‘চার্লি? আপনি না বললেন জ্যাক?’
‘সবাই বলে, তাই আমিও বলেছি।’
ফুলহ্যাম ব্রডওয়ে স্টেশনের বাইরে একটা ক্যাফেতে বসে আছি আমরা। ধূমপান করছে হোথর্ন। মিডোস যেসব ডকুমেন্ট দিয়েছে ওকে, সেগুলো দেখেছে ইতোমধ্যে। আমাকেও দেখতে দিয়েছে।
মৃত্যুর আগে এবং পরে ডায়ানা ক্যুপারের কয়েকটা ফটোগ্রাফ পাওয়া গেছে। এবং মৃত্যুর আগে-পরে একই মানুষের শারীরিক পরিবর্তন দেখে রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে গেছি আমি। আন্দ্রিয়া কুভানেক যে-বর্ণনা দিয়েছিল মরদেহের, সেটার সঙ্গে যে-মানুষটা মঞ্চনাটক দেখে বেড়াতেন আর মেফেয়ারের দামি-দামি রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ খেতেন, তাঁর কোনো মিলই নেই।
ব্লুভানেক যা বলেছে পুলিশের কাছে, সেটা লিখিত আকারে আছে ওই ফাইলের ভিতরে:
.
সকাল এগারোটার দিকে কাজে আসি আমি। সাধারণত ওই সময় নাগাদই কাজ শুরু করি। বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখতে পাই মিসেস ক্যুপারকে, এবং সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি, খুবই খারাপ কিছু-একটা ঘটেছে…
ফাইলের ভিতরে ওই মেয়ের একটা ছবি পাওয়া গেল। হালকাঁপাতলা শরীর, গোলগাল চেহারা। সে-চেহারা দেখতে কেমন ছেলেদের মতো। মাথায় খাটো আর খাড়া-খাড়া চুল। ছবিটা যখন তোলা হয়েছিল, তখন যেন আত্মরক্ষা করার কায়দায় তাকিয়ে ছিল ক্যামেরার দিকে। হোথর্ন বলেছে, মেয়েটার নাকি ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে। তারপরও ডায়ানা ক্যুপারের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এই মেয়েকে জোড়া দিতে পারছি না। মেয়েটাকে আসলে… খুনি হিসেবে মানাচ্ছে না একেবারেই। হোথর্ন যে-বর্ণনা দিয়েছে খুনির, তার তুলনায় খুবই ছোট হয়ে গেছে মেয়েটা।
আরও অনেক কিছু আছে এই ফাইলের ভিতরে। এবং সে-কারণে কেন যেন মনে হচ্ছে আমার, এখানে এই টেবিলে বসে কফি আর সিগারেট খেতে খেতে মিসেস ক্যুপারের হত্যারহস্যের সমাধান করে ফেলাটা সম্ভব হোথর্নের পক্ষে। তবে আমি চাই না সে-রকম কিছু ঘটুক। কারণ সেক্ষেত্রে খুবই ছোট হয়ে যাবে আমার বইটা। শেষপর্যন্ত হয়তো দেখা যাবে, উপন্যাসের বদলে কোনো একটা গল্প লিখে বসে আছি হোথৰ্নকে নিয়ে।
‘ওই লোকের সঙ্গে আপনার পরিচয় হলো কী করে?’ জিজ্ঞেস করলাম।
আনমনা হয়ে ছিল, তাই আমার প্রশ্নটা বুঝতে পারল না হোথর্ন। ‘কার কথা বলছেন?’
‘মিডোস।
‘পাটনির একই সাব কমান্ডে একসময় কাজ করতাম আমরা। ওর কথা বাদ দিন। ডায়ানা ক্যুপারকে নিয়ে কিছু বলতে চান?’
