হচ্ছে লন্ডনের মেট্রোপলিটান পুলিশ সার্ভিসের একজন ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর, পাটনি’র সাব কমান্ডের বাইরে আছে আপাতত। হোমিসাইড স্পেশালিস্ট বলতে যা বোঝায়, সে ঠিক তা-ই। দশ বছর ধরে কাজ করছিল পুলিশফোর্সে। চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে ওকে… কারণটা ঠিক জানা নেই আমার।

যা-হোক, অপরাধ জগৎ নিয়ে লেখালেখি করতে হলে অথবা সিনেমা-নাটক বানাতে গেলে পুলিশের-এককালের-অফিসারদের সঙ্গে কমবেশি খাতির রাখতে হয়। কারণ তাঁরা এমন সব তথ্য দিতে পারেন, যেগুলো গল্প-উপন্যাসে অথবা নাটক-সিনেমায় যোগ করা হলে কাহিনিটা সত্যি বলে মনে হয়। আর হোথর্ন ছিল ওই কাজে ঝানু। আমি কী চাই, তা চট করে বুঝে ফেলার সহজাত একটা প্রবৃত্তি ছিল ওর ভিতরে। একটা উদাহরণ দিই। একবার এক কাহিনিতে আমার কল্পনার গোয়েন্দাচরিত্র এক সপ্তাহের পুরনো একটা লাশ দেখতে যায়। তাকে তখন নাকের নিচে মাখার জন্য ভিক্স-ভ্যাপোরাব দেয় ক্রাইম সিন একযামিনার। এক সপ্তাহ ধরে পচেছে লাশ, কাজেই বিকট গন্ধ বের হতে থাকবে ওটা থেকে, সুতরাং নাকের নিচে যদি ওই মেনথোলেটাম লাগিয়ে নেয় আমার গোয়েন্দা, তা হলে সেটা ভালো হবে ওর জন্য– মলমের গন্ধের নিচে চাপা পড়ে যাবে পচা-লাশের দুর্গন্ধ। বলা বাহুল্য, বুদ্ধিটা আমার না, হোথর্নের।

ইলেভেন্থ আওয়ার ফিল্মসের প্রোডাকশন অফিসে প্রথম দেয়া হয় ওর সঙ্গে। আমি যে-সিরিযের কথা বলেছি একটু আগে, সেটা বানাচ্ছিল ওই প্রতিষ্ঠান। প্রথম পরিচয়ের পরই যখন-তখন যোগাযোগ করতে লাগলাম হোথর্নের সঙ্গে, এটা-সেটা জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। ওসব কাজ টেলিফোনেই সেরে নেয়া যেত।

মনে আছে, প্রথমবার যখন দেখি হোথর্নকে, তখন ওই প্রোডাকশন অফিসের রিসিপশন এরিয়ায় পায়ের উপর পা তুলে বসে ছিল সে, রেইনকোটটা খুলে ভাঁজ করে রেখেছিল কোলের উপর। ওকে দেখামাত্র বুঝতে পারি, ওর সঙ্গেই দেখা করার কথা আমার।

সে বিশালদেহী কেউ না। এবং প্রথম দেখায় মোটেও ভয়ঙ্কর বলে মনে হয় না ওকে। কিন্তু আমাকে দেখামাত্র যেভাবে দাঁড়িয়ে গেল, সে-ভঙ্গি দেখে কোনো প্যান্থার বা চিতাবাঘের কথা মনে পড়ে গেল আমার। অত মসৃণ আর ক্ষিপ্র গতিতে কোনো মানুষকে কখনও উঠে দাঁড়াতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বিদ্বেষ বা অপচিকীর্ষায় যেন জ্বলজ্বল করছে ওর হালকা বাদামি দুই চোখ। মনে হলো, আমাকে যেন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে সে, যেন হুমকি দিচ্ছে নিঃশব্দে। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। খুবই ছোট করে কাটিয়ে-রাখা চুলের রঙ ঠাহর করা যায় না চট করে। ওগুলো ওর দুই-কানের কাছে ধূসর হতে শুরু করেছে। দাড়িগোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো। গায়ের রঙ পাণ্ডুর। কল্পনা করে নিলাম, যখন ছোট ছিল সে, তখন সুন্দর ছিল; কিন্তু তারপর ওর জীবনে এমন কিছু-একটা ঘটেছে, যার ফলে কুৎসিত-না- হওয়ার পরও আকর্ষণীয়-বলতে-যা-কিছু ছিল ওর চেহারায় সব বিদায় নিয়েছে। ব্যাপারটা যেন এ-রকম: সে নিজেই পরিণত হয়েছে নিজের বাজে একটা ফটোগ্রাফে।

স্যুট, সাদা শার্ট আর টাই পরেছে সে; স্মার্ট দেখাচ্ছে ওকে। উঠে দাঁড়ানোয় রেইনকোটটা এখন ভাঁজ করা অবস্থায় আছে এক হাতের উপর। তাকিয়ে আছে আমার দিকে, আরও বেশি জ্বলজ্বল করতে শুরু করেছে চোখ দুটো… যেন কৌতূহল অতি-মাত্রায় পেয়ে বসেছে ওকে… আমি যেন চমকে দিয়েছি ওকে।

‘হ্যালো, অ্যান্টনি,’ বলল সে, ‘আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল।’

আমি কে, সেটা সে জানল কী করে? অফিসে অনেকেই আসছে এবং যাচ্ছে, কেউই আমার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেনি, আমার নাম উচ্চারণ করেনি। আমিও ওকে কিছু বলিনি।

তা হলে?

‘আমি আপনার লেখালেখির একজন ভক্ত বলতে পারেন,’ বলছে হোথর্ন, কিন্তু ওর বলার ভঙ্গি দেখেই বুঝলাম, আমার একটা লেখাও পড়েনি কখনও।

‘ধন্যবাদ, ভদ্রতা করলাম আমি। ‘আমিও আপনার সঙ্গে কাজ করার জন্য মুখিয়ে আছি।’

‘মজা হবে তা হলে।’

কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, হোথর্নের সঙ্গে কাজ করে একটুও মজা পাইনি আমি।

আগেও বলেছি, টেলিফোনে ওর সঙ্গে প্রায়ই কথা হতো আমার। ছয়-সাতবার দেখাও করেছি বিভিন্ন জায়গায়। কখনও কখনও ওই প্রোডাকশন কোম্পানির অফিসে, কখনও আবার জে অ্যান্ড এ’র বাইরে। (ধূমপানের বদভ্যাস আছে হোথর্নের, চেইনস্মোকার বলা যায় ওকে… ল্যাম্বার্ট অ্যান্ড বাটলার অথবা রিচমন্ডের মতো সস্তা সিগারেট খায় বেশিরভাগ সময়। )

জানতে পারলাম, এসেক্সে থাকে সে, কিন্তু সেটা ঠিক কোন্ জায়গায়, সে- ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো ধারণা পেলাম না। নিজের ব্যাপারে কখনোই কিছু বলত না সে। পুলিশফোর্সে থাকতে কী করত না-করত, সে-ব্যাপারেও কিছু বলত না কখনও। কেন হঠাৎ বরখাস্ত করা হয়েছে ওকে, তা নিয়ে ভুলেও কোনো শব্দ উচ্চারণ করেনি কোনোদিন।

কিন্তু আমার কৌতূহল কি আর থেমে থাকে? তাই একদিন গিয়ে ধরলাম সেই প্রোডাকশন সুপারভাইযারকে।

জানা গেল, বেশ কয়েকটা হাই-প্রোফাইল মার্ডার ইনভেস্টিগেশনে কাজ করেছে হোথর্ন। এবং বেশ নামডাকও আছে ওর। গুগলে সার্চ দিলাম ওর নামটা, কিন্তু কিছু পাওয়া গেল না।

অসাধারণ একটা মন… বলা ভালো, কল্পনাশক্তির অধিকারী সে। লেখালেখির কোনো অভ্যাস নেই, কোনো পরিকল্পনাও নেই ওই ব্যাপারে। আমার সেই সিরিয নিয়েও বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই ওর। তারপরও, যখনই ওই সিরিযের চিত্রনাট্যের কোনো একটা ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতাম ওর সঙ্গে, ঘটনার শেষটা বলে দিত সে, এবং আশ্চর্য হয়ে টের পেতাম, ঠিক সে-রকম কিছু-একটাই ভেবে রেখেছিলাম আমি। আবারও একটা উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হয়ে যাবে ব্যাপারটা। ওই চিত্রনাট্যের একজায়গায় ছিল, আমার সেই গোয়েন্দাচরিত্র, কৃষ্ণাঙ্গ একটা ছেলেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে পুলিশের হাত থেকে। পুলিশ ওই ছেলের বিরুদ্ধে একটা মেডেল চুরির অভিযোগ এনেছে। বলা হচ্ছে, মেডেলটা নাকি পাওয়া গেছে ওই ছেলের জ্যাকেটের পকেটে। কিন্তু সে-মেডেল হাতে নিয়ে দেখা গেল, সম্প্রতি পরিষ্কার করা হয়েছে সেটা। তারপর পরীক্ষা করা হলো ওই ছেলের জ্যাকেটের পকেট, কিন্তু সালফেইমিক অ্যাসিড অথবা অ্যামোনিয়ার কোনো নমুনা পাওয়া গেল না– ওগুলোই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় রূপার জিনিসপত্র পরিষ্কার করার কাজে। তার মানে প্রমাণিত হয়ে গেল, ছেলেটার জ্যাকেটের পকেটে ওই মেডেল থাকতে পারে না। অর্থাৎ, ওটা চুরি করেনি সে।

বলা বাহুল্য, এই আইডিয়াও ছিল হোথর্নের

আমাকে যে পদে-পদে সাহায্য করেছে সে, সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই আমার। তারপরও ওর সঙ্গে যতবার যোগাযোগ করেছি, যতবার দেখা করেছি, অদ্ভুত এক শঙ্কা ততবার কাজ করেছে আমার মনে। অকাজের কথা একটাও বলতে রাজি না সে… যতবার কথা হয়েছে ওর সঙ্গে প্রায় ততবারই সরাসরি চলে গেছে মূল প্রসঙ্গে। ভাবখানা এমন, দুনিয়ার কোনো কিছু নিয়েই কোনো আগ্রহ নেই ওর। লোকে এটা-সেটা নিয়ে কত কথা বলে… আবহাওয়া অথবা সরকার থেকে শুরু করে ফুকুশিমার সাম্প্রতিক ভূমিকম্প অথবা প্রিন্স উইলিয়ামের বিয়ে; কিন্তু হাতে যে-কাজ আছে সেটা ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কখনও একটা কথাও বলতে শুনিনি হোথৰ্নকে।

ওর আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করেছি। যতবার আমার সঙ্গে সময় কাটিয়েছে, কফি (কালো, চিনিসহ) খেয়েছে, সিগারেট টেনেছে, কিন্তু কোনো খাবার খায়নি। এমনকী বিস্কিটও না। এবং সব সময় একই কাপড় পরে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। সুতরাং, ওই যে বলেছিলাম, সে নিজেই যেন পরিণত হয়েছে নিজের বাজে একটা ফটোগ্রাফে– সেই একই ফটো বার বার দেখতে হয়েছে আমাকে। সেই ফটোর যেমন কোনো পরিবর্তন নেই, ওরও তেমন কোনো পরিবর্তন নেই।

মজার কথা হলো, আমার ব্যাপারে অগাধ জ্ঞান হোথর্নের। আমার প্রায় সব কিছুই জানে সে। ওর সঙ্গে যেদিন প্রথমবার দেখা হলো, তার আগের রাতে গলা ভেজানোর জন্য বাসার বাইরে গিয়েছিলাম। আমার সহকারী অসুস্থ ছিল, সপ্তাহান্তের দুটো দিন বুঁদ হয়ে ছিলাম আমি লেখালেখির কাজে। আশ্চর্য, কথাগুলো আমাকে গড়গড় করে বলে দিল হোথর্ন! অফিসের কারও সঙ্গে আমার ব্যাপারে কথা বলছিল কি না সে, ভাবলাম। কিন্তু বললেই বা কী… যে-কথা বলে আমাকে তাজ্জব বানিয়ে দিয়েছে সে, সেটা তো জানার কথা না অফিসের কারও!

যা-হোক, আমার সেই চিত্রনাট্যের দ্বিতীয় খসড়াটা যখন দেখালাম ওকে, ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কের অবনতিটা ঘটল তখনই। ঘটনাটা বলার আগে আরেকটা কথা বলে রাখি। সে-সময় কোনো একটা পর্বের শুটিং শুরু হওয়ার আগে ওই পর্বের চিত্রনাট্য লেখা এবং সম্পাদনার কাজটা কমপক্ষে বারোবার করতে হতো আমাকে কারণ কখনও এটা-সেটা বিভিন্ন বিষয় পরিবর্তন করতে বলতেন প্রযোজক নিজেই, কখনও আবার সেটা করতে বলত আমাদের ব্রডকাস্টার। কখনও বলত আমার এজেন্ট, আবার কখনও পরিচালক বা কোনো অভিনেতা-অভিনেত্রী। আসল কথা হচ্ছে, সবাই চাইত, কোনো খুঁত বা সমস্যা যাতে না-থাকে সেই চিত্রনাট্যে।

কিন্তু হোথর্ন ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। এই ব্যাপারে ওর আচরণ ছিল ইট- দিয়ে-বানানো নিরেট কোনো দেয়ালের মতো। এই ব্যাপারে একবার যদি সে মনে করত কোথাও কোনো ভুল হয়েছে, তা হলে ওকে বোঝানোটা ছিল এককথায় অসম্ভব।

আরও একটা উদাহরণ দেয়া যাক। চিত্রনাট্যের একজায়গায় আমার গোয়েন্দা দেখা করতে গেছে ওর সিনিয়র অফিসার… অর্থাৎ পুলিশের একজন চীফ সুপারিনটেন্ডেন্টের সঙ্গে। কোথায় দেখা করতে গেছে তা-ও বলি… প্রত্যন্ত এক ফার্মহাউসের ভিতরে আবিষ্কৃত হয়েছে এক প্রাণীঅধিকার-কর্মীর লাশ, সেখানে। ওকে বসতে বলেছেন চীফ সুপারিনটেন্ডেন্ট, কিন্তু জবাবে সে বলছে, ‘আপনি যদি কিছু মনে না-করেন, তা হলে দাঁড়িয়েই থাকি আমি, স্যর।’

আসলে আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কিছুটা হলেও ঝামেলা আছে আমার গোয়েন্দা চরিত্রের। কিন্তু হোথর্ন সেটা মানতে নারাজ।

ও-রকম কখনও হয় না,’ সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিল সে।

কোনো একটা রেস্টুরেন্টের বাইরে বসে ছিলাম আমরা সেদিন… ঠিক কোথায় বসে ছিলাম তা এখন আর মনে নেই; আমাদের দু’জনের মাঝখানে একটা টেবিলের উপর রাখা ছিল চিত্রনাট্যের পাণ্ডুলিপিটা। বরাবরের মতো হোথর্নের পরনে স্যুট আর টাই। প্যাকেটের শেষ সিগারেটটা খাচ্ছে সে, খালি প্যাকেটটা ব্যবহার করছে অ্যাশট্রে হিসেবে।

‘কেন হয় না?’ জানতে চাইলাম আমি।

‘কারণ আপনার সিনিয়র কোনো কর্মকর্তা যদি বসতে বলেন আপনাকে, তা হলে আপনাকে বসতেই হবে।’

‘আমার গোয়েন্দা-চরিত্র যে বসেনি, সেটা তো কোথাও বলিনি আমি।’

‘না, তা বলেননি, তবে সে ব্যাপারটা নিয়ে তর্ক করেছে। (ছাপার অযোগ্য একটা গালি দিয়ে বসল হোথর্ন) আপনার গোয়েন্দাচরিত্র এ-রকম বোকাটে কেন, বুঝলাম না।’

কথায় কথায় গালি দেয়ার বদভ্যাসও আছে ওর।

‘আসলে ঘটনার সঙ্গে… বলা ভালো দৃশ্যটার সঙ্গে দর্শককে পরিচয় করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি আমি ওই সংলাপের মাধ্যমে,’ বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলাম। ‘তার চেয়েও বড় কথা, দু’জন পুলিশ অফিসারের পারস্পরিক সম্পর্কটা ফুটে উঠেছে ওই সংলাপের মধ্য দিয়ে।’

‘কিন্তু ভুল করেছেন আপনি, টনি, মিথ্যা একটা দৃশ্যের অবতারণা করেছেন। আনাড়ির মতো হয়ে গেছে কাজটা।’

‘মিথ্যা দৃশ্য? বাস্তব জীবনে যেমনটা ঘটে, টেলিভিশনের কোনো সিরিযে কি ঠিক তা-ই দেখানো হয়? টিভিতে পুলিশ, ডাক্তার, নার্স বা অপরাধীদের দেখে যা শিখি আমরা, তাদেরকে নিয়ে যখন কিছু লিখি, সেই শিক্ষাটাই কিন্তু তখন ঘুরপাক খেতে থাকে আমাদের মস্তিষ্কে… আমরা সে-শিক্ষা দ্বারা অনুপ্রাণিত হই। বাস্তবের পুলিশ, ডাক্তার, নার্স বা অপরাধী কেমন হয়, সেটা কিন্তু ভাবি না আমরা বেশিরভাগ সময়ই।’

কিন্তু ব্যাপারটা হোথর্নকে বোঝানো গেল না কিছুতেই। আমার সঙ্গে রীতিমতো তর্ক জুড়ে দিল সে… বিশেষ করে যেসব দৃশ্যে পুলিশি কর্মকাণ্ড আছে, সেসব নিয়ে। কিছুতেই বোঝাতে পারলাম না ওকে, আমি যা লিখেছি তা একটা কল্পকাহিনি মাত্র, কোনো ডকুমেন্টারি ফিল্ম না।

কাজেই পাঁচ পর্বের ওই ধারাবাহিকের সবগুলো চিত্রনাট্য যখন লেখা হলো শেষপর্যন্ত, যখন সেগুলো তুলে দিতে পারলাম যথাযথ কর্তৃপক্ষের হাতে, এবং যখন আর যোগাযোগ করার দরকার থাকল না হোথর্নের সঙ্গে, তখন আমি যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এটা-সেটা জানার যদি দরকার হতো কখনও, প্রোডাকশন অফিসকে বলে দিতাম, ওরাই তখন ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করত হোথর্নের সঙ্গে।

সাফোক আর লন্ডনে চিত্রায়িত হলো ওই সিরিয। চার্লি ক্রিড-মাইল্স্ নামের দুর্দান্ত এক অভিনেতা অভিনয় করলেন আমার সেই গোয়েন্দা-চরিত্রে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তাঁর সঙ্গে হোথর্নের শারীরিক গঠনের খুব মিল। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, হোথর্ন ততদিনে ঢুকে পড়েছে আমার অবচেতন মনে… আমার চরম বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে; কাজেই ওর চরিত্রের খারাপ দিকগুলো হয়তো অবচেতনভাবেই আমি ঢুকিয়ে দিতে শুরু করেছি আমার গোয়েন্দা-চরিত্রের ভিতরে। তার নামও আমি রেখেছিলাম হোথর্নের নামের সঙ্গে মিলিয়ে- ড্যানিয়েলের সঙ্গে মিল রেখে মার্ক, আর হোথর্নের সঙ্গে মিল রেখে ওয়েনবর্ন। চার নম্বর পর্বের শেষে যখন মার্ক ওয়েনবর্নকে মেরে ফেললাম আমি, স্বীকার করছি, তখন একটুখানি হলেও হাসি ফুটে উঠেছিল আমার ঠোঁটের কোনায়।

ফিরে আসি বর্তমানে। হোথর্ন কেন হঠাৎ দেখা করতে চাইছে আমার সঙ্গে, ভাবছি। আমার যে-জগৎ, তাতে ওর কোনো ভূমিকা নেই। এবং ওকে এই মুহূর্তে কোনো কাজে দরকারও নেই আমার। আবার এই কথাও সত্যি, এখনও লাঞ্চ সারিনি, আর ওদিকে লন্ডনের সেরা যত কেক আছে সব পাওয়া যায় জে অ্যান্ড এ-তে।

শেষপর্যন্ত ঠিক সময়েই গেলাম জায়গামতো।

রেস্টুরেন্টের বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে হোথর্ন, একটা টেবিলের ধারে কফি আর সিগারেট নিয়ে বসেছে। শেষবার যখন দেখেছিলাম ওকে, তখন ওর পরনে যা ছিল, এখনও তা-ই আছে: সেই একই স্যুট, একই টাই, একই রেইনকোট। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে মুখ তুলে তাকাল, মাথা ঝাঁকাল।

‘শুটিং কেমন হলো আপনাদের?’ জানতে চাইল।

‘কাস্ট এবং ক্রু-স্ক্রীনিঙের সময় আসা উচিত ছিল আপনার,’ বললাম আমি। ‘লন্ডনের একটা হোটেল ভাড়া নিয়ে সেখানে প্রথম দুটো পৰ্ব দেখিয়েছিলাম আমরা। আপনাকে নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ওই অনুষ্ঠানে।’

‘ব্যস্ত ছিলাম আমি তখন,’ বলল সে।

একজন ওয়েইট্রেস এগিয়ে এল আমাদের দিকে। চা আর একটুকরো ভিক্টোরিয়া স্পঞ্জের অর্ডার দিলাম আমি। তারপর তাকালাম হোথর্নের দিকে। ‘কেমন আছেন?’

অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল সে। ‘আছি একরকম… কোনো অভিযোগ নেই আর কী। গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন মনে হয়?’

ঘটনাক্রমে সেদিন সকালেই ফিরেছি আমি সাফোক থেকে। আমার স্ত্রীকে নিয়ে দুটো দিন কাটিয়েছি সেখানে।

‘হ্যাঁ,’ ক্লান্ত গলায় বললাম।

‘নতুন একটা কুকুরছানাও পেয়ে গেছেন বোধহয়!’

কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালাম হোথর্নের দিকে। এটা ওর আরেকটা ট্রেডমার্ক। নিজে থেকে যদি কিছু না-ও বলি আমি ওকে, এটা-সেটা বিভিন্ন কথা বলে দেয় সে আমার ব্যাপারে। কী করে করতে পারে কাজটা, সে-ই ভালো জানে। লন্ডনের বাইরে গিয়েছিলাম আমি, সেটা এখন-পর্যন্ত জানাইনি কাউকে। এমনকী টুইটারেও কিছু লিখিনি ওই ব্যাপারে। আর ওই কুকুরছানার কথা যদি বলি… ওটা আমাদের এক প্রতিবেশীর। তাঁরা একটা কাজে বাড়ির বাইরে ছিলেন কিছু দিন, তখন ওটার দেখভাল করতে হয়েছে আমাদেরকে।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি জানলেন কীভাবে?’

‘অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান,’ আমার প্রশ্নটা পাশ কাটিয়ে গেল হোথর্ন। ‘যা-হোক, কাজের কথায় আসি। একটা ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করতে পারবেন?

‘যেমন?’

‘আমাকে নিয়ে কিছু লিখতে পারবেন?’

যতবার দেখা হয়েছে হোথর্নের সঙ্গে, কিছু-না-কিছু বলে আমাকে চমকে দিয়েছে সে… আজ আরও একবার চমকে উঠলাম।

‘মানে?’

‘আমি চাই আমাকে নিয়ে একটা বই লিখুন আপনি।’

‘সেটা কেন করতে যাবো আমি?’

‘টাকার জন্য।’

‘কে দেবে আমাকে সে-টাকা? আপনি?’

‘না। বইটা লিখে যা কামাই হবে, সেটা আধাআধি ভাগ করে নেবো আমরা দু’জন।’

দু’জন লোক এগিয়ে এল আমাদের দিকে, পাশের টেবিলটাতে বসে পড়ল। নার্ভাস লাগছে আমার– মুখের উপর মানা করে দিতে ইচ্ছা করছে হোথর্নকে, কিন্তু করতে পারছি না কাজটা।

‘বুঝলাম না আসলে,’ বললাম আমি। ‘ঠিক কী ধরনের বইয়ের কথা বলছেন আপনি?’

ঘোলাটে দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে হোথর্ন। ‘বুঝিয়ে বলি তা হলে। আপনি জানেন, টেলিভিশনের জন্য এখানে-সেখানে টুকটাক কাজ করি আমি। হয়তো এই কথাও শুনেছেন, পুলিশফোর্স থেকে লাথি মেরে বের করে দেয়া হয়েছে আমাকে। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, এখন টুকটাক কনসালটেন্সিও করি… এবং সেটা পুলিশের জন্য। তবে ব্যাপারটা আনঅফিশিয়াল। অস্বাভাবিক কোনো কিছু যখন ঘটে, তখন ডাক পড়ে আমার, কাজে লাগানো হয় আমাকে… ওরা আসলে কাজে লাগায় আমার কর্মঅভিজ্ঞতাকে। কখনও কখনও কোনো কোনো কেস একেবারে পানির-মতো সহজ হয় মেট্রোপলিটন পুলিশের জন্য, কখনও আবার তা হয় না। যখনই কঠিন কোনো সমস্যায় পড়ে যায় তারা, দ্বারস্থ হয় আমার।’

‘আসলেই?’ কথাটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আমার।

‘হ্যাঁ। আধুনিক পুলিশ এভাবেই কাজ করে আজকাল। আসলে বিভিন্ন কারণে অভিজ্ঞ এত লোককে বাদ দেয়া হয়েছে ফোর্স থেকে যে, জটিল কোনো সমস্যার সমাধান করার জন্য এখন আর কেউই নেই বলা যায়। গ্রুপ ফোর অথবা সার্কোর নাম শুনেছেন? দুটোই বেসরকারি তদন্ত সংস্থা… সাহায্য করে পুলিশকে। এমন সব উপায়ে এমন সব তথ্য জোগাড় করে তারা, যা পুলিশের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। শুধু তা-ই না। ল্যাম্বেথে বড় একটা ল্যাবরেটরি আছে আমাদের, প্রয়োজন হলে সেটাও ব্যবহার করি। কখনও কখনও রক্তের-নমুনা পরীক্ষা করিয়ে নেয়া হয় সেখান থেকে, অন্য বিভিন্ন ফরেনযিক সাপোর্টও পাই। কাজেই এখন আমাকে একটা এক্সটার্নাল রিসোর্স বলা যায়।’

থামল হোথর্ন… যেন নিশ্চিত হতে চাইছে, ওর কথা আসলেই শুনছি কি না আমি।

মাথা ঝাঁকালাম।

পকেট থেকে সিগারেটের আরেকটা প্যাকেট বের করল সে, আরেকটা সিগারেট ধরাল।

বলতে লাগল, ‘ওই কনসালটেন্সি করে নিজের খরচটা ভালোই চালিয়ে নিতে পারছি। দিন-প্রতি একটা ভাতা তো পাই-ই, খরচাপাতি যা-যা লাগে তা-ও দেয়া হয় আমাকে। কিন্তু ইদানীং একটু টানাটানির মধ্যে পড়ে গেছি। কারণ আজকাল আর খুন-টুন তেমন একটা হচ্ছে না। যা-হোক, সেই টিভি শো-তে পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করতে গিয়ে যখন পরিচয় হলো আপনার সঙ্গে, তখন জানতে পারলাম, আপনি নাকি বইও লেখেন। তখনই একটা চিন্তা খেলে গিয়েছিল আমার মাথায়– আমরা একজন আরেকজনকে সাহায্য করতে পারি। বখরা আধাআধি। ইন্টারেস্টিং অনেক কাহিনি জানা আছে আমার। সেসব নিয়ে… মানে, আমাকে নিয়ে লিখতে পারেন আপনি।’

‘কিন্তু… আমি তো বলতে গেলে চিনিই না আপনাকে।’

‘আমাকে চিনতে বেশি সময় লাগবে না আপনার। …এখন একটা কেস আছে আমার হাতে! বেশিদিন হয়নি ওই কেস নিয়ে কাজ করছি, তবে… আমার মনে হয় আপনি যে-ঘরানার লেখক, কেসটা মনঃপুত হবে আপনার।’

আমার কেক আর চা নিয়ে হাজির হলো ওয়েইট্রেস। মনে মনে আফসোস করলাম– কেন যে অর্ডার দিতে গিয়েছিলাম এসব! এগুলো যদি না-দেয়া হতো এখন আমার সামনে, তা হলে যেভাবেই হোক হোথর্নকে পাশ কাটিয়ে বাসার পথ ধরতে পারতাম।

বললাম, ‘একটা কথা বলুন তো। বিখ্যাত শত শত লোক আছে দেশে- বিদেশে। তাঁদের কথা বাদ দিয়ে আপনার কথা কেন পড়তে যাবে লোকে?’

‘কারণ আমি একজন গোয়েন্দা। লোকে গোয়েন্দাকাহিনি পড়তে পছন্দ করে।’

‘কিন্তু গোয়েন্দা বলতে যা বোঝায়, আপনি তো সে-রকম কেউ না আসলে। চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে আপনাকে। …আচ্ছা, ভালো কথা, আপনাকে বরখাস্ত করা হলো কেন, বলুন তো?’

‘ওই ব্যাপারে কথা বলতে চাই না আমি।’

‘দেখুন, আপনি কিন্তু আবারও একগুঁয়েমি শুরু করেছেন। যদি চান আপনাকে নিয়ে কিছু লিখি আমি, তা হলে সব কথা সোজাসুজি বলতে হবে আমাকে। আপনার ব্যাপারে সব কথা জানা দরকার আমার।’

‘যেমন?’

‘কোথায় থাকেন আপনি। বিয়ে করেছেন কি না। ব্রেকফাস্টে কী খেয়েছেন আজ। যখন হাতে কোনো কাজ থাকে না তখন কী করেন… মোদ্দা কথা, আপনার ব্যাপারে সব জানতে হবে আমাকে। …গোয়েন্দাকেই যদি ঠিকমতো জানতে না- পারে লোকে, তা হলে খুনের গল্প পড়বে কেন?’

‘আপনার কি তা-ই মনে হয়?’

‘হ্যাঁ।’

মাথা নাড়ল হোথর্ন। ‘একমত হতে পারলাম না আপনার সঙ্গে। দ্য ওয়ার্ড ইয মার্ডার… মানে, আসল কথা হলো খুন। লোকে পড়বে একটা খুনের গল্প… গোয়েন্দা কীভাবে সমাধান করে হত্যারহস্যটার। গোয়েন্দাকে চিনে কী করবে তারা?’

সেক্ষেত্রে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আপনার আইডিয়াটা ভালো ছিল, সন্দেহ নেই যে-কেস নিয়ে কথা বলতে চাইছিলেন সেটা ও দারুণ কিছু-একটা ছিল। কিন্তু আমি আসলেই খুব ব্যস্ত। তা ছাড়া আপনি যে-প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন আমার কাছে, সে-রকম কোনো কাজ করি না আমি। নিজের গোয়েন্দাকে নিজের কল্পনামতো সাজিয়ে নিই, বাস্তবের কারও সঙ্গে মেশাই না। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই, তা হলেই বুঝতে পারবেন। শার্লক হোমসের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন। এই কিছু দিন আগে ওকে নিয়ে একটা কাহিনি লিখে শেষ করলাম। পোয়ারোকে নিয়েও টুকটাক লিখেছি, টিভিতে একটা রহস্যকাহিনি-নির্ভর সিরিযও লিখেছি… নাম মিডসামার মার্ডার্স। মোদ্দাকথা, আমি কল্পকাহিনির লেখক। বাস্তব জীবনের ঘটনা নিয়ে যাঁরা লেখালেখি করেন, তাঁদের কাউকে খুঁজে বের করা উচিত আপনার।’

‘কথা তো একই, তা-ই না? আপনিও লেখক, যাঁদেরকে খুঁজে বের করতে বলছেন তাঁরাও লেখক।

‘না, কথা এক না। আমার প্রতিটা কাহিনির উপর আমার পূর্ণ দখল আছে। যা লিখি আমি, তার আদ্যোপান্ত আমার মাথায় থাকে সব সময়। নিজের মতো করে একটা অপরাধ তৈরি করি আমি, কিছু ক্লু জুড়ে দিই ওই ঘটনার সঙ্গে, তারপর ঘটনাপ্রবাহ সাজাই নিজের মতো করে। গোয়েন্দাকাহিনিকে যদি এভাবে উপস্থাপন করা হয় পাঠকের কাছে, তা হলে তারা মজা পায়, বইয়ের কাটতি বাড়ে। কিন্তু কোনো একটা গোয়েন্দাকাহিনিকে যদি একজন গোয়েন্দার দৃষ্টিভঙ্গিতে বর্ণনা করতে শুরু করি, তা হলে কেমন হবে ব্যাপারটা, ভেবে দেখেছেন? কোথায় কোথায় গেলেন আপনি, সেসব লিখতে হবে আমাকে। কী কী দেখলেন, কার কার সঙ্গে কী কী কথা বললেন, লিখতে হবে সেসবও। ওসবে মজা পাবে না পাঠক।’ মাথা নাড়লাম। ‘আমি দুঃখিত, মিস্টার হোথর্ন। আপনার প্রস্তাবে আগ্রহ পাচ্ছি না।’

সিগারেটের যে-অংশটা পুড়ছে, সেটার উপর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে হোথর্ন। আশ্চর্য হয়নি সে, অপমানিতও হয়নি। ওকে দেখে মনে হচ্ছে, ওর প্রস্তাবের জবাবে কী বলবো আমি, তা যেন আগে থেকেই জানত।

‘তার মানে আপনি আসলে বইয়ের কাটতি নিয়ে ভাবছেন। কিন্তু যে-কাহিনি শোনাবো আমি আপনাকে, সেটার বিক্রি যদি দারুণ হয়, তা হলে? কোন্ কেস নিয়ে কাজ করছি আমি এখন, সেটা কি শুনতে চান না?’

ওর মুখের উপর সরাসরি বলে দিতে চাইছিলাম, না, চাই না; কিন্তু আমাকে সুযোগটা না-দিয়ে সে বলে চলল, ‘কেসটা একজন মহিলার। একটা ফিউনারেল পার্লারে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন তিনি। পার্লারটা লন্ডনের আরেক প্রান্তে, দক্ষিণ কেনসিংটনে। নিজের শেষকৃত্যানুষ্ঠান কীভাবে করতে চান তিনি, তা নিয়ে বিস্তারিত কথা বললেন ওই পার্লারের ফিউনারেল ডিরেক্টরের সঙ্গে। এবং সেদিনই, ঘণ্টা ছয়েক পর, কেউ একজন খুন করেছে তাঁকে… ঢুকে পড়েছিল তাঁর বাড়িতে, গলায় ফাঁস লাগিয়ে শেষ করে দিয়েছে তাঁকে। এবার বলুন, পুরো ঘটনা কি স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে আপনার কাছে?’

আরও একবার টের পেলাম, কৌতূহল মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে আমার ভিতরে। ‘কে ওই মহিলা?’

‘এই মুহূর্তে তাঁর নামটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। তবে কথা হচ্ছে, তিনি ধনী একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর একটা ছেলে আছে, সে-লোক আবার নিজনামে পরিচিত। আরেকটা কথা। যতদূর জানতে পেরেছি, এই পৃথিবীতে শত্রু বলে কেউ ছিল না ওই মহিলার। যে-ক’জনের সঙ্গে কথা বলেছে পুলিশ, সবাই পছন্দ করত তাঁকে। কেসটা জটিল, আর সে কারণেই তলব করা হয়েছে আমাকে।’

লোভ জাগল আমার মনে।

একটা হত্যারহস্য নিয়ে যদি কোনো কাহিনি লিখতে হয়, তা হলে সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে প্লট দাঁড় করানো। যে-সময়ের কথা বলছি, তখন আমার মাথায় ও-রকম কোনো প্লট নেই। কারণ টেলিভিশনের জন্য ধারাবাহিকভাবে নাটক লিখে- লিখে প্রায় সব রকমের প্লট ‘শেষ’ করে ফেলেছি আমি। টাকার জন্য কেউ কাউকে খুন করছে… লিখে ফেলেছি। অন্যের স্ত্রী বা চাকরি হাতিয়ে নিতে চায় কেউ… তা- ও লেখা হয়ে গেছে। কেউ কাউকে ভয় পাচ্ছে, আর সে-কারণে ঘটে গেছে একটা হত্যাকাণ্ড; সেটাও দেখে ফেলেছে আমার দর্শকরা। কেউ কারও গোপন কোনো কথা জেনে ফেলেছে, ফলে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেয়া হয়েছে তাকে… এ-রকম কাহিনিও উপহার দিয়েছি আমার পাঠকদের। বদলা নেয়ার জন্য খুন করা, অথবা দুর্ঘটনাক্রমে খুন করে ফেলা… লিখেছি ওসব নিয়েও।

আরও কথা আছে। মৌলিক কোনো কাহিনির জন্য অপরিহার্য একটা শর্ত হচ্ছে রিসার্চ বা গবেষণা। আমি যদি কোনো হোটেলের বাবুর্চিকে খুনি বানাতে চাই, তা হলে আগে ওই হোটেলটা ভালোমতো দেখতে হবে আমাকে। তাদের ক্যাটারিং বিযনেসটা ভালোমতো বুঝতে হবে। উদ্ভাবন করতে হবে আরও বিশ কি ত্রিশটা চরিত্র। তারপর আমাকে বুঝতে হবে পুলিশি তদন্ত কীভাবে চলে–ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ফরেনযিক সাইন্স, ডিএনএ… এবং এ-রকম আর যা-যা আছে তার সব। অর্থাৎ মৌলিক কোনো উপন্যাসের প্রথম শব্দটা লেখার আগে কয়েক মাস ধরে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে আমাকে। কিন্তু যে-সময়ের কথা বলছি, তখন অত উদ্যম ছিল না আমার ভিতরে…. টিভি সিরিয়ালের জন্য দিনের-পর-দিন পরিশ্রম করে আমি যারপরনাই ক্লান্ত। দ্য হাউস অভ সিল্ক শেষ করার পর হোমসকে নিয়ে নতুন কী লিখবো, তা-ও ছিল না আমার মাথায় তখন। হোমসকে নিয়ে নতুন কিছু লেখার মতো উদ্যম ছিল কি না আমার ভিতরে তখন, সন্দেহ ছিল তা নিয়েও।

অর্থাৎ সোজাসুজি যদি বলি, শর্টকাট একটা পদ্ধতির প্রস্তাব দিচ্ছে আমাকে হোথর্ন। পুরো খাবারটা প্লেটে তুলে দিয়ে পরিবেশন করছে সে আমাকে। তা ছাড়া একটা কথা ঠিকই বলেছে সে– অজ্ঞাতনামা সেই মহিলার কেসটা ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে আমার কাছে। কথা নেই বার্তা নেই, একটা ফিউনারেল পার্লারে গিয়ে হাজির হলেন তিনি। উপন্যাসের শুরুটা যদি ওভাবেই করতে পারি… নাহ্, মন্দ হয় না তা হলে। বরং সত্যি বলতে কী, একেবারেই ব্যতিক্রমী কিছু-একটা দেয়া যায় পাঠকদের।

টের পেলাম, ওই উপন্যাসের প্রথম চ্যাপ্টার যেন চলে এসেছে আমার মাথায় ি বসন্তের এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল। শহরের একটা ঝকঝকে-তকতকে এলাকা। রাস্তা পার হলেন ওই মহিলা…

‘আপনি জানলেন কীভাবে?’ হুট করে জিজ্ঞেস করলাম আমি।

‘কী?’

‘একটু আগে বললেন, আমি গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। বললেন, একটা কুকুরছানা পেয়েছি। এসব কথা আপনি জানলেন কী করে? কে বলেছে আপনাকে ওসব?’

‘কেউ বলেনি।’

‘তা হলে জানতে পারলেন কীভাবে?’

চোখমুখ কুঁচকে ফেলল হোথর্ন… জবাবটা যেন দিতে চাইছে না আমাকে। কিন্তু একইসঙ্গে বুঝতে পারছে, নিজের কাহিনি যদি আমাকে দিয়ে লেখাতে চায়, তা হলে আমার কথামতো কিছু-না-কিছু করতে হবে ওকে। বলল, ‘আপনার জুতোর তলায় বালি লেগে আছে। পায়ের উপর পা তুলে যখন বসলেন আপনি, তখন খেয়াল করলাম ব্যাপারটা। ঘটনাটার দুটো ব্যাখ্যা হতে পারে। নির্মাণকাজ চলছে, এমন কোনো বিল্ডিঙের নিচ দিয়ে হেঁটে এসেছেন। অথবা কোনো গ্রামাঞ্চলে গিয়েছিলেন, কারণ লন্ডনের পথেঘাটে বালির অস্তিত্ব বলতে-গেলে নেই। এখানে যে-জায়গায় থাকেন, সেখান থেকে সোজা পথে এই রেস্টুরেন্টে আসতে নির্মাণাধীন কোনো বাড়ি আছে বলে মনে পড়ে না আমার। আর অনেক আগে একবার শুনেছিলাম, অরফোর্ডে আপনাদের যে-গ্রামের বাড়ি আছে, মাঝেমধ্যেই সেখানে যান। তাই দুইয়ে দুইয়ে যোগ করে অনুমান করে নিলাম, সেখানেই গিয়েছিলেন আপনি।’

মনে মনে হোথর্নের পর্যবেক্ষণশক্তির প্রশংসা না-করে পারলাম না। সে দেখছি শার্লক হোমসের পদ্ধতি প্রয়োগ করতে শুরু করেছে!

বললাম, ‘আর কুকুরছানার ব্যাপারটা?’

‘খেয়াল করে দেখুন, আপনার জিন্সের হাঁটুর ঠিক নিচে কুকুরছানার থাবার দাগ লেগে আছে। তার মানে আপনাকে আদর করার জন্য, অথবা আপনার কাছ থেকে আদর পাওয়ার জন্য আপনার-গায়ে পা তুলে দিয়েছিল সেটা।’

তাকালাম আমার জিন্সের হাঁটুর দিকে। সত্যিই, কুকুরছানার থাবার অস্পষ্ট দাগ লেগে আছে সেখানে। দাগটা এত হালকা যে, আমি খেয়ালই করিনি। কিন্তু হোথর্ন ঠিকই খেয়াল করেছে।

একটা কথা মনে পড়ে গেল। ‘দাঁড়ান… দাঁড়ান… এক মিনিট! আপনি কী করে জানলেন ওটা কুকুরছানা? ওটা তো কোনো ছোট জাতের কুকুরও হতে পারে? তা ছাড়া… ওটা যে দেয়া হয়েছে আমাকে, মানে… রাস্তায় কোনো কুকুরের সঙ্গে যে মোলাকাত হয়নি আমার, নিশ্চিত হলেন কীভাবে?’

হতাশ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল হোথর্ন। ‘আপনার বাঁ পায়ের জুতোর ফিতাটা চিবানো হয়েছে। কাজটা যদি আপনার না-হয়ে থাকে, তা হলে সেটা কার, বলতে পারেন? পূর্ণ বয়স্ক কোনো কুকুর কি করবে ওই কাজ?’

ফিতাটার দিকে তাকালাম না আমি। সন্তুষ্ট হয়েছি, মনে মনে আরেকদফা প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছি হোথর্নের। একইসঙ্গে বেজার হয়েছি নিজের উপর- ব্যাখ্যা দুটো এত সহজ ছিল, অথচ ওগুলো আমার মাথায় আসেনি!

বললাম, ‘দুঃখিত। আপনি যে-কেসের কথা বলতে চাইছিলেন, সেটা আসলেই ইন্টারেস্টিং লাগছে আমার কাছে। তারপরও… যেমনটা বলেছি… কোনো একজন সাংবাদিক অথবা ও-রকম কাউকে খুঁজে বের করলেই ভালো হবে আপনার জন্য। আমি চাইলেও করতে পারবো না আপনারকাজটা। কারণ অন্য আরও কিছু কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে আমাকে আগামী বেশ কিছু দিন।’

‘কী আর করা’ ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে উঠে দাঁড়াল হোথর্ন, হাত ঢুকিয়ে দিল ট্রাউজারের পকেটে। ‘দাম দিয়ে দেবো?’

চা আর কেকের কথা বোঝাচ্ছে সে। ‘না, না, লাগবে না,’ ভদ্রতা করলাম, ‘আমিই দিয়ে দেবো। ধন্যবাদ।’

‘আমি এক কাপ কফি খেয়েছি।’

‘ঠিক আছে, ওটার দামও দিয়ে দেবো।’

‘যদি সিদ্ধান্ত বদল করেন, তা হলে যোগাযোগ করতে পারেন। কীভাবে খোঁজ পাওয়া যাবে আমার, জানা আছে আপনার!

‘হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি আমার এজেন্টের সঙ্গে কথা বলে দেখবো। আপনাকে সাহায্য করতে পারবে, এমন কারও খোঁজ দিতে পারবে মেয়েটা।’

‘না, থাক। যদি দরকার হয়, আমি নিজেই খুঁজে নিতে পারবো কাউকে।’ ঘুরে চলে গেল হোথর্ন।

কেকটা শেষ করলাম আমি। ভেবে খারাপ লাগছে, শুধু শুধু অপচয় করলাম কিছু টাকা। বাসায় ফিরে গেলাম, যে-উপন্যাসটা পড়ছিলাম সেটা নিয়ে বসলাম আবার। হোথর্নকে ভুলে থাকার চেষ্টা করছি, কিন্তু ওর কথা মনে পড়ছে বার বার।

কেউ যদি ফুল-টাইম লেখক হয়ে যায়, তা হলে কোনো কাজ প্রত্যাখ্যান করাটা তার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ। কোনো কাজ প্রত্যাখ্যান করার মানে হচ্ছে, এমন কোনো দরজা লাগিয়ে দেয়া, যেটা আর কখনও খুলবে না। এবং লাগিয়ে-দেয়া সেই দরজার ওপাশে কী আছে, তা সম্পূর্ণ মিস করবে ওই লেখক।

প্রশ্ন হচ্ছে, সে-রকম কোনো কিছু কি মিস করছি আমি?

একজন মহিলা গিয়ে হাজির হলেন একটা ফিউনারেল পার্লারে। ওই ঘটনার ছ’ঘণ্টা পর তাঁরই বাড়িতে খুন করা হলো তাঁকে। ধাঁধায় পড়ে গেল পুলিশ। ডাক পড়ল ড্যানিয়েল হোথর্নের। অদ্ভুত আর জটিল চরিত্রের একজন মানুষ সে, কিন্তু গোয়েন্দাগিরিতে ওর মেধা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই! কনসালটেন্সির দরকার হয়ে পড়ল পুলিশের। তারপর?

তারপর কী হলো?

টের পাচ্ছি, অদ্ভুত এক উৎকণ্ঠা পেয়ে বসেছে আমাকে।

হোথর্নের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে কি ভুল করলাম?

অনিশ্চয়তায় ভুগতে ভুগতে আবারও তুলে নিলাম উপন্যাসটা, ডুবে গেলাম সেটাতে।

দু’দিন পর গিয়ে যোগ দিলাম সেই সাহিত্য-উৎসবে।

সারা পৃথিবীতে এ-রকম উৎসব ক’টা হয় প্রতি বছর, ভাবলে মজা লাগে আমার। এ-রকম অনেক লেখককে চিনি আমি, যাঁরা ওসব উৎসবে যোগ দেন হরহামেশা, অথচ তাঁদের লেখালেখি বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বই সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়াটাই তাঁদের কাজ এখন।

যা-হোক, ভালোই হলো আমার সেশনটা। ছোট ছোট অনেক বাচ্চা এসেছে এই অনুষ্ঠানে, অনুষ্ঠানটা প্রাণবন্ত করে রেখেছে তারা। তাদের কেউ কেউ চমৎকার কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল আমাকে। কথা বলতে গিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা সময় নিয়ে ফেললাম আমি। সঞ্চালকদের একজন ইশারায় বক্তৃতা শেষ করতে বললেন আমাকে। আর ঠিক তখনই ঘটল অদ্ভুত এক ঘটনা।

দর্শকের মধ্যে একেবারে সামনের সারিতে বসে আছে একজন মহিলা। প্ৰথম দেখায় তাকে একজন শিক্ষিকা অথবা লাইব্রেরিয়ান বলে মনে করেছিলাম। দেখতে একেবারে সাদামাটা, চল্লিশের কাছাকাছি বয়স, চেহারাটা গোলগাল। মাথায় লম্বা লম্বা সাদাটে চুল। ঘাড় থেকে একটা চেইনের মাধ্যমে ঝুলছে চশমা। দুটো কারণে তাকে লক্ষ করেছি। এক, তাকে একা বলে মনে হয়েছে আমার। আর দুই, আমি এতক্ষণ ধরে যা বলেছি সেসবের একটা শব্দের প্রতিও তার কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হয়নি। বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে কৌতুক করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু একবারের জন্যও হাসতে দেখিনি তাকে। মহিলা কোনো সাংবাদিক কি না, ভেবে একটুখানি হলেও শঙ্কা জাগল আমার মনে। শুনেছি আজকাল নাকি পত্রপত্রিকা থেকে সাহিত্য-বিষয়ক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাংবাদিক পাঠানো হয়, সেসব সাংবাদিক নাকি লেখকদের বিভিন্ন বেফাঁস কথা টুকে নিয়ে গিয়ে ছাপিয়ে দেয় পত্রিকায়, পরে ওই উক্তি ব্যবহৃত হয় ওই লেখকের বিরুদ্ধেই। কাজেই মহিলাটা যখন আমাকে কিছু-একটা জিজ্ঞেস করার জন্য হাত তুলল, মনে মনে সতর্ক না-হয়ে পারলাম না। অ্যাটেন্ডেন্টদের একজন এগিয়ে গিয়ে মাইক তুলে দিল মহিলার হাতে।

‘একটা কথা ভাবছিলাম,’ বলল মহিলাটা। ‘আপনি সব সময় কল্পকাহিনিই লেখেন কেন? বাস্তব কোনো ঘটনা নিয়ে কিছু লেখেন না কেন?’

এ-রকম কোনো প্রশ্ন কখনও জিজ্ঞেস করা হয়নি আমাকে। সচরাচর যেসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয় আমাকে সেগুলো হলো, নিত্যনতুন এত আইডিয়া কোত্থেকে পাই আমি? আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র কোনটা? একটা বই লিখতে কতদিন সময় লাগে আমার?

ওই মহিলার প্রশ্ন করার ভঙ্গিতে আক্রমণাত্মক কিছু নেই, তারপরও কেন যেন দমে গেলাম খানিকটা।

ব্যাখ্যা দেয়ার ভঙ্গিতে বললাম, ‘ফয়েল’স ওয়ার নামের যে-টিভি সিরিয লিখেছি, সেটার প্রতিটা পর্ব বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে রচিত। ‘

‘আমি নিশ্চিত সত্যি ঘটনার উপর ভিত্তি করে অনেক কিছু লিখেছেন আপনি, কিন্তু আসলে যা বলতে চাইছি তা হলো, আপনি যে-অপরাধজগতের বর্ণনা দিয়েছেন বা দিচ্ছেন, সেটা তো বাস্তব কোনো কিছুর উপর ভিত্তি করে লেখা হচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে আপনার দুটো টিভি সিরিয়ালের নাম বলি… পোয়ারো এবং মিডসামার মার্ডার্স। দুটো ধারাবাহিকই সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত। আবার যদি অ্যালেক্স রাইডারের কথা বলি, চোদ্দ বছর বয়সী ওই ছেলেকে নিয়ে একের-পর-এক গুপ্তচর- কাহিনি লিখছেন আপনি। আমি জানি, অনেক ছেলেমেয়েই ওই কাহিনিগুলো পড়ে মজা পায়। কিন্তু সেখানেও সেই একই কথা… কল্পনা। আমি যা জানতে চাইছি তা হলো, বাস্তবজীবনের উপর কোনো আগ্রহ কেন নেই আপনার?’

‘বাস্তবজীবন বলতে ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন?’ পাল্টা প্রশ্ন করলাম।

‘বোঝাতে চাইছি আমাদের আশপাশের রক্তমাংসের মানুষদের, এবং তাদেরকে ঘিরে যে-অপরাধজগত আবর্তিত হয়, সেটা।’

অস্থির হয়ে উঠেছে কোনো কোনো ছেলেমেয়ে। প্রশ্নোত্তর পর্ব দ্রুত শেষ করার জন্য আরও একবার তাগাদা দেয়া হলো আমাকে।

বললাম, ‘কল্পকাহিনি লিখতে ভালো লাগে আমার।’

‘আপনার কি কখনও মনে হয় না, এমন একটা দিন আসতে পারে, যখন অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে আপনার-লেখা বইগুলো?’

‘আমার মনে হয়, কোনো লেখকের লেখা যদি প্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচিত হতে হয়, তা হলে তাঁকে যে বাস্তবজীবনের উপর ভিত্তি করেই লিখতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।’

‘কিছু মনে করবেন না… একমত হতে পারলাম না আপনার সঙ্গে। আপনার লেখা ভালো লাগে আমার, তারপরও বাধ্য হয়ে বললাম কথাটা।’

দু’দিন আগে হোথর্ন কী প্রস্তাব দিয়েছিল আমাকে, মনে পড়ে গেল হঠাৎ করেই।

অনুষ্ঠান থেকে চলে আসার আগে এদিক-ওদিক তাকিয়ে খুঁজলাম ওই মহিলাকে, কিন্তু কোথাও দেখতে পেলাম না। আমার লেখা কোনো বইয়ে অটোগ্রাফ নেয়ার জন্যও আমার সামনে আসেনি সে।

ট্রেনে চেপে যখন লন্ডনে ফিরছি, নাম-না-জানা সেই মহিলা যেন ভূতের মতো সওয়ার হলো আমার চিন্তাভাবনার ঘাড়ে। তার কথাগুলো বার বার না-ভেবে পারলাম না। সে কি ঠিক কথাই বলেছে? আমার লেখালেখি কি আসলেই বেশি মাত্রায় কল্পনানির্ভর হয়ে যাচ্ছে? কিশোর-সাহিত্যিক থেকে একজন অ্যাডাল্ট- রাইটারে পরিণত হতে চলেছি আমি, আমার জন্য দ্য হাউস অভ সিল্ক বইটা হয়তো পরিণত হতে যাচ্ছে একটা টার্নিং পয়েন্টে, তারপরও… যে-সময়কালের উপর ভিত্তি করে ওই কাহিনি লিখেছি, সেটা এখনকার আধুনিক পৃথিবী থেকে যোজন যোজন দূরে। টেলিভিশনের জন্য যেসব কাহিনি লিখেছি… উদাহরণ হিসেবে ইনজাস্টিস- এর কথাই ধরা যাক… একবিংশ শতাব্দীর লন্ডনের কথা মাথায় রেখে লেখা হয়েছে সেটা, কিন্তু সেটাতেও প্রয়োগ করেছি নিজের কল্পনাশক্তি।

তার মানে ওই মহিলা কি ঠিক কথাই বলেছে?

এমন একটা দিন কি আসলেই আসতে পারে, যখন অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে আমার-লেখা বইগুলো?

প্যাডিংটন স্টেশনে পৌঁছাতে অনেকক্ষণ সময় লাগল। যতক্ষণে বাসায় পৌঁছালাম, ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেছে আমার। তাই বাসায় ঢুকেই তুলে নিলাম ফোনটা।

‘হোথৰ্ন?’

‘টনি!’

‘আমি রাজি। বখরা আধাআধি। আছি আমি আপনার সঙ্গে।’

৩. প্রথম অধ্যায়

আমার লেখা প্রথম অধ্যায়টা পছন্দ হয়নি হোথর্নের।

ওটা প্রথমে দেখাইনি ওকে। ইনজাস্টিস নামের সেই টিভি সিরিযের সময় কী কাণ্ডটা সে করেছিল, ভালোমতোই মনে আছে আমার। তাই ওই চ্যাপ্টার লুকিয়ে রেখেছিলাম নিজের কাছে। কিন্তু ওটা দেখতে চাইল হোর্থন… রীতিমতো জোরাজুরি শুরু করে দিল। যেহেতু আধাআধি বখরার চুক্তিতে রাজি হয়েছি, সেহেতু ওর দাবি অগ্রাহ্য করি কী করে?

বরাবরের মতো একটা রেস্টুরেন্টের বাইরে বসে আছি আমরা দু’জন। প্ৰথম চ্যাপ্টারটা ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম ওর কাছে। সঙ্গে করে আনা অ্যাটাচি কেসের ভিতর থেকে আমার সেই ই-মেইলের প্রিন্ট-করা কপি যখন বের করল সে, বুঝে গেলাম কপালে খারাপি আছে আমার। লাল কালিতে অঙ্কিত অনেকগুলো কাটা চিহ্ন আর বৃত্ত দেখতে পাচ্ছি আমার সে-লেখায়।

নিজের লেখালেখির ব্যাপারে যদি মন্তব্য করতে বলা হয় আমাকে, তা হলে নিজেকে খুব সতর্ক বলবো আমি। লেখার আগে প্রতিটা শব্দ নিয়ে চিন্তা করি। হোথর্নের প্রস্তাবে যখন রাজি হয়েছিলাম, তখন ভেবেছিলাম, কেসের দায়িত্ব ওর কাঁধে থাকার পরও কাহিনির-বর্ণনার-সময় সে থাকবে ‘ব্যাক সিটে’। ভুল ধারণাটা থেকে আমাকে মুক্তি দিল সে।

‘সব ভুল করে বসে আছেন আপনি, টনি,’ বলল হোথর্ন। ‘আসলে পাঠকদের বিশ্বাস করাতে চাইছেন এমন কিছু একটা, যা সত্যি না।’

‘মানে?’

‘প্রথম বাক্যটার কথাই ধরুন। সম্পূর্ণ ভুল ওটা।’

যা লিখেছি, পড়তে শুরু করলাম:

বসন্তের এক উজ্জ্বল সকাল। ঘড়িতে মাত্র এগারোটা বেজেছে। প্রায় সাদা সূর্যের- আলো যেন প্রতিজ্ঞা করেছে, আজ এমন এক উষ্ণতা বিলিয়ে দেবে, যা সচরাচর দেয় না। ফুলহ্যাম রোড পার হলেন ডায়ানা ক্যুপার, গিয়ে ঢুকলেন ফিউনারেল পার্লারে।

‘ভুলটা কোথায় হয়েছে,’ বললাম আমি, ‘বুঝলাম না। মিসেস ক্যুপার তো এগারোটার দিকেই গিয়ে ঢুকেছিলেন ওই ফিউনারেল পার্লারে, নাকি?’

‘হ্যাঁ, ঢুকেছিলেন, কিন্তু আপনি যেভাবে বর্ণনা দিয়েছেন, আসল ঘটনা সেভাবে ঘটেনি।’

সেভাবে ঘটেনি মানে? তিনি তো বাসে চেপেই সেখানে গিয়েছিলেন!’

‘তাঁর বাসার সামনের রাস্তা থেকে বাসে উঠেছিলেন তিনি। ব্যাপারটা জানতে পেরেছি, কারণ সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে তাঁকে। ড্রাইভারকে যখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, মিসেস ক্যুপারকে চিনতে পেরেছে লোকটা। এমনকী ওই ব্যাপারে পুলিশের কাছে বিবৃতিও দিয়েছে সে। কিন্তু আসল সমস্যা কোথায়, জানেন? আসল সমস্যা হচ্ছে, আপনি লিখেছেন রাস্তা পার হয়ে ফিউনারেল পার্লারে গিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার। এই কথা কেন লিখলেন?’

‘কেন, অসুবিধা কী?’

‘অসুবিধা একটাই… ডায়ানা ক্যুপার রাস্তা পার হননি। আমরা আসলে কথা বলছি ১৪ নম্বর বাস নিয়ে। তিনি ওই বাসে উঠেছিলেন চেলসি ভিলেজ থেকে। ব্রিটানিয়া রোডের ঠিক উল্টোদিকে অবস্থিত জায়গাটা। যা-হোক, বাসটা মিসেস ক্যুপারকে নিয়ে হাজির হয়েছিল চেলসি ফুটবল ক্লাবের সামনে… মানে, হর্টেনশিয়া রোডে। তারপর সেখান থেকে যায় ওল্ড চার্চ রোডে। ওখানেই ওই বাস থেকে নেমে পড়েন তিনি।’

‘বুঝতে পারছি, লন্ডনের বাস রুট সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান আছে আপনার। তারপরও… ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন, বুঝতে পারছি না।’

‘বোঝাতে চাইছি, ১৪ নম্বর বাসে চড়ে ওই ফিউনারেল পার্লারে এলে রাস্তা পার হওয়ার দরকার হবে না মিসেস ক্যুপারের। কারণ বাস থেকে রাস্তার যে-পাশে নামবেন তিনি, পার্লারটা সে-পাশেই।’

‘তাতে এমন কী আসে-যায়?’

‘আসে-যায়। কারণ আপনি যদি উপন্যাসে লেখেন রাস্তা পার হয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার, তা হলে সেটার মানে দাঁড়ায়, অন্য কোনো একটা কাজে কোথাও গিয়েছিলেন তিনি ফিউনারেল পার্লারে ঢোকার আগে। তখন পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কী কাজে কোথায় গিয়েছিলেন তিনি? কেউ কেউ ভাবতে পারে, তিনি কি ব্যাংকে গিয়েছিলেন? একগাদা টাকা তুলে নিয়েছেন সেখান থেকে? নাকি কারও সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন বাকবিতণ্ডায়, যার ফলে, পরে, সেদিনই মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে তাঁকে? খুনি কি তাঁকে অনুসরণ করে রাস্তা পার হয়েছিল? দেখেছিল কোথায় কোথায় যাচ্ছেন তিনি? …কী হলো, আমার দিকে ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? … যা-হোক, মোদ্দা কথা, ব্রেকফাস্ট সারার পর বাসা থেকে বেরিয়ে ওই বাসে উঠে পড়েছিলেন মিসেস ক্যুপার। এবং সেদিন সকালে ওই কাজই করেছিলেন তিনি অন্য সব কিছুর আগে।’

‘আচ্ছা, ঠিক করে বলুন তো, আপনি আসলে কী লেখাতে চান আমাকে দিয়ে?’

এক তা কাগজে কিছু-একটা লিখে এনেছিল হোথর্ন; সেটা বাড়িয়ে ধরল আমার দিকে।

হাতে নিয়ে পড়লাম কী লিখেছে সে:

ঠিক এগারোটা সতেরো মিনিটে ১৪ নম্বর বাস থেকে ওল্ড চার্চ স্ট্রীটে নেমে পড়লেন ডায়ানা জেইন ক্যুপার। ফুটপাত ধরে হাঁটলেন পঁচিশ মিটারের মতো। তারপর ঢুকে পড়লেন কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্স নামের ফিউনারেল পার্লারটাতে।

.

‘এসব লেখা সম্ভব না আমার পক্ষে,’ সোজা জানিয়ে দিলাম। ‘কারণ আপনি যা লিখে এনেছেন, সেসব কোনো গল্পের মতো শোনাচ্ছে না। বরং সেসব পড়ে মনে হচ্ছে, কোনো পুলিশ-রিপোর্ট পড়ছি।’

‘পড়ে যা-ই মনে হোক, আমি যা লিখেছি তা একেবারে সঠিক। ও… আরেকটা কথা মনে পড়ে গেছে… ঘণ্টার ব্যাপারে এসব কী লিখেছেন?’

‘কীসের ঘণ্টা?’

‘কেন… এই যে দেখুন…’ প্রিন্ট করে নিয়ে আসা কাগজগুলো উল্টিয়ে একজায়গায় থামল হোথর্ন। পড়তে লাগল, ‘সদর দরজাটা খুললেন মিসেস ক্যুপার। দরজার পুরনো-ধাঁচের স্প্রিং মেকানিযমের সঙ্গে যুক্ত একটা ঘণ্টা বেজে উঠল জোরে, একবার।’ ওই ফিউনারেল পার্লারে ঘণ্টা কোথায় পেলেন আপনি, বলুন তো? এতবার গেলাম আমি সেখানে, কোনো ঘণ্টার ‘ঘ’-ও তো দেখলাম না! কারণ সেখানে আসলেই কোনো ঘণ্টা নেই।’

নিজেকে শান্ত রাখার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমি। যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় বললাম, ‘দেখুন, বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে যেসব কল্পকাহিনি লেখা হয়, সেগুলোতে ও-রকম কোনো-না-কোনো বর্ণনা জুড়ে দেয়া হয়। বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে লেখার মানে এ-ই না, ঠিক যা-যা ঘটেছিল, তা-ই লিখতে হবে আমাকে, তার বাইরে একটা-কথাও লেখা যাবে না। দয়া করে মনে রাখবেন, পাঠক একটা গল্প পড়ার জন্য আপনার বইটা হাতে নেবে, বাস্তব জীবনের কোনো বিবরণ পড়তে চাইবে না তারা। মনে রাখবেন, বই আর সংবাদপত্র এক জিনিস না। এবার আসুন কাজের কথায়। কন্সওয়ালিস অ্যান্ড সন্স-এর ব্যবসাটা যে পুরুষানুক্রমিক আর সেকেলে, সেটা বোঝানোর জন্য ওই ঘণ্টার বর্ণনা জুড়ে দিয়েছি আমি।’

‘তা হয়তো দিয়েছেন, কিন্তু ঝামেলা তো লাগিয়ে দিয়েছেন অন্য জায়গায়।‘

‘ঝামেলা?’

‘হুঁ। ধরুন কেউ একজন মিসেস ক্যুপারকে অনুসরণ করে ঢুকে পড়েছিল ওই পার্লারে। সেখানে সেদিন যা-যা বলেছিলেন তিনি, কেউ একজন আড়ি পেতে শুনে ফেলেছিল সেসব। ওই ঘণ্টা যদি রেখে দেন আপনি উপন্যাসে, তা হলে পরে পাঠক প্রশ্ন করবে, আড়ি-পাতা লোকটা যখন ঢুকল ওই পার্লারে, তখন ঘণ্টার আওয়াজ শুনতে পেল না কেন অন্য কেউ?’

‘কিন্তু কেউ একজন আসলেই অনুসরণ করেছিল কি না মিসেস ক্যুপারকে, জানি না আমরা। তাঁর সেদিনের কথোপকথন আসলেই আড়ি পেতে শুনেছিল কি না কেউ, তা-ও জানি না। …আপনি আসলে ঠিক কী ভাবছেন, বলুন তো?’

অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘যে বা যারা বলছে, মিসেস ক্যুপারের নিজের-শেষকৃত্যের-আয়োজন-করা এবং একইদিনে তাঁর খুন হওয়ার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে, আমার মনে হয় আপনি তাদের দলে। অন্ততপক্ষে আপনি চাইছেন পাঠকরা যাতে সেটাই মনে করে। কিন্তু বিকল্প ব্যাখ্যাগুলোও মাথায় রাখতে হবে আপনাকে। নিজের শেষকৃত্যের জন্য যেদিন আলোচনা করতে গিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার, সেদিনই খুন হয়েছেন তিনি… ব্যাপারটা সম্পূর্ণ কাকতালীয়ও হতে পারে। তবে একটা সত্যি কথা বলি আপনাকে… কাকতালীয় কোনো কিছু একেবারেই পছন্দ করি না আমি। খুনখারাপি নিয়ে কাজ করছি গত বিশ বছর ধরে। কাকতালীয় কোনো কিছু ঘটেনি আমার কোনো কেসে… সোজাসুজি যদি বলি, সব কিছুসব সময় জায়গামতোই পেয়েছি। যা-হোক, মিসেস ক্যুপার হয়তো জানতেন, মরতে চলেছেন তিনি। তাঁকে হয়তো হুমকি দেয়া হয়েছিল। এবং হয়তো সে-কারণে তিনি নিজেই গিয়েছিলেন ফিউনারেল পার্লারে, আলাপ করেছেন নিজের শেষকৃত্যানুষ্ঠান নিয়ে। হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, বাঁচার কোনো উপায় নেই তাঁর। ব্যাপারটা সম্ভব, কিন্তু একইসঙ্গে গোলমেলেও বটে। কারণ মিসেস ক্যুপার যদি সত্যিই টের পেয়ে থাকেন বাঁচার কোনো উপায় নেই তাঁর, তা হলে পুলিশের কাছে গেলেন না কেন? তা ছাড়া আমিই যে বার বার বলছি কেউ একজন জেনে গিয়েছিল কী করতে যাচ্ছেন তিনি, সেটাতেও ঘাপলা আছে… সেই কেউ একজনটা যে-কেউ হতে পারে। এবং যদি সত্যিই তা-ই হয়… যদি সত্যিই কেউ একজন মিসেস ক্যুপারের পিছু পিছু ঢুকে থাকে ওই ফিউনারেল পার্লারে, তা হলে অন্য কেউ টের পায়নি ব্যাপারটা। অর্থাৎ আপনার সেই ঘণ্টা বাজেনি।’

‘ঠিক আছে,’ বললাম আমি, ‘ঘণ্টাটা বাদ দিয়ে দেবো।’

‘আর ওই মন্ট ব্ল্যাঙ্ক কলমও বাদ দিতে হবে।’

‘কেন?’ কিন্তু হোথর্নকে কিছু বলার সুযোগ না-দিয়ে বলে চললাম, ‘ঠিক আছে, ওটাও বাদ দিয়ে দেবো। ওই কলম না-থাকলে তেমন কিছু যাবে-আসবে না।

পাতা উল্টাচ্ছে হোথর্ন। ভাবখানা এমন, এ-রকম কোনো বাক্য খুঁজছে, যা পছন্দ হতে পারে ওর। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘দেখা যাচ্ছে কিছু কিছু তথ্য নিজস্ব কায়দায় বাছাই করে নিয়েছেন।’

‘মানে?’

‘আপনি লিখেছেন, মিসেস ক্যুপার গণপরিবহন ব্যবহার করতেন। কিন্তু কেন করতেন তিনি কাজটা, সেটা বলেননি।’

‘বলেছি। একজায়গায় লিখেছি, খামখেয়ালি স্বভাবের ছিলেন তিনি।’

‘তাঁর শেষকৃত্যানুষ্ঠান নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ রয়ে গেছে। ঠিক কোন্ সার্ভিসটা চেয়েছিলেন তিনি জানেন আপনি, কিন্তু সেটা লেখেননি।’

‘লিখেছি। পবিত্র একটা স্তবক অথবা বিটলসের কোনো একটা গান…’

‘কোন্ স্তবক? বিটলসের কোন্ গান? ব্যাপারটা কি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়নি আপনার?’ নোটবুক বের করল হোর্থন, খুলল। ‘স্তবক নম্বর চৌত্রিশ। আই উইল রেস দ্য লর্ড অ্যাট অল টাইমস: হিজ প্রেইজ শ্যাল কন্টিনিউয়ালি বি ইন মাই মাউথ। আর গানটা ছিল: ‘এলিনররিগবি’… লিখেছিলেন খুব সম্ভব সিলভিয়া প্লাথ। টনি, এই ব্যাপারে মনে হয় আপনার সাহায্য লাগবে আমার। কারণ গানের কথাগুলো পড়েছিলাম আমি, কিন্তু মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারিনি। আরেকটা কথা। মিসেস ক্যুপার চেয়েছিলেন, প্রশংসাসূচক উক্তিটা যেন লিখে দেয় তাঁর ছেলে। কী যেন বলা হয় ওই টার্মটাকে?’

‘ইউলোজি।’

‘হবে হয়তো। যা-হোক, ক্যাফে মুরানোতে লাঞ্চ করেছিলেন মিসেস ক্যুপার। তখন কে সঙ্গ দিয়েছিলেন তাঁকে, সেটা লেখা উচিত ছিল আপনার। লোকটার নাম রেমন্ড কুন্স… মঞ্চনাটক প্রযোজনা করেন।’

‘তাঁকেও কি সন্দেহ করা হচ্ছে?’

‘ক্লন্স প্রযোজনা করেছিলেন, এ-রকম একটা নাটকে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড খুইয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার। আমার অভিজ্ঞতা বলে, টাকা আর হত্যাকাণ্ড হাত ধরাধরি করে চলে।

‘আর কোনো কিছু কি মিস করেছি আমি?’

‘যেদিন খুন করা হয়েছে মিসেস ক্যুপারকে, সেদিনই গ্লোব থিয়েটারের বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি। ব্যাপারটা কি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়নি আপনার? অথচ গত ছ’বছর ধরে ওই বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি। যেদিন সিদ্ধান্ত নিলেন ছেড়ে দেবেন কাজটা, সেদিনই শেষ করে দেয়া হলো তাঁকে। …ক্লিনার আন্দ্রিয়া কুভানেকের বর্ণনাও অতিরঞ্জিত বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। পা টিপে টিপে বেরিয়ে এসেছিল সে মিসেস ক্যুপারের বাড়ি থেকে, তারপর ফোন করেছিল পুলিশে… কোত্থেকে পেলেন আপনি এই খবর?’

‘পুলিশের কাছে যে-বিবৃতি দিয়েছিল সে, সেটা থেকে জানতে পেরেছি।

ওই বিবৃতি আমিও পড়েছি। কিন্তু আপনি নিশ্চিত হলেন কী করে, মিথ্যা কথা বলেনি সে?

‘মিথ্যা কথা কেন বলবে?’

‘জানি না। কিন্তু এটা জানি, একটা ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে তার। কাজেই যা বলেছে সে সেটা যে এক শ’ ভাগ সত্যি, সে-রকম ধরে নেয়ার কোনো কারণ নেই। ‘

‘ওই মেয়ের ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে… জানলেন কী করে?’

চেক করেছি। যা-হোক, সবশেষে বলতে হয় মিসেস ক্যুপারের ছেলে ড্যামিয়েন ক্যুপারের কথা। মায়ের মৃত্যুতে আড়াই মিলিয়ন পাউন্ডের মালিক হয়ে গেছে সে রাতারাতি। অথচ আমার কাছে পাকা খবর আছে, টাকাপয়সার টানাটানি চলছিল তার।’

স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি। চুপসে যাওয়ার মতো কোনো একজাতের অনুভূতি হচ্ছে আমার পেটের ভিতরে।

কিছুক্ষণ পর জানতে চাইলাম, ‘টাকাপয়সার টানাটানি? যেমন?’

‘আকণ্ঠ ঋণে জর্জরিত বলে একটা কথা আছে না? ড্যামিয়েন ক্যুপারের হয়েছিল সে-অবস্থা। হলিউড হিলসে বিলাসবহুল একটা বাড়ি কিনেছে সে। এমনকী সুইমিংপুলও আছে সেখানে। চলাফেরার জন্য ব্যবহার করত পোর্শে ৯১১। ইংরেজ এক বান্ধবী জুটিয়ে নিয়েছিল, লিভ টুগেদার করে মেয়েটার সঙ্গে। অথচ তাকে খুব একটা পছন্দ করে না ওই মেয়ে। কারণ তার মতো মানুষদের জীবনে মেয়েদের আনাগোনা চলতেই থাকে।’

সাহস করে জানতে চাইলাম, ‘আপনি যদি এই রহস্যের সমাধান করতে না- পারেন, তা হলে কী হবে? এ-রকমও তো হতে পারে, ডায়ানা ক্যুপারের খুনিকে আপনার আগেই পাকড়াও করে ফেলল পুলিশ?’

দেখে মনে হলো, কথাটা শুনে অপমানিত হয়েছে হোথর্ন। ‘পুলিশ? তাদের কাছে যদি কোনো একটা ক্লু-ও থাকত, এই রহস্য সমাধানের জন্য আমার সাহায্য চাইত না। কথাটা আগেও বোধহয় বলেছি আপনাকে। ইদানীং খুন হওয়ার আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই সমাধান হয়ে যাচ্ছে বেশিরভাগ হত্যারহস্য। কেন হচ্ছে, ভেবে দেখেছেন কখনও? কারণ বেশিরভাগ খুনি জানে না, কী করছে তারা। ইদানীং বেশিরভাগ খুন করা হচ্ছে রাগের মাথায়। একই ঘটনা বার বার ঘটছে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটছে। রক্তের ছিটা, গাড়ির নম্বর প্লেট, সিসিটিভি… ইত্যাদি নিয়ে যতক্ষণে চিন্তিত হয়ে পড়ছে ইদানীংকালের খুনিরা, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে তাদের জন্য। কেউ কেউ অবশ্য গোপন করার চেষ্টা করছে তাদের চিহ্ন বা আলামত, কিন্তু সব চেষ্টাই শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানের কারণে।’

‘কিন্তু…’

‘জানি কী বলবেন আপনি,’ আমাকে কথা শেষ করতে দিল না হোথর্ন। ‘শতকরা প্রায় দুই ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, হত্যাকাণ্ডটা পূর্বপরিকল্পিত। অথবা দেখা যাচ্ছে, পেশাদার কোনো খুনিকে ব্যবহার করা হচ্ছে ওসব কাজে। কখনও আবার উদ্ভব ঘটছে বাতিকগ্রস্ত বা উন্মত্ত কোনো কোনো সিরিয়াল কিলারের… নিছক মজা পাওয়ার আশায় একের-পর-এক খুন করে যাচ্ছে তারা। মোদ্দা কথা হলো, সব খবরই আছে পুলিশের কাছে। তারা জানে, ঠিক কখন সাহায্য চাইতে হবে আমার মতো লোকদের কাছে। জানে, সাহায্য চাইতেই হবে তাদেরকে। কাজেই আমি আপনাকে যা বলতে চাই তা হলো, আমার উপর ভরসা রাখুন। বিস্তারিত কিছু যদি জানার থাকে আপনার, আগে আমাকে জিজ্ঞেস করুন। অন্যথায় যা দেখতে পাচ্ছেন বা পাবেন, ঠিক সে-কথাই লিখুন। দয়া করে মনে রাখবেন, টিনটিনের কোনো কাহিনি লিখছেন না আপনি আমাকে-নিয়ে। ঠিক আছে?’

