‘কৌতূহল হচ্ছে, তাই।’
‘না, এখানে একা ছিলেন না মিসেস ক্যুপার। তাঁর সঙ্গে সারাটা সময় ছিলাম আমি।’
‘তবে…’ দ্বিধা করছে আইরিন, কথাটা বলবে কি না ভাবছে হয়তো, শেষপর্যন্ত বলেই ফেলল, ‘চলে যাওয়ার আগে ক্লোকরুমটা ব্যবহার করেছিলেন মিসেস ক্যুপার।’
‘ক্লোকরুম মানে টয়লেট?’
‘হ্যাঁ। শুধু ওই সময়টুকুই একা ছিলেন তিনি। সেখান থেকে বের হয়ে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে চলে যান। আরেকটা কথা। যখন চলে যাচ্ছিলেন তিনি, তখন… বেশ… কী বলবো… প্রসন্ন মনে হচ্ছিল তাঁকে।’
বুঝতে পারার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন, উঠে দাঁড়াল।
এমন সময় একটা কথা মনে পড়ে গেল আমার। বললাম, ‘টিমোথি গডউইন নামের কারও ব্যাপারে কি কোনো কথা বলেছিলেন মিসেস ক্যুপার?’
‘টিমোথি গডউইন?’ মাথা নাড়ল কর্নওয়ালিস। ‘কে সে?’
‘আজ থেকে বছর দশেক আগে মিসেস ক্যুপারের গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা গিয়েছিল ছেলেটা। একই দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিল ওই ছেলের যমজ ভাই জেরেমি গডউইন …
‘কী সাংঘাতিক!’ আইরিনের দিকে তাকাল কর্নওয়ালিস। ‘ওই দুই ভাইয়ের নাম কি তোমাকে বলেছিলেন মিসেস ক্যুপার?’
‘না।’
হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল হোথর্ন। ‘সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ, মিস্টার কর্নওয়ালিস।’
রাস্তায় বের হয়েই আমার মুখোমুখি হলো সে। ‘দয়া করে আমার একটা উপকার করুন। এর পরে যতবার থাকবেন আমার সঙ্গে, কাউকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। ঠিক আছে?’
‘মানে? আপনার সঙ্গে চুপচাপ বসে থাকবো, কিন্তু কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারবো না?’
‘ঠিক তা-ই।’
‘কেন, আমাকে কি বোকা বলে মনে করেন? আপনার কাজে সাহায্য করার সামর্থ্য আছে আমার।’
‘হ্যাঁ, তা হয়তো আছে, কিন্তু আপনি নিজেই বলেছেন, এই উপন্যাস আসলে একটা গোয়েন্দাকাহিনি। আর আমিই সেই গোয়েন্দা। কাজেই জিজ্ঞাসাবাদের দায়িত্বটা আমার উপরই ছেড়ে দিন দয়া করে।
‘ঠিক আছে, দিলাম। এবার বলুন কী জানতে পারলেন। ক্রাইমসিনে গিয়েছিলেন আপনি। মিসেস ক্যুপারের ফোন রেকর্ড দেখেছেন। আন্ডারটেকারের সঙ্গে কথা বলেছেন। বলুন, কী কী জানতে পারলেন?’