‘না। বরং আপনাকে নিয়ে কথা বলতে চাই।’
টেবিলের উপর ছড়িয়েছিটিয়ে রাখা কাগজগুলোর দিকে তাকাল হোথর্ন। কিছু বলল না।
কিন্তু আমিও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। ‘আপনাকে নিয়ে কাজ করতে হলে আপনার ব্যাপারে আরও অনেক কিছু জানতে হবে আমাকে।’
‘আমার ব্যাপারে কারও কোনো আগ্রহ নেই।’
‘কথাটা সত্যি হলে আজ এখানে থাকতাম না আমি। কথাটা সত্যি হলে আপনাকে নিয়ে যে-বই লিখবো, সেটা এককপিও বিক্রি হবে না।’
আরেকটা সিগারেট ধরাল হোথর্ন।
ওর দিকে তাকিয়ে আছি আমি। ‘দেখুন, হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় যে-মানুষটা, তাকে নিয়ে কিন্তু কাহিনি লেখে না কেউ। কাহিনি লেখা হয় ওই অপরাধ নিয়ে। লেখা হয় রহস্যটার সমাধান করে যে-গোয়েন্দা, তাকে নিয়ে। আপনার ব্যাপারে বই লেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক বড় একটা ঝুঁকির মধ্যে আছি আমি আসলে। আপনি যদি এখনই সমাধান করে ফেলেন এই কেসের, তা হলে লেখার মতো কিছুই থাকবে না আমার হাতে। আর যদি সমাধান করতে না পারেন, সেক্ষেত্রে পুরো ব্যাপারটা সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই হবে না। কাজেই আপনার ব্যাপারে যত বেশি জানতে পারবো, আপনাকে তত মানবিকভাবে তুলে ধরতে পারবো পাঠকদের কাছে। কাজেই আমি যা-যা জিজ্ঞেস করবো, নিতান্ত অবহেলায় সেসব পাশ কাটিয়ে যাবেন না দয়া করে। আপনার আর আমার মাঝখানে এমন কোনো দেয়াল তৈরি করবেন না, যার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারবেন আপনি।’
‘জ্যাক মিডোসকে নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না।’
‘বলার দরকারও নেই আপাতত। আপনার নিজের ব্যাপারে কিছু বলুন।’ সঙ্গে- আনা নোটবুকটা খুললাম আমি, কলম বের করলাম। ‘আপনি কোথায় থাকেন, তা- ও জানা নেই আমার।’
দ্বিধা করছে হোথর্ন।
আমার মনে হচ্ছে, পাথর ভেঙে সেটার ভিতর থেকে রক্ত বের করার চেষ্টা করছি। ‘গ্যান্টস হিলে থাকার মতো একটা জায়গা আছে আমার,’ শেষপর্যন্ত বলল হোথর্ন। ‘জায়গাটা উত্তর-পূর্ব লন্ডনের শহরতলীতে, সাফোকে যাওয়ার পথে।’
‘আপনি বিবাহিত?’
‘হ্যাঁ। তবে… একসঙ্গে থাকি না আমরা। এই ব্যাপারে আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না আমাকে।’
‘আপনি কি কোনো ফুটবল দলকে সমর্থন করেন?
‘আর্সেনাল।’
হোথর্নের বলার ভঙ্গিতে তেমন কোনো উৎসাহ টের পেলাম না। তার মানে খেলাধূলার প্রতি টান নেই ওর আসলে।
‘সিনেমা দেখেন?’
‘কখনও কখনও।’ অধৈর্য হয়ে উঠছে হোথৰ্ন।
‘গান শোনেন?’
‘মানে?’
‘ঠিক কী ধরনের গান শোনেন আপনি? ক্ল্যাসিকাল? জ্যাজ?’
‘গান তেমন একটা শোনা হয় না।’
‘ছেলে-মেয়ে আছে?’
দুই ঠোঁটের মাঝখান থেকে সিগারেটটা বের করল হোথর্ন। এমন এক ভঙ্গিতে সেটা ধরে আছে যে, দেখে মনে হচ্ছে, কোনো পয়জন ডার্ট ধরে আছে যেন। বিষদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ছোঁ মেরে একটা কাগজ তুলে নিল টেবিলের উপর থেকে। ‘এসব দেখার কোনো আগ্রহ আপনার আছে কি নেই?’
তখনই বাসায় চলে যেতে পারতাম আমি। তখনই ভুলে যেতে পারতাম সব কিছু। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে ঘুরে এসেছি ওই ক্রাইমসিন থেকে। মনে হচ্ছে, ডায়ানা ক্যুপারকে যেন চিনি। যে-নৃশংসতার শিকার হয়েছেন তিনি, সেটার জন্য যেন একধরনের মায়া অনুভব করছি তাঁর প্রতি। মনে হচ্ছে, কিছু-একটা পাওনা আছেন তিনি আমার কাছে।