‘এক মিনিট! আমি তো আপনাকে বলিনি টিনটিনের কোনো কাহিনি লিখছি আমি, তা হলে আপনি কী করে…’

‘আপনি বলেছিলেন, স্পিলবার্গের হয়ে একটা কাজ করছেন। এবং স্পিলবার্গ এই মুহূর্তে কী পরিচালনা করছেন, জানি আমি।’

‘পরিচালনা না, প্রযোজনা করছেন তিনি।’

‘ওই একই কথা।

টের পেলাম, রেগে গেছি। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। তারপর বললাম, ‘ঠিক আছে, আপনার ব্যাপারে লিখবো আমি। লিখবো এই কেসের ব্যাপারে। কেসটা যখন সমাধান করবেন… যদি সমাধান করতে পারেন আর কী… তা হলে আমার প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলে দেখবো এই কাহিনি ছাপাতে তিনি আগ্রহী হন কি না। কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে। যখন যা খুশি তা-ই বলবেন আমাকে, মুখে যা আসবে তা-ই শুনিয়ে দেবেন… এসব চলবে না। যত যা-ই হোক এই বইয়ের লেখক আমি। কাজেই কাহিনি কীভাবে এগোবে, সে-সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আমার।’

বড় বড় হয়ে গেল হোথর্নের চোখ। ‘শান্ত হোন, টনি। আমি শুধু সাহায্য করতে চাইছি আপনাকে।’

আলাপ-আলোচনা করে শেষপর্যন্ত একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারলাম আমরা।

এই বই লেখার কাজ যতদিন চলতে থাকবে, ততদিন আর একটা পৃষ্ঠাও দেখাবো না আমি হোথর্নকে। যা-খুশি তা-ই লেখার স্বাধীনতা থাকবে আমার। যদি প্রয়োজন বোধ করি, হোথর্নের সমালোচনাও করতে পারবো। এমনকী নিজস্ব চিন্তাভাবনাও ঢুকিয়ে দিতে পারবো বইয়ের ভিতরে। কিন্তু ক্রাইমসিনের বর্ণনা অথবা জিজ্ঞাসাবাদের প্রসঙ্গ যদি আসে, তা হলে ঠিক যা ঘটেছিল অথবা ঘটছে, তা-ই লিখতে বাধ্য থাকবো। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করবো না নিজের কল্পনাশক্তি, অনুমানসাপেক্ষে কিছু লিখবো না, অথবা অতিরঞ্জিত কোনো বর্ণনাও দেবো না। মোদ্দা কথা, এসব ক্ষেত্রে এমন কিছু লিখবো না, যার ফলে ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে পাঠক

সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো প্রথম চ্যাপ্টারের ব্যাপারেও। যেমন, ওই ঘণ্টা আর মন্ট ব্ল্যাঙ্ক কলমের ব্যাপারটা ভুলে যেতে হবে আমাকে। লিখতে হবে, যেদিন খুন হয়েছেন ডায়ানা ক্যুপার, সেদিন তিনি লাঞ্চ করেছেন রেমন্ড কুন্সের সঙ্গে। আন্দ্রিয়া ক্লুভানেকের বর্ণনাও বদল করতে হবে কিছুটা… এমনভাবে লিখতে হবে, যাতে পাঠকের মনে হয়, মেয়েটা হয়তো সত্যি কথা বলছে না।

আর, খুনির পরিচয় ফাঁস হয়ে যাবে, এ-রকম কোনো ক্লু যদি দিতে চাই, তা হলে সেটা সম্পূর্ণ নির্ভুল হতে হবে।

৪. ক্রাইম সিন

সোমবার সকালে গিয়ে হাজির হলাম ডায়ানা ক্যুপারের বাসার বাইরে।

ইউনিফর্ম পরিহিত এক পুলিশ-অফিসার দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। ‘পুলিশ লাইন ডু নট ক্রস’ লেখা নীল-সাদা প্লাস্টিকের একটা টেপ ঝুলছে সদর দরজায়। কিন্তু আমি যে যাবো, সেটা কেউ একজন বলে রেখেছিল ওই অফিসারকে। কারণ আমাকে ভিতরে ঢুকতে দিল লোকটা, আমার নামটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করল না। যেদিনের কথা বলছি, তার ঠিক পাঁচ দিন আগে খুন হয়েছেন ডায়ানা ক্যুপার। পুলিশের আরও কিছু ফাইল আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে হোথর্ন ইতোমধ্যে, কয়েকজনের ইন্টারভিউ রেকর্ডও পাঠিয়েছে। উইকএন্ডের পুরোটা খরচ করে ওসব পড়েছি আমি। নথিপত্রের সঙ্গে ছোট একটা নোটও পাঠিয়ে দিয়েছিল সে। বলেছিল, আজ এখানে সকাল ন’টার সময় যেন দেখা করি ওর সঙ্গে। যা-হোক, বাসার ভিতরে ঢুকে পড়লাম।

এর আগে যেসব ক্রাইমসিন পরিদর্শন করেছি, সেগুলো আমার তৈরি-করা। অর্থাৎ, কোনো নাটক বা সিনেমার জন্য ওই ঘটনাস্থলের বর্ণনা লিখেছি আমি; ডিরেক্টর, লোকেশন ম্যানেজার, ডিজাইনার আর প্রন্স ডিপার্টমেন্টের সবাই মিলে সেটা বানিয়ে দিয়েছেন আমার জন্য। কোন্ আসবাবটা কোথায় কীভাবে রাখতে হবে, এমনকী দেয়ালের রঙ কী হবে… সব ঠিক করে দিয়েছেন তাঁরা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিটেইলগুলোর উপর সব সময় জোর দিয়েছি আমি– ভাঙা আয়না, জানালার গোবরাটে রক্তমাখা আঙুলের ছাপ, অথবা আমার কাহিনির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে-কোনো কিছু। যে-কু’র কথা উল্লেখ করতে চেয়েছি, সেটা যে থাকতেই হবে ক্রাইমসিনে, এমন কোনো কথা নেই। ব্যাপারটা আসলে নির্ভর করে ক্যামেরা কোন্‌দিকে তাক করা হচ্ছে সেটার উপর।

ধীর পায়ে হাঁটছি আমি, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি; গিয়ে হাজির হলাম মিসেস ক্যুপারের লিভিংরুমে। জুতোর নিচে পুরু কার্পেটের অস্তিত্ব টের পাচ্ছি। মাথার উপর ঝুলছে স্ফটিকের একটা ঝাড়বাতি। আশপাশে দেখতে পাচ্ছি নকল- অ্যান্টিকের কিছু আসবাব। কফি টেবিলের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কান্ট্রি লাইফআর ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনের বেশ কয়েকটা সংখ্যা। একটা বিল্ট-ইন বুকশেল্ফে দেখা যাচ্ছে আধুনিক ফিকশনের উপর হার্ডব্যাক কয়েকটা বই। কোনোটাই আমার লেখা না। নিজেকে একজন অনধিকারপ্রবেশকারী বলে মনে হচ্ছে আমার। আর এই জায়গা মনে হচ্ছে এমন একটা জাদুঘর, যেখানে কিছু দিন আগেও কেউ একজন থাকতেন।

পুলিশের তদন্তকারী অফিসাররা হলুদ প্লাস্টিকের কতগুলো ট্যাগ লাগিয়ে দিয়েছে কিছু কিছু জিনিসের গায়ে। তবে ওসব ট্যাগের সংখ্যা খুব বেশি না। অর্থাৎ, বোঝা যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ তেমন কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি এখানে। পানিভর্তি একটা গ্লাসের (গ্লাসের ভিতরের ওই তরল আপাতদৃষ্টিতে পানি বলেই মনে হচ্ছে) গায়ে লাগানো ট্যাগের নম্বর ১২। অ্যান্টিক একটা সাইডবোর্ডের উপর রাখা আছে ওই গ্লাস। ওটার পাশে যেন নিতান্ত অবহেলায় পড়ে আছে একটা ক্রেডিট কার্ড। খেয়াল করলাম, কার্ডের গায়ে ডায়ানা ক্যুপারের নাম লেখা। এবং সেটার সঙ্গে যুক্ত-করা ট্যাগের নম্বর ১৪।

এসব কি কোনো ক্লু?

বলা মুশকিল।

তিনটা জানালা আছে এই ঘরে। মখমলের দুটো করে পর্দা ঝুলছে প্রতিটা জানালায়। পর্দাগুলো এত লম্বা যে, মেঝে ছুঁই ছুঁই করছে। রেশমি ঝুলওয়ালা লাল রঙের আলাদা আলাদা ফিতার সাহায্যে বেঁধে রাখা হয়েছে পাঁচটা পর্দা। দরজার সবচেয়ে কাছে যে-পর্দা আছে, সেটা বেঁধে রাখা হয়নি। এই পর্দার গায়ে দেখা যাচ্ছে আরেকটা ট্যাগ: ৬। পর্দাটা দেখে মনে পড়ে গেল, এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি, সেখানে গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করা হয়েছে এক মহিলাকে, এবং ঘটনাটা বেশিদিন আগের না। দৃশ্যটা কেন যেন ভেসে উঠল আমার চোখের সামনে… বড় বড় হয়ে গেছে মিসেস ক্যুপারের চোখ, আতঙ্কিত আর পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি, বাতাসে নিষ্ফল খামচি মারছে তাঁর হাতের আঙুলগুলো।

নিচের দিকে তাকালাম। কার্পেটের একজায়গায় একটা দাগ দেখা যাচ্ছে। সেখানে আরও দুটো নম্বর দিয়ে রেখেছে পুলিশের অফিসাররা। মারা যাওয়ার আগে, খুব সম্ভব, নিজের অন্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন মিসেস ক্যুপার… মল নির্গত হয়েছিল তাঁর।

একটা আওয়াজ শুনতে পেয়ে চোখ তুলে তাকালাম। ঘরে ঢুকেছে হোথর্ন। বরাবরের মতো একই স্যুট পরে আছে। স্যান্ডউইচ খাচ্ছে। বুঝতে একটু সময় লাগল আমার, মিসেস ক্যুপারের খাদ্যসামগ্রী ব্যবহার করে তাঁরই রান্নাঘরে ওই স্যান্ডউইচ বানিয়ে নিয়েছে সে নিজের জন্য। তাকিয়ে থাকলাম ওর দিকে।

‘কী?’ জিজ্ঞেস করল সে, মুখ ভর্তি হয়ে আছে খাবারে।

‘কিছু না,’ বললাম আমি।

‘নাস্তা খেয়েছেন?’

‘হ্যাঁ, ধন্যবাদ।’

আমার কণ্ঠ শুনে যা বুঝবার বুঝে নিল হোথর্ন। ‘শুধু শুধু এসব খাবার নষ্ট করে কোনো লাভ আছে, বলুন? তা ছাড়া এখন আর এসব দরকারও নেই মিসেস ক্যুপারের।’ স্যান্ডউইচটা নাড়িয়ে সারা ঘর দেখিয়ে দিল ইশারায়। ‘কী ধারণা আপনার, বলুন।’

কী বলবো, বুঝতে পারছি না। এই ঘর খুবই সাজানোগোছানো। শুধু একটা ফ্ল্যাটস্ক্রীন টেলিভিশন বেখাপ্পা ঠেকছে আমার কাছে। আজকাল লোকে দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয় ওসব জিনিস, কিন্তু তা না করে ওটা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে স্ট্যান্ডের উপর। আশপাশে যা-ই দেখতে পাচ্ছি, কেন যেন সব সেকেলে ঠেকছে আমার কাছে। মনে হচ্ছে, সুশৃঙ্খল একটা জীবন যাপন করতেন ডায়ানা ক্যুপার। এমনকী তাঁর মৃত্যুটাও কেন যেন পরিপাটি বলে মনে হচ্ছে। ধ্বস্তাধ্বস্তি করেননি তিনি, বাধা দেয়ার চেষ্টা করেননি খুনিকে… কোথাও উল্টে পড়ে নেই কোনো আসবাব। খুনি শুধু একটা চিহ্ন রেখে গেছে নিজের: দরজার কাছে, কার্পেটের এককোনায় অর্ধেকটা জুতোর-ছাপ। লোকটা মিসেস ক্যুপারকে খুন করার আগে তাঁকে নৃশংসভাবে পেটায়নি, এমনকী তাঁকে ধর্ষণও করেনি। কেন যেন মনে হচ্ছে, লোকটা ঠাণ্ডা মাথায় শেষ করে দিয়েছে তাঁকে।

‘খুনিকে চিনতেন মিসেস ক্যুপার,’ বলল হোথর্ন। ‘তবে তাঁর বন্ধু ছিল না ওই লোক। আমার ধারণা, লোকটা কমপক্ষে ছ’ফুট লম্বা, সুঠাম দেহের অধিকারী। তবে তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ। মিসেস ক্যুপারকে খুন করার উদ্দেশ্য নিয়েই এই বাড়িতে হাজির হয়েছিল সে। এবং খুব বেশিক্ষণ ছিল না এখানে। তাকে একা রেখে এই ঘর ছেড়ে কোনো একজায়গায় গিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার… খুব সম্ভব রান্নাঘরে। হয়তো ভেবেছিলেন, চলে যাবে লোকটা। যা-হোক, মিসেস ক্যুপারকে খুন করার পর এই বাড়িতে… কী বলবো… তল্লাশি চালায় ওই লোক, টুকটাক কয়েকটা জিনিস নিয়ে যায় নিজের সঙ্গে, কিন্তু আসলে ওসব জিনিস নেয়ার জন্য আসেনি। আমার ধারণা, ব্যক্তিগত কোনো কারণে খুন করেছে সে মিসেস ক্যুপারকে।

‘এসব কথা আপনি জানলেন কী করে?’

প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করামাত্র নিজেই বিরক্ত হলাম নিজের উপর। কারণ আমি জানি, হোথর্ন চেয়েছিল, ওই প্রশ্ন যেন জিজ্ঞেস করি। ওর ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছি।

‘লোকটা যখন এই বাড়িতে আসে,’ বলল হোর্থন, ‘তখন বাইরে অন্ধকার ঘনাচ্ছে। এবং, জানেন কি না জানি না, ইদানীং এই এলাকায় চুরিচামারির ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকটা। কাজেই শহরের ব্যয়বহুল একটা এলাকায় একা থাকেন এ- রকম একজন মহিলা যদি জানতে পারেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে একজন আগন্তুক, দরজা খুলবেন না তিনি। অর্থাৎ, খুনি মিসেস ক্যুপারের পূর্বপরিচিত। সে পুরুষ নাকি মহিলা, সে-প্রসঙ্গে আসুন এবার। আমি যা বলছি মেনে নিন– খুনি একজন পুরুষ। মেয়েরাও যে মেয়েদেরকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, জানি আমি; তারপরও… মিসেস ক্যুপারের বেলায় ঘটনাটা অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। তাঁর উচ্চতা ছিল পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি। গলায় ফাঁস লাগিয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে টেনে ধরে রাখার কারণে ভেঙে গেছে তাঁর হায়োইড অস্থি। কাজেই তাঁর চেয়ে লম্বা এবং অত্যন্ত শক্তিশালী কেউ যদি খুনি না-হয়, তা হলে ঘটত না ওই ঘটনা। তবে স্বীকার করে নিচ্ছি, বয়স হয়েছিল মিসেস ক্যুপারের, দুর্বল হয়ে গিয়েছিল তাঁর হায়োইড অস্থি, এবং সেটা ভেঙে ফেলার জন্য অসুরের মতো শক্তিশালী কাউকে দরকার নেই।’

‘লোকটা যে মিসেস ক্যুপারকে খুন করার জন্যই হাজির হয়েছিল এখানে, জানলেন কীভাবে?’

‘তিনটা কারণে। এই বাড়ির কোথাও কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায়নি খুনির। আজ থেকে পাঁচ দিন আগে মোটেও ঠাণ্ডা ছিল না আবহাওয়া, বরং বেশ গরমই ছিল; তারপরও গ্লাভস পরে ছিল লোকটা… আসলে নিশ্চিত হতে চেয়েছে কোথাও যেন আঙুলের ছাপ না-পড়ে তার। বেশিক্ষণ এখানে ছিলও না সে। কোথাও কোনো কফির কাপ নেই, জিন অ্যান্ড টনিকের খালি গ্লাস নেই। ওই লোক যদি মিসেস ক্যুপারের বন্ধু হতো, তা হলে তারা দু’জনে একসঙ্গে কোথাও বসে গলা ভেজাত।’

‘হয়তো তাড়াহুড়ো ছিল লোকটার।’

‘কুশনগুলোর দিকে একবার তাকান, টনি। লোকটা এমনকী বসেওনি।

একটু আগে যে-গ্লাস দেখেছি, এগিয়ে গেলাম সেটার দিকে। ওটা হাতে নিয়ে দেখতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু সংবরণ করলাম নিজেকে। পুলিশ আর ফরেনযিকের অফিসাররা এসেছিল এখানে, প্রমাণ হিসেবে নিশ্চয়ই কিছু-না-কিছু নিয়ে গেছে; কিন্তু এই গ্লাস কেন নিল না, ভেবে আশ্চর্য হলাম কিছুটা।

কথাটা বললাম হোথৰ্নকে।

‘ওটা নিয়ে গিয়েছিল ওরা,’ বলল হোথর্ন, ‘কিন্তু আবার রেখে গেছে।’

‘কেন?’

‘আমার জন্য,’ একটুখানি হাসল হোথর্ন, মুখের ভিতরে চালান করে দিল স্যান্ডউইচের বাকিটা।

‘তার মানে কেউ একজন ড্রিঙ্ক করেছিল।’

‘গ্লাসের ওই তরল পানি ছাড়া আর কিছু না,’ স্যান্ডউইচটুকু চিবিয়ে নিয়ে গিলে ফেলল হোথর্ন। ‘আমার কী ধারণা, জানেন? আমার ধারণা, চলে যাওয়ার আগে খুনি একগ্লাস পানি চেয়েছিল মিসেস ক্যুপারের কাছে। এবং সেটা আনতেই এই ঘর ছেড়ে বাইরে গিয়েছিলেন তিনি। সময়টা কাজে লাগিয়েছে খুনি, হুক থেকে খুলে নিয়েছে পর্দার ফিতা। ঘটনাটা ঘটার সময় এখানে যদি উপস্থিত থাকতেন মিসেস ক্যুপার, তা হলে সেটা করতে পারত না ওই লোক।’

‘কিন্তু খুনি পানি খায়নি।

‘নিজের ডিএনএ রেখে যেতে চায়নি সে আসলে।’

‘ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপারটা কী?’ ওই জিনিসের গায়ে প্রিন্ট-করা নামটা পড়লাম: মিসেস ডায়ানা জে. ক্যুপার। কার্ডটা ইস্যু করা হয়েছে বাসে ব্যাংক থেকে। মেয়াদ শেষ হবে নভেম্বর মাসে। মানে আরও ছ’মাস বাকি।

‘ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং,’ বলল হোখন। ‘জিনিসটা অন্য সব কিছুর সঙ্গে তাঁর পার্সের ভিতরে পাওয়া গেল না কেন? ওটা কি পার্স থেকে বের করেছিলেন তিনি নিজেই? কেন করেছিলেন? কোনো কিছুর দাম চুকাতে চাইছিলেন? আর সেজন্যই কি দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতে দিয়েছিলেন খুনিকে? ওই কার্ডে তাঁর ফিঙ্গারপ্রিন্ট ছাড়া অন্য কারও আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়নি।’

‘তার মানে…’

‘তার মানে সম্ভাব্য একটা ব্যাখ্যা চলে আসছে আমাদের সামনে,’ আমার মুখের কথা কেড়ে নিল হোথর্ন। ‘কেউ একজন কিছু-একটার দাম চেয়েছিল মিসেস ক্যুপারের কাছে। তখন ক্রেডিট কার্ডটা বের করতে চাইছিলেন তিনি পার্সের ভিতর থেকে। ওটা যখন খুঁজছিলেন তিনি, তখন সুযোগ বুঝে তাঁর গলায় ফাঁস লাগিয়ে দেয় খুনি। এখন কথা হচ্ছে, কারও হাতে ক্রেডিট কার্ড থাকা অবস্থায় তার গলায় যদি ফাঁস লাগানো হয়, তা হলে কার্ডটা মেঝেতে পড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটা ঘটেনি… মানে, কার্ডটা মেঝেতে পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন?’ মাথা নাড়ল সে। ‘আবার এ-রকমও হতে পারে, মূল ঘটনার সঙ্গে ওই কার্ডের কোনো যোগসূত্রই নেই। …দেখা যাক শেষপর্যন্ত কী জানতে পারি।’

‘আপনি বলেছেন খুনির দৃষ্টিশক্তি নাকি দুর্বল।’

‘হ্যাঁ…’

‘কেন বলেছেন কথাটা? মিসেস ক্যুপারের একহাতের আঙুলে হীরার একটা আংটি ছিল, অথচ সেটা নজরে পড়েনি ওই লোকের… সেজন্য? আংটিটা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারলে অনেক টাকায় বেচতে পারত সে।’

‘না, আংটির কারণে বলিনি কথাটা। ভুল বুঝেছেন। ওই আংটির উপর বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না খুনির। আগেও বলেছি আবারও বলছি, যে-লোকই খুন করে থাকুক না কেন মিসেস ক্যুপারকে, হত্যাকাণ্ডটা চুরি বা ডাকাতি হিসেবে চালিয়ে দিতে চেয়েছে সে। ওই মহিলার কিছু গহনা আর একটা ল্যাপটপ নিয়ে গেছে সে। তবে হীরার ওই আংটি নেয়নি। ওটার কথা হয় ভুলে গেছে, নয়তো সঙ্গে স্যাকেটার্স (শক্ত ধাতব পদার্থ কাটার জন্য ব্যবহৃত বিশেষ একজাতের কেঁচি) ছিল না বলে কোনো ঝামেলা করতে চায়নি। …পেছন থেকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করবে সে মিসেস ক্যুপারকে, অথচ তাঁর হাতের আংটিটা দেখতে পাবে না– এটা এককথায় অসম্ভব।’

‘তা হলে ওই লোকের দৃষ্টিশক্তি যে দুর্বল, জানলেন কী করে?’

‘এই বাড়ির সদর দরজার বাইরে কাদায় ভরা একটা জায়গা ছিল, দৃষ্টিশক্তি দুর্বল বলেই সেখানে পা দিয়ে ফেলেছিল। আর সে-কারণেই তার জুতোর তলার ছাপ বসে গেছে কার্পেটের এককোনায়। যা-হোক, সে-ছাপ দেখে তাকে পুরুষলোক বলেই মনে হয়েছে আমার। ওই ছাপ বাদ দিয়ে যদি বলি, অন্য সব বিষয়ে খুব সতর্ক ছিল সে। …এসব কথা লিখবেন তো আপনি বইয়ে?’

‘লিখবো। মোটামুটি সব কিছুই মনে আছে আমার।’ বের করলাম আমার আইফোনটা। ‘কোনো সমস্যা না-থাকলে কয়েকটা ছবি তুলতে চাই।’

‘সমস্যা নেই। তুলুন।’ সাইডবোর্ডের উপর একজন লোকের সাদা-কালো একটা ফটোগ্রাফ রাখা আছে, লোকটার বয়স চল্লিশের ঘরে; ইঙ্গিতে ছবিটা দেখিয়ে দিল হোথর্ন। ‘ওটার ছবি তুলে নিতে ভুলবেন না যেন।’

‘কে ওই লোক?’

‘আমার ধারণা মিসেস ক্যুপারের স্বামী। লরেন্স ক্যুপার।’

‘ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল তাঁদের দু’জনের?

এমন এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল হোথর্ন যে, দেখে মনে হলো, কথাটা শুনে চোট পেয়েছে মনে। ‘ডিভোর্স হয়ে গেলে ওই লোকের ছবি নিজের বাড়িতে রাখতেন না মিসেস ক্যুপার। যা-হোক, আজ থেকে বারো বছর আগে মারা গেছেন লোকটা। ক্যান্সার।’

কথা আর না-বাড়িয়ে নিজের আইফোনে মিসেস ক্যুপারের স্বামীর ছবি তুলে নিলাম। টুকটাক আরও কিছু ছবি তুললাম।

তারপর ঘুরে বেড়াতে লাগলাম হোথর্নের পিছু পিছু। আমাকে নিয়ে এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যাচ্ছে সে। দেখিয়ে দিচ্ছে এটা-সেটা, ছবি তুলতে বলছে আমাকে। ওর কথামতো কাজ করছি।

আমাদের এই ঘুরে বেড়ানোর কাজটা শুরু হলো কিচেন থেকে। রান্নাঘরটা, প্রথম দেখায়, কোনো শো-রুম বলে মনে হলো আমার কাছে… প্রয়োজনীয় এবং দামি সব জিনিসপত্রে ঠাসা, অথচ ব্যবহৃত হয়েছে খুব কম। অর্থাৎ রান্নার কাজ খুব একটা করতেন না মনে হয় মিসেস ক্যুপার। রাতে হয়তো একটা সেদ্ধ ডিম আর দু’টুকরো টোস্ট খেয়ে শুয়ে পড়তেন।

ফ্রিজের গায়ে চুম্বক দিয়ে সাঁটা আছে অনেক কিছু: ক্ল্যাসিকাল আর্ট, শেক্সপিয়ারের উক্তি। নার্নিয়া সিনেমার প্রিন্স ক্যাস্পিয়ান চরিত্রটার ছবিওয়ালা একটা টিনের-কৌটা রাখা আছে ফ্রিজের উপর

যাতে আঙুলের ছাপ বসে না-যায় সেজন্য একটা কাপড় দিয়ে ধরে ফ্রিজের দরজাটা খুলল হোথর্ন। ভিতরটা বলতে গেলে খালি। দরজাটা লাগিয়ে দিল সে। এবার খুলল টিনের কৌটাটা। কিছুক্ষণ দেখার পর আগের জায়গায় রেখে দিল সেটা।

এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি আমি। যেটা যেখানে রাখা দরকার, সেটা ঠিক সেখানেই রাখা আছে বলে মনে হচ্ছে। জানালার গোবরাটের উপর রাখা আছে রেসিপির কয়েকটা বই। টোস্টারের পেছনের একটা র‍্যাকে রাখা আছে কয়েকটা নোটবুক আর সাম্প্রতিক কিছু চিঠি। এই সপ্তাহে কী কী কেনাকাটা করতে হবে সেটার ছোট একটা তালিকা লেখা আছে একটা ব্ল্যাকবোর্ডে।

এগিয়ে গিয়ে চিঠিগুলো তুলে নিল হোথর্ন, ঘাঁটাঘাঁটি করল কিছুক্ষণ, তারপর রেখে দিল আগের জায়গায়। কাউন্টারের উপর, দেয়ালের গায়ে আটকানো আছে কাঠের একটা মাছ; সেটার সঙ্গে যুক্ত আছে পাঁচটা হুক, আলাদা আলাদা কয়েকটা চাবি ঝুলছে ওসব হুকে… ব্যাপারটা আগ্রহী করে তুলল হোথর্নকে। প্রতিটা চাবির গায়ে সাঁটা আছে লেবেল। আগ্রহ জাগল আমার মনেও, ছবি তুলে নিলাম চাবিগুলোর। ওসব লেবেলের উপর চোখ বুলিয়ে জানতে পারলাম, কোনো চাবি সদর-দরজার, কোনোটা আবার পেছনের দরজার অথবা সেলারের। চতুর্থ চাবির গায়ে সাঁটা লেবেলে লেখা আছে: স্টোনার হাউস।

‘এটা কী?’ জানতে চাইলাম আমি।

‘একটা বাড়ি… একসময় সেখানে থাকতেন মিসেস ক্যুপার। পরে লন্ডনে চলে আসেন তিনি। বাড়িটা কেন্টের ওয়ালমারে অবস্থিত।’

‘ওই বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছেন তিনি, তারপরও রেখে দিয়েছেন সেখানকার চাবি… ব্যাপারটা অদ্ভুত।’

কোনো মন্তব্য করল না হোথর্ন।

খুঁজতে খুঁজতে একটা ড্রয়ারে পাওয়া গেল আরও কিছু পুরনো চিঠি এবং বিল। প্রায় সবগুলোই ঘেঁটে দেখল হোথর্ন। মরোক্কান নাইটস নামের একটা গীতিনাট্যের ব্রশিউর পাওয়া গেল আরেকটা ড্রয়ারে। প্রথম পৃষ্ঠায় দেখা যাচ্ছে কয়েকজন প্রযোজকের নাম; তাঁদের মধ্যে রেমন্ড কুন্সের নামটাও আছে।

রান্নাঘর থেকে আমরা গেলাম উপরতলায়। করিডর ধরে হাঁটছি। ফ্রেমে বন্দি অবস্থায় মঞ্চনাটকের কিছু দৃশ্য ঝুলছে ওয়ালপেপার-সাঁটা দু’ধারের দেয়ালে হ্যামলেট, দ্য টেম্পেস্ট, হেনরি ফাইভ, দ্য ইম্পর্টেন্স অভ বিইং আর্নেস্ট, দ্য বার্থডে পার্টি। প্রতিটা নাটকেই অভিনয় করেছে ড্যামিয়েন ক্যুপার।

করিডর ধরে সামনের দিকে এগিয়ে গেল হোথর্ন, কিন্তু আমি ঢুকে পড়লাম মিসেস ক্যুপারের বেডরুমে। অনধিকার-প্রবেশের সেই অস্বস্তিকর অনুভূতি আরও একবার জেগে উঠল আমার মনে, এবং ব্যাপারটা বিস্মিত করল আমাকে। হয়তো সপ্তাহখানেক আগেও একজন মহিলা কাপড় ছেড়েছেন এই ঘরে, হয়তো কিছু সময়ের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি প্রমাণ আকৃতির আয়নার সামনে, হয়তো স্টিগ লারসনের দ্য গার্ল হু প্লেইড উইথ ফায়ার বইটা নিয়ে শুয়েছেন কুইন-সাইজ বিছানায়। বইটা এখন পড়ে আছে বেডসাইড টেবিলের উপর।

দুটো বালিশ দেখা যাচ্ছে বিছানায়। একটাতে একটুখানি গর্ত হয়ে আছে… অর্থাৎ ওটাতে মাথা রেখে শুয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার।

যেখানেই গিয়ে থাকুক না কেন হোথর্ন, ফিরে এসে ঢুকে পড়েছে বেডরুমে তল্লাশি চালাচ্ছে ওয়ার্ডরোব, বেডসাইড কেবিনেট আর বিভিন্ন ড্রয়ারে। ড্যামিয়েন ক্যুপারের ফ্রেমে-বন্দি একটা ছবির উপর নজর বুলিয়ে নিল দ্রুত। ছবিটা রাখা আছে মিসেস ক্যুপারের মেকআপ টেবিলের উপর। আমিও তাকালাম ওটার দিকে একনজরেই যে চিনতে পারলাম লোকটাকে, এমনটা দাবি করবো না… কারণ লোকের চেহারা ঠিকমতো মনে থাকে না আমার; বিশেষ করে ড্যামিয়েনের মতো যুবক বয়সী, সুদর্শন, ইংরেজ অভিনেতাদের ব্যাপারে প্রায়ই তালগোল পাকিয়ে ফেলি। আর যারা হলিউডের ছবিতে অভিনয় করে, তাদের কথা তো বলাই বাহুল্য।

মিসেস ক্যুপারের শু র‍্যাকের পেছনে একটা সিন্দুক খুঁজে পেল হোথর্ন। ওটা লক-করা বুঝতে পেরে ভ্রূ কুঁচকে গেল ওর। কিন্তু পরমুহূর্তেই যেন ভুলে গেল ব্যাপারটা।

যে-পদ্ধতিতে ক্লু খুঁজছে সে, মুগ্ধ না-হয়ে পারছি না। খোঁজাখুঁজির এই সময়টাতে একটা কথাও বলেনি আমার সঙ্গে। এমনকী ওর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়নি, আমি যে আছি এখানে, সেটা মনে আছে ওর। কোনো কোনো বিমানবন্দরে গন্ধ শুঁকবার কাজে ব্যবহৃত হয় কুকুর; হোথর্নের কাজ দেখে ওসব জন্তুর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে আমার। যাত্রীদের প্রতিটা সুটকেসেই যে ড্রাগস বা বোমা থাকবে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই, তারপরও… কুকুর তো কুকুরই… প্রতিটা সুটকেস আর ব্যাগ শুঁকবেই ওগুলো। এবং ওগুলোর মতোই অনিশ্চয়তা দেখতে পাচ্ছি হোথর্নের চেহারায়। ওগুলো যেভাবে নিশ্চিত হতে চায়, সেভাবে যেন নিশ্চিত হতে চাইছে সে বিশেষ কোনো একটা ব্যাপারে।

বেডরুম থেকে বাথরুমে গিয়ে ঢুকল হোথর্ন। বাথটাবের ধারে গোটা বিশেক বোতল দেখতে পাচ্ছি। অনুমান করলাম, হোটেল থেকে নিজের জন্য শ্যাম্পু আর বাথ-জেল আনিয়ে নিতেন মিসেস ক্যুপার। বেসিনের উপর একটা কেবিনেট দেখতে পেয়ে সেটা খুলল হোথর্ন। টেমাজেপামের তিনটা প্যাকেট বের করল। এটা আসলে একজাতের ঘুমের ওষুধ। আমার দিকে ঘুরে প্যাকেট তিনটা দেখাল।

‘ইন্টারেস্টিং,’ এতক্ষণে কথা ফুটল ওর মুখে।

‘কিছু একটা নিয়ে উদ্বেগে ভুগছিলেন মিসেস ক্যুপার,’ বললাম আমি। ‘হয়তো… ঠিকমতো ঘুম হচ্ছিল না তাঁর।’

মন্তব্য করল না হোথর্ন। প্রথমে বের হলো বাথরুম থেকে, তারপর বের হলো বেডরুম থেকে। ওর পেছন পেছন রওয়ানা হলাম।

এই বাড়ির উপরতলায় দুটো গেস্টরুম আছে। তবে একনজর দেখেই বোঝা গেল, সাম্প্রতিক সময়ে কোনো অতিথি থাকতে আসেনি এখানে। খুবই পরিপাটি করে সাজানো আছে দুটো ঘরই, এবং দু’জায়গার বাতাসই কেমন ঠাণ্ডা। অনুমান করে নিলাম, বিদ্যুতের খরচ বাঁচানোর জন্য এই দু’ঘরের সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেম বন্ধ করে রাখা হয়েছে।

এদিক-ওদিক তাকাল হোথর্ন, তারপর বেরিয়ে এসে দাঁড়াল করিডরে। ‘বিড়ালটার কী হয়েছে বলে ধারণা আপনার?’ জিজ্ঞেস করল আমাকে

‘কীসের বিড়াল?’

‘মিসেস ক্যুপারের একটা বিড়াল ছিল। পার্শিয়ান গ্রে। মেডিসিন বল দেখেছেন না? বড় বড় লোমওয়ালা ওসব বিড়াল দেখলে ওই জিনিসের কথা মনে পড়ে যায় আমার।’

‘কই, কোথাও কোনো বিড়ালের ফটোগ্রাফ দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না?’

‘আমিও দেখিনি।’

দেখেনি যখন, তখন বিড়ালের ব্যাপার জানল কী করে হোথৰ্ন?

কিন্তু ওই ব্যাপারে আর কিছু বলল না সে। হঠাৎ করেই বদলে গেছে ওর মুখভাব… বিরক্ত বলে মনে হচ্ছে ওকে।

বললাম, ‘আপনাকে নিয়ে যদি লিখি, তা হলে আপনার কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে হবে আমাকে।’

‘যেমন?’

‘বিড়ালের ব্যাপারটা। বলা নেই কওয়া নেই, হুট করে বলে বসলেন ওটার কথা। অথচ পুরো বাড়ির ভিতরে ওই প্রাণীর একটা ছবিও নেই।

আমার কথা শুনে হোথর্নের বিরক্তি আরও যেন বাড়ল। ‘কিচেনে একটা ফিডিং বোল আছে… দেখেননি? আর বেডরুমের ওই বালিশটা… ওটাও কি নজর এড়িয়ে গেছে আপনার?’

‘বেডরুমের বালিশটা? আমি তো ভেবেছিলাম মিসেস ক্যুপার ওটাতে মাথা রেখে শুয়েছিলেন বলেই…’

‘আরে না! তাঁর মাথায় বিড়ালের লোমের মতো ছোট ছোট রেশমি চুল নেই। তা ছাড়া ওই বালিশ থেকে মাছের মতো গন্ধ পেয়েছি। আরও একটা ব্যাপার নজর এড়িয়ে গেছে আপনার… বুঝতে পারছি। বিছানার বাঁ দিকে শুতেন মিসেস ক্যুপার, কারণ বেডসাইড টেবিলটা সেদিকেই, আর ওই টেবিলের উপরই দেখতে পেয়েছি আমরা স্টিগ লারসনের বইটা। বিড়ালটা শুত বিছানার অন্য পাশে। বালিশে যে- রকম গর্ত তৈরি হয়েছে সেটা দেখলেই বোঝা যায়, ওই বিড়াল বেশ নাদুসনুদুস এবং বড়সড়। আগেও বলেছি আবারও বলছি, আমার ধারণা ওটা একটা পার্শিয়ান গ্রে। কিন্তু…’ আরও একবার এদিক-ওদিক তাকাল হোথর্ন, ‘কোথাও দেখতে পাচ্ছি না কেন ওটাকে?’

‘হয়তো… পুলিশ নিয়ে গেছে।’

‘হয়তো।’

নিচতলায় হাজির হলাম আমরা দু’জন। আবার ঢুকলাম লিভিংরুমে। দেখতে পেলাম, আরও একজন লোক উপস্থিত হয়েছে কখন যেন। তার পরনে সস্তা স্যুট। দু’পা ফাঁক করে বসে আছে সোফায়, একটা ফাইল খুলে মেলে রেখেছে কোলের উপর। বাঁকা হয়ে আছে পরনের টাই, লাগানো হয়নি শার্টের দুটো বোতাম। কেন যেন মনে হলো, লোকটা ধূমপায়ী। অসুস্থতার ছাপ তার সব কিছুতে: চামড়ার রঙে, পাতলা হয়ে-আসা চুলে, ভাঙা নাকে, এমনকী ট্রাউজারের ওয়েস্টব্যান্ডের সঙ্গে লেপ্টে-থাকা পেটে। তার বয়স হোথর্নের সমানই, কিন্তু হোথর্নের চেয়ে বড়সড় আর থলথলে। দেখে মনে হচ্ছে, কিছু দিন আগে অবসর নিয়েছে বক্সিং-রিং থেকে। অনুমান করলাম, লোকটা নিশ্চয়ই পুলিশের কোনো অফিসার। এ-রকম লোকদের টেলিভিশনে অনেক দেখেছি… নাটকে না, আদালতকক্ষের বাইরে– ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আগে-থেকেই তৈরি-করে-রাখা কোনো বিবৃতি পড়ার সময়।

‘হোথর্ন,’ বলে উঠল লোকটা, উৎসাহের ছিটেফোঁটা নেই কণ্ঠে

‘ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিডোস!’ আনুষ্ঠানিক উপাধিটা হাস্যকর ভঙ্গিতে উচ্চারণ করল হোথর্ন; ভাবখানা এমন, মিডোসের নামের সঙ্গে যেন মেলে না সেটা। তারপর বলল, ‘হ্যালো, জ্যাক।‘

বুঝে নিলাম, সোফায় বসে-থাকা ওই লোকের পুরো নাম জ্যাক মিডোস।

‘আমাকে যখন বলা হলো আপনাকে খবর দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে এই কেসের ব্যাপারে, বিশ্বাসই করতে পারিনি।’ আমার উপর নজর পড়ল মিডোসের। ‘আপনি কে?’

সহসা কোনো জবাব দিলাম না। কারণ ঠিক কী পরিচয় দেবো নিজের, বুঝতে পারছি না।

‘তিনি একজন লেখক,’ বলল হোথর্ন। ‘আমার সঙ্গে আছেন।’

‘কী! কী নিয়ে লেখালেখি করছেন তিনি?’

‘এই কেস নিয়ে।’

‘বাইরের কাউকে জড়িয়ে ফেলছেন আপনি এসবের সঙ্গে … ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছেন তো? যা-হোক, আপনার জন্য যা-যা করতে বলা হয়েছিল আমাকে, সব করেছি। প্রমাণ হিসেবে কিছু জিনিস নিয়ে গিয়েছিলাম আমরা সঙ্গে, সব আবার ফিরিয়ে এনে যেটা-যেখানে-ছিল সেটা সেখানে রেখে দিয়েছি সময়ের অপচয় আর কী। …ক্রাইম সিন পরিদর্শনের কাজটা মনে হচ্ছে শেষ করেছেন?’

‘করেছি মোটামুটি। চলে যাচ্ছিলাম, আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ভালোই হলো। মিসেস ক্যুপারের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে কী ধারণা আপনার, বলুন তো?’

‘কিছু মনে করবেন না… এ-ব্যাপারে আমার যা-ধারণা, সেটা ভাগাভাগি করতে চাইছি না আপনার সঙ্গে।’ অলস ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল মিডোস। যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়েও লম্বাচওড়া সে। মনে হচ্ছে, একটা টাওয়ার যেন দাঁড়িয়ে আছে আমার আর হোথর্নের সামনে। ফাইলের কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে সেটা বাড়িয়ে ধরল হোথর্নের দিকে। ‘এটা আপনার হাতে দিতে বলা হয়েছে আমাকে।’

ইতোমধ্যে নজর বুলিয়ে নিয়েছি আমি ওই ফাইলের উপর। ওটার ভিতরে বিভিন্ন ফটোগ্রাফ, ফরেনযিক রিপোর্ট, সাক্ষীদের বিবৃতি, এবং এই বাড়ির টেলিফোন আর ডায়ানা ক্যুপারের মোবাইল থেকে করা গত দু’সপ্তাহের সমস্ত কলের রেকর্ড আছে।

ফাইলটা হাতে নিল হোথর্ন, নজর বোলাল প্রথম পৃষ্ঠার উপর। ‘সন্ধ্যা ছ’টা একত্রিশ মিনিটে একটা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার।’

‘ঠিক। আর সে-সময়ের কিছুক্ষণ পরই তাঁর গলায় ফাঁস লাগানো হয়। খুনি … কিছু একটা বলতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিল মিডোস, হাসল। ‘ওই মেসেভ পড়েছি আমি। এবং সেটা পড়ে তেমন কিছুই মনে হয়নি আমার। এমনক মেসেজটা আদৌ গুরুত্বপূর্ণ কি না, তা-ও বুঝতে পারিনি। আপনি চেষ্টা করে দেখুন ওটার কোনো মানে বের করতে পারেন কি না।’ সাইডবোর্ডের উপর, ক্রেডিট কার্ডের পাশে রাখা পানির গ্লাসটার দিকে এগিয়ে গেল। ‘এবার এই জিনিস নিয়ে যেতে চাই… যদি কোনো আপত্তি না-থাকে আপনার।’

‘না, আপত্তি নেই।’

প্রথমবারের মতো খেয়াল করলাম, গ্লাভস পরে আছে মিডোস। কোনো একজাতের প্লাস্টিকের-ক্যাপ ব্যবহার করে গ্লাসটা সিল করে দিল সে, তারপর তুলে নিল।

‘ওই গ্লাসে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে,’ বলল হোথর্ন, ‘তবে সেটা শুধু মিসেস ক্যুপারের। কিন্তু কোনো ডিএনএ পাওয়া যায়নি ওটা থেকে। তার মানে কেউ পানি খায়নি ওই গ্লাসে।’

‘মানে?’ দ্বিধা দেখা দিয়েছে মিডোসের চেহারায়। ‘রিপোর্টটা কি আগেই পড়ে ফেলেছেন?’

‘যা বললাম, সেটা বলার জন্য রিপোর্ট পড়ার দরকার হয় না আমার… দেখলেই বোঝা যায়। ফ্রিজের উপর রাখা টিনের ওই কৌটা দেখেছেন?’

‘দেখেছি। কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায়নি ওটাতেও

‘ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপারটা কী?’

‘কোন্ ব্যাপার?’

‘শেষ কবে ব্যবহার করা হয়েছিল ওটা?’

ইঙ্গিতে ফাইলটা দেখিয়ে দিল মিডোস। ‘ওই মহিলার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে আছে পনেরো হাজার পাউন্ড। আর তাঁর সেভিংস অ্যাকাউন্টে আছে আরও দুই লক্ষ পাউন্ড। …কী যেন জানতে চেয়েছিলেন? ও… মিসেস ক্যুপার শেষ কবে ব্যবহার করেছেন ওই কার্ড, তা-ই তো? সপ্তাহখানেক আগে। হ্যাঁরোস্-এ। সেখান থেকেই মুদি সামগ্রী কিনতেন তিনি।’

‘কী কী কিনেছিলেন তিনি, তা-ও জানি। স্মোক্ড স্যামন আর ক্রীম-লাগানো পনির।’

‘কীভাবে জানতে পারলেন?’

‘কিচেনে দেখেছি ওসব। এবং ওসব কাজে লাগিয়েই নিজের জন্য ব্রেকফাস্ট বানিয়ে নিয়েছিলাম।’

‘কী! স্বেচ্ছায়-সজ্ঞানে ক্রাইমসিনের প্রমাণ ধ্বংস করেছেন?’

‘হ্যাঁ, করেছি। কারণ আমার খিদে পেয়েছিল অনেক।’

ভ্রূ কুঁচকে গেছে মিডোসের। ‘আর কিছু জানার আছে আপনার?’

‘আছে। বিড়ালটার কী হয়েছে?

‘কীসের বিড়াল?’

‘আমার প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেছি।’

হোথর্নের বলার কায়দায় বুঝতে পারলাম, মিসেস ক্যুপারের বিশেষ সেই বিড়ালের ব্যাপারে কিছুই জানে না মিডোস।

গ্লাসটা চোখের সামনে ধরে কী যেন দেখছে পুলিশের ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টর। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, সে যেন কোনো জাদুকর… এখনই এমন কোনো ভেল্কিবাজি দেখাবে, যার ফলে ওই গ্লাসের ভিতরে হাজির হবে কোনো গোল্ডফিশ। কিন্তু, বলাই বাহুল্য, সে-রকম কিছু ঘটল না।

গ্লাসের উপর থেকে চোখ না সরিয়ে আমার উদ্দেশে মাথা ঝাঁকাল লোকটা। ‘আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল। তবে… আপনার জায়গায় যদি আমি থাকতাম, এ-রকম কোনো ক্রাইমসিনে এলে সাবধান থাকার চেষ্টা করতাম। বিশেষ করে যদি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতাম, তা হলে।’

জবাবে কিছু বলার সুযোগ দিল না আমাকে। নজর সরিয়ে নিল গ্লাসের উপর থেকে, এদিক-ওদিক তাকাল, তারপর গ্লাসটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল।

১০. চিত্রনাট্যের সম্মেলন

মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দেয়ার কথা ছিল না আমার। কারণ যেদিন হওয়ার কথা ছিল ওই অনুষ্ঠান, তার আগের দিন ফোন পেলাম স্টিভেন স্পিলবার্গের অফিস থেকে। জানতে পারলাম, তিনি আর পিটার জ্যাকসন হাজির হয়েছেন লন্ডনে, টিনটিনের সেই চিত্রনাট্য নিয়ে কথা বলতে চাইছেন আমার সঙ্গে। আরও জানতে পারলাম, রিচমন্ড মিউসের সোহো হোটেলে উঠেছেন তাঁরা।

ওই হোটেল ভালোমতোই চিনি আমি। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, এককালে কার পার্কিং ছিল জায়গাটা। আর এখন পরিণত হয়েছে ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কেন্দ্রবিন্দুতে। হোটেলের চারদিকে সারি সারি প্রোডাকশন হাউস আছে। আরও আছে বিভিন্ন রকমের পোস্ট প্রোডাকশন ফ্যাসিলিটি। হোটেলের ভিতরে আছে দুটো স্ক্রিনিং রুম। গ্রাউন্ড ফ্লোরে আছে ‘রিফুয়েল’ নামের ব্যস্ত একটা রেস্টুরেন্ট। সেখানে দু’-একবার লাঞ্চ করেছি আমি।

পরের দুটো দিন ড্যামিয়েন ক্যুপার আর তার মায়ের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেলাম। ডুবে থাকলাম টিনটিনের সেই চিত্রনাট্য নিয়ে। কারণ আমার জানা ছিল না, পরিচালক হিসেবে জ্যাকসন অথবা প্রযোজক হিসেবে স্পিলবার্গ ঠিক কী প্রতিক্রিয়া দেখাবেন আমার কাজে।

যা-হোক, নির্ধারিত দিনে সকাল ঠিক দশটায় হাজির হয়ে গেলাম সোহো হোটেলে। দ্বিতীয় তলার একটা রুমে নিয়ে যাওয়া হলো আমাকে। বড় একটা কনফারেন্স টেবিল আছে সেখানে। সেটার উপর রাখা আছে তিনটা গ্লাস আর ফিজি মিনারেল ওয়াটারের একটা বোতল। কয়েক মিনিট পরই উপস্থিত হলেন পিটার জ্যাকসন। বরাবরের মতোই অমায়িক দেখাচ্ছে তাঁকে। আগে বেশ মোটা ছিলেন, ওজন অনেক কমিয়েছেন। পরনের কাপড় ঢলঢল করছে।

কথা শুরু হলো আমাদের মধ্যে। লন্ডন, এখানকার আবহাওয়া, এখনকার সিনেমা… ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে কথা হলো তাঁর সঙ্গে; কিন্তু চিত্রনাট্যটা নিয়ে কোনো কথা বললেন না তিনি।

রুমের দরজাটা খুলে গেল আবার, এবার ভিতরে ঢুকলেন স্পিলবার্গ। সব সময় বলতে-গেলে একইরকম কাপড় পরেন তিনি, আজও ব্যতিক্রম করেননি… চামড়ার একটা জ্যাকেট, জিন্স, ট্রেইনার্স আর বেসবল ক্যাপ। চশমা আর দাড়ি দেখামাত্র চেনা যায় তাঁকে।

সবসময়ের মতো আরও একবার নিজেকে আমার মনে করিয়ে দিতে হলো, চোখের সামনে যা ঘটছে তা সত্যি… যে-রুমে বসে আছেন স্পিলবার্গ সেখানে বসে আছি আমিও। আসলে তিনি এমন কেউ, যাঁর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছি বার বার।

সরাসরি কাজের কথায় চলে গেলেন স্পিলবার্গ। জীবনে অনেক চিত্র-প্রযোজকের দেখা পেয়েছি আমি, তাঁদের সঙ্গে কাজ করার অথবা কথা বলার সৌভাগ্যও হয়েছে; কিন্তু স্পিলবার্গের মতো কাউকে দেখিনি কখনও। কাজই যেন তাঁর ধ্যানজ্ঞান। যে- ক’বার দেখা হয়েছে তাঁর সঙ্গে, আমাকে একবারও কোনো ব্যক্তিগত প্রশ্ন করেননি। তাঁর এই মনোভাব লক্ষ করে আমার মনে হয়েছে, যে-কাজ করেছি আমি, সেটার বাইরে আমার প্রতি কোনো আগ্রহই নেই তাঁর!

বললেন, ‘ভুল একটা বই বেছে নিয়েছেন আপনি।’

কথাটা আজগুবি মনে হলো আমার কাছে। ওয়েলিংটনে যখন ছিলাম, তখন আমি আর পিটার মিলে আলোচনা করে ঠিক করেছি, টিনটিনের সিনেমার জন্য কোন্ বইটা বেছে নেবো। তারপর টানা তিন মাস খাটুনি করে দাঁড় করিয়েছি আমি এই চিত্রনাট্য। সুতরাং যা বললেন স্পিলবার্গ, সেটা তাঁর মুখ থেকে শুনতে হবে… এ-রকম কিছু কল্পনাও করিনি কখনও।

‘দুঃখিত… বুঝলাম না কথাটা,’ আসলেই উচ্চারণ করেছিলাম কি না শব্দগুলো, সে-ব্যাপারে এখন আর নিশ্চিত না আমি।

‘দ্য সেভেন ক্রিস্টাল বল্স। প্রিজনার্স অভ দ্য সান। আমার মনে হয় সিনেমা বানানোর জন্য এসব বই উপযুক্ত না…

‘কেন?’

‘এসব বই নিয়ে সিনেমা বানাতে চাই না আমি।’

পিটারের দিকে তাকালাম আমি। মাথা ঝাঁকালেন তিনি।

‘ঠিক আছে!’

মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই আমার। কারণ পিটার জ্যাকসন পরিচালনা করবেন, আর স্পিলবার্গ প্রযোজনা করবেন। তাঁদের দু’জনের সামনেই আমার-লেখা চিত্রনাট্যের কপি আছে, কিন্তু সেটা নিয়ে কোনো আলোচনাই হবে না আমাদের মধ্যে। প্লট, চরিত্র, অ্যাকশন, কৌতুক… চিত্রনাট্যের কোনো কিছু নিয়েই কোনো কথা হবে না।

তার মানে আলোচনা করার মতো কোনো প্রসঙ্গই নেই।

পিটার বললেন, ‘সিরিজের তৃতীয় সিনেমা হিসেবে প্রিজনার্স অভ দ্য সান কাজে লাগাতে পারি আমরা।’ চিত্রনাট্যের কপিটা হাত দিয়ে ঠেলে একপাশে সরিয়ে দিলেন, তাকালেন স্পিলবার্গের দিকে। ‘তা হলে সিরিজের দ্বিতীয় কাহিনি হিসেবে কোন্ বই নিয়ে কাজ শুরু করবেন অ্যান্টনি?

অ্যান্টনি! মানে আমি! অর্থাৎ আমাকে বাদ দিচ্ছেন না স্পিলবার্গ।

কিন্তু স্পিলবার্গ কিছু বলার আগেই আবারও খুলে গেল রুমের দরজাটা। একইসঙ্গে বিস্ময় এবং গাঢ় হতাশা নিয়ে দেখতে পেলাম, হোথর্ন ঢুকছে রুমের ভিতরে। বরাবরের মতো স্যুট আর সাদা শার্ট পরে আছে। তবে এবার একটা কালো টাইও ঝুলিয়েছে।

মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের কথা মনে পড়ে গেল আমার।

ঠিক কোন্ জাতের একটা আলোচনায় বিঘ্ন সৃষ্টি করতে যাচ্ছে সে, সে-ব্যাপারে সম্ভবত কোনো ধারণাই নেই ওর। হয়তো জানেও না, এই আলোচনা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ আমার জন্য। এমনভাবে ভিতরে ঢুকছে, যেন আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ওকে। আমাকে দেখতে পেয়ে হাসল… ভাবখানা এমন, আশা করেনি আমাকে দেখতে পাবে এখানে।

‘টনি,’ বলল সে, ‘আপনাকে খুঁজছিলাম।’

‘ব্যস্ত আছি,’ বললাম আমি, টের পেলাম রক্তের আকস্মিক জোরালো-প্রবাহে লাল হয়ে গেছে আমার গাল।

‘জানি। শেষকৃত্যানুষ্ঠান!

দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আপনি হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন।

‘আপনাকে আগেও বলেছি, আবারও বলছি। ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া সম্ভব না আমার পক্ষে।

‘কে মারা গেছেন?’ জিজ্ঞেস করলেন পিটার।

তাঁর দিকে তাকালাম আমি। আসলেই উদ্বিগ্ন বলে মনে হচ্ছে তাঁকে। টেবিলের আরেকধারে তখন পিঠ খাড়া করে বসে আছেন স্পিলবার্গ, বিরক্ত মনে হচ্ছে তাঁকে। অনুমান করে নিলাম, এমন একটা পৃথিবীতে বাস করেন তিনি, যেখানে অপ্রত্যাশিত কারও হঠাৎ ঢুকে পড়ার কোনো সুযোগ নেই… অথবা যদি ঢোকেও, তাঁর কোনো অ্যাসিস্টেন্টকে সঙ্গে না-নিয়ে ঢুকতে পারবে না। কারণ এসবের সঙ্গে তাঁর নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত।

‘কেউ না,’ পিটারের প্রশ্নের জবাবে বললাম আমি। এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না, হোথর্ন ঢুকে পড়েছে এ-রকম একটা জায়গায়। সে কি ইচ্ছাকৃতভাবে বিব্রতকর একটা পরিস্থিতিতে ফেলে দিতে চাইছে আমাকে? ওর দিকে তাকালাম। ‘আপনাকে বলেছি… আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব না।’

‘কিন্তু আপনাকে যেতে হবে। ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ।’

‘আপনি কে?’ হোথর্নকে জিজ্ঞেস করলেন স্পিলবার্গ।

এমন ভঙ্গিতে স্পিলবার্গের দিকে তাকাল হোথর্ন যে, মনে হলো, এই প্রথমবারের মতো দেখতে পেয়েছে তাঁকে। ‘আমি হোথর্ন। পুলিশে আছি।’

‘আপনি একজন পুলিশ অফিসার?’

‘না,’ বলে উঠলাম আমি। ‘তিনি একজন পরামর্শদাতা। একটা তদন্তের ব্যাপারে সাহায্য করছেন পুলিশকে।

‘একটা হত্যারহস্য,’ ব্যাখ্যা করার কায়দায় বলল হোথর্ন। তাকিয়ে আছে স্পিলবার্গের দিকে, ওর ভাব দেখে মনে হচ্ছে তাঁকে চিনতে পেরেছে যেন। ‘আপনাকে কি চিনি আমি?’

‘আমি স্টিভেন স্পিলবার্গ।’

‘আপনি কি সিনেমা লাইনের কেউ?’

কাঁদতে ইচ্ছা হলো আমার।

‘হ্যাঁ। আমি সিনেমা বানাই …

‘তিনি স্টিভেন স্পিলবার্গ, আর এই ভদ্রলোকের নাম পিটার জ্যাকসন,’ পরিচয় করিয়ে দিলাম আমি; কিন্তু কেন করলাম কাজটা, জানি না। পরিস্থিতির উপর হয়তো নিয়ন্ত্রণ পেতে চাইছে আমার মনের একটা অংশ। অথবা হয়তো ভাবছি, কোনো-না-কোনোভাবে বশ করতে পারবো হোথর্নকে…. ওকে তখন বের করে দিতে পারবো এই রুম থেকে।

‘পিটার জ্যাকসন!’ চেহারা উজ্জ্বল হলো হোথর্নের। ‘লর্ড অভ দ্য রিংস সিনেমাটা আপনিই বানিয়েছিলেন না?’

‘হ্যাঁ। দেখেছিলেন ওটা?’

‘ছেলের সঙ্গে বসে ডিভিডিতে দেখেছিলাম। ওর ধারণা, সিনেমাটা দারুণ।’

‘ধন্যবাদ।’

‘আসলে… ওই সিরিযের প্রথম সিনেমাটার কথা বলছি আমি। দ্বিতীয় সিনেমাটার ব্যাপারে সে-রকম নিশ্চিত ছিল না সে। কী যেন নাম ছিল দ্বিতীয় সিনেমাটার…?’

‘দ্য টু টাওয়ার্স।’ হাসছেন পিটার, তবে সে-হাসি পুরোপুরি আন্তরিক না।

আরও একবার পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণ পেতে চাইলাম আমি। ‘স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হয়ে বিশেষ একজন পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন মিস্টার হোথর্ন। এখন যে-কেস নিয়ে কাজ করছেন তিনি, সেটার উপর একটা বই লেখার দায়িত্ব পেয়েছি আমি…’

‘বইটার নাম ‘হোথর্ন ইনভেস্টিগেটস’,’ বলল হোথৰ্ন।

‘নামটা পছন্দ হয়েছে আমার,’ বললেন স্পিলবার্গ।

‘নামটা ভালো,’ একমত হলেন জ্যাকসন।

হাতঘড়ির দিকে তাকাল হোথর্ন। ব্যাখ্যা করার কায়দায় বলল, ‘এগারোটায় অনুষ্ঠিত হবে ওই শেষকৃত্যানুষ্ঠান।’

‘এবং আমি আগেও বলেছি আবারও বলছি, সেখানে যাওয়া সম্ভব না আমার পক্ষে। কেন সম্ভব না, সেটাও দেখতে পাচ্ছেন আপনি চোখের সামনে।’

‘আপনাকে যেতে হবে, টনি। মানে… যে বা যারাই চিনতেন ডায়ানা ক্যুপারকে, তাঁরাই কিন্তু যাচ্ছেন ওই অনুষ্ঠানে। তাঁরা কে কী বলেন অথবা কী করেন, সেটা দেখার এ-ই সুযোগ।

‘ডায়ানা ক্যুপার,’ বললেন স্পিলবার্গ, ‘তার মানে ড্যামিয়েন ক্যুপারের মা?’

‘হ্যাঁ। গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করা হয়েছে তাঁকে। তাঁর নিজের বাড়িতেই।’

‘শুনেছি। গত মাসে ড্যামিয়েন ক্যুপারের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার। ওয়ার হর্স নামের একটা সিনেমার ব্যাপারে কথা বলতে এসেছিল সে।’

‘বেচারা!’ আফসোস করলেন পিটার জ্যাকসন। ‘এভাবে মারা গেল ওর মা!’

‘ঠিক বলেছেন,’ বললেন স্পিলবার্গ।

তাঁরা দু’জনই তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। ভাবখানা এমন, আমি যেন সারাজীবন ধরে চিনি ড্যামিয়েন ক্যুপারকে। এবং তার মায়ের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ না-দিয়ে আমি যেন জঘন্যতম কোনো কাজ করছি। আর হোথর্ন এমন এক ভাব ধরে আছে, যেন সে একজন দেবদূত … আমার শুভবুদ্ধির উদয় ঘটানোর জন্য হাজির হয়েছে।

স্পিলবার্গ বললেন, ‘আমার মনে হয় আপনার যাওয়া উচিত সেখানে, অ্যান্টনি।’

‘কিন্তু এই বইয়ের চেয়ে সিনেমাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে,’ বললাম আমি। পিটার বললেন, ‘আসলে… এই চিত্রনাট্যের ব্যাপারে বেশি কিছু বলার নেই এখন আর। কারণ আমরা যদি এটা নিয়ে কাজ করি, তা হলে সেটা হবে সিরিজের তিন নম্বর সিনেমা। আর দুই নম্বরটার ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারিনি আমরা। ওই ব্যাপারে না-হয় সপ্তাহ দু’-এক পর আলোচনা করা যাবে।

‘ইচ্ছা করলে কনফারেন্স কল করতে পারেন আপনি,’ বললেন স্পিলবার্গ।

তার মানে… টিনটিনের ব্যাপারে যে-আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, সেটা প্রকৃতপক্ষে দু’মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। আমার এত সাধের চিত্রনাট্য বলতে গেলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে আমাকেও। ব্যাপারটা মোটেও ভালো হয়নি আমার জন্য। পৃথিবীসেরা দু’জন চলচ্চিত্রনির্মাতার সঙ্গে আলোচনা করার কথা ছিল আমার, তাঁদের জন্য একটা সিনেমার চিত্রনাট্য লিখে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে আমাকে এখন যেতে হবে এমন কারও শেষকৃত্যে, যাঁকে কখনও সামনাসামনি দেখিনি।

পিটার জ্যাকসন আর স্পিলবার্গের দিকে তাকিয়ে হোথর্ন বলল, ‘আপনাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে এবং কথা বলতে পেরে ভালো লাগল।’

‘অবশ্যই,’ বললেন স্পিলবার্গ। ‘ড্যামিয়েনকে আমার সমবেদনা জানিয়ে দেবেন প্লিয।’

‘ঠিক আছে, জানাবো।’

এবার আমার দিকে তাকালেন স্পিলবার্গ। ‘চিন্তা করবেন না, অ্যান্টনি। আপনার এজেন্টকে সময়মতো ফোন করবো আমরা।’

কিন্তু সে-ফোন আর আসেনি কখনও স্পিলবার্গের পক্ষ থেকে। টিনটিনকে নিয়ে প্রথম যে-সিনেমা বানিয়েছিলেন তিনি, সেটার নাম দ্য সিক্রেট অভ দ্য ইউনিকর্ন উচ্ছ্বসিত প্রশংসা পেয়েছিল সিনেমাটা, কিন্তু সারা পৃথিবীতে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যবসা করতে পারেনি। ওদিকে আমেরিকায় তেমন একটা সাড়া পাওয়া যায়নি এই সিনেমার ব্যাপারে। আর সে-কারণেই হয়তো টিনটিনকে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি স্পিলবার্গ। অথবা হয়তো কাজ করছেন এখন… তবে আমাকে ছাড়া।

বাইরের করিডরে যখন বেরিয়ে এলাম হোথর্নের সঙ্গে, আমাকে সে বলল, ‘তাঁদের দু’জনকে চমৎকার বলে মনে হলো আমার কাছে।’

‘যিশুর দোহাই লাগে চুপ করুন!’ এতক্ষণে বিস্ফোরিত হলাম আমি। ‘বার বার বলেছিলাম ওই শেষকৃত্যে যেতে চাই না। কেন এখানে হাজির হলেন আপনি? এখানে যে আছি আমি, সেটাই বা জানতে পারলেন কী করে?’

‘আপনার অ্যাসিস্টেন্টকে ফোন করেছিলাম।’

‘আর মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে গড়গড় করে সব বলে দিয়েছে আপনাকে?’

‘শুনুন,’ আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করল হোথর্ন। ‘টিনটিনকে নিয়ে কোনো কাজ করতে চান না আপনি আসলে। কারণ এটা বাচ্চাদের জন্য। আমি ভেবেছিলাম বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করা বন্ধ করে এবার বড়দের জন্য কিছু করতে চাইছেন।’

‘বাচ্চাদের জন্য! সিনেমাটা প্রযোজনা করতে যাচ্ছেন স্টিভেন স্পিলবার্গ!’

‘আপনি যে-বই লিখবেন আমাকে নিয়ে, দরকার হলে সেটা নিয়ে সিনেমা বানাবেন তিনি। একটা হত্যারহস্য! ওদিকে ড্যামিয়েন ক্যুপারকেও ভালোমতো চেনা আছে তাঁর।’

হোটেলের সদর-দরজা দিয়ে বেরিয়ে রাস্তায় হাজির হলাম আমরা।

হোথর্ন বলল, ‘আমাকে নিয়ে যদি কোনো সিনেমা বানানো হয়, তা হলে সেটাতে আমার ভূমিকায় অভিনয় করবে কে, বলতে পারেন?’

১১. শেষকৃত্যানুষ্ঠান

ব্রম্পটন সেমেট্রি ভালোমতোই চিনি। আমার বয়স যখন বিশের কোঠায়, তখন ওই কবরস্থান থেকে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে এক ফ্ল্যাটে একটা রুমে থাকতাম। ওই কবরস্থানে বসে লেখালেখি করে পার করে দিতাম গ্রীষ্মের উষ্ণ বিকেলগুলো। কখনও কখনও উদ্দেশ্যবিহীন হাঁটাহাঁটি করতাম সেখানে। কবরস্থানটা ছিল নিরিবিলি এক জায়গায় … ধুলো আর ট্রাফিক থেকে দূরে। আমার নিজের আলাদা একটা জগৎ ছিল সেখানে।

আমার কাছে ওই সেমেট্রি লন্ডনের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক আর হৃদয়গ্রাহী কবরস্থান বলে মনে হয়েছে সব সময়। কবরস্থানের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত একটা পথ চলে গেছে সরলরেখার মতো। রৌদ্রোজ্জ্বল কোনো দিনে যখন সে-পথ ধরে হাঁটতাম, মনে হতো, প্রাচীন রোমে হাজির হয়েছি যেন। নিজের জন্য খুঁজে নিতাম কোনো একটা বেঞ্চ, নোটবুকটা নিয়ে বসে পড়তাম সেখানে। কাঠবিড়ালি দেখতে পেতাম অনেক। মাঝেমধ্যে দেখা মিলত নিঃসঙ্গ কোনো শেয়ালের। কোনো কোনো শনিবার বিকেলে ও-রকম কোনো বেঞ্চে বসে শুনতে পেতাম স্ট্যামফোর্ড ব্রিজ ফুটবল ক্লাবের সমর্থকদের হুল্লোড়ের আওয়াজ। কবরস্থানের গাছের সারির ওপাশেই ছিল ক্লাবটা।

লন্ডনের কোনো কোনো জায়গা আমার-লেখালেখিতে কী বিচিত্র সব ভূমিকা পালন করেছে, ভাবলে আশ্চর্য লাগে এখন। সে-রকম এক ভূমিকা পালন করেছে থেমস নদী। এবং, নিঃসন্দেহে, অন্য এক ভূমিকা পালন করেছে ব্রম্পটন সেমেট্রি।

এগারোটা বাজতে মিনিট দশেক বাকি আছে, এমন সময় ওই কবরস্থানে পৌঁছালাম আমি আর হোথর্ন। মেইন গেটের দু’পাশে পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে দুটো লাল টেলিফোন বক্স; সেগুলোর মাঝখান দিয়ে পথ করে নিতে হলো আমাদেরকে। একটা সরু আর আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগোচ্ছি, পথনির্দেশক খুঁটি আছে এখানে। যানবাহন চলাচলের সুবিধার্থে নামিয়ে রাখা যায় ওটা। শোক প্রকাশ করতে এসেছে, এ-রকম কয়েকজন লোক হাঁটছে আমাদের আগে।

কবরস্থানের এই জায়গায় লতাগুল্মের সংখ্যা বেশি। এককোনায় দেখতে পেলাম মস্তকবিহীন একটা মূর্তি। সেটার একটা হাতও খসে পড়ে গেছে। আইফোনটা বের করলাম আমার পকেট থেকে, ছবি তুললাম ওই মূর্তির। অনতিদূরের ঘেসো জমিনে হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে কয়েকটা কবুতর। ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে কী যেন।

পথের একটা কোনা ঘুরতেই সামনে দেখা মিলল ব্রম্পটন চ্যাপেলের। গির্জাটার পেছনের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লাম আমরা। খোলা দরজার পাশে কক্রীটে- বাঁধাই-করা চত্বরে নিথর দাঁড়িয়ে আছে একটা শবযান। কাঠের যে-কফিনের অর্ডার করেছিলেন মিসেস ক্যুপার, সেটা নিশ্চয়ই ওই শবযানের ভিতরেই আছে। আর সেটার ভিতরে… ভাবতে গিয়ে কেমন একটা মোচড় অনুভব করলাম তলপেটের ভিতরে… নিথর শুয়ে আছেন ওই ভদ্রমহিলা। কালো টেইলকোট পরিহিত চারজন লোক দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির পাশে; আমার ধারণা তারাই বহন করে গির্জার ভিতরে নিয়ে আসবে মিসেস ক্যুপারের কফিন।

মেইন এন্ট্রেন্সের সামনে হাজির হলাম আমি আর হোথর্ন। এখানে চার- পিলারযুক্ত একটা দরজা মুখ করে আছে উত্তরদিকে। ওই দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকবার জন্য ছোট একটা ভিড় তৈরি হয়েছে। উপস্থিত লোকদের কেউ কথা বলছে না অন্য কারও সঙ্গে। মাথা নিচু করে আছে সবাই… যেন এখানে আসতে হয়েছে বলে অপ্রস্তত বোধ করছে। ডায়ানা ক্যুপারকে কখনও দেখিনি আমি, অথচ তাঁর জন্য যাঁরা শোক জানাতে এসেছেন তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছি… ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত লাগছে আমার কাছে। সপ্তাহখানেক আগে ওই মহিলার ব্যাপারে কখনও কিছু শুনিওনি।

আমি সাধারণত কারও শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দিই না। আমার কাছে ব্যাপারটা কেমন ভয়ঙ্কর মনে হয়। ও-রকম কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিলে কেমন যেন মনমরা হয়ে যাই। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, বয়স যত বাড়ছে আমার, কারও-না-কারও শেষকৃত্যে যোগ দেয়ার প্রস্তাব আসছে তত। অর্থাৎ আমার পরিচিত লোকেরা একে একে বিদায় নিতে শুরু করেছেন এই পৃথিবী থেকে। বন্ধুবান্ধব আর পরিচিত লোকদের উপকার করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এমন কোনো ব্যবস্থা করে যাবো, যাতে আমার শেষকৃত্যে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো না-হয় তাদেরকে।

যাঁরা শোক জানাতে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন চিনতে পারছি আমি। আন্দ্রিয়া কুভানেক এসেছে। সে হয়তো বিদায় জানাতে চাইছে তাঁর পুরনো নিয়োগকর্ত্রীকে। গির্জার একটা কোনা সবে ঘুরেছি আমরা, সঙ্গে সঙ্গে একদিকের একটা দরজা দিয়ে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল মেয়েটা।

রেমন্ড কন্সকেও দেখতে পেলাম। নতুন-কেনা কালো একটা কাশ্মীরি কোট পরে আছেন তিনি। শুধু এই অনুষ্ঠানের জন্যই ওই কোট কিনেছেন, সন্দেহ হলো আমার। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন দাড়িওয়ালা এক যুবককে… ছেলেটা সম্ভবত তাঁর পার্টনার।

নার্ভাস দৃষ্টিতে তাকালাম হোথর্নের দিকে। সরু চোখে, সতর্ক দৃষ্টিতে ওই দু’জনকেই দেখছে সে। কিছু বলল না।

আরও একজন লোক আমাদের-মতোই-একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন কুন্সের দিকে। চেহারা দেখলে বোঝা যায় লোকটা হংকং চাইনি। মাথার লম্বা কোঁকড়া চুল নেমে এসেছে কাঁধের উপর। নিখুঁত ছাঁটের স্যুট পরেছেন, সঙ্গে সাদা শার্ট। পায়ে চকচকে কালো শু। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ওই লোককে চিনি আমি। তাঁর নাম ব্রুনো ওয়াং। ক্রুন্সের মতো তিনিও একজন থিয়েটার প্রযোজক। পাশাপাশি একজন সুপরিচিত জনহিতৈষী। যে-দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন কুন্সের দিকে, সেটা দেখে বুঝতে পারলাম, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নেই তাঁদের দু’জনের মধ্যে।

দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকবো আমি আর হোথর্ন, এমন সময় দেখা হয়ে গেল ওয়াঙের সঙ্গে। কুশলাদি বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করলাম তাঁকে, ডায়ানা ক্যুপারকে চিনতেন আপনি?’

‘তিনি আমার খুব প্রিয় একজন বন্ধু ছিলেন,’ জবাবে বললেন ওয়াং। নরম গলায় ধীরেসুস্থে কথা বলেন, শুনলে মনে হয় পরের বাক্যটা ভাবছেন মনে মনে, অথবা যেন আবৃত্তি করছেন কোনো কবিতা। ‘তিনি ছিলেন এমন একজন মহিলা, যাঁর মনে ছিল অনেক দয়া আর আন্তরিকতা। যখন শুনলাম মারা গেছেন তিনি, বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আর আজ… এখানে হাজির হওয়ার পর… আমার মনটা বলতে গেলে ভেঙে যাচ্ছে।’

‘আপনি যেসব মঞ্চনাটক প্রযোজনা করতেন, সেগুলোতে বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি কখনও?’

‘না… দুঃখজনক হলেও সত্যি কথাটা। কাজটা করতে অনেকবার অনুরোধ জানিয়েছিলাম তাঁকে। কারণ আমি জানতাম, তাঁর রুচি একেবারেই অন্যরকম। যা- হোক, ত্রুটি বলতে যদি কোনো কিছু ছিল তাঁর, তা হলে সেটা হলো, খুবই দয়ালু একটা মন। সবাইকে খুব বিশ্বাস করতেন তিনি 1 …কয়েক সপ্তাহ আগেও তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলাম আমি। তাঁকে সতর্ক করে দিয়েছিলাম…’

‘কোন্ ব্যাপারে?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন, আমাকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে সামনে চলে এসেছে।

এদিক-ওদিক তাকালেন ওয়াং। এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে আমরা তিনজন ছাড়া অন্য কেউ নেই বলা যায়। আমাদেরকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেছে বাকিরা, ঢুকে পড়েছে মূল গির্জার ভিতরে।

ওয়াং বললেন, ‘ওই ব্যাপারে কিছু বলতে চাইছি না।’

‘কেন, কী সমস্যা?’