‘জানতে পেরেছি, ডায়ানা ক্যুপার জানতেন, তিনি মরতে চলেছেন।’
অপেক্ষা করছি… হয়তো আরও কিছু বলবে হোথর্ন।
কিন্তু আর কিছু বলল না সে, ঘুরে হনহন করে হাঁটতে লাগল ফুটপাত ধরে। কী করবো, ভাবলাম কিছুক্ষণ। তারপর অনুসরণ করতে শুরু করলাম হোথৰ্নকে।
ওর সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটাটা কষ্টকর।
৬. সাক্ষীদের বিবৃতি
ডায়ানা ক্যুপারকে তেমন একটা চিনতাম না আমি। কিন্তু এটা জানতাম, তাঁকে খুন করতে চাইবে, এ-রকম লোকের সংখ্যা নিতান্তই হাতেগোনা। তিনি ছিলেন বিধবা, নিজের মতো থাকতেন। তিনি যে খুব ধনী ছিলেন তা না, কিন্তু সচ্ছ্বল ছিলেন। একটা থিয়েটারের বোর্ড অভ ডিরেক্টর্সে ছিলেন। আর ছিলেন বিখ্যাত এক লোকের মা। ঘুমের সমস্যা ছিল তাঁর। আর ছিল একটা বিড়াল। মঞ্চনাটক প্রযোজনা করেন এ-রকম এক লোককে টাকা দিয়ে সে-টাকা খুইয়েছিলেন। নিজের বাসায় ক্লিনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন এমন এক মেয়েকে, যার ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে। কিন্তু ওই প্রযোজক অথবা ওই ক্লিনার মেয়েটা কেন খুন করতে চাইবে তাঁকে? ঠিক জানি না।
ছোট একটা ছেলেকে, সত্যি বলতে কী, হত্যা করেছিলেন তিনি। গুরুতরভাবে জখম করেছিলেন ওই ছেলের ভাইকে। দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল মিসেস ক্যুপারেরই বেপয়োরা আচরণের কারণে… চশমা ছাড়া দূরের জিনিস দেখতে পেতেন না, অথচ সেদিন ড্রাইভিঙের সময় পরেননি ওটা। তার চেয়েও খারাপ কথা, ছেলে দুটোকে গাড়িচাপা দিয়ে থামেননি, বরং একটানা ড্রাইভিং করে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন নিজের বাসায়। এবং এত বড় একটা ঘটনার পরও বেকসুর খালাস পেয়ে গেছেন আদালত থেকে। আমি যদি টিমোথি আর গডউইনের বাবা হতাম, মিসেস ক্যুপারকে নিজহাতে খুন করার ইচ্ছা হয়তো জেগে উঠত আমার মনে।
ওই দুর্ঘটনাই কি ডায়ানা ক্যুপারের হত্যাকাণ্ডের মোটিভ?
এখন কথা হচ্ছে, গডউইন পরিবার যদি উত্তর লন্ডনের হ্যাঁরো-অন-দ্য-হিলের
বাসিন্দা হয়ে থাকে, তা হলে সেখানে কেন যাচ্ছি না আমরা?
কথাটা জিজ্ঞেস করলাম হোথর্নকে।
‘একবারে একটা পদক্ষেপ,’ মনে করিয়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বলল সে। ‘আমি
আগে আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে চাই।’
‘আরও কয়েকজন? মানে সেই ক্লিনার মেয়েটা?’
চলন্ত একটা ট্যাক্সির পেছনের সিটে পাশাপাশি বসে আছি আমরা দু’জন। অ্যাক্টনের শেফার্ড বুশে যাচ্ছি… সেখানেই থাকে আন্দ্রিয়া কুভানেক। রেমন্ড ক্লন্সকেও ফোন করেছিল হোথর্ন। ওই লোকের সঙ্গেও দেখা করতে যাওয়ার কথা আছে আমাদের।
হোথর্ন জবাব না-দেয়ায় আবার বললাম, ‘আন্দ্রিয়া কুভানেককেও কি সন্দেহ করছেন আপনি?’
‘করছি। কারণ পুলিশের কাছে মিথ্যা কথা বলেছিল সে
‘আর কুন্স? এসবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা কী?’
‘মিসেস ক্যুপারকে ভালোমতোই চিনতেন কুন্স। একটা গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মহিলা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, শতকরা আটাত্তর ভাগ ক্ষেত্রে খুনিদের সঙ্গে পূর্বপরিচয় থাকে তাঁদের।’
‘আসলেই?’
‘কেন, জানেন না? আমি তো ভেবেছিলাম জানেন। নাটক-সিনেমা লেখেন, আপনার তো জানার কথা।’ ট্যাক্সির ভিতরে ‘নো-স্মোকিং’ লেখা একটা বাতি জ্বলছে; কিন্তু সে-অনুরোধ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের পাশের জানালার কাঁচ নামিয়ে দিল হোথর্ন বাটন-চেপে, তারপর একটা সিগারেট ধরাল। ‘স্বামী, সৎ বাপ, প্রেমিক… পরিসংখ্যান বলছে, সাধারণত এসব লোকই খুন করে মহিলাদেরকে।’