আমি ভাবলাম, হোথর্নকে আসলে চিনতে পারেননি ওয়াং, তাই মুখ খুলতে চাইছেন না। বললাম, এঁর নাম ড্যানিয়েল হোথর্ন। পুলিশের একজন তদন্তকারী অফিসার। মিসেস ক্যুপারের কেসটা তদন্ত করছেন।’

‘রেমন্ড ক্লন্সকে চেনেন আপনি?’ জানতে চাইল হোথর্ন। খেয়াল করেছে, কিছুক্ষণ আগে ক্লুন্সের দিকে তাকিয়ে ছিলেন ওয়াং।

‘ঠিক চিনি বলা যাবে না। তবে… দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে আমাদের মধ্যে।’

‘তারপর?’

‘অন্য কারও ব্যাপারে খারাপ কিছু বলতে চাই না… বিশেষ করে এ-রকম কোনো জায়গায়। যা-হোক… যদি কিছু মনে না-করেন…. শেষকৃত্যানুষ্ঠানটা মিস করতে চাই না।’ তাড়াহুড়ো করে চলে গেলেন ওয়াং, ঢুকে পড়লেন গির্জার ভিতরে।

এখন আমরা দু’জন একা।

হোথর্ন বলল, ‘আভাসে-ইঙ্গিতে যা বললেন ওয়াং, শুনে অনুমান করে নিচ্ছি, মিস্টার কুন্সের সঙ্গে কোনো-একটা ঝামেলা চলছিল মিসেস ক্যুপারের। এবং সেটা মিটমাট করে নিতে চাইছিলেন তিনি। ‘

আমাদের থেকে কিছুটা দূরে, হাতে ক্যামেরা নিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে পায়চারি করে বেড়াচ্ছে দু’জন লোক। এতক্ষণ খেয়াল করিনি ওদেরকে; একজনকে একটা ছবি তুলতে দেখে তাকালাম সেদিকে।

নিচু গলায় বিশ্রী একটা গালি দিল হোথর্ন।

ওর সেই গালি অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হলো না আমার। নিশ্চয়ই ড্যামিয়েন ক্যুপারের ছবি তুলবার জন্য এখানে হাজির হয়ে গেছে ওই সাংবাদিকেরা।

গির্জার ভিতরে ঢুকে পড়লাম আমরা দু’জন।

ভিতরটা অনেকটা গোলাকার। সারি সারি পিলারের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে গম্বুজাকৃতির একটা ছাদ। জানালা আছে বেশ কয়েকটা, কিন্তু সেগুলোর সবই মেঝে থেকে অনেক উঁচুতে, ফলে আকাশ ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না বাইরের। আমাদের সামনেই ধরাধরি করে নিয়ে আসা হলো কফিনটা। সেটা যেখানে রাখা হলো, সে-জায়গার মুখোমুখি লাগিয়ে দেয়া হয়েছে গোটা চল্লিশেক চেয়ার। তাকালাম কফিনটার দিকে। সেটা যতটা না কফিন বলে মনে হচ্ছে আমার, তার চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে একটা পিকনিক বাস্কেট। চামড়ার দুটো স্ট্র্যাপের সাহায্যে মূল কাঠামোর সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে ঢাকনাটা। হলুদ-সাদা ফুলের একটা মালা সাজিয়ে রাখা হয়েছে ঢাকনার উপর। স্পিকার সিস্টেম আছে গির্জার ভিতরে; সেটাতে নিচু ভলিউমে বাজছে জেরেমিয়াহ ক্লার্কের ট্রাম্পেট। ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগল আমার কাছে। কারণ ওই বাজনা সাধারণত ব্যবহৃত হয় কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে।

যাঁরা হাজির হয়েছেন এই শেষকৃত্যানুষ্ঠানে, তাঁদেরকে দেখছি আমি। আশ্চর্য লাগছে… অনেক কম লোক এসেছেন, বারো-তেরোজনের বেশি হবে না। একেবারে সামনের সারিতে বসেছেন ব্রুনো ওয়াং আর রেমন্ড ক্লন্স, তবে নিজেদের মাঝখানে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। আন্দ্রিয়ার পরনে সস্তা কালো চামড়ার-জ্যাকেট, একপাশে বসেছে। ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর জ্যাক মিডোসকেও দেখতে পাচ্ছি। থেকে থেকে হাই তুলছে। বসতে অস্বস্তি হচ্ছে তার… যে-চেয়ারে বসেছে সেটা বোধহয় ছোট হয়ে গেছে শরীরের তুলনায়।

এই অনুষ্ঠানে কোনো এক তারকার ভূমিকায় যে অভিনয় করতে হবে, জানা ছিল ড্যামিয়েন ক্যুপারের। চমৎকার ছাঁটের স্যুট, ধূসর শার্ট, আর সিল্কের কালো টাই পরেছে। তার পাশেই দেখতে পাচ্ছি গ্রেস লভেলকে। পরনে কালো পোশাক। তাদের দু’জনের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বসেছেন বাকিরা। ভাবখানা এমন, ড্যামিয়েন আর গ্রেস যেখানে বসেছে, সে-জায়গা যেন কোনো ভিআইপি এরিয়া যেন সে-জায়গার ধারেকাছে যাওয়া যাবে না। ড্যামিয়েনের পেছনে পেশীবহুল এক কৃষ্ণাঙ্গ লোক বসে আছে; অনুমান করে নিলাম, লোকটা ড্যামিয়েনের বডিগার্ড।

অন্য যাঁরা এসেছেন, তাঁদের সবাইকে চিনি না আমি; তবে আমার ধারণা, তাঁরা মিসেস ক্যুপারের হয় বন্ধু নয়তো সহকর্মী। কারও বয়সই পঞ্চাশের নিচে না। একেকজনের চেহারায় একেক রকম আবেগ দেখতে পাচ্ছি… বিরক্তি, কৌতূহল, গাম্ভীর্য। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, কারও চেহারাতেই দুঃখের কোনো ছাপ নেই। শোকের ছায়া দেখতে পাচ্ছি শুধু একজনের চেহারায়… লম্বাটে এক লোক, মাথায় এলোমেলো চুল, বসে আছেন আমার থেকে কয়েক চেয়ার দূরে। ভিকার উঠে দাঁড়িয়ে যখন এগিয়ে গেলেন কফিনের দিকে, ওই লোক তখন পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছলেন।

গির্জার ভিকার একজন মহিলা। তিনি বেঁটেখাটো, নাদুসনুদুস। দুর্বল হাসি লেপ্টে আছে চেহারায়। আর দশজন ভিকারের তুলনায় ভাবভঙ্গিতে আধুনিক। যে- সুর বাজছে, সেটা শেষ না-হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন, তারপর আগে বাড়লেন। হাতে হাত ঘষলেন, এরপর বলতে শুরু করলেন, ‘হ্যালো, এভরিবডি। খুবই সুন্দর এই গির্জায় আপনাদের সবাইকে আমন্ত্রণ জানাতে পেরে আমি খুব খুশি। রোমের সেইন্ট পিটার্সের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮৩৯ সালে নির্মাণ করা হয়েছে এই গির্জা। চমৎকার একজন মহিলাকে শেষবারের মতো সম্মান জানানোর জন্য আজ এখানে একত্রিত হয়েছি আমরা; আমার ধারণা, ওই কাজ করার জন্য এই গির্জা বিশেষ একটা জায়গা, সুন্দর একটা জায়গা। আমরা যারা বেঁচে থাকি, তাদের জন্য মৃত্যু সব সময়ই কঠিন কিছু। ডায়ানা ক্যুপারকে আচমকা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে জীবনের পথ থেকে। নিষ্ঠুর এক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তিনি। কেন এ-রকম করা হলো তাঁর মতো একজন মানুষের সঙ্গে, এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি আমরা কেউ।

‘ডায়ানা ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি সব সময়ই সাহায্য করতে চাইতেন অন্যদেরকে। অনেক টাকা দানখয়রাত করেছেন তিনি। গ্লোব থিয়েটারের বোর্ড অভ ডিরেক্টর্সে ছিলেন। তাঁর ছেলে একনামে পরিচিত আমাদের সবার কাছে। মায়ের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য সেই আমেরিকা থেকে এখানে উড়ে এসেছেন ড্যামিয়েন। যে-কষ্ট লাগছে তাঁর, সেটা টের পাচ্ছি আমরা; তারপরও বলবো, তাঁকে আজ এখানে দেখতে পেয়ে আমরা সবাই খুশি।’

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম আমি। দেখতে পেলাম আন্ডারটেকার রবার্ট কর্নওয়ালিসকে। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে। ফিসফিস করে কী যেন বলছে আইরিন লযকে। শেষকৃত্যের জন্য আনুষ্ঠানিক পোশাক পরে আছে তারা দু’জনই। খেয়াল করলাম, আইরিন লয মাথা ঝাঁকাল, এবং তারপরই বাইরে চলে গেল কর্নওয়ালিস।

স্টিভেন স্পিলবার্গ আর পিটার জ্যাকসনের কথা কেন যেন মনে পড়ে গেল আমার। হয়তো এখনও সোহো হোটেলে আছেন তাঁরা দু’জন। অথবা হয়তো একটু তাড়াতাড়িই সেরে নিচ্ছেন আজকের লাঞ্চটা। তাঁদের সঙ্গে থাকার কথা ছিল আমার! টের পেলাম, আমাকে যে জোর করে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে, সেজন্য ক্রোধ জেগে উঠছে আমার মনে।

‘ডায়ানা ক্যুপার ছিলেন এমন একজন মানুষ,’ বলছেন ভিকার, ‘যিনি ওয়াকিবহাল ছিলেন নিজের মৃত্যুর ব্যাপারে। আজকের এই অনুষ্ঠানের সব কিছু আয়োজন করে গেছেন তিনি। এমনকী এইমাত্র যে-সুর শুনলেন আপনারা, সেটাও। যা-হোক, বাইবেলের গীতসংহিতার সাম থার্টি ফোর (Psalm 34 ) দিয়ে এই অনুষ্ঠানের কাজ শুরু করতে চাই আমি। আমার ধারণা, ডায়ানা যখন বেছে নিয়েছিলেন এই প্রার্থনাস্তব, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মৃত্যু আসলে ভয়ের কোনো কিছু না। কারণ এই স্তবকে বলা হয়েছে, ধার্মিক লোকের অনেক সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু প্রভু তাঁকে সব কিছু থেকে উদ্ধার করেন।’

বিশেষ ওই স্তব পাঠ করলেন ভিকার।

তারপর উঠে দাঁড়াল গ্রেস লোভেল। এগিয়ে গেল সামনে, সিলভিয়া প্লাথের ‘এরিয়েল’ আবৃত্তি করে শোনাল।

স্ট্যাটিস ইন ডার্কনেস
দেন দ্য সার্ক্সট্যান্সলেস ব্লু
পোর অভ টোর অ্যান্ড ডিসট্যান্সেস…

কবিতাটা সে মুখস্ত করে ফেলেছে দেখে ভালো লাগল আমার। শুধু মুখস্ত করেনি, আন্তরিকভাবে আবৃত্তিও করেছে।

সুন্দর দুই চোখ মেলে অদ্ভুত শান্ত দৃষ্টিতে লোভেলের দিকে তাকিয়ে আছে ড্যামিয়েন। কে যেন হাই তুলল আমার পাশে। তাকিয়ে দেখি, হোথৰ্ন।

সবশেষে ড্যামিয়েনের পালা। উঠে দাঁড়াল সে, ধীর পায়ে হেঁটে আগে বাড়ল। ঘুরল। এখন ওর মায়ের কফিনের দিকে উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। যা বলল, সংক্ষেপে বলল; আবেগের লেশমাত্র পেলাম না ওর কথায়।

‘বাবা যখন মারা যান, তখন আমার বয়স মাত্র একুশ। এখন আমি আমার মাকেও হারিয়েছি। মায়ের সঙ্গে যা ঘটেছে তা মেনে নেয়া কষ্টকর, কারণ বাবা অসুস্থ অবস্থায় মারা গেছেন, কিন্তু মায়ের উপর হামলা চালানো হয়েছে তাঁরই বাসায়। ঘটনাটা যখন ঘটেছে, আমি তখন আমেরিকায়। যা-হোক, মাকে বিদায় বলার সুযোগ পাইনি, সেজন্য সব সময় খারাপ লাগবে আমার। তবে এটা জানি, আমি যা করছি, তার জন্য আমাকে নিয়ে গর্বিত ছিলেন তিনি। এবং আমার মনে হয়, তিনি যদি বেঁচে থাকতেন তা হলে আমার নতুন শো উপভোগ করতে পারতেন… আগামী সপ্তাহ থেকে শুটিং শুরু হবে সেটার। নাম হোমল্যান্ড… এ- বছরের শেষ-নাগাদ প্রদর্শিত হবে।

‘আমি যে একজন অভিনেতা হতে চেয়েছি, সেটা সব সময় সমর্থন করেছেন মা। আমাকে সব সময় উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আমি একদিন তারকা হতে পারবো। যখন স্ট্র্যাটফোর্ডে ছিলাম, তখন আমার প্রতিটা প্রোডাকশন্সে গেছেন তিনি… দ্য টেম্পেস্টে এরিয়েল, হেনরি ফাইভ, ডক্টর ফস্টার্সে মেফিস্টোফিলিস। শেষের চরিত্রটা খুব প্রিয় ছিল তাঁর। তিনি সব সময় বলতেন, আমি নাকি তাঁর পুঁচকে শয়তান।

কথাটা শুনে, গুঞ্জনমিশ্রিত সহানুভূতির হাসি শোনা গেল শ্রোতাদের পক্ষ থেকে।

‘এখন থেকে আমি যখন স্টেজে থাকবো,’ বলছে ড্যামিয়েন, ‘তখন দর্শকদের সারির দিকে তাকিয়ে সব সময় খুঁজবো মাকে। কিন্তু আর কখনোই খুঁজে পাবো না তাঁকে… তাঁর আসন সব সময়ই খালি থাকবে। তাঁর সেই টিকিট বিক্রি করে দেয়া যেতে পারে অন্য কারও কাছে…

ড্যামিয়েনের শেষের কথাটার মানে বোঝা গেল না ঠিক। সে কি মজা করছে? আমার আইফোনে রেকর্ড করে নিচ্ছিলাম ড্যামিয়েন ক্যুপারের কথাগুলো। ওর বক্তৃতার এই পর্যায়ে এসে মনোযোগ হারিয়ে ফেললাম, কী বলছে সে তা আর শুনছি না। আরও কয়েক মিনিট কথা বলল সে, তারপর সাউন্ড সিস্টেমে বাজতে শুরু করল ‘এলিনর রিগবি’। খুলে দেয়া হলো সবগুলো দরজা, বাইরে বের হয়ে কবরস্থানে হাজির হলাম আমরা সবাই। উসুখুসু চুলের সেই লোক আমাদের ঠিক সামনে আছেন এখন! দ্বিতীয়বারের মতো চোখ মুছতে দেখা গেল তাঁকে।

কবরস্থানের পশ্চিম পাশে সমান ব্যবধানে স্থাপন করা হয়েছে কতগুলো স্তম্ভ, সেগুলোর পেছনে হাজির হলাম আমরা। একদিকের নিচু একটা দেয়ালের পাশে, অবিন্যস্ত ঘাসে ছাওয়া জমিনে খোঁড়া হয়েছে একটা কবর। দেয়ালের ওপাশে রেললাইন আছে। ওটা দেখা যাচ্ছে না, তবে যখন কবরটার দিকে এগোচ্ছি আমরা, তখন একটা ট্রেন চলে গেল সেখান দিয়ে… আওয়াজ শুনতে পেলাম।

একটা সমাধিফলকের উপর নজর পড়ল আমার। সেটাতে লেখা আছে: লরেন্স ক্যুপার, ৩ এপ্রিল ১৯৫০– ২২ অক্টোবর ১৯৯৯, দীর্ঘদিনের অসুস্থতায় ভুগবার পর এবং তিতিক্ষার শেষে। মনে পড়ে গেল, কেন্টে থাকতেন তিনি, এবং সম্ভবত সেখানেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁকে এই জায়গায় সমাহিত করা হলো কেন, ভেবে আশ্চর্য লাগল।

আমাদের মাথার উপর ঝকঝক করছে সূর্যটা। তবে কয়েকটা গাছ ছায়া দিচ্ছে আমাদেরকে। বেলা বাড়ছে, আবহাওয়া মনোরম আর উষ্ণ। মৃতদেহের শেষযাত্রায় সেটাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য আমাদের থেকে পিছিয়ে পড়েছে ড্যামিয়েন ক্যুপার আর গ্রেস লভেল। ওদের সঙ্গে আছেন ভিকারও। তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছি আমরা, এমন সময় ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টর মিডোস এগিয়ে এল আমাদের দিকে

‘কেমন চলছে, হোথৰ্ন?’

‘খুব একটা খারাপ না, জ্যাক।’

অবজ্ঞার ভঙ্গিতে নাক সিঁটকাল মিডোস। ‘কোনো সমাধান বের করতে পেরেছেন? আপনি নিশ্চয়ই এত জলদি সমাধান করে ফেলতে চান না এই কেস?’

‘আসলে আপনার পক্ষ থেকে কোনো একটা জবাবের জন্য অপেক্ষা করছি আমি,’ বলল হোথর্ন।

সেক্ষেত্রে হতাশ করতে হচ্ছে আপনাকে। কাছাকাছি চলে এসেছি আমরা… ‘আসলেই?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি। মিডোস যদি হোথর্নের আগে সমাধান করে ফেলে এই কেস, তা হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে আমার বইয়ের।

‘হ্যাঁ। পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারবেন সব। এবং সেটা খুব শীঘ্রই। তবে এখন একটা কথা বলে রাখি আপনাকে… ব্রিটানিয়া রোডে সাম্প্রতিক সময়ে তিন- তিনটা চুরির ঘটনা ঘটেছে। এবং সবগুলো ঘটনার ধরণ প্রায় একইরকম… প্যাকেজ ডেলিভারির বাহানায় ডিসপ্যাঁচ রাইডারের বেশ ধরে হাজির হয়েছিল চোর। মোটরবাইকের হেলমেটে ঢাকা পড়ে ছিল তার চেহারা। এবং প্রতিবারই সে টার্গেট করেছে এমন সব মহিলাদের, যাঁরা নিজেদের বাসায় একা থাকতেন।’

‘এবং সে কি তাঁদের সবাইকে খুন করেছে?’

‘না। প্রথম দু’জনকে ধোলাই দিয়েছে। তারপর নিয়ে গিয়ে ঢুকিয়েছে কাবার্ডে, তালা দিয়ে আটকে রেখেছে সেখানে। এরপর তোলপাড় করে ফেলেছে পুরো বাসা। কিন্তু তার তৃতীয় শিকার অত বোকা ছিলেন না। বরং বলা যায় বেশ চালাক-চতুর ছিলেন। বাসায় ঢুকতে দেননি তিনি ওই লোককে। ফোন করেছিলেন ট্রিপল নাইনে। যা-হোক, এখন আমাদের জানা আছে, কার খোঁজ করছি আমরা। সিসিটিভি ফুটেজ দেখছি। আমার মনে হয় বাইকটা খুঁজে বের করতে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না আমাদেরকে। আর ওটা খুঁজে পেলে ওটার মালিককেও ধরতে পারবো আশা করি।

‘ডায়ানা ক্যুপারকে কীভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হলো, সে-ব্যাপারে আপনার থিউরি কী? বাকিদের মতো ওই মহিলাকেও কেন মারধোর করে ছেড়ে দিল না সেই মোটরবাইকার? কেন তাঁকে খুন করল?’

মিডোসের কাঁধ দুটো রাগবি খেলোয়াড়দের মতো; অনিশ্চিত ভঙ্গিতে ও-দুটো ঝাঁকাল সে। ‘যতদূর মনে হয়… কিছু-একটা গড়বড় হয়ে গিয়েছিল।’

গাছগুলোর ওপাশে একটা নড়াচড়া চোখে পড়ল আমার। অন্তিম বিশ্রামস্থলে নিয়ে আসা হচ্ছে ডায়ানা ক্যুপারকে। কবরটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ছোটখাটো একটা মিছিল। ওই লোকগুলোর মধ্যে, ফিউনারেল পার্লার থেকে আসা চারজন লোকও আছে। আরও আছেন ভিকার নিজে, ড্যামিয়েন ক্যুপার আর গ্রেস লোভেল। বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে ওই লোকগুলোকে অনুসরণ করছে আইরিন লয। দুই হাত পিছমোড়া ভঙ্গিতে হাঁটছে। নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, সব কিছু সুচারুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। রবার্ট কর্নওয়ালিসের পাত্তা নেই কোথাও।

‘একটা কথা বলি?’ হঠাৎ বলে উঠল হোথর্ন… যা বলার মিডোসকে বলছে। ‘আমার মনে হয় আপনার থিউরি আসলে ভুয়া। যখন একসঙ্গে পুলিশ ডিপার্টমেন্টে কাজ করতাম আমরা তখনও ফালতু সব থিউরি আউড়াতেন আপনি, এবারও তা-ই করেছেন। যা-হোক, শেষপর্যন্ত যদি আপনার সেই মুখোশ পরিহিত ডিসপ্যাঁচ রাইডারকে চিহ্নিত করতে পারেন, যদি ধরতে পারেন, তা হলে আমার পক্ষ থেকে শুভকামনা জানিয়ে দেবেন তাকে। কারণ ওই লোক ব্রিটানিয়া রোডের ধারেকাছেও যায়নি… এই ব্যাপারে আপনার সঙ্গে যে-কোনো পরিমাণ টাকার বাজি ধরতে রাজি আছি আমি।’

‘কী বললেন?’ রেগে গেছেন মিডোস। ‘আমার থিউরি ভুয়া? পুলিশ ডিপার্টমেন্টে যখন ছিলাম তখন ফালতু সব থিউরি দিতাম? আপনি নিজে যখন পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ছিলেন তখন কী ছিলেন, জানেন? জঘন্য একটা বেজন্মা। আপনার চাকরি যে চলে গেল, সেজন্য আমরা সবাই কী পরিমাণ খুশি হয়েছিলাম, হয়তো জানেনও না।’

‘আপনি যাদেরকে টার্গেট করেছিলেন তাদের কপালে কী ঘটেছে, সেসব আসলে লজ্জাজনক ব্যাপার ছাড়া আর কিছু না।’ সমান তেজের সঙ্গে বলল হোথর্ন, চকচক করছে ওর দুই চোখ। ‘শুনেছি আমি চলে আসার পর ওই লোকদের সবাই নাকি কমবেশি বিপদে পড়েছে। যা-হোক, ব্যক্তিগত কথা যখন চলেই এল… শুনলাম আজ বাদে কাল নাকি বিবাহবিচ্ছেদ ঘটতে চলেছে আপনার?’

‘কথাটা কে বলেছে আপনাকে?’ দেখে মনে হলো, একটুখানি হলেও ঝাঁকুনি খেয়েছে মিডোস।

‘আপনার সারা গায়ে লেখা আছে সেটা।’

ভুল বলেনি হোথর্ন। দেখে সাংঘাতিক অবহেলিত বলে মনে হচ্ছে মিডোসকে। কুঁচকে আছে তার স্যুট। শার্টটা ইস্ত্রি করা হয়নি কতদিন কে জানে। এমনকী শার্টের একটা বোতাম উধাও। অর্থাৎ তার স্ত্রী হয় মারা গেছে নয়তো তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে।

হয়তো তর্কাতর্কি শুরু হয়ে যেত মিডোস আর হোথর্নের মধ্যে, কিন্তু তখনই হাজির হলো কফিনটা… দেখতে পেলাম, ঘেসো জমিনে নামিয়ে রাখা হলো সেটা, শুনতে পেলাম ক্যাচক্যাচ করে উঠল কফিনের কাঠ। কফিনের নিচে দুটো দড়ি আছে। ওটা দিয়ে পুরো কফিন পেঁচিয়ে বেঁধে দিতে কিছু সময় লাগল চার কফিন- বাহকের। দেখতে পেলাম, ওই লোকগুলোর দিকে সপ্রংশস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আইরিন ল্য।

তাকালাম ড্যামিয়েন ক্যুপারের দিকে। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে সে। পাশে কে আছে না-আছে সে-ব্যাপারে উদাসীন বলে মনে হচ্ছে তাকে। কাছেই দাঁড়িয়ে আছে গ্রেস, কিন্তু ড্যামিয়েনের হাত ধরেনি গ্রেস। বেশ কিছুক্ষণ আগে কয়েকজন ফটোগ্রাফারকে দেখেছিলাম; দূরে দাঁড়িয়ে আছে তারা, তবে তাদের ক্যামেরায় যুম লেন্স আছে। ধারণা করে নিলাম, যেসব ছবি তোলা দরকার তাদের, সেসব ছবি দূর থেকেই তুলে নিতে পারছে।

‘কফিনটা কবরে নামানোর সময় হয়েছে,’ জানান দিলেন ভিকার। ‘আসুন আমরা সবাই পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে দাঁড়াই। খুবই বিশেষ একটা জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছে, আসুন আমরা সবাই নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চিন্তা করি ওই ব্যাপারে।’

কফিন নামানো হচ্ছে কবরে। আমার মনে হলো, কবরটা যেন অপেক্ষা করছিল ওই কফিনের জন্য। কবর ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ছোটখাটো একটা জটলা। সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে কবরে-কফিন-নামানোর দৃশ্য। রুমাল হাতে একটা লোককে দেখেছিলাম কিছুক্ষণ আগে, এখন খেয়াল করলাম ওটা দিয়ে চোখের কোনা মুছছেন তিনি। ব্রুনো ওয়াঙের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন রেমন্ড ক্লন্স, নিজেদের মধ্যে নিচু গলায় সংক্ষিপ্ত আলাপ সেরে নিলেন তাঁরা।

কবরের জমিনে কফিনটা নামিয়ে দিল চার কফিন-বাহক।

আর ঠিক তখনই, অনেকটা হঠাৎ করেই, বেজে উঠল একটা গান। গানটা বাচ্চাদের… একটা নার্সারি রাইম….

দ্য হুইলস অন দ্য বাস গো
রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড
রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড
রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড
দ্য হুইলস অন দ্য বাস গো রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড
অল ডে লং।

শব্দের মান বেশি ভালো না… কেমন যেন ফিনফিনে। শুনে মনে হচ্ছে, কোথাও যেন টুংটুং আওয়াজ হচ্ছে। প্রথম যে-চিন্তা আমার মাথায় এল তা হচ্ছে, কারও মোবাইল বাজছে। যাঁরা শোক প্রকাশ করতে এসেছেন তাঁরা তাকাচ্ছেন একজন আরেকজনের দিকে। আমার মতো সবাই হয়তো ভাবছেন, কার মোবাইল বাজছে। হয়তো ভাবছেন, এতগুলো লোকের মধ্যে কে বিব্রত হতে চলেছে। আগে বাড়ল আইরিন লয, সতর্ক হয়ে উঠেছে। কবরের সবচেয়ে কাছে দাঁড়িয়ে আছে ড্যামিয়েন ক্যুপার। আতঙ্ক আর উন্মত্ততার একটা মিশ্র আবেগ দেখা দিয়েছে তার চেহারায়। নিচের দিকে নির্দেশ করল, কী যেন বলল গ্রেস লোভেলকে। না-শুনতে পেলেও বুঝতে পারলাম, কী বলতে চাইছে সে।

কবরের ভিতর থেকে আসছে আওয়াজটা।

তার মানে… কফিনের ভিতরে বাজছে ওই নার্সারি রাইম।

রাইমটার দ্বিতীয় চরণ শুরু হয়ে গেছে…

দ্য ওয়াইপার্স অন দ্য বাস গো সুইশ, সুইশ, সুইশ
সুইশ, সুইশ, সুইশ,
সুইশ, সুইশ, সুইশ…

জমে যেন বরফে পরিণত হয়েছে চার কফিন-বাহক। হাত থেকে দড়ি ছেড়ে দিয়ে কফিনটা কবরে পড়ে যেতে দেবে কি না, অথবা কী করবে, বুঝতে পারছে না। হয়তো ভাবছে, কফিনটা যদি নামিয়ে দেয় কবরে, তা হলে মাটির এত গভীর থেকে আর শোনা যাবে না ওই রাইম। অথবা হয়তো ভাবছে, তুলে আনবে কফিনটা, তারপর কিছু-একটা করবে ওই রাইমের ব্যাপারে। আবার এ-রকমও ভাবতে পারে, নৃশংস আর অনুপযুক্ত একটা গান-সহ কি দাফন করবে মিসেস ক্যুপারকে?

এতক্ষণে মোটামুটি সবাই বুঝে গেছে, কোত্থেকে আসছে ওই গান। বুঝে গেছে, কোনো একজাতের ডিজিটাল রেকর্ডার অথবা রেডিও রাখা আছে কফিনের ভিতর। ডায়ানা ক্যুপার যদি নিজের জন্য মেহগনি কাঠের কফিন বেছে নিতেন, তা হলে ওই গান হয়তো ভেসে আসত না আমাদের কারও কানে। এতক্ষণে হয়তো শান্তিতে ঘুমানোর জন্য কবরে নামিয়ে দেয়া হতো ওই মহিলাকে।

কফিনের চিড়-ধরা কাঠ ভেদ করে এখনও শোনা যাচ্ছে গানটা…

দ্য ড্রাইভার অন দ্য বাস গোয ‘মুভ অন ব্যাক….

ফটোগ্রাফাররা উঁচু করে ধরেছে তাদের ক্যামেরা, সামনের দিকে এগিয়ে আসছে… কিছু-একটা গণ্ডগোল যে হয়েছে কোথাও, টের পেয়ে গেছে। ঠিক সে- মুহূর্তে ভিকারের উপর যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল ড্যামিয়েন ক্যুপার, তবে সেটা শারীরিকভাবে না, বরং মৌখিকভাবে… আসলে দোষারোপ করার জন্য কোনো একজনকে দরকার ছিল তার এবং হাতের কাছেই ছিল ওই মহিলা।

‘কী… হচ্ছেটা কী?’ খেঁকিয়ে উঠল ড্যামিয়েন। ‘এসব কার কাজ?’

কবরের কাছে পৌঁছে গেছে আইরিন লয, খাটো পায়ে যত দ্রুত সম্ভব দৌড়ানোর চেষ্টা করছে। ‘মিস্টার ক্যুপার… ‘ শুরু করল সে, কিন্তু শেষ করতে পারল না কথাটা… হাঁপাচ্ছে।

‘আমাদের সঙ্গে কোনো ধরনের মজা করতে চাইছে নাকি কেউ?’ দেখে কেমন অসুস্থ মনে হচ্ছে ড্যামিয়েনকে। ‘ওই গান কেন বাজানো হচ্ছে?’

‘কফিনটা তোলো,’ দায়িত্ব নিল আইরিন। ‘তুলে আনো ওটা।’

মুভ অন দ্য ব্যাক, মুভ অন দ্য ব্যাক…

‘আমাদের কাছ থেকে যে-টাকা নিয়েছেন আপনারা,’ আবারও খেঁকিয়ে উঠল ড্যামিয়েন, ‘তার প্রতিটা পয়সার জন্য আপনাদের বেজন্মা প্রতিষ্ঠানের নামে আদালতে মামলা ঠুকবো…

?

‘আমি খুবই দুঃখিত,’ বলে উঠল আইরিন। ‘বুঝতেই পারছি না…

যে-গতিতে কফিনটা কবরে নামিয়েছিল চার কফিন-বাহক, তার চেয়ে অনেক দ্রুত সেটা কবরের ভিতর থেকে বের করে আনল তারা। আরও একবার ঘেসো জমিনের উপর ধপ্ করে পড়ল কফিনটা। কল্পনার দৃষ্টিতে দেখতে পেলাম, কফিনের ভিতরে থাকা ডায়ানা ক্যুপারের শরীরটা দুলে উঠল এদিক-ওদিক। যাঁরা শোক প্রকাশ করতে এসেছেন, তাঁদের সবার চেহারার উপর নজর বুলিয়ে নিলাম চট করে। আসলে জানতে চাইছি, বিশেষ সেই গানের জন্য এঁদের কেউ দায়ী কি না। বোঝাই যাচ্ছে, ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে কাজটা। কেউ কি অসুস্থ কোনো মশকরা করতে চাইছে ক্যুপার পরিবারের সঙ্গে? নাকি বিশেষ কোনো বার্তা দিতে চাইছে?

রেমন্ড ক্লন্স আঁকড়ে ধরে রেখেছেন তাঁর পার্টনারকে। মুখে হাত চাপা দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ব্রুনো ওয়াং। আর আন্দ্রিয়া কুভানেক… আমার ভুল হতে পারে, কিন্তু কেন যেন মনে হলো, হাসছে সে। রুমালওয়ালা লোকটা দাঁড়িয়ে আছে কুভানেকের পাশে; তার চেহারায় এমন এক ভাব খেলা করছে যার মানে ঠাহর করতে পারলাম না। হাতটা মুখের কাছে তুললেন তিনি… মনে হলো এখনই বোধহয় ছুঁড়ে ফেলে দেবেন রুমালটা, অথবা হয়তো ফেটে পড়বেন হাসিতে। কিন্তু কোনোটাই করলেন না, বরং মোচড় কেটে ঘুরলেন, পিছিয়ে গেলেন বেশ কিছুটা। দেখতে পেলাম, দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন কবরস্থান থেকে। ব্রম্পটন রোডের দিকে এগিয়ে গেছে যে-রাস্তা, সেদিকে যাচ্ছেন।

দ্য ড্রাইভার অন দ্য বাস গোয ‘মুভ অন ব্যাক’
অল ডে লং

কিছুতেই থামছে না ওই গান। ওটা অতি প্রচলিত; গাইবার ভঙ্গি অতি উৎফুল্ল… বড়রা যখন ছোটদেরকে গান শোনান তখন সাধারণত ও-রকম ভঙ্গিতে গান করেন।

‘অনেক হয়েছে,’ শেষপর্যন্ত আর সহ্য করতে পারল না ড্যামিয়েন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সাংঘাতিক একটা মানসিক-ধাক্কা খেয়েছে সে। এই শেষকৃত্যানুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর এই প্রথম আসল কোনো আবেগ দেখা দিল তার চেহারায়।

‘ড্যামিয়েন… ‘ তার হাত ধরার জন্য নিজের একটা হাত বাড়িয়ে দিল গ্রেস। কিন্তু ঝাড়া দিয়ে গ্রেসের হাতটা ছাড়িয়ে দিল ড্যামিয়েন। ‘বাসায় যাচ্ছি আমি। তুমি পাবে চলে যেয়ো। ফ্ল্যাটে দেখা হবে তোমার সঙ্গে।’

ফটোগ্রাফাররা যে সমানে ছবি তুলছে, জানি আমি। ড্যামিয়েন ক্যুপারের ব্যক্তিগত ট্রেনার-কাম-বডিগার্ড ফটোগ্রাফারদের লেন্স থেকে আড়াল করতে চাইছে ড্যামিয়েনকে, কিন্তু ওই লেন্সগুলো যেন চুম্বকের মতো আটকে আছে ড্যামিয়েনের সঙ্গে… যেন ছায়ার মতো অনুসরণ করে চলেছে তাকে।

ঝড়ের বেগে কবরস্থান থেকে বেরিয়ে গেল ড্যামিয়েন।

ঘুরে আইরিনের দিকে তাকালেন ভিকার, কেমন অসহায় দেখাচ্ছে তাঁকে। ‘কী করবো?’

চার কফিনবাহকের দিকে তাকাল আইরিন, ধৈর্য রাখার চেষ্টা করছে। ‘চলো কফিনটা গির্জায় ফিরিয়ে নিয়ে যাই। তাড়াতাড়ি!’

ঘেসো জমিনের উপর দিয়ে ডায়ানা ক্যুপারের কফিনটা দ্রুত টেনে নিয়ে চলল চার কফিন-বাহক। দৌড়াচ্ছে না, কিন্তু যত জলদি সম্ভব এগোনোর চেষ্টা করছে। কিছু-না-কিছু শালীনতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে এখনও।

দূরে চলে গেছে কফিনটা, সেই রাইমও স্তিমিত হয়ে এসেছে অনেকখানি…

দ্য হর্ন অন দ্য বাস গো …

কিছুক্ষণের মধ্যে গির্জার ভিতরে ঢুকে পড়ল কফিন-বাহকরা।

তাদের গমনপথের দিকে তাকিয়ে আছে হোথর্ন। স্পষ্ট বুঝতে পারছি, সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার কোনো একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে ওর মাথায়।

‘বিপ, বিপ, বিপ,’ বেসুরো ভঙ্গিতে আউড়াল সে ছড়াগানটার কিছু অংশ, তারপর হাঁটা ধরল দ্রুত পায়ে।

কফিনটার গমনপথ অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছে গির্জার দিকে।

১২. রক্তের গন্ধ

শূন্য কবর ঘিরে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকজন লোক… তাঁদের চেহারায় কেমন বিভ্রান্তির ছাপ। কফিনের পেছন পেছন রওয়ানা হলাম আমরা। দৃশ্যটা এখন স্মৃতির পর্দায় যতবার দেখি, ততবার মনে পড়ে যায় কোনো জাহাজের কথা– ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগরে যেন নিঃসঙ্গ ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে ওটাকে।

কেন যেন মনে হচ্ছিল, যা ঘটেছে তা দেখে আমোদিত হয়েছে হোথর্ন। একটু আগে যে-রসিকতা করা হয়েছে, সেটাই ওর আমোদের কারণ কি না, নিশ্চিত হতে পারলাম না। একটু আগে মিডোস নিজের থিউরির কথা বলেছে… মিসেস ক্যুপারের বাসায় নাকি চুরি সংঘটিত হয়েছিল, কিন্তু তালগোল পাকিয়ে ফেলে চোর, ফলে নৃশংস হামলা চালায় ওই মহিলার উপর। কিন্তু মিসেস ক্যুপারের বাসায় যা ঘটেছে, আমার বিবেচনায় সেটা পুলিশের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতার বাইরে। আর সেজন্যই নিজের মতো করে তদন্ত করার সুযোগ পেয়ে গেছে হোথর্ন।

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। থপথপ করে হাঁটছে মিডোস, আসছে আমাদের পেছন পেছন। গির্জার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। আমাদের থেকে আর কিছুটা দূরে আছে ওটা।

‘কী মনে হয় আপনার?’ জিজ্ঞেস করলাম হোথর্নকে। ‘ওটা কী ছিল আসলে?’

‘আমার মনে হয় আসলে কোনো মেসেজ দেয়া হয়েছে আমাদেরকে,’ বলল হোথর্ন।

‘মেসেজ? কার জন্য?

‘নিশ্চিত করে বলবো না এখনই। তবে… ড্যামিয়েন ক্যুপারের জন্য হতে পারে। তার চেহারাটা দেখেছেন না?’

‘দেখেছি। আপসেট দেখাচ্ছিল।’

‘কাগজের মতো সাদা হয়ে গিয়েছিল তার চেহারা। একটা পর্যায়ে মনে হচ্ছিল আমার, লোকটা বুঝি মারাই যাবে!’

‘আচ্ছা, জেরেমি গডউইনের ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি তো?’

‘না… আমার মনে হয় না। কারণ ছেলেটা কোনো বাসের নিচে চাপা পড়েনি।

‘না, তা পড়েনি, কিন্তু এ-রকম কি হতে পারে না… ছেলেটা যখন গাড়িচাপা পড়েছিল তখন কোনো খেলনা-বাস বহন করছিল? অথবা… সে হয়তো বাসে সওয়ার হয়ে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করত…’

‘ঠিকই বলেছেন হয়তো। বাচ্চাদের নার্সারি রাইম শোনানো হয়েছে আমাদেরকে। তার মানে কোনো একটা মৃত বাচ্চার সঙ্গে কোনো-না-কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে কোথাও-না-কোথাও।’ একটা কবর টপকাল হোথর্ন। ‘বাসায় ফিরে গেছে ড্যামিয়েন। তবে তার সঙ্গে অচিরেই দেখা করতে হবে আমাদেরকে। ভাবছি, কী বলার আছে লোকটার।’

‘ওই গাড়ি-দুর্ঘটনা ঘটেছে দশ বছর আগে,’ মাথায় যা আসছে, তা-ই বলছি আমি। ‘প্রথমে খুন করা হলো ডায়ানা ক্যুপারকে। তারপর ঘটল এই ঘটনা। আমার মনে হয় কেউ একজন বিশেষ একটা পয়েন্টের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে আমাদের।’

গির্জায় পৌঁছে গেলাম। কফিনটাও নিয়ে আসা হয়েছে ইতোমধ্যে। মিডোস এসে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম আমরা।

মিডোসের শরীরটা নষ্ট হয়ে গেছে একেবারেই… এতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করেই হাঁপাচ্ছে। সে যদি খাবার নিয়ন্ত্রণ না-করে, ধূমপান না-ছাড়ে, আর ব্যায়াম না-করে, তা হলে এই কবরস্থানে চিরস্থায়ী বসবাসের জন্য আসতে হবে তাকে।

গির্জার ভিতরে ঢুকলাম। ইতোমধ্যে কাঠের পায়ার উপর বসিয়ে দেয়া হয়েছে কফিনটা। স্ট্র্যাপ খুলবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে আইরিন লয। সেদিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছেন ভিকার, তাঁর দৃষ্টি দেখে বোঝা যাচ্ছে মানসিক একটা ধাক্কা হজম করতে হয়েছে তাঁকে। কর্নওয়ালিস অ্যান্স সন্সের সেই চারজন লোকও হাত লাগিয়েছে। আমরা যখন ভিতরে ঢুকলাম, মুখে তুলে আমাদের দিকে তাকাল আইরিন লয।

‘এই ব্যবসায় সাতাশ বছর ধরে আছি আমি,’ বলল সে, ‘কিন্তু এ-রকম কোনো কিছু ঘটেনি আগে কখনও।’

আর কিছু না-হোক, অন্তত সেই নার্সারি রাইম মিউযিকটা বন্ধ হয়েছে। দ্রুত অভ্যস্ত হাতে কাজ শেষ করছে আইরিন, কাঠের মচমচানি শুনতে পাচ্ছি। কফিনের ঢাকনাটা তুলে ফেলল সে। কেন জানি না আঁতকে উঠে পিছু হটে গেলাম কিছুটা। ডায়ানা ক্যুপার মারা গেছেন সপ্তাহখানেক আগে; এতদিন পর তাঁকে দেখার কোনো ইচ্ছাই নেই আমার। কপাল ভালো… মসলিনের একখণ্ড কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে মরদেহটা। তাঁর শারীরিক অবয়ব ঠাহর করতে পারছি, তবে তাঁর নিষ্পলক খোলা চোখের দৃষ্টি অথবা একসঙ্গে-সেলাই-করে-রাখা ঠোঁট দুটো দেখতে হচ্ছে না। ঝুঁকে পড়ল আইরিন, ক্রিকেট বলের মতো দেখতে উজ্জ্বল কমলা রঙের কিছু-একটা তুলে নিল ডায়ানার দুই হাতের মাঝখান থেকে… ওটা বসিয়ে দেয়া হয়েছিল সেখানে। মিডোসের হাতে দিল জিনিসটা।

যারপরনাই বিরাগ নিয়ে জিনিসটা দেখছে মিডোস। ‘এটা কী, জানি না আমি।’

‘একটা অ্যালার্ম ক্লক,’ বলল হোথর্ন, হাত বাড়িয়ে দিল ঘড়িটা নেয়ার জন্য। ওটা ওর হাতে দিল মিডোস… দেখে মনে হলো জিনিসটা হস্তান্তর করতে পেরে খুশি হয়েছে।

তাকালাম ঘড়িটার দিকে। ওটা একটা ডিজিটাল অ্যালার্ম ক্লক। একধারে একটা বৃত্তাকার প্যানেল আছে, সঠিক সময়টা দেখা যাচ্ছে সেখানে। বেশ কয়েকটা ছিদ্র দেখা যাচ্ছে গায়ে… অনেকটা যেন আগের-দিনের রেডিও’র মতো। সুইচ আছে দুটো। একটা সুইচে চাপ দিল হোথর্ন। সঙ্গে সঙ্গে বাজতে শুরু করল…

দ্য হুইলস অন দ্য বাস গো রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড…

‘বন্ধ করুন ওটা!’ চিৎকার করে উঠল আইরিন লয়।

কথামতো কাজ করল হোথর্ন। ব্যাখ্যা দেয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘এটা একটা এমপি থ্রি রেকর্ডিং অ্যালার্ম ক্লক। ইন্টারনেট ঘাঁটলে ও-রকম ঘড়ির খোঁজ পাওয়া যায় অনেক। আইডিয়াটা হচ্ছে, সকালে ঘুম থেকে তুলবার জন্য আপনার বাচ্চাদের প্রিয় কোনো গান ঢুকিয়ে রাখতে পারবেন এ-ধরনের কোনো ঘড়িতে। আমার ছেলের জন্যও এ-রকম একটা জিনিস জোগাড় করেছি আমি। তবে কোনো গান ঢোকাইনি ওটাতে, বরং আমার নিজের কণ্ঠ রেকর্ড করে দিয়েছি। কী রেকর্ড করেছি, জানেন? ‘ওঠ, ছোট্ট বেজন্মা কোথাকার, কাজ শুরু করে দে!’ কথাটা শুনলে আমার ছেলে যারপরনাই উল্লাস বোধ করে।’

ঘড়িটার দিকে ইঙ্গিত করলাম আমি। ‘ওটা অ্যাক্টিভেট করা হলো কী করে?’

জিনিসটা উল্টেপাল্টে দেখল হোথর্ন। ‘সাড়ে এগারোটায় সেট করা হয়েছিল অ্যালার্ম। যে-ই করে থাকুক কাজটা, চেয়েছিল, শেষকৃত্যানুষ্ঠানের মাঝ-পর্যায়ে যেন বেজে ওঠে অ্যালার্ম।’ তাকাল আইরিন লযের দিকে। ‘এই ঘড়ি ডায়ানা ক্যুপারের হাতে এল কী করে, সে-ব্যাপারে কোনো ধারণা আছে আপনার?’

‘না!’ হতাশ মনে হচ্ছে আইরিনকে; মনে হচ্ছে, সে ভাবছে তাকে দুষছে হোথৰ্ন।

‘এ-রকম কি হয়েছিল… কফিনটা রেখে চলে গিয়েছিল সবাই… মানে, কফিনের ধারেকাছে কেউ ছিল না?’

‘সদুত্তর পেতে চাইলে মিস্টার কর্নওয়ালিসকে জিজ্ঞেস করুন প্রশ্নটা।’

‘তিনি কোথায়?’

‘একটু তাড়াতাড়ি চলে গেছেন তিনি… যেতে হয়েছে আসলে। আজ বিকেলে তাঁর ছেলের স্কুলে একটা নাটক আছে।’ কমলা রঙের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে আইরিন। ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের কারও এ-রকম কোনো কাজ করার কথা না।’

‘তার মানে কাজটা নিশ্চয়ই বাইরের কারও। সেজন্যই জিজ্ঞেস করেছিলাম, কফিনটা ফেলে রেখে বাইরে চলে গিয়েছিলেন কি না আপনারা সবাই?

‘হ্যাঁ,’ কেঁপে উঠল আইরিন, দেখে মনে হলো অস্বস্তিতে ভুগছে… কথাটা স্বীকার করতে রীতিমতো ঘৃণা বোধ করছে। ‘ফুলহ্যাম প্যালেস রোডে আমাদের অফিসে রাখা ছিল মিসেস ক্যুপারের লাশটা। আজ সেখান থেকেই এখানে নিয়ে আসা হয়েছে তাঁর মরদেহ। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দক্ষিণ কেনসিংটনের অফিসে লাশ রাখার জন্য যথেষ্ট জায়গা নেই। হ্যাঁমারস্মিথের কাছে একটা গির্জা আছে, সেখানে প্রায়ই মরদেহ রেখে দেয়া হয়, যাতে যিনি মারা গেছেন তাঁর আত্মীয়স্বজন সেখানে গিয়ে শোক জানাতে পারেন; মিসেস ক্যুপারের বেলায়ও করা হয়েছিল কাজটা।’

‘মিসেস ক্যুপারের জন্য শোক জানাতে গিয়েছিল ক’জন?’

‘সেটা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। তবে ওখানে একটা ভিটির বুক আছে আমাদের। এবং শনাক্তকরণ ছাড়া সেখানে ঢুকতে দেয়ার কথা না কাউকে।’

‘আর এই গির্জার কী অবস্থা?’ জানতে চাইল হোথর্ন।

জবাবে কিছু বলল না আইরিন।

হোথর্ন বলে চলল, ‘আমরা যখন হাজির হলাম এই জায়গায়, তখন কফিনটা শবযানের ভিতরে ছিল। আর ওটা পার্ক করে রাখা হয়েছিল গির্জার পেছনদিকে। সেখানে কি সার্বক্ষণিকভাবে কোনো একজনকে নিযুক্ত রাখা হয়েছিল?’

মিসেস ক্যুপারের কফিন নিয়ে এসেছে যে-চারজন, তাদের একজনের দিকে তাকাল আইরিন।

দৃষ্টি নত করল লোকটা। ‘বেশিরভাগ সময় কফিনের সঙ্গেই ছিলাম আমরা, তবে সারাটা সময় ছিলাম না।’

‘আপনি কে?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন।

‘আলফ্রেড লয। আমি ওই প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক।’ লম্বা করে দম নিলেন তিনি। ‘আইরিন আমার স্ত্রী।’

বিষণ্ণ হাসি হাসল হোথর্ন। ‘সারাটা সময় ছিলেন না… কোথায় গিয়েছিলেন তা হলে?’

‘এখানে আসার পর শবযানটা পার্ক করে গির্জার ভিতরে ঢুকে পড়েছিলাম আমরা।’

‘আমরা মানে আপনারা চারজনই?’

‘হ্যাঁ।’

‘শবযানটা কি তখন লক করা ছিল?’

‘না।’

আইরিন বলল, ‘মৃত একজন মানুষকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে কেউ, এ-রকম কিছু দেখিনি আজপর্যন্ত।’

‘ভবিষ্যতে হয়তো এই ব্যাপারে অন্যকিছু ভাবতে হবে আপনাদেরকে,’ আইরিনের দিকে এগিয়ে গেল হোথর্ন, ভঙ্গিটা আক্রমণাত্মক। ‘মিস্টার কর্নওয়ালিসের সঙ্গে কথা বলা দরকার আমার। কোথায় পাবো তাঁকে?’

‘দিচ্ছি তাঁর ঠিকানা।’ একটা হাত বাড়িয়ে দিল আইরিন। সে-হাতে তার স্বামী একটা নোটবুক আর একটা কলম ধরিয়ে দিলেন। প্রথম পৃষ্ঠায় খসখস করে কয়েকটা লাইন লিখল আইরিন, ছিঁড়ে ফেলল পৃষ্ঠাটা, তারপর সেটা বাড়িয়ে ধরল হোথার্নের দিকে।

‘ধন্যবাদ।

‘এক মিনিট!’ একপাশে দাঁড়িয়ে আছে মিডোস, তাকে দেখে মনে হলো, যেন বুঝতে পেরেছে, কিছুই বলেনি এতক্ষণ। কিন্তু একইসঙ্গে… তার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম… বেশি কিছু বলার নেই আসলে, এবং সেটা সে নিজেও জানে। ‘অ্যালার্ম ক্লকটা নিয়ে যেতে হবে আমাকে। ওটা অন্য কারও হাতে পড়লে মূল্যবান কোনো সূত্র নষ্ট হয়ে যেতে পারে… আমাদের ফরেনযিক এক্সপার্টরা পছন্দ না-ও করতে পারে ব্যাপারটা।

হোথর্ন বলল, ‘আপনাদের তথাকথিত ফরেনযিক এক্সপার্টরা আদৌ কিছু খুঁজে পাবেন কি না এই ঘড়িতে, সন্দেহ আছে আমার।’

‘ইন্টারনেটের মাধ্যমে যদি কেনা হয়ে থাকে এই ঘড়ি,’ বলছে মিডোস, ‘তা হলে ক্রেতার পরিচয় বের করার ভালো একটা সম্ভাবনা আছে আমাদের।’

তার হাতে ঘড়িটা দিল হোথর্ন। ওটা খুব সাবধানে ধরার ভান করল মিডোস… ঘড়ির একপাশ আঁকড়ে ধরেছে বুড়ো আঙুলের সাহায্যে, অন্যপাশ ধরেছে তর্জনীর সাহায্যে।

‘গুড লাক,’ বলল হোথৰ্ন I

অর্থাৎ ভদ্র-ভাষায় বিদায় নিতে বলছে সে মিডোসকে।

.

মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যাঁরা শোক জানাতে এসেছিলেন, তাঁরা ফিনবরো রোডের এককোনায়, একটা গ্যাসট্রোপাবে একত্রিত হচ্ছেন। কবরস্থান থেকে হেঁটে ওই পাবে যেতে কয়েক মিনিট লাগে। তাড়াহুড়ো করে বাসায় ফিরে গেছে ড্যামিয়েন ক্যুপার, তবে চলে যাওয়ার আগে ওই পাবের কথা বলে গেছে। আর শেষকৃত্যের এই অনুষ্ঠান থেকে সে একাই চলে যায়নি, যাঁরা শোক প্রকাশ করতে এসেছিলেন তাঁদের প্রায় অর্ধেক লোকও চলে গেছেন ইতোমধ্যে। তবে গ্রেস লোভেল আছে, আর আছেন কয়েকজন পুরুষ ও মহিলা।

হোথর্ন বলেছিল, ড্যামিয়েন ক্যুপারের সঙ্গে কথা বলতে চায় সে। ইতোমধ্যেই যোগাযোগ করেছে রবার্ট কর্নওয়ালিসের সঙ্গে, একটা টেক্সট মেসেজও পাঠিয়ে দিয়েছে তার মোবাইল ফোনে। তবে সব কিছুর আগে যে-কাজ করতে চায় সে তা হলো, যাঁরা এখন আছেন ওই পাবে তাঁদের সঙ্গে যোগ দিতে চায়। ওই লোকগুলো যদি ভালোমতো না-চিনতেন ডায়ানা ক্যুপারকে, তা হলে আসতেন না এই শেষকৃত্যানুষ্ঠানে… বলা ভালো, অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাওয়ার পরও রয়ে যেতেন না। কাজেই এই যে এখন একসঙ্গে আছেন তাঁরা, তাঁদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এবং কথা বলার এটাই সুযোগ হোথর্নের। চলার গতি দ্রুত করল সে, ফুলহ্যাম রোড পার হয়ে ওই পাবে ঢুকে পড়লাম আমরা দু’জন।

এবং ঢোকামাত্রই দেখতে পেলাম গ্রেসকে। কালো পোশাক পরেছে, কিন্তু সেটা খুবই খাটো। ওই কাপড়ের উপরে পরেছে মখমলের টাক্সিডো জ্যাকেট, সেটার দু’দিকের কাঁধে প্যাড লাগানো আছে। বারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে, কারও শেষকৃত্যে অংশ নিতে আসেনি, বরং কোনো সিনেমার প্রিমিয়ারে যোগ দিতে এসেছে। কারও সঙ্গে কথা বলছে না। আমরা যখন এগিয়ে গেলাম ওর দিকে, আমাদেরকে দেখে হাসল নার্ভাস ভঙ্গিতে।

‘মিস্টার হোথর্ন!’ বোঝাই গেল, হোথর্নকে দেখে খুশি হয়েছে গ্রেস। ‘এখানে কী করছি, নিজেই জানি না আমি। এখানকার কাউকেই বলতে গেলে চিনি না।’

‘এঁরা কারা?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন।

এদিক-ওদিক তাকাল গ্রেস, তারপর আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে দিতে শুরু করল একেকজনকে। ‘ওই যে… রেমন্ড কুন্স। মঞ্চনাটকের প্রযোজক। তাঁর একটা নাটকে অভিনয় করেছে ড্যামিয়েন।’

‘তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে আমাদের।’

‘আর ওই যে… ডক্টর বাটারওয়ার্থ… ডায়ানার জেনারেল প্র্যাকটিশনার,’ মাথা ঝাঁকিয়ে লোকটাকে দেখিয়ে দিল গ্রেস। ভদ্রলোকের বয়স ষাটের ঘরে, মাথাটা কেমন কবুতরের মাথার মতো, পরনে তিন পিসের গাঢ় রঙের স্যুট। ‘ডাক্তারের পাশে যে-মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন তিনি তাঁর স্ত্রী। আর ওই যে… ওই কোনায় একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছেন না… তিনি ডায়ানার উকিল… চার্লস কেনওয়ার্দি। ডায়ানার উইল নিয়ে কাজ করছেন। এঁদের ক’জনকে ছাড়া বাকি কাউকে চিনি না।’

‘ড্যামিয়েন বাসায় চলে গেছেন, তা-ই না?’

‘হ্যাঁ। খুবই আপসেট হয়ে পড়েছিল সে। আমার কী মনে হয়, জানেন? মনে হয়, ওকে আপসেট করে দেয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বেছে নেয়া হয়েছিল ওই গান। কেউ একজন ভয়ঙ্কর কোনো তামাশা করেছে ওর সঙ্গে।’

‘ওই গান কি আপনাদের পূর্বপরিচিত?’

‘হ্যাঁ,’ দ্বিধা ফুটল গ্রেসের চেহারায়, বাকি কথা বলবে কি বলবে না তা নিয়ে সংশয়ে ভুগছে সম্ভবত। ‘গানটা আসলে ওই দুই ছেলের দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কাদের কথা বলছি, বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয়ই? ওই গান টিমোথি গডউইনের সবচেয়ে প্রিয় গান। যখন কবর দেয়া হচ্ছিল ছেলেটাকে, তখন বাজানো হয়েছিল গানটা।’

‘আপনি জানতে পারলেন কী করে?’ জিজ্ঞেস করল হোথৰ্ন।

‘ড্যামিয়েন বলেছে আমাকে। এই ব্যাপারটা নিয়ে প্রায়ই কথা বলত সে।’ আমার কেন যেন মনে হলো, ড্যামিয়েনকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে গ্রেস। ‘নিজের আবেগ বা অনুভূতির কথা সবার কাছে বলে বেড়ানোর মতো মানুষ না সে। তারপরও ওই গান… বিশেষ সেই ঘটনার একটা মানে আছে ওর কাছে। এত বছর হয়ে গেছে, তারপরও ভুলতে পারে না সে ঘটনাটা।’ নিজের জন্য এক গ্লাস প্রোসেকো ঢেলে নিল, একচুমুকে প্রায় পুরোটাই চালান করে দিল পেটে। ‘ঈশ্বর, কী ভয়াবহ একটা দিন যে গেল আজ! আমি জানতাম আজকের দিনটা মোটেও ভালো কাটবে না। সকালে যখন ঘুম থেকে উঠলাম, তখনই টের পেয়েছিলাম ব্যাপারটা। কিন্তু এত খারাপ যে হবে, স্বপ্নেও ভাবিনি।’

হোথর্ন একদৃষ্টিতে দেখছে গ্রেসকে। হঠাৎ বলল, ‘আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, ড্যামিয়েনের মাকে তেমন একটা পছন্দ করতেন না আপনি। ‘

লাল হয়ে গেল গ্রেসের চেহারা। ‘কথাটা ঠিক না! কে বলেছে আপনাকে?’

‘তিনি খুব একটা পাত্তা দিতেন না আপনাকে… আপনিই বলেছিলেন একবার।

‘ও-রকম কিছু বলিনি আমি। শুধু বলেছিলাম, আমার চেয়ে বেশি অ্যাশলিইয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল ড্যামিয়েনের মায়ের। আর কিছু না।’

‘অ্যাশলিই কোথায়?’

‘হাউনস্লো-তে, আমার বাবা-মায়ের কাছে। এখান থেকে বাসায় ফেরার সময় ওকে নিয়ে যাবো ওখান থেকে।’ বারের উপর মদের গ্লাসটা নামিয়ে রাখল গ্রেস। আমাদেরকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল এক ওয়েইটার, তার ট্রে থেকে আরেকটা গ্লাস তুলে নিল।

‘তার মানে মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল আপনার,’ বলল হোথর্ন।

সে-কথাও তো কখনও বলিনি,’ কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল গ্রেস। ‘আমাদের জীবনে অ্যাশলিই আসার আগে ড্যামিয়েনের সঙ্গে অল্প কিছু সময় একা কাটাতে পেরেছি আমি। ড্যামিয়েনের মা একটু নার্ভাস ছিলেন… অ্যাশলিইয়ের কারণে হয়তো ভাটা পড়তে পারে ড্যামিয়েনের ক্যারিয়ারে। কথাটা শুনতে আপনাদের কেমন লাগছে বুঝতে পারছি, কিন্তু ড্যামিয়েনের মা ছিলেন আসলে নিঃসঙ্গ একজন মানুষ। লরেন্স মারা যাওয়ার পর আপন বলতে এক ড্যামিয়েনই ছিল তাঁর জীবনে। এবং ওর প্রতি মানসিকভাবে অনেকখানি ঝুঁকে পড়েছিলেন তিনি। ড্যামিয়েনের যে- কোনো সাফল্য তাঁর জন্য ছিল সব কিছু।

‘তার মানে ড্যামিয়েন আর মিসেস ক্যুপারের মাঝখানে চলে এসেছিল অ্যাশলিই?’

‘অ্যাশলিইয়ের এই পৃথিবীতে চলে আসাটা আসলে পরিকল্পিত ছিল না… আপনি যদি সেটাই বোঝাতে চেয়ে থাকেন তা হলে বলছি। তবে ড্যামিয়েন এখন ভালোবাসে মেয়েটাকে।’

‘আর আপনি? অ্যাশলিইয়ের কারণে আপনার ক্যারিয়ারের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না?’

‘মিস্টার হোথর্ন, আপনি এমন সব কথা বলেন, শুনলে মন-মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। আমার বয়স মাত্র তেত্রিশ। আমি অ্যাশলিইকে অনেক ভালোবাসি। আর… যদি আগামী কয়েক বছর কাজ না-ও করি, তাতে তেমন কিছু আসে-যায় না আমার। এখন যেভাবে চলছে আমার জীবন, তাতে খুবই খুশি আমি।’

কেন যেন সন্তুষ্ট হতে পারলাম না কথাটা শুনে।

‘লস অ্যাঞ্জেলস কেমন লাগে আপনার?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন।

‘ওখানে থিতু হতে একটু সময় লেগেছে আমার। হলিউড হিলসে একটা বাড়ি আছে আমাদের। সেখানে যখন থাকি… যখন সকালে ঘুম থেকে উঠি, আমি যে আছি সেখানে, মাঝেমধ্যে বিশ্বাসই হয় না। যখন নাটকের স্কুলে ক্লাস করতাম, তখন থেকেই একটা স্বপ্ন ছিল আমার… কখনও এ-রকম কোনো বাসায় থাকবো, যেখানে ঘুম থেকে উঠে চোখ মেললেই দেখা যাবে ‘হলিউড’ লেখাটা।’

‘আপনার নিশ্চয়ই নতুন নতুন অনেক বন্ধু আছে, তা-ই না?’

‘নতুন বন্ধুর কোনো দরকার নেই আমার। কারণ ড্যামিয়েন আছে আমার সঙ্গে।’ হোথর্নকে ছাড়িয়ে দূরে তাকাল গ্রেস। ‘যদি কিছু মনে না-করেন, এখানে আরও কয়েকজন লোকের সঙ্গে হাই-হ্যালো করতে হবে আমাকে। কথা ছিল, এখানে যাঁরাই এসেছেন, তাঁদের সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে হবে, তাঁদের সবার খেদমত করতে হবে। আর… এখানে বেশিক্ষণ থাকতেও চাই না আমি।’

আমাদেরকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল মেয়েটা। ওকে দৃষ্টি-দিয়ে অনুসরণ করল হোথর্ন। চেহারা দেখেই বুঝলাম, একরাশ চিন্তা ভর করছে ওর উপর।

‘এবার?’ জানতে চাইলাম আমি।

‘ডাক্তার,’ বলল হোথর্ন।

‘তিনি কেন?’

আমার দিকে ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকাল হোথর্ন। ‘কারণ ডায়ানা ক্যুপারকে খুব ভালোমতো চিনতেন তিনি। আমরা যদি ধরে নিই কোনো একটা সমস্যায় ভুগছিলেন ডায়ানা ক্যুপার, তা হলে আমরা এটাও ধরে নিতে পারি, সে-সমস্যার ব্যাপারে কথা বলেছিলেন তিনি সেই ডাক্তারের সঙ্গে। সবচেয়ে বড় কারণটা হচ্ছে,

ওই ডাক্তার নিজেও খুন করে থাকতে পারেন ডায়ানা ক্যুপারকে!

মাথা নাড়ল হোথর্ন, গ্রেসের দেখিয়ে দেয়া সেই তিন-পিসের-স্যুট পরিহিত লোকের উদ্দেশে পা বাড়াল। কাছে গিয়ে বলল, ‘ডক্টর বাটারওয়ার্থ।

‘বাটিমোর,’ হোথর্নের সঙ্গে হাত মেলালেন ডাক্তার। তিনি বিশালদেহী, গালে দাড়ি আছে। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। হোথর্ন যে তাঁর নাম ভুল বলেছে সেজন্য মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছেন, কিন্তু দোষ আসলে হোথর্নের না, বরং গ্রেসের– নামটা সে-ই বলেছিল আমাদেরকে। যা-হোক, হোথর্ন যখন বলল স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ আছে ওর, তখন দেখলাম চেহারায় আগ্রহ দেখা দিয়েছে তাঁর।

ব্যাপারটা আগেও অনেকবার লক্ষ করেছি আমি। কোনো খুনের তদন্তের সঙ্গে যখন জড়িয়ে ফেলা হয় সাধারণ কোনো লোককে, তখন তারা সেটা উপভোগ করে। কেউ কেউ সাহায্য করার চেষ্টা করে, তবে তাদের সে-চেষ্টা আসলে ভান ছাড়া আর কিছু না।

‘কবরস্থানে ওটা কী ঘটল, বলুন তো?’ হোথর্নকে জিজ্ঞেস করলেন বাটিমোর। ‘বাজি ধরে বলতে পারি, মিস্টার হোথর্ন, ও-রকম কিছু আগে কখনও দেখেননি আপনি। কী মনে হয় আপনার? কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে করেছে কাজটা?’

‘আমার মনে হয়, কফিনের ভিতরে অ্যালার্ম ক্লক ঢুকিয়ে দেয়াটা কোনো দুর্ঘটনা না, স্যর,’ বলল হোথর্ন।

‘একদম ঠিক। ঘটনাটা তদন্ত করে দেখবেন আশা করি।

‘আসলে… মিসেস ক্যুপারের হত্যাকাণ্ডকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।

‘আমি ভেবেছিলাম দোষী লোকটাকে ইতোমধ্যেই শনাক্ত করতে পেরেছেন আপনারা।’

‘চোর ছাড়া আর কারও কাজ না ওটা,’ বলে উঠলেন ডাক্তারের স্ত্রী। আকারে তিনি তাঁর স্বামীর অর্ধেক, বয়স পঞ্চাশের ঘরে।

‘নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে আসার আগে সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখতে হবে আমাদেরকে,’ বলল হোথর্ন, তাকাল ডক্টর বাটিমোরের দিকে। ‘জানতে পেরেছি, মিসেস ক্যুপারের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আপনি। তাঁর সঙ্গে শেষ কবে দেখা হয়েছিল আপনার, সেটা যদি বলতে পারেন, ভালো হয়।’

‘সপ্তাহ তিনেক আগে। ক্যাভেনডিশ স্কোয়ারে আমার ডাক্তারখানা আছে, সেখানে এসেছিলেন তিনি। সত্যি বলতে কী, আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন তিনি বেশ কয়েকবার।’

‘ইদানীং?’

‘গত কয়েক মাসে। ঘুমাতে সমস্যা হচ্ছিল তাঁর। নির্দিষ্ট বয়সের মহিলাদের বেলায় সমস্যাটা খুব সাধারণ। আর… বিভিন্ন রকম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাতেও ভুগছিলেন।’ ডানে-বাঁয়ে তাকালেন তিনি, সবার সামনে গোপন কথা বলে দিচ্ছেন ভেবে নার্ভাস হয়ে পড়েছেন কিছুটা। কণ্ঠ নিচু করলেন। ‘আসলে… ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছিল তাঁর। ‘

‘কেন?’ জানতে চাইল হোথৰ্ন।

‘মিস্টার হোথর্ন, আমি আপনার সঙ্গে শুধু মিসেস-ক্যুপারের-ডাক্তার হিসেবেই না, তাঁর বন্ধু হিসেবেও কথা বলছি। …সত্যি কথাটা হচ্ছে, তাঁর ছেলে যেভাবে জীবনযাপন শুরু করেছিল লস অ্যাঞ্জেলসে, সেটা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। প্রথম কথা, তিনি মোটেও চাননি ও-রকম কোনো জায়গায় গিয়ে থাকুক তাঁর ছেলে। পত্রপত্রিকায় তারকাদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব প্রকাশিত হয় প্রায়ই; সে-রকম খবর পড়েছিলেন তিনি, আর সেগুলোতে বলা হয়েছিল, ড্রাগস এবং বিভিন্ন ধরনের পার্টির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে তাঁর ছেলে। অথচ বিন্দুমাত্র কোনো সত্যতা ছিল না ওসব খবরের। যারা নাম কামিয়ে ফেলেছে, তাদের ব্যাপারে বানিয়ে বানিয়ে যা-তা লেখাটা পত্রিকাওয়ালাদের একটা বদভ্যাস। কথাটা বলেছিলাম আমি মিসেস ক্যুপারকে। কিন্তু তিনি তখন বিশ্বাস করে বসে আছেন ওসব খবর, দুশ্চিন্তায় ভুগছেন; তাই তাঁকে ঘুমের ওষুধ প্রেসক্রাইব করি। শুরু করতে বলেছিলাম ‘অ্যাটিভ্যান’ দিয়ে, তাতে যদি কাজ না-হয় তা হলে খেতে বলেছিলাম ‘টেমাযেপাম’।’

মিসেস ক্যুপারের বাথরুমে পাওয়া ওষুধগুলোর কথা মনে পড়ে গেল আমার।

‘আমার প্রেসক্রিপশন কাজে লেগে গিয়েছিল,’ বলছেন বাটিমোর। ‘এপ্রিলের শেষের দিকে শেষবার দেখা হলো মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে। তখন তাঁকে আরেকটা প্রেসক্রিপশন দিলাম…

‘তিনি ঘুমের ওষুধের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়তে পারেন ভেবে খারাপ লাগেনি আপনার?’

করুণার হাসি দেখা দিল ডক্টর বাটিমোরের চেহারায়। ‘মিস্টার হোথর্ন, কিছু মনে করবেন না, ওষুধের ব্যাপারে আপনি আসলে কিছু জানেন কি না জানি না… টেমাযেপামের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা আসলে খুবই কম। আর সে- কারণেই বিশেষ ওই ওষুধ খেতে দিই আমার-রোগীদেরকে। একটা মাত্র সমস্যা হতে পারে ওষুধটা খেলে… শর্ট টার্ম মেমোরি লস… কিন্তু যতদূর জানতে পেরেছি, যেদিন মারা গেছেন মিসেস ক্যুপার, সেদিনও তাঁর স্বাস্থ্য যথেষ্ট ভালো ছিল।’

‘কোনো ফিউনারেল পার্লারে যাওয়ার ব্যাপারে আপনার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন তিনি?’

‘সরি?’

‘একটা ফিউনারেল পার্লারে গিয়েছিলেন তিনি। যেদিন মারা গেছেন, সেদিনই ব্যবস্থা করে গেছেন নিজের শেষকৃত্যের।’

চোখ পিটপিট করছেন ডক্টর বাটিমোর। ‘আমি… কী বলবো… হতভম্ব। কেন ওই কাজ করতে গেলেন তিনি, কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে আপনাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ওই সমস্যার কথা বাদ দিয়ে বললে, এটা ভাববার কোনো কারণই ছিল না মিসেস ক্যুপারের যে, তাঁর সময় শেষ। কাজেই যতদূর মনে হয়, যেদিন ওই ফিউনারেল পার্লারে গেছেন তিনি সেদিনই তাঁর খুন হওয়ার ব্যাপারটা কাকতালীয় ছাড়া আর কিছু না।’

‘আগেও বলেছি, আবারও বলছি, ভয়ঙ্কর কোনো এক চোর ঢুকে পড়েছিল মিসেস ক্যুপারের বাড়িতে,’ বললেন ডক্টর বাটিমোরের স্ত্রী।

‘ঠিক তা-ই, প্রিয়তমা। মিসেস ক্যুপারের জানার কথা না, খুন করা হবে তাঁকে। কাজেই পুরো ব্যাপারটা কাকতালীয় ছাড়া আর কিছু না।’

মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন।

আমরা দু’জন সরে এলাম কিছুটা দূরে।

আমাদের কথা কেউ শুনতে পাবে না টের পেয়ে বিড়বিড় করে জঘন্য একটা গালি দিল হোথর্ন।

‘কেন গালি দিলেন?’ জানতে চাইলাম আমি।

‘কারণ ডক্টর বাটিমোর এতক্ষণ যা বলেছেন, সে-ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই তাঁর।’

থতমত খেয়ে গেলাম।

‘তিনি যা-যা বলেছেন, শুনেছেন আপনি। সেসব কথা অর্থহীন মনে হয়েছে আমার কাছে।’

‘কিন্তু… আমার তো সে-রকম মনে হয়নি?’

জবাবে কিছু বলল না হোথর্ন, এগিয়ে গেল চার্লস কেনওয়ার্দি… মানে মিসেস ক্যুপারের উকিলের দিকে। ওর পিছু পিছু গেলাম আমিও।

এখনও আগের কোনাতেই দাঁড়িয়ে আছেন কেনওয়ার্দি, কথা বলছেন এক মহিলার সঙ্গে। ধারণা করলাম, ওই মহিলা তাঁর স্ত্রী। লোকটা বেঁটেখাটো, গোলগাল। মাথায় কোঁকড়া রূপালি চুল। মহিলাও একই গড়নের, তবে স্বামীর চেয়ে বেশি মোটা। কেনওয়ার্দি পোর্সেকো খাচ্ছেন। আর তাঁর স্ত্রীর হাতে ফলের জুসের গ্লাস।

কেমন আছেন আপনি?’ হোথর্নের সম্ভাষণের জবাবে বললেন উকিল সাহেব। ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমিই কেনওয়ার্দি। আর এ হচ্ছে ফ্রিডা।’

হোথর্ন কী জানতে চায়, তা শোনার পর শুরু হলো তাঁর বকবকানি। তিনি ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চেনেন মিসেস ক্যুপারকে। লরেন্স ক্যুপারের সঙ্গে এককালে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল তাঁর। অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে ভুগে মারা গেছেন বেচারা। খুব দুঃখজনক ছিল ব্যাপারটা। কারণ ভালো একজন মানুষ ছিলেন লরেন্স। প্ৰথম শ্রেণীর ডেন্টিস্ট ছিলেন একজন। কেন্টের ফেভারশ্যামে থাকতেন। যা-হোক, ভয়ঙ্কর সেই দুর্ঘটনা যখন ঘটল, তখন বাড়িটা বিক্রি করে দিতে ডায়ানাকে সাহায্য করেছিলেন কেনওয়ার্দি। তারপর ডায়ানা চলে আসেন লন্ডনে।

হোথর্ন বলল, ‘সেই দুর্ঘটনার পরে যখন কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল মিসেস ক্যুপারকে, তখন কি তাঁকে আইনি শলাপরামর্শও দিয়েছিলেন?’

‘অবশ্যই। সত্যি বলতে কী, মিসেস ক্যুপারের বিরুদ্ধে আসলে কোনো কেসই ছিল না। বিচারক যা-রায় দিয়েছিলেন, সেটা একদম ঠিক ছিল।’

‘সেই বিচারকের সঙ্গে কি পূর্বপরিচয় ছিল আপনার?’

‘কে, ওয়েস্টন? পূর্বপরিচয় মানে একবার কি দু’বার দেখাসাক্ষাৎ হয়েছিল আমাদের মধ্যে। লোকটা ভালো মনের মানুষ। যা-হোক, ওই সময়ে আমি ডায়ানাকে বলেছিলাম, চিন্তার কিছু নেই… পত্রপত্রিকায় যে-খবরই বের হোক না কেন, বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। তারপরও সময়টা খুব খারাপ গেছে বেচারীর। খুবই আপসেট হয়ে পড়েছিলেন তিনি।’

‘তাঁর সঙ্গে শেষ কবে দেখা হয়েছিল আপনার?’

‘গত সপ্তাহে… যেদিন তিনি মারা গেছেন সেদিন। বোর্ড মিটিং ছিল আমাদের। আমরা দু’জনই ছিলাম গ্লোব থিয়েটারের বোর্ডে। জানেন কি না জানি না… ওই থিয়েটার কিন্তু একটা শিক্ষামূলক দাঁতব্য প্রতিষ্ঠান। কাজকর্ম চালিয়ে নেয়ার জন্য লোকজনের দান-খয়রাতের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয় আমাদেরকে

‘আপনারা সাধারণত কোন্ ধরনের নাটক করেন?’

‘মূলত শেক্সপিয়ার।’

আশ্চর্য লাগছে আমার। হোথর্নের মতো একজন মানুষ কিনা জানতে চাইছে গ্লোব থিয়েটারের ব্যাপারে! ওই থিয়েটারের ব্যাপারে আসলেই কিছু জানে না, নাকি না-জানার ভান করছে… নিশ্চিত হতে পারলাম না। আজ থেকে চার শত বছর আগে থেমস নদীর দক্ষিণ তীরে গড়ে উঠেছিল ওই থিয়েটার, পরে পুনঃনির্মিত হয়েছে। রানি এলিযাবেথের আমলের নাটকগুলোর নির্ভরযোগ্য মঞ্চ- উপস্থাপনার জন্য থিয়েটারটাকে বিশেশায়িত বলা চলে। যা-হোক, হোথর্নের মধ্যে এখন পর্যন্ত এমন কিছু দেখতে পাইনি যার ফলে মনে হতে পারে, নাটক, সাহিত্য, সঙ্গীত বা আর্টের প্রতি আগ্রহ আছে ওর। আবার, একইসঙ্গে, অনেক কিছুর ব্যাপারে অনেক কিছু জানে সে। কাজেই, হতে পারে, উকিল সাহেবকে বাজিয়ে দেখতে চাইছে আসলে।

বলল, ‘শুনলাম, সেদিনের বোর্ড মিটিঙে আপনাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল?’

‘না তো! কথাটা কে বলেছে আপনাকে?’

জবাব দিল না হোথর্ন। ব্রম্পটন সেমেট্রি’র ব্যাপারে জানার জন্য ডায়ানা ক্যুপারকে ফোন করেছিল রবার্ট কর্নওয়ালিস, তখন ফোনের ও-প্রান্ত থেকে বাকবিতণ্ডার আওয়াজ শুনতে পাওয়া গেছে। কথাটা কর্নওয়ালিস নিজে বলেছে আমাদেরকে।

‘বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেছিলেন মিসেস ক্যুপার,’ বলল হোথর্ন।

‘হ্যাঁ। তবে সেটা বিশেষ কোনো মতানৈক্যের কারণে না।’

‘তা হলে কেন করেছিলেন কাজটা?’

কোনো ধারণা নেই আমার। তিনি শুধু বলেছিলেন, পদত্যাগের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু দিন ধরে ভাবছিলেন। তাঁর সেই ঘোষণা শুনে আমরা সবাই আশ্চর্য হয়ে যাই। কারণ একনিষ্ঠ সমর্থক বলতে যা বোঝায়, আমাদের থিয়েটারের জন্য তিনি ছিলেন ঠিক সে-রকম। বিভিন্ন সময়ে চাঁদা তুলবার ব্যাপারেও চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতেন। শুধু তা-ই না, শিক্ষামূলক যেসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো, সেগুলোতেও অগ্রণী ভূমিকা ছিল তাঁর।’

‘কোনো কিছু নিয়ে নাখোশ ছিলেন তিনি?’

‘না… মোটেও না। ছ’বছর ধরে থিয়েটারের বোর্ডে ছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, যথেষ্ট হয়েছে… আর না।’

অস্বস্তি দেখা দিয়েছে উকিল সাহেবের স্ত্রীর চেহারায়। ‘চার্লস, আমার মনে হয় আমাদের যাওয়া উচিত।’

‘ঠিক আছে, প্রিয়তমা।’ হোথর্নের দিকে তাকালেন কেনওয়ার্দি। ‘ওই বোর্ডের ব্যাপারে আপনাকে আর বিশেষ কিছু বলার নেই আমার। ব্যাপারটা গোপনীয়।

‘মিসেস ক্যুপারের উইলের ব্যাপারে কিছু বলতে পারবেন?’

‘হ্যাঁ। আমার ধারণা, আজ বাদে কাল এমনিতেও জানাজানি হয়ে যাবে ব্যাপারটা। সহজ হিসাব… নিজের সব কিছু ড্যামিয়েনকে দিয়ে গেছেন মিসেস ক্যুপার। তবে বিস্তারিত কিছু বলাটা এই মুহূর্তে সম্ভব না আমার পক্ষে। যা-হোক, আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে এবং কথা বলে ভালো লাগল, মিস্টার হোথৰ্ন। হাতেধরা গ্লাসটা নামিয়ে রাখলেন কেনওয়ার্দি। পকেট হাতড়ে বের করলেন গাড়ির চাবি, সেটা দিলেন স্ত্রীর হাতে। ‘চলো তা হলে, প্রিয়তমা। তুমিই যদি গাড়ি চালাও, ভালো হয়।

‘ঠিক আছে।’

‘চাবি… বিড়বিড় করে নিজের সঙ্গেই কথা বলছে হোথর্ন। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চার্লস আর ফ্রিডা কেনওয়ার্দির দিকে, দেখছে হেঁটে বেরিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু ওই দু’জনের প্রতি কোনো আগ্রহই নেই ওর। অন্য কোনো চিন্তায় হারিয়ে গেছে। গাড়ির চাবিটা এখনও ফ্রিডার হাতে। দেখতে পেলাম, দরজা দিয়ে যখন বেরিয়ে গেলেন তিনি, তখনও চাবিটা হাতে ধরে রেখেছেন।

বুঝতে পারলাম, ওই চাবি এমন কিছু একটা মনে করিয়ে দিয়েছে হোথৰ্নকে, যা মিস করেছিল আগে।

এবং তারপর… হঠাৎ করেই… নড়ে উঠল সে; যেন অদৃশ্য কেউ একজন সজোরে ধাক্কা দিয়েছে ওকে। এমনিতে পাণ্ডুরই বলা চলে ওর চেহারাটা, কাজেই যদি বলি রক্ত সরে গেল ওর চেহারা থেকে, তা হলে সেটা যথোপযুক্ত হবে না; বরং বলা উচিত, ভয়ানক কোনো উপলব্ধি হঠাৎ করেই যেন দেখা দিল ওর চেহারায়। সে যেন বুঝতে পেরেছে, কিছু একটা গড়বড় হয়ে গেছে কোথাও।

‘চলুন,’ বলল আমাকে।

‘কোথায়?’

‘ব্যাখ্যা করার সময় নেই। তাড়াতাড়ি আসুন।’

ইতোমধ্যেই হাঁটতে শুরু করে দিয়েছে সে। ওর সামনে হাজির হয়েছিল এক ওয়েইটার, ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল লোকটাকে। সোজা এগিয়ে যাচ্ছে দরজার দিকে।

দরজাটার কাছে দাঁড়িয়ে তখন পরিচিত কাউকে বিদায় জানাচ্ছিলেন কেনওয়ার্দি দম্পতি, তাঁদেরকে পাশ কাটিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম আমরা হুড়মুড় করে। হাজির হলাম এককোনায়, সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল হোথর্ন। রাগে ফুঁসছে।

‘সারা রাস্তায় কোনো ট্যাক্সি নেই কেন?’

ঠিকই বলেছে সে। অনেক যানবাহন চলাচল করছে রাস্তায়, কিন্তু একটা ট্যাক্সিও নজরে পড়ছে না।

কিছুক্ষণ পরই আমাদের উল্টোদিকে, রাস্তার আরেক ধারে একটা ট্যাক্সি থামল। ওটা থামিয়েছে এক মহিলা… তার দু’হাতে কয়েকটা শপিং ব্যাগ।

ট্যাক্সিচালকের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য চিৎকার করে উঠল হোথর্ন। ছুট লাগিয়েছে, কোন্ গাড়ি কোন্‌দিক দিয়ে আসছে সে-ব্যাপারে যেন কোনো পরোয়াই নেই… সে যেন অন্ধ। ওর চেয়ে একটু সতর্ক হয়ে রাস্তাটা পার হওয়ার চেষ্টা করলাম আমি… মনে পড়ে যাচ্ছে কবরস্থানটা খুব বেশি দূরে না এখান থেকে। শুনতে পেলাম রাস্তার সঙ্গে গাড়ির চাকার জোরালো ঘর্ষণের আওয়াজ… হঠাৎ ব্রেক চেপেছে কোনো ড্রাইভার; কেউ আবার সমানে বাজাচ্ছে হর্ন। কিন্তু যেভাবেই হোক শেষপর্যন্ত পৌঁছে গেলাম রাস্তার অপরপ্রান্তে।

হোথর্ন ইতোমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে ওই মহিলা আর ট্যাক্সিচালকের মাঝঝানে। মিটার চালু করে দিয়েছে লোকটা, নিভিয়ে দিয়েছে হলুদ বাতিটা।

‘এক্সকিউয মি,’ বলে উঠল মহিলাটা, তার কণ্ঠে একইসঙ্গে ঘৃণা আর ক্রোধ। ‘পুলিশ,’ মুখ ঝামটা মারল হোথর্ন, ‘ব্যাপারটা জরুরি।’

ওর আইডি কার্ড দেখতে চাইল না ওই মহিলা।

ট্যাক্সির ভিতরে ঢুকে বসেছি আমরা, এমন সময় ড্রাইভার জানতে চাইল, ‘কোথায় যেতে চান আপনারা?’

‘ব্রিক লেন,’ বলল হোথর্ন।

তার মানে ড্যামিয়েন ক্যুপারের বাসা।

সেদিনের সেই ট্যাক্সিযাত্রার কথা কখনও ভুলতে পারবো না আমি। ঘড়িতে তখন বারোটা বেজে কয়েক মিনিট, রাস্তায় যানজট তেমন বেশি না। তারপরও যখন দাঁড়িয়ে পড়ছে আমাদের ট্যাক্সি, অথবা যখনই লাল বাতি জ্বলে উঠছে সিগনালে, তখনই দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন অত্যাচার চালাচ্ছে হোথর্নের উপর। আমার পাশেই বসে আছে সে, কেমন কুঁজো হয়ে গেছে পিঠটা। একটু পর পর মোচড়ামোচড়ি করছে।

হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আমার মনে ভিতরে… সেসব জিজ্ঞেস করতে চাইছি হোথৰ্নকে। গাড়ির চাবি দেখে এমন কী কথা মনে পড়ে গেল ওর? ওই চাবি ড্যামিয়েন ক্যুপারের কথা মনে করিয়ে দিল কেন ওকে? নাকি কোনো বিপদে পড়েছে ড্যামিয়েন ক্যুপার?

মনে যত প্রশ্নই থাকুক, চুপ করে আছি। হোথর্নের মেজাজ কেমন সেটা ভালোমতোই জানা আছে আমার, কাজেই আমার উপর ওকে চটিয়ে দেয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে হচ্ছে না। তা ছাড়া… জানি না কেন… আমার মনের ভিতরে কেউ একজন যেন ফিসফিস করে বলছে, যা ঘটছে, আমারই কোনো ভুলের কারণে ঘটছে।

ফুলহ্যাম থেকে ব্রিক লেনের রাস্তাটা বেশ লম্বা। পশ্চিমদিক থেকে পুবদিক পর্যন্ত সারা লন্ডন পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছাতে হলো আমাদেরকে। আমরা যদি টিউব ট্রেনে করে আসতাম, তা হলে আমার ধারণা আরও তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে পারতাম। কয়েকটা স্টেশন পার হতে হলো আমাদেরকে… দক্ষিণ কেনসিংটন, নাইটসব্রিজ, হাইড পার্ক কর্নার… প্রতিবারই খেয়াল করলাম, মনে মনে কী যেন হিসেব করছে হোথর্ন। আমাদের সামনে গাড়িঘোড়ার সংখ্যা কত, সেটাই ভাবছে বোধহয়।

যা-হোক, শেষপর্যন্ত পৌঁছে গেলাম আমরা ড্যামিয়েন ক্যুপারের ফ্ল্যাটের কাছে। একলাফে ট্যাক্সি থেকে বেরিয়ে গেল হোথর্ন, ভাড়া দেয়ার দায়িত্ব ছেড়ে দিল আমার উপর। ৫০ পাউন্ডের একটা নোট ধরিয়ে দিলাম আমি ড্রাইভারের হাতে, ভাংতির জন্য অপেক্ষা করলাম না।

একধারের দুটো দোকানের মাঝখান দিয়ে সরু একটা সিঁড়ি উঠে গেছে উপরের দিকে, সেদিকে ছুট লাগিয়েছে হোথর্ন, আমিও ছুটলাম ওর পিছু পিছু। দ্বিতীয় তলার প্রবেশপথের কাছে হাজির হতে বেশি সময় লাগল না।

আশ্চর্য, দরজাটা আধখোলা।

ভিতরে ঢুকে পড়লাম আমরা।

প্রথমেই আমার নাকে বাড়ি মারল রক্তের গন্ধ। হত্যাকাণ্ডের উপর কম করে হলেও ডজনখানেক বই লিখেছি আমি, টেলিভিশনের জন্য নাটকও লিখেছি কিছু। কিন্তু বাস্তবজীবনে যে এ-রকম কোনো ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে, কল্পনাও করিনি কখনও।

ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা হয়েছে ড্যামিয়েন ক্যুপারকে। রক্তের ছোটখাটো একটা পুকুরের পাশে পড়ে আছে সে। ওর শরীর থেকে বেরিয়ে সে-রক্ত ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে; ঢুকে যাচ্ছে ফ্লোরবোর্ডের ভিতরে। এমনভাবে পড়ে আছে, দেখে মনে হচ্ছে, কিছু একটা ধরার জন্য বাড়িয়ে দিয়েছে একটা হাত। সে-হাতের দুটো আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে প্রায়। আমার ধারণা, যে-ছুরি দিয়ে কমপক্ষে ছ’বার আঘাত করা হয়েছে ওকে, সেটার কবল থেকে বাঁচতে গিয়ে ওই অবস্থা হয়েছে আঙুল দুটোর। ছুরিটা শেষপর্যন্ত ঠাঁই নিয়েছে ওর বুকে… অনেকখানি ঢুকে আছে বুকের গভীরে ছুরির একটা ঘা ওর চেহারাতেও লেগেছে, এবং এই আঘাতটাই বেশি ভয়ঙ্কর লাগছে আমার কাছে। কারণ কেউ যদি একটা হাত অথবা একটা পা হারিয়ে ফেলে, তা হলেও তার পরিচয়টা রয়ে যায়। কিন্তু যদি কারও চেহারা নষ্ট হয়ে যায়, তা হলে তার পরিচয়টাও নষ্ট হয়ে যায়।

ছুরি দিয়ে ড্যামিয়েনের চেহারায় যে-আঘাত করা হয়েছে, তার ফলে উপড়ে গেছে ওর একটা চোখ, সেদিকের চামড়া অনেকখানি কেটে গিয়ে ঝুলে আছে মুখের উপর। আরও যেসব আঘাত করা হয়েছে ওকে, সেগুলো হয়তো ওর কাপড়ের কারণে বোঝা যাচ্ছে না, তবে এটা বোঝা যাচ্ছে, যে-ই করে থাকুক খুনটা, পাগলের মতো ছুরি চালিয়েছে সে ড্যামিয়েনের উপর। মাথাটা একদিকে কাত হয়ে আছে ওর, ফলে একদিকের গাল লেগে আছে মেঝের সঙ্গে; এই অবস্থায় ওর মাথাটা দেখে মনে পড়ে যাচ্ছে বাতাস বেরিয়ে-যাওয়া কোনো চুপসানো ফুটবলের কথা। জীবিত অবস্থায় যে-রকম ছিল, খুন হওয়ার পর মোটেও সে-রকম দেখাচ্ছে না ওকে। ওর কাপড় আর কালো চুল দেখে ওকে চিনে নিতে হচ্ছে আমার।

রক্তের গন্ধে কেমন যেন ভরাট হয়ে গেছে আমার নাক। মনে হচ্ছে, এমন কোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে এইমাত্র গভীর করে কোনো গর্ত খোঁড়া হয়েছে, ফলে মাটির গন্ধ পাচ্ছি। রক্তের গন্ধ যে ও-রকম, আগে কখনও জানা ছিল না। কিন্তু বিচ্ছিরি এই গন্ধ যেন বড় বেশি পেয়ে বসছে আমাকে। ফ্ল্যাটের ভিতরটা গরম, জানালাগুলো বন্ধ, দেয়ালগুলো কেমন যেন বেঁকে আসছে আমার দিকে…

‘টনি? কী হয়েছে? যিশুর দোহাই লাগে…

জানি না কেন, কিন্তু যে-কোনো কারণেই হোক ছাদের দিকে তাকিয়ে আছি আমি। আমার মাথার পেছনদিকটা কেমন যেন ব্যথা করছে। আমার উপর ঝুঁকে আছে হোথর্ন। কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুললাম, কিন্তু থেমে গেলাম। না, জ্ঞান হারাতে পারি না আমি। সেটা অসম্ভব। যা ঘটছে আমার সঙ্গে, তা পাগলামি হয়ে যাচ্ছে। বিব্রতকর একটা অবস্থায় পড়তে যাচ্ছি।

শেষপর্যন্ত জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।

১৩. নরা মানুষের জুতো

‘টনি? আপনি ঠিক আছেন?’

আমার উপর ঝুঁকে আছে হোথর্ন, আমার দৃষ্টিপথের পুরোটা জুড়ে দিয়েছে। তবে তেমন একটা উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে না ওকে। বরং, মনে হচ্ছে, হতবুদ্ধি হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, বীভৎস, ক্ষতবিক্ষত, এবং এখনও-রক্ত-পড়ছে এ-রকম কোনো লাশ দেখে জ্ঞান হারানোটা যেন অদ্ভুত কোনো ব্যাপার ওর কাছে।

সে জিজ্ঞেস করেছে, আমি ঠিক আছি কি না। না, ঠিক নেই আমি। জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছি ড্যামিয়েন ক্যুপারের ফ্ল্যাটের মেঝেতে, মাথায় ব্যথা পেয়েছি। রক্তের গন্ধে এখনও যেন বন্ধ হয়ে আছে আমার নাক। সেই রক্তের উপরই পড়ে গেছি কি না, ভেবে কেমন যেন আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। না-দেখেও টের পেলাম চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে আমার। নিজের আশপাশের খানিকটা জায়গা হাতড়ালাম। না, আমার আশপাশ শুকনোই আছে।

‘আমাকে উঠতে বসতে সাহায্য করতে পারেন?’ বললাম হোথৰ্নকে।

‘অবশ্যই।’ দ্বিধা করল সে, কিন্তু তারপর আমার হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দিল আমাকে।

আশ্চর্য, দ্বিধা করল কেন সে? হঠাৎ করেই প্রশ্নটা জাগল আমার মনে… নতুন কোনো উপলব্ধি হলো যেন। এই কেসের তদন্তের সময় এবং আমার রিসার্চের কাজে আমাকে যে-ক’দিন সাহায্য করেছে সে, আমাদের মধ্যে শারীরিক সংস্পর্শ বলতে গেলে ঘটেনি। একবারও আমার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে কি না, সন্দেহ। কারও সঙ্গেই হাত মেলাতে, অথবা অন্য কোনো রকম শারীরিক সংস্পর্শে যেতে দেখিনি আমি ওকে। তা হলে সে কি একজন জার্মোফোব… মানে, জীবাণুভীতি আছে ওর? নাকি পুরোপুরি অসামাজিক কেউ? যেটাই হোক, সমাধান করার জন্য নতুন আরেকটা রহস্য জুটল আমার কপালে।

একধারে কয়েকটা লেদার আর্মচেয়ার আছে, একটাতে বসে পড়লাম। ড্যামিয়েন ক্যুপারের লাশ আর রক্ত থেকে দূরে সরে এসেছি।

‘পানি খাবেন?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন।

‘না। আমি ঠিক আছি।’

‘বমি-টমি করে দেবেন না তো? এই জায়গা এখন একটা ক্রাইম এরিয়া, এটা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।’

‘না, বমি করবো না।’

মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘কারও লাশ দেখাটা চমৎকার কোনো কাজ না। আর… দেখেই বোঝা যাচ্ছে, খুনি তার ঝাল ঝেড়েছে ড্যামিয়েন ক্যুপারের উপর।’ মাথা নাড়ল। ‘লাশ ক্ষতবিক্ষত করে ফেলার ঘটনা আগেও দেখেছি। এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে লাশের চোখও উপড়ে ফেলা হয়েছিল…

‘ধন্যবাদ!’ টের পেলাম, বিবমিষা জেগে উঠছে আমার ভিতরে। লম্বা করে দম নিলাম।

‘কেউ একজন প্রচণ্ড ঘৃণা করত ড্যামিয়েন ক্যুপারকে।’

‘বুঝতে পারছি না ব্যাপারটা,’ বললাম আমি। শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পর গ্রেস কী বলেছে, মনে পড়ে গেল। ‘পূর্বপরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে ড্যামিয়েন ক্যুপারকে, ঠিক না? কেউ একজন ওই মিউযিক প্লেয়ারটা রেখে দিয়েছিল কফিনের ভিতরে। কারণ সে জানত, বিশেষ ওই সুর পেয়ে বসবে ড্যামিয়েনকে। জানত, ওই সুর শুনে আপসেট হয়ে পড়বে ড্যামিয়েন, আলাদা হয়ে পড়বে সবার কাছ থেকে। আর সে-সুযোগই নিতে চেয়েছিল লোকটা… নাগালের মধ্যে একা পেতে চেয়েছিল ড্যামিয়েনকে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ড্যামিয়েনকে কেন? পুরো ব্যাপারটা যদি ডিলের সেই দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত হয়, তা হলে ড্যামিয়েনকে কোনোভাবেই দায়ী করা যায় না। যখন ঘটেছিল ঘটনাটা, তখন গাড়ির ভিতরে ছিল না সে।’

‘হুঁ, ভালো বলেছেন।

ব্যাপারটা ভেবে দেখার চেষ্টা করলাম। বেপরোয়া গাড়ি চালাচ্ছেন একজন মহিলা। তাঁর সেই গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা গেল একটা বাচ্চা। দশ বছর পর শাস্তি দেয়া হলো মহিলাকে। কিন্তু সে-শাস্তি কেন তাঁর ছেলেকেও দেয়া হবে? বাইবেলে যেমনটা বলা হয়েছে… চোখের বদলে চোখ… সে-রকম কিছুই কি ঘটছে? কিন্তু কেন যেন পুরো ব্যাপারটার কোনো মানেই দাঁড় করাতে পারছি না। ডায়ানা ক্যুপার ইতোমধ্যেই মারা গেছেন। ড্যামিয়েন ক্যুপারকে খুন করার মাধ্যমে ডায়ানা ক্যুপারের মনে কষ্ট দেয়ার ইচ্ছা যদি থাকে কারও, তা হলে তার উচিত ছিল আগে ড্যামিয়েনকে খুন করা।

আপনমনে বললাম, ‘বিশেষ ওই দুর্ঘটনার পর মিসেস ক্যুপার প্রথমেই পুলিশের কাছে যাননি, কারণ তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিল ড্যামিয়েন।’

কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল হোথর্ন, তবে আমি যা বলেছি সে-ব্যাপারে কিছু না। বরং বলল, ‘আপনাকে এখানে কিছুক্ষণের জন্য একা রেখে যেতে হবে আমাকে। ইতোমধ্যে নাইন নাইন নাইনে ফোন করেছি আমি। ফ্ল্যাটটা চেক করে দেখা দরকার।’

‘যান, চেক করুন।

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে, সর্পিলাকার সেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে।

আর্মচেয়ারে বসে আছি আমি, ভুলেও তাকানোর চেষ্টা করছি না ড্যামিয়েনের লাশের দিকে। ভয়াবহ যেসব ক্ষত তৈরি হয়েছে ওর শরীরে, সেগুলোর ব্যাপারে ভাবছি না। কাজটা মোটেও সহজ না। কারণ যখনই চোখ বন্ধ করে ফেলছি, রক্তের সেই গন্ধ যেন বাড়ি মারছে আমার নাকে। চোখ খুললেই দেখতে পাচ্ছি রক্তের সেই পুকুর, অথবা হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে-থাকা ড্যামিয়েনকে। শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে নিলাম, তাকালাম আরেকদিকে… আসলে আমার দৃষ্টিপথ থেকে বিদায় করে দিতে চাইছি ড্যামিয়েন ক্যুপারকে।

ঠিক তখনই গুঙিয়ে উঠল সে।

চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম আবার, ধরেই নিয়েছি যা শুনেছি তা আমার কল্পনা ছাড়া আর কিছু না। কিন্তু আবারও শুনতে পেলাম শব্দটা… কেমন বিভীষিকাময়। এখনও মেঝের সঙ্গে লেগে আছে ড্যামিয়েনের মাথা, আমার উল্টোদিকে তাকিয়ে আছে সে, কিন্তু আমি নিশ্চিত আওয়াজটা সে-ই করেছে।

‘হোথর্ন!’ চিৎকার করে উঠলাম। একইসঙ্গে টের পাচ্ছি, পিত্তরস উঠে আসছে আমার গলার কাছে। ‘হোথৰ্ন!’

সিঁড়িতে ধুপধাপ আওয়াজ হচ্ছে। হুড়মুড় করে উঠে আসছে হোথর্ন। ‘কী হয়েছে?’

‘ড্যামিয়েন!’ আবারও চেঁচালাম আমি। ‘বেঁচে আছে সে!’

ঘরের ভিতরে হাজির হলো হোথর্ন, সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এগিয়ে গেল লাশটার দিকে। ‘না, বেঁচে নেই।’

‘এই মাত্র তার গলার আওয়াজ শুনলাম।

আবারও গুঙিয়ে উঠল ড্যামিয়েন, এবার আগের চেয়েও জোরে। এবং ব্যাপারটা মোটেও আমার কল্পনা না। কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে লোকটা।

কিন্তু নাক সিঁটকানো ছাড়া আর কিছু করল না হোথর্ন। ‘যেখানে আছেন সেখানেই থাকুন, টনি। এসব ভুলে যান, ঠিক আছে? মাংসপেশী শক্ত হয়ে আসছে ড্যামিয়েনের, এবং সেসব মাংসপেশীর মধ্যে লোকটার ভোকাল কর্ডের আশপাশের পেশীও আছে। শুধু তা-ই না, লোকটার পেটের ভিতরে কিছু গ্যাস আছে, সেগুলোও বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আর ওই শব্দও শুনতে পেয়েছেন আপনি। এ-রকম ঘটনা সব সময়ই ঘটে।’

‘ওহ্,’ কেন মরতে থাকতে গেলাম এখানে, ভেবে আফসোস লাগছে আমার। কেন এই জঘন্য বই লিখতে রাজি হলাম, সেটা ভেবেও আফসোস হলো।

একটা সিগারেট ধরাল হোথর্ন।

‘উপরতলায় কিছু খুঁজে পেয়েছেন?’ জানতে চাইলাম আমি।

‘অন্য কেউ নেই এখানে,’ বলল হোথর্ন।

‘আপনি জানতেন খুন করা হবে ড্যামিয়েনকে।’

‘জানতাম বললে ভুল হবে। বলা ভালো, আমি জানতাম, তার খুন হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

‘কীভাবে জানতে পারলেন?’

নিজের একহাতের তালুতে সিগারেটের ছাই ঝাড়ল হোথর্ন। বুঝতে পারছি, আমার প্রশ্নটার জবাব দেয়ার তেমন ইচ্ছা নেই ওর। বলল, ‘গাধামি করে ফেলেছি। তবে… আমরা দু’জন যখন প্রথমবার এলাম এখানে, আমার মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিয়েছিলেন আপনি।’

‘তার মানে ভুলটা আমার?

‘আপনাকে বলেছিলাম, আমি যখন কারও সঙ্গে কথা বলবো, তখন মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা দরকার আমার। আপনি যদি তখন ব্যাঘাত ঘটান, তা হলে যা ভাবছি আমি তা নষ্ট হয়ে যায়… আমার চিন্তার ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে যায়।’ একটু নরম হলো হোথর্নের কণ্ঠ। ‘তবে… দোষটা আমার। আমিই মিস করেছি ব্যাপারটা।’

‘কী মিস করেছেন?’

‘ড্যামিয়েন বলেছিল, তার মা নাকি এখানে এসেছিলেন, টেরেসের গাছগুলোতে পানি দিয়েছিলেন। বলেছিল, তার মা এমনকী তার মেইলও ফরওয়ার্ড করেছিলেন। কথাটা মনে রাখা উচিত ছিল আমার। আচ্ছা, আপনার কি মনে আছে, আমরা দু’জন যখন ডায়ানা ক্যুপারের বাসায় গিয়েছিলাম, তাঁর রান্নাঘরে পাঁচটা হুক দেখতে পেয়েছিলাম? মনে আছে?’

‘কাঠের একটা মাছের গায়ে লাগানো ছিল ওই হুকগুলো।’

‘ঠিক। এবং চারটা হুকে চার সেট চাবি ছিল।

‘একটা হুক খালি ছিল।’

‘হুঁ। কেউ একজন খুন করেছে মিসেস ক্যুপারকে। তারপর সুযোগ বুঝে বিশেষ এক সেট চাবি হাতিয়ে নিয়েছে ওই মাছের গা থেকে।’ থামল হোথর্ন, এইমাত্র যা বলল সেটা ভেবে দেখছে। ‘ব্যাপারটা কিন্তু একটা সম্ভাবনা হতে পারে।’

সদর-দরজার সঙ্গে যে-সিঁড়ি আছে, সেখান থেকে ভেসে আসছে একাধিক লোকের পায়ের আওয়াজ। ইউনিফর্ম পরিহিত দু’জন পুলিশ অফিসার হাজির হলো। প্রথমে লাশটার দিকে, তারপর আমাদের দিকে তাকাল তারা। বুঝবার চেষ্টা করছে, কী ঘটছে।

‘যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুন আপনারা,’ বলল এক অফিসার। ‘আপনাদের মধ্যে কে ফোন করেছিলেন?

‘আমি,’ বলল হোথৰ্ন। ‘আসতে দেরি করে ফেলেছেন আপনারা।‘

‘আপনি কে, স্যর?’

‘প্রাক্তন ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টর হোথর্ন… একসময় এম.আই.টি.-তে ছিলাম। ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টর মিডোসের সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করেছি। যা-হোক, বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট কারণ আছে আমার, চলমান একটা হত্যাকাণ্ডের তদন্তের সঙ্গে এই খুনের সম্পর্ক আছে। কাজেই স্থানীয় ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টরকে এবং মার্ডার স্কোয়াডে খবর দেয়াটাই বোধহয় ভালো হবে আপনাদের জন্য।’

দুই পুলিশ অফিসারকে কেমন নিরাশ বলে মনে হচ্ছে আমার। তাদের কারও কাছেই কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নেই। কারও পরনে সানগ্লাস নেই। দু’জনই যুবক, চেহারায় স্থিরসংকল্পের ছাপ। একজন এশিয়ান, অন্যজন শ্বেতাঙ্গ। আমাদের সঙ্গে আর তেমন কোনো কথা বলল না তারা কেউ।

রেডিও বের করল একজন, কী ঘটেছে ব্যাখ্যা করে বোঝাতে লাগল। এই সুযোগে ঘরটা নিজের মতো করে দেখে নিচ্ছে হোথর্ন। ওর দিকে তাকিয়ে আছি আমি।

ঘরের দরজার কাছে হাজির হলো সে, তারপর গেল টেরেসে। দরজার হাতলে যাতে হাত না-পড়ে যায়, সে-ব্যাপারে সতর্ক আছে। পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে সাবধানে ধরল হাতলটা। লক করা ছিল না ওই দরজা। টেরেসে গেল সে, তারপর গায়েব হয়ে গেল আমার দৃষ্টিপথ থেকে।

এখনও খুব খারাপ লাগছে আমার, তারপরও উঠে দাঁড়ালাম চেয়ার ছেড়ে, অনুসরণ করলাম হোথর্নকে। তাকালাম পুলিশের দুই অফিসারের দিকে। ফোন করার কথা ছিল তাদের, সেটা করেছে তারা। দেখে মনে হচ্ছে এখন আর কিছু করার নেই তাদের। অনিশ্চিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে… দেখছে কোথায় যাচ্ছি আমি। আমি কে, সেটাও জিজ্ঞেস করেনি।

টেরেসে, বিকেলের বাতাসে বেরিয়ে আসামাত্র ভালো লাগতে শুরু করল। এখানে কয়েকটা ডেকচেয়ার দেখতে পাচ্ছি। আরও আছে পাত্রে লাগানো বেশ কিছু গাছ। একধারে একটা গ্যাস বারবিকিউ-ও আছে। এসব দেখে স্টুডিয়ো’র কোনো সেটের কথা মনে পড়ে গেল।

একধারে দাঁড়িয়ে আছে হোথর্ন, তাকিয়ে আছে নিচের দিকে। খেয়াল করলাম, জুতো জোড়া খুলে ফেলেছে… খুব সম্ভব কোনো ফুটপ্রিন্ট রাখতে চাইছে না। আবারও ধূমপান করছে। সে এত বেশি সিগারেট খায় যে, আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় কাজটা করে আসলে আত্মহত্যা করার জন্য। কম করে হলেও বিশটা সিগারেট খায় দিনে। সংখ্যাটা আরও বেশি হতে পারে। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুরে তাকাল।

‘খুনি এখানে অপেক্ষা করছিল,’ বলল সে। ‘শেষকৃত্যানুষ্ঠান থেকে যতক্ষণে এখানে ফিরে এসেছিল ড্যামিয়েন ক্যুপার, তার আগেই ব্রিটানিয়া রোডের সেই বাসা থেকে হাতিয়ে-নেয়া চাবি কাজে লাগিয়ে এই ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়েছিল খুনি। এবং ড্যামিয়েনকে খুন করে পালিয়ে গেছে এখান দিয়েই।’

‘এক মিনিট। এসব কথা আপনি জানলেন কীভাবে? আর… বার বার বলছেন লোকটা’… একজন পুরুষমানুষই যে খুন করেছে ড্যামিয়েন ক্যুপারকে, নিশ্চিত হলেন কী করে?’

‘পর্দা আটকানোর দড়ি কাজে লাগিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়েছিল ডায়ানা ক্যুপারের। আর তাঁর ছেলেকে বলতে গেলে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে। কাজেই খুনি হয়-কোনো পুরুষমানুষ, নয়তো প্রচণ্ড রাগী কোনো মহিলা।’

‘কিন্তু বাকিটা? খুন কীভাবে হয়েছে সে-ব্যাপারে নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে?’

অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল হোথর্ন, কিছু বলল না।

‘আপনি যদি চান এই কেস নিয়ে কোনো বই লিখি, তা হলে সব কথা সোজাসাপ্টা বলতে হবে। অন্যথায়, এই কাজ বাদ দিতে হবে আমাকে।’ এ-রকম হুমকি আগেও দিয়েছি আমি, আবারও দিলাম।

‘ঠিক আছে।’ সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিল হোথর্ন। দেখলাম, বাতাসে একবার গোত্তা খেয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল সেটা। ‘নিজেকে খুনির জায়গায় বসান। কী চিন্তাভাবনা চলছে তার মাথায়, ভেবে দেখুন।’

‘যেমন?’

‘যেমন আপনি জানতেন, শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান থেকে এখানে ফিরে আসবে ড্যামিয়েন। আর তাই আপনি একটা এমপি থ্রি প্লেয়ার ঢুকিয়ে দিলেন কফিনের ভিতরে, আর চালিয়ে দিলেন সেই ‘দ্য হুইলস অন দ্য বাস’ ছড়াটা। ইচ্ছাকৃতভাবেই করলেন কাজটা, যাতে এখানে আসতে বাধ্য হয় ড্যামিয়েন। আবার এমনও হতে পারে, আপনি নিজেই গিয়েছিলেন কবরস্থানে… মিশে ছিলেন জনতার ভিড়ে, অথবা অদৃশ্য হয়ে ছিলেন কোনো একটা কবরফলকের আড়ালে। হয়তো শুনেছেন, ড্যামিয়েন তার গার্লফ্রেন্ডকে বলছে, ‘বাসায় ফিরে যাচ্ছি আমি।’ আর ঠিক তখনই পরিকল্পনাটা এঁটে নিলেন মনে মনে।

‘শুধু একটাই সমস্যা ছিল আপনার… বাসায় একা ফিরবে কি না ড্যামিয়েন, সে-ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না। তার সঙ্গে হয়তো গ্রেসও ফিরে আসত। আবার এমনও হতে পারত, সঙ্গে করে ভিকারকে নিয়ে আসত ড্যামিয়েন। কাজেই আপনার আসলে এমন একটা জায়গা দরকার, যেখানে লুকিয়ে থেকে অপেক্ষা করতে পারবেন… যদি সে-রকম কোনো সুযোগ না আসে তা হলে চট করে পালিয়েও যেতে পারবেন।’ বুড়ো আঙুলের ইশারায় টেরেসের নিচটা দেখিয়ে দিল হোথর্ন। ‘নিচতলার দিকে একটা স্টেয়ারকেস নেমে গেছে।’

‘তার মানে… খুনি সম্ভবত ওই পথেই হাজির হয়েছিল?’

‘না। লিভিংরুমের দরজাটা লক করা ছিল, এবং ভিতর থেকে হুড়কো আটকানো ছিল।’ মাথা নাড়ল হোথর্ন। ‘খুনির কাছে চাবি ছিল। সদর-দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকেছে সে। তারপর নিজের জন্য লুকানোর একটা জায়গা খুঁজে নিয়েছে… হাজির হয়েছে এখানে। এই জায়গা যুৎসই ছিল তার জন্য। এখান থেকে জানালার কাঁচ ভেদ করে তাকিয়ে সহজেই দেখতে পেয়েছে সে, ড্যামিয়েন ক্যুপার একা এসেছে, নাকি তার সঙ্গে অন্য কেউ আছে। যা-হোক, একাই এসেছিল ড্যামিয়েন। এবং সেটাই চেয়েছিল খুনি। লিভিংরুমের ভিতরেচট করে ঢুকে পড়েছিল ড্যামিয়েনের অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে, এবং তারপর… ‘ বাকি কথা শেষ করল না।

‘আপনি বলেছেন, পরে এখান দিয়েই পালিয়ে গেছে লোকটা,’ মনে করিয়ে দেয়ার কায়দায় বললাম আমি।

‘এখানে একজায়গায় একটা ফুটপ্রিন্ট আছে,’ ইশারায় দেখিয়ে দিল হোথর্ন। তাকালাম আমি।

ফায়ার এস্কেপের একধারে, সিকি চাঁদের আকৃতির লাল একটা দাগ দেখা যাচ্ছে।

বুঝলাম, ওটা খুনির জুতোর তলার দাগ… কোনো কারণে পা দিয়ে ফেলেছিল ড্যামিয়েনের রক্তে।

ডায়ানা ক্যুপারের বাসার সেই ফুটপ্রিন্টের কথা মনে পড়ে গেল আমার। হতে পারে, দুটো ফুটপ্রিন্ট একই জুতোর।

‘পালিয়ে যাওয়ার সময় এই ফ্ল্যাটের সামনের দিকের দরজাটা ব্যবহার করার উপায় ছিল না খুনির,’ বলল হোথর্ন। ‘আপনি দেখেছেন, কীভাবে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে ড্যামিয়েনকে। রক্তের ছিটা কমবেশি লাগার কথা খুনির গায়েও। ওই অবস্থায় ব্রিক লেন ধরে যাবে সে, আর কেউ লক্ষ করবে না তাকে… সেটা কি সম্ভব? কাজেই আমার অনুমান, কোট অথবা ওই জাতীয় কিছু-একটা চাপিয়ে নিয়েছে সে গায়ে, তারপর এই ফায়ার এস্কেপ ধরে নেমে গেছে, শেষে নিচের গলি ধরে অদৃশ্য হয়ে গেছে।’

‘কফিনের ভিতরে সেই অ্যালার্ম ক্লক এল কী করে, জানতে পেরেছেন?’

‘এখনও না। কর্নওয়ালিসের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তবে আমার মনে হয় না, খুব জলদি ছাড়া পেতে চলেছি আমরা এখান থেকে। মিডোসের কাছে আনুষ্ঠানিক একটা বিবৃতি দিতে হতে পারে আপনার। আগেই বলে রাখি, বেশি কিছু বলবেন না ওকে। খুব ভালো হয়, যদি বোবা সেজে থাকার চেষ্টা করেন।’

পরের দুই ঘণ্টায় পুলিশের লোক দিয়ে গিজগিজ করতে শুরু করল ড্যামিয়েন ক্যুপারের ফ্ল্যাটটা। আমরা দু’জন চুপচাপ বসে আছি… কিছুই করার নেই। পুলিশের যে-দুই কন্সটেবল হাজির হয়েছিল সবার আগে, তারা খবর দিয়ে নিয়ে এসেছে তাদের ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টরকে; ওই লোক পরে খবর দিয়েছে মার্ডার ইনভেস্টিশন টিমকে। বিশেষ সেই দলের জনা ছয়েক সদস্য এখন হুড়ওয়ালা প্লাস্টিসাইড্ পেপার স্যুট পরে, মুখে মাস্ক আর হাতে গ্লাভস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফ্ল্যাটের এখানে-সেখানে। তাদের একজনের থেকে অন্যজনকে আলাদা করে চেনার কোনো উপায় নেই। হাজির হয়েছে পুলিশের একজন ফটোগ্রাফারও; লোকটা যখন কয়েক-মুহূর্ত-পর-পর অত্যুজ্জ্বল ফ্ল্যাশের সাহায্যে ফ্ল্যাটের এ-জায়গা সে-জায়গার ছবি তুলছে, তখন মনে হচ্ছে, এই ফ্ল্যাট যেন জমে যাচ্ছে কোনো বরফখণ্ডের মতো। একজন পুরুষ আর একজন মহিলা… দু’জনই ফরেনযিক টিমের সদস্য… ঝুঁকে আছে ড্যামিয়েনের মৃতদেহের উপর, কটন বাডের সাহায্যে লাশের হাত আর ঘাড় মুছছে খুব সাবধানে। ছুরিকাঘাতের সময় খুনির সঙ্গে যদি কোনো শারীরিক সংস্পর্শ ঘটে থাকে ড্যামিয়েনের, তা হলে হয়তো ড্যামিয়েনের দেহে খুনির ডিএনএ রয়ে যেতে পারে।

ড্যামিয়েনের লাশ যখন সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় হলো, তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল দু’জন অফিসার; পলিথিন দিয়ে পেঁচিয়ে দিল পুরো শরীরটা। দৃশ্যটা দেখে একইসঙ্গে প্রাচীন মিশর আর ফেডেরাল এক্সপ্রেসের কথা মনে পড়ে গেল আমার।

ফ্ল্যাটের সদর-দরজার সামনে সাদা আর নীল টেপ পেঁচিয়ে দিয়েছে পুলিশ, সিঁড়ির খানিকটাও আটকে দিয়েছে ওই টেপ। এই ফ্ল্যাটের উপরতলা আর নিচতলার অধিবাসীদের ব্যাপারে কী করবে পুলিশ, জানি না ঠিক। এখন-পর্যন্ত পুলিশের কোনো অফিসার কিছু জিজ্ঞেস করেনি আমাকে। তবে প্লাস্টিকের স্যুট পরিহিত এক মহিলা হাজির হয়েছিল আমার কাছে, আমার জুতো জোড়া খুলতে বলেছিল। কাজটা আমি করার পর ও-দুটো নিয়ে চলে গেছে সে। ব্যাপারটা হতভম্ব করে দিয়েছে আমাকে।

হোথর্নকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার জুতো দিয়ে কী করবে পুলিশ?’

‘ফুটপ্রিন্ট,’ বলল হোথর্ন। ‘আনুষ্ঠানিক তদন্ত কার্যক্রম থেকে আপনাকে বাদ দিয়ে চায় ওরা আসলে।’

‘জানি। কিন্তু ওরা তো আপনার জুতো জোড়া নিল না?’

‘কারণ আমি আপনার চেয়ে অনেক বেশি সাবধান।’

নিজের পায়ের দিকে তাকাল সে। এখনও মোজা পরে আছে। তার মানে ড্যামিয়েনের লাশটা যখন দেখতে পেয়েছিল, তখনই হয়তো খুলে ফেলেছিল জুতো জোড়া।

‘আমার জুতো ফেরত পাবো কখন?’ জানতে চাইলাম।

অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল হোথৰ্ন।

এখানে আর কতক্ষণ থাকতে হবে আমাদেরকে?’

জবাব দিল না সে আবারও। আরেকটা সিগারেট দরকার হয়ে পড়েছে ওর, কিন্তু এখানে ধূমপান করতে দেয়া হবে না ওকে। এবং সে-কারণে বিরক্তি বোধ করছে সে।

কিছুক্ষণ পর হাজির হলো মিডোস। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে-থাকা লগ অফিসারের হাতেধরা কাগজে স্বাক্ষর করে ঢুকল ভিতরে। ড্যামিয়েন ক্যুপারের হত্যাকাণ্ডের কেস গ্রহণ করল আনুষ্ঠানিকভাবে। এবার তার এক অন্য রূপ দেখতে পেলাম আমি। শান্ত আছে, তবে কর্তৃত্বপূর্ণ একটা ভাব বজায় রেখেছে চেহারায়। ক্রাইম সিন ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলল কিছুক্ষণ, তারপর কথা বলল ফরেনযিক টিমের সঙ্গে। কিছু নোট নিল। শেষপর্যন্ত যখন এগিয়ে এল আমাদের দিকে, সরাসরি চলে গেল কাজের কথায়।

‘আপনারা কী করছেন এখানে?’

‘সান্ত্বনা জানাতে এসেছিলাম আসলে।

‘বাজে কথা বাদ দিন, হোথর্ন। সিরিয়াস একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছি আমি। নিহত লোকটা কি ফোন করেছিল আপনাকে? নাকি আপনি কোনোভাবে জানতে পেরেছিলেন বিপদে পড়তে পারেন তিনি?’

তার মানে, হোথর্ন যতটা বলেছিল, আসলে ততটা বোকা নয় মিডোস। একটা কথা ঠিকই বলেছে সে… হোথর্ন কোনোভাবে জানতে পেরেছিল কোনো একটা বিপদে পড়তে যাচ্ছে ড্যামিয়েন। কিন্তু কথা হচ্ছে, হোথর্ন কি স্বীকার করবে সেটা?

‘না,’ বলল হোথর্ন, ‘আমাকে ফোন করেনি ড্যামিয়েন।’

‘তা হলে এখানে এসেছেন কেন আপনি?’

‘আপনার কী মনে হয়? শেষকৃত্যের সেই ঘটনা… কিছু-একটা ছিল আসলে ওই ঘটনায়, এবং আপনি যদি আপনার সেই অস্তিত্বহীন চোরের পেছনে ঘুরে সময় নষ্ট না-করতেন, তা হলে আপনিও বুঝতে পারতেন। …ঠিক কী ঘটেছিল, সেটা ড্যামিয়েনের কাছ থেকে জানতে চাওয়ার ইচ্ছা ছিল আমার। কিন্তু এখানে যতক্ষণে পৌঁছালাম, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

চাবির কথাটা উল্লেখ করেনি সে। একটা ভুল যে করে ফেলেছে, সেটা স্বীকার করবে না কখনোই। কিন্তু বোধহয় ভুলে গেছে, আমি যদি কখনও লিখে শেষ করতে পারি এই বই… এটা যদি ছাপা হয় কখনও, তা হলে মিডোস অনায়াসেই পড়ে ফেলতে পারবে ব্যাপারটা।

‘আপনি বলতে চাইছেন আপনারা যতক্ষণে হাজির হয়েছেন এখানে, তার আগেই মারা গেছেন মিস্টার ক্যুপার?’

‘হ্যাঁ।’

‘এখান থেকে কাউকে চলে যেতে দেখেননি?’

‘টেরেসের একদিকে কোনো একজনের জুতোর তলার একটুখানি দাগ লেগে আছে… ড্যামিয়েনের রক্তে পা দিয়ে ফেলেছিল ভুলক্রমে… একটু কষ্ট করে যদি দেখে নেন, ভালো হয়। ওই দাগ দেখে লোকটার জুতোর মাপ অনুমান করতে পারবেন হয়তো। যা-হোক, আমি বলবো, ড্যামিয়েনকে খুন করার পর খুনি ফায়ার- এস্কেপ ধরে নেমে গেছে নিচের গলিতে। কাজেই আপনারা যদি সিসিটিভি ফুটেজ ঘাঁটেন, উপকার পেতে পারেন। তবে আমরা কাউকে দেখিনি। এখানে পৌঁছাতে আসলেই দেরি হয়ে গেছে আমাদের।’

‘ঠিক আছে তা হলে। আপনি বিদায় হতে পারেন এখন। আর সঙ্গে আপনার আগাথা ক্রিস্টিকেও নিয়ে যেতে পারেন।

আগাথা ক্রিস্টি বলতে আমাকে বোঝানো হয়েছে। আমি ক্রিস্টির দারুণ একজন ভক্ত, কাজেই মিডোসের কথাটা খারাপ লাগল।

উঠে দাঁড়াল হোথর্ন, ওর পিছু নিলাম আমি। কাঠের মেঝের উপর দিয়ে মোজা- পরা পায়ে হেঁটে হাজির হলাম সদর-দরজার কাছে।

কালো চামড়ার এক জোড়া জুতো বের করে আমাকে দিল হোথর্ন। নিচু গলায় বলল, ‘আপনার জন্য।’

‘কোথায় পেলেন?’

‘উপরতলায় যখন গিয়েছিলাম, কাবার্ডের ভিতর থেকে বের করে নিয়েছি।’ ইঙ্গিতে দেখাল পলিথিনে পেঁচানো ড্যামিয়েন ক্যুপারকে। ‘এই জুতো জোড়া খুব সম্ভব ড্যামিয়েনের… আপনার পায়ে লাগার কথা।’

দ্বিধা ফুটে উঠল আমার চেহারায়। ‘অন্য কারও জুতো…’

‘এসবের আর দরকার হবে না ড্যামিয়েনের,’ আশ্বাস দেয়ার ভঙ্গিতে বলল হোথৰ্ন।

আর কথা বাড়ালাম না, পরে নিলাম জুতো জোড়া। ইটালিয়ান জুতো, বেশ দামি। আমার পায়ে চমৎকার লেগে গেল।

এবার নিজের জুতো পরে নিল হোথর্ন। ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা। পুলিশের আরও কয়েকজন ইউনিফর্ম-পরিহিত অফিসারকে পাশ কাটিয়ে হাঁটতে লাগলাম ব্রিক লেন ধরে।

বাড়ির বাইরে পার্ক করে রাখা হয়েছে পুলিশের তিনটা গাড়ি। ‘প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স’ লেখা একটা ভ্যানও দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার একপাশে। তবে ওটা আসলে কারও ব্যক্তিগত না। ড্যামিয়েন ক্যুপারের লাশ মর্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসলে আনা হয়েছে কালো ওই ভ্যান।

উৎসুক জনতার ভিড় তৈরি হয়ে গেছে, তাদেরকে রাস্তার আরেক প্রান্তে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। এই রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

তারপরও আমাদের সামনে এসে থামল একটা ট্যাক্সি, সেটার ভিতর থেকে বের হলো গ্রেস লোভেল। কনুই দিয়ে মৃদু একটা গুঁতো দিলাম আমি হোথর্নকে। শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যে-কাপড় পরে গিয়েছিল মেয়েটা, এখনও সেটাই পরে আছে। একহাতে ঝুলছে হ্যান্ডব্যাগ। তবে এবার অ্যাশলিই আছে তার সঙ্গে। গোলাপি একটা পোশাক পরেছে বাচ্চাটা, মায়ের হাত ধরে রেখেছে!

থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল গ্রেস, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। যা ঘটছে, তা দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। আমাদেরকে দেখতে পেয়ে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এল।

‘কী হয়েছে?’ জানতে চাইল সে। ‘পুলিশ কেন এসেছে এখানে?

‘কিছু মনে করবেন না…’ বলল হোথর্ন, ‘ভিতরে যেতে পারবেন না আপনি। খারাপ খবর আছে।’

‘ড্যামিয়েন…?’

‘খুন করা হয়েছে তাঁকে।’

আমার মনে হয় কথাটা আরেকটু কোমলভাবে বলা উচিত ছিল হোথর্নের। কারণ ওর ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তিন বছর বয়সী একটা মেয়ে। সে যদি শুনে ফেলে থাকে কথাটা, এবং বুঝে ফেলে থাকে, তা হলে কী হবে?

মেয়েটাকে নিজের দিকে টেনে নিল গ্রেস, রক্ষা করার কায়দায় জড়িয়ে ধরেছে মেয়েটার কাঁধ। ফিসফিস করে বলল, ‘কী বলতে চাইছেন?’

‘শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পর কেউ একজন হামলা চালিয়েছে ড্যামিয়েনের উপর।’

‘সে কি… মারা গেছে?

‘হ্যাঁ… বলতে খারাপই লাগছে… কিন্তু ঠিক সেটাই ঘটেছে।’

‘না। সম্ভব না। আপসেট হয়ে পড়েছিল ড্যামিয়েন। বলেছিল, বাসায় ফিরে যাবে। আসলে ভয়ঙ্কর সেই তামাশা শোনার পর পরই…’ হোথর্নকে ছাড়িয়ে বাড়ির দরজার দিকে তাকাল গ্রেস, তারপর আবার তাকাল হোথর্নের দিকে। এতক্ষণে বোধহয় বুঝতে পারছে, চলে যাচ্ছি আমরা। ‘কোথায় যাচ্ছেন আপনারা?’

‘ফ্ল্যাটের ভিতরে মিডোস নামের একজন ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টর আছেন। তদন্তের দায়িত্ব এখন তাঁর উপর। আমার ধারণা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইবেন তিনি। তবে যদি আমার একটা পরামর্শ শোনেন… এই মুহূর্তে ফ্ল্যাটের ভিতরে যাওয়ার দরকার নেই আপনার। কারণ এখন সেখানে যাওয়াটা খুব একটা সুখকর হবে না আপনার জন্য। …আচ্ছা, এতক্ষণ কোথায় ছিলেন আপনি? আপনার বাবা-মায়ের সঙ্গে?’

‘হ্যাঁ। অ্যাশলিইকে নিয়ে আসার জন্য গিয়েছিলাম সেখানে।

‘তা হলে বরং এক কাজ করুন… আবার গিয়ে চড়ুন ওই ট্যাক্সিতে, ফিরে যান আপনার বাবা-মায়ের কাছে। নিজের প্রয়োজনেই আপনাকে খুঁজে নেবেন মিডোস।’

‘আমি কি ফিরে যেতে পারবো? যদি যাই, ওরা হয়তো ভাববে… ‘

‘ওরা কিছুই ভাববে না। কারণ যা ঘটেছে, তার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত না আপনি। শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পর আপনি ছিলেন পাবে… আমাদের সঙ্গে।’

‘আমি সেটা বলিনি।’ কিন্তু কথা আর বাড়াল না গ্রেস, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। মাথা ঝাঁকাল। ‘ঠিকই বলেছেন। ভিতরে যেতে পারবো না আমি… বিশেষ করে অ্যাশলিই যখন আছে আমার সঙ্গে তখন।

‘বাবা কোথায়?’ প্রথমবারের মতো কথা বলে উঠল অ্যাশলিই। দ্বিধান্বিত বলে মনে হচ্ছে তাকে। মনে হচ্ছে, একসঙ্গে এত পুলিশ দেখে ভয় পেয়েছে।

‘বাবা নেই এখানে,’ বলল গ্রেস। ‘নানা-নানীর কাছে ফিরে যাচ্ছি আমরা।’

‘আপনি কি চান এখন কেউ একজন থাকুক আপনার সঙ্গে?’ গ্রেসকে জিজ্ঞেস করলাম আমি। ‘যদি আপত্তি না-থাকে আপনার, তা হলে আপনার সঙ্গে যেতে কোনো অসুবিধা নেই আমার।’

‘না। কাউকে লাগবে না আমার।’

অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে থাকতে কখনোই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না আমি। কারণ তারা কখন অভিনয় করছে আর কখন করছে না, সেটা ঠিক ঠাহর করতে পারি না। যেমন গ্রেস। আপসেট দেখাচ্ছে তাকে। অশ্রু দেখা দিয়েছে চোখে। মনে হয়তো সাংঘাতিক চোটও পেয়েছে। তারপরও… আমার ভিতরের একটা অংশ যেন বলছে আমাকে… আসলে অভিনয় করছে মেয়েটা। কেন যেন মনে হচ্ছে, ট্যাক্সিতে যখন ছিল সে, তখনই সেরে নিয়েছে অভিনয়ের মহড়াটা।

ট্যাক্সির কাছে ফিরে যাচ্ছে গ্রেস, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি আমরা তাকে। অ্যাশলিইকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল, সামনের দিকে ঝুঁকে কী যেন বলল ড্রাইভারকে। কিছুক্ষণ পর চলে গেল ট্যাক্সিটা।

‘দ্য গ্রিভিং উইডো,’ বিড়বিড় করে বলল হোথর্ন।

কিন্তু কথাটা কান এড়াল না আমার। ‘আসলেই কি তা-ই মনে করেন?

‘না, টনি। একবার এক তুর্কি দম্পতির বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে শোকের যে-বহিঃপ্রকাশ দেখেছি, সেটা, কিছুক্ষণ আগে গ্রেসের ভিতরে যে- শোক দেখা গেল তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। যা-হোক, আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন তা হলে বলবো, আমাদের কাছে অনেক কিছুই গোপন করেছে মেয়েটা।’ একটুখানি হাসল হোথর্ন। ‘ড্যামিয়েন কীভাবে মারা গেছে, এমনকী সেটাও জিজ্ঞেস করেনি সে।’

১৪. উইল্‌স্‌ডেন গ্রীন

বাড়িটা ১৯৫০ সালের; ওটার মতোই দেখতে আরেকটা বাড়ির সঙ্গে একদিক দিয়ে লাগোয়া। প্রথম তলায় ব্যবহার করা হয়েছে লাল ইট, সেগুলোর সঙ্গে আছে হালকা ধূসর পলেস্তারার আবরণ। ছাদ ত্রিকোণাকৃতির। দেখলে মনে হয়, একইসঙ্গে তিনজন আর্কিটেক্ট কাজ করেছে বাড়িটা বানানোর সময়, অথচ তাদের কারও সঙ্গেই কারও দেখা হয়নি তখন। আয়নার প্রতিবিম্বের মতো দেখতে লাগোয়া বাড়িটার কারণে মনে হয়, ওই তিনজন তাদের কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট। কাঠের ফেন্সের কারণে ভাগ হয়ে গেছে বাড়ি দুটোর ড্রাইভওয়ে, তবে দুই বাড়ির চিমনি একটাই। প্রতিটা বাড়িতে একটা করে বে-উইন্ডো আছে। সে-জানালা দিয়ে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়বে অসম-আকারের-সমতল-পাথর দিয়ে বানানো শানবাঁধানো ফুটপাত। নিচু একটা দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেছে ওই ফুটপাত, সে-দেয়ালের অপর পাশে স্পেয়িড রোড। আমার ধারণা, ওই বাড়িতে চারটা বেডরুম আছে। সামনের দিকের জানালায় ঝুলছে একটা পোস্টার; ওটা প্রকৃতপক্ষে উত্তর লন্ডনের একটা অনাথশালার জন্য প্রতিযোগিতবিহীন ফান-রানের বিজ্ঞাপন। একদিকে দেখতে পাচ্ছি একটা গ্যারেজ, সেটার দরজা খোলা। ভিতরে নিথর দাঁড়িয়ে আছে উজ্জ্বল সবুজ রঙের একটা ভক্সহল অ্যাস্ট্রা। আরও আছে একটা ট্রাইসাইকেল এবং একটা মোটরবাইক। জায়গা নিয়ে ওগুলোর মধ্যে মারামারি লেগে গেছে যেন।

সদর-দরজার প্রবেশপথটা খিলানাকৃতির; দরজাটা নকল-মধ্যযুগীয়, সেটাতে লাগানো আছে ফ্রস্টেড কাঁচের মোটা প্যানেল। অভিনব একটা ওয়েলকাম ম্যাট দেখতে পাচ্ছি দরজার সামনে; সেটাতে লেখা আছে: ‘কুকুর নয়, সেটার মালিক থেকে সাবধান!

হোথর্ন যখন চাপ দিল ডোরবেলে, স্টার ওয়ার্স-এর থিম সঙের শুরুর দিকের কয়েকটা লাইন শুনতে পেলাম। তবে আমার মনে হয় ওটার বদলে যদি চপিনের ফিউনারেল মার্চ শুনতে পেতাম, তা হলে মানানসই হতো বেশি। কারণ এই বাড়িতেই থাকে রবার্ট কর্নওয়ালিস।

যে-মহিলা দরজা খুলে দিল তার চেহারায় হাসিখুশি একটা ভাব আছে, কিন্তু একইঙ্গে মারমুখী ভাবও আছে। ব্যাপারটা যেন এ-রকম… গত একটা সপ্তাহ ধরে আমাদের আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিল সে। আমাদের দিকে কিছুটা এগিয়ে এল; ভঙ্গি দেখে মনে হলো, এখনই যেন বলবে, এসেছেন শেষপর্যন্ত? এত দেরি হলো যে?

তার বয়স প্রায় চল্লিশ; দেখলে মনে হয় মাঝবয়সের দিকে প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে চলেছে। চালচলনে ফুটে আছে সম্পূর্ণ বেপরোয়া একটা ভঙ্গি। ঢলঢলে আর বেখাপ্পা একটা জার্সি পরে আছে, সেটার সঙ্গে পরেছে বাজে ফিটিঙের জিন্স। সেটার একদিকের হাঁটুতে এমব্রয়ডারির সাহায্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ফুলের একটা নকশা। মাথায় কোঁকড়া চুল। অল্প যে-ক’টা গহনা দেখা যাচ্ছে গায়ে সেগুলো কেমন ছোট-ছোট আর মোটা-মোটা। ওজন বেশি। লন্ড্রিতে দেয়ার জন্য একগাদা কাপড় চেপে ধরেছে একদিকের বগলের নিচে। একহাতে দেখা যাচ্ছে একটা কর্ডলেস টেলিফোন। কিন্তু ওসব কাপড় অথবা ওই টেলিফোনের কোনো কিছুর প্রতিই তার কোনো খেয়াল আছে বলে মনে হয় না। ওসবের কারণে দরজাটা খুলতে কষ্ট হলো তার; কল্পনার চোখে দেখতে পেলাম, একটা হাঁটু উঁচু করে সেটাতে ঠেস দিয়ে কাপড়ের বোঝা সামাল দিল, একইসঙ্গে কান আর কাঁধের সাহায্যে চেপে ধরল টেলিফোনটা।

‘মিস্টার হোথর্ন?’ বলল সে, তাকিয়ে আছে আমার দিকে। মনোরম কণ্ঠ শুনলে উচ্চ-শিক্ষিত বলে মনে হয় তাকে।

‘না,’ বললাম আমি, ইশারায় দেখিয়ে দিলাম হোথর্নকে। ‘তিনি হোথর্ন।

‘আমি বারবারা। প্লিয ভিতরে আসুন। কিছু মনে করবেন না… আমাদের বাড়ির ভিতরটার অবস্থা বেশি ভালো না। রবার্ট অন্য একটা ঘরে আছে। শেষকৃত্যানুষ্ঠানে কী ঘটেছে, সেটা আইরিন বলেছে আমাদেরকে। শুনে মনে আঘাত পেয়েছি আমি। …আপনারা তো পুলিশে আছেন, তা-ই না?’

‘এই কেসে পুলিশকে সাহায্য করছি আমি,’ বলল হোথৰ্ন।

‘এদিক দিয়ে আসুন! এই যে, এদিকে একটা রোলার স্কেট পড়ে আছে, খেয়াল রাখবেন। বাচ্চাগুলোকে এতবার বলেছি এসব যাতে হলে ফেলে না-রাখে… কথা শুনতে চায় না ওরা।’ বগলের নিচে চেপে রাখা কাপড়ের গাদার উপর চোখ পড়ল বারবারার। ‘আমার অবস্থা দেখুন! আমি দুঃখিত। ডোরবেলটা যখন বাজল, তখন এসব মাত্র ধুতে দিচ্ছিলাম। আমার ব্যাপারে কী ভাবছেন আপনারা, কে জানে!’

রোলার স্কেটটা টপকালাম আমরা দু’জন, এগিয়ে চলেছি হলওয়ে ধরে। এখানে-সেখানে পড়ে আছে কোট, ওয়েলিংটন বুট আর বিভিন্ন সাইজের কিছু জুতো। একদিকে একটা চেয়ারের উপর রাখা আছে মোটরবাইকের একটা হেলমেট। দুটো বাচ্চা ছুটে বেড়াচ্ছে সারা ঘরে। তাদেরকে দেখতে পাচ্ছি না আমরা, কিন্তু তাদের উঁচু কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি… ছুটতে ছুটতে মনের আনন্দে চেঁচাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত পরই একদিকের একটা খোলা দরজা দিয়ে ছুটে বের হলো তারা… দুটো ছেলে, দু’জনেরই চুল ধূসর, বয়স পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে। আমাদের দিকে একবারমাত্র তাকাল, তারপরই ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল আরেকদিকে। এখনও চিৎকার করছে।

‘টবি আর সেবাস্টিয়ান,’ বললেন বারবারা। ‘আর কিছুক্ষণ পর গোসলে ঢুকবে ওরা দু’জন, তারপর যদি একটু শান্তি পাই আমি! আপনাদের বাসায় কি বাচ্চাকাচ্চা আছে? …মাঝেমধ্যে আমার কী মনে হয়, জানেন? মনে হয়, এই বাড়ি যেন কোনো একটা যুদ্ধক্ষেত্র!’

এদিক-ওদিক তাকালাম আমি। বাচ্চা দুটো সারা বাড়ি তছনছ করে ফেলেছে। রেডিয়েটরের উপর পড়ে আছে কাপড়, সব জায়গায় ছড়িয়েছিটিয়ে আছে বিভিন্ন রকমের খেলনা… ফুটবল, প্লাস্টিকের তলোয়ার, স্টাফ-করা পশুপাখি, টেনিসের পুরনো র‍্যাকেট, প্লেয়িং কার্ডস, লেগোর পিস। এসব এড়িয়ে নিজেদের চলাচলের জন্য জায়গা করে নেয়া আসলেই মুশকিল কাজ। তারপরও যখন হাজির হলাম লিভিংরুমে, পুরনো এই বাসা বেশ আরামদায়ক বলে মনে হলো আমার কাছে। ফায়ারপ্লেসের ধারে দেখা যাচ্ছে শুকিয়ে-আসা ফুল, মেঝেতে বিছানো আছে সী- গ্রাস কার্পেট। একধারে দেখা যাচ্ছে একটা পিয়ানো, তবে সেটা আর কাজ করে কি না সন্দেহ। গোলাকৃতির পেপার ল্যাম্পশেডগুলো দেখলে মনে হয় ওগুলো কখনোই সেকেলে হয়ে যাবে না। দেয়ালে দেয়ালে ঝুলছে বেশ কিছু পেইন্টিংস; বিমূর্ত চিত্রকলা ঠাঁই পেয়েছে ওগুলোতে, তবে সবগুলোই বর্ণিল। দেখলে মনে হয় সাধারণ কোনো ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে কেনা হয়েছে ওসব।

বারবারার পেছন পেছন তাদের কিচেনে যাচ্ছি, এমন সময় হোথর্ন বলল, ‘আপনার স্বামীর ব্যবসায় কি আপনিও কাজ করেন, মিসেস কর্নওয়ালিস?’

‘ঈশ্বর, না! আর আমাকে বারবারা বলে ডাকতে পারেন।’ একটা চেয়ারের উপর ধপ করে সব কাপড় নামিয়ে রাখল সে। ‘আমি একজন ফার্মাসিস্ট… তবে পার্ট-টাইম। ‘বুটস’-এর স্থানীয় একটা শাখায় কাজ করি। ওই কাজ যে খুব ভালো লাগে আমার, তা না, কিন্তু সংসারের খরচাপাতি জোগাতে গেলে কিছু-একটা করতে হয়।

কিচেনে হাজির হলাম আমরা। ঘরটা আলোকোজ্জ্বল, তবে এলোমেলো। একধারে একটা ব্রেকফাস্ট বার আর সাদা রঙের দেহাতি গড়নের একটা টেবিল আছে। সিঙ্কের উপর স্তূপ করে রাখা হয়েছে নোংরা জিনিসপত্র। সেগুলোর পাশেই আবার দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার কিছু তৈজস। কাজের সময় কোন্‌টা লাগবে না-লাগবে, সেটা কীভাবে নির্ধারণ করে বারবারা, ভেবে খানিকটা আশ্চর্য হলাম। রান্নাঘরে ফ্রেঞ্চ উইন্ডো আছে, একটা বাগানের দিকে মুখ করে আছে সেটা। আকারে সবুজ একটা আয়তক্ষেতের চেয়ে কিছু বড় হবে ওই বাগান, সেটার এককোনায় গজিয়ে আছে কিছু লতাগুল্ম, বেড়া দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছে সেগুলো। টবি আর সেবাস্টিয়ান কলোনি স্থাপন করেছে ওখানেও… একটা ট্র্যাম্পোলিন দেখতে পাচ্ছি, আরও দেখতে পাচ্ছি একটা ক্লাইম্বিং ফ্রেম। লনের বেশিরভাগ জায়গা শেষ করে দিয়েছে ওসব জিনিস।

টেবিলটার এককোনায় বসে আছে রবার্ট কর্নওয়ালিস। ব্রম্পটন চ্যাপেলে যে- স্যুট পরে ছিল, সেটাই পরে আছে, তবে টাই পরেনি। কিছু হিসাবপত্র দেখছে। একজন ফিউনারেল ডিরেক্টরকে তাঁর পার্লারের বাইরে এভাবে বসে থাকতে দেখে আশ্চর্য লাগল আমার।

‘এই যে, রবার্ট,’ বারবারা জানিয়ে দিল আমাদেরকে… যেন পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে তার স্বামীর সঙ্গে। তারপর তাকাল কর্নওয়ালিসের দিকে। তিরস্কার করার ঢঙে বলল, ‘তুমি এখনও ওসব নিয়ে বসে আছ? সাপার রান্না করতে হবে আমাদেরকে, বাচ্চাগুলোকে ঘুম পাড়াতে হবে। এদিকে পুলিশ এসে হাজির হয়েছে বাসায়।

‘শেষ করে ফেলেছি,’ হিসাবনিকাশের খাতাটা বন্ধ করল কর্নওয়ালিস। তাকাল আমাদের দিকে, ইশারায় দেখিয়ে দিল তার সামনের দুটো চেয়ার। ‘মিস্টার হোথর্ন, প্লিয বসুন।’

‘চা খাবেন আপনারা?’ জিজ্ঞেস করল বারবারা।

‘না, কিছু লাগবে না। ধন্যবাদ।’

‘কড়া কিছু দেবো? …রবার্ট, ফ্রিজের ভিতরে ওয়াইনের বোতলটা আছে না?’ মাথা নেড়ে মানা করে দিলাম আমি।

‘আমি একগ্লাস খাবো… যদি কিছু মনে না-করেন আপনারা। যত যা-ই হোক আজ উইকএন্ড। তোমার লাগবে, রবি?’

‘না, ধন্যবাদ।’

টেবিলের আরেকপ্রান্তে বসে পড়লাম আমি আর হোথর্ন।

‘শেষকৃত্যানুষ্ঠানের ব্যাপারে আমাকে জানিয়েছে আইরিন,’ শুরু করল কর্নওয়ালিস। ‘আমি যে কী পরিমাণ আতঙ্কিত হয়েছি, বলে বোঝাতে পারবো না আপনাদেরকে। আমার আগে আমার বাবা চালিয়েছেন আমাদের ওই প্রতিষ্ঠান, তাঁর আগে চালিয়েছেন আমার দাদা। আপনাদেরকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, ও- রকম কিছু ঘটেনি আগে কখনও।’

কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল হোথর্ন, কিন্তু কর্নওয়ালিস বলে চলল, ‘আমি যে তখন উপস্থিত থাকতে পারিনি সেখানে, সেজন্য দুঃখিত। আমার প্রতিষ্ঠান যেসব শেষকৃত্যের আয়োজন করে, সাধারণত সবগুলোতেই উপস্থিত থাকি। কিন্তু… আইরিন হয়তো বলেছে আপনাদেরকে… আমার ছেলের স্কুলে একটা নাটকের আয়োজন করা হয়েছিল…

‘সপ্তাহের পর সপ্তাহ পরিশ্রম করে ওই নাটকের ডায়ালগগুলো মুখস্ত করেছিল আমাদের ছেলেটা,’ বলল বারবারা। ‘প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে করেছে কাজটা খুব সিরিয়াসলি নিয়েছিল ব্যাপারটা।’ বড় একটা গ্লাস ওয়াইনে ভর্তি করে নিয়ে আমাদের সঙ্গে এসে বসল। ‘কাজেই ওই নাটক দেখতে যদি না-যেতাম আমরা, আমাদেরকে কখনোই ক্ষমা করত না সে। আসলে অভিনয়টা মিশে আছে ওর রক্তের সঙ্গে… সব সময় নাটক নিয়েই কথা বলে। এবং কাজও করে দারুণ! ‘

‘তারপরও ওই নাটক দেখতে যাওয়া উচিত হয়নি আমার,’ মাথা নাড়ল কর্নওয়ালিস। ‘তখনই কেমন যেন লাগছিল আমার কাছে… বার বার মনে হচ্ছিল, কিছু একটা গড়বড় হবে কোথাও না কোথাও।

‘কেন, মিস্টার কর্নওয়ালিস?’

জবাব দেয়ার আগে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল কর্নওয়ালিস। ‘মিসেস ক্যুপারের মৃত্যুর ব্যাপারে সব কিছুই আসলে অস্বাভাবিক। মিস্টার হোথর্ন, শুনলে হয়তো আশ্চর্য লাগবে আপনার, কিন্তু নৃশংস হত্যাকাণ্ড আমার কাছে নতুন কিছু না। দক্ষিণ লন্ডনে আমাদের আরেকটা শাখা আছে, এবং সেখানকার পুলিশ একাধিকবার খবর দিয়েছে আমাদেরকে… কাউকে খুন করা হয়েছে ছুরিকাঘাতের মাধ্যমে, কেউ আবার শিকার হয়েছে গ্যাং ভায়োলেন্সের। কিন্তু মিসেস ক্যুপারের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। যেদিন নিজের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করে গেলেন তিনি… কে জানত, সেদিনই সেটা দরকার হয়ে পড়বে তাঁর। যা-হোক, আইরিনকে থাকতে বলেছিলাম মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে। জানতাম, পুলিশ যাবে সেখানে, সাংবাদিকরা যাবে। আর যাবে ড্যামিয়েন ক্যুপার। আসলে… আমি ঠিক ভরসা করতে পারিনি আলফ্রেডের উপর… সে হয়তো একা হাতে সব কিছু সামলাতে পারত না। তারপরও… আমার থাকা উচিত ছিল সেখানে।’

‘ড্যামিয়েন ক্যুপারের সঙ্গে কথা বলার দরকারও ছিল না তোমার,’ বললেন বারবারা। ক্রিস-এর একটা বোল আছে টেবিলের উপর, সেটা টেনে নিল নিজের দিকে, একমুঠো ক্রিস্স নিল। বাগানে গিয়ে হাজির হয়েছে টবি আর সেবাস্টিয়ান, সমানে লাফাচ্ছে ট্র্যাম্পোলিনের উপর, উত্তেজিত ভঙ্গিতে হাসছে। ওদের সেই লাফালাফি আর হাসির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি আমরা। ‘ড্যামিয়েন ক্যুপার তোমার প্রিয় অভিনেতাও।’

‘ঠিক।

‘যত জায়গায় যেসব অভিনয় করেছে সে, সব দেখেছি আমরা।’

‘আপনাদেরকে দেয়ার মতো একটা খবর আছে আমার কাছে,’ বলল হোথৰ্ন। ‘এবং সেটা শুনলে হয়তো বিস্মিত হবেন আপনারা।’ হাত বাড়িয়ে একটা ক্রিস তুলে নিল সে; এমনভাবে ধরে আছে সেটা, যেন ওটা কোনো একটা অপরাধের প্রমাণ। ‘ড্যামিয়েন ক্যুপারকেও খুন করা হয়েছে।’

‘কী?’ হোথর্নের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন কর্নওয়ালিস।

‘আজ বিকেলে খুন করা হয়েছে তাকে। তার মায়ের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের বড়জোর এক কি দেড় ঘণ্টা পর।’

‘কী বলছেন এসব? এটা অসম্ভব!’ কর্নওয়ালিসকে দেখে মনে হচ্ছে, বড় রকমের মানসিক-ধাক্কা খেয়েছে।

আমি ভেবেছিলাম, ড্যামিয়েন ক্যুপারের খুন হওয়ার খবরটা ইতোমধ্যে প্রচারিত হয়েছে টিভিতে, অথবা ছড়িয়ে গেছে ইন্টারনেটের বদৌলতে। কিন্তু মিস্টার ও মিসেস কর্নওয়ালিস বোধহয় তাদের বাচ্চাদের নিয়ে এত ব্যস্ত ছিল যে, ওই খবর দেখার বা শোনার মতো সময় পায়নি।

‘কীভাবে খুন করা হয়েছে ড্যামিয়েনকে?’ জানতে চাইল বারবারা। তাকে দেখেও মনে হচ্ছে, মানসিক ধাক্কা খেয়েছে।

‘ছুরিকাঘাত। ব্রিকলেনে যে-ফ্ল্যাট আছে তার, সেখানেই করা হয়েছে খুনটা।’

‘কে খুন করেছে তাকে, জানেন?’

‘এখনও না। …আশ্চর্য লাগছে, ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টর মিডোস এখনও যোগাযোগ করেননি আপনাদের সঙ্গে।’

‘আমরা কিছু শুনিনি।’ একবার হোথর্নের দিকে, পরেরবার আমার দিকে তাকাচ্ছে কর্নওয়ালিস… কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজছে বোধহয়। ‘শেষকৃত্যানুষ্ঠানে কী ঘটল… দুটো ঘটনার মধ্যে কি কোনো যোগসূত্র আছে? মানে… আমার মনে হয় না-থেকে পারেই না! আইরিন যখন ঘটনাটা বলল আমাকে, আমি তখন ভাবলাম, পুরো ব্যাপারটা মানসিকভাবে-অসুস্থ কারও তামাশা ছাড়া আর কিছু না…

‘কেউ একজন তার মনের ঝাল মিটিয়েছে ড্যামিয়েনের উপর,’ হোথর্নকে বলল বারবারা। ‘সেটাই বলতে চাইছেন আপনি, তা-ই না?’

‘আপাতদৃষ্টিতে আর কোনো ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে। তবে… পুরো ব্যাপারটা আমার অভিজ্ঞতার বাইরে… মানে, এ-রকম কিছু দেখিনি আগে কখনও।’ ক্রিসটা মুখে দিতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল হোথর্ন, কী যেন ভাবল কিছুক্ষণ। তারপর ওটা রেখে দিল বোলে। ‘কেউ একজন একটা এমপিথ্রি রেকর্ডিংযুক্ত অ্যালার্ম ক্লক রেখে দিল কফিনের ভিতরে। সাড়ে এগারোটার সময় বাজতে শুরু করল ওই ঘড়ি… চালু হয়ে গেল একটা নার্সারি রাইম। কাজেই যদি বাজি ধরি কেউ একজন ইচ্ছাকৃতভাবে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করেছে কাজটা, তা হলে মনে হয় না ভুল হবে। আমি এখন যা জানতে চাই তা হলো, ওই ঘড়ি কীভাবে গেল মিসেস ক্যুপারের কফিনের ভিতরে।’

‘কোনো ধারণা নেই আমার।

‘একটু ভেবে বলছেন না কেন?’ দেখে মনে হচ্ছে যারপরনাই বিরক্ত হয়েছে হোথর্ন। বিরক্ত হওয়ারই কথা। সারা বাড়ি অগোছালো, বাগানে সমানে চিৎকার করছে বাচ্চা দুটো… সেই তখন থেকে লাফিয়েই চলেছে, এদিকে কুড়মুড় শব্দে ক্রিস চিবুচ্ছে বারবারা… উইলসডেন গ্রীন, মানে এই বাসার সব কিছু বোধহয় স্নায়ু ধ্বংস করে দিচ্ছে হোথর্নের।

এমন এক দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকাল কর্নওয়ালিস যে, দেখে মনে হলো, সে বোধহয় সাহায্য প্রার্থনা করছে ওই মহিলার কাছে। তারপর তাকাল হোথর্নের দিকে। ‘আপনাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, আমার অধীনে কাজ করে, এমন কেউ ওই ঘড়ি রাখেনি মিসেস ক্যুপারের কফিনের ভিতরে। কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্সে যে বা যারাই আছে, তারা কম করে হলেও পাঁচ বছর ধরে কাজ করছে। তাদের বেশিরভাগই আমাদের পরিবারেরই সদস্য- কাছের বা দূরের আত্মীয়। আমি নিশ্চিত কথাটা আপনাকে আগেও বলেছে আইরিন। যা-হোক, হ্যাঁমারস্মিথে আমাদের একটা কেন্দ্রীয় মর্গ আছে, হাসপাতাল থেকে সেখানে সরাসরি নিয়ে আসা হয়েছিল মিসেস ক্যুপারের লাশ। তাঁকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করি আমরা, তাঁর চোখ দুটো বন্ধ করে দিই। মিসেস ক্যুপার চাননি, রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর লাশের পচন রোধ করা হোক। লাশটা দেখার কথা বলা হয়নি কাউকে; যদি হতোও, কোনো ভুল করার সুযোগ ছিল না।

‘নিজের জন্য প্রাকৃতিক উইলো উইভ কাঠের কফিন বেছে নিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার। সে-রকম একটা কফিনের ভিতরই রাখা হয়েছিল তাঁর লাশ। কফিনের ভিতরে কখন রাখা হয়েছিল তাঁকে সেটাও বলে দিই… সকাল আনুমানিক সাড়ে ন’টার দিকে। আমি অবশ্য তখন ছিলাম না সেখানে। তবে যে-চারজন লোক কফিন বহন করে নিয়ে গিয়েছিল গির্জায়, তারা ছিল। যা-হোক, সাড়ে ন’টার পর ওই চারজন কফিনটা বয়ে নিয়ে গিয়ে রাখে শবযানে। উঠানের মতো ব্যক্তিগত একটুখানি জায়গা আছে আমাদের, সেখানে ইলেকট্রিক গেটও আছে। কাজেই রাস্তা থেকে চাইলেই কেউ হুট করে ঢুকে পড়তে পারবে না আমাদের সেই কেন্দ্রীয় মর্গে। সেখান থেকে পরে কফিনটা নিয়ে যাওয়া হয় ব্রম্পটন সেমেট্রিতে।’

‘তার মানে মর্গ থেকে কবরস্থানে যাওয়ার সারাটা পথে কেউ-না-কেউ সার্বক্ষণিকভাবে চোখ রেখেছিল মিসেস ক্যুপারের কফিনের উপর?

‘হ্যাঁ। তবে… যতদূর অনুমান করতে পারি, তিন কি বেশি হলে চার মিনিটের জন্য কফিনটা আমাদের সবার চোখের আড়ালে ছিল। কখন ঘটেছিল ঘটনাটা তা-ও বলে দিই… গির্জার পেছনের কার পার্কে যখন হাজির হয়েছিল কফিনটা, তখন। যা- হোক, এ-রকম কোনো ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে আর কখনও না-ঘটে, খেয়াল রাখবো।’

‘তার মানে ওই তিন কি চার মিনিটের মধ্যেই কেউ একজন অ্যালার্ম ক্লকটা ঢুকিয়ে দিয়েছে কফিনের ভিতরে?’

‘হ্যাঁ… তা-ই মনে হয় আমার।’

‘কফিনের ঢাকনা খুলে ফেলাটা কি সহজ কোনো কাজ? মানে… কেউ চাইলেই করতে পারবে সেটা?’

জবাব দেয়ার আগে কিছুক্ষণ ভাবল কর্নওয়ালিস। ‘হ্যাঁ… কফিনের ঢাকনা খুলে ফেলাটা মোটেও কঠিন কিছু না… বড়জোর কয়েক মুহূর্ত লাগবে যে-কারও। কফিনটা যদি সনাতনী কিছু হতো… অর্থাৎ নিরেট কাঠ দিয়ে বানানো থাকত, তা হলে ঢাকনাটা স্ক্রু দিয়ে আটকানো অবস্থায় থাকত কফিনের মূল কাঠামোর সঙ্গে। কিন্তু উইলো কফিনের ক্ষেত্রে ঢাকনা সাধারণত শুধু দুটো স্ট্র্যাপ দিয়ে বাঁধা অবস্থায় থাকে।’

ওয়াইন খাওয়া শেষ বারবারার। আমাদেরকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনারা কি আসলেই ড্রিঙ্ক নেবেন না?’

‘না, ধন্যবাদ,’ বললাম আমি।

বারবারা বলল, ‘আমি আরেক গ্লাস খাবো। খুন আর মৃত্যু নিয়ে এত কথা শুনতে কেমন যেন লাগছে। রবার্টের কাজ নিয়ে আমরা সাধারণত বাসায় কোনো আলোচনা করি না। বাচ্চারা এসব ঘৃণা করে। অ্যান্ড্রিউ… মানে আমাদের সবচেয়ে বড় ছেলের স্কুলে একবার একটা আলোচনা হলো… কার বাবা কী করে সেসব নিয়ে। সে তখন বানিয়ে বানিয়ে সারা ক্লাসের সামনে বলে দিল, ওর বাবা একজন অ্যাকাউন্টেন্ট।’ হেসে উঠল সে। ‘অথচ অ্যাকাউন্টেন্সির কিছুই জানে না রবার্ট।’ টেবিল ছেড়ে উঠে এগিয়ে গেল ফ্রিজের দিকে, নিজের জন্য ঢেলে নিল আরেক গ্লাস ওয়াইন।

ফ্রিজের দরজাটা যখন লাগিয়ে দিচ্ছে, তখন আরেকটা ছেলে ঢুকল কিচেনে। তার পরনে ট্র্যাকস্যুটের ট্রাউজার আর একটা টি-শার্ট। টবি আর সেবাস্টিয়ানের চেয়ে লম্বা। চুলের রঙ গাঢ়। সে-চুলের বোঝা কেমন অমার্জিত ভঙ্গিতে ঝুলে আছে চেহারার উপর। ‘টবি আর সেব বাগানে কেন?’ জিজ্ঞেস করল। পরমুহূর্তেই দেখতে পেল আমাদেরকে। ‘আপনারা কারা?

‘এই যে… এর নামই অ্যান্ড্রিউ,’ পরিচয় করিয়ে দিল বারবারা। তাকাল বড় ছেলের দিকে। ‘এঁরা পুলিশের লোক।

‘পুলিশের লোক? কেন? কী হয়েছে?’

‘তোমার চিন্তা করার মতো কিছু হয়নি, অ্যান্ড্রিউ। হোমওয়ার্ক শেষ করেছ?’

মাথা ঝাঁকাল ছেলেটা।

‘তা হলে ইচ্ছা করলে টেলিভিশন দেখতে পারো।’ ছেলের উদ্দেশে হাসল বারবারা। ‘স্কুলে যে-নাটকে অভিনয় করেছ তুমি আজ, সেটার ব্যাপারে এই দুই ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছিলাম আমরা। মিস্টার পিনোকিও!’

‘আমি যখন বড় হবো,’ বলছে অ্যান্ড্রিউ, ‘তখন একজন অভিনেতা হবো।’

‘ওসব নিয়ে এখনই কথা বলার দরকার নেই, অ্যান্ড্রিউ,’ বলে উঠল কর্নওয়ালিস। ‘আমাদেরকে যদি সাহায্য করতে চাও, বাগানে গিয়ে তোমার ভাইদের বলো, ঘুমাতে যাওয়ার সময় হয়েছে।

বাগানে এতক্ষণে ক্লাইম্বিং ফ্রেমের কাছে গিয়ে হাজির হয়েছে টবি আর সেবাস্টিয়ান। একে অপরের উদ্দেশে চিৎকার করছে সমানে। অতিমাত্রায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে দু’জনই।

মাথা ঝাঁকাল অ্যান্ড্রিউ। যা করতে বলা হয়েছে তাকে, সেটা করার জন্য রওয়ানা হলো বাগানের উদ্দেশে।

‘আপনাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারি?’ কর্নওয়ালিসের উদ্দেশে বললাম আমি। জানি পরে এই ব্যাপারটা নিয়ে আমার সঙ্গে রাগ করতে পারে হোথর্ন, তারপরও কৌতূহল বোধ করছি। ‘এই কেসের সঙ্গে আদৌ কোনো যোগসূত্র নেই আমার প্রশ্নটার, তারপরও জানতে ইচ্ছা করছে, জীবিকার জন্য এই কাজ বেছে নিলেন কেন।

‘মানে আন্ডারটেকার হলাম কেন, সেটাই তো জানতে চাইছেন?’ দেখে মনে হলো না, আমার প্রশ্ন শুনে বিব্রত হয়েছে কর্নওয়ালিস। ‘আসলে এই কাজ আমি বেছে নিয়েছি বলার চেয়ে, বলা ভালো, এই কাজই বেছে নিয়েছে আমাকে। দক্ষিণ কেনসিংটনে আমাদের যে-অফিস আছে, সেটার দরজায় একটা সাইনবোর্ড লাগানো আছে… দেখেছেন বোধহয়। এটা আমাদের পারিবারিক ব্যবসা। আমার মনে হয় এই ব্যবসা চালু করেছিলেন আমার দাদার দাদার দাদা, তারপর থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে এটা চলে আসছে আমাদের মধ্যে। একদিন হয়তো আমার তিন ছেলের কোনো একজন আমার থেকে বুঝে নেবে ব্যবসার দায়িত্ব।’

বাইরে অন্ধকার ঘনাচ্ছে। টবি আর সেবাস্টিয়ান তাদের বড় ভাইয়ের সঙ্গে তর্কাতর্কি করছে… বাসায় ফিরতে চাইছে না তারা, ওদিকে অ্যান্ড্রিউ চেষ্টা করছে ওদেরকে ফিরিয়ে আনতে।

কর্নওয়ালিস বলল, ‘কিছু মনে করবেন না… আর কোনো প্রশ্ন যদি জিজ্ঞেস না- করার থাকে আপনাদের, তা হলে এখন বরং আসুন আপনারা। টবি আর সেবাস্টিয়ানকে ঘুম পাড়াতে হবে।’

উঠে দাঁড়াল হোথর্ন। ‘খুব উপকার করলেন আমাদের।’

কথাটা আদৌ সত্যি কি না, সন্দেহ আছে আমার।

বারবারা বলল, ‘আপনারা যদি কিছু জানতে পারেন, তা হলে আমাদেরকে জানাবেন? বিশ্বাস করতে এখনও কষ্ট হচ্ছে আমার, খুন করা হয়েছে ড্যামিয়েন ক্যুপারকে। প্রথমে তার মা, তারপর সে। এরপর কে, সেটাই ভাবছি!’

উঠে বাগানে চলে গেল… ছেলেদেরকে ফিরিয়ে আনবে।

আমাদেরকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল কর্নওয়ালিস।

আমরা যখন শেষবিকেলের ধূসর আলোয় শানবাঁধানো ফুটপাতে বেরিয়ে এসেছি, তখন কর্নওয়ালিস বলল, ‘আপনাদেরকে আরেকটা কথা বলা উচিত বলে মনে করছি। অবশ্য… কথাটা প্রাসঙ্গিক হবে কি না বুঝতে পারছি না… ‘

‘বলুন,’ বলল হোথর্ন।

‘দু’দিন আগে একটা টেলিফোন কল এসেছিল আমার। কেউ একজন ফোন করে জানতে চেয়েছিল, কবে এবং কোথায় অনুষ্ঠিত হবে মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠান। ওপ্রান্তের কণ্ঠটা ছিল একজন পুরুষের। লোকটা বলেছে, সে নাকি মিসেস ক্যুপারের বন্ধু এবং তাঁর শেষকৃত্যে যোগ দিতে চায়। আমি তখন তার নাম জানতে চাইলাম, কিন্তু সেটা বলতে অস্বীকৃতি জানাল সে। সত্যি বলতে কী… লোকটার আচরণ তখন… কী বলবো… সন্দেহজনক লেগেছিল আমার কাছে। তাকে উন্মত্ত বা বিকৃতমস্তিষ্ক বলছি না, কিন্তু তার কণ্ঠ শুনে আমার মনে হয়েছিল, প্রচণ্ড কোনো মানসিক চাপের মধ্যে আছে। নার্ভাস বলে মনে হচ্ছিল তাকে। এমনকী, কোত্থেকে ফোন করেছিল সে, সেটাও বলেনি।

‘আপনি যে ওই শেষকৃত্যের তদারকিতে আছেন, সেটা ওই লোক জানল কী করে?’

‘কথাটা আমিও ভেবেছি, মিস্টার হোথর্ন। আমার কী মনে হয়, জানেন? আমার মনে হয়, ওই লোক আমাকে ফোন করার আগে পশ্চিম লন্ডনের সমস্ত আন্ডারটেকারকে ফোন করেছে এবং তাদের সবার কাছে একই কথা জানতে চেয়েছে। আবার এমনও হতে পারে, আমাদের প্রতিষ্ঠান যেহেতু অন্য সবার চেয়ে বড় এবং একনামে-পরিচিত, সেহেতু আমাদেরকে দিয়েই শুরু করেছে খোঁজখবর। যা-হোক, আমি তখন খুব বেশিকিছু চিন্তা করিনি এই ব্যাপারে। ওই লোক যা-যা জানতে চেয়েছিল, বিস্তারিত বলে দিয়েছি। কিন্তু আজ যখন আইরিন বলল কী ভয়ানক ঘটনা ঘটে গেছে মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে, তখন মনে পড়ে গিয়েছিল রহস্যময় সেই লোকের কথা।

‘লোকটা যে-নম্বর থেকে ফোন করেছিল আপনাকে, সেটা বোধহয় নেই আপনার কাছে, না?’

‘আছে। আমাদের কাছে যতগুলো ইনকামিং কল আসে, সবগুলোর রেকর্ড রাখি আমরা। …একটা মোবাইল নম্বর থেকে আমাকে ফোন করেছিল লোকটা। নম্বরটা দেখা গিয়েছিল আমাদের সিস্টেমে।’ পকেট থেকে একটা ভাঁজকরা কাগজ বের করে হোথর্নকে দিল কর্নওয়ালিস। ‘সত্যি বলতে কী, এটা আপনাকে দেবো কি না, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলাম। আমি আসলে কাউকে কোনো ঝামেলায় ফেলতে চাই না!’

‘ব্যাপারটা দেখবো, মিস্টার কর্নওয়ালিস।’

‘হয়তো এটা কিছুই না… সময়ের অপচয় আর কী।’

‘সময় অনেক আছে আমার হাতে।’

বাসার ভিতরে ঢুকে পড়ল কর্নওয়ালিস, দরজা লাগিয়ে দিল।

ভাঁজ-করা কাগজটা খুলল হোথর্ন, দেখল কী লেখা আছে সেটাতে। তারপর হেসে ফেলল। ‘এই নম্বর আমার পরিচিত।

‘কীভাবে?’

‘জুডিথ গডউইন একটা নম্বর দিয়েছিলেন আমাকে… সে-নম্বরের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে এটা। এই নম্বর তাঁর স্বামী অ্যালান গডউইনের।’

কাগজের টুকরোটা আগের মতো ভাঁজ করে পকেটে ঢুকিয়ে রাখল হোথর্ন। এখনও হাসছে।

ভাবখানা এমন, এ-রকম কিছু-একটা পেয়ে গেছে, যা আশা করছিল অনেকদিন ধরে।

১৫. হিলডার সঙ্গে লাঞ্চ

‘তুমি দেখছি নতুন একটা জুতো কিনেছ,’ পরদিন সোমবার বাসা থেকে বের হতে যাবো, এমন সময় বলল আমার স্ত্রী।

‘না, কিনিনি,’ বললাম আমি। তাকালাম জুতো জোড়ার দিকে। হোথর্ন আমাকে যে-জুতো জোড়া দিয়েছিল, সেগুলোই পরে আছি। এই জুতো দুটোর মালিক আসলে ড্যামিয়েন ক্যুপার।

জুতো জোড়া আসলে বেশ আরামদায়ক, ইটালিয়ান। কিছু না-ভেবেই এগুলো পরে ফেলেছি। ‘ওহ্, এগুলো!’ বিড়বিড় করে বললাম।

আমার স্ত্রী একজন টেলিভিশন প্রডিউসার। ওর খুঁটিনাটি দেখার ক্ষমতা সাংঘাতিক। ইচ্ছা করলেই একজন গোয়েন্দা অথবা গুপ্তচর হতে পারত। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি, জবুথবু হয়ে গেছি। হোথর্নের ব্যাপারে এখনও কিছু বলিনি আমার স্ত্রীকে।

বললাম, ‘এই তো… গত কয়েকদিন হলো পরছি এগুলো। তবে… সব সময় পরি না।

স্ত্রীর সঙ্গে কখনও মিথ্যা কথা বলি না আমি, সে-ও আমার সঙ্গে করে না ওই কাজ। এইমাত্র যা বললাম, সেটা, ব্যাপক অর্থে, সত্যি।

‘তুমি যাচ্ছ কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল সে।

‘হিলডার সঙ্গে লাঞ্চ খেতে।’

হিলডা স্টার্ক আমার সাহিত্য-সংক্রান্ত এজেন্ট। তাকেও হোথর্নের ব্যাপারে কিছু বলিনি।

আর দাঁড়িয়ে থাকলাম না আমার স্ত্রীর সামনে, যত জলদি সম্ভব কেটে পড়লাম।

একজন লেখক এবং তার এজেন্টের মাঝখানের সম্পর্কটা সব সময়ই অদ্ভুত লাগে আমার। এই সম্পর্ক ঠিক বুঝি কি না, সে-ব্যাপারে আমি নিজেও নিশ্চিত না। এজেন্টদেরকে দরকার লেখকদের। এজেন্টরা লেখকদের অনেক কাজ করে দেয়, বিনিময়ে লেখকরা যা আয় করে তার দশ শতাংশ গ্রহণ করে কমিশন হিসেবে। ব্যাপারটা খুবই যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয় আমার। কোনো লেখকের বই যদি খুব বেশি বিক্রি হতে শুরু করে, তা হলে অবশ্য কমিশনের ব্যাপারটা অন্যরকম।

যা-হোক, লাঞ্চের পর ওয়েইটার যখন প্লেট-ডিশ ইত্যাদি পরিষ্কার করছে, তখন হিলডা বলল, ‘আমার একজন ক্লায়েন্টকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, জানেন কি না জানি না।’

‘কে লোকটা?’

‘রেমন্ড ক্লুন্স।

‘মঞ্চনাটকের প্রযোজক?’

মাথা ঝাঁকাল হিলডা। ‘সঙ্গীতধর্মী একটা নাটকের জন্য গত বছর কিছু টাকা জোগাড় করেছিলেন তিনি। নাটকটার নাম ছিল ‘মরোক্কান নাইটস’। আশা করা হয়েছিল বেশ ভালো ব্যবসা করবে ওই নাটক, কিন্তু বাস্তবে ঘটেনি তেমনটা। যারা টাকা দিয়েছিল নাটকটার জন্য, তারা অভিযোগ করেছে, তাদেরকে নাকি ভুল পথে পরিচালিত করা হয়েছে। পুলিশ তাই জালিয়াতি তদন্তের কাজে নেমেছে মিস্টার ক্রুন্সের বিরুদ্ধে।’

তার মানে, মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পর ব্রুনো ওয়াং যে-গল্প শুনিয়েছিল আমাদেরকে, সেটা সত্যি।

আশ্চর্য হলাম। হিলডা যে মঞ্চনাটকের-প্রযোজকদেরও কাজ করে, জানতাম না। সে-ও কি টাকা বিনিয়োগ করেছিল বিশেষ সেই নাটকের পেছনে? কে জানে! কথাটা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হলো, কিন্তু সাহসে কুলাল না। হিলডাকে যতটা পছন্দ করি, ঠিক ততটা ভয়ও পাই।

যা-হোক, কুন্সের প্রসঙ্গ যখন এসেই গেছে, তার মানে কথা বলার সুযোগ পেয়ে গেছি; এবং সে-সুযোগ কাজে লাগিয়ে বলে ফেললাম, কুন্সের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার সম্প্রতি… ডায়ানা ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে। চলে এল হোথর্নের প্রসঙ্গ, জানিয়ে দিলাম ওর হয়ে একটা বই লিখে দিতে রাজি হয়েছি।

ভেবেছিলাম রেগে যাবে হিলডা, কিন্তু সে-রকম কিছু ঘটল না। ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কখনোই রাগারাগি করে না সে। বলল, ‘আপনার কথাটা বুঝলাম না আসলে। বলেছিলেন বাচ্চাদের বই লেখার কাজ থেকে সরে আসবেন আস্তে আস্তে, এবং সে- ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কথাও হয়েছিল আমার। নিজেকে বড়দের বই লেখার কাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন…’

‘এ-বই বড়দের জন্যই! ‘

‘ট্রু ক্রাইম অথবা সত্যিকারের অপরাধ বলতে যা বোঝায়, এ-বই হচ্ছে সে- রকম। কিন্তু আপনি কোনো ট্রু ক্রাইম রাইটার না। তা ছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, সত্যিকারের অপরাধের কাহিনি নিয়ে যেসব বই লেখা হয়, সেসবের কাটতি নেই বললেই চলে।’ হাত বাড়িয়ে নিজের ওয়াইনের গ্লাস তুলে নিল হিলডা। ‘আমার মনে হয় না আপনার আইডিয়াটা ভালো। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আপনার হাউস অভ সিল্ক বইটা প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। এবং আপনি জানেন ওই বই কতখানি ভালো লেগেছে আমার। বইটার সিকুয়েল লিখবেন আপনি… এ-রকম একটা ব্যাপারে একমতও হয়েছিলাম আমরা।’

‘লিখবো তো!’

সেক্ষেত্রে ওই সিকুয়েল নিয়েই কাজ করা উচিত ছিল আপনার। লোকে কিন্তু হাউস অভ সিল্কের পরবর্তী কাহিনিই পড়তে চাইবে আপনার লেখায়। কেউ কেন ওই লোকের… কী যেন নাম বললেন তাঁর?’

‘হোথর্ন। ড্যানিয়েল হোথর্ন। তবে নিজের নামের প্রথম অংশটা ব্যবহার করতে চায় না সে।

‘সে একজন গোয়েন্দা?’

‘এককালে তা-ই ছিল।’

‘তার মানে এখন বেকার। অদ্ভুত এক লোকের পেছনে ঘুরছেন… বেকার একজন গোয়েন্দা। ও-রকম কোনো নামই দিয়েছেন নাকি বইটার? …ওই বইয়ের কোনো নাম ঠিক করেছেন?’

‘না।’

চটে উঠল হিলডা, ওয়াইনের গ্লাসটা সশব্দে নামিয়ে রাখল টেবিলের উপর। কেন এই কাজে রাজি হলেন, বুঝতে পারছি না। ওই লোককে কি বিশেষ ভালো লেগে গেছে আপনার?’

‘না।’

‘তা হলে?’

‘লোকটা খুবই চালাক।’

‘তা-ই? এখনও কিন্তু রহস্যের সমাধান করতে পারেনি সে।’

আমাদের মেইন কোর্স নিয়ে ওয়েইটার হাজির হলো এমন সময়। গত কয়েকদিনে যেসব ইন্টারভিউ নিয়েছি আমি আর হোথর্ন, সেগুলোর কিছু কিছু বললাম হিলডাকে।

আমার কথা শেষ হলে সে বলল, ‘এই হোথর্ন লোকটা আসলে কে? ঠিক কোন্ কাজে মজা পায়? মল্টের হুইস্কি খায় নাকি? ক্লাসিক কোনো গাড়ি চালায়? জ্যায বা অপেরা পছন্দ করে? কোনো কুকুর আছে তার?’

‘হোথর্নের ব্যাপারে আসলে তেমন কিছু জানি না আমি। তবে এটা জানি, বিয়ে করেছিল এককালে, এবং এগারো বছর বয়সী একটা ছেলে আছে তার। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সিঁড়ি থেকে কাউকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল খুব সম্ভব। সমকামী পুরুষদের পছন্দ করে না মোটেও… কেন করে না, জানি না।’

‘নিজেও সমকামী নাকি?’

‘না। তবে সে নিজের ব্যাপারে কিছু বলতে ঘৃণা করে। আসলে আমাকে ওর কাছে ঘেঁষতে দিতে চায় না।’

‘তা হলে তার ব্যাপারে লিখবেন কীভাবে?’

‘যদি সে রহস্যটার সমাধান করতে পারে…’

‘কোনো কোনো কেস সমাধান করতে বছরের পর বছর লেগে যায়। আপনি কি আপনার জীবনের বাকিটা সময় ওই লোকের পেছন পেছন লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকবেন? যা-হোক, ওই বই যদি লেখেন শেষপর্যন্ত, পাত্র-পাত্রীদের নাম বদলে দিতে হবে। লোকজনের বাসায় হুটহাট করে ঢুকে পড়ে তাদেরকে নিয়ে বই লিখতে পারেন না আপনি!’ জ্বলন্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে হিলডা। ‘আর… আমাকে নিয়েও যদি কিছু লেখেন ওই বইয়ে, নামটা বদলে দেবেন আমার। আমি অবশ্য চাই না আমাকে নিয়ে কিছু লেখা হোক জঘন্য ওই বইয়ে।’

‘দেখুন, কেসটা কিন্তু ইন্টারেস্টিং,’ বললাম আমি, জোর খাটানোর চেষ্টা করছি আসলে। ‘এবং আমার মনে হয় হোথর্ন একজন ইন্টারেস্টিং মানুষ। দরকার হলে ওর ব্যাপারে আরও কিছু জানার চেষ্টা করবো আমি।’

‘কীভাবে?’

একজন ডিটেক্টিভের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে আমার। তাঁকে দিয়েই শুরু করবো।’ চার্লি মিডোসের কথা ভাবছি। তাকে যদি একটা ড্রিঙ্ক কিনে দিই, তা হলে হয়তো আমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়ে যাবে।

‘টাকা-পয়সার ব্যাপারে মিস্টার হোথর্নের সঙ্গে কথা হয়েছে আপনার?’ জানতে চাইল হিলডা।

ঠিক এই প্রশ্নেরই ভয় পাচ্ছিলাম। ‘আধাআধির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে…’

‘কী?’ আরেকটু হলে হাত থেকে কাঁটাচামচ ফেলে দিয়েছিল হিলডা। ‘আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? চল্লিশটা উপন্যাস লিখেছেন আজপর্যন্ত। আপনি একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক। আর মিস্টার হোথর্ন একজন বেকার গোয়েন্দা। তাঁর উচিত আপনাকে পারিশ্রমিক হিসেবে টাকা দেয়া, অথচ…। আর বখরার কথা যদি বলেন, তাঁকে তো বিশ শতাংশের বেশি দেয়ার কোনো যুক্তিই দেখি না!’

‘কিন্তু গল্পটা তো ওর!

‘যারই হোক, সে-গল্প লিখছেন আপনি।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল হিলডা। ‘আপনি কি আসলেই এই কাজ চালিয়ে যেতে চান?’

‘পিছিয়ে আসার ব্যাপারে দেরি হয়ে গেছে। যা-হোক, সত্যি বলতে কী, আমি এখনও নিশ্চিত না, কাজটা আসলেই করতে চাই কি না। …ড্যামিয়েন ক্যুপারের ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখেছি নিজের চোখে।’ নিজের স্টেইকের দিকে তাকালাম, নামিয়ে রাখলাম কাঁটাচামচ। ‘আসল কথা হচ্ছে, মিসেস ক্যুপার আর তাঁর ছেলেকে খুন করেছে কে, সেটা জানতে চাই আমি।’

‘ঠিক আছে,’ এমন এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল হিলডা যে, দেখে মনে হলো, যা করতে চলেছি আমি তা কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে না, কিন্তু ওই ব্যাপারে কোনো দোষ নেই তার। ‘মিস্টার হোথর্নের নম্বরটা দিন আমাকে। তার সঙ্গে কথা বলবো। একইসঙ্গে আপনাকে সাবধান করে দিয়ে বলতে চাই, আরও দুটো বই লেখার ব্যাপারে আপনি কিন্তু চুক্তিবদ্ধ। এবং সে-বই দুটোর কমপক্ষে একটা উনিশ শতকের উপর ভিত্তি করে লেখার কথা আছে। আর… মিস্টার হোথর্নকে নিয়ে যে-বই লিখতে চলেছেন, আপনার প্রকাশকরা সেটার ব্যাপারে আদৌ আগ্রহী হবেন কি না, আমি নিশ্চিত না।’

লাঞ্চের পর ভিক্টোরিয়ার উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। নিজেকে একজন স্কুলপালানো বালকের মতো মনে হচ্ছে। কেন হঠাৎ করেই সব কিছু গোপন করার চেষ্টা করছি সবার কাছ থেকে? হোথর্নের ব্যাপারে কিছুই বলিনি আমার স্ত্রীকে। আর এখন… চুপিসারে রওয়ানা হয়েছি হোথর্নের সঙ্গে আবারও দেখা করার উদ্দেশ্যে, অথচ হিলডাকেও কিছু বলিনি এই ব্যাপারে। কেঁচোর মতো গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে আমার জীবনে ঢুকে পড়ছে হোথর্ন, এবং এমন এক পদ্ধতিতে কাজটা করছে, যা অবশ্যই অমঙ্গলজনক। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার, ওর সঙ্গে আবার দেখা করার জন্য মুখিয়ে আছি– এই কেসে কোথাকার জল গড়িয়ে কোনদিকে যাচ্ছে তা জানার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে আছি। কিছুক্ষণ আগে সত্যি কথাটাই বলেছি হিলডাকে… আমি আসলে ফেঁসে গেছি।

ভিক্টোরিয়া জায়গাটা মোটেও ভালো লাগে না আমার। সেখানে বলতে গেলে যাই না কখনও। কেনই বা যাবো? এই জায়গা লন্ডনের অদ্ভুত এক জায়গা… বাকিংহাম প্যালেসের এমন এক প্রান্তে অবস্থিত, যা আমার দৃষ্টিতে ভুল বলে মনে হয়। যতদূর জানি, ওখানে ভালো কোনো রেস্টুরেন্ট নেই, প্রয়োজনীয় কোনো কিছু বিক্রি করা হচ্ছে এমন কোনো দোকান নেই। সিনেমা হল নেই একটাও। তবে দুটো থিয়েটার আছে। ভিক্টোরিয়া স্টেশনটাও এত পুরনো আমলের যে, সেখানে যদি কখনও হাজির হয় বাষ্পচালিত কোনো ট্রেন, আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে বলে মনে হয় না। সে-স্টেশন ছাড়িয়ে যাওয়ামাত্র আমার মনে হয়, একইরকম দেখতে জীর্ণশীর্ণ কতগুলো রাস্তার একটা জংশনে উপস্থিত হয়েছি যেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কর্তৃপক্ষ কিছুসংখ্যক গাইড দাঁড় করিয়ে দিয়েছে স্টেশনের সামনে; তাদের মাথায় থাকে বোলার হ্যাট, ট্যুরিস্টদের বিভিন্ন রকমের উপদেশ দেয় তারা। ওই লোকগুলোর প্রতি কোনো উপদেশ যদি দিতে বলা হয় আমাকে, তা হলে আমি তাদেরকে অন্য কোথাও চলে যেতে বলবো।

অ্যালান গডউইন কাজ করেন এখানেই। একটা প্রতিষ্ঠান চালান তিনি। কনফারেন্সের আয়োজন করে তাঁর সে-প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ীদের জন্য সামাজিক কিছু অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করে। ১৯৬০ সালের একটা বিল্ডিঙের দ্বিতীয় তলায় তাঁর অফিস। ওই ভবনের বেহাল দশা হয়েছে আবহাওয়ার ছোবলে; ওটা দাঁড়িয়ে আছে সরু একটা রাস্তার শেষমাথায়। আকর্ষণহীন কিছু ক্যাফে দিয়ে গিজগিজ করছে রাস্তাটা। অনতিদূরে আছে একটা কোচ স্টেশন

আমি যখন হাজির হলাম সেখানে, তখন বৃষ্টি পড়ছে। আজ সকাল থেকেই মেঘলা ছিল আবহাওয়া। রাস্তার ধারের ফুটপাতগুলোয় জায়গায়-জায়গায় গর্ত আছে; বৃষ্টির পানি জমে গিয়ে সেগুলোতে তৈরি হয়েছে ছোটখাটো ডোবা। কোচ চলছে; রাস্তায় জমে থাকা পানি ছিটকে দিয়ে যাচ্ছে সেগুলো।

হাজির হলাম অ্যালান গডউইনের অফিসে। দরজায় ঝুলছে একটা সাইনবোর্ড: ডিয়ারবয় ইভেন্টস। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম লেখাটার দিকে… কোত্থেকে এল ওটা, ভাবছি। মনে পড়তে বেশি সময় লাগল না। হারল্ড ম্যাকমিলান নামের এক রক্ষণশীল ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ বলেছিলেন কথাটা একবার। তাঁকে তখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাজনীতিবিদেরা আসলে কী ভয় পান। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘ইভেন্সট, ডিয়ার বয়, ইভেন্টস।’

ছোট এবং অসম আকৃতির একটা রিসিপশন রুমে নিয়ে যাওয়া হলো আমাকে।

অ্যালান গডউইনের ব্যবসা কেমন চলছে, তা বুঝতে গোয়েন্দা হতে লাগে না। এই অফিসের আসবাবগুলো দামি, কিন্তু কেমন একটা শীর্ণতার ছাপ সবগুলোতে। ব্যবসাসংক্রান্ত যেসব ম্যাগাজিন ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে আছে একধারের একটা টেবিলের উপর, অনেক আগেই পুরনো হয়ে গেছে সেগুলো। পাত্রে লাগানো গাছগুলো হারিয়েছে সতেজ ভাব। কেমন একটা উদসীনতার ছাপ রিসিপশনিস্টের চেহারায়, এবং সেটা গোপন করার কোনো চেষ্টাই করছে না সে। তার ডেস্কে রাখা টেলিফোনটা বাজছে না। একদিকের একটা ডিসপ্লে শেল্ফে রাখা আছে কিছু পুরস্কার। ওগুলো দেয়া হয়েছে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে, যাদের নামই শুনিনি কখনও।

হোথর্ন ইতোমধ্যেই হাজির হয়ে গেছে এখানে, হাবভাবে ধৈর্যহীনতার লক্ষণ নিয়ে বসে আছে একদিকের একটা সোফায়। ওকে দেখে মনে হচ্ছে, অপরাধের প্রতি নেশাগ্রস্ত সে, এবং জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করতে তর সইছে না।

আমাকে দেখামাত্র বলল, ‘দেরি করে ফেলেছেন।’

হাতঘড়ির দিকে তাকালাম। তিনটা বেজে পাঁচ মিনিট। ‘কেমন আছেন?’ জানতে চাইলাম। ‘আপনার উইকএন্ড কেমন কাটল?’

‘ভালো।’

‘কিছু করেছেন এই উইকএন্ডে? কোনো সিনেমা-টিনেমা দেখেছেন?

কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল সে। ‘আপনার কী হয়েছে, বলুন তো?’

‘কিছু না।’ বসে পড়লাম হোথর্নের মুখোমুখি। ‘রেমন্ড কুন্সকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে… জানেন নাকি?’

মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘খবরের কাগজে দেখলাম। পঞ্চাশ হাজার খসিয়েছিলেন তিনি ডায়ানা ক্যুপারের কাছ থেকে; খবরটা জানামাত্র আমার মনে হয়েছিল, ধোঁকাবাজি করেছেন আসলে।’

‘হতে পারে, মিসেস ক্যুপার হয়তো কিছু-একটা জেনে ফেলেছিলেন কুন্সের ব্যাপারে। আর হয়তো সে-কারণেই কুন্স শেষ করে দিয়েছেন ওই মহিলাকে।’

আমার কথা শুনে এমন এক প্রতিক্রিয়া দেখা দিল হোথর্নের চেহারায় যে, মনে হলো, এই চিন্তা ইতোমধ্যেই বাতিল করে দিয়েছে সে। ‘আপনি কি তা-ই ভাবছেন?’

‘ব্যাপারটা সম্ভব।’

রিসিপশন এরিয়ায় হাজির হলো যুবতী এক মেয়ে। জানাল, মিস্টার গডউইন দেখা করতে চান আমাদের সঙ্গে। সংক্ষিপ্ত একটা করিডর ধরে পথ দেখিয়ে আমাদেরকে নিয়ে গেল সে গডউইনের কামরার সামনে। দরজা খুলে বলল, ‘আপনার ভিটিররা চলে এসেছেন, মিস্টার গডউইন।’

ভিতরে ঢুকে পড়লাম আমরা।

দেখামাত্র চিনতে পারলাম অ্যালান গডউইনকে। মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে দেখেছি তাঁকে। তিনিই সেই উসুখুসু চুলের লম্বা লোক, যার হাতে সাদা রঙের রুমাল ছিল। এখন তিনি বসে আছেন একটা ডেস্কের পেছনে, আর তাঁর পেছনে দেখা যাচ্ছে একটা জানালা। তাঁর কাঁধ ছাড়িয়ে দেখতে পাচ্ছি সেই কোচ স্টেশনটা। গোল গলার একটা জার্সির উপর একটা স্পোর্টস জ্যাকেট পরেছেন তিনি। তাকানোর ভঙ্গি দেখে অনুমান করে নিলাম, আমাদেরকে চিনে নিতেও কষ্ট করতে হয়নি তাঁকে। সঙ্গে সঙ্গে চেহারাটা ঝুলে গেল তাঁর।

ডেস্কের এপ্রান্তে দুটো চেয়ার আছে। বসে পড়লাম আমরা।

হোথর্নের দিকে নার্ভাস ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছেন গডউইন। ‘আপনি পুলিশের অফিসার?’

‘হ্যাঁ… পুলিশের হয়ে কাজ করছি।’

‘আমাকে কি কোনো পরিচয়পত্র দেখাতে পারবেন?’

‘ব্রম্পটন কবরস্থানে কী করছিলেন আপনি?’

জবাব দিলেন না গডউইন।

‘পুলিশ কিন্তু জানে না সেখানে গিয়েছিলেন আপনি,’ বলে চলল হোথৰ্ন, ‘কিন্তু আমি জানি। কথাটা যদি জানিয়ে দিই তাদেরকে, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনার সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী হয়ে উঠবে তারা। কাজেই আমার ধারণা, পুলিশের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে আমার সঙ্গে কথা বলাটা তুলনামূলকভাবে বেশি সহজ আপনার জন্য।’

দেখে মনে হলো, গডউইন নিজের চেয়ারের ভিতরে ঢুকে গেছেন খানিকটা। ভালোমতো তাকালাম তাঁর দিকে। ব্যর্থতার ভারে আক্রান্ত একজন মানুষ। এবং এই ব্যাপার খেয়াল করে তেমন একটা আশ্চর্য লাগল না আমার। একটা দুর্ঘটনায় দুই ছেলের এক ছেলেকে হারিয়েছেন তিনি। অন্য ছেলেটা মারাত্মক আহত হয়েছে। হয়তো ওই দুর্ঘটনাই তাঁর ব্যর্থতার সূচনা। কারণ ওই ঘটনার পর হারিয়েছেন তিনি নিজের বাড়ি, স্ত্রীর সঙ্গে বলতে গেলে বিচ্ছেদ ঘটে গেছে তাঁর, আর এখন ব্যবসাতেও ভাটা পড়েছে। আমি জানি… মানে, বুঝতে পারছি, হোথর্নের প্রশ্নের জবাব দেবেন তিনি। কারণ প্রতিরোধ বা লড়াইয়ের কোনো চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি না তাঁর ভিতরে।

‘ওই শেষকৃত্যানুষ্ঠানে গিয়ে নিশ্চয়ই কোনো অপরাধ করিনি আমি?’ বললেন তিনি।

‘কেউ একজন মিসেস ক্যুপারের কফিনের ঢাকনা খুলেছিল এবং সেটার ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে একটা মিউযিক বক্স। এই ব্যাপারে কিছু জানা আছে আপনার?’

‘না।’

‘কিন্তু মিউযিক বক্স যে ঢোকানো হয়েছিল, সেটা তো জানেন? বাজনাটা বাজতে শুনেছিলেন নিশ্চয়ই?’

‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’

‘ওই বাজনার বিশেষ কোনো অর্থ আছে আপনার কাছে?’

জবাব দেয়ার আগে একটু সময় নিলেন গডউইন। দেখতে পেলাম, তাঁর দুই চোখ যেন পরিণত হয়েছে হতাশার গভীর দুটো গর্তে। ‘টিমোথিকে যখন কবর দেয়া হচ্ছিল, তখন ওই মিউযিক বাজিয়েছিলাম আমরা।’ কণ্ঠ কর্কশ হয়ে গেছে তাঁর। ‘ওটা টিমোথির সবচেয়ে প্রিয় গান ছিল।

দেখে মনে হলো, কথাটা শুনে এমনকী হোথর্নও মানসিকভাবে হোঁচট খেয়েছে। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না সেটা। আবার শুরু হলো ওর আক্রমণ। ‘মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে কেন গিয়েছিলেন?’ এমনভাবে জানতে চাইল, যেন জবাবটা দাবি করছে। ‘এমন একজন মহিলার শেষকৃত্যে কেন যোগ দিলেন, যাঁকে ঘৃণা করার সবরকমের কারণ ছিল আপনার?

‘কারণ আমি তাকে আসলেই ঘৃণা করতাম!’ দুই গাল লাল হয়ে গেছে গডউইনের। তাঁর ভ্রূ জোড়া কালো আর ঘন, কুঁচকে গেছে ওগুলো, বোঝা যাচ্ছে রেগে গেছেন। ‘ওই মহিলার নির্বুদ্ধিতা আর বেপরোয়া আচরণের কারণেই মারা গেছে আমার আট বছর বয়সী ছেলেটা। আমার আরেক ছেলে… কতই না প্রাণোচ্ছ্বল ছিল সে, হাসাতে পারত সবাইকে… একই কারণে জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে তার। চশমা না পরে আমার জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছে ওই মহিলা। তার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে গেছি, কারণ সে যে মারা গেছে, সেটা দেখে ভালো লাগছিল। তাকে যে আসলেই দাফন করা হচ্ছে, সেটা দেখতে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ওই দৃশ্য দেখতে পেলে আমার দুঃখকষ্টের অবসান হবে।’

‘আপনার দুঃখকষ্টের অবসান হয়েছে?’

‘না।’

‘এবার বলুন ড্যামিয়েন ক্যুপারের মৃত্যুর ব্যাপারে কী জানেন?’

আমার মনে হচ্ছে, হোথর্ন ইচ্ছা করলে টেনিস খেলোয়াড় হতে পারত। যেন সপাটে র‍্যাকেট চালিয়েছে সে… বলটা পাঠিয়ে দিয়েছে নেটের ওপ্রান্তে। ওর উদ্যম আর একাগ্রতা একজন টেনিস খেলোয়াড়ের মতোই।

অবজ্ঞার ভঙ্গিতে হাসলেন গডউইন। ‘মিস্টার হোথর্ন, আপনার কি ধারণা, আমি খুন করেছি ওই লোককে? আর সেজন্যই কি জানতে চেয়েছেন, মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পর কী করেছি? …ওই অনুষ্ঠানের পর সোজা হাঁটা ধরি আমি… অনেকক্ষণ হেঁটেছি রাস্তায় রাস্তায়… কিং’স রোড ধরে চলে গেছি একেবারে থেমস নদীর পাড়ে। তবে হ্যাঁ, কোনো সাক্ষী নেই… মানে, আমাকে অতটা পথ হাঁটতে দেখেনি কেউ। আমি কোথায় ছিলাম তখন, সেটা আপনাকে বলে দেয়ার মতোও কেউ নেই। কিন্তু… একটা কথা ভেবে দেখুন… আমি কেন কোনো ক্ষতি করতে চাইবো ওই লোকের? সেদিনের সেই দুর্ঘটনার সময় সে তো চালাচ্ছিল না গাড়িটা। সে তখন ছিল তাদের বাসায়।’

‘হয়তো তাকে রক্ষা করার জন্যই তার মা গাড়ি না-থামিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন সেদিন।’

‘যদি কাজটা করেও থাকে ওই মহিলা, নিজের সিদ্ধান্তে করেছে। কাপুরুষের মতো, স্বার্থপরের মতো একটা কাজ করেছে সে, কিন্তু ওই ব্যাপারে তো কিছু করার ছিল না তার ছেলের!

আমি যা ভাবছিলাম, সেটারই যেন বহিঃপ্রকাশ ঘটল গডউইনের কথায়। ডায়ানা ক্যুপারকে খুন করার সব রকমের কারণ থাকতে পারে অ্যালান গডউইনের, কিন্তু নিজের রাগটা ওই মহিলার ছেলের উপর ঝাড়তে যাবেন কেন তিনি?

চুপ করে আছেন গডউইন, চুপ করে আছে হোথর্ন। তাঁদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, এতক্ষণ যেন বক্সিং করছিলেন দু’জন, এবং এইমাত্র একটা রাউন্ড শেষ হয়েছে।

বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না নীরবতা। হোথর্ন বলল, ‘মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন আপনি।’

কিছু বলার আগে দ্বিধা করলেন গডউইন। ‘না।’

‘আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলবেন না, মিস্টার গডউইন। আমি জানি আপনি গিয়েছিলেন সেখানে।’

‘কীভাবে জানতে পারলেন?’

‘মিসেস ক্যুপার তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন আপনার কথা। আপনাকে দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলেন তিনি। এবং ড্যামিয়েন ক্যুপারের ভাষ্যমতে, ওই মহিলাকে হুমকি দিয়েছিলেন আপনি।’

‘সে-রকম কিছুই করিনি আমি।’ থামলেন গডউইন, দম নিলেন লম্বা করে। ‘ঠিক আছে, ওই মহিলার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কথাটা অস্বীকার করার কিছু আছে বলে মনে হয় না। ঘটনাটা তিন কি চার সপ্তাহ আগের

‘তার মানে মিসেস ক্যুপার খুন হওয়ার দুই সপ্তাহ আগের।

‘আমাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিল জুডিথ, তার সপ্তাহ দু’-এক পরে গিয়েছিলাম মিসেস ক্যুপারের কাছে। ততদিনে আমি আর জুডিথ বুঝে গেছি, আমাদের বৈবাহিক সম্পর্কটা আর টিকিয়ে রাখা যাবে না। আর তখনই গিয়েছিলাম জঘন্য ওই মহিলার কাছে। ভেবেছিলাম, হয়তো সাহায্য করতে পারবে সে। ভেবেছিলাম, হয়তো সাহায্য করতে চাইতেও পারে।’

‘সাহায্য করবেন… আপনাকে? কীভাবে?’

‘টাকা দিয়ে! কেন, আপনি কী ভেবেছিলেন?’ আবারও লম্বা করে দম নিলেন গডউইন। ‘আমার প্রতিষ্ঠানের অবস্থা ভালো না। ব্যবসা বাড়ানোর আর কোনো সুযোগ নেই এখন। সবারই এখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। ওদিকে আমি আর জুডিথ… আমরা দু’জনই শেষ। চব্বিশ বছরের বৈবাহিক জীবন ছিল আমাদের। একদিন হঠাৎ করেই বুঝতে শুরু করলাম আমরা, একই ছাদের নিচে একই ঘরে থাকা আর সম্ভব না আমাদের পক্ষে।’ আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে দিলেন ঘরের ছাদটা। ‘উপরতলায় এক বেডরুমের একটা ফ্ল্যাট আছে। এখন সেখানেই থাকি। আমার বয়স পঞ্চান্ন। কখনও বাসায় রান্না করে খাই, কখনও বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসি। এখন এই পর্যায়ে এসে ঠেকেছে আমার জীবন। যা-হোক, ওই বজ্জাত মহিলার সঙ্গে কেন দেখা করতে গিয়েছিলাম, জানেন? এই অফিস… আর কিছু দিন পর এখান থেকে বের করে দেয়া হবে আমাদেরকে। হ্যাঁরো-অন-দ্য-হিলে যে-বাড়ি আছে আমাদের, সেটাও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল। মর্টগেজের রিপেমেন্ট শোধ করে ওই বাড়ি নিজেদের দখলে রাখাটা আর সম্ভব হচ্ছিল না আমাদের পক্ষে। তারপরও এই ব্যাপারটা গায়ে মাখতাম না, যদি না ওই বাড়ি জেরেমির হতো। ওটা ওর বাসা। সেখানে নিরাপদ বোধ করে সে।’ ক্রোধ স্ফুলিঙ্গের মতো ছিটকে উঠল তাঁর দুই চোখে। ‘ওর কথা ভেবেই নিজের মান-মর্যাদা সব গিলে খেয়েছিলাম সেদিন, দেখা করতে গিয়েছিলাম মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে। ভেবেছিলাম, হয়তো সাহায্য পাবো। তার ঠিকানা জানা ছিল আগে থেকেই। পত্রিকা পড়ে জানতে পেরেছিলাম, তার ছেলে একইসঙ্গে নাম আর টাকা কামাই করছে হলিউডে। ভেবেছিলাম, শিষ্টাচার বলে যদি কোনো কিছু থাকে ওই মহিলার ভিতরে, তা হলে যা করেছে তার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে নিজেকে হয়তো শুধরে নেয়ার চেষ্টা করবে। হয়তো টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করবে আমার পরিবারকে।’

‘সেটা করেছিলেন তিনি?’

‘কী মনে হয় আপনার?’ অবজ্ঞাসূচক চাহনিটা ফিরে এসেছে গডউইনের চেহারায়। ‘বজ্জাত ওই মহিলা আমাকে দেখামাত্র তার বাসার দরজাটা আমার মুখের উপর লাগিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। আমি যখন জোর করে ভিতরে ঢুকে পড়লাম, পুলিশে খবর দেয়ার হুমকি দিল।’

‘জোর করে ভিতরে ঢুকে পড়েছিলেন?’ বলল হোথর্ন। ‘মানে কী কথাটার?

‘মানে… তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম, আমার সঙ্গে যাতে কথা বলে সে। হুমকি-ধমকি দিইনি… ও-রকম কিছু করার কোনো ইচ্ছাও ছিল না আমার। হিংস্র কোনো আচরণ করিনি ওই মহিলার সঙ্গে… বিশ্বাস করা না-করা আপনাদের ইচ্ছা। বলতে গেলে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলাম তার সামনে, আমার কথা শোনার জন্য দশটা মিনিট সময় চেয়েছিলাম তার কাছে।’ একটুখানি থামলেন গডউইন, তারপর আবার বলতে লাগলেন, ‘আমি শুধু কিছু টাকা ধার চেয়েছিলাম ওই মহিলার কাছে। আপনিই বলুন, খুব বেশি কিছু কি চেয়েছিলাম? কিন্তু বজ্জাত মহিলাটা আমার মুখের উপর বলে দিল, তার কাছে নাকি টাকাপয়সা নেই। একটা মানুষ এত নিরুত্তাপ আর নিস্পৃহ হয় কী করে, জানি না। বলল, তার বাড়ি ছেড়ে ওই মুহূর্তে বেরিয়ে যেতে। এবং ঠিক সে-কাজই করেছিলাম আমি। পরে ভীষণ অনুশোচনা হলো আমার… এত বেশি যে, অসুস্থ বোধ করছিলাম… কেন মরতে গিয়েছিলাম ওই বজ্জাত মহিলার কাছে? আসলে মরিয়া না-হলে জীবনেও যেতাম না আমি শয়তানটার বাড়িতে।’

‘আপনি যা-যা বললেন সেসব ঘটনা ওই বাড়ির কোন্ ঘরে ঘটেছিল, মিস্টার গডউইন?’

‘সামনের ঘরে। মানে… লিভিং রুমে। কেন?’

‘তখন ক’টা বাজে?’

‘লাঞ্চের আওয়ার ছিল তখন। তার মানে আনুমানিক বারোটা।

‘অর্থাৎ ঘরের পর্দাগুলো বেঁধে রাখা অবস্থায় ছিল?’

‘হ্যাঁ,’ গডউইনের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে, হোথর্নের প্রশ্নে হতবুদ্ধি হয়ে গেছেন।

‘মিসেস ক্যুপার যে বাসায় ছিলেন, সেটা জানলেন কী করে?’

‘জানতাম না। স্রেফ গিয়ে হাজির হয়ে গিয়েছিলাম ওখানে। কপালগুণে ওই মহিলাকে পেয়ে গেছি

‘এবং পরে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপারের কাছে?’

একটুখানি দ্বিধা করলেন গডউইন। ‘হ্যাঁ।’

পরনের জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল হোথর্ন, বের করে আনল একটা চিঠি… ওটা ওকে দিয়েছিল আন্দ্রিয়া কুভানেক।

গত কয়েক দিনে এত বেশি ঘটনা ঘটেছে যে, এটার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম আমি।

চিঠিটার ভাঁজ খুলল হোথর্ন। আপনার উপর নজর রেখেছি আমি, জানি কোন্ কোন্ জিনিস খুব প্রিয় আপনার কাছে।’

‘ পড়ল। ‘একটু আগে বললেন, আপনি নাকি হুমকি দেননি মিসেস ক্যুপারকে। কিন্তু চিঠির এই অংশটা সাংঘাতিক শাসানিমূলক বলে মনে হচ্ছে আমার।’

‘আসলে রেগে গিয়েছিলাম তখন। তবে… এই কথার মাধ্যমে তেমন কিছু বোঝাতে চাইনি।’

‘কখন পাঠিয়েছিলেন এই চিঠি?’

‘পাঠাইনি। হাতে হাতে দিয়ে এসেছিলাম।’

‘কখন?’

‘ওই মহিলার সঙ্গে দেখা করার সপ্তাহখানেক পরে। সেদিন ছিল শুক্রবার… মাসের ছয় বা সাত তারিখ।’

‘অর্থাৎ মিসেস ক্যুপার মারা যাওয়ার আগের উইকএন্ড!’

‘চিঠিটা দিতে ওই বাড়ির ভিতরে ঢুকিনি আমি। দরজার নিচ দিয়ে ঠেলে দিয়েছিলাম।’

‘মিসেস ক্যুপার কি এই চিঠির কোনো জবাব দিয়েছিলেন?’

‘না। তাঁর পক্ষ থেকে আর কোনো সাড়াশব্দ পাইনি

চিঠিটার দিকে আবার তাকাল হোথর্ন। ‘জানি কোন্ কোন্ জিনিস খুব প্রিয় আপনার কাছে… এই কথার মাধ্যমে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন?’

‘কিছুই বোঝাতে চাইনি!’ ডেস্কের উপর দুম করে একটা কিল বসিয়ে দিলেন গডউইন। ‘কিছু-একটা লেখার দরকার ছিল, তাই লিখেছি ওভাবে। আমার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে ভেবে দেখুন ব্যাপারটা। ওই মহিলার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়াটা ভুল হয়েছে আমার। তাকে চিঠি লেখাটাও ভুল হয়েছে। কিন্তু দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে যায় লোকের, তখন তারা বোকার মতো কিছু কাজ করতে বাধ্য হয়।’

‘একটা বিড়াল ছিল মিসেস ক্যুপারের,’ বলল হোথর্ন। ‘একটা পার্সিয়ান গ্রে। আমার মনে হয় না ওটা দেখেছেন আপনি।’

‘না। কোনো বেজন্মা বিড়াল দেখিনি আমি ওই বাসায়। এবং আপনাকে বলার মতো আর কিছু নেইও আমার। এখনপর্যন্ত নিজের আইডি কার্ডটা আমাকে দেখাননি আপনি। আমি আসলে জানিও না আপনি কে। কাজেই আমি চাই আপনি

এখন চলে যান।

পাশের অফিসে একটা টেলিফোন বেজে উঠল এমন সময়। আমরা এ-বিল্ডিঙে ঢোকার পর এই প্রথম কোনো যান্ত্রিক আওয়াজ শুনতে পেলাম।

‘কিছুক্ষণ আগে বললেন এখান থেকে নাকি বের করে দেয়া হবে আপনাদেরকে,’ বলল হোথর্ন। ‘আর কতদিন সময় আছে আপনার হাতে?’

‘মাস তিনেকের লিয বাজি আছে এখনও।’

উঠে দাঁড়াল হোথর্ন। ‘তা হলে পরে কোথায় পাওয়া যেতে পারে আপনাকে, সেটা জেনে নেবো আমরা।

প্রায় শূন্য অফিসের ভিতর দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে এলাম আমরা। বাইরে তখনও বৃষ্টি হচ্ছে।

রাস্তায় হাজির হওয়ামাত্র একটা সিগারেট ধরাল হোথর্ন। ‘আগামীকাল ক্যান্টেব্রিতে যাবো আমি।’ হঠাৎ করেই বলল সে। ‘আপনি যাবেন?’

‘ক্যান্টেব্রিতে কেন?’

‘নাইজেল ওয়েস্টনের খোঁজ বের করতে পেরেছি।’

সহসা মনে করতে পারলাম না নামটা।

‘নাইজেল ওয়েস্টন… কিউসি… সিনিয়র ব্যারিস্টার,’ আমাকে মনে করিয়ে দিল হোথর্ন। সেই বিচারক, যিনি বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন ডায়ানা ক্যুপারকে। আর তারপর… ঠিক করেছি, ডিল-এ ঢুঁ মেরে আসবো একবার। আপনার হয়তো ভালো লাগবে, টনি। সাগরের বাতাস একটুখানি হলেও লাগাতে পারবেন গায়ে।’

‘ঠিক আছে,’ বললাম বটে, কিন্তু লন্ডন ছেড়ে কোথাও যেতে চাইছি না আসলে। প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন সব জায়গায় যেতে হচ্ছে আমাকে, এবং গাইড হিসেবে হোথর্ন যখন সঙ্গে থাকে তখন কেন যেন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারি না।

‘দেখা হবে তা হলে।

আমাদের দু’জনের পথ দু’দিকে… আমরা তাই আলাদা হয়ে গেলাম একজন আরেকজনের থেকে।

হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেছি রাস্তার শেষমাথায়, ঠিক তখনই প্রশ্নটা মনে পড়ে গেল আমার। এটা জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু খেয়াল ছুটে গেছে। অ্যালান গডউইন বলেছেন, মিসেস ক্যুপারের মৃত্যুতে খুশি হয়েছেন তিনি। অথচ শেষকৃত্যানুষ্ঠানের সময় তাঁকে কাঁদতে দেখেছি আমি। একটু পর পর রুমাল দিয়ে চোখ মুছছিলেন তিনি। কেন?

আরেকটা কথা।

গডউইন বলেছেন: চশমা না-পরে আমার জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছে ওই মহিলা।

কিছুক্ষণ আগে বলেছেন তিনি কথাটা। ওই সময়, খেয়াল করেছি, ক্রোধে অর্ধেক-বুজে এসেছিল তাঁর কণ্ঠ। অথচ আরেকজন সাক্ষী… রেমন্ড ক্লুন্স… বলেছেন সম্পূর্ণ আলাদা একটা কথা।

বাসায় ফেরামাত্র নিজের খাতাপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে লাগলাম… বিশেষ কিছু নোট খুঁজছি। ওটা পেতে বেশি সময় লাগল না। এই ব্যাপারটা মিস করেছে হোথৰ্ন… এটা সব সময় আমাদের চোখের সামনেই ছিল, কিন্তু নজর এড়িয়ে গেছে আমাদের দু’জনেরই।

তাকিয়ে আছি বিশেষ সেই নোটের দিকে।

কেন খুন করা হয়েছে মিসেস ক্যুপার এবং তাঁর ছেলেকে, সেটা বোধহয় বুঝতে পেরেছি আমি।

এবং কে করেছে খুন দুটো, তা-ও সম্ভবত জানা হয়ে গেছে আমার। সত্যি বলতে কী, এই ব্যাপারে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই আমার মনে।

টের পেলাম, ক্যান্টেব্রিতে যাওয়ার ব্যাপারে উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠছি ভিতরে ভিতরে।

কেন যেন মনে হচ্ছে, অন্তত একবারের জন্য হলেও টেক্কা মারতে পারবো এবার হোথর্নের উপর।

১৬. ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর নিডোস

বইয়ের সমাপ্তি ঘনিয়ে এসেছে… অন্তত তা-ই দেখতে পাচ্ছি আমি; উপলব্ধি করতে পারছি, আরও কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড দরকার আমার। কাজেই ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিডোসের সঙ্গে দেখা করার জন্য এটাই উপযুক্ত সময়।

কাজটা শেষপর্যন্ত সহজই হলো আমার জন্য। ফোন করলাম মেট্রোপলিটান পুলিশে, নাম বললাম মিডোসের; সঙ্গে সঙ্গে, আমার ধারণা, তার মোবাইলে ট্রান্সফার করা হলো লাইনটা। যতক্ষণ কথা বলছিলাম তার সঙ্গে, বায়ুচালিত কোনো একজাতের ড্রিলিঙের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম ব্যাকগ্রাউন্ডে।

প্রথমেই নিজের পরিচয় দিলাম লোকটাকে। কেন দেখা করতে চাই, বললাম সেটা। সন্দীহান হয়ে উঠল সে। দেখা না-করার জন্য এটা-সেটা বাহানা দিতে শুরু করল। হয়তো কেটেই দিত লাইনটা, যদি না… সরাসরিই বলি… ঘুষ দিতাম। অর্থাৎ, প্রতি এক ঘণ্টা সময়ের জন্য ৫০ পাউন্ড করে অফার করলাম। আরও বললাম, এমন কোনো পাবে দেখা করতে চাই, যেখানে ড্রিঙ্ক কিনে খাওয়াতে পারবো তাকে! রাজি হয়ে গেল লোকটা, কিন্তু কণ্ঠে তেমন উৎসাহ নেই।

সেদিন বিকেলেই সোহো’র একটা ক্লাবে দেখা হলো আমাদের।

আসতে দশ মিনিট দেরি হয়ে গেল মিডোসের। আমি ততক্ষণে ওই ক্লাবের উপরতলায় নির্জন একটা কোনা বেছে নিয়েছি নিজেদের জন্য। ভদকা মার্টিনির অর্ডার করল সে… আশ্চর্য হলাম কিছুটা। তার বিশাল পাঞ্জায় ত্রিকোণাকৃতির পানপাত্রটা কেমন হাস্যকর দেখাচ্ছে। মাত্র তিন চুমুকে খালি করে ফেলল ওই পাত্র, তারপর অর্ডার করল আরেকটা ড্রিঙ্ক।

মিডোসের জন্য অনেক প্রশ্ন নিয়ে এসেছি আমি, কিন্তু প্রথমে আমার ব্যাপারে এটা-সেটা অনেক কিছু জানতে চাইল সে। হোথর্নের সঙ্গে কী করে পরিচয় হলো আমার? ওর জন্য বই কেন লিখছি আমি? আমাকে কত টাকা দিয়েছে সে?

জবাব দিলাম সবগুলো প্রশ্নের। কিছু বাড়তি কথার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলাম, হোথর্নের ব্যাপারে সংশয় আছে আমার মনেও, এবং সে আমার বন্ধু না।

কথাটা শুনে হাসল মিডোস। ‘হোথর্নের মতো কোনো মানুষের কোনো বন্ধু থাকার কথা না। এমন অনেক চোর আর ধর্ষণকারীকে পাকড়াও করেছি আমি, যারা হোথর্নের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিল।’

‘খুনখারাপি নিয়ে প্রচুর লেখালেখি করেছি আমি, কিন্তু হোথর্নের মতো কারও সঙ্গে পরিচয় হয়নি কখনও।’

আবারও হাসল মিডোস। ‘পরিচয় না-হওয়ারই কথা, কারণ হোথর্নের মতো লোক খুব বেশি নেই। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।’

‘আপনি ঠিক কেন অপছন্দ করেন ওকে, বলবেন?’

‘কী মনে হয় আপনার? আমি আসলে তেমন একটা পাত্তা দিই না তাকে। আমার মনে হয়, তার মতো কাউকে… মানে, যারা আসলে পুলিশের লোক না… পুলিশের কোনো কাজে নিয়োগ দেয়া উচিত না।’

‘ঠিক কী ঘটেছিল, জানতে চাই আমি। কেন চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল ওকে?’

‘আপনি যে দেখা করতে এসেছেন আমার সঙ্গে, সেটা কি জানিয়েছেন হোথর্নকে?’

‘না। তবে সে জানে, ওকে নিয়ে লিখছি আমি। কাজটা সে-ই করতে বলেছে আমাকে। এবং আমি ওকে বলেছি, ওর ব্যাপারে যা-যা জানা দরকার, সেগুলো জেনে নেবো যেভাবেই হোক।’

‘তার মানে আপনিও একটু-আধটু গোয়েন্দাগিরি করতে চান আর কী। …মার্ডার স্কোয়াডের ব্যাপারে আপনাকে কিছু বলেছে হোথর্ন?’

‘না, বলেনি। আমি আসলে ওর ব্যাপারে বলতে গেলে কিছুই জানি না। এমনকী সে কোথায় থাকে, তা-ও না।’

‘রিভার কোর্ট, ব্ল্যাকফ্রায়ার্স।’

অর্থাৎ ক্লার্কেনওয়েলে যে-ফ্ল্যাটে থাকি আমি, সেটা থেকে মাত্র এক মাইল দূরে।

‘তবে বাসাটা হোথর্নের নিজের না,’ বলে চলল মিডোস।

‘ঠিকানাটা জানেন?’ জিজ্ঞেস করলাম।

মাথা নাড়ল মিডোস। ‘না।’

‘হোথর্ন আমাকে বলেছিল, গ্র্যান্টস হিলে নাকি…’

‘স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর ওই জায়গা ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে তাকে।’

‘আমিও তা-ই ভেবেছিলাম। ওর স্ত্রীর সঙ্গে কি কখনও দেখা হয়েছে আপনার?’

‘একবার। আমাদের অফিসে এসেছিল। অনেক লম্বা… পাঁচ ফুট এগারোর মতো হবে। ককেশিয়ান।’ এমনভাবে বর্ণনাটা দিল মিডোস যে, শুনে আমার মনে হলো, কোনো একটা কেসের কোনো একজন সন্দেহভাজনের ব্যাপারে বলছে। ‘তবে মহিলা যথেষ্ট সুন্দরী, মাথার চুলগুলো সাদা। বয়সে হোথর্নের চেয়ে কয়েক বছরের ছোট। কিছুটা নার্ভাস প্রকৃতির। সেদিন অফিসে আমার কাছে এসে বলল দেখা করতে চায় হোথর্নের সঙ্গে। তখন তাকে হোথর্নের ডেস্কে নিয়ে গেলাম আমি।’

‘কী নিয়ে কথা হয়েছিল ওদের দু’জনের মধ্যে?’

‘কোনো ধারণা নেই আমার। …হোথর্নের সঙ্গে কেউ মিশত না। আমিও এড়িয়ে চলতাম।’

‘সহকর্মী হিসেবে সে কেমন ছিল?’

‘ভালো না। তার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন না আপনি। ২০০৫ সালে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় সে। অন্য একটা সাব-কমান্ডে ছিল… সাটন আর হেন্ডনে… সেখানে ওরা রাখতে চায়নি তাকে। কেন চায়নি, সেটা হোথর্ন আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়ার কয়েকদিন পরই বুঝতে পারি।’ থামল মিডোস।

অপেক্ষা করছি আমি।

‘কাজ শেষে একসঙ্গে ড্রিঙ্ক করা আমাদের অভ্যাস। আমরা একজন আরেকজনকে সাহায্য করি। কিন্তু হোথর্ন সে-রকম না। সে অন্য কারও সঙ্গে মেলামেশা করতে পছন্দ করে না। এবং সত্যি বলতে কী, এ-রকম কাউকে পছন্দ করে না কেউ। অথচ কাজেকর্মে সে কিন্তু সাংঘাতিক ভালো। যেসব কেস কখন ও সমাধান করা যাবে না বলে ধরেই নিয়েছিলাম আমরা, সেসব কেসে তাক-লাগানো সমাধান করে দেখিয়েছে সে। তার কাজ করার ধরণ সম্পূর্ণ আলাদা… সম্পূর্ণ নিজের মতো। কারও অনুমতির তোয়াক্কা না-করেই কখনও কখনও গায়েব হয়ে যেত অফিস থেকে… কারণ হুট করেই কিছু-একটা মনে পড়ে যেত তার, অথবা কিছু-একটা অনুমান করে ফেলত। কিন্তু যা-ই করত, প্রতিবারই দেখা যেত, ঠিক কাজটাই করেছে। হয়তো সে-কারণেই তার উপর আস্তে আস্তে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলাম আমরা সবাই। তার মতো অ্যারেস্ট রেকর্ড নেই আমাদের ডিপার্টমেন্টের কারও।’

‘কিন্তু একটা লোক ভালো কাজ করছে বলেই কি তাকে অপছন্দ করতে হবে?’

‘হ্যাঁ। কারণ সে গোদের উপর বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছিল আমাদের সবার জন্য। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত। কাউকে পছন্দ করত না, কারও যুক্তি-পরামর্শ শুনত না। সবচেয়ে বড় কথা, মদ খেত না কখনও। ওই জিনিস না-খাওয়াটা খারাপ কোনো কাজ না, কিন্তু সে-অভ্যাস কোনো কাজেই লাগেনি তার। সন্ধ্যা সাতটা বাজলেই গায়েব হয়ে যেত অফিস থেকে। হয়তো বাসায়, নিজের স্ত্রীর কাছে চলে যেত। কিন্তু অফিসের অনেকেই তখন আড়ালে ফিসফিস করে বলত, অন্য কোথাও নিজের যৌনচাহিদা মেটাতে গেছে। তবে এসব আসলে কোনো ব্যাপার না।’

‘সিঁড়ির ব্যাপারে আমাকে সাবধান থাকতে বলেছিলেন আপনি।’

‘কথাটা আসলে বলা উচিত হয়নি আমার।’ তৃতীয় আরেক রাউন্ড ভদকা মার্টিনি নিল মিডোস। ‘লোকটার নাম ছিল ডেরেক অ্যাবোট। ৬২ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক, থাকত ব্রেন্টফোর্ডে। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধী বলতে যা বোঝায়, সে ছিল ঠিক সে-রকম। পঞ্চাশটা দেশে অপারেশন চালিয়ে পাকড়াও করা হয়েছিল তাকে। মেইল আর ইন্টারনেটের মাধ্যমে চাইল্ড পর্নোগ্রাফিই ছিল তার কাজ। এই ক্রাইম চেইনের শুরুটা হয় কানাডায়, তিন শ’রও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তখন। সন্দেহ করা হয়, যুক্তরাজ্যে মেইন ডিস্ট্রিবিউটরের ভূমিকা পালন করছে অ্যাবোট। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসা হয় তাকে। হোথর্ন তখন পাটনিতে কী যেন করছিল। ওই ব্যাপারে আসলে নিশ্চিত না আমি, কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, সে-সময় সেখানে ছিল সে।’

‘তারপর?’

‘কাস্টোডি অফিসে ছিল অ্যাবোট… সেটা ছিল আমাদের অফিস বিল্ডিঙের দ্বিতীয় তলায়। সেখান থেকে বেইযমেন্টে… মানে, ইন্টারভিউ রুমে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তাকে। হোথর্ন তখন স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করতে চায়। সিদ্ধান্ত নেয়, হাতকড়া পরানো অবস্থায় থাকবে অ্যাবোট। অথচ ওই কাজের কোনো দরকার ছিল না। লোকটার বয়স ছিল ষাটের ঘরে। মারামারির কোনো রেকর্ড ছিল না তার যা-হোক, এরপর কী হয়েছিল, আপনি বোধহয় অনুমান করতে পারছেন। বিল্ডিঙের ওই অংশে সেদিন সিসিটিভিও কাজ করছিল না। পরে অ্যাবোট আমাদের কাছে কসম খেয়ে বলেছে, তাকে নাকি ল্যাং মেরেছিল হোথর্ন। অথচ হোথর্ন কথাটা বেমালুম অস্বীকার করে। মাথাটা নিচের দিকে দিয়ে সিঁড়ির চোদ্দটা ধাপ নিচে নেমে যায় অ্যাবোট। পতন ঠেকানোর কোনো উপায়ই ছিল না, কারণ তার দুই হাত পিছমোড়া করে আটকানো ছিল।’

‘ঠিক কী-রকম আহত হয়েছিল লোকটা?’

অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকালেন মিডোস। ‘ঘাড়ে ব্যথা পেয়েছিল সাংঘাতিক। শরীরের কয়েকটা হাড়ও ভেঙে গিয়েছিল। সে যদি মারা যেত, জেল খাটতে হতো হোথৰ্নকে।’

আশ্চর্য হলাম না ঘটনাটা শুনে। হোথর্নের ভিতরে প্রচণ্ড রাগ আর অবিচার দেখেছি আমি। যৌন-নিপীড়নকারী কাউকে লাথি মেরে সিঁড়ি থেকে ফেলা দেয়াটা খুবই সম্ভব ওর পক্ষে।

জানতে চাইলাম, ‘পরে কী হয়েছিল অ্যাবোটের?’

‘জানি না। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে। কিন্তু তারপর তাকে আর কখনও দেখিনি আমরা।’

প্রসঙ্গ বদল করলাম। ‘একজন ডিটেক্টিভ চিফ ইন্সপেক্টর সব সময় সাহায্য– সহযোগিতা করেন হোথৰ্নকে।’

‘রাদারফোর্ড। তাঁর মনে হোথর্নের জন্য নরম একটা জায়গা আছে। তিনিই এই প্যারালাল ইনভেস্টিগেশনের বুদ্ধিটা ঢুকিয়েছেন পুলিশের বড় কর্তাদের মাথায়। আর তাঁর সেই বুদ্ধির ফলেই হোথর্ন কখনও কখনও কাজ পেয়ে যায়। বিশেষ করে যেসব কেসের সমাধান করতে গিয়ে আমরা… মানে, রেগুলার পুলিশ অফিসাররা গলদঘর্ম হই, সেসব কেসে। … মিসেস ক্যুপারের বাসায় গিয়েছিলেন আপনি! দেখেছেন, কীভাবে সব কিছু রেখে দেয়া হয়েছিল হোথর্নের জন্য। সে সরাসরি রিপোর্ট করে রাদারফোর্ডের কাছে। আসলে এভাবে পুরো সিস্টেমটা পাশ কাটিয়ে… ‘ থেমে গেল মিডোস, বুঝতে পেরেছে যা বলা উচিত না তা বলে ফেলছে। হাতঘড়ি দেখল। ‘আর কিছু?’

‘জানি না। আমাকে বলার মতো আর কিছু কি আছে আপনার?’

‘না। তবে আপনি আমাকে এখন কিছু-একটা বলতে পারেন। হোথর্নের পেছন পেছন তো অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বলুন তো, অ্যালান গডউইন নামের কারও সঙ্গে কি দেখা করেছে সে?’

শীতল একটা অনুভূতি হলো আমার পেটের ভিতরে। কখনও কল্পনাও করিনি, এই কেসে হোথর্নের উপর টেক্কা মারার কাজে আমাকে ব্যবহার করবে মিডোস। মনে হলো, আমার সঙ্গে দেখা করতে যে রাজি হয়েছে লোকটা, এটাই হলো তার আসল কারণ। একইসঙ্গে বুঝতে পারলাম, তাকে কোনো কিছু বলতে পারবো না… বলাটা উচিত হবে না। মিডোস যদি খুনির পরিচয় ফাঁস করে দেয়, ভয়ানক একটা বিপর্যয় ঘটে যাবে। বিশেষ এই কাহিনি নিয়ে কোনো বই লেখা হবে না আমার!

আনুগত্য বা বিশ্বস্ততা যা-ই বলি না কেন, গত কয়েকদিনে হোথর্নের প্রতি সে- রকম কোনো এক আবেগ জন্মেছে আমার মনে। মাত্র দু’জন… তারপরও আমরা একটা দল। মিডোস অথবা অন্য কাউকে না, এই কেস সমাধান করতে হবে আমাকে আর হোথৰ্নকে।

দুর্বল গলায় বললাম, ‘অনেকের সঙ্গেই কথা বলছে হোথর্ন, তবে সবগুলো ইন্টারভিউ’র সময় হাজির থাকি না আমি।

‘কথাটা বিশ্বাস করতে পেরেছি বলে মনে হয় না।’

‘দেখুন… আমি আসলে দুঃখিত। হোথর্ন কী করছে না-করছে সে-ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারি না আমি। একটা চুক্তি হয়েছে আমাদের মধ্যে। ব্যাপারটা গোপনীয়।’

অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে মিডোস। তার সে-দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে, পেনশনভোগী কোনো বুড়ো লোককে যেন পিটিয়েছি আমি। অথবা খুন করেছি কোনো শিশুকে। এই নিয়ে মিডোসের সঙ্গে তিনবার দেখা হলো আমার। প্রতিবারই তাকে ধীরস্থির, লঘুচিত্ত এবং এমনকী আনাড়ি বলে মনে হয়েছে। প্রতিবারই তাকে জ্যাপ বা লেসট্রেড বলে ভেবেছি আমি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, আসলে অবমূল্যায়ন করেছি তাকে। কারণ মিডোসের মতো লোকেরা কখনও কখনও বিপজ্জনকও।

‘অ্যান্টনি, আপনাকে দেখলে কিন্তু মনে হয় না, অনেক কিছু জানেন আপনি। তবে… পুলিশি কর্মকাণ্ডে বাধা দেয়ার শাস্তি সম্পর্কে নিশ্চয়ই জানা আছে আপনার?’

‘হ্যাঁ, আছে।’

‘১৯৯১ সালের পুলিশ অ্যাক্ট অনুযায়ী, পুলিশের কাজে বাধা সৃষ্টি করলে আপনাকে এক হাজার পাউন্ড জরিমানা গুনতে হতে পারে। এমনকী জেলেও যেতে পারেন।’

‘পাগলামি করছেন আপনি।’

ঠিকই বলেছি আমি। কারণ এখন যেখানে আছি আমরা সেটা একটা পাব, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড না। এবং মিডোস আমাকে ধরে আনেনি, আমিই বরং আমন্ত্রণ জানিয়েছি তাকে।

‘আমি শুধু সহজ একটা প্রশ্নের জবাব জানতে চেয়েছি আপনার কাছে,’ কণ্ঠ কিছুটা কোমল হলো মিডোসের।

‘হোথর্নকে জিজ্ঞেস করুন।’

আমার দিকে তাকিয়ে আছে লোকটা।

আমিও তাকিয়ে আছি তার দিকে। কী করবে সে, বুঝতে পারছি না। কিন্তু হঠাৎ করেই কেমন যেন শিথিল হয়ে গেল।

বলল, ‘একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমার ছেলে যখন শুনল আপনার সঙ্গে দেখা করবো আমি, খুবই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল।’

‘তা-ই?’ জিন অ্যান্ড টনিকের অর্ডার করেছিলাম, নিজের গ্লাসে চুমুক দিলাম একটুখানি।

‘হ্যাঁ। সে আবার অ্যালেক্স রাইডারের বড় একজন ভক্ত।’

‘শুনে ভালো লাগল।’

‘সত্যি বলতে কী…’ হঠাৎ করেই লাজুক হয়ে গেছে মিডোস। সঙ্গে করে চামড়ার একটা ব্রিফকেস নিয়ে এসেছে, হাত ঢুকিয়ে দিল সেটার ভিতরে।

কী ঘটতে চলেছে, বুঝে গেছি আমি। বছরের পর বছর ধরে এ-রকম ঘটনা এবং লোকজনের শারীরিক ভাষা দেখে যা বুঝবার বোঝা হয়ে গেছে আমার।

অ্যালেক্স রাইডার সিরিযের তৃতীয় বই ‘স্কেলিটন কী’ বের করল মিডোস। বইটা একেবারে নতুন। তার মানে এই পাবে আসার আগে কোনো একটা বইয়ের- দোকানে থেমেছিল সে।

বলল, ‘অটোগ্রাফ দিতে নিশ্চয়ই আপত্তি নেই আপনার?’

‘না, না, আপত্তি কীসের? বরং ভালোই লাগবে।’ কলম বের করলাম আমি। ‘ওর নাম কী?’

‘ব্রায়ান।’

বইটা খুললাম আমি। প্রথম পাতায় লিখলাম:

ব্রায়ানকে। তোমার বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। আরেকটু হলে আমাকে গ্রেপ্তার করে ফেলেছিলেন তিনি। অনেক শুভকামনা রইল।

স্বাক্ষর করে ফিরিয়ে দিলাম বইটা। ‘আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল। সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ।

‘আমার মনে হয় আপনি বলেছিলেন, আপনাকে সময় দিলে কিছু টাকা দেবেন আমাকে।’

‘ওহ্, হ্যাঁ,’ ওয়ালেট বের করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম। ‘পঞ্চাশ পাউন্ড।’

হাতঘড়ি দেখল মিডোস। ‘আসলে… এক ঘণ্টা দশ মিনিট কথা বলেছি আমি আপনার সঙ্গে। আর এখানে আসতে সময় লেগেছে আরও আধ ঘণ্টা।’

এক শ’ পাউন্ড নিয়ে চলে গেল লোকটা।

ড্রিঙ্কের দামও চুকিয়ে দিলাম আমি। ভাবতে লাগলাম, এত কিছুর বিনিময়ে কী পেলাম?

আদৌ কিছু পেয়েছি কি না, তা নিয়ে সন্দেহ হতে লাগল।

১৭. ক্যান্টারি

পরদিন কিং’স ক্রস সেইন্ট প্যানক্র্যাসে যখন দেখা হলো হোথর্নের সঙ্গে, দেখতে পেলাম, খোশমেজাজে আছে সে। ইতোমধ্যেই টিকেট কিনে ফেলেছে। আমাকে শুধু আমার টিকেটের দাম দিতে বলল।

ট্রেনের কামরায় একটা টেবিলের দু’প্রান্তে মুখোমুখি বসে পড়লাম আমরা। আমি কিছু বলতে শুরু করার আগেই হুট করে একটা পেপারপ্যাড, একটা কলম আর একটা পেপারব্যাক বই বের করল হোথর্ন। ওই বইয়ের প্রচ্ছদের দিকে তাকালাম। দ্য আউটসাইডার, লিখেছেন আলবেয়ার কামু। ফরাসি ভাষা থেকে অনুবাদ করা হয়েছে ওটা। সেকেন্ড হ্যান্ড এডিশন, পেঙ্গুইন ক্লাসিক।

খুবই আশ্চর্য হলাম। ট্যাবলয়েড খবরের-কাগজ ছাড়া আর কিছু যে পড়ে হোথর্ন, কখনও মনেই হয়নি আমার। মনে হয়নি, কল্পকাহিনির প্রতি কোনো আগ্রহ থাকতে পারে ওর।

বিরক্ত করতে ইচ্ছা করছে না ওকে। কিন্তু ডায়না ক্যুপার আর তাঁর ছেলের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে যে-সমাধান বের করেছি, সেটা বলার জন্যও নিশপিশ করছে আমার ভিতরটা। মিনিট পনেরো চুপচাপ বসে থাকার পর আর সহ্য করতে পারলাম না। এই সময়ে তিন পৃষ্ঠা পড়ে ফেলেছে সে।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘বইটা পড়তে কি ভালো লাগছে আপনার?’

‘কী?’

‘দ্য আউটসাইডার।

‘লাগছে মোটামুটি।

‘তার মানে আধুনিক সাহিত্য ভালো লাগে আপনার।’

হোথর্নের চেহারা দেখে বোঝা গেল, আমার কথায় বিরক্ত হচ্ছে। বলল, ‘এই বই আমি নিজে পছন্দ করিনি।’

‘মানে?’

‘মানে… একটা বইয়ের-গ্রুপের সঙ্গে জড়িত আছি।’

বইয়ের গ্রুপ! তা-ও আবার হোথর্ন!

বললাম, ‘আমার বয়স যখন আঠারো, তখন ওই বইটা পড়েছি। যা-হোক, আসল কথায় আসি। আমার ধারণা, কে খুন করেছে মিসেস ক্যুপার আর তাঁর ছেলেকে, সেটা বুঝে ফেলেছি আমি।’

চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল হোথর্ন। একরকমের চ্যালেঞ্জ খেলা করছে ওর দৃষ্টিতে। ‘কে?’

‘অ্যালান গডউইন।’

মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন, তবে সেটা সম্মতি জানানোর কায়দায় না। ‘ডায়ানা ক্যুপারকে খুন করার যথোপযুক্ত কারণ আছে ওই লোকের, কিন্তু আমরা যখন শেষকৃত্যানুষ্ঠানে ছিলাম, তখন তিনিও ছিলেন সেখানে। লন্ডনের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত পাড়ি দিয়ে ড্যামিয়েনের ফ্ল্যাটে অত জলদি গেলেন কী করে তিনি?’

‘আমার ধারণা, বিশেষ সেই মিউযিক বাজতে শুরু করামাত্র কবরস্থান ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন তিনি। তা না-হলে আপনিই বলুন, আর কে ওই এমপি থ্রি প্লেয়ারটা রাখতে যাবে কফিনের ভিতরে? আমাদেরকে যা বলেছেন গডউইন, শুনেছেন আপনি। বলেছেন, গানটা নাকি তাঁর ছেলের প্রিয় গান ছিল।’ আমাকে হোথর্ন থামিয়ে দেয়ার আগেই বলে চললাম, ‘ডায়ানা ক্যুপারকে খুন করার কোনো কারণ নেই অন্য কারও। কেন, আপনি কি দোষ চাপাতে চান ওই ক্লিনার মেয়েটার উপর… কারণ সে টাকা চুরি করেছে মিসেস ক্যুপারের বাড়ি থেকে? নাকি দোষী সাব্যস্ত করতে চান রেমন্ড কুলকে… কারণ তিনি কিছু টাকা খসিয়ে নিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপারের কাছ থেকে? কী হলো… চুপ করে আছেন কেন? এই ব্যাপারটা নিয়ে এখনও তর্কাতর্কি করছি আমরা… আশ্চর্য লাগছে আমার কাছে।’

‘আমি কোনো তর্ক করছি না,’ বলল হোথর্ন, শান্ত আছে এখনও। যা বলেছি আমি তা ভাবল কিছুক্ষণ, তারপর কেমন দুঃখিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। ‘দুর্ঘটনাটা যখন যখন ঘটল, মানে.. মিসেস ক্যুপারের গাড়ির নিচে যখন চাপা পড়ল মিস্টার গডউইনের ছেলে দুটো, ড্যামিয়েন তখন নিজেদের বাসায়। ওই দুর্ঘটনার ব্যাপারে কিছুই করার ছিল না তার। কাজেই তাকে কেন খুন করবে গডউইন?’

‘আমার মনে হয় এই প্রশ্নের জবাবও বের করে ফেলেছি আমি। মনে করুন গাড়িটা আসলে ডায়ানা ক্যুপার চালাচ্ছিলেন না। খেয়াল করে দেখুন, মেরি ও’ব্রায়ান কিন্তু ঠিকমতো দেখতে পায়নি মিসেস ক্যুপারের চেহারা। গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেখেই কিন্তু শেষপর্যন্ত ধরা গেছে ওই মহিলাকে।’

‘তিনি কিন্তু শেষপর্যন্ত গিয়ে হাজির হয়েছিলেন পুলিশ স্টেশনে। ধরা দিয়েছিলেন পুলিশের কাছে।’

‘কাজটা তিনি ড্যামিয়েনকে রক্ষা করার জন্যও করে থাকতে পারেন। … আমার কথা হচ্ছে, যদি বলি গাড়িটা আসলে ড্যামিয়েনই চালাচ্ছিল, তা হলে?’ কথাটা যত ভাবছি, সম্ভাবনাটা ততই প্রকট বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। ‘ড্যামিয়েন, মিসেস ক্যুপারের ছেলে। যে-সময়ে ঘটেছে দুর্ঘটনাটা, সে-সময়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল সে। হতে পারে… মাত্রাতিরিক্ত মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় ছিল তখন। আবার এমনও হতে পারে, কোকেনের মাত্রাতিরিক্ত ডোজ নিয়ে ফেলেছিল। যে-কোনো কিছু হতে পারে আসলে। মিসেস ক্যুপার জানতেন, এসব কথা যদি জানাজানি হয়… যদি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় ড্যামিয়েন, তার ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যাবে। আর তাই ওই দুর্ঘটনার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। সেজন্যই ভুলে-চশমা- ফেলে-যাওয়ার বানোয়াট গল্পটা বানিয়েছিলেন। এই গল্প বানানোর বিশেষ একটা উদ্দেশ্যও ছিল তাঁর… নিজে যাতে না-ফেঁসে যান আইনের চোখে।’

‘এসব আপনার অনুমান… এসবের পক্ষে উপস্থাপন করার মতো কোনো প্রমাণ নেই আপনার হাতে।

‘সত্যি বলতে কী… আছে।’ এতক্ষণে আমার টেক্কাটা চালোম। ‘আপনি যখন রেমন্ড কুন্সের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তিনি তখন বলেছিলেন, যেদিন লাঞ্চ করেছিলেন মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে… মানে যেদিন খুন হয়েছেন ওই মহিলা… সেদিন তিনি মিসেস ক্যুপারকে টিউব স্টেশন থেকে বের হয়ে আসতে দেখেছেন। আমাকে দেখে হাত নেড়েছিল সে… ঠিক এই কথাটাই বলেছিলেন মিস্টার কুন্স। এখন একটা কথা চিন্তা করে দেখুন। মিস্টার কুন্সকে রাস্তার ওপ্রান্তে দেখে যদি হাত নেড়ে থাকতে পারেন মিসেস ক্যুপার, তার মানে ওই মহিলার দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। যাঁর দৃষ্টিশক্তি আজ থেকে কিছু দিন আগে স্বাভাবিক থাকতে পারে, তাঁর সে-শক্তি বছর দশেক আগে কীভাবে খারাপ হবে? অর্থাৎ ওই দুর্ঘটনার পরে পুলিশের কাছে বানিয়ে কথা বলেছেন মিসেস ক্যুপার।’

বিরল একজাতের হাসি দেখা গেল হোথর্নের ঠোঁটের কোনায়। তবে পরমুহূর্তেই মিলিয়ে গেল সেটা। ‘হুঁ… দেখা যাচ্ছে এই কেসে বেশ মনোযোগ দিতে শুরু করেছেন আপনি।’

‘বুঝলাম, কিছু একটা বলতে চান আপনি,’ ক্লান্ত গলায় বললাম। ‘শুনছি।’

‘ওই টিউব স্টেশন থেকে যখন বের হয়ে এসেছিলেন মিসেস ক্যুপার, তখন যে চশমা ছিল না তাঁর চোখে, কে বলল আপনাকে? এ-রকম কি হতে পারে না, তখন চশমা পরে ছিলেন তিনি?’ হোথর্নকে দেখে মনে হচ্ছে আমার কথায় দুঃখ পেয়েছে যেন। আবার এমনও হতে পারে, আমার যুক্তি খণ্ডন করতে গিয়ে কষ্ট পাচ্ছে মনে। ‘মিসেস ক্যুপার চশমা পরে ছিলেন কি না, সে-ব্যাপারে কিন্তু কিছুই বলেননি মিস্টার ক্লন্স। আরেকটা কথা। আপনি বলেছেন, সেদিনের সেই দুর্ঘটনার সময় মিসেস ক্যুপার নাকি গাড়ি চালাচ্ছিলেন না। সেক্ষেত্রে ওই ঘটনার পর গাড়ি চালানো ছেড়ে দিলেন কেন তিনি? কেন বাড়ি বদল করে চলে এলেন অন্য এক জায়গায়? ওই ঘটনার ব্যাপারে যে-ক’জনের সঙ্গে কথা বলেছি, মোটামুটি সবাই বলেছে, ঘটনাটার পর আপসেট হয়ে পড়েছিলেন মিসেস ক্যুপার… যেন এমন কোনো অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন, যা আসলে করেননি তিনি।’

‘হ্যাঁ… ড্যামিয়েন যদি ঘটিয়ে থাকে দুর্ঘটনাটা, তা হলেও আপসেট হয়ে থাকতে পারেন মিসেস ক্যুপার। আমি বলবো, ওই মহিলা ছিলেন ওই ঘটনার… অন্যভাবে যদি বলি, ওই অপরাধের সহযোগী। …কীভাবে জানি না, কিন্তু যে- কোনোভাবেই হোক না কেন, অ্যালান গডউইন জেনে গিয়েছিল সত্যি কথাটা। আর সে-কারণেই তিনি সুযোগ পাওয়ামাত্র খুন করেছেন মিসেস ক্যুপার আর তাঁর ছেলেকে। কারণ ওই দুর্ঘটনার জন্য ওই দু’জনই দায়ী।’

আমরা যে-ট্রেনে সওয়ার হয়েছি, সেটার গতি বেড়েছে। পূর্ব লন্ডন ছাড়িয়ে এগিয়ে চলেছি, আস্তে আস্তে কমে আসছে দালানকোঠার সংখ্যা। শ্যামলিমার দেখা মিলছে এখন। সামনে দেখতে পাচ্ছি কিছু খোলা জায়গাও।

‘আপনার থিউরি মনঃপুত হলো না আমার,’ বলল হোথর্ন। ‘ওই দুর্ঘটনার পর মিসেস ক্যুপারের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করার কথা পুলিশের। আরেকটা কথা।

‘কী?’

অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল হোথর্ন… ভাবখানা এমন, এই কথোপকথন আর চালিয়ে যেতে চাইছে না। কিন্তু তারপর, সম্ভবত, আমার উপর করুণা হলো ওর। ‘আন্ডারটেকার… মানে, মিস্টার কর্নওয়ালিসের কাছে যখন গিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার, তখন ঠিক কী খেলা করছিল তাঁর মনে? এবং ওই ফিউনারেল পার্লারে গিয়ে সবার প্রথমে ঠিক কোন্ জিনিসটা দেখেছিলেন তিনি?’

‘আপনিই বলুন।

‘আমার বলার দরকার নেই, মেইট। এই উপন্যাসের প্রথম চ্যাপ্টারটা যাচ্ছেতাইভাবে লিখে আমাকে দেখিয়েছিলেন আপনি একবার… মনে আছে? আমার প্রশ্নের জবাবটা সেখানে লিখে দিয়েছিলেন আপনি। যা-হোক, আমার মনে হয় যা দেখেছিলেন মিসেস ক্যুপার, সেটা এই কেসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।’

ভাবতে লাগলাম আমি। ওই ফিউনারেল পার্লারে গিয়ে সবার প্রথমে ঠিক কোন্ জিনিসটা দেখেছিলেন মিসেস ক্যুপার?

ওই মহিলার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করার চেষ্টা করলাম ব্যাপারটা।

বাস থেকে নামলেন তিনি। হাঁটতে লাগলেন ফুটপাত ধরে। হ্যাঁ… ফিউনারেল পার্লারের নামটাই সবার আগে দেখেছিলেন তিনি… কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্স। অথবা… অফিসের ঘড়িটা দেখেছিলেন তিনি… তখন সে-ঘড়িতে দুপুর বারোটা বাজতে এক মিনিট বাকি আছে। কিন্তু… এই কেসের সঙ্গে ওই ফিউনারেল পার্লারের নাম অথবা ওই ঘড়ির সম্পর্ক কী? ও… ওই পার্লারের একটা জানালার গোবরাটে মার্বেল দিয়ে একটা বই বানানো ছিল… যে-কোনো আন্ডারটেকারের অফিসেই দেখা যায় ও-রকম কোনো-না-কোনো জিনিস… কিন্তু এসব দেখলে কি বিশেষ কোনো কিছু খেলা করার কথা মিসেস ক্যুপারের মনে? হোথর্ন আমাকে বলেছে, মিসেস ক্যুপার নাকি জানতেন, আজ বাদে কাল মারা যাচ্ছেন তিনি। কেউ একজন হুমকি দিয়েছিল তাঁকে কিন্তু তিনি পুলিশের কাছে যাননি। কেন?

হঠাৎ করেই টের পেলাম, রেগে যাচ্ছি আমি।

‘ঈশ্বরের দোহাই লাগে, হোথর্ন,’ বলে উঠলোম, ‘আমার নাকে দড়ি দিয়ে অর্ধেকটা ইংল্যান্ড ঘুরিয়েছেন আমাকে। কাজেই আমরা আসলে কী করছি, অন্তত সেটা তো বলতে পারেন… নাকি?’

‘সেটা ইতোমধ্যেই বলেছি আপনাকে। জাজ নাইজেল ওয়েস্টনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। তারপর যাবো যেখানে-দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল সেখানে।’

‘তার মানে আপনি ভাবছেন ওই দুর্ঘটনার সঙ্গে এই কেসের সম্পর্ক আছে।’

হাসল হোথর্ন। জানালার কাঁচে ওর চেহারার প্রতিবিম্ব দেখতে পেলাম। ‘দিনশেষে যখন আপনাকে আপনার কাজের জন্য টাকা দেয়া হবে, তখন সব কিছুর সঙ্গে সব কিছুরই কোনো-না-কোনো সম্পর্ক আছে।’

বইয়ে মনোযোগ দিল সে, আর কোনো কথা বলল না।

.

নাইজেল ওয়েস্টন, মানে যে-জাজ দ্য ক্রাউন বনাম ডায়ানা ক্যুপারের কেসটা পরিচালনা করেছিলেন এবং পক্ষপাত দেখিয়েছিলেন দ্বিতীয় পক্ষের প্রতি, থাকেন কেন্টাব্রি’র একেবারে কেন্দ্রস্থলে। তাঁর বাসস্থানের একপাশে আছে একটা গির্জা, আরেক পাশে আছে সেইন্ট অগাস্টিন’স কলেজ। সে-বাসস্থান দেখলে মনে হবে, সারাটা জীবন আইন নিয়ে কাজ করার পরও নিজেকে ঘিরে রাখার জন্য ইতিহাস আর ধর্ম বেছে নিয়েছেন তিনি। কারণ আমাদের চারপাশে এখন প্রাচীন সব দেয়াল আর চূড়া, সেইসঙ্গে পথেঘাটে বাইসাইকেলে সওয়ার হয়ে চলেছেন মিশনারিরা। তাঁর বাড়িটা কেমন চারকোনা, নিরেট, দেখলে মনে হয় সব কিছু বানানো হয়েছে সমান অনুপাতে। যতদূর চোখ যায়, শুধু সবুজ আর সবুজ। জায়গাটা আরামদায়ক, এই শহর আরামদায়ক, এবং চারদিক দেখলে মনে হয় নাইজেল ওয়েস্টন আরামদায়ক একটা জীবন যাপন করছেন।

তাঁর সঙ্গে এগারোটার সময় দেখা করার ব্যাপারটা চূড়ান্ত করেছে হোথৰ্ন। ট্যাক্সি থেকে নেমে ড্রাইভারকে টাকা দিচ্ছি, এমন সময় খেয়াল করলাম আমাদের জন্য সদর দরজায় অপেক্ষা করছেন ওয়েস্টন। তাঁকে দেখলে যতটা না একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যারিস্টার বলে মনে হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি মনে হয় একজন সুরকার… সুর-পরিচালকও বলা যেতে পারে সম্ভবত। হালকাঁপাতলা শরীর তাঁর, কেমন রোগাটে বলে মনে হয়। আঙুলগুলো লম্বা লম্বা, মাথায় রূপালি চুল। চোখে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি। বয়স সত্তরের ঘরে। দেখলে মনে হয়, বয়সের ভারে কুঁচকে যাচ্ছেন। ভারী একটা নিট-কার্ডিগান এবং মোটা সুতি কাপড়ের ফুল প্যান্ট পরে আছেন। মনে হচ্ছে ওগুলোর ভিতরে যেন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। শু পরেননি, বরং স্লিপার পরেছেন। চোখ দুটো গর্তে বসে গেছে। গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছেন আমাদের দিকে। কণ্ঠার হাড় দুটো দেখলে কেমন অনমনীয় বলে মনে হয় তাঁকে।

‘আসুন, ভিতরে আসুন। আশা করি আপনাদের যাত্রা সুখকর হয়েছে। এত সদয় আর অমায়িক আচরণ করছেন কেন তিনি, ভাবলাম। আমার ধারণা, কেন এসেছি আমরা এখানে, সেটা তাঁকে জানায়নি হোথর্ন।

পুরু কার্পেট, অ্যান্টিক আসবাব আর দামি আর্টে ঠাসা একটা হলওয়ে ধরে তাঁর পিছন পিছন এগিয়ে চলেছি আমরা দু’জন। এরিজ জিল নামের একজন ডিযাইনারের একটা ড্রয়িং চিনতে পারলাম আমি। এরিক র‍্যাভিলিয়াস নামের এক চিত্রশিল্পীর একটা জলরঙও চোখে পড়ল। দুটোই আসল।

আমাদেরকে ছোট একটা লিভিংরুমে নিয়ে গেলেন নাইজেল ওয়েস্টন। এখান থেকে বাইরের শ্যামলিমা দেখা যায়। একধারের ফায়ারপ্লেসে জ্বলছে আগুন। একটা টেবিলের উপর আগে থেকেই আমাদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে কফি আর বিস্কিট।

বসে পড়লাম আমরা।

‘আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগল, মিস্টার হোথর্ন,’ বলতে শুরু করলেন নাইজেল ওয়েস্টন। ‘বেশ নামডাক আছে আপনার। রাশান রাষ্ট্রদূতের সেই কেসটা… দ্য বেযরুকভ কেস… চমৎকার কাজ দেখিয়েছেন আপনি।’

‘কিন্তু শেষপর্যন্ত অপরাধী হিসেবে প্রমাণ করা যায়নি তাঁকে,’ মনে করিয়ে দেয়ার কায়দায় বলল হোথর্ন।

‘নিজের জন্য খাসা একজন উকিল নিয়োগ দিয়েছিলেন তিনি। আর… আমার ধারণা জুরিকে ভুল পথে পরিচালিত করা হয়েছিল। …কফি খাবেন?’

হোথর্নকে যে আগে থেকেই চেনেন নাইজেল ওয়েস্টন, আশা করিনি ভাবলাম, হোথর্ন যতদিনে বেরিয়ে এসেছে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে, সেই বেযরুকভ কেস কি সে-ঘটনার আগের নাকি পরের? কারণ ওই কেস হোথর্ন তদন্ত করবে… ব্যাপারটা কেমন যেন অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে।

আমাদের তিনজনের জন্যই কফি ঢালছেন নাইজেল ওয়েস্টন। এই সুযোগে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি আমি। ঘরের বড় একটা অংশ দখল করে রেখেছে ক্ষুদ্রকায় একটা গ্র্যান্ড পিয়ানো। ঢাকনাটা নামানো আছে, সেটার উপর দামি ফ্রেমে ঠাঁই পেয়েছে আধ ডজন ফটোগ্রাফ। চারটা ছবিতে অন্য কোনো লোকের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে ওয়েস্টনকে। একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক লোকের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, তাঁদের দু’জনেরই পরনে হাওয়াইয়ান শার্ট আর শর্টস। আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই, ইতোমধ্যে এই ছবিগুলো দেখা হয়ে গেছে হোথর্নের।

‘তো… ক্যান্টাব্রিতে আসা হলো কেন?’ জানতে চাইলেন ওয়েস্টন।

‘একটা জোড়া খুনের কেস তদন্ত করছি আমি,’ ব্যাখ্যা করল হোথর্ন। ‘ডায়ানা ক্যুপার এবং তাঁর ছেলে।’

‘হ্যাঁ, পড়েছি আমি ওই খুন দুটোর ব্যাপারে। ভয়ঙ্কর ব্যাপার। মেট্রোপলিটান পুলিশকে পরামর্শ দিচ্ছেন আপনি?’

‘হ্যাঁ, স্যর।’

‘ওরা আপনাকে একেবারেই ছেড়ে না-দিয়ে খুব ভালো কাজ করেছে। …কী ধারণা আপনার… ডিলে যে-দুর্ঘটনা ঘটেছিল এবং তার ফলে যে-ছেলেটা মারা গিয়েছিল, সে-ঘটনার সঙ্গে ওই খুন দুটোর কোনো সম্পর্ক আছে?’

‘আমি কোনো সম্ভাবনাই বাদ দিচ্ছি না, স্যর।’

‘এসব কেসে আবেগ প্রচণ্ড একটা ব্যাপার হতে পারে কখনও কখনও। খেয়াল করেছি, ওই দুর্ঘটনার দশ বছর হতে চলেছে। আর তাই দুর্ঘটনাটাকে হত্যাকাণ্ড- দুটোর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ভাবছি আমিও। …ওই সময়ে আদালতে যেসব রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছিল, ইচ্ছা করলেই তো সেগুলো ঘাঁটতে পারেন আপনি; কাজেই আমি ঠিক কীভাবে সাহায্য করতে পারি আপনাকে, বুঝতে পারছি না।’

এখনও একজন বিচারকের মতো কথা বলেন নাইজেল ওয়েস্টন। চিন্তাভাবনা না-করে একটা শব্দও উচ্চারণ করেন না।

‘যে বা যাঁরা জড়িত ছিলেন ওই বিচারকাজের সঙ্গে, আমার মনে হয় তাঁদের সঙ্গে কথা বলাটাও দরকার।’

‘মানলাম। সাক্ষ্য আর লিখিত প্রমাণের মাঝখানে কিছু-না-কিছু পার্থক্য থাকে সব সময়ই। …গডউইন পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন?’

‘হ্যাঁ, স্যর।’

‘তাদের জন্য খুব খারাপ লাগে আমার। তাদের জন্য ওই সময়ও খারাপ লেগেছিল আমার এবং সেটা বলেছিও। তারা ভেবেছিল, আমি বোধহয় ন্যায়বিচার করিনি তখন। কিন্তু, মিস্টার হোথর্ন, আপনাকে বলার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না, তারপরও বলছি… এসব কেসে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবার কী ভাবল না-ভাবল তা আমলে নেয়ার কোনো সুযোগ থাকে না

‘বুঝতে পেরেছি।’

দরজাটা খুলে গেল এমন সময়, দ্বিতীয় আরেকজন লোককে দেখা গেল। এই লোককে পিয়ানো-উপর-রাখা ফটোগ্রাফে দেখেছি কিছুক্ষণ আগে। লোকটা বেঁটে, বেশ গাঁট্টাগোট্টা, বয়সে ওয়েস্টনের চেয়ে বছর দশেকের ছোট। হাতে একটা সুপারমার্কেটের-শপিংব্যাগ।

‘বাইরে যাচ্ছি আমি,’ বললেন লোকটা, ‘আপনার কিছু লাগবে?’

‘কিচেনে লিস্ট রেখে দিয়েছি।’

‘নিয়েছি ওটা। কোনো কিছু লিখতে ভুলে গেছেন কি না, সেটাই ভাবছিলাম।’

‘আরও কিছু ডিশওয়াশার ট্যাবলেট দরকার আমাদের।’

‘লিস্টে আছে ওটা।

‘তা হলে আর কিছু লাগবে বলে মনে হয় না।’

‘দেখা হবে,’ বলে গায়েব হয়ে গেলেন লোকটা।

‘কলিন,’ গাঁট্টাগোট্টার পরিচয় দিলেন ওয়েস্টন।

‘আপনি যে-রায় দিয়েছিলেন তখন, তাতে পত্রিকাওয়ালারাও খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেনি,’ বলল হোথর্ন। খেয়াল করলাম, অদ্ভুত একজাতের বিদ্বেষ খেলা করছে ওর চোখে।।

একটুখানি হাসলেন ওয়েস্টন। ‘আমি যে-রায় দিয়েছি সেটা নিয়ে পত্রপত্রিকায় কী লেখালেখি হলো, সেসব দেখার স্বভাব কোনোকালেই ছিল না আমার। পত্রিকাওয়ালাদের খুশি হওয়া অথবা বেজার হওয়ার সঙ্গে আসল ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।’

‘আসল ঘটনা মানে? আট বছর বয়সী একটা ছেলেকে পরপারে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার। ওই ছেলের ভাইকে পঙ্গু বানিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাপারটা যখন আদালত পর্যন্ত গড়াল, তখন নামকাওয়াস্তের শাস্তি পাওয়া ছাড়া আর তেমন কিছু হলো না তাঁর।’

ওয়েস্টনের হাসিটা মলিন হলো। ‘রোড ট্রাফিক অ্যাক্ট ১৯৮৮-এর সেকশন টু- এ অনুযায়ী, প্রসিকিউশনের দায়িত্ব হচ্ছে, বিপজ্জনক ড্রাইভিঙের মাধ্যমে যদি কারও মৃত্যু হয়ে থাকে, সেটা প্রমাণ করা। কিন্তু তারা সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এবং তাদের সে-ব্যর্থতার কারণও আছে। মিসেস ক্যুপার আইন ভঙ্গ করেননি, আবার এমন কিছুও করেননি যার ফলে কেউ বলতে পারবে, ঝুঁকিপূর্ণ ড্রাইভিং করছিলেন তিনি তখন। গাড়ি চালানোর আগে তিনি ড্রাগ নেননি, মাত্রাতিরিক্ত মদও খাননি। আর কিছু কি বলার দরকার আছে আমার? আসলে আমি যা বলতে চাইছি তা হলো, কাউকে খুন করার কোনো ইচ্ছা ছিল না ওই মহিলার।

‘তিনি সে-সময় চশমা পরে ছিলেন না,’ বলল হোথর্ন, তাকাল আমার দিকে। আমি যাতে ব্যাঘাত সৃষ্টি না-করি, সে-ব্যাপারে ইশারায় নিষেধ করল আমাকে।

‘মানলাম। ঘটনাটা দুঃখজনক। কিন্তু, মিস্টার হোথর্ন, আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন, ঘটনাটা ২০০১ সালের। তারপর থেকে বিশেষ এই ব্যাপারে আইন অনেক কড়া হয়ে গেছে। এবং আমার মনে হয় সেটা ঠিকই হয়েছে। তারপরও, আমার মনে হয়, ও-রকম কোনো কেসে যদি আজ আমাকে বিচারকের ভূমিকা পালন করতে হতো, তা হলেও একই রায় দিতাম।’

‘কেন?’

সে-সময়ের আদালতের কার্যক্রমের লিখিত প্রতিলিপি যদি দেখে নেন, ভালো হয়। তারপরও বলি… ওই বাচ্চা দুটো… ওরাই কিন্তু দৌড়ে হাজির হয়ে গিয়েছিল রাস্তার মাঝখানে। রাস্তার ও-প্রান্তে আইসক্রিমের দোকানটা দেখতে পেয়েছিল তারা। তাদের দেখভালের দায়িত্ব ছিল যে-মেয়ের উপর, সে সামান্য কিছু সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল ছেলে দুটোর উপর। ওই মেয়েকেও দোষ দেয়া যায় না আসলে। কিন্তু একটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখুন, মিসেস ক্যুপার যদি চশমা পরে থাকতেনও, হয়তো সময়মতো থামাতে পারতেন না গাড়িটা।’

‘সে-কারণেই কি তাঁকে বেকসুর খালাস দেয়ার কথা বলেছিলেন আপনি জুরিকে?’ দেখে মনে হলো, হোথর্নের কথা শুনে মনে চোট পেয়েছেন ওয়েস্টন। কিছু বলার আগে চুপ করে থাকলেন কয়েকটা মুহূর্ত। ‘সে-রকম কিছুই করিনি আমি। আর… সরাসরিই বলি… আপনার কথা কিছুটা আক্রমণাত্মক বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। স্বীকার করে নিচ্ছি, আমি যে-রায় দিয়েছিলাম সেটা মিসেস ক্যুপারের পক্ষে গেছে, তারপরও পুরো ঘটনা ভেবে দেখার অনুরোধ জানাবো আপনাকে। ক্রিমিনাল রেকর্ড বলতে কিছুই ছিল না তাঁর, এবং তিনি ছিলেন সম্মানিত একজন মানুষ। ছেলে দুটোর পরিবারের জন্য ওই ঘটনা ছিল খুবই দুঃখজনক, কিন্তু সেটা বিবেচনা করে যদি কোনো রায় দিতাম, তা হলে সে-রায়ও যথোপযুক্ত হতো না।’

সামনের দিকে ঝুঁকল হোথর্ন। শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেছে এমন কোনো বুনো জন্তুর কথা মনে পড়ে গেল আমার আরও একবার। ‘ভদ্রমহিলাকে চিনতেন আপনি।’

তিনটা সাধারণ শব্দ উচ্চারণ করেছে হোথর্ন, অথচ তাতেই কেমন স্তব্ধ হয়ে গেছেন ওয়েস্টন। আমার মনে হচ্ছে, যেন দড়াম করে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে কোনো শবকক্ষের দরজা। হঠাৎ করেই যেন বদলে গেছে আমার আশপাশের সব কিছু। নাইজেল ওয়েস্টন যেন হঠাৎই টের পাচ্ছেন, বিপদ হাজির হয়েছে এই ঘরে। আগুনে পুড়ছে কাঠ, সে-আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। সে-উত্তাপ টের পাচ্ছি নিজের চেহারায়।

‘সরি?’ বললেন ওয়েস্টন।

‘আমার মনে হয়, মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে পূর্বপরিচয় ছিল আপনার। এবং আমার আরও মনে হয়, রায় দেয়ার সময় সে-পরিচয় কিছুটা হলেও ভূমিকা পালন করেছে।’

‘আপনার ভুল হয়েছে। মিসেস ক্যুপারকে চিনতাম না আমি।’

দেখে মনে হলো, থতমত খেয়ে গেছে হোথর্ন। ‘রেমন্ড ক্রুন্সের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল আপনার।

‘আমার মনে হয় না…’

‘রেমন্ড কুন্স… থিয়েটারের প্রযোজক। ওই লোকের নাম তো আপনার ভুলে যাওয়ার কথা না। তাকে কাজে লাগিয়ে অনেক টাকা কামিয়েছেন আপনি।’

আত্মসংবরণ করতে কষ্ট হচ্ছে ওয়েস্টনের। ‘রেমন্ড কুন্সকে ভালোমতোই চিনি আমি।’

‘একটা শো-তে টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন আপনি।’

‘একটা না, দুটো। লা কেইজ অঁ ফলে এবং দ্য ইম্পর্টেন্স অভ বিইং আর্নেস্ট।’

‘দ্বিতীয় নাটকটাতে অভিনয় করেছিল ড্যামিয়েন ক্যুপার। সে-নাটক উপলক্ষে যে-ফার্স্ট নাইট পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল, সেটাতে ড্যামিয়েন আর তার মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আপনার। ঠিক না?’

‘না।’

‘কিন্তু দুর্ঘটনার সেই কেস নিয়ে কুন্সের সঙ্গে কথা বলেছিলেন আপনি।’

‘কে বলেছে?’

‘কুন্স নিজেই।’

আর সহ্য করতে পারলেন না ওয়েস্টন। ‘আপনার সাহস তো কম না! আমার বাড়িতে বসে আমারই বিরুদ্ধে লাগাতার অভিযোগ করে চলেছেন!’ কণ্ঠ চড়াননি তিনি, কিন্তু ক্রোধোন্মত্ত হয়ে গেছেন। যে-আর্মচেয়ারে বসে আছেন সেটার হাতল আঁকড়ে ধরেছেন দুই হাতে। তাঁর চামড়ার নিচের রগগুলো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। ‘ওই পার্টিতে গিয়েছিলাম আমি, কিন্তু ড্যামিয়েন ক্যুপার অথবা তার মা যদি সেখানে গিয়েও থাকে, আমার সঙ্গে দেখা হয়নি তাদের, কথাও হয়নি।’

‘মিসেস ক্যুপার কি ওই বিচারকাজ চলার সময় বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে রেমন্ড কুন্সকে পাঠিয়েছিলেন আপনার কাছে?’

‘কেন করতে যাবেন তিনি কাজটা?’

‘যাতে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করেন আপনি ঘটনাটা। যাতে রেমন্ড কুন্সের কথা শোনেন আপনি। কারণ আপনি এবং মিসেস ক্যুপার দু’জনই টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন কুন্সের নাটকে।’

‘যথেষ্ট হয়েছে,’ উঠে দাঁড়ালেন ওয়েস্টন। ‘আপনার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছিলাম, কারণ ভেবেছিলাম হয়তো সাহায্য করতে পারবো আপনাকে। তা ছাড়া আপনার নামও শুনেছিলাম অনেক। কিন্তু আপনি আজেবাজে কথা বলে মেজাজটাই খারাপ করে দিলেন আমার… আপনার সঙ্গে কথা বলার আর কোনো প্রয়োজন বোধ করছি না।’

কিন্তু কথা এখনও শেষ হয়নি হোথর্নের। ‘আপনি কি জানেন রেমন্ড কুন্স জেলে যাচ্ছেন?’

‘আপনাকে চলে যেতে বলেছি!’ চিৎকার করে উঠলেন ওয়েস্টন।

আর কিছু বলল না হোথর্ন, বেরিয়ে এল।

আমিও তা-ই করলাম।

স্টেশনের পথে যখন ফিরে চলেছি, তাকালাম ওর দিকে। ‘আপনি আসলে কেন এসেছিলেন নাইজেল ওয়েস্টনের কাছে, বলুন তো?’

একটা সিগারেট ধরাল হোথর্ন। ‘ওই দুর্ঘটনাটার ব্যাপারে আরও বেশি কিছু জানতে চাই। ডায়ানা ক্যুপার আর গডউইন পরিবারের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল কি না, জানতে চাই। আমার ধারণা, নাইজেল ওয়েস্টন ছিলেন সে- যোগাযোগের একটা অংশ। আর সেটাই বের করতে চাইছি আমি।’

‘তার মানে আপনি ভাবছেন খুন দুটোর ব্যাপারে কিছু-না-কিছু করার ছিল ওয়েস্টনের?’

‘যাদের সঙ্গেই দেখা করেছি আমরা, খুন দুটোর ব্যাপারে কিছু-না-কিছু করার ছিল তাদের প্রত্যেকেরই। হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারটাই ও-রকম। আপনি বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় মারা যেতে পারেন। ক্যান্সারে ভুগে মারা যেতে পারে। আবার বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগেও মারা যেতে পারেন। কিন্তু কেউ যখন আপনাকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে, অথবা আপনার শ্বাসরোধ করবে, তখন বুঝতে হবে কোথাও-না-কোথাও কোনো-না-কোনো ছক আছে… একটা নেটওয়ার্ক আছে… আর সেটাই খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি আমরা।’ মাথা নাড়ল হোথর্ন। ‘আমি আসলে জানি না! আপনি হয়তো এ-সবের জন্য উপযুক্ত না, টনি। অন্য লেখকদের কাছে যে যেতে পারিনি আমি, সেটা ভেবে এখন লজ্জাই লাগছে আমার।’

‘কী?’ ঘাবড়ে গেছি আমি। ‘কী বলছেন আপনি?’

‘যা বলেছি, শুনতে পেয়েছেন।’

‘অন্য লেখকদের সঙ্গে কথা বলেছেন আপনি?’

‘অবশ্যই, মেইট। তবে আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন তাঁরা।’

১৮. ডিল

ট্রেনে সওয়ার হয়ে ডিলে যাওয়ার পথে হোথর্নের সঙ্গে একটা কথাও বললাম না। এবার একটু দূরে সরে বসেছি ওর থেকে। আগের সেই বইটা পড়ছে সে, থেকে থেকে পাতা উল্টাচ্ছে। আমি জানালা দিয়ে গোমড়া মুখে তাকিয়ে আছি বাইরে, হোথর্নের শেষ কথাটা ভাবছি। কিন্তু যখন হাজির হয়ে গেলাম ডিলে, ব্যাপারটা বেরিয়ে গেল আমার মাথা থেকে।

এর আগে কখনও ডিলে আসিনি আমি। তবে আসতে চেয়েছিলাম বহুবার। কারণ সমুদ্রতীরবর্তী কোনো শহরের প্রতি সব সময়ই একরকমের অনুরাগ ছিল আমার মনে… বিশেষ করে যখন পর্যটকদের মৌসুম চলে না, তখন। কারণ সে- সময় রাস্তাঘাট থাকে ফাঁকা। সে-সময় আকাশটা থাকে ধূসর, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিও হয় কখনও কখনও। আমার ভালো লাগে বালিয়াড়ি, স্লট মেশিন, পিয়ার্স, সিগাল, প্রিন্ট- করা নামের পিপারমিন্ট রক। ক্যাফে আর চায়ের দোকান, পট থেকে কাদাপানির– মতো-দেখতে চা ঢালতে থাকা বুড়ি মহিলাদের দল, মাছ ধরার জাল বিক্রি করে এমন দোকান, গাছের সারি এবং নভেলটি হ্যাঁটের প্রতি একরকমের লালসা আছে আমার মনে।

কিন্তু যখন স্টেশন থেকে বের হলাম, ডিল শহরটা তখন আশ্চর্য রকম আকর্ষণহীন বলে মনে হলো আমার। হাঁটতে লাগলাম প্রধান সড়কটা ধরে। আমাদের মাথার উপর চিৎকার করছে সিগালের দল… বিভিন্ন বাড়ির ছাদে বসে আছে ওগুলো। এখন মে মাস, পর্যটনের মৌসুম শুরু হতে বাকি আছে এখনও। আবহাওয়া নিতান্তই খারাপ। স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য এই শহর কেমন, সে-চিন্তা খেলে গেল আমার মনে।

হাজির হলাম সমুদ্রের ধারে। আবহাওয়া ঠাণ্ডা, চারপাশের কোনো কিছুর প্রতিই কোনো আকর্ষণ বোধ করছি না। একটামাত্র পিয়ার আছে বেলাভূমিতে; সেটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্বল পিয়ার বলে মনে হচ্ছে আমার। কোথাও কোনো পেনি আর্কেড নেই, ট্রাম্পোলিন নেই, ক্যারোযেল নেই। এ-রকম এক জায়গায় গডউইন দম্পতি তাদের দুই ছেলেকে পাঠাতে গেল কেন? এখানে অন্য কোথাও কি বিনোদনের ভালো কোনো ব্যবস্থা ছিল?

যেখানে ঘটেছিল দুর্ঘটনাটা, প্রথমেই সেখানে গেলাম না আমরা।

ডায়ানা ক্যুপার কোথায় থাকতেন, সেটা আগে দেখতে চায় হোথর্ন। আর তাই সাগরের ধারে পৌঁছে ডানদিকে মোড় নিলাম আমরা। এখান দিয়ে যাওয়া যায় কাছের একটা গ্রামে। গ্রামটার নাম ওয়ালমার। এখনও আমাদের দু’জনের মধ্যে কথা বলা বন্ধ আছে।

একটা অ্যান্টিক শপকে পাশ কাটাচ্ছি, এমন সময় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল হোথর্ন, ওই দোকানের জানালা দিয়ে তাকাল ভিতরে। কিন্তু একটা জাহাজের- কম্পাস, একটা গ্লোব, একটা সেলাই মেশিন, নষ্ট হয়ে যাওয়া কিছু বই আর ছবি ছাড়া অন্যকিছু নজরে পড়ল না।

আরও মিনিট পনেরো হাঁটলাম আমরা। তারপর সহসাই হাজির হয়ে গেলাম ওয়ালমার গ্রামে। গিয়ে দাঁড়ালাম স্টোনার হাউসের সামনে। বিশেষ সেই দুর্ঘটনা ঘটার আগে এখানেই থাকতেন ডায়ানা ক্যুপার, পরে বাধ্য হয়ে এই জায়গা ছেড়ে চলে যান। দু’পাশে দুটো রাস্তা স্যান্ডউইচের মতো ঘিরে রেখেছে বাড়িটাকে। পেছনের রাস্তাটা লিভারপুল রোড, আর সামনেরটা দ্য বীচ। দুই রাস্তার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে ব্যক্তিগত একটা ড্রাইভ। সেটার দুই মাথায় আছে সুসজ্জিত দুটো ধাতব গেট।

ডায়ানা ক্যুপারকে যতটুকু চিনেছি, সে-অনুযায়ী আমি বলবো, এই বাড়িতে চমৎকার মানিয়ে গিয়েছিল তাঁকে। বাড়িটা ধূসর নীলাভ রঙের, দেখলে নিরেট বলে মনে হয়। রক্ষণাবেক্ষণের কাজ নিয়মিত করা হয় এখনও। বাড়িটা দুই তলা। চিমনির সংখ্যা একাধিক। একদিকে একটা গ্যারেজ আছে। সদর দরজার সামনে যেন পাহারায় নিয়োজিত আছে পাথরে-নির্মিত দুটো সিংহ। চারদিকে গাছের সারি, সুন্দর করে ছেঁটে রাখা হয়েছে সেগুলোর ডালপাতা; সরু কিছু ফ্লাওয়ারবেডে শোভা পাচ্ছে অর্ধগ্রীষ্মমণ্ডলীয় কতগুলো গাছ। নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর লাগানো হয়েছে ওগুলো। পুরো এলাকা যে ব্যক্তিগত সেটা বোঝানোর জন্য জায়গাটা ঘিরে দেয়া হয়েছে দেয়াল দিয়ে।

‘আমরা কি বেল বাজাবো?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি, দাঁড়িয়ে আছি লিভারপুল রোডের এককোনায়। যতদূর বুঝতে পারছি, ওই বাড়িতে কেউ নেই।

‘না। দরকার নেই।’ পকেট থেকে একটা চাবি বের করল হোথর্ন। দেখতে পেলাম, সেটার গায়ে একটা ট্যাগ লাগানো আছে, আর সেই ট্যাগে লেখা আছে বাড়িটার নাম।

থতমত খেয়ে গেলাম।

তবে ব্যাপারটা বুঝতে বেশি সময় লাগল না আমার। এই চাবি মনে হয় ডায়ানা ক্যুপারের কিচেন থেকে জোগাড় করে নিয়েছে হোথর্ন, কিন্তু কখন করেছে কাজটা সে-ব্যাপারে নিশ্চিত না আমি। পুলিশ যদি টের পেত মিসেস ক্যুপারের শেষ আবাসস্থল থেকে কোনো কিছু সরাচ্ছে হোথর্ন, তা হলে কাজটা কখনোই করতে দিত না তাকে। তার মানে, ধরে নেয়া যায়, এই চাবির অস্তিত্বে সম্পর্কে কিছু জানা ছিল না পুলিশের।

চাবিটা নিরেট আর মোটাসোটা। ইয়েল জাতীয় কোনো কিছু না। বুঝতে পারছি, এটা সদর-দরজার চাবি না আসলে। তার মানে এটা দিয়ে ওই ধাতব দরজা দুটোর কোনো একটা খোলা যাবে হয়তো। একটা দরজার দিকে এগিয়ে গেল হোথর্ন, ওই চাবি দিয়ে দু’বার চেষ্টা করল তালা খুলতে কিন্তু পারল না। মাথা নেড়ে বলল, ‘এটা এই দরজার চাবি না।’

দ্য বীচ লাগোয়া যে-রাস্তা আছে, সেখানে গেলাম আমরা; এখানকার দরজাটা খোলার চেষ্টা করল হোথর্ন সেই চাবি দিয়ে। কিন্তু এবারও পারল না। বিড়বিড় করে বলল, ‘দুঃখের বিষয়।’

‘এই বাড়ি ছেড়ে দেয়ার পরও এখানকার একটা চাবি নিজের কাছে রাখতে গেলেন কেন মিসেস ক্যুপার?’ জিজ্ঞেস করলাম।

‘আমিও জানতে চাই সেটা।’

এদিক-ওদিক তাকাল হোথর্ন। ভাবলাম, আমাদেরকে এবার হয়তো হেঁটে ফিরে যেতে হবে ডিলে। কিন্তু আরেকটা গেট দেখতে পেয়েছে সে… আমিও দেখেছি ওটা। স্টোনার হাউসে একটা আলাদা আর ব্যক্তিগত বাগান আছে… বেলাভূমির ঠিক পাশেই। আনমনে হাসল হোথর্ন, রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে গেল ওই দরজার দিকে, তৃতীয়বারের চেষ্টায় কাজে লেগে গেল ওর সেই চাবি।

ছোট একটা চৌকোনা জায়গায় প্রবেশ করলাম আমরা। চারদিকে ছোটবড় ঝোঁপঝাড়। আসলে বাগান বলতে যা বোঝায়, এই জায়গা সে-রকম কিছু না, বরং এটাকে একটা চত্বর বলা যেতে পারে। ক্ষুদ্রাকৃতির কিছু ইউ গাছ আছে এদিকে- সেদিকে, আর আছে গোলাপ ফুলের কিছু বেড। এগুলো ঘিরে রেখেছে মার্বেল পাথরে-বানানো সুন্দর একটা ফোয়ারাকে। ঘিরে রেখেছে কাঠের দুটো বেঞ্চকেও… ওগুলো দাঁড়িয়ে আছে একটা আরেকটার মুখোমুখি। ইয়র্ক পাথরে মুড়ে দেয়া হয়েছে জমিন। এত কিছুর কারণে পুরো জায়গায় তৈরি হয়েছে মঞ্চনাটকের মতো একটা আবহ… মনে হচ্ছে, বাচ্চাদের কোনো নাটকের কোনো দৃশ্য দেখছি যেন।

এগিয়ে গেলাম ফোয়ারাটার দিকে। শুকিয়ে খটখট করছে ওটা, বোঝাই যায় অনেকদিন হয়ে গেল আর ব্যবহৃত হচ্ছে না। কেমন একটা দুঃখের অনুভূতি ভর করল আমার মনে। কী খুঁজে পেতে চলেছি আমরা, সে-ব্যাপারে একটা ধারণাও জন্মাল।

এবং সেটা চোখে পড়তে বেশি সময় লাগল না।

ফোয়ারাটার একদিকে, পাথরের গায়ে খোদাই করা আছে :

লরেন্স ক্যুপার
৩ এপ্রিল –২২ অক্টোবর ১৯৯৯
‘টু স্লিপ, পারচ্যান্স টু ড্রিম।

‘মিসেস ক্যুপারের স্বামী,’ বললাম আমি।

‘হ্যাঁ। ক্যান্সারে ভুগে মারা গিয়েছিলেন ভদ্রলোক। আর তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যেই এই জায়গা বানিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার। বেচারী এই বাড়িতে থাকতে পারেননি, কিন্তু জানতেন, এখানে ফিরে আসতে চাইবেন বার বার। আর তাই এই বাড়ির একটা চাবি রেখে দিয়েছিলেন নিজের কাছে।

‘মিসেস ক্যুপার তাঁর স্বামীকে খুবই ভালোবাসতেন,’ বললাম আমি।

মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন।

একটাবারের জন্য মনে হলো আমার, আমরা দু’জনই ভুগছি অস্বস্তিতে।

‘চলুন বেরিয়ে যাই এখান থেকে,’ বলল হোথর্ন।

.

যে-দুর্ঘটনা বদলে দিয়েছিল ডায়ানা ক্যুপারের জীবন, সেটা ঘটেছিল ডিলের কেন্দ্রস্থলে… দ্য রয়্যাল নামের একটা হোটেলের কাছে। হোটেলটা সুন্দর, জর্জিয়ান আমলের। এখানেই উঠেছিল মেরি ও’ব্রায়ান, তার সঙ্গে ছিল জেরেমি আর টিমোথি গডউইন। বিকেলের নাস্তা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে আর যখন মাত্র কয়েক মিনিট বাকি ছিল তাদের তিনজনের, তখনই ঘটে দুর্ঘটনাটা।

মেরি কী বলেছিল, মনে পড়ে গেল আমার। সৈকত থেকে উঠে এসেছিল জেরেমি আর টিমোথি… এই মুহূর্তে আমাদের পেছনে আছে ওই বেলাভূমি। এখানকার রাস্তাটা ডিলের যে-কোনো জায়গার রাস্তার তুলনায় চওড়া, ফলে এই জায়গায় হাজির হলে গাড়ির চালকেরাও স্বাভাবিকভাবে গতি বাড়িয়ে দেয়। রাস্তার একধারে একটা দোকান দেখা যাচ্ছে, আরেক প্রান্তে আছে একটা এন্টারটেইনমেন্ট আর্কেড। আরও দেখতে পাচ্ছি একটা পাব এবং একটা ওষুধের দোকান। দোকানটার নাম পিয়ার ফার্মেসি। সবশেষে, ওষুধের ওই দোকানের পাশে, দেখা যাচ্ছে আইসক্রিম শপটা। দোকানটার সামনের দিকের পুরোটা বানানো হয়েছে প্লেট-গ্লাস উইন্ডো দিয়ে, সেটার উপর লাগিয়ে রাখা হয়েছে একটা উজ্জ্বল আর চিত্রবিচিত্র শামিয়ানা।

ওই দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটেছিল সেটা অনুমান করে নেয়াটা মোটেও কঠিন কোনো কাজ না এখন আমার জন্য: রাস্তার একটা কোনা ঘুরে বেরিয়ে এসেছিল মিসেস ক্যুপারের গাড়ি, দ্রুত ড্রাইভ করছিলেন তিনি। ঠিক ওই সময়ে জেরেমি আর টিমোথি সিদ্ধান্ত নেয় পালাবে মেরি ও’ব্রায়ানের কাছ থেকে, ফুটপাত ধরে ছুট লাগায় তারা। তারপর হুট করেই নেমে পড়ে রাস্তায়, দৌড় দেয় ওই আইসক্রিম শপের উদ্দেশে।

তার মানে… নাইজেল ওয়েস্টন হয়তো ঠিকই বলেছিলেন। ডায়ানা ক্যুপার যদি তখন চশমা পরেও থাকতেন, সময়মতো ব্রেক কষতে পারতেন কি না সন্দেহ। দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল বছরের এই সময়েই… আজকের তারিখের কাছাকাছি কোনো তারিখে। এই প্রমেনাড এখন যে-রকম জনশূন্য, সে-সময়ও হয়তো সে-রকমই ছিল। হয়তো আজকের মতো সেদিনও কেবল ফিকে হতে শুরু করেছিল শেষ- বিকেলের আলো।

‘কোত্থেকে শুরু করবো আমরা?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।

মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘আইসক্রিমের দোকান

দোকানটা, দেখতে পাচ্ছি, খোলা। রাস্তা পার হয়ে গিয়ে ঢুকলাম সেখানে।

দোকানটার নাম গেইল’স আইসক্রিম। ভিতরে সব জায়গায় কেমন একটা খুশি-খুশি ভাব। ফর্মিকা-বিছানো মেঝের উপর পেতে দেয়া হয়েছে প্লাস্টিকের চেয়ার। এখানে যে-আইসক্রিম বিক্রি করা হয় সেটা বাসায় বানানো। একটা ফ্রিয়ারের ভিতরে বারোটা আলাদা আলাদা টাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে ওগুলো। বেশ পুরনো হয়ে গেছে ফ্রিয়ারটা, বেহাল দশা ওটার। জানালার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে কোন-গুলো। দেখে মনে হচ্ছে, ওগুলো বেশ কিছু দিন ধরে আছে ওখানে। এই দোকানে আরও পাওয়া যায় ফিযি ড্রিঙ্ক, চকলেট, ক্রিস্পস আর রেডি-মিক্স সুইট ব্যাগ। একদিকের দেয়ালে ঝুলছে একটা মেন্যু। তাতে বলা হচ্ছে, ডিম, বেকন, সসেজ, মাশরুম আর চিপসও পাওয়া যায় এখানে।

দোকানের মাত্র দুটো টেবিলে খদ্দের দেখা যাচ্ছে। একটা টেবিলে বসে আছে বয়স্ক এক দম্পতি। আরেকটা টেবিলে বসেছে যুবতী দুই মা, তাদের সঙ্গে আছে দুটো পুশচেয়ার, সেগুলোর ভিতরে আছে দুটো বাচ্চা। কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলাম আমরা। সেখানে দেখা যাচ্ছে বড়সড় হাস্যোজ্জ্বল এক মহিলাকে। তাঁর বয়স পঞ্চাশের ঘরে। কাপড়ের উপর একটা অ্যাপ্রন পরে আছেন। ওই অ্যাপ্রন, এই দোকানের প্রবেশপথের শামিয়ানাটার মতোই চিত্রবিচিত্র। খদ্দেরদের সেবা দেয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি।

জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী দেবো আপনাদের?’

‘সাহায্য,’ বলল হোথৰ্ন, ‘আমি পুলিশে আছি।’

‘ওহ্?’

‘আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে এখানে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ওটার ব্যাপারে খোঁজখবর করছি। একটা গাড়ির নিচে চাপা পড়েছিল ছোট দুটো ছেলে।’

‘কিন্তু… এই ঘটনা তো দশ বছর আগের!’

‘ডায়ানা ক্যুপার… মানে যে-মহিলা গাড়িটা চালাচ্ছিলেন তখন… মারা গেছেন। আপনি কি পড়েননি খবরটা?’

‘কিছু একটা পড়েছি। কিন্তু …’

‘আপনি যা বলবেন তার ফলে হয়তো নতুন কোনো প্রমাণ পাওয়া যাবে।’

‘ওহ্!’ নার্ভাস দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকালেন মহিলা। তাঁর সে-দৃষ্টি দেখে আমি ভাবলাম, বিশেষ কোনো কিছু গোপন করতে চাইবেন হয়তো। ‘কিছু মনে করবেন না… ওই ব্যাপারে আসলে বেশি কিছু বলার নেই আমার।

‘আপনি কি তখন ছিলেন এখানে?’

‘আমার নাম গেইল হারকোর্ট। এটা আমারই দোকান। এবং দুর্ঘটনাটা যেদিন ঘটেছিল, সেদিন আমি এখানেই ছিলাম। ওই দুটো বাচ্চার কথা যখনই মনে পড়ে, তখনই কেমন যেন অসুস্থ বোধ করি। ওরা শুধু আইসক্রিম খেতে চেয়েছিল, আর সে-কারণেই রাস্তা পার হতে ছুট লাগিয়েছিল। কিন্তু ওরা যদি আসত এখানে, কোনো লাভ হতো না… সেদিন এই দোকান বন্ধ ছিল।’

‘জুনের শুরুতে বন্ধ? কেন?’

ছাদের দিকে ইঙ্গিত করলেন মহিলা। ‘একটা পাইপ ফেটে গিয়েছিল। ফলে পানিতে ভেসে গিয়েছিল পুরো জায়গা। আমার মালসামান সব নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। নষ্ট হয়ে গিয়েছিল ইলেকট্রিক লাইনও। এই দোকানের কোনো কিছুরই বীমা করাইনি আমি। কারণ বীমার কিস্তি দেয়ার ক্ষমতা ছিল না আমার। কাজেই ওই পাইপ ফেটে যাওয়ার ঘটনায় বলতে গেলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল আমার ব্যবসা।’ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘দুর্ঘটনাটার আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলাম। তবে দেখতে পাইনি ঘটনাটা। তৎক্ষণাৎ দৌড়ে বের হই রাস্তায়, দেখি ছেলে দুটো পড়ে আছে। একটা মেয়ে ছিল ওদের সঙ্গে… কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, প্রচণ্ড কোনো মানসিক ধাক্কা খেয়েছে। তার বয়স ছিল খুবই কম… বিশ্বের কোঠায়। যা-হোক, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাই আমি তখন, দেখতে পাই গাড়িটা। পিয়ারের আরেক প্রান্তে গিয়ে থেমে দাঁড়ায় ওটা। মিনিটখানেকের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর আবার চলতে শুরু করে এবং একসময় অদৃশ্য হয়ে যায়।’

‘ড্রাইভারকে কি দেখেছিলেন?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।

ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল হোথর্ন, কিন্তু পাত্তা দিলাম না।

‘দেখেছিলাম মানে… শুধু ওই মহিলার মাথার পেছনদিকটা দেখেছিলাম।’

‘তার মানে গাড়িটা কে চালাচ্ছিল তখন, সে-ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত না? অর্থাৎ, ড্রাইভার যে-কেউ হতে পারে?’

‘যে-কেউ মানে? ওটা তো ওই মহিলাই! তাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল ওই দুর্ঘটনার কারণে।’ হোথর্নের দিকে তাকালেন গেইল হারকোর্ট। ‘একটা মানুষ কীভাবে ওই কাজ করতে পারে… মানে, কোনো দুর্ঘটনার জায়গা থেকে পালিয়ে যেতে পারে, জানি না আমি। দু’-দুটো বাচ্চা ছেলে পড়ে ছিল ওখানে! ওই মহিলা… আসলে একটা কুত্তী! আপনি জানেন কি না জানি না… তখন কিন্তু চশমা পরে ছিল না সে। চোখে দেখতে পায় না এমন কেউ কেন গাড়ি চালাবে, বুঝি না আমি। ওই মহিলাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া উচিত ছিল। আর ওই বিচারক… যে কিনা ওই মহিলাকে বেকসুর খালাস দিয়েছে… তার চাকরি চলে যাওয়া উচিত ছিল। বিরক্তিকর! ন্যায়বিচার বলে কোনো কিছু আর বাকি নেই আমাদের দেশে।’

গেইল হারকোর্টের প্রচণ্ডতা দেখে বিস্মিত হয়ে গেছি আমি। বিকট দেখাচ্ছে তাঁকে এই মুহূর্তে।

আরও দু’জন খদ্দের ঢুকল দোকানের ভিতরে, নিজেকে সামলে নিলেন গেইল হারকোর্ট, প্রস্তুত হলেন ব্যবসার জন্য। ‘পাশের বাসায় মিস্টার ট্র্যাভার্টন নামের এক ভদ্রলোক আছেন, আপনারা ইচ্ছা করলে কথা বলতে পারেন তাঁর সঙ্গে। তিনিও সেদিন ছিলেন এখানে। আমার চেয়ে বেশি দেখেছেন তিনি সেদিনের ঘটনাটা।’ কাউন্টারের কাছে চলে এসেছে মাত্র-দোকানে-ঢোকা খদ্দের, তার উদ্দেশে হাসলেন। ‘হ্যাঁ, কী নেবেন আপনি?’

.

‘এখনও যখন ভাবি ঘটনাটা, আমার মনে হয় মাত্র গতকাল ঘটেছে সেটা। তখন বিকেল সোয়া চারটা। দিনটা ছিল চমৎকার… আজকের মতো না। ঝকঝকে রোদ ছিল, সাগর-পানিতে গোসল করার জন্য যথেষ্ট গরম ছিল আবহাওয়া। আমি তখন কিছু-একটা বিক্রি করছিলাম একজন খদ্দেরের কাছে। ওই লোক ছিল একজন রহস্যমানব… পরে সবাই আগ্রহী হয়ে উঠেছিল তার উপর। দুর্ঘটনাটা যখন ঘটল, তার বড়জোর সেকেন্ড পাঁচেক আগে আমার দোকান ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে। আর সে-কারণেই বীভৎস শব্দটা স্পষ্ট শুনতে পেলাম আমি। শুনতে পেলাম, গাড়িটা ছুটে এসে ধাক্কা মারল ছেলে দুটোকে। আওয়াজটা যে কী বীভৎস… বলে বোঝাতে পারবো না। এবং খুব জোরে হয়েছিল ওই শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলাম, খারাপ কিছু-একটা হয়েছে। থাবা চালিয়ে তুলে নিলাম আমার মোবাইল ফোন, একদৌড়ে বের হলাম বাইরে। আমার দোকানে তখন মিস প্রিসলি ছাড়া আর কেউ ছিল না। বিয়ে হয়ে গেছে তার, এখন সে আর ডিলে থাকে বলে মনে হয় না। যা-হোক, বাইরে যাওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিলাম দোকানে আছে কি না মেয়েটা। আমাদের এই দোকানে অনেক ওষুধপত্র আছে, এবং কাউকে পাহারায় না রেখে এখান থেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই। অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা যদি ঘটে… যেমন যে- ঘটনার কথা বলছি এখন… তবুও না।’

পিয়ার ফার্মেসি অদ্ভুত আর সেকেলে একটা দোকান। ঘরোয়া একটা আবহ আছে। অনেক কিছু বিক্রি করা হয় এখানে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে স্টাফ-করা খেলনা, জ্যাম, চকলেট বার, সিরিয়াল, টয়লেট পেপার, এমনকী কুকুরের-গলায়- বাঁধার ফিতা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি আমি। সাধারণ ওষুধপত্র তো আছেই। এককোনায় কিছু হার্বাল সামগ্রীও আছে। এখানকার স্টাফদের সবাই সাদা কোট পরে। তাদের হাতের নাগালে রয়েছে বিভিন্ন জাতের শত শত প্যাকেট, ফয়েল আর বোতল।

সে-রকম একজনের সঙ্গেই এখন কথা বলছি আমরা… গ্রাহাম ট্রেভার্টন। তিনি এই দোকানের মালিক এবং ম্যানেজার। বয়স পঞ্চাশের ঘরে। মাথায় টাক পড়ে গেছে। গাল দুটো লালচে। উপরের পার্টির সামনের দিকের দুটো দাঁতের মাঝখানে শূন্যস্থান আছে। আমাদের সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী তিনি। এবং যেসব ডিটেইল দিচ্ছেন আমাদেরকে, সেগুলো শুনে আমি অবাক। সেদিন যা ঘটেছিল, সে-ব্যাপারে দেখা যাচ্ছে সব কিছুই ঠিকমতো মনে আছে তাঁর। সে-বর্ণনা শুনে দু’-একবার ভাবতে বাধ্য হলাম, কোনো কিছু বানিয়ে বলছেন কি না তিনি। কিন্তু কথা হচ্ছে, আগেও ইন্টারভিউ নেয়া হয়েছিল তাঁর… একবার নিয়েছিল পুলিশ, আরেকবার সাংবাদিকরা। কাজেই একই গল্প বার বার বলার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। তা ছাড়া আমার ধারণা, যখন ভয়ঙ্কর কোনো কিছু ঘটে, সে-ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেক কিছুই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মনে রাখতে পারে অনেকেই।

‘দরজা দিয়ে বের হলাম আমি,’ বলছেন ট্রেভার্টন। ‘আরেকটু হলে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলাম রহস্যময় ওই কাস্টোমারের উপর… ফুটপাতের উপর দাঁড়িয়ে ছিল লোকটা।

‘কী হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করলাম লোকটাকে। জবাব দিল না সে… কিছুই বলল না।

‘ততক্ষণে যা দেখার দেখা হয়ে গেছে আমার। ছেলে দুটো পড়ে ছিল রাস্তার উপর। দু’জনের পরনেই নীল শর্টস আর খাটো হাতার শার্ট। তাদের একজন এমনভাবে পড়ে ছিল যে, দেখামাত্র আমার মনে হলো, মারা গেছে বেচারা। চোখ দুটো বন্ধ ছিল, একটুও নড়ছিল না। অন্য ছেলেটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ছিল তাদের আয়া মেরি ও’ব্রায়ান। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল মেয়েটা, ভূতের মতো দেখাচ্ছিল তাকে। ঘটনাস্থলে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম, চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল মেয়েটা, অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। ভাবখানা এমন, সাহায্যের জন্য আকুতি জানাচ্ছে আমার কাছে, কিন্তু… কী-বা করার ছিল আমার? পুলিশে খবর দিলাম। আমার মনে হয় আমার জায়গায় থাকলে অনেকেই সে-কাজ করত ওই সময়।

‘নীল রঙের একটা ভক্সওয়্যাগন তখন দুর্ঘটনার-জায়গাটা থেকে কিছুটা দূরে থেমে দাঁড়িয়ে ছিল। খেয়াল করলাম, কেউ একজন বসে আছে গাড়ির ভিতরে। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরই চলতে শুরু করল গাড়িটা, তারপর একসময় গতি বাড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। কসম খেয়ে বলতে পারি, ওই গাড়ির এক্সহস্ট থেকে তখন ধোঁয়া বের হচ্ছিল। রাস্তার উপর চাকার তীব্র ঘর্ষণের আওয়াজও শুনতে পেয়েছিলাম। তখন অবশ্য জানতাম না, যে-মহিলা দায়ী ছিল দুর্ঘটনাটার জন্য, গাড়িটা তারই। কিন্তু চট করে গাড়ির নম্বরটা লিখে নিলাম, এবং পরে সেটা রিপোর্ট করে দিলাম পুলিশের কাছে। যা-হোক, ওই রহস্যমানবের উপর নজর পড়ল আমার তখন আমি তাকে দেখছি টের পেয়ে চট করে ঘুরে গেল সে, হাঁটা ধরল। কিং স্ট্রীটের কোনা ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল একসময়।’

‘বিশেষ এই ঘটনা কি অদ্ভুত মনে হয়েছিল আপনার কাছে?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন।

‘অবশ্যই। খুবই অস্বাভাবিক আচরণ করছিল লোকটা। মানে… আপনি যখন ও-রকম কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে দেখবেন তখন কী করবেন? কী করা উচিত সাধারণ একজন মানুষের? হয় একজায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকবেন কী ঘটে… বেশিরভাগ লোক তা-ই করে। নয়তো আপনার কিছুই করার নেই ধরে নিয়ে চলে যাবেন। কিন্তু ওই লোক কী করেছিল, জানেন? খুবই তাড়াহুড়ো করে চলে গিয়েছিল… ভাবখানা এমন, সে যেন চায়নি কেউ দেখে ফেলুক তাকে। আরও কথা আছে। দুর্ঘটনাটা নিজের চোখে দেখেছে সে। তার ঠিক সামনেই ঘটেছে ওই ঘটনা। অথচ পুলিশ যখন বিবৃতি চাইল প্রত্যক্ষদর্শীদের, দেখা দিল না সে… উপস্থিত হলো না পুলিশ স্টেশনে।’

‘ওই লোকের ব্যাপারে আর কী বলতে পারেন?’

‘বেশি কিছু না… কারণ লোকটা সানগ্লাস পরে ছিল। এখন আমার কথা হচ্ছে, ওই সময়ে সানগ্লাস পরার দরকারটা কী ছিল তার? তখন সাড়ে চারটার মতো বাজে, সূর্যও কিছুটা ঢলে পড়েছে আকাশে। এবং ততক্ষণে কিছুটা মেঘলা হতে শুরু করেছে আবহাওয়া। …আমার কী মনে হয়, জানেন? মনে হয়, আসলে সানগ্লাসের দরকারই ছিল না ওই লোকের… যদি না লোকটা বিখ্যাত কেউ হয়ে থাকে… মানে, সে হয়তো চায়নি, কেউ চিনে ফেলুক তাকে। আরেকটা কথা। মাথায় ক্যাপ পরে ছিল সে। কী কিনেছিল সেদিন, সেটাও মনে আছে আমার।’

‘কী?’

‘মধুর একটা বোতল আর এক প্যাকেট আদা চা। মধুটা স্থানীয়… আমিই ওটা কিনতে বলেছিলাম ওই লোককে।’

‘তারপর কী হলো?’

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ট্র্যাভের্টন। ‘আর তেমন কিছু বলার নেই। ওই আয়া মেয়েটা হাঁটু গেড়ে বসে ছিল দুর্ঘটনাস্থলে। দুটো বাচ্চার মধ্যে একটা বাচ্চা বেঁচে ছিল। ওকে চোখ খুলতে দেখলাম আমি। ‘বাবা’ বলে ডেকে উঠল সে। ব্যাপারটা খুবই করুণ… আসলেই! পুলিশ এল একসময়, হাজির হলো একটা অ্যাম্বুলেন্সও। আসতে বেশি সময় লাগেনি তাদের। আর কিছু করার নেই বুঝে দোকানে ফিরে এলাম তখন। উপরতলায় গিয়ে এক কাপ চা খেলাম। মোটেও ভালো লাগছিল না আমার। এবং এই যে এখন ঘটনাটা বলছি আপনাদেরকে… এখনও ভালো লাগছে না।

.

ফার্মেসি থেকে হেঁটে আমরা হাজির হলাম কিছুটা দূরের রয়্যাল হোটেলে। একেবারে চুপ করে আছে হোথর্ন। ওর নিজেরও এগারো বছর বয়সী একটা ছেলে আছে। এইমাত্র যে-কাহিনি শুনলাম আমরা, সেটা খুব সম্ভব প্রভাব বিস্তার করেছে ওর মনে। তবে একটা কথা বলতেই হয়… ওকে দেখে কিন্তু দুঃখিত বা বিষণ্ণ বলে মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে, ফিরে যাওয়ার জন্য তাড়া অনুভব করছে যেন।

লাউঞ্জের মতো একটা জায়গায় ঢুকে পড়লাম। শুধু কোনো ইংলিশ সমুদ্রতীবরর্তী-হোটেলেই দেখা যায় এ-রকম জায়গা… নিচু ছাদ, কাঠের মেঝের জায়গায় জায়গায় ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে কিছু রাগ, আরও আছে আরামদায়ক কিছু লেদার ফার্নিচার। তবে এই জায়গা… দেখে আশ্চর্য লাগল আমার… লোকে ভর্তি। তাদের বেশিরভাগই বয়স্ক দম্পতি। খুব উৎসাহ নিয়ে স্যান্ডউইচ আর বিয়ার খাচ্ছে সবাই। ঘরের ভিতরে এত গরম যে, সহ্য করতে পারছি না। এককোনায় পুরোদমে চলছে একটা রেডিয়েটর, গ্যাসের আগুন জ্বালানো হয়েছে সেখানে।

নিজেদের জন্য পথ করে নিয়ে রিসিপশন এরিয়ার দিকে এগিয়ে গেলাম আমরা। স্থানীয় একটা মেয়ে কাজ করছে সেখানে, বন্ধুবৎসল ভাব আছে তার চেহারায়। হোথর্নের কথা শুনে বলল আমাদেরকে সাহায্য করতে পারবে না, তবে ফোন করল হোটেলের ম্যানেজারকে। নিচতলার বারে ছিলেন মহিলা, উঠে এলেন উপরে।

তাঁর নাম মিসেস রেন্ডেল। বারো বছর ধরে আছেন রয়্যাল হোটেলে, কিন্তু বিশেষ সেই দুর্ঘটনার দিন ছিলেন না এখানে। তবে মেরি ও’ব্রায়্যান আর জেরেমি- টিমোথির সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাঁর।

‘লক্ষ্মী বাচ্চা ছিল ওরা,’ বললেন তিনি। ‘ওদের ব্যবহার খুব ভালো ছিল। হোটেলের দ্বিতীয় তলায় একটা ফ্যামিলি রুমে উঠেছিল। একটা কিং সাইজের বেড আর বাঙ্ক ছিল ওখানে। রুমটা কি দেখতে চান আপনারা?’

‘না,’ বলল হোথর্ন।

‘ওহ্,’ দেখে মনে হলো, হোথর্নের কথায় মনে চোট পেয়েছেন মিসেস রেন্ডেল। তারপরও বলে চললেন, ‘আমার মনে আছে, যেদিন এই হোটেলে উঠেছিল ওরা, সেদিন ছিল বুধবার। আর দুর্ঘটনাটা ঘটল তার পরের দিন। সত্যি বলতে কী, ওই রুম নিয়ে খুশি ছিল না মিস ও’ব্রায়্যান। কারণ সেখান থেকে সমুদ্র দেখা যায় না। লাগোয়া দরজা আর ডাবল বেড আছে এ-রকম একটা টুইন রুমের জন্য অনুরোধ করেছিল মেয়েটা। কিন্তু আমাদের হোটেলে ও-রকম কোনো রুম নেই, তা ছাড়া বাচ্চা দুটো ছেলেকে কোনো ঘরে একা ঘুমাতে দেয়াটা সম্ভব ছিল না আমাদের পক্ষে। যা-হোক, মেয়েটাকে ঠিক পছন্দ হয়নি আমার। তাকে বিশ্বাস করতে পারিনি। বলতে খারাপই লাগছে, আবার না-বলেও পারছি না… আমার সেই অবিশ্বাস সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। বাচ্চা দুটোকে ধরে রাখা উচিত ছিল তার। কিন্তু সেটা না-করে ওদেরকে দৌড়ে রাস্তায় নেমে যেতে দিল সে, এবং তার ফলেই…। আর সে-কারণেই আমার মনে হয় না, ওই দুর্ঘটনার জন্য দোষ দেয়া যায় মিসেস ক্যুপারকে।’

‘তাঁকে চিনতেন আপনি?’

‘অবশ্যই। প্রায়ই লাঞ্চ বা ডিনার খেতে আমাদের এই হোটেলে আসতেন তিনি। বেশ কমনীয় ছিলেন, তার চেয়েও বড় কথা, বিখ্যাত একটা ছেলে ছিল তাঁর।’

হঠাৎ করেই টের পেলাম, এই হোটেলে আর থাকতে ইচ্ছা করছে না আমার। তাই হোথর্ন যখন মিসেস রেন্ডেলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল আর-কিছু জিজ্ঞেস করার নেই ওর, খুশি হলাম তখন।

হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে এলাম আমরা দু’জন।

১৯. মিস্টার টিবস

পরদিন যে দেখা হয়ে যাবে হোথর্নের সঙ্গে, আশা করিনি। তাই যখন ফোন করল সে আমাকে, আশ্চর্য হলাম। ব্রেকফাস্টের কিছুক্ষণ পর এল ওর কলটা।

‘আজ সন্ধ্যায় কিছু করছেন?’

‘হ্যাঁ, কাজ আছে,’ বললাম আমি। ‘আমার একটু আসা দরকার।’

‘কোথায়? আমার এখানে?’

‘হ্যাঁ।’

‘কেন?’

হোথর্ন আগে কখনও আমার লন্ডনের-ফ্ল্যাটে আসেনি। এবং সে যে আসেনি, সেজন্য আমি খুশি। সুকৌশলে একটু একটু করে ঢুকতে চেয়েছি আমি ওর জীবনে, কখনও চাইনি উল্টোটা ঘটুক। এখনপর্যন্ত নিজের বাসার ঠিকানাটা পর্যন্ত বলেনি সে আমাকে। সত্যি বলতে কী, সে জেনেশুনে ভুল পথে পরিচালিত করেছে আমাকে। বলেছে, ওর বাসা নাকি গ্যান্টস হিলে। অথচ ব্ল্যাকফায়ার্সের রিভার কোর্টে একটা ফ্ল্যাট আছে ওর। আমি চাই না, সে ওর গোয়েন্দা-নজরটা ফেলুক আমার বাসার উপর। চাই না, পরে আমারই কোনো কিছু ব্যবহার করুক আমার বিরুদ্ধে।

আমি যে ইতস্তত করছি, সেটা বোধহয় লাইনের ওপ্রান্তে থেকেও টের পেয়ে গেল সে। ব্যাখ্যা করার কায়দায় বলল, ‘একটা মিটিঙের আয়োজন করতে চাই আসলে। এবং আমি চাই, সেটা নিরপেক্ষ কোনো জায়গায় হোক!

‘ওই মিটিং আপনার বাসায় হলে সমস্যা কী?

‘মিটিংটা আমার বাসায় করা ঠিক হবে না আসলে।’ একটুখানি থামল সে। ‘ডিলে আসলে কী ঘটেছিল, সে-ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে এসেছি আমি। এবং সেটার সঙ্গে যে আমাদের তদন্তের সম্পর্ক আছে, আমার মনে হয় সে-ব্যাপারে একমত হবেন আপনি।’

‘কার সঙ্গে মিটিং করতে চান?’

সেটা তাঁদের দু’জনকে দেখলেই জানতে পারবেন।’ শেষ আরেকবার অনুরোধ করল হোথর্ন। ‘ব্যাপারটা জরুরি।

ঘটনাক্রমে আজ সন্ধ্যায় আমি একাই আছি বাসায়। আমার মনে হলো, কোথায় থাকি সেটা যদি দেখতে দিই হোথর্নকে, তা হলে সে কোথায় থাকে, তা দেখতে দেয়ার ব্যাপারে বলেকয়ে রাজি করাতে পারবো ওকে। নদীর দিকে মুখ করে আছে এ-রকম কোনো ফ্ল্যাটে থাকার আর্থিক সামর্থ্য হয় কী করে ওর, জানার খুব ইচ্ছা আমার। অথচ মিডোস বলেছে, ওই ফ্ল্যাট নাকি হোথর্নের নিজের না।

‘কখন?’ জানতে চাইলাম।

‘বিকেল পাঁচটায়।’

‘ঠিক আছে। বললাম বটে, কিন্তু ইতোমধ্যেই ভুগতে শুরু করেছি অনুশোচনায়। ‘আগেই বলে রাখি… এক ঘণ্টার বেশি সময় দিতে পারবো না।’

‘ঠিক আছে,’ লাইন কেটে দিল হোথর্ন।

সকালের বাকি সময়টা আমাদের তদন্তের বিভিন্ন নোট টাইপ করার কাজে ব্যয় করলাম… ব্রিটানিয়া রোড, কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্স, দ্য সাউথ অ্যাক্টন এস্টেট। কারও কারও কথা নিজের আইফোনে রেকর্ড করে নিয়েছিলাম; ওটা কানেক্ট করলাম আমার কম্পিউটারের সঙ্গে, হেডফোনের মাধ্যমে শুনতে লাগলাম হোথর্নের আকর্ষণহীন আর ছলনাপূর্ণ কণ্ঠ। ডজনখানেকের মতো ফটোও তুলেছি, দেখতে লাগলাম ওগুলো। যা যা দেখেছি এই কেসে, নিজেকেই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছি সেগুলো। এই কেসে, বলা বাহুল্য, যা যা দরকার, তার চেয়ে অনেক বেশি মালমশলা ছিল আমার কাছে এবং আমি নিশ্চিত সেগুলোর নব্বই শতাংশই অপ্রাসঙ্গিক।

আসলে এ-রকম কোনো পদ্ধতিতে আগে কখনও কাজ করিনি আমি। সাধারণত যখন কোনো উপন্যাস বা টিভি স্ক্রিপ্টের পরিকল্পনা করি, কী-কী দরকার তা ভালোমতোই জানা থাকে আমার। অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা দিতে গিয়ে সময় নষ্ট করি না তখন। কিন্তু হোথর্নের মাথায় কী চলছে তা যেহেতু জানা নেই আমার, সেহেতু কোটা প্রয়োজনীয় আর কোটা অপ্রয়োজনীয় বুঝবো কী করে? ফলে এই কেসের তদন্তের কাজে যেসব জায়গায় গেছি, সেসব জায়গায় যা-যা দেখেছি তার প্রায় সব কিছুই লিখতে হয়েছে আমাকে।

আমি এখনও নিশ্চিত, অ্যালান গডউইনই খুনি। ওই লোক যদি খুনি না-হবে, তা হলে আর কে খুন করে থাকতে পারে মিসেস ক্যুপার আর তাঁর ছেলেকে? নিজের ডেস্কের ধারে বসে থেকে কথাটা আপনমনেই জিজ্ঞেস করলাম নিজেকে।

জুডিথ গডউইন… উদাহরণ হিসেবে কি বলা যায় ওই মহিলার কথা? ডায়ানা ক্যুপার আর তাঁর ছেলেকে খুন করার পেছনে যে-মোটিভ আছে অ্যালান গডউইনের, প্রায় একই মোটিভ আছে জুডিথেরও।

খুনির ব্যাপারে কী বলেছিল হোথর্ন, ভাবতে লাগলাম। হাতড়াতে শুরু করলাম আমার কাগজগুলো, নির্দিষ্ট কাগজটা খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগল না। আমি যা বলছি মেনে নিন– খুনি একজন পুরুষ। মেয়েরাও যে মেয়েদেরকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, জানি আমি; তারপরও… মিসেস ক্যুপারের বেলায় ঘটনাটা অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে।

এখন কথা হচ্ছে, কোনো কিছু অস্বাভাবিক হলেই কি সেটা অসম্ভব হয়ে যায়?

সুতরাং জুডিথ গডউইন খুন করে থাকতে পারেন ডায়ানা ক্যুপার আর তাঁর ছেলেকে। আবার মেরি ও’ব্রায়ানও করে থাকতে পারে কাজটা। গত দশটা বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে চলেছে সে গডউইন পরিবারে। বোঝাই যায়, প্রচণ্ড ভালোবাসে সে জেরেমিকে। ভালোবাসত টিমোথিকেও। অন্ধ সেই ভালোবাসাই কি কারও প্রাণহরণের কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল তাকে?

জেরেমি গডউইন কি করে থাকতে পারে খুন দুটো? হতে পারে, সবাই তাকে যে-রকম অসহায় ভাবে, আসলে ততটা অসহায় না সে। শারীরিকভাবে অক্ষম কত খুনিরই তো বর্ণনা পাওয়া যায় দেশ-বিদেশে।

গ্রেস লোভেলের কথাই বা বাদ দিই কী করে? মুখে যদিও বলেনি সে, কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে হয়েছে, শাশুড়ির সঙ্গে তেমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না তার। ওদিকে ওই অভিনেত্রী মেয়েটার উপরও কোনো টান ছিল না মিসেস ক্যুপারের… নাতনি অ্যাশলিই ছিল তাঁর সব আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। বাচ্চা ওই মেয়ের কারণেই শেষ হয়ে গিয়েছিল গ্রেসের অভিনয়-ক্যারিয়ার। শুধু তা-ই না, পত্রপত্রিকায় যেসব খবর ছাপা হয়েছিল, সেগুলো যদি সত্যি হয়ে থাকে, তা হলে স্বীকার করে নিতেই হবে, আদর্শ পার্টনার বলতে যা বোঝায়, সেটার সঙ্গে যোজন যোজন দূরত্ব ছিল ড্যামিয়েনের। সোজা কথায় তার সঙ্গে গ্রেসের সম্পর্কটা ছিল কেবল শারীরিক, মানসিক দিক দিয়ে যথেষ্ট দূরত্ব ছিল তাদের দু’জনের মধ্যে। ড্রাগস, পার্টি, শোগার্ল… এসব নিয়ে আমেরিকায় ব্যস্ত ছিল ড্যামিয়েন, হয়তো ঠিকমতো সময় দিতে পারত না গ্রেসকে।

সুযোগ পাওয়ামাত্র সে-বঞ্চনারই কি শোধ তুলেছে মেয়েটা? ড্যামিয়েনকে খুন করার জন্য সেটাই কি মোটিভ তার? কিন্তু একইসঙ্গে এ-কথাও ভুললে চলবে না, ডায়ানা ক্যুপারকে যখন খুন করা হয়, তখন আমেরিকায় ছিল মেয়েটা।

আসলেই?

আরও একবার হাতড়াতে লাগলাম আমার নোটগুলো। যা খুঁজছিলাম, তা পেয়েও গেলাম একসময়।

একবার একটা কথা বলেছিল ড্যামিয়েন ক্যুপার। এবং যখন বলেছিল সে কথাটা, তখন ততটা গুরুত্ব পায়নি সেটা। কিন্তু এখন কেন যেন ওই কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে আমার।

গ্রেস অভিযোগ জানিয়ে বলেছিল, লস অ্যাঞ্জেলসে ফিরে যেতে চায় না সে। তার বাবা-মায়ের সঙ্গে আরও বেশি করে সময় কাটাতে চায় সে। ড্যামিয়েন তখন বলেছিল, তাদের সঙ্গে ইতোমধ্যেই একটা সপ্তাহ কাটিয়ে ফেলেছ তুমি, বেইব।

সন্তুষ্টি অনুভব করছি আমি। কিছুই মিস করিনি! এমনও হতে পারে, এই কেস সমাধান করার ব্যাপারে হোথর্নকে ছাড়িয়ে গেছি। হতে পারে, ড্যামিয়েনের চেয়ে নয়-দশ দিন আগেই ইংল্যান্ডে চলে এসেছিল গ্রেস। তার মানে যেদিন খুন হয়েছেন ডায়ানা ক্যুপার, সেদিন এ-দেশেই ছিল মেয়েটা।

কিন্তু একটা ব্যাপার মিলছে না। মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পরে মেয়েটাকে ফুলহ্যাম রোডের ওই পাবে রেখে ব্রিক লেনের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলাম আমি আর হোথর্ন। আমার মনে আছে, কী সাংঘাতিক যানজট ছিল তখন। ড্যামিয়েনকে খুন করতে হলে আমাদের আগে ব্রিক লেনের ওই ফ্ল্যাটে হাজির হতে হবে গ্রেসকে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেটা সে করল কী করে?

সেদিনের সেই শেষকৃত্যে আর কে কে ছিল?

রবার্ট কর্নওয়ালিস অথবা আইরিন লযের যে-কেউ ওই মিউযিক প্লেয়ারটা ঢুকিয়ে থাকতে পারেন কফিনের ভিতরে। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রশ্ন রয়ে যায়… কেন করতে যাবেন তাঁরা কাজটা? ডায়ানা ক্যুপার যেদিন খুন হয়েছেন, সেদিনই তাঁর সঙ্গে প্রথমবার দেখা হয়েছে ওই দু’জনের। তাদের কারও কোনো লাভ হয়নি ওই মহিলা কিংবা তাঁর ছেলের মৃত্যুতে।

সারাটা দিন মেতে থাকলাম আমার সেই নোটগুলো নিয়ে। ঘড়ির দিকে তাকানোর মতো সময়ই পেলাম না। পাঁচটা বাজতে যখন মিনিট পনেরো বাকি, তখন বেজে উঠল ডোরবেল।

যে-বিল্ডিঙে থাকি আমি, সেটার পঞ্চম তলায় কাজ করি… মানে লেখালেখি করি। একটা ইন্টারকম আছে আমার এখানে, সেটা সরাসরি যুক্ত হয়েছে রাস্তার সঙ্গে। আমাদের বাসায় যদি কেউ আসে, তার সঙ্গে ওই ইন্টারকমের মাধ্যমে কথা যায়।

মনে পড়ে গেল হোথর্নের কথা। বুঝলাম, হাজির হয়ে গেছে সে।

‘সুন্দর জায়গা,’ ভিতরে ঢুকে বলল সে। ‘তবে আমার মনে হয় না ড্রিঙ্কের কোনো দরকার আছে।’

অতিথি আসবে বাসায়; তাই মিনারেল ওয়াটার, কমলার জুস আর কয়েকটা গ্লাস রেখেছি আমি। হোথর্নের কথামতো ওগুলো নিয়ে গিয়ে ঢুকিয়ে রাখছি ফ্রিজে, এমন সময় খেয়াল করলাম, আমার লিভিংরুমটা ভালোমতো দেখছে সে।

একটা কফি টেবিল ঘিরে দুটো সোফা আছে, ওগুলোর একটাতে বসে পড়ল হোথর্ন। ওকে দেখে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত বলে মনে হচ্ছে।

‘ডিলে ঠিক কী ঘটেছিল, সেটা তা হলে জানা হয়ে গেছে আপনার,’ বললাম আমি। ‘তা হলে… ডায়ানা ক্যুপারকে কে খুন করেছে, সেটা কি জানতে পারি?’

মাথা নাড়ল হোথর্ন। ‘এখনই না। তবে কথাটা যখন বলবো আপনাকে, ইন্টারেস্টিং লাগবে আপনার কাছে। যা-হোক, ভালো একটা খবর আছে আমার কাছে।

‘কী?’

‘মিস্টার টিবসকে পাওয়া গেছে।

‘মিস্টার টিবস?’ নামটা কীসের, মনে করতে কয়েক সেকেন্ড লেগে গেল আমার। ‘মিসেস ক্যুপারের বিড়ালটার কথা বলছেন?’

‘হ্যাঁ। মিসেস ক্যুপারের সেই পার্শিয়ান গ্রে।’

‘কোথায় আছে ওটা?’

‘স্কাইলাইট দিয়ে ওই মহিলার এক প্রতিবেশীর বাসায় ঢুকে পড়েছিল। তারপর আর বের হতে পারেনি। ওই প্রতিবেশী ভদ্রলোক আবার বেড়াতে গিয়েছিলেন দক্ষিণ ফ্রান্সে, তিনি বাসায় ফিরে এসে খুঁজে পান বিড়ালটাকে। তারপর ফোন করেছেন আমাকে।

‘হ্যাঁ… খবরটা মনে হয় ভালোই।’ বললাম বটে, কিন্তু এই কেসের সঙ্গে ডায়ানা ক্যুপারের বিড়ালের কী সম্পর্ক, বুঝতে পারছি না। এমন সময় একটা চিন্তা খেলে গেল আমার মাথায়। ‘এক মিনিট। যতদূর মনে পড়ে, মিসেস ক্যুপারের এক প্রতিবেশী একজন উকিল… ‘

‘মিস্টার গ্রসম্যান।

‘তিনি কেন ফোন করলেন আপনাকে? আপনি কে, সেটাই বা জানলেন কী করে তিনি?’

‘তাঁর সদর-দরজার নিচ দিয়ে একটা নোট ঠেলে দিয়েছিলাম আমি ভিতরে। সত্যি বলতে কী, ব্রিটানিয়া রোডের সবগুলো বাসার সদর-দরজার নিচ দিয়েই একটা করে নোট ঠেলে দিয়েছিলাম। ওসব বাড়ির বাসিন্দাদের কেউ দেখতে পেয়েছিল কি না বিড়ালটাকে, সেটাই জানতে চেয়েছিলাম আসলে।’

‘কেন?’

‘মিস্টার টিবসের কারণেই সব কিছু ঘটেছে, টনি। মিস্টার টিবস যদি হারিয়ে না-যেত, তা হলে খুন হতেন না মিসেস ক্যুপার। খুন করা হতো না তাঁর ছেলেকেও।’

আমি নিশ্চিত, মশকরা করছে হোথর্ন। অথচ ওকে দেখে তা মনে হচ্ছে না। আমার সামনেই বসে আছে সে; আক্রোশ আর আত্মকেন্দ্রিকতার যে-অদ্ভুত শক্তিমত্তা দেখা যায় ওর ভিতরে, দেখতে পাচ্ছি সেটা… সে-শক্তির কারণে ওকে ঠিক বুঝে উঠতে পারি না বেশিরভাগ সময়। এইমাত্র যা বলেছে সে, সে-ব্যাপারে ওকে চ্যালেঞ্জ জানানোর আগেই দ্বিতীয়বারের মতো বেজে উঠল ডোরবেলটা।

‘দরজা খুলবো?’ জিজ্ঞেস করলাম।

হাত নাড়ল হোথর্ন। ‘এই বাসা আপনার।’

এগিয়ে গিয়ে তুলে নিলাম ইন্টারকম টেলিফোনটা। ‘হ্যাঁ, বলুন?’

‘আমি অ্যালান গডউইন।’

উত্তেজনার উত্তাল একটা তরঙ্গ যেন টের পেলাম নিজের ভিতরে। উপরে আসতে বললাম আমার প্রথম অতিথিকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির হয়ে গেলেন গডউইন। কাপড়ের উপরে একটা রেইনকোট পরেছেন, সেটা তাঁর শরীরের তুলনায় বেশ বড় দেখাচ্ছে। মনে পড়ে গেল, এই কোট তিনি মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যের দিনও পরেছিলেন। এমন এক ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকলেন, দেখে মনে হলো, ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কোনো আসামি।

আমি প্রায় নিশ্চিত, ক্যান্টেব্রিতে যাওয়ার পথে হোথর্ন আমাকে যা-ই বলে থাকুক না কেন, সে আজ এখানে গডউইনকে ডেকে এনেছে একটা মাত্র কারণে… সে-ও আমার মতোই ভাবছে, গডউইনই খুনি। এবং কথাটা আজ সরাসরি বলবে সে। আজ নিজের সব গোপন কথা প্রকাশ করবে আমার সামনে। মনে পড়ে গেল, আরও একজনের আসার কথা আছে। তার মানে… খুনের কাজে কি কোনো সহযোগী ছিল গডউইনের?

‘কী চান আপনি?’ জিজ্ঞেস করলেন গডউইন, সোজা এগিয়ে গেছেন হোথর্নের দিকে। ‘বলেছেন, আমাকে বলার মতো নাকি কিছু কথা আছে আপনার। সেসব কথা ফোনে কেন বলতে পারলেন না?’ এদিক-ওদিক তাকালেন তিনি, চারপাশটা দেখে নিলেন একনজর। ‘আপনি কি এখানেই থাকেন?’

‘না,’ ইঙ্গিতে আমাকে দেখিয়ে দিল হোথর্ন। ‘তিনি থাকেন।’

গডউইন বোধহয় বুঝতে পারলেন, আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পরও আমার ব্যাপারে কিছুই জানেন না তিনি। ‘আপনি কে?’ দাবি জানানোর ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন। ‘নিজের নামটা আমাকে বলেননি কখনও।’

সৌভাগ্যক্রমে ডোরবেলটা বেজে উঠল আবারও, জবাব দেয়ার জন্য দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলাম।

কিন্তু এবার ইন্টারকমের ও-প্রান্তে নীরবতা।

‘আপনি কি হোথর্নের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি। ‘হ্যাঁ,’ জবাব দিল একটা নারীকণ্ঠ।

‘একটা বাটন চেপে দরজা খুলে দিচ্ছি। সিঁড়ি বেয়ে চলে আসুন উপরতলায়।’

‘কে এসেছে?’ জিজ্ঞেস করলেন গডউইন, তাঁর কণ্ঠের ভীতি স্পষ্ট টের পেলাম। এবং এ-ও বুঝতে পারলাম, যে এসেছে তার পরিচয় জানা আছে তাঁর।

‘আপনি বসে পড়ছেন না কেন, মিস্টার গডউইন?’ বলল হোথর্ন। ‘আপনি যদিও আমাকে বিশ্বাস করবেন না, তারপরও বলি… আমি কিন্তু আসলে আপনাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি। কিছু লাগবে আপনার?’

‘জুস আছে আমার বাসায়,’ বললাম আমি।

‘পানি খাবো,’ টেবিলের আরেকপ্রান্তে বসে পড়লেন গডউইন। হোথর্নের মুখোমুখিই বসেছেন, কিন্তু ওর সঙ্গে যাতে চোখাচোখি না-হয় সে-ব্যাপারে সতর্ক আছেন।

পানি আর জুস দুটোই সরিয়ে রাখতে বলেছিল হোথর্ন; গিয়ে পানি নিয়ে এলাম গডউইনের জন্য। ঠিক তখনই পায়ের আওয়াজ শুনতে পেয়ে মুখ তুলে তাকালাম।

ঘরে ঢুকছে মেরি ও’ব্রায়ান।

কল্পনাও করিনি, ওই মেয়েকে এখন এই সময়ে দেখতে হবে আমার এখানে।

আমাদের দিকে দু’কদম এগিয়ে এল সে, তারপরই থেমে দাঁড়িয়ে পড়ল স্থাণুর মতো। একটা মুহূর্ত আগেও হয়তো নার্ভাস আর অনিশ্চিত ছিল সে, কিন্তু এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার উপর বজ্রপাত হয়েছে যেন। অ্যালান গডউইনকে দেখতে পেয়েছে, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লোকটার দিকে। গডউইন নিজেও কোনো অংশে কম চমকাননি মেরির চেয়ে, তিনিও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মেয়েটার দিকে।

লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল হোথর্ন। শয়তানি কিছু-একটা দেখা যাচ্ছে ওর চেহারায়… এমন একজাতের উল্লাস দেখতে পাচ্ছি সেখানে, যা আগে কখনও দেখিনি। বলল, ‘আমার ধারণা আপনারা দু’জন চেনেন একজন আরেকজনকে।’

বজ্রাহত অবস্থা থেকে আগে সামলে নিলেন অ্যালান গডউইন। ‘অবশ্যই আমরা চিনি একজন আরেকজনকে। আপনি আসলে কী বোঝাতে চাইছেন, বলুন তো?’

‘আমার ধারণা কী ঘটছে এখানে, সেটাও জানেন আপনি, অ্যালান। মেরি, আপনি বসছেন না কেন? আপনাদের দু’জনকে যদি নাম ধরে ডাকি, অসুবিধা আছে? আসলে আমরা এখানে যারা আছি এখন, সবাই একজন আরেকজনের বন্ধু… ঠিক না?’

‘কিছুই বুঝতে পারছি না আমি!’ নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করছে মেরি ও’ব্রায়ান, কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আর কিছুক্ষণের মধ্যে কান্নায় ভেঙে পড়বে। গডউইনের দিকে তাকাল। ‘আপনি কেন এসেছেন এখানে?’

ইঙ্গিতে হোথর্নকে দেখিয়ে দিলেন গডউইন। ‘তিনি আসতে বলেছেন।’

গডউইন আর মেরি… দু’জনকেই কেমন অপরাধীর মতো দেখাচ্ছে। একইসঙ্গে মনে হচ্ছে, তাঁরা রেগে গেছেন… ভয়ও পেয়েছেন।

উঠে দাঁড়ালেন গডউইন। ‘এখানে আর থাকছি না আমি। মিস্টার হোথর্ন, আপনি যে-খেলায় মেতেছেন, সেটা নিয়ে কোনো পরোয়া নেই আমার। ওই খেলায় অংশ নিতে আমি রাজি না।’

‘খুব ভালো কথা, অ্যালান। কিন্তু আপনি যদি এই ঘর থেকে বেরিয়ে যান, পুলিশ জেনে যাবে সব কথা। এবং তারপর আপনার স্ত্রীও জানতে পারবেন।’

বরফের মতো জমে গেলেন গডউইন। মেরিও নড়ছে না।

ঘরের ভিতরের পুরো পরিস্থিতি এখন হোথর্নের নিয়ন্ত্রণে।

‘বসে পড়ুন,’ বলল সে। ‘গত দশ বছর ধরে আপনারা দু’জন গোপনে আঁতাত করছেন, এবং মিথ্যা কথা বলছেন সবার কাছে। কিন্তু আজ সেই খেল খতম। আর সে-কারণেই আপনাদেরকে ডেকে আনা হয়েছে এখানে।’

আবারও বসে পড়লেন গডউইন। গিয়ে তাঁর পাশে বসে পড়ল মেরি, তবে দূরত্ব বজায় রেখেছে।

খেয়াল করলাম, মেয়েটা বসামাত্র, গডউইন নিঃশব্দে বলে উঠলেন, ‘আমি দুঃখিত।’ তাঁর ঠোঁট নাড়ানোর ভঙ্গি দেখে বুঝে ফেললাম কথাটা। এবং এ-ও বুঝতে পারলাম, গডউইন আর মেরি আসলে প্রেমিক-প্রেমিকা। আরও বুঝতে পারলাম, এই ব্যাপারটা সন্দেহ করেছিলেন জুডিথ গডউইন। আর সে-কারণেই মন কষাকষি হয়েছিল ওই দুই মেয়েমানুষের মধ্যে।

পিয়ানো স্টুলটার উপর বসে পড়লাম আমি। এখন ঘরের ভিতরে কেবল হোথৰ্নই দাঁড়িয়ে আছে!

‘ডিলে যা ঘটেছিল,’ শুরু করল সে, ‘তা খতিয়ে দেখা দরকার আমাদের। কারণ পুরো কাহিনি কম করে হলেও ছ’বার শুনেছি আমি। কিন্তু আপনারা দু’জন যা বলেছেন ওই ব্যাপারে, তা মিথ্যা ছাড়া আর কিছু না। যা-হোক, এখন আপনারা ফেঁসে গেছেন, এবং এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই আপনাদের। আমার খারাপ লাগা উচিত ছিল আপনাদের জন্য, কিন্তু লাগছে না।

সিগারেটের প্যাকেট বের করল সে পকেট থেকে, একটা ধরাল। কিচেনে গিয়ে ঢুকলাম আমি, একটা অ্যাশট্রে নিয়ে এলাম। ওটা রাখলাম টেবিলের উপর যাতে ব্যবহার করতে পারে।

‘এই লীলাখেলা কবে থেকে শুরু করলেন আপনারা?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন। নীরবতা।

কাঁদতে শুরু করেছে মেরি।

হাত বাড়িয়ে দিয়ে ওই মেয়ের একটা হাত ধরতে চাইলেন অ্যালান গডউইন, কিন্তু টান মেরে হাতটা সরিয়ে নিল সে।

গডউইন বুঝে গেছেন, আর ভান করে কোনো লাভ নেই। হোথর্নের প্রশ্নের জবাবে বললেন, ‘মেরি আমাদের ওখানে কাজ শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই। আসলে… আমিই শুরু করেছিলাম এসব। সম্পূর্ণ দায় নিজের উপর নিচ্ছি আমি।’

‘সব শেষ হয়ে গেছে এখন,’ নিচু গলায় বলল মেরি। ‘অনেকদিন হলো সব কিছু শেষ হয়ে গেছে আমাদের মধ্যে।

‘সত্যি বলতে কী,’ মুখ খুলল হোথর্ন, ‘আপনাদের মাঝখানের এই অনৈতিক সম্পর্কের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র পরোয়া নেই আমার। আমি শুধু সত্যি কথাটা জানতে চাই। …ডায়ানা ক্যুপার হয়তো ভুলে তাঁর চশমা ফেলে এসেছিলেন, কিন্তু বাচ্চা দুটো দৌড়ে রাস্তা পার হতে চেয়েছিল আপনাদের দু’জনের কারণেই। বলুন, ঠিক না?’

মাথা ঝাঁকাল মেরি। তার গাল বেয়ে অশ্রু নামছে।

আমার দিকে তাকাল হোথর্ন। ‘একটা সত্যি কথা বলি আপনাকে, টনি আপনাকে নিয়ে যখন ডিলে গেলাম, অনেক কিছুই আমার বোধগম্য হচ্ছিল না। যেমন, বাচ্চা দুটো ওই আইসক্রিমের দোকানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রাস্তা পার হওয়ার জন্য ছুট লাগিয়েছিল। কিন্তু দোকানটা তখন ছিল বন্ধ। শুধু তা-ই না, পানিতে ভেসে গিয়েছিল সেটা, ইলেকট্রিক লাইনেও সমস্যা হয়েছিল। তার মানে দোকানের ভিতরে তখন ছিল অন্ধকার। আমি জানি বাচ্চা দুটোর বয়স তখন মাত্র আট বছর। তারপরও… কোনো দোকান বন্ধ নাকি খোলা, সেখানে গেলে আইসক্রিম পাওয়া যাবে কি যাবে না… এসব বুঝবার মতো বুদ্ধি নিশ্চয়ই ছিল তাদের? তারপরও তারা দৌড় দিল, এবং গিয়ে পড়ল মিসেস ক্যুপারের গাড়ির নিচে। একজন মারা গেল সেখানেই। আরেকজন পড়ে থাকল গুরুতর আহত অবস্থায়। এবার ওষুধের দোকানের মিস্টার ট্রাভের্টনের কথা অনুযায়ী, বেঁচে থাকা বাচ্চাটা ওর বাবাকে ডাকতে লাগল। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, ও-রকম অবস্থায় কোনো বাচ্চাই ওই কাজ করবে না। কোনো বাচ্চা যখন আহত হয়, সে তার মাকে চায়… সে তার মাকে ডাকে। কাজেই, ঠিক কী হচ্ছিল তখন সেখানে?’

একটুখানি থামল সে।

কেউ কিছু বলছে না।

আমার মনে হচ্ছে, পুরো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়েছে হোথর্ন। মনে হচ্ছে, এই ফ্ল্যাট শুধু আমারই না, ওরও। অস্বীকার করার উপায় নেই, চুম্বকের মতো কোনো একজাতের ব্যক্তিত্ব আছে হোথর্নের। এবং এ-কথাও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, চুম্বক শুধু আকর্ষণই করে না, বিকর্ষণও করে।

‘চলুন একেবারে শুরুতে ফিরে যাই,’ বলছে সে। ‘বাচ্চা দুটোকে ডিলে নিয়ে গেলেন মেরি। তাদের মায়ের একটা কনফারেন্স ছিল। আর বাবা একটা বিযনেস ট্রিপে গিয়েছিলেন ম্যানচেস্টারে। ছেলে দুটোকে নিয়ে রয়্যাল হোটেলে উঠলেন মেরি। একটা ফ্যামিলি রুম বরাদ্দ দেয়া হলো তাঁদেরকে, কিন্তু সেটা পছন্দ হলো না তাঁর। তিনি বাচ্চা দুটোর জন্য চেয়েছিলেন একটা টুইন রুম। আর নিজের জন্য চেয়েছিলেন একটা ডাবল রুম। এবার, টনি, আপনিই বলুন, ও-রকম কেন চাইলেন মেরি?’

‘হোটেল থেকে আমাদেরকে বলা হয়েছে, ওই ফ্যামিলি রুম থেকে নাকি সাগর দেখা যায় না।’

‘সাগর দেখা যাওয়া না-যাওয়ার সঙ্গে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই আসলে। …মেরি, আসল ঘটনাটা আপনিই বলে দিচ্ছেন না কেন টনিকে?’

আমার দিকে তাকাল না মেরি। যখন কথা বলল, আমার মনে হলো কোনো মানুষ না, একটা রোবট কথা বলছে যেন। ‘ডিলে… দেখা করার কথা ছিল আমাদের দু’জনের। একসঙ্গে… থাকার কথা ছিল।

‘ঠিক,’ ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল হোথর্নের কণ্ঠে। ‘পুরনো সেই প্রেমকাহিনি … আয়া এবং তার নিয়োগকর্তা। কিন্তু হ্যাঁরো-অন-দ্য-হিলে এসব করার উপায় ছিল না আপনাদের, তাই না? কাজেই আপনারা করলেন কী… চুরি করে একটা উইকএন্ড ম্যানেজ করলেন নিজেদের জন্য, তা-ও আবার সমুদ্রতীরবর্তী কোনো শহরে। ভালোমতোই জানা ছিল আপনাদের, বাচ্চা দুটো ছ’টার মধ্যে শুয়ে পড়ে বিছানায়। অর্থাৎ একসঙ্গে থাকার জন্য সারাটা রাত ছিল আপনাদের হাতে।’

‘আপনি আসলে বিরক্তিকর একটা মানুষ,’ বলে উঠলেন গডউইন। ‘নোংরা সব কথাবার্তা বলছেন।’

‘কেন, নোংরা কোনো কিছু কি করেননি আপনারা?’ ধোঁয়া ছাড়ল হোথর্ন। ‘সেদিন সেই ওষুধের দোকানে একজন রহস্যমানবের আবির্ভাব ঘটেছিল… আপনিই সে-লোক। কী করছিলেন আপনি সেখানে, বলুন তো? যদি বলি, ডায়ানা ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের সময় যে-কারণে কাঁদছিলেন, ঠিক একই কারণে সেদিন গিয়েছিলেন ওই দোকানে, তা হলে কি ভুল হবে?’

খুব মনমরা দেখাচ্ছে গডউইনকে… কেন, ভাবলাম আমি।

‘আসলে আপনার হে ফিভার (hay fever) আছে। এটা একজাতের অ্যালার্জি… ফুলের রেণু বা ধূলিকণার কারণে হয়। এই অসুখ যাদের আছে, তাদের চোখ আর নাকের মিউকাস মেমব্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়, ফলে চোখ আর নাক দিয়ে সমানে পানি পড়তে থাকে… দেখলে মনে হয় কাঁদছে তারা।’ আমার দিকে তাকাল হোথর্ন। ‘ব্রম্পটন সেমেট্রিতে যখন ছিলাম আমরা, প্লেন ট্রি-গুলো লক্ষ করেছিলেন?’

‘হ্যাঁ। এবং ওই ব্যাপারে নোটও নিয়েছি আমি। মিসেস ক্যুপারের কবরের ঠিক পাশেই ছিল ওই গাছগুলো।

‘আপনার যদি হে ফিভার থাকে, তা হলে প্লেন ট্রি আপনার জন্য সাংঘাতিক খারাপ। কারণ ওসব গাছের পরাগরেণু সরাসরি চলে আসতে পারে আপনার নাকে। …এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের দুটো বহুল-পরিচিত উপায় কি আপনাকে বলে দিতে হবে?’

‘মধু,’ বললাম আমি। ‘আর আদা চা।’

‘এবং ঠিক ওগুলোই ওই ফার্মেসি থেকে কিনেছিলেন অ্যালান সেদিন।’ গডউইনের দিকে তাকাল হোথর্ন। ‘তখন রোদ ঝলমল করছিল না, অথচ সানগ্লাস পরে ছিলেন আপনি। আসলে চাননি কেউ চিনে ফেলুক আপনাকে। আপনার বান্ধবীর সঙ্গে প্রেম করার জন্য ডিলে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু তখন, যে- কোনো কারণেই হোক, হে ফিভারে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। আর তাই সাহায্যের জন্য ওই ওষুধের-দোকানে যেতে হয় আপনাকে। কিছু হার্বাল সামগ্রী কেনার পর ওই দোকান থেকে বেরিয়ে আসেন, আর তখনই ঘটে দুর্ঘটনাটা।

‘আপনার কারণেই ঘটেছিল মর্মান্তিক ওই ঘটনা। আপনার দুই ছেলে তখন ছিল সৈকতসংলগ্ন প্রমেনেডে। কখনও যাতে দৌড়ে রাস্তা পার না-হয়, সেটা বলে দেয়া হয়েছিল ওদেরকে। ওরাও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল, আইসক্রিমের দোকানটা বন্ধ। কিন্তু হঠাৎ করেই ওদের চোখের সামনে হাজির হলো ওদের বাবা… হেঁটে বের হলো সেই ওষুধের দোকানটা থেকে। আপনি তখন ক্যাপ আর সানগ্লাস পরে ছিলেন, তারপরও আপনাকে চিনে নিতে কষ্ট হয়নি বাচ্চা দুটোর। খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল ওরা, ছুট লাগাল আপনার উদ্দেশে। আর ঠিক সে-মুহূর্তেই রাস্তার কোনা ঘুরে বেরিয়ে এল ডায়ানা ক্যুপারের গাড়িটা। এবং মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনাও ঘটল আপনার চোখের সামনেই। আপনার দুটো বাচ্চাই চাপা পড়ল গাড়ির নিচে।’

গুঙিয়ে উঠলেন গডউইন। দুই হাতে চেপে ধরলেন মাথা। নিঃশব্দে ফোঁপাচ্ছে মেরি।

‘টিমোথি মারা গেল,’ বলে চলল হোথর্ন, ‘ঘটনাস্থলে পড়ে ছিল জেরেমি, ‘বাবা, বাবা’ বলে ডাকতে লাগল সে, কারণ কিছুক্ষণ আগে আপনাকে দেখেছিল। অ্যালান, ওই মুহূর্তে আপনার মনের ভিতরে ঠিক কী চলছিল, কল্পনাও করতে পারি না আমি। কারণ আপনি তখন চোখের সামনে দেখেছেন, আপনার দুই ছেলেকে চাপা দিয়ে চলে গেছে একটা গাড়ি। অথচ বাচ্চা দুটোর কাছে যেতে পারছেন না, কারণ তা হলে ফাঁস হয়ে যাবে আপনি আসলে ম্যানচেস্টারে যাননি। বাচ্চা দুটোর কাছে যেতে পারেননি আপনি, কারণ যদি যেতেন তা হলে ডিলে কী করছিলেন সে- ব্যাপারে কী ব্যাখ্যা দিতেন আপনার স্ত্রীর কাছে?’

ওরা যে গুরুতরভাবে আহত হয়েছে, সেটা বুঝতে পারিনি আমি তখন,’ কর্কশ হয়ে গেছে গডউইনের কণ্ঠ। ‘ওদের জন্য আমার কিছু করারও ছিল না আসলে…

বিশ্রী একটা গালি দিল হোথর্ন। ‘কিছু করার ছিল না আপনার, না? দৌড়ে হাজির হতে পারতেন আপনি আপনার ছেলেদের কাছে। টিমোথির জন্য হয়তো কিছু করার ছিল না, কিন্তু জেরেমির জন্য তো কিছু করতে পারতেন? আসলে আপনার মাথায় তখন খেলা করছিল নিজেকে লুকিয়ে ফেলার ব্যাপারটা, আর তাই সুযোগ পাওয়ামাত্র সটকে পড়েছিলেন।’ অ্যাশট্রেতে পিষে নেভাল সিগারেটটা, গনগন করে উঠল ছাই। ‘আসলে ওই মুহূর্তে মেরির সঙ্গে একরকমের চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন আপনি। কোনো কথাই হয়নি আপনাদের মধ্যে, শুধু ইশারায় সম্পাদিত হয়েছিল ওই চুক্তি। কীভাবে বুঝলাম? ট্রাভের্টন বলেছেন, মেরি নাকি তাকিয়ে ছিলেন তাঁর দিকে। ভুল বলেছেন তিনি। মেরি আসলে তাকিয়ে ছিলেন আপনার দিকে। কারণ আপনি দাঁড়িয়ে ছিলেন ট্রাভের্টনের ঠিক পাশে।’ মেরির দিকে তাকাল হোথর্ন। ‘আপনি ইশারায় চলে যেতে বলেছিলেন অ্যালানকে, ঠিক না?’

‘করার মতো কিছু ছিল না ওর,’ একটু আগে যা বলেছেন গডউইন, সে-কথারই পুনরাবৃত্তি করল মেরি। মড়ার মতো চেহারা হয়েছে তার। দুই গালে এখনও লেগে আছে অশ্রুর দাগ।

হোথর্ন বলল, ‘এত বছর ধরে গডউইন পরিবারের সঙ্গে কেন আছেন, সেটা বোধহয় মোটামুটি বুঝতে পারছি আমি, মেরি। যা ঘটেছিল ডিলে, সে-দায় থেকে নিজেকে মুক্তি দিতে পারেননি আপনি আসলে। নাকি… অ্যালানের সঙ্গে এখনও অবাধ যৌনাচার চলছে আপনার?’

‘ঈশ্বরের দোহাই লাগে!’ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে গডউইনের চেহারা। ‘ওসব অনেক আগেই বন্ধ করে দিয়েছি আমরা। জেরেমির জন্য রয়ে গেছে মেরি। শুধু জেরেমির জন্য।’

‘হ্যাঁ। আর জেরেমিও আছে মেরির জন্য। ওদের একজনকে আসলে বানানো হয়েছে আরেকজনের জন্য।’

‘আমাদের কাছে কী চান আপনি?’ জিজ্ঞেস করলেন গডউইন। ‘আপনার কি মনে হয় না সেদিন যা ঘটেছে, তার জন্য ইতোমধ্যেই যথেষ্ট শাস্তি পেয়েছি আমরা?’ একটা মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করলেন তিনি। তারপর বলে চললেন, ‘পুরো ব্যাপারটা দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু না। আমি যদি ওই মুহূর্তে বেরিয়ে না- আসতাম ওই দোকান থেকে, তখন যদি আমাকে না-দেখত বাচ্চা দুটো…। আপনি কি এখন সব কথা বলে দেবেন জুডিথকে?’

‘না, তাঁকে কিছুই বলবো না আমি। ব্যাপারটা আমার না।

‘তা হলে আমাদের দু’জনকে এখানে নিয়ে এলেন কেন?’

‘কারণ আপনাদের ব্যাপারে যা অনুমান করেছিলাম আমি, সেটা ঠিক কি না, জানার দরকার ছিল আমার।’

উঠে দাঁড়ালেন অ্যালান গডউইন। একই কাজ করল মেরি ও’ব্রায়ানও। দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন অ্যালান। তাঁর পিছু নিয়েছে মেয়েটা।

বেরিয়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে ঘুরলেন গডউইন। ‘আপনি একজন চালাক মানুষ, মিস্টার হোথর্ন। কিন্তু এতগুলো বছর আমাদের উপর দিয়ে কী গেছে, সে-ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই আপনার। কারণ আবেগ বলে কিছু নেই আপনার। ভয়ঙ্কর একটা ভুল করে ফেলেছিলাম আমরা, এবং সে-ভুলের দায় মাথায় নিয়ে প্রতিটা দিন অতিবাহিত করতে হচ্ছে আমাদেরকে। তারপরও বলবো, আমরা কিন্তু দানব না। আমরা অপরাধী না। আমরা একজন আরেকজনকে ভালোবেসেছিলাম।’

হোথর্নকে দেখে মনে হচ্ছে না, গডউইনের ওসব কথা বিন্দুমাত্র প্রভাব বিস্তার করেছে ওর মনে। আরও বেশি পাণ্ডুর দেখাচ্ছে ওকে। আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিশোধপরায়ণ দেখাচ্ছে ওর দুই চোখ।

বলল, ‘কীসের ভালোবাসা? আপনারা আসলে সেক্স করতে চেয়েছিলেন। এবং আপনি জেনেবুঝে ধোঁকা দিচ্ছিলেন আপনার স্ত্রীকে। আর সে-কারণেই মারা গেছে আপনার একটা ছেলে।’

তীব্র বিতৃষ্ণার দৃষ্টিতে হোথর্নের দিকে তাকিয়ে আছেন গডউইন। মেরি ইতোমধ্যেই বেরিয়ে গেছে দরজা দিয়ে। ঘুরলেন গডউইন, অনুসরণ করলেন মেয়েটাকে।

এখন ঘরের ভিতরে শুধু আমি আর হোথৰ্ন।

‘ওই দু’জনের সঙ্গে কি এতটা কঠোর হওয়ার দরকার ছিল?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।

অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘কেন, ওদের জন্য কি খারাপ লাগছে আপনার?’

‘জানি না… সম্ভবত। অ্যালান গডউইন খুন করেননি ডায়ানা ক্যুপারকে।’

‘ঠিক। ওই দুর্ঘটনার জন্য তিনি দায়ী করেন না মিসেস ক্যুপারকে। বরং তিনি দায়ী করেন নিজেকেই। কাজেই মিসেস ক্যুপারকে খুন করার কোনো কারণই নেই তাঁর।’

‘কিন্তু গাড়িটা যে চালাচ্ছিল তখন…’

‘ড্যামিয়েন, তার মা, অথবা তাদের কোনো প্রতিবেশী… গাড়িটা কে চালাচ্ছিল ওই সময়ে, তাতে কিছু যায়-আসে না।

ঘরের বাতাসে যেন ঝুলে আছে সিগারেটের ধোঁয়া। এই ঘটনার ব্যাখ্যা পরে আমার স্ত্রীর কাছে দিতে হবে আমাকে। আমি এখনও বসে আছি পিয়ানো টুলটার উপর। হত্যাকাণ্ড দুটোর ব্যাপারে যে-এক নম্বর থিউরি দাঁড় করিয়েছিলাম, সেটা বিধ্বস্ত হয়েছে এইমাত্র।

বললাম, ‘অ্যালান গডউইন যদি খুনি না-হবে, তা হলে কে খুন করেছে মিসেস ক্যুপার আর তাঁর ছেলেকে?’

‘গ্রেস লোভেল,’ বলল হোথ

চমকে উঠলাম আমি।

কিন্তু হোথর্নের পরের কথায় কেটে গেল আমার সে-চমক।

‘আগামীকাল গ্রেস লোভেলের সঙ্গে দেখা করতে যাবো আমরা।’

২০. একজন অভিনেত্রীর জীবন

ব্রিক লেনের সেই ফ্ল্যাটে আর ফিরে আসেনি গ্রেস লোভেল এবং সেজন্য তাকে দোষও দিচ্ছি না আমি। সেখানে যে-পরিমাণ রক্তপাত হয়েছে, সেসব মুছে ফেলতে অনেক সময় লাগবে। হিংসাত্মক যে-ঘটনা ঘটেছে সেখানে, সেটা মুছে ফেলতে সময় লাগবে আরও বেশি।

আপাতত হাউনস্লো-তে, নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে, অ্যাশলিইকে নিয়ে থাকছে লোভেল। জায়গাটা হিথ্রো এয়ারপোর্টের কাছে। ওই বিমানবন্দরে সিনিয়র কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন লোভেলের বাবা। তাঁর নাম মার্টিন লোভেল। আজ ছুটি নিয়েছেন তিনি। ভদ্রলোক বিশালদেহী, তাঁকে দেখলেই ভয় লাগে মনে। যে-পোলো শার্ট পরে আছেন, সেটা তাঁর শরীরে কেমন ছোট হয়ে গেছে। সে-শার্টের হাতা যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আছে কসাইদের-হাতের মতো শক্তিশালী দুটো বাহু। মাথা কামিয়ে রেখেছেন তিনি, ফলে তাঁর বয়স অনুমান করা মুশকিল। তবে আপাতত ধারণা করে নিলাম ষাটের কাছাকাছি হবে। তাঁর সঙ্গে আদৌ কোনো মিল নেই গ্রেসের। অ্যাশলিইকে কোলে নিয়েছেন তিনি, এবং আমার ধারণা কী করছেন তিনি সে-ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক আছেন। কারণ তিনি যদি তা না- থাকেন, তা হলে তাঁর সেই ভালুকের মতো আলিঙ্গনে হয়তো দম আটকে যেতে পারে ছোট্ট মেয়েটার। দুনিয়ার কোথায় কী হচ্ছে না-হচ্ছে সে-ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই ওই মেয়ের, ডুবে আছে একটা র‍্যাগ বুকের পাতায়

বাড়িটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, আধুনিক। বিমানবন্দরের মেইন রানওয়ে থেকে বেশি দূরে না। কয়েক মিনিট পর পরই একটা করে প্লেন টেকঅফ করছে, আর তখন প্রচণ্ড শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছে আমাদের। কিন্তু এই একই শব্দে গ্রেস আর তার বাবার কোনো বিকার হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। অ্যাশলিই রীতিমতো উপভোগ করছে শব্দটা… যখনই কোনো প্লেন উড়ে যাচ্ছে তখনই মুখ টিপে হেসে উঠছে। গ্রেস আমাদেরকে বলেছে, তার মা রোযমেরি লোভেল কাজে গেছেন। স্থানীয় একটা সেকেন্ডারি স্কুলে অঙ্ক শেখান তিনি। ফলে আমরা পাঁচজন এখন বলতে গেলে গায়ে গা ঘেঁষে বসে আছি সোফা আর আর্মচেয়ারে। এসব সোফা আর আর্মচেয়ার এই-ঘরের-তুলনায় বড় হয়ে গেছে আসলে। আমাদেরকে কফি অফার করেছিলেন মার্টিন, কিন্তু আমরা মানা করে দিয়েছি। কথা যা বলার গ্রেসই বলছে, তার বাবা বলতে গেলে চুপ করে আছেন। খেয়াল করলাম, থেকে থেকে লক্ষ করছেন তিনি আমাকে আর হোথর্নকে। তখন অদ্ভুত একজাতের ধিকিধিকি ক্রোধ দেখা যাচ্ছে তাঁর চোখে।

ড্যামিয়েন ক্যুপারের সঙ্গে কাটানো নিজের-জীবনের বর্ণনা দিল গ্রেস বিশ- মিনিট-ধরে… কীভাবে দেখা হলো তাদের, কীভাবে একটা সম্পর্কে জড়িয়ে গেল তারা, কীভাবে সময় কাটাল আমেরিকাতে। শেষ যে-ক’বার এই মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমাদের, তখন যে-রকম দেখেছি তাকে, তার চেয়ে কেন যেন সম্পূর্ণ অন্যরকম মনে হচ্ছে আজ। মনে হচ্ছে, ড্যামিয়েনের মৃত্যুতে কোনো একজাতের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি পেয়ে গেছে যেন। তার কথা শুনতে শুনতে আমার মনে হলো, ড্যামিয়েনের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্কটা শেষ হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। মনে পড়ে গেল, হোথর্ন একবার ব্যঙ্গ করে এই মেয়েকে বিষাদাক্রান্ত বিধবা বলেছিল। আসলে… ঠিকই বলেছিল হোথর্ন। আমাদের সামনে সব সময়ই অভিনয় করে গেছে মেয়েটা। আমার কথাটা হয়তো নিষ্ঠুর শোনাচ্ছে… কিন্তু… মেয়েটাকে আমি পছন্দ করি, সে যুবতী এবং সহজাত একজাতের দক্ষতাও আছে তার মধ্যে… তারপরও আমার মনে হয় নিজের জীবনটা চুরি হতে দিয়েছে সে নিজেরই কাছ থেকে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ড্যামিয়েনের মৃত্যুতে জীবনটা নতুন করে শুরু করার একটা সুযোগ পেয়ে গেছে সে … যদিও এ-ব্যাপারে মুখ ফুটে কিছুই বলেনি।

‘আমি সব সময়ই একজন অভিনেত্রী হতে চেয়েছিলাম। যখন স্কুলে পড়তাম, নাটকের ক্লাসগুলো খুব ভালো লাগত আমার। যখনই সময়-সুযোগ করতে পারতাম, থিয়েটারে চলে যেতাম। স্কুলে যখন ছুটিছাটা থাকত, একটা হেয়ারড্রেসিং সেলুনে পার্টটাইম কাজ করতাম, যাতে টাকা জমাতে পারি, আর সে-টাকা দিয়ে কিনতে পারি থিয়েটারের টিকিট। মা আর বাবাও সব সময় সাহায্য করেছেন আমাকে, সমর্থন করেছেন। তাঁদেরকে যখন বললাম রাডা-তে (RADA = রয়্যাল অ্যাকাডেমি অভ ড্রামাটিক আর্ট… লন্ডনে অবস্থিত নাটকের একটা স্কুল; সিনেমা, টেলিভিশন আর মঞ্চের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এখানে। সারা যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে-পুরনো নাট্যবিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এটি একটি, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯০৪ সালে) অ্যাপ্লিই করবো, আমাকে শতভাগ সমর্থন দিলেন তাঁরা।

‘যা-হোক, আপনারা আসলে এসেছেন ড্যামিয়েনের ব্যাপারে জানতে। রাডা- তে ছিল সে-ও। বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল আমাদের গ্রুপের সব সদস্যের মধ্যে। আমরা একজন আরেকজনকে ভালোবাসতাম। এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলতে কিছু ছিল না আমাদের কারও মধ্যে। উত্তর ইংল্যান্ডের তিনজন মেয়ে ছিল আমাদের সঙ্গে। তাদেরকে কিছুটা ভয় পেতাম আমরা। সমকামী দুটো লোকও ছিল। কোনো কোনো ছাত্রছাত্রীর বয়স ছিল আমাদের চেয়ে বেশি… ত্রিশের কাছাকাছি। আমাদের সঙ্গে খুব একটা মিশতে চাইত না তারা, নিজেদের মধ্যেই সাচ্ছন্দ্য বোধ করত। আর আমি ছিলাম বলতে গেলে একা।

‘কিন্তু আস্তে আস্তে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে লাগল আমাদের মধ্যে। আর ড্যামিয়েন… সবাই চিনত ওকে, সবাই ওর প্রশংসা করত। ওর বয়স আর আমার বয়স প্রায় এক। রাডা-য় ভর্তি হওয়ার আগে বলতে গেলে কখনও আসেনি সে লন্ডনে … কেন্টে থাকত, অথচ অস্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস ছিল ওর। আমাদের শিক্ষকরাও খুব ভালো জানতেন ওকে। সবাই ওর বেস্ট-ফ্রেন্ড হতে চাইত। ঘটনাক্রমে আমিই হয়ে গেলাম সেটা। তখনও একসঙ্গে বিছানায় যাইনি আমরা… না, একটু ভুল হলো… একবার গিয়েছিলাম। আর পাকাপাকিভাবে একসঙ্গে থাকতে শুরু করলাম রাডা থেকে বেরিয়ে আসার কয়েক বছর পর

‘ড্যামিয়েনের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল আমার। তবে… আরেকটা মেয়ে ছিল আমাদের দু’জনের মাঝখানে… আমান্ডা লেই। অবশ্য… ড্যামিয়েন সব সময় বলত ওটা নাকি ওই মেয়ের আসল নাম না। বিখ্যাত অভিনেত্রী ভিভিয়ান লেইয়ের নাম শুনেছেন না? মেয়েটা ওই অভিনেত্রীর নামে বলতে গেলে পাগল ছিল, এবং কেউ কেউ বলে ওই অভিনেত্রীর মতো হওয়ার উদ্দেশ্যেই পাল্টে নিয়েছিল নিজের নামটা। মেয়েটার ব্যাপারে পরে আরও কিছু কথা বলবো আপনাদেরকে। আগে ড্যামিয়েনের কথা শেষ করি। যা বলছিলাম… আমার আর ড্যামিয়েনের মাঝখানে আমান্ডা ছিল, ছিল আরেকটা ছেলেও… ড্যান রবার্টস। চমৎকার একজন অভিনেতা ছিল সে। অনেকেই মনে করে, ড্যামিয়েন আর ড্যান লেগে ছিল একজন আরেকজনের পেছনে, কিন্তু কথাটা আসলে সত্যি না। আসলে আমরা চারজন ছিলাম খুব ভালো বন্ধু। রাডা-তে যে-ক’বছর ছিলাম, চারজন বলতে-গেলে একসঙ্গেই ছিলাম সব সময়। সেখান থেকে বের হয়ে আমরা যার যার রাস্তায় চলে যাই। গ্লাসগো-তে সিটিযেন থিয়েটারে প্রথম একটা কাজ পেয়ে যাই আমি। ড্যামিয়েন গিয়ে যোগ দেয় আর.এস.সি.-তে। আর ড্যান ছিল ব্রিস্টলে, টুয়েল্ফথ্ নাইট-এ। তবে আমান্ডা কোথায় গিয়েছিল সেটা এখন আর মনে নেই আমার, কিন্তু এটা মনে আছে, আমরা আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম।

‘ড্যামিয়েনের ব্যাপারে যদি কিছু বলতে হয়, তা হলে হ্যামলেট-এর তৃতীয় বছরের প্রোডাকশনের কথাটা বলতেই হবে। কারণ ওই প্রোডাকশনটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম কথা, নাটকটা ছিল হ্যামলেট, আর দ্বিতীয় কথা, বিশেষ ওই চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাবে যে, তার অভিনয়-জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়ার সুযোগ ছিল। নাটকটা দেখতে আসার কথা ছিল শত শত এজেন্টের। ওটা পরিচালনা করছিলেন লিন্ডসে পযনার, রয়্যাল কোর্টে দারুণ কিছু কাজ করেছিলেন তিনি। নাটক পরিচালনার কাজে তিনি যে অদ্বিতীয়, ইয়ং ভিক-এ আমেরিকান বাফেলো পরিচালনার মাধ্যমে সেটা প্রমাণ করেছেন। যা-হোক, কথা ছিল ওই নাটকে নাম-ভূমিকায়, মানে হ্যামলেটের চরিত্রে অভিনয় করবে ড্যান। আগের দুটো নাটকে ছোট ছোট দুটো চরিত্রে অভিনয় করেছিল সে। আমাদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল, ও-রকম চরিত্রগুলোতে ওকে দিয়ে অভিনয় করানো হয়েছিল আসলে, কারণ হ্যামলেট নাটকে হ্যামলেটের চরিত্রে অভিনয় করতে দেয়া হবে ওকে।

‘এই ব্যাপারটা নিয়ে বেশ উত্তেজিত ছিলাম আমরা। কিছুটা নার্ভাসও হয়ে পড়েছিলাম। রাডা ছেড়ে চলে যেতে হবে, অথচ কোনো এজেন্ট পাওয়া যাবে না… এর চেয়ে খারাপ আর কিছু হতে পারে না একজন অভিনয়শিল্পীর জন্য। কাজেই আমাদের জন্য হ্যামলেটের গুরুত্ব ছিল অসীম।

‘কিন্তু শেষপর্যন্ত কী হলো, জানেন? শেষপর্যন্ত বিশেষ ওই চরিত্রের জন্য মনোনীত করা হলো ড্যামিয়েনকে। আর আমি পেলাম অফেলিয়ার চরিত্রটা। আমান্ডা পেল ছোট একটা চরিত্র… অসরিচ।

‘টানা পাঁচ সপ্তাহ ধরে রিহার্সেল করতে হলো আমাদেরকে। আর তখনই এমন একটা ঘটনা ঘটল, যার ফলে বদলে গেল সব কিছু। বদলে গেল আমার জীবনটাও। সপ্তাহখানেক রিহার্সেল করার পর জ্বরে অসুস্থ হয়ে পড়ল ড্যান, ওর চরিত্রে রিহার্সেলের দায়িত্ব তখন ন্যস্ত হলো ড্যামিয়েনের কাঁধে। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে একসঙ্গে কাজ করতে লাগলাম আমি আর ড্যামিয়েন। ফিরে তাকিয়ে যখন দেখি ওসব, বুঝতে পারি, আমি আসলে ওই সময়েই প্রেমে পড়েছিলাম ওর।

‘আজও সেই হ্যামলেট নাটকের প্রোডাকশন নিয়ে কথা বলে লোকে। সেটাতে কাজ করার সুবাদে এজেন্ট পেয়ে যাই আমি, ড্যামিয়েন আর ড্যান। ড্যামিয়েন যে চমৎকার কাজ দেখিয়েছিল ওই নাটকে, সে-ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই… বলতে গেলে বাজিমাত করে দিয়েছিল একাই। ভালো কাজ দেখিয়েছিল ড্যানও। যা-হোক, আমি যা বলতে চাইছি তা হলো, ড্যামিয়েনকে মানুষ হিসেবে যতটা না ভালোবেসেছিলাম, তার চেয়ে বেশি ভালোবেসেছিলাম অভিনেতা হিসেবে। সে আসলে… মানুষ হিসেবে…’

উপযুক্ত শব্দটা খুঁজে পাচ্ছে না গ্রেস, তাই সাহায্যের আশায় তাকাল তার বাবার দিকে।

‘একটা বেজন্মা!’ শব্দটা জোগান দিলেন মিস্টার লোভেল।

‘বাবা!’

‘শয়তানটা তোমার সঙ্গে যে-রকম ব্যবহার করেছে, তোমাকে যেভাবে কাজে লাগিয়েছে…’

‘সব সময় ও-রকম করেনি সে।’

‘শুরু থেকেই ওই শয়তান আর তার মা ও-রকমই ছিল। ওরা দু’জন কেউ কারও চেয়ে কম খারাপ না।

এমন এক দৃষ্টিতে মিস্টার লোভেলের দিকে তাকিয়ে আছে গ্রেস যে, দেখে মনে হচ্ছে, বাবার কথাটা মেনে নিতে পারছে না। তবে এই কথা নিয়ে তাঁর সঙ্গে তর্কে গেল না। আমাদের, মানে আমার আর হোথর্নের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল, ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট ট্যালেন্টের সঙ্গে একটা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করলাম আমি… কাজ করবো জনাথন ক্রীক নামের একটা টিভি শো-তে। তবে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না চরিত্রটা… একজন ম্যাজিশিয়ানের অ্যাসিস্টেন্ট। তারপরও… আমার বায়োডাটার জন্য কিছু তো ছিল! এরপর টিভিতে আরও কয়েকটা কাজ পেয়ে গেলাম: ক্যাযুয়ালটি, হলবি সিটি, দ্য বিল। স্টেলা আরটিয়োসের জন্য একটা বিজ্ঞাপনও করে ফেললাম। আর সেটার জন্য বুয়েন্স আয়ার্সে একটা সপ্তাহ থাকতে হয়েছিল আমাকে। দ্য কান্ট্রি ওয়াইফ আর দ্য সী নামের নাটকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগও পেয়ে গেলাম।

‘তারপর একদিন হুট করেই আবার দেখা হয়ে গেল ড্যামিয়েনের সঙ্গে। ঘটনাক্রমে দ্য কান্ট্রি ওয়াইফ নাটকটা দেখতে এসেছিল সে। আমি যে ছিলাম ওই নাটকে, জানত না সেটা। যা-হোক, ব্যাকস্টেজে ওর সঙ্গে দেখা হলো আমার। গলা ভেজানোর জন্য বাইরে একজায়গায় গেলাম আমরা। ওকে যে চোখের সামনে দেখছি, সেটা বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছিল তখন। মানে… আমি যা বলতে চাইছি তা হলো, আমরা একজন আরেকজনকে এত ভালোমতো চিনি, আমরা একজন আরেকজনের এত ঘনিষ্ঠ ছিলাম, তারপরও বছরের-পর-বছর দেখা হয়নি আমাদের দু’জনের মধ্যে।’

খেলতে খেলতে মার্টিন লোভেলের কোলেই ঘুমিয়ে গেছে অ্যাশলিই; বাচ্চাটাকে সাবধানে সোফায় শুইয়ে দিলেন তিনি। ‘ড্যামিয়েন নামের ওই শয়তান শুধু নিজের ক্যারিয়ারের দিকে খেয়াল রেখেছে। বন্ধু বলতে কেউ ছিল না তার কোনোকালে। তোমাকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে সে।

বাবার দিকে তাকাল গ্রেস। ‘এভাবে বোলো না, বাবা,’ এখনও একমত হতে পারছে না মিস্টার মার্টিনের সঙ্গে। আবারও তাকাল আমাদের দিকে। ‘আমার সঙ্গে যখন আবার দেখা হলো ড্যামিয়েনের, ততদিনে বিখ্যাত হয়ে গেছে সে। লোকে যদি ওর অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য ভিড় না-ও করত, তবুও ওকে দূর থেকে দেখে চিনতে পারত। বড় বড় বেশ কয়েকটা ছবি আর টিভি শো-তে অভিনয় করা হয়ে গিয়েছিল ওর। ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড থেকে একটা পুরস্কারও পেয়েছিল। ততদিনে সে কাজ শুরু করে দিয়েছিল হলিউডে। স্টার ট্রেক-এর শুটিং শুরু করার কথা ছিল ওর। তবে… ওর সঙ্গে দ্বিতীয়বার যখন দেখা হলো, তখন বুঝতে পারলাম, আগের চেয়ে বদলে গেছে সে… কিছুটা যেন কঠোর হয়ে গেছে। অত পয়সা কামাই করতে পারলে, অত সাফল্য পেলে যে-কেউ ও-রকম হয়ে যায় সম্ভবত। ব্রিক লেনের ফ্ল্যাটটা তখন মাত্র কিনে নিয়েছে সে।

‘যা-হোক, সেদিনের সেই সন্ধ্যাটা চমৎকার কাটল আমাদের। একটু বেশিই গিলে ফেলেছিলাম আমরা। কথা বলছিলাম রাডা-য় একসঙ্গে কাটানো দিনগুলো নিয়ে। আর তখনই ওর কাছ থেকে জানতে পারলাম, অভিনয় ছেড়ে দিয়েছে ড্যান। লজ্জাজনক ছিল ব্যাপারটা, কারণ ড্যান ছিল খুব মেধাবী। কিন্তু… কখনও কখনও হয় এ-রকম। প্রতিভার অবমূল্যায়ন হলে একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি সে-কাজে লেগে থাকবে কেন? জানেন, পাইরেট্স অভ দ্য ক্যারিবিয়ান-এর প্রধান চরিত্রটা আরেকটু হলে পেয়ে গিয়েছিল ড্যান। কিন্তু শেষপর্যন্ত সেটা চলে যায় ওরল্যান্ডো ক্লুমের কাছে। আইটিভি’র জন্য ডক্টর যিভাগো নাটকটা করার কথা ছিল ওর, সে-সুযোগও হাতছাড়া হয় ওর।

‘ড্যামিয়েনের কাছ থেকে সেদিন আরও জানতে পারলাম, আমান্ডা স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে। নিজের ব্যাপারে সেদিন অনেক কথা বলেছিল ড্যামিয়েন আমাকে। বলেছিল, স্টার ট্রেক থেকে যে-পরিমাণ টাকা পেয়েছিল, লস অ্যাঞ্জেলসে একটা বাসা কেনার কাজে ব্যবহার করতে পারবে সেটা। ওই বাসায় পাকাপাকিভাবে থাকার কথাও ভাবছিল সে।

‘সপ্তাহ তিনেকের জন্য এসেছিল ড্যামিয়েন ইংল্যান্ডে। কাজ করছিল একটা মিনি সিরিযে। ওই পুরোটা সময় একসঙ্গে সময় কাটিয়েছি আমরা দু’জন। ওর সেই ব্রিক লেনের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম আমি, সেটা বিস্ময়কর মনে হয়েছে আমার। কারণ আমি তখন থাকি ক্ল্যাপহ্যামের ছোট্ট একটা বাসায়, আমার সঙ্গে থাকে আরও দু’জন অভিনেত্রী। কাজেই ড্যামিয়েনের সেই ফ্ল্যাট আমার জন্য ছিল অন্য একটা জগৎ। একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম তখন… ওর ফোন ক্রমাগত বেজেই চলেছে। ওর এজেন্ট, ওর ম্যানেজার, ওর হয়ে যারা পাবলিসিটি চালায় তারা… এমনকী খবরের কাগজ আর রেডিও স্টেশন থেকে সমানে ফোন দেয়া হচ্ছে ওকে। আমি তখন বুঝতে পারি, যখন রাডা-য় ভর্তি হয়েছিলাম, তখন এ-রকম কিছুরই স্বপ্ন দেখেছিলাম।’

‘ওই স্বপ্ন এখন তোমার জন্যও সত্যি হবে, গ্রেস,’ বলে উঠলেন মার্টিন লোভেল, ‘কারণ চিরবিদায় নিয়েছে লোকটা।’

‘কথাটা ঠিক বললে না, বাবা। ড্যামিয়েন কখনও আমার রাস্তায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়নি।

‘তোমার ক্যারিয়ার যেইমাত্র বিকশিত হতে শুরু করেছে, তখনই তোমাকে প্রেগন্যান্ট বানিয়ে দিয়েছে সে।’

‘এমন না যে আমাদের দু’জনের মধ্যে যা ঘটেছে তা একতরফাভাবে ড্যামিয়েনের ইচ্ছাতেই ঘটেছে। বরং আমার প্রেগন্যান্ট হওয়ার ঘটনায় আমারও সম্মতি ছিল। ড্যামিয়েন বলেছিল, আমার মাধ্যমে একটা বাচ্চার বাবা হতে চায় সে। চেয়েছিল, আমি যেন চলে যাই ওর সঙ্গে… যেন থাকি ওর সঙ্গে। বলেছিল, আমাদের দু’জনের জন্য, এমনকী অনাগত বাচ্চাটার জন্যও যথেষ্ট টাকা আছে ওর কাছে। পরের ফ্লাইটেই আমাকে লস অ্যাঞ্জেলসে যাওয়ার কথা বলেছিল সে।’

‘আপনারা দু’জন কি বিয়ে করেছিলেন?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন। অস্বাভাবিক হলেও সত্যি, এই যে এতক্ষণ ধরে কথা বলল গ্রেস, একটাবারের জন্যও কিছু বলেনি সে… কিছু জিজ্ঞেসও করেনি, বরং চুপ করে ছিল সারাটা সময়। মনোযোগ দিয়ে শুনেছে গ্রেসের কথা।

‘না, করিনি। বিয়ে করার পেছনে কোনো যুক্তি থাকতে পারে বলে মনে করেনি ড্যামিয়েন।’

‘মনে করবে কী করে?’ খেঁকিয়ে উঠলেন মার্টিন লোভেল। ‘ওই শয়তান তো সারাটা সময় ব্যস্ত ছিল নিজেকে নিয়েই… শুধু নিজের কথাই ভেবেছে। শয়তানটা আসলে কোনো বাঁধনে জড়াতে চায়নি। আর ওর মা-টাও ছিল একই রকম খারাপ। ছেলেকে মহামূল্যবান ভাবত, ছেলেই ছিল তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। তোমাকে একটুও সময় দেয়নি ওই মহিলা কখনও।’

‘তুমি যতটা বলছ, ডায়ানা আসলে ততটা খারাপ ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রকৃতপক্ষে নিঃসঙ্গ একজন মানুষ। কিছুটা হলেও দুঃখ ছিল তাঁর মনে। আর… মা হিসেবে তিনি তো তাঁর ছেলের ভালো চাইতেই পারেন, তা-ই না?’ অ্যাশলিইয়ের দিকে এগিয়ে গেল গ্রেস; মেয়েটার চোখের উপর নেমে এসেছে কিছু চুল, সরিয়ে দিল ওগুলো। ‘আমাকে যা করতে বলেছিল ড্যামিয়েন, ঠিক তা-ই করেছিলাম আমি। প্লেনের টিকিট পাঠিয়ে দিয়েছিল সে আমার কাছে…’

‘প্রিমিয়াম ইকোনোমি ক্লাস,’ আবারও বাগড়া দিলেন মার্টিন লোভেল। ‘তোমার জন্য এমনকী বিযনেস ক্লাসের টিকিটও পাঠায়নি লোকটা।

‘…আমি গিয়ে উঠলাম ওর কাছে,’ বলছে গ্রেস। ‘ওর এজেন্ট ভিসার ব্যবস্থা করে দিল। অ্যাশলিই জন্ম নিল আমেরিকায়, ওই দেশের নাগরিকত্ব আছে ওর। ড্যামিয়েন ততদিনে স্টার ট্রেকের শুটিং শুরু করে দিয়েছে। তাই ওর সঙ্গে খুব একটা দেখা হতো না আমার। তবে আমি কিছু মনে করতাম না ওই ব্যাপারে। বরং যে-বাসা সে কিনেছিল লস অ্যাঞ্জেলসে, সেটা কেনার কাজে ওকে সাহায্য করেছিলাম। দুটো মাত্র বেডরুম ছিল ওই বাসায়, তারপরও বাসাটা ছিল চমৎকার… একটা পাহাড়ের উপরে অবস্থিত, দারুণ সব দৃশ্য দেখা যেত সেখান থেকে, ছোট্ট একটা পুলও ছিল সেখানে। আমি রীতিমতো প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম ওই বাসার। যেভাবে সাজাতে চেয়েছিলাম ওই বাসা, ওটা আমাকে সেভাবে সাজাতে দিয়েছিল ড্যামিয়েন। অ্যাশলিইয়ের জন্য একটা বেবি রুম সাজিয়ে নিয়েছিলাম আমি। যখন বাজার করার দরকার হতো, তখন কোথায় যেতাম, জানেন? ওয়েস্ট হলিউড আর রডিয়ো ড্রাইভে। বাসায় ফিরতে কখনও কখনও বেশ রাত হয়ে যেত ড্যামিয়েনের, তবে উইকএন্ডটা একসঙ্গেই কাটাতাম আমরা। ওর সব বন্ধুর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সে। আমি তখন ভেবেছিলাম, সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।’

নিচের দিকে তাকাল গ্রেস। বিষাদ দেখতে পাচ্ছি তার চোখে।

‘কিন্তু সব কিছু ঠিক হয়নি শেষপর্যন্ত। দোষ আসলে আমার। চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু লস অ্যাঞ্জেলস ভালো লাগেনি। কারণটা হলো, ওটা আসলে কোনো শহরই না। সেখানে যদি কোথাও যেতে চান আপনি, গাড়িতে চড়তে হবে, কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই সেখানে। মানে… সারি সারি দোকান আছে, রেস্টুরেন্ট আছে, সমুদ্রসৈকত আছে, তারপরও কেমন যেন খালি-খালি লাগে সব কিছু। আর সেখানে গরমও অনেক বেশি… বিশেষ করে আমি যখন প্রেগন্যান্ট ছিলাম, তখন। একসময় খেয়াল করতে শুরু করলাম, বাইরে যতটা না যাচ্ছি, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় একা-একা কাটিয়ে দিচ্ছি আমাদের সেই বাসায়। একটু আগে বলেছি, ড্যামিয়েন আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল ওর বন্ধুদের সঙ্গে, কিন্তু আসলে অত বেশি বন্ধু ছিল না ওর। আর ওরা সব সময় ওদের কাজ নিয়েই গল্পগুজব করত। ফলে আমার অবস্থা হলো দলছুটের মতো। তখন মনে হতো লাগল, মা আর বাবাকে মিস করছি অনেক। মনে হতে লাগল, মিস করছি লন্ডনকে, আমার ক্যারিয়ারকে।

‘ড্যামিয়েনের সঙ্গে আমার কখনও ঝগড়াঝাঁটি হতো না। তারপরও সুখী ছিলাম না আমরা। কারণ আমার মনে হতো, রাডা-য় যে-ড্যামিয়েনকে চিনেছিলাম, আসলে সে-রকম ছিল না সে। মনে হতো, বদলে গেছে অনেকখানি। হতে পারে, বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল সে… আর সেজন্যই ও-রকম মনে হতো আমার। কখনও কখনও আমার মনে হতো, আমার সঙ্গে অভিনয় করছে লোকটা। বিখ্যাত যেসব ব্যক্তির কথা শোনাত আমাকে, তাঁদের কথা শুনে মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতাম… একেকজন কোত্থেকে কোথায় চলে গেল, আর আমি কিনা হাত-পা গুটিয়ে বসে আছি বাসায়! অস্বীকার করছি না, মা হতে চেয়েছিলাম আমি, কিন্তু তার চেয়ে বেশি কিছুও হতে চেয়েছিলাম।

‘যা-হোক, একসময় জন্ম নিল অ্যাশলিই। ব্যাপারটা জাদুকরী কিছু-একটা ছিল আমাদের জন্য। ওই উপলক্ষে বেশ বড় একটা পার্টি দিল ড্যামিয়েন। আমি বলবো, একজন গর্বিত পিতা ছিল সে। কিন্তু তারপর টের পেলাম, আস্তে আস্তে দূরে… আরও দূরে সরে যাচ্ছে সে যেন। আমি যখন বাসায় বসে অ্যাশলিইকে দুধ খাওয়াচ্ছি, অথবা ওর ন্যাপি বা ডায়াপার বদল করছি, তখন পার্টি, প্রিমিয়ার, দামি- দামি দ্রুত গতির গাড়ি আর নিত্য নতুন নারী মডেল যেন ভরিয়ে তুলছে ড্যামিয়েনের জীবনটা। এত টাকা কামাই করত সে, তারপরও কখনও কখনও আমাদের মালির বেতন আর মুদি দোকানের বিল দেয়ার মতো টাকা থাকত না আমার হাতে।’

‘ড্রাগসের ব্যাপারটা বলছ না কেন এঁদেরকে?’ বললেন মার্টিন লোভেল।

‘কোকেইন এবং হাবিজাবি আরও কিছু খেত ড্যামিয়েন। তবে সেটা বিশেষ কিছু না… হলিউডের অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীই খায় ওসব। শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়ে পার্টিতে যাওয়া ছেড়ে দিলাম আমি। কখনও ড্রাগস খাইনি, ওসব ভালো লাগত না আমার। আমার গায়ে কখনও হাত তোলেনি ড্যামিয়েন। খারাপ মানুষ ছিল না সে। কিন্তু সে আসলে…’

‘স্বার্থপর একটা মানুষ ছিল,’ বাক্যটা শেষ করে দিলেন মার্টিন লোভেল।

‘বরং আমি বলবো সফল একজন মানুষ ছিল সে,’ দ্বিমত পোষণ করল গ্রেস। ‘আর ওর সেই সফলতাই গিলে খেয়েছিল ওকে।’

শূন্য দৃষ্টিতে গ্রেসের দিকে তাকিয়ে আছে হোথর্ন। ‘তার মানে… ড্যামিয়েন যে খুন হয়েছেন… তাঁর খুন হওয়ার জন্য এরচেয়ে ভালো সময় আর ছিল না?’

‘আপনার কথা বুঝতে পারছি না আমি,’ কিছুটা হলেও রেগে গেছে গ্রেস। ‘ও- রকম কিছু বলিনি আমি, বলবোও না কখনও। ড্যামিয়েন ছিল অ্যাশলিইয়ের বাবা। মেয়েটা বড় হয়ে উঠবে একসময়, অথচ বাবার অভাবটা সব সময় রয়ে যাবে ওর ভিতরে।’

‘ড্যামিয়েন কি কোনো উইল রেখে গেছেন?’

একটুখানি যেন থতমত খেয়ে গেল গ্রেস। ‘হ্যাঁ।’

‘সেটা কী, জানেন আপনি?’

‘হ্যাঁ। ড্যামিয়েনের উকিল চার্লস কেনওয়ার্দি উপস্থিত ছিলেন শেষকৃত্যানুষ্ঠানে, তাঁকে তখন জিজ্ঞেস করেছি ওই উইলের ব্যাপারে। আসলে অ্যাশলিইয়ের খাতিরে নিজেদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে জানাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল।’

‘তা… কী জানতে পেরেছেন?’

‘জানতে পেরেছি, চিন্তা করার কোনো কারণ নেই আমার। নিজের সব কিছু আমাকে আর অ্যাশলিইকে দিয়ে গেছে ড্যামিয়েন।’

‘একটা জীবনবীমা ছিল তাঁর।’

‘ওই ব্যাপারে কিছু জানি না আমি।’

‘কিন্তু আমি জানি,’ পায়ের উপর পা তুলে বসেছে হোথর্ন, দুই হাত ভাঁজ করে রেখেছে বুকের উপর। ওকে দেখে এই পৃথিবীর সবচেয়ে নিশ্চিন্ত মানুষ বলে মনে হচ্ছে। একইসঙ্গে সবচেয়ে পাষাণহৃদয়ও মনে হচ্ছে। কালো চোখ জোড়া যেন স্থির হয়ে আছে গ্রেসের উপর… যেন দৃষ্টি দিয়েই গেঁথে ফেলতে চাইছে মেয়েটাকে। ‘মাস ছয়েক আগে একটা পলিসি নিয়েছিলেন ড্যামিয়েন। এবং সেটার ফলে প্রায় এক মিলিয়ন পাউন্ড পেতে যাচ্ছেন আপনি। ব্রিক লেনের ওই ফ্ল্যাট, হলিউড হিলসের সেই বাড়ি, আর আলফা রোমিও স্পাইডারটার কথা না-হয় বাদই দিলাম…

‘কী বলতে চাইছেন আপনি, মিস্টার হোথর্ন?’ দাবি জানানোর সুরে বলে উঠলেন মার্টিন লোভেল। ‘আপনার কি ধারণা আমার মেয়ে খুন করেছে ড্যামিয়েনকে?

‘কেন নয়?’ গ্রেসের দিকে তাকাল হোথর্ন। ‘ড্যামিয়েনের মা যেদিন খুন হলেন, তার আগের দিন ইংল্যান্ডে এসেছেন আপনি। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে কি দেখা হয়েছিল আপনার?

‘ডায়ানার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা ছিল আমার। কিন্তু সেই আমেরিকা থেকে লন্ডন… এতটা পথ যাত্রা করে সাংঘাতিক ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল অ্যাশলিই।’

‘তার মানে মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে দেখা করেননি আপনি?’

‘না!’

গ্রেস আমার সঙ্গে এখানেই ছিল,’ বললেন মার্টিন লোভেল। ‘এবং যদি দরকার হয়, এই কথা শপথ করে বলতে পারবো আদালতে। আরেকটা কথা। ড্যামিয়েনকে যখন খুন করা হলো, তখন গ্রেস ছিল ওই লোকের মায়ের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে।

‘আর আপনি ওই শেষকৃত্যের সময় কোথায় ছিলেন, মিস্টার লোভেল?’

‘আমি অ্যাশলিইকে নিয়ে গিয়েছিলাম রিচমন্ড পার্কে… হরিণ দেখাতে।’

গ্রেসের দিকে তাকাল হোথর্ন। ‘রাডা’র ব্যাপারে যখন বলছিলেন আপনি আমাদেরকে, তখন বলেছেন, আমান্ডা লেই নামের মেয়েটার ব্যাপারে নাকি আরও কিছু কথা বলবেন। কী কথা?’

‘ওই মেয়ে ছিল ড্যামিয়েনের প্রথম গার্লফ্রেন্ড। তবে শেষপর্যন্ত ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় ওদের। সত্যি বলতে কী, আমার মনে হয় ড্যান রবার্টসের খাতিরে ড্যামিয়েনকে ছেড়ে দিয়েছিল মেয়েটা।’ দেখে মনে হলো, কিছুটা হলেও অস্বস্তিতে ভুগছে গ্রেস। ‘হ্যামলেটের রিহার্সেল শুরু করার আগে একদিন ড্যান আর ওই মেয়েকে চুমু খেতে দেখেছি আমি। খুবই আবেগঘন হয়ে পড়েছিল ওরা… বলতে গেলে ডুবে গিয়েছিল একজন আরেকজনের মধ্যে। ওই নাটকে… আগেও বলেছি হয়তো… অসরিচের ভূমিকায় অভিনয় করেছিল লেই। পরে বড় বড় গোটা দুয়েক গীতিনাট্যেও কাজ করেছিল। কিন্তু তারপর হুট করেই গায়েব হয়ে যায় কোথায় যেন।’

‘মানে… আপনি বলতে চাইছেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি?’ এতক্ষণে মুখ খুললাম আমি।

‘না। গায়েব হয়ে যাওয়া মানে লাপাত্তা হয়ে যাওয়া। একদিন একটু বেড়াতে বের হয়েছিল, কিন্তু তারপর ফিরে আসেনি কখনও। সব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল খবরটা। যথেষ্ট খোঁজখবরও হয়েছিল ওর ব্যাপারে। কিন্তু কী হয়েছে ওর, সেটা কেউ জানতে পারেনি কোনো দিন।’

মার্টিন লোভেলের বাসা থেকে বের হয়েই নিজের আইফোনটা হাতে নিলাম আমি। চট করে সেরে নিলাম গুগল সার্চ।

পেয়ে গেলাম আট বছর আগের একটা নিউযপেপার রিপোর্ট:

সাউথ লন্ডন প্রেস
১৮ অক্টোবর ২০০৩

অভিনেত্রী নিখোঁজ, আবেদন করলেন তাঁর বাবা-মা

স্ট্রেটহ্যামে নিজের বাসা থেকে নিখোঁজ হয়েছেন ২৬ বছর বয়সী এক নারী। তাঁকে খুঁজতে শুরু করেছে পুলিশ।

জানা গেছে, তাঁর নাম আমান্ডা লেই। তিনি একজন অভিনেত্রী। ওয়েস্ট এন্ডের দুটো গীতিনাট্যে অভিনয় করেছেন তিনি… দ্য লায়ন কিং আর শিকাগো। বর্ণনায় বলা হচ্ছে, তিনি হালকাঁপাতলা দেহের অধিকারিণী, মাথায় লম্বা সাদা চুল। চোখের মণি হালকা বাদামি রঙের। চেহারায় ছুলীর দাগ আছে।

রোববার বিকেলে নিজের বাসা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন মিস লেই। তখন তাঁর পরনে ছিল ফিটফাট পোশাক… সিল্কের ধূসর একটা ট্রাউজার স্যুট পরে ছিলেন, গাঢ় নীল রঙের একটা হার্মিস কেলি হ্যান্ডব্যাগ বহন করছিলেন। লাইসিয়াম থিয়েটারে সোমবার সন্ধ্যায় একটা নাটকে অভিনয় করার কথা ছিল তাঁর, কিন্তু তিনি সময়মতো সেখানে উপস্থিত হতে না-পারায় খবর দেয়া হয় পুলিশে। তারপর থেকে আজ ছ’দিন ধরে তিনি নিখোঁজ।

ইন্টারনেট ভিত্তিক কয়েকটা ডেটিং এজেন্সির সঙ্গে কথা বলেছে পুলিশ। জানা গেছে, বিয়ে করেননি ওই অভিনেত্রী, এবং অনলাইনে পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা করার অভ্যাস ছিল তাঁর। ধারণা করা হচ্ছে, ও-রকম কারও সঙ্গেই সাক্ষাৎ করতে গেছেন তিনি। তাঁকে সেদিন সন্ধ্যায় দেখেছেন, এ-রকম যে-কাউকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসার ব্যাপারে আহ্বান জানিয়েছেন তাঁর বাবা-মা।

রিপোর্টটা দেখালাম আমি হোথর্নকে। ওটা পড়ে এমন ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল সে যে, মনে হলো, ও-রকম কিছু পড়বে বলেই আশা করছিল যেন।

‘আপনি তা হলে আমান্ডা লেইয়ের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন?’ বললাম আমি!

জবাব দিল না হোথৰ্ন।

আমরা তখনও দাঁড়িয়ে আছি মার্টিন লোভেলের বাড়ির বাইরে। আমাদের মাথার উপর দিয়ে গর্জন করতে করতে উড়ে গেল আরেকটা প্লেন।

ওটা চলে যেতে দিলাম আমি। তারপর বললাম, ‘আপনি কি বলতে চান আমান্ডা লেইকেও খুন করা হয়েছে? কিন্তু কেন? এসবের সঙ্গে তো কোনো যোগাযোগ ছিল না ওই মেয়ের? এমনকী আজকের আগে মেয়েটার নামও শুনিনি আমরা।

বেজে উঠল হোথর্নের ফোন।

ওটা পকেট থেকে বের করল সে, কল রিসিভ করে কথা বলল মিনিটখানেক। কথা বলল মানে… ‘হ্যাঁ’ শব্দটা উচ্চারণ করল দুই কি তিনবার, তারপর বলল ‘ঠিক’ এবং সবশেষে ‘ঠিক আছে।’ এরপর লাইন কেটে দিল। খেয়াল করলাম, কঠোর হয়ে উঠেছে ওর চেহারা।

বলল, ‘মিডোস ফোন করেছিলেন।’

‘কী হয়েছে?’

‘ক্যান্টেব্রিতে ফিরে যেতে হবে আমাকে। আমার সঙ্গে কথা বলতে চান তিনি।’

‘কেন?’

এমন এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল হোথর্ন যে, অস্বস্তিতে ভুগতে লাগলাম। বলল, ‘কেউ একজন গতকাল রাতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে নাইজেল ওয়েস্টনের বাড়িতে। লেটার বক্সের ভিতর দিয়ে পেট্রোল ঢেলে দিয়েছিল, তারপর আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল সেখানে।’

‘মাই গড! নাইজেল ওয়েস্টন কি মারা গেছেন?’

‘না। তিনি আর তাঁর সেই বয়ফ্রেন্ড সময়মতো বেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন। আপাতত হাসপাতালে আছেন তিনি। নিঃশ্বাসের সঙ্গে ধোঁয়া ঢুকে গিয়ে কিছু ক্ষতি হয়েছে তাঁর, তবে সেটা তেমন গুরুতর কিছু না। ডাক্তাররা আশা করছেন সেরে উঠবেন তিনি।’ হাতঘড়ি দেখল হোথর্ন। ‘ট্রেন ধরতে হবে আমাকে।’

‘আমিও যাবো আপনার সঙ্গে।’

মাথা নাড়ল হোথর্ন। ‘না। আমার মনে হয় না আপনার যাওয়াটা উচিত হবে। একাই যাবো আমি সেখানে।’

‘কেন?’

প্রশ্নটার জবাব দিল না হোথর্ন।

‘আপনি জানেন কে আগুন লাগিয়েছে নাইজেল ওয়েস্টনের বাড়িতে, তা-ই না?’ চ্যালেঞ্জ জানানোর সুরে বললাম আমি।

আবারও সেই শূন্যতা ফিরে এসেছে হোথর্নের চোখে। এই শূন্যতা সম্পর্কে ভালোমতো জানা আছে আমার। এই শূন্যতা আমাকে সব সময় জানিয়ে দেয়, পৃথিবীকে যেভাবে দেখি আমি, তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিতে দেখে হোথর্ন। আরও জানিয়ে দেয়, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কখনও কাছাকাছি হতে পারবে না।

‘হ্যাঁ,’ আমার প্রশ্নের জবাবে বলল সে। ‘আপনি।’

২১. রাডা

হোথর্ন কী বোঝাতে চেয়েছে, সে-ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই আমার। কিন্তু ওটা নিয়ে যত ভাবছি, তত খারাপ হয়ে যাচ্ছে মনটা। কেউ একজন আগুন লাগিয়ে দিয়েছে নাইজেল ওয়েস্টনের বাড়িতে… আমি কীভাবে দায়ী হতে পারি ওই হামলার জন্য? এমনকী ওই জায়গায় যাওয়ার আগপর্যন্ত জানতামও না কোথায় থাকেন ওই জাজ। হোথর্ন যখন কথা বলছিল বুড়ো লোকটার সঙ্গে, তখন নিজের মুখ একেবারে বন্ধ করে রেখেছিলাম। এমনকী আমি আর হোথর্ন যে যাবো সেখানে, সে-কথা ও বলিনি কাউকে। না, একটু ভুল হলো বোধহয়… বলেছিলাম… আমার স্ত্রীকে, আমার অ্যাসিস্টেন্টকে, আর সম্ভবত আমার দুই ছেলের কোনো একজনকে। এখন কথা হচ্ছে, হোথর্ন কি আমার উপর ইচ্ছাকৃতভাবে ওর ঝাল মিটাচ্ছে? সে-রকম কোনো ইচ্ছা যদি থাকে ওর, আশ্চর্য হবো না। খুব সম্ভব এমন কিছু একটা ঘটেছে যা আসলে আশা করেনি সে, আর সেজন্য হাতের কাছে যাকে পাচ্ছে তার সঙ্গেই দুর্ব্যবহার করছে।

আমাদের তদন্তের বর্তমান অবস্থাটা আসলে কী, ভাবতে লাগলাম। যতদূর বুঝতে পারছি, নিজের সন্দেহের তালিকা থেকে অ্যালান গডউইনকে কমবেশি বাদ দিয়ে ফেলেছে হোথর্ন। আবার একইসঙ্গে এ-কথাও সত্যি, ডায়ানা ক্যুপারকে বেকসুর খালাস দিয়ে পুরো ব্যাপারটা ঘোলাটে করে ফেলেছেন নাইজেল ওয়েস্টন, কিন্তু কেউ প্রমাণ করতে পারবে না, ওই কাজ করে কোনো অপরাধ করেছেন তিনি। আর এখন প্রাণঘাতী হামলা হলো তাঁর উপরই। মুশকিল হচ্ছে, আমি যখন ভাবতে শুরু করেছি বিশেষ ওই গাড়ি-দুর্ঘটনার সঙ্গে এখনকার খুন দুটোর কোনো সম্পর্কই নেই, তখনই এমন এক ঘটনা ঘটল, যার ফলে আমার সেই অনুমানের উল্টোটাই সত্যি বলে মনে হচ্ছে।

গাড়িটা চালাচ্ছিলেন ডায়ানা ক্যুপার। সে-গাড়ির নিচে পড়ে মারা গেল টিমোথি গডউইন, গুরুতর আহত হলো ওর ভাই। ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেলেন তিনি। সবাই জানতে পারল, ছেলে ড্যামিয়েন ক্যুপারকে বাঁচাতে পালিয়েছিলেন ওই মহিলা। তাঁর নামে মামলা দেয়া হলো, বিচার হলো আদালতে, কিন্তু তাঁকে বেকসুর খালাস দিলেন নাইজেল ওয়েস্টন… নামকাওয়াস্তের কিছু সাজার কথা যদি বাদ দিয়ে বলি। এখন কথা হচ্ছে, ডায়ানা ক্যুপার, ড্যামিয়েন ক্যুপার আর নাইজেল ওয়েস্টন… তাঁদের তিনজনের উপরই কিন্তু হামলা হয়েছে। প্রাণে মারা পড়ল প্রথম দু’জন।

এসব নিশ্চয়ই কাকতালীয় হতে পারে না?

আরও একটা প্রশ্ন চলে আসছে আমাদের সামনে।

আমান্ডা লেই… মানে, যে-মেয়ে ড্যামিয়েন ক্যুপারের সঙ্গে রাডা-তে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল, এবং পরে যে-মেয়ে গায়েব হয়ে গিয়েছিল রহস্যজনকভাবে… পুরো ব্যাপারটাতে তার ভূমিকা কী? হতে পারে, আসলে ওই মেয়ের কোনো ভূমিকাই নেই। গ্রেস লোভেলদের বাসা থেকে বের হয়ে আমি আমার আইফোনে আমান্ডা- লেইকে-নিয়ে-লেখা একটা আর্টিকেল বের করেছিলাম এবং সেটা দেখিয়েছিলাম হোথর্নকে। কিন্তু ওই ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি সে। কাজেই আমি আসলে এখনও নিশ্চিত হতে পারছি না, পুরো ব্যাপারটার সঙ্গে রহস্যময়ী সেই অভিনেত্রীর কোনো যোগসূত্র আছে কি না।

হঠাৎ করেই টের পেলাম, প্রচণ্ড বিরক্ত লাগছে নিজের উপরই।

এখন মাঝবিকেল, হাউনস্লো ইস্ট টিউব স্টেশনের পাশে সস্তা কিন্তু চটকদার একটা ক্যাফেতে একা বসে আছি। হোথর্ন চলে যাওয়ার পর এখানে এসে ঢুকেছি। টিউব ট্রেনে চেপে চলে গেছে সে। আমার চারদিকে এখন আয়না এবং চকচকে সব মেন্যুর রাজত্ব। একদিকের দেয়ালে একটা ওয়াইড স্ক্রীন টিভি লাগানো আছে, ওটাতে একটা অ্যান্টিক শো চলছে। দুই পিস টোস্ট আর এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়েছি। কিন্তু আসলে এসব খেতে চাইনি। আপনমনে নিজেকেই জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে আমার? হোথর্নের সঙ্গে যখন প্রথমবার দেখা হলো, আমি ততদিনে একজন সফল ও প্রতিষ্ঠিত লেখক। এমনকী একটা টিভি শো’র ক্রিয়েটর… সেই শো কম করে হলেও পঞ্চাশটা দেশে দেখানো হয়েছে। শুধু তা-ই না, সেই শো’র প্রোডিউসারকে বিয়েও করেছি। আমাদের হয়ে তখন কাজ করত হোথর্ন। ঘণ্টাপ্রতি দশ কি বিশ পাউন্ড করে দেয়া হতো ওকে… বিনিময়ে কিছু তথ্য সরবরাহ করত সে, আর সেসব তথ্য আমার চিত্রনাট্যে ব্যবহার করতাম আমি।

কিন্তু গত দু’সপ্তাহের মধ্যে বদলে গেছে সব কিছু। আমাকে একজন মৌন সহযোগীতে পরিণত করে ফেলেছে হোথর্ন। আমি আমার নিজের বইয়েই পরিণত হয়েছি গৌণ একটা চরিত্রে। তার চেয়েও খারাপ কথা, কী ঘটছে, সেটা হোথর্ন বলে না-দেয়া পর্যন্ত এই কেসের কোনো একটা ক্লু নিয়ে কাজ করার স্বাধীনতা নেই আমার। সে কি আমাকে বোকা ভাবে? কিন্তু আমি আসলে যথেষ্ট চালাক।

একটা চিন্তা খেলে গেল আমার মাথায়। অনেকদিন হয়ে গেল হোথর্নের পদাঙ্ক অনুসরণ করছি। আজ এক কাজ করলে কেমন হয়? হোথর্ন যেহেতু লন্ডনে নেই, আমি নিজে যদি উদ্যোগী হয়ে কিছু তদন্তকাজ পরিচালনা করি, তা হলে এগিয়ে যেতে পারবো ওর চেয়ে।

আমার চা আর টোস্ট পরিবেশন করা হলো। চায়ের উপরিতলে তেলতেলে একজাতের দীপ্তি দেখতে পাচ্ছি। টোস্ট দুটো ছেয়ে আছে কিছু-একটাতে, সেগুলো আবার গলে গেছে। গা কেমন ঘিনঘিন করে উঠল আমার। ঠেলে সরিয়ে দিলাম প্লেটটা। পকেট থেকে বের করলাম আমার ফোন। আজ সারাদিনের জন্য লন্ডনে থাকছে না হোথর্ন। তার মানে রহস্যময়ী সেই আমান্ডা লেইকে নিয়ে তদন্ত করার সুবর্ণ সুযোগ চলে এসেছে আমার হাতে।

একটু অদ্ভুত হলেও সত্যি, সাউথ লন্ডন প্রেসের যে-আর্টিকেল পড়েছিলাম, সেটাতে ওই মেয়ের কোনো ছবি ছিল না। মেয়েটা দেখতে কেমন, ভাবলাম। নেট ঘাঁটলাম কিছুক্ষণ, কিন্তু কোনো ছবি পেলাম না।

মেয়েটা গায়েব হয়ে গেছে এবং তাকে আর কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার বাবা-মা হয়তো আজও হা-হুঁতাশ করছে ওই মেয়ের জন্য, কিন্তু সাধারণ জনগণের কৌতূহল উবে গেছে।

আমান্ডা লেইয়ের ব্যাপারে আরও জানতে চাই আমি। রাডা-তে এমন কী ঘটেছিল, যার ফলে গায়েব হয়ে যেতে হবে একজন অভিনেত্রীকে, খুন হবে একজন অভিনেতার মা এবং খুন হবে সেই অভিনেতা নিজে?

কিন্তু… রাডা-তে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করাও তো মুখের কথা না।

কিছুক্ষণ ভাবলাম ব্যাপারটা নিয়ে। একসময় আমার মনে হতে লাগল, একটা উপায় বোধহয় আছে। রাডা মাঝেমধ্যে অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালক আর চিত্রনাট্যকারদের আমন্ত্রণ জানায়… ওখানে গিয়ে দেখা করতে বলে ওদের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে। গত বছর আমি গিয়েছিলাম সেখানে, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আমার সেই সেশন থেকে কতখানি উপকৃত হয়েছে, সে-ব্যাপারে আমি নিশ্চিত না। তবে আমি ওই সেশন খুব উপভোগ করেছি।

আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন একজন সহযোগী পরিচালক। ওই ভদ্রমহিলা চান না পরিচয় ফাঁস হয়ে যাক তাঁর, তাই আপাতত তাঁকে লিয নামেই ডাকছি। ক্যাফেতে বসেই ফোন করলাম তাঁকে। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন বিকেলে তিনি রাডা- তেই ছিলেন। তিনটার সময় এক ঘণ্টার জন্য আমার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হলেন। চালচলনে লিয স্মার্ট, ব্যবহারে ঐকান্তিক। বয়সে আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড়। অভিনেত্রী হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত হতে পেরেছেন লেখিকা। এবং পরিচালনার এবং পরিচালনার দায়িত্বটাও গ্রহণ করতে পেরেছেন সফলভাবে।

রাডার মেইন বিল্ডিংটা গাওয়ার স্ট্রীটে। নিচতলার একটা চটকদার ক্যাফেতে দেখা হলো লিযের সঙ্গে।

‘ড্যামিয়েন ক্যুপারের কথা খুব ভালোমতো মনে আছে আমার,’ বললেন তিনি ‘কাঁপাচিনো নিয়ে বসে পড়তাম আমরা, আমাদের আশপাশে থাকত সাদা-কালো অনেক ছবি। আমাদের সঙ্গে বেশ কিছু ছাত্রছাত্রীও থাকত… নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করত তারা, অথবা নাটকের স্ক্রিপ্ট পড়ত।’ কণ্ঠ নিচু করলেন। ‘একটা কথা সব সময় মনে হতো আমার… ড্যামিয়েন ক্যুপারের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। ওর বয়স ছিল কম, তবে নিজের উপর বিশ্বাস ছিল, আর… মাঝেমধ্যে একটু খারাপ ব্যবহার করত।’

‘আপনি যে তখনও শিক্ষকতা করতেন এখানে, বুঝতে পারিনি।’

‘১৯৯৭ সালের কথা বলছি আমি। তখন কেবল যোগ দিয়েছি এখানে। ড্যামিয়েন তখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে।’

‘তাকে মনে হয় তেমন একটা পছন্দ করতেন না আপনি।

‘না, সে-রকম কিছু না। ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি আমার ব্যক্তিগত যে-আবেগ, সেটা সব সময় লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতাম। যা-হোক, যা বলছিলাম… ড্যামিয়েন ছিল খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কাস্টিং পাওয়ার জন্য দরকার হলে নিজের মাকেও ছুরি মারতে পারত সে, এমন অবস্থা।’ বলতে গিয়ে কী বলে ফেলেছেন, সেটা কিছুক্ষণ ভাবলেন লিয। তারপর বললেন, ‘আমি কী বোঝাতে চেয়েছি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন।’

‘হ্যামলেট নাটকে অভিনয় করেছিল সে। সেটা কি দেখেছিলেন?’

‘হ্যাঁ। কিন্তু কথাটা স্বীকার করতে রীতিমতো ঘৃণা হচ্ছে আমার। কারণ ওই চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল না ড্যামিয়েনের। যার অভিনয় করার কথা ছিল, সে গ্রান্ডুলার ফিভারে আক্রান্ত হয়ে পড়ায় সুযোগটা পেয়ে গিয়েছিল ড্যামিয়েন। সে- বছর ওই অসুখ মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। একবার ভয়াবহ প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছিল লন্ডনে, তখনকার মতো হয়েছিল অবস্থাটা। আসলে… একটা কথা ঠিকই বলেছেন আপনি… ড্যামিয়েনকে ঠিক পছন্দ হতো না আমার। কারণ অন্যদেরকে নিজের কাজে লাগানোর একটা বাজে স্বভাব ছিল তার। তা ছাড়া ডিলের ঘটনাটা…’

‘ডিলের কোন্ ঘটনা?’ হঠাৎ করেই আগ্রহী হয়ে উঠেছি আমি। নাটকের এই স্কুল আর সেই গাড়ি দুর্ঘটনার মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক আছে? এবং এই সম্পর্কের ব্যাপারটা কি জানা নেই হোথর্নের? আমিও কি মিস করেছি এটা?

‘ঘটনাটা বলার আগে একটা কথা বলে নিই আপনাকে,’ বলছেন লিয। ‘আমাদের ক্লাসগুলোতে একটা নিয়ম চালু ছিল। ছাত্র-ছাত্রীদের সবাইকে একটা করে জিনিস নিয়ে আসতে হতো, এবং সেটা নিয়ে কথা বলতে হতো সহপাঠীদের সামনে। তো… একবার প্লাস্টিকের একটা খেলনা নিয়ে এল ড্যামিয়েন… লন্ডনের একটা বাস। তখন একটা নার্সারি রাইমের রেকর্ডিংও বাজিয়ে শুনিয়েছিল সে আমাদেরকে… দ্য হুইলস অন দ্য বাস গো রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড। সে বলেছিল, ওই ছড়া নাকি বাজানো হয়েছিল একটা ছেলের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে… ছেলেটা মারা পড়েছিল বিশেষ সেই গাড়ি-দুর্ঘটনায়। আর গাড়িটা চালাচ্ছিল ওর মা।’

‘এই ঘটনার ঠিক কোন্ ব্যাপারটা রোমাঞ্চকর বলে মনে হচ্ছে আপনার কাছে?’

‘এই ব্যাপারটা নিয়ে পরে তার সঙ্গে একটু মন কষাকষি হয়েছিল আমার। এই ব্যাপারে খুব আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিল সে। বলেছিল, ওই ছড়াগান নাকি ওর ভিতরটাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল। ওটা নাকি কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে পারছিল না সে মাথা থেকে। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, আমার মনে হয় না ওই গাড়ি দুর্ঘটনার সঙ্গে আদৌ কোনো সম্পর্ক ছিল তার। বরং আমার মনে হয়, ঘটনাটা ব্যবহার করতে চাইছিল সে আসলে… ওটা উপজীব্য করে কোনো একটা ফায়দা লুটতে চাইছিল। তার সেই ভান ছিল খুবই আত্মকেন্দ্রিক। ড্যামিয়েনের মা হয়তো সেই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ছিলেন না, কিন্তু তাঁর কারণেই যে মারা গিয়েছিল আট বছর বয়সী ওই ছেলেটা, সে-ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আমার মনে হয় না, এই ব্যাপারটা ক্লাসে সবার সামনে উপস্থাপন করে ঠিক কাজ করেছে ড্যামিয়েন। এবং সেটা তাকে বলেছিলামও।

‘আমান্ডা লেইয়ের ব্যাপারে কিছু বলতে পারেন?’

‘তার কথা তেমন একটা মনে নেই আমার। তবে এটা মনে আছে, মেয়েটা মেধাবী আর চুপচাপ প্রকৃতির ছিল। ড্যামিয়েনের সঙ্গে মাঝেমধ্যে কোথায় কোথায় যেন যেত। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাদের দু’জনের মধ্যে। বলতে খারাপই লাগছে… রাডা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মেয়েটা তার ক্যারিয়ার বেশিদূর টেনে নিতে পারেনি। দুটো গীতিনাট্যে অভিনয় করেছিল, কিন্তু তার বেশি কিছু না।’ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন লিয। ‘মাঝেমধ্যে হয় এ-রকম। কোথাকার জল গড়িয়ে কোন্ পর্যন্ত যাবে, সেটা আগেভাগে অনুমান করা যায় না।

‘মেয়েটা একদিন হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে গিয়েছিল, না?’

‘পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছিল খবরটা। আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য এখানেও এসেছিল পুলিশ, অথচ রাডা থেকে চলে যাওয়ার চার কি পাঁচ বছর পর হারিয়ে যায় মেয়েটা। একটা গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল তখন… ওই মেয়ে নাকি তার এক ভক্ত বা উত্যক্তকারীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। কিন্তু এই ব্যাপারে পরে নিজেদের মত বদল করে পুলিশ। বলে, মেয়েটা নাকি কারও সঙ্গে ডেট করার জন্য গিয়েছিল সম্ভবত। কারণ তার পরনে তখন ছিল স্মার্ট পোশাক। একটা ফ্ল্যাটে থাকত সে, সেখানে তার সঙ্গে আরও কয়েকটা মেয়ে থাকত… তারা বলেছে, বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সে নাকি খোশমেজাজে ছিল। যা-হোক, সেই যে গেল মেয়েটা… তার দেখা পাওয়া গেল না আর কখনও। সে যদি আরও বিখ্যাত কেউ হতো, তা হলে এই ব্যাপারটা আরও বেশি হইচই হতো। অথবা কেউ যদি ড্যামিয়েন ক্যুপারের সঙ্গে ওই মেয়ের কোনো একটা সম্পর্ক জুড়ে দিতে পারত, তা হলেও আলোড়ন তৈরি হতো ব্যাপারটা নিয়ে। কারণ ক্যুপার ততদিনে নিজের জন্য নাম কামাতে শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, লন্ডনের বাসিন্দা অনেকেই হারিয়ে যাচ্ছে হরহামেশা… ওই মেয়েও হয়তো তাদের মতোই একজন।’

‘আপনি বলেছিলেন আপনার কাছে নাকি ওই মেয়ের একটা ছবি আছে।’

‘হ্যাঁ। আপনি আসলে সৌভাগ্যবান। কারণ ওই সময়ে যারা ছিল রাডা-য়, তাদের কারও তেমন কোনো ছবি নেই আমাদের কাছে। এখনকার দিনে তো সবারই মোবাইল ফোন থাকে। যা-হোক, আমরা ছবিটা রেখেছিলাম সেই হ্যামলেট নাটকের কারণে।’ সঙ্গে করে বড় একটা ক্যানভাসের ব্যাগ নিয়ে এসেছেন লিয, ওটা তুলে রাখলেন টেবিলের উপর। ‘আমাদের অফিসে খুঁজে পেয়েছি ছবিটা।’

ফ্রেমে বাঁধাই-করা সাদা-কালো একটা ছবি বের করলেন তিনি। আমাদের দু’জনের কফির কাপ দুটোর মাঝখানে রাখলেন ওটা। তাকালাম ছবিটার দিকে। হঠাৎ করেই টের পেলাম, যেন কোনো জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি ১৯৯৯ সালের দিকে।

কম-বয়সী পাঁচজন অভিনেতা-অভিনেত্রীকে দেখা যাচ্ছে। খালি একটা স্টেজের উপর আছে তারা সবাই, তাকিয়ে আছে ক্যামেরার দিকে, ভাবভঙ্গিতে অতিরিক্ত সিরিয়াসনেস। ছবিটা দেখামাত্র চিনতে পারলাম ড্যামিয়েন ক্যুপারকে। গত বারো বছরে খুব একটা বদলায়নি সে। তবে ওই সময়ে আরও হালকাঁপাতলা ছিল, আরও সুন্দর ছিল। কিন্তু ছবিটা দেখামাত্র মনে হয়, ধৃষ্টতা যেন লেপ্টে আছে তার চেহারায়। সোজা তাকিয়ে আছে লেন্সের দিকে, পারলে তাকে উপেক্ষা করার নিঃশব্দ চ্যালেঞ্জ যেন জানাচ্ছে চোখ দুটো। পরনে কালো জিন্স আর খোলা গলার কালো শার্ট। হাতে একটা জাপানিয মুখোশ। গ্রেস লোভেল দাঁড়িয়ে আছে ড্যামিয়েনের এক পাশে। আরেক পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটা ছেলে।

এদের পেছনে দাঁড়িয়ে-থাকা আরেকটা মেয়েকে দেখিয়ে দিলেন লিয। ‘এই যে… এটাই আমান্ডা।

মেয়েটার মাথায় লম্বা চুল। ওই নাটকে একটা পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করেছিল সে, আর তাই ড্যামিয়েন যে-রকম কাপড় পরেছে সে-ও সে-রকম কাপড় পরেছে।

বলতে বাধ্য হচ্ছি, মেয়েটা হতাশ করল আমাকে। কী আশা করছিলাম, সে- ব্যাপারে আসলে নিশ্চিত না আমি, কিন্তু এই মেয়েকে কেন যেন খুব সাধারণ বলে মনে হলো আমর কাছে। চেহারানকশা এমনিতে সুন্দর, কিন্তু ছুলীতে ভরা। দলটার একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে একটা লোকের দিকে… অন্য এক দিক থেকে ওই দলের উদ্দেশে এগিয়ে যাচ্ছে লোকটা।

‘এটা কে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।

অপরিচিত ওই লোক ছবির ফ্রেমে নেই বললেই চলে। ফলে তার চেহারাটা ভালোমতো দেখতেও পাচ্ছি না, তাকে চিনতেও পারছি না। তবে এটুকু বোঝা যাচ্ছে… লোকটা কৃষ্ণাঙ্গ, চশমা পরে আছে, হাতে একগুচ্ছ ফুল, বিশেষ সেই দলের সবার চেয়ে বয়সে যথেষ্ট বড় এবং স্পষ্ট ঠাহর করা যায় ব্যাপারটা।

‘আমার কোনো ধারণা নেই,’ বললেন লিয। ‘ওই দলের কোনো একজনের বাবা হবেন হয়তো। নাটকটা প্রথমবার মঞ্চস্থ হওয়ার পর তোলা হয়েছিল এই ছবি।’

‘আপনি কি কখনও…

প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও জিজ্ঞেস করা হলো না আমার। জানতে চাইছিলাম, ড্যামিয়েনের সঙ্গে আমান্ডার সম্পর্কের ব্যাপারে কিছু জানেন কি না লিয। কিন্তু ঠিক তখনই এমন কিছু একটা দেখতে পেলাম, যার ফলে বাক্যের মাঝখানে থেমে যেতে হলো আমাকে। ছবিতে যে-দলটা দেখা যাচ্ছে, তাদের বিশেষ একজনের দিকে তাকিয়ে আছি, এবং হঠাৎ করেই চিনতে পেরেছি তাকে। ওই মানুষটার পরিচয়ের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই আমার মনে। উত্তেজনার মাথায় হঠাৎ করেই অনুধাবন করতে পারলাম, এমন কিছু একটা আবিষ্কার করে ফেলেছি, যেটা এই কেসের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অনুধাবন করতে পারলাম, আমি অন্তত একটাবারের জন্য হলেও এক ধাপ এগিয়ে গেছি হোথর্নের চেয়ে। এমন কিছু একটা জেনে গেছি, যা সে জানে না। গ্রেস লোভেলদের বাসা থেকে যখন বের হয়েছিলাম, তখন জেনে-বুঝে উপহাস করেছে সে আমাকে। উপহাস বলছি কেন… রীতিমতো অবজ্ঞা করেছে আমাকে, অপমান করেছে। এখন কথা হচ্ছে, সে ক্যান্টাব্রি থেকে ফেরার পর আমি যদি তাকে বলি কোন্ বিষয়টা মিস করেছে, তা হলে কেমন হবে? একটুখানি না-হেসে পারলাম না। লন্ডনের পথেঘাটে আমাকে ঘুরিয়েছে সে… সাইডলাইনে বসে-থাকা খেলোয়াড়দের মতো নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করেছে ওর দিকে… কাজেই সে ফেরার পর যদি এই কথা বলি তাকে, এক হাত নিতে পারবো আমি ওকে।

‘লিয, আপনার কোনো জবাব নেই,’ বললাম আমি। ইঙ্গিতে দেখালাম ছবিটা। ‘এটা কি ধার নিতে পারি আমি?’

‘দুঃখিত। ছবিটা এই প্রতিষ্ঠানের… এটাকে এই বিল্ডিঙের বাইরে যেতে দেয়াটা উচিত হবে না। তবে আপনি চাইলে আপনার মোবাইল দিয়ে ছবি তুলে নিতে পারেন।

‘চমৎকার!’ আইফোনটা টেবিলের উপরই আছে… এতক্ষণ ধরে আমাদের কথোপকথন রেকর্ড করেছি। ওটা তুলে নিলাম, একটা ছবি তুললাম বিশেষ সেই ফটোগ্রাফের। তারপর উঠে দাঁড়ালাম। ‘অনেক ধন্যবাদ।

রাডা’র বাইরে এসে যোগাযোগ করলাম আলাদা আলাদা তিন জায়গায়।

প্রথমে আয়োজন করলাম একটা মিটিং।

তারপর ফোন করলাম আমার অ্যাসিস্টেন্টকে… আমার জন্য অপেক্ষা করছে সে। মেয়েটাকে বললাম, আজ বিকেলে আর ফিরতে পারছি না।

সবশেষে একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিলাম আমার স্ত্রীর কাছে, জানিয়ে দিলাম আজ ডিনারে যোগ দিতে হয়তো একটু দেরি হবে।

জানা ছিল না, সে-রাতে ডিনারই জুটবে না আমার কপালে।

২২. মুখোশের আড়ালে

গাওয়ার স্ট্রীট থেকে টিউব ট্রেনে চেপে চলে এলাম পশ্চিম লন্ডনে। মিনিট পাঁচেক হেঁটে হাজির হলাম লাল-ইটে-বানানো চৌকোনা একটা বিল্ডিঙের সামনে। এটার জানালাগুলোয় ফ্রস্টেড কাঁচ লাগানো। বিজ্ঞাপনমূলক কোনো কিছু নেই কোথাও। চাপ দিলাম ডোরবেলে। ঘণ্টার আওয়াজটা কেমন যেন ক্রুদ্ধ বলে মনে হলো আমার। ভিতরের কোনো এক জায়গা থেকে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে খুলে দেয়া হলো তালা, ক্লিক করে শব্দ হলো। ঢোকার সময় খেয়াল করলাম, একটা সিসিটিভি ক্যামেরা তাকিয়ে আছে আমার দিকে। হাজির হলাম শূন্য একটা রিসিপশন এরিয়ায়। দেয়ালগুলো খালি, মেঝেতে টাইলস করা। আশপাশ দেখে কোনো ক্লিনিক অথবা কোনো একটা হাসপাতালের অন্ধকারাচ্ছন্ন কোনো ডিপার্টমেন্টের কথা মনে পড়ে গেল আমার। প্রথমে মনে হলো, আমি বুঝি একা এখানে। কিন্তু একটা ডাক শুনতে পেলাম হঠাৎ। এগিয়ে গেলাম একটা অফিসের দিকে। সেখানে দু’কাপ কফি বানাচ্ছে ফিউনারেল ডিরেক্টর রবার্ট কর্নওয়ালিস। এই বিল্ডিঙের অন্যান্য জায়গার মতো এই অফিসেও উল্লেখ করার মতো তেমন কিছু নেই। একটামাত্র ডেস্ক আছে এখানে, আর আছে কাজ চালানোর মতো অল্প কয়েকটা চেয়ার। তুলার আবরণ দেখতে পাচ্ছি সেসব চেয়ারে, কিন্তু একইসঙ্গে এ-ও বুঝতে পারছি, খুব একটা আরামদায়ক না সেগুলো। একদিকে কাঠের-পায়াওয়ালা একটা টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে আছে একটা কফি মেশিন। আরেকদিকের দেয়ালে ঝুলছে একটা ক্যালেন্ডার।

কর্নওয়ালিসের সঙ্গে যখন প্রথমবার দেখা হয়েছিল আমার, তখন এই জায়গার কথা আমাকে বলেছিল সে। আলাপ-আলোচনার জন্য তার খদ্দেররা যায় দক্ষিণ কেনসিংটনে, কিন্তু লাশগুলো নিয়ে আসা হয় এখানে। এই জায়গার ধারেকাছে ছোট একটা গির্জা আছে। অন্য কেউ আছে কি না কাছেপিঠে, জানার জন্য কান পাতলাম। আমরা দু’জন ছাড়া আর কেউ যে নেই, সে-কথা একবারও মনে হয়নি আমার। এখন পড়ন্ত বিকেল, কাজ শেষে সবাই বোধহয় ফিরে গেছে যার যার বাসায়। কর্নওয়ালিসকে তার অফিসে ফোন করেছিলাম আমি, কিন্তু এখানে দেখা করার ব্যাপারে জোরাজুরি করেছে সে।

নাম ধরে আমাকে সম্ভাষণ জানাল লোকটা। শেষ দু’বার যখন দেখা হয়েছে তার সঙ্গে, তখন তাকে যতটা আন্তরিক আর নিরুদ্বেগ বলে মনে হয়েছে, এখন তার চেয়েও বেশি বলে মনে হচ্ছে। স্যুট পরে আছে, তবে টাই খুলে ফেলেছে। শার্টের উপরের দিকের দুটো বোতামও খুলে রেখেছে।

‘আপনি কে সে-ব্যাপারে কোনো ধারণাই ছিল না আমার,’ বলল সে। কফির একটা কাপ বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। ফোনে নিজের নামটা বলেছি আমি তাকে। ‘আপনি একজন লেখক! বলতেই হয়… পুরোপুরি বিস্মিত হয়েছি আমি। কারণ আপনি যখন আমার অফিসে আর বাসায় গিয়েছিলেন, আমি ধরেই নিয়েছিলাম আপনিও পুলিশে আছেন।’

‘একদিক দিয়ে চিন্তা করলে আছি বটে,’ বললাম আমি।

‘না… আসলে বোঝাতে চেয়েছি, আপনাকেও একজন গোয়েন্দা ভেবেছিলাম আমি। ….মিস্টার হোথর্ন কোথায়?’

কফির কাপে চুমুক দিলাম। আমাকে জিজ্ঞেস না করেই কফিতে চিনি দিয়ে ফেলেছেন কর্নওয়ালিস। ‘এই মুহূর্তে একটা কাজে লন্ডনের বাইরে আছে।’

‘তিনিই কি পাঠিয়েছেন আপনাকে?’

‘না। সত্যি বলতে কী… আমি যে দেখা করতে এসেছি আপনার সঙ্গে, জানে না সে সেটা

কথাটা ভেবে দেখল কর্নওয়ারিস। দেখে মনে হচ্ছে, থতমত খেয়ে গেছে। ‘ফোনে তখন বললেন, আপনি নাকি একটা বই নিয়ে কাজ করছেন…’

‘হ্যাঁ।’

‘ব্যাপারটা একটু… কী বলবো… বেখাপ্পা হয়ে গেল না? কারণ আমি জানতাম পুলিশি কোনো তদন্ত… খুনের কোনো তদন্ত… গোপনেই করা হয়। আচ্ছা, আপনার সেই বইয়ে কি আমার কথাও থাকবে?’

‘মনে হয়।

‘কিছু মনে করবেন না… সে-রকম কিছু চাই না আমি আসলে। ডায়ানা ক্যুপার আর তাঁর ছেলের ব্যাপারটা নিয়ে আমি খুবই আপসেট। এসবের সঙ্গে আর জড়িত থাকতে চাই না।’

‘বইটা যেহেতু এখনও লেখাই হয়নি, কাজেই কারও যদি আপত্তি থাকে তা হলে তার নাম বদলে দিতে পারি আমি। আপনি কি চান আপনার পরিচয় বদলে দিই?’

‘সরাসরিই বলি… যদি তা করেন তা হলে ভালো হয়।

সেক্ষেত্রে… আপনার নাম যদি দিই ড্যান রবার্টস, তা হলে কেমন হয়?’

কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে কর্নওয়ালিস। হাসি দেখা দিয়েছে তার চেহারায়। ‘অনেক বছর হয়ে গেল ওই নাম ব্যবহার করিনি আমি।’

‘জানি।’

সিগারেটের একটা প্যাকেট বের করল কর্নওয়ালিস। সে যে সিগারেট খায়, জানা ছিল না আমার। মনে পড়ে গেল, তার দক্ষিণ কেনসিংটনের অফিসে কোনো একজাতের একটা অ্যাশট্রে দেখেছিলাম। একটা সিগারেট ধরাল সে, হাত ঝাঁকুনি দিয়ে নেভাল জ্বলন্ত ম্যাচকাঠি। ভঙ্গিটা কেমন যেন ক্রুদ্ধ বলে মনে হলো আমার। ‘ফোনে বলেছিলেন, আপনি নাকি রাডা থেকে কথা বলছেন

‘হ্যাঁ, ঠিক। আজ বিকেলে সেখানে গিয়েছিলাম আমি। দেখা করতে গিয়েছিলাম… ‘ সহযোগী সেই পরিচালকের নাম বললাম। কিন্তু দেখে মনে হলো না, লিয়কে চিনতে পেরেছে কর্নওয়ালিস। ‘আপনি যে এককালে রাডা’র ছাত্র ছিলেন, কখনও বলেননি।’ অর্ধেকটা কফি শেষ করলাম। নামিয়ে রাখলাম মগটা।

‘না… আমি নিশ্চিত কথাটা বলেছিলাম

‘না, বলেননি। আপনার সঙ্গে দু’বার কথা বলেছে হোথর্ন, দু’বারই উপস্থিত ছিলাম আমি। যা-হোক, আপনি যে শুধু রাডা-য় ছিলেন তা-ই না, ড্যামিয়েন ক্যুপার যে-সময়ে ছিল সেই একই সময়েও ছিলেন। তার সঙ্গে অভিনয় করেছেন।

নিশ্চিত ছিলাম, কথাটা অস্বীকার করবে কর্নওয়ালিস। কিন্তু চোখের পলক পড়ছে না তার। বলল, ‘রাডা ছেড়ে চলে আসার পর ওই প্রতিষ্ঠান নিয়ে আর কথা বলি না আমি। যা-হোক, দক্ষিণ কেনসিংটনে আমার অফিসে যেদিন গিয়েছিলেন, সেদিন কিন্তু আপনাদের কথা শুনে মনে হয়েছিল ডিলের সেই গাড়ি-দুর্ঘটনার ব্যাপারে আপনারা আগ্রহী বেশি।

‘ওই দুর্ঘটনার সঙ্গে হত্যাকাণ্ড দুটোর সম্পর্ক থাকতে পারে… অস্বীকার করছি না। দুর্ঘটনাটা নিয়ে ক্লাসে মাঝেমধ্যে কথা বলতেন ড্যামিয়েন। আপনি কি ছিলেন সেসব ক্লাসে?’

‘ছিলাম। ঘটনাটা অনেক বছর আগের। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, আপনি সব মনে করিয়ে দিলেন।’ ঘরের ভিতরে অত্যুজ্জ্বল একটা নিয়ন লাইট জ্বলছে, সেটার আলো প্রতিফলিত হচ্ছে কর্নওয়ালিসের চশমায়। ‘একবার লাল রঙের একটা ছোট্ট বাস নিয়ে এসেছিল ড্যামিয়েন। একটা মিউযিকও বাজিয়েছিল তখন। কী ঘটেছিল ডিলে, সেটা জানিয়েছিল আমাদের সবাইকে। ওই ঘটনা কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছিল তার মনে, বলেছিল সে-কথাও।’ কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। ‘জানেন কি না জানি না… ওই দুর্ঘটনায় বাচ্চা একটা ছেলে মারা যাওয়ার পরও ড্যামিয়েন এবং তার ক্যারিয়ার নিয়ে যে ভেবেছে তার মা, বিশেষ এই ব্যাপারে কিন্তু বেশ গর্বিত ছিল সে। বলাই বাহুল্য, মা আর ছেলে দু’জনই ছিল উল্লেখ করার মতো দুটো চরিত্র। …আপনি কি একমত?’

‘ড্যামিয়েনের সঙ্গে অভিনয় করেছেন আপনি,’ জবাব দিলাম না কর্নওয়ালিসের প্রশ্নটার। ‘হ্যামলেট নাটকে ছিলেন আপনারা দু’জন।’

‘ছিলাম। তবে এখন ওসব পাগলামি বলে মনে হয় আমার। আসলে আমাদের বয়স তখন ছিল অল্প… বাচ্চাই বলা চলে। অথচ বড় বড় অনেক চিন্তাভাবনা খেলা করত আমাদের মাথায়।

‘আপনি প্রতিভাবান একজন অভিনেতা ছিলেন,’ বললাম আমি।

অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল কর্নওয়ালিস। ‘একটা সময় ছিল যখন অভিনেতা হতে চাইতাম আমি।’

‘কিন্তু শেষপর্যন্ত হয়েছেন একজন আন্ডারটেকার।’

‘আমার বাসায় যখন গিয়েছিলেন আপনারা, তখন এসব নিয়ে কথা বলেছি। .এই ব্যবসা আমাদের পারিবারিক ব্যবসা। আমার বাবা, দাদা… মনে আছে কী বলেছিলাম?’ চেহারা বদলে গেল কর্নওয়ালিসের… দেখে মনে হলো, কিছু একটা স্মরণে এসেছে তার। ‘কিছু একটা দেখাতে চাই আমি আপনাকে। ওটা হয়তো ইন্টারেস্টিং লাগবে আপনার।’

‘কী?’

‘এখানে না। পাশের ঘরে…’

উঠে দাঁড়াল কর্নওয়ালিস, আশা করছে তাকে অনুসরণ করবো আমি। তা-ই করতে চেয়েছিলাম আমিও। কিন্তু যখন উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম, টের পেলাম, পারছি না কাজটা করতে।

প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম… এত আতঙ্কিত কখনও হইনি এই জীবনে। নড়তে পারছি না আমি। আমার মস্তিষ্ক উঠে দাঁড়ানোর সিগনাল পাঠাচ্ছে আমার দুই পায়ে, কিন্তু পা-দুটো শুনছে না সে-আদেশ। আর আমার হাত দুটো ভিনদেশী কোনো কিছু বলে মনে হচ্ছে… সংযুক্ত আছে আমার শরীরের সঙ্গে, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। আমার পুরো শরীরটা পরিণত হয়েছে পেশী আর হাড়ের একটা অকেজো স্তূপে। আতঙ্কে বুকের ভিতরে… ঠিক হৃৎপিণ্ডে হাতুড়ির বাড়ি পড়ছে যেন। মনে হচ্ছে, পাঁজরা ভেঙে বেরিয়ে আসবে ওটা। বুঝতে পারছি, কোনো একজাতের ড্রাগ খাইয়ে দেয়া হয়েছে আমাকে। আরও বুঝতে পারছি, ভীষণ বিপদে পড়েছি আমি।

‘আপনি ঠিক আছেন?’ জানতে চাইল কর্নওয়ালিস, চেহারায় রাজ্যের উদ্বেগ। অভিনয়।

‘কী করেছেন আপনি?’ নিজের কণ্ঠ নিজের কানেই অপরিচিত বলে মনে হলো আমার। প্রতিটা শব্দ উচ্চারণ করতে দু’বার চেষ্টা করতে হয়েছে আমাকে।

‘উঠে দাঁড়ান…’

‘পারছি না!’

হাসল কর্নওয়ালিস। হাসিটা ভয়ঙ্কর।

ধীরেসুস্থে হেঁটে আমার কাছে হাজির হলো শয়তান লোকটা। পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে গুঁজে দিল আমার মুখে, আঁতকে উঠলাম। অর্থাৎ কার্যত বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লাম। রুমালটা আমার মুখের ভিতরে ঢোকার আগপর্যন্ত একটাবারের জন্যও মনে হয়নি, চেঁচানো উচিত আমার। তা ছাড়া চেঁচালে খুব একটা লাভ হতো বলে মনেও হয় না। কেউ বলে না-দিলেও জানি, আমরা দু’জন ছাড়া আর কেউ যাতে না-থাকে এই জায়গায়, সেটা আগেই নিশ্চিত করেছে কর্নওয়ালিস।

‘একটা জিনিস নিয়ে আসি,’ বলল শয়তানটা। ‘এক মিনিটও লাগবে না।’

হেঁটে বেরিয়ে গেল সে ঘর থেকে, দরজাটা খুলে রেখে গেছে। বসে আছি আমি আগের মতোই, নতুন এই অনুভূতি টের পাওয়ার চেষ্টা করছি… বলা ভালো, শরীরের অসাড়তা অনুভব করছি। প্রকৃতপক্ষে ভয় ছাড়া আর কোনো কিছু টের পাচ্ছি না। শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বেড়ে গেছে, সেটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। এখনও হাতুড়ির বাড়ি পড়ছে বুকে। রুমালটা যেন একটু একটু করে ঢুকে যাচ্ছে গলায়… একটু একটু করে দম আটকে আসছে আমার। যা বুঝতে পারাটা সহজ ছিল, প্রচণ্ড আতঙ্কিত থাকার কারণে সেটা বুঝতে যেন কষ্ট হচ্ছে আমার: আমি খুশিমনে হাজির হয়ে গেছি কোনো এক মরার জায়গায়। এবং এর ফলাফল আমারই নিশ্চিত মৃত্যু।

একটা হুইলচেয়ার ঠেলতে ঠেলতে হাজির হলো কর্নওয়ালিস। লাশ ঠেলার কাজে কি ওটা ব্যবহার করে সে? মনে হয় না। বরং যেসব অতি-বৃদ্ধ মানুষ শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে আসে কোনো মরদেহকে, সম্ভবত তাদের জন্য ব্যবহৃত হয় ওই চেয়ার।

নিচু সুরে শিস বাজাচ্ছে কর্নওয়ালিস। আমি যেন একইসঙ্গে কৌতূহল আর ভাবলেশহীনতা দেখতে পাচ্ছি শয়তানটার চেহারায়। টিন্টেড সেই চশমা আর পরে নেই সে। পিটপিট করছে দুই চোখ, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি সে-দুটো। দেখছি তার ছোট ছোট কিন্তু পরিপাটি দাড়ি, পাতলা হয়ে আসা চুল, বুঝতে পারছি এসব আসলে শয়তানটার মুখোশ ছাড়া আর কিছু না। বুঝতে পারছি, সে-মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে দানবীয় কিছু-একটা। এবং এখন ওই মুখোশ ভেদ করে যেন দেখা যাচ্ছে দানবটাকে। সে জানে আমি নড়তে পারছি না। আমার কফিতে নিশ্চয়ই কিছু-একটা মিশিয়েছে সে। আর আমিও এমন বোকা… খেয়ে নিয়েছি ওই কফি। বাস্তবে চেঁচাতে পারছি না, কিন্তু মনে মনে ঠিকই চিৎকার করছি নিজের উদ্দেশে…. কর্নওয়ালিসই শ্বাসরোধ করেছে হত্যা করেছে ডায়ানা ক্যুপারকে, পরে টুকরো টুকরো করেছে ওই মহিলার ছেলেকে। কিন্তু কেন? এবং আরও বড় কথা হচ্ছে, এখানে এসে শয়তানটার ফাঁদে ধরা পড়ার আগে কথাটা কেন বোধগম্য হলো না আমার?

আমার উপর ঝুঁকে পড়ল সে, একটা মুহূর্তের জন্য মনে হলো আমাকে বুঝি চুমু খেতে চলেছে। প্রচণ্ড ঘৃণায় কুঁকড়ে গেলাম, কিন্তু অবলীলায় আমাকে তুলে নিল শয়তানটা, লোকে যেভাবে ময়লা ছুঁড়ে ফেলে সেভাবে আমাকে ছুঁড়ে ফেলল হুইলচেয়ারে। আমার ওজন প্রায় পঁচাশি কেজি, কাজ শেষ করে দম নিতে হলো কর্নওয়ালিসকে। তারপর ঠিক করে দিল আমার পা দুটো, এখনও শিস বাজাচ্ছে। ঠেলতে শুরু করল হুইলচেয়ারটা, অফিসের বাইরে নিয়ে এল আমাকে।

খোলা একটা দরজা পার হলাম আমরা। এবার একদিকে একটা গির্জা দেখতে পাচ্ছি। একঝলক তাকালাম সেদিকে। চোখে পড়ল মোমবাতি, কাঠের প্যানেল, একটা বেদি… সেখানে সম্ভবত একটা ক্রুশ বা মেনোরাহ অথবা অন্য কোনো উপযুক্ত ধর্মীয় প্রতীক রাখা আছে। করিডরের শেষমাথায় আছে একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল লিফট। ওটা এত বড় যে, ভিতরে একটা কফিন এঁটে যাবে। হুইলচেয়ার ঠেলতে ঠেলতে আমাকে ওই লিফটের কাছে নিয়ে গেল কর্নওয়ালিস, ঢুকিয়ে দিল ভিতরে। তারপর খোঁচা মারল একটা বাটনে। দরজাটা যখন লেগে যাচ্ছে, তখন টের পেলাম, আমার জীবনটাও বুঝি শেষ হয়ে গেল। একটা ঝাঁকুনি অনুভব করলাম, নামতে শুরু করলাম নিচে।

লিফটটা হাজির হলো নিচু ছাদওয়ালা বড়সড় একটা ওয়ার্করুমে। আরও নিয়ন লাইট আছে এখানে। নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর বসানো আছে সেগুলো। যা-কিছু দেখছি, তাতেই নতুন নতুন ভয়ে ছেয়ে যাচ্ছে আমার মন। আমি যে অসহায়, সে-অনুভূতি তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে আমার ভিতরে। দূরের এক কোনায় দেখা যাচ্ছে রূপার ছ’টা কেবিনেট… ওগুলো আসলে রেফ্রিজারেটেড কম্পার্টমেন্ট, দুই সেটে তিনটা তিনটা করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। পূর্ণবয়স্ক একজন মানুষকে অনায়াসে ঢুকিয়ে রাখা যাবে যে-কোনো কেবিনেটে। ঘরের বাকি অংশ দেখলে মনে পড়ে যায় কোনো সার্জারির কথা। একধারে আছে ধাতব একটা গার্নি। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে কয়েকটা শেল্ফ, গাঢ় রঙের কিছু তরলে ভর্তি কতগুলো বোতল আর শিশি দেখা যাচ্ছে সেগুলোতে। একটা টেবিলের উপর থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে স্কালপেল, সুঁই আর ছুরি। হুইলচেয়ারটা ঠেলতে ঠেলতে ওসব জিনিসের সামনে নিয়ে রাখল কর্নওয়ালিস, যাতে আমার মুখোমুখি থাকে ওগুলো। একটু আগে যে- লিফট থেকে বের হয়েছি, আমার পিঠটা এখন সেদিকে। চারদিকের দেয়ালে সাদা চুনকাম করা। ধূসর শিট ভিনাইলে আচ্ছাদিত পুরো মেঝে। এককোনায় একটা বালতি আর একটা মপ আছে।

‘আপনি যদি এখানে না-আসতেন, তা হলেই ভালো হতো,’ বলল কর্নওয়ালিস। শয়তানটার কথাবার্তায় এখনও ভদ্রতা আছে। আমার ধারণা, বছরের পর বছর ধরে চর্চা করে এ-রকম কথাবার্তা রপ্ত করেছে সে। সে যে-ভূমিকা পালন করছে, সেটার জন্য এ-রকম আচরণেরও দরকার আছে। কথাটা বললাম, কারণ আমি এখন জেনে গেছি, আসলেই বিশেষ একটা ভূমিকা পালন করছে সে। একটা একটা করে মুহূর্ত পার হচ্ছে, আর আসল রবার্ট কর্নওয়ালিস যেন একটু একটু করে উদ্ভাসিত হচ্ছে আমার সামনে।

‘আপনার সঙ্গে আসলে কোনো রেষারেষি নেই আমার,’ বলল শয়তানটা! ‘আপনার কোনো ক্ষতিও করতে চাইনি কখনও। কিন্তু আপনি নিজেই স্বেচ্ছায়- সজ্ঞানে এসেছেন এখানে। স্বেচ্ছায় নাক গলিয়েছেন আমার ব্যবসায়।’ বলতে বলতে গলা চড়ে গিয়েছিল তার, নিজেকে সামলে নিল একটুখানি। ‘রাডা’র ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞেস করতে গেলেন কেন? কেন খুঁড়ে বের করতে গেলেন আমার অতীত? এখানে হাজির হয়ে বোকার মতো সব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, ফলে আমাকে বাধ্য হয়ে…। এই কাজটা আসলেই করতে চাইনি আমি।’

কথা বলতে চাইলাম, কিন্তু মুখের ভিতরে ঢুকে-থাকা রুমালটা সে-কাজ করতে দিল না আমাকে। ওটা আমার মুখের ভিতর থেকে টেনে বের করল কর্নওয়ালিস। ওটা বেরিয়ে যাওয়ামাত্র কথা বলতে পারলাম।

‘আমি যে এখানে এসেছি, আসার আগে সেটা বলে এসেছি আমার স্ত্রীকে। আমার অ্যাসিস্টেন্টকেও বলেছি। এখন আপনি যদি কিছু করেন আমাকে, ওরা জেনে যাবে।’

‘হ্যাঁ, তা যাবে বটে… যদি তাঁরা আপনাকে খুঁজে পান।’ বলল কর্নওয়ালিস, আবেগের ছিটেফোঁটাও নেই কণ্ঠে। আবারও কথা বলতে চাইলাম আমি কিন্তু হাত তুলে আমাকে থামিয়ে দিল শয়তানটা। ‘পরোয়া করি না। আপনার কাছ থেকে আর কিছু শুনতেও চাই না। এখন আর এসবে আমার তেমন কিছু আসে-যায়ও না। আমি শুধু এখন কিছু কথা বুঝিয়ে বলতে চাই।’

আঙুল তুলে কপালের একটা পাশ স্পর্শ করল সে, তাকিয়ে আছে অনতিদূরের কোনো এক জায়গার দিকে। কী বলবে, তা মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছে বোধহয়। অবশের মতো বসেই আছি আমি, নিঃশব্দে চিৎকার করছি। মনে মনে বলছি, আমি একজন লেখক। এসব ঘটতে পারে না আমার সঙ্গে। আমি চাইনি এসব ঘটুক।

‘আমার জীবনটা আসলে কী-রকম, সে-ব্যাপারে আদৌ কি কোনো ধারণা আছে আপনার?’ শেষপর্যন্ত বলল কর্নওয়ালিস। ‘আপনি কি মনে করেন জীবিকার জন্য যা করি আমি সেটা উপভোগ করি? দিনের পর দিন ঠায় বসে থেকে দুঃস্থ কিছু লোকের মরা বাপ-মা-দাদা-দাদী-নানা-নানীর করুণ গল্প শুনতে কেমন লাগে, বলুন তো? মাথার উপর যখন গনগন করছে দুপুরের সূর্যটা, তখন ওসব মরা মানুষের শেষকৃত্যানুষ্ঠান বা শবদাহের আয়োজন করতে কেমন লাগে? তাদের কফিন বা সমাধিফলক বয়ে বেড়াতে কেমন লাগে? লোকে আমার দিকে তাকায়, আর দেখে, স্যুট-কোট পরে বসে আছে বিরক্তিকর একটা মানুষ, যার মুখে কখনও হাসি নেই, যে সব সময় সান্ত্বনার বাণী শোনায় তার খদ্দেরদের, কখনও কখনও আবার ক্রন্দনরত কারও দিকে বাড়িয়ে দেয় টিস্যু। অথচ ভিতরে ভিতরে আমি সব সময় চেয়েছি তাদের চেহারায় সজোরে ঘুসি হাঁকাতে। কারণ এ-রকম কিছু হতে চাইনি আমি কখনও।

‘কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্স। এই পরিবারেই আমার জন্ম। আমার বাবা ছিলেন একজন আন্ডারটেকার। আমার দাদাও ছিলেন তা-ই। তাঁর বাবাও তা-ই ছিলেন। আমার চাচা-ফুফুরাও একই কাজ করতেন। আমি যখন নেহাৎই একজন বালক, তখন থেকেই যাঁদেরকে দেখেছি আমার আশপাশে, তাঁরা সব সময় কালো কাপড় পরে থাকতেন। কতগুলো ঘোড়া টেনে নিয়ে চলেছে একটা শবযান… এই দৃশ্য দেখানোর জন্য বার বার রাস্তায় নিয়ে যাওয়া হতো আমাকে। ওটাই ছিল আমার শৈশবের শিক্ষা। রাতে যখনই আমার বাবাকে ডিনার খেতে দেখতাম, আমার মনে পড়ে যেত, সারাটা দিন কাটিয়েছেন তিনি মরা মানুষদের সঙ্গে। মনে পড়ে যেত, যে-দুই হাতে আমাকে আলিঙ্গন করতেন তিনি, সে-হাতেই সারাদিনে ঘেঁটেছেন মানুষের লাশ। মৃত্যু যেন তাঁর পিছু নিয়ে হাজির হতো আমাদের সেই বাড়িতে, সেই ডাইনিংরুমে। আমার ধারণা, আমাদের পুরো পরিবার সংক্রমিত হয়েছিল এই চিন্তায়। মৃত্যুই ছিল আমাদের জন্য জীবন। যখনই ভাবতাম একদিন আমাকেও হতে হবে ও-রকম, কারণ আমার জন্যও ভেবে রাখা হয়েছে এসব, তখনই খারাপটা লাগত সবচেয়ে বেশি। কিন্তু কিছু করার নেই… আমরা কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্স… এবং আমি ওই পরিবারের একজন পুত্রসন্তান।

‘এই ব্যাপারটা নিয়ে স্কুলে আমার বন্ধুরা প্রায়ই খেপাত আমাকে। আমাদের পারিবারিক নামটা জানা ছিল সবারই… কর্নওয়ালিস। তাদের কাউকে কাউকে আবার স্কুলের বাসে গিয়ে ওঠার জন্য আমাদের দোকানের সামনে দিয়েই যেতে হতো। এমনকী স্কুলে আমার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ফিউনারেল বয়’। কেউ কেউ আবার ডাকত ‘ডেড বয়’। আমার কাছে জানতে চাইত, মরা মানুষের গায়ে যখন কাপড় থাকে না, তখন তাদেরকে দেখতে কেমন লাগে। জানতে চাইত, পুরুষ মানুষ মরে গেলেও কি তাদের লিঙ্গ উত্থিত হয়? মরা মানুষের কি নখ বাড়ে? স্কুলে যেসব শিক্ষক-শিক্ষিকা পড়াতেন আমাদেরকে, তাঁদের অর্ধেক মনে করতেন, আমি বোধহয় রোমাঞ্চকর কোনো কিছু… কারণটা আর কিছুই না, আমাদের সেই পারিবারিক কর্মযজ্ঞ। আরেকটু বড় ক্লাসে যখন উঠলাম, বন্ধুরা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কথা বলত, যার যার ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলত। স্বপ্ন ছিল তাদের। ভবিষ্যৎ ছিল। কিন্তু আমার ওসব কিছুই ছিল না। স্বপ্ন বা ভবিষ্যৎ যা-ই বলুন, সব মরে গিয়েছিল আমার সেই ছেলেবেলাতেই।

‘তারপরও… বলতে মজাই লাগছে এখন… একটা স্বপ্ন ছিল আমার। একবার স্কুলের একটা নাটকে একটা চরিত্রে অভিনয় করতে দেয়া হলো আমাকে। তেমন বড় কোনো চরিত্র না… দ্য টেমিং অভ দ্য শ্রু নাটকের হর্টেনশিয়ো। কিন্তু কথা হচ্ছে, চরিত্রটা দারুণ ভালো লেগে গিয়েছিল আমার। শেক্সপিয়ার বেশ ভালো লাগত তখন। কা