‘আপনি কি এই জীবনে কখনও সাগরসৈকতে গেছেন?’
জবাব দিল না হোথর্ন।
বইয়ের স্তূপগুলো দেখিয়ে দিলাম আমি ইঙ্গিতে। ‘দ্য আউটসাইডার কেমন লাগছে?’
‘শেষ করেছি। শেষটা বেশ ভালো লেগেছে। কীভাবে লিখতে হয়, জানতেন আলবেয়ার কামু।’
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি আমরা দু’জন। এখানে এসে কোনো ভুল করেছি কি না, ভাবছি। যা জানা দরকার ছিল আমার, এখানে এসে সেটা জানা হয়ে গেছে। কিন্তু একইসঙ্গে অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি হচ্ছে… বিশ্বাস ভেঙেছি আমি, হোথর্নের অজান্তে গিয়ে হাজির হয়েছি মিডোসের কাছে, ওর অনুমতি না-নিয়েই উপস্থিত হয়ে গেছি এখানে।
বললাম, ‘আগামী সপ্তাহে একসঙ্গে ডিনার করলে কেমন হয়? ততদিনে আপনাকে দেখানোর মতো দুটো চ্যাপ্টার লেখা হয়ে যাবে আমার হয়তো।’
মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘হয়তো।’
দেখা হবে তা হলে।
আমাদের সেদিনের সেই সাক্ষাৎ শেষ হয়ে যেতে পারত এখানেই। মনে একটা অনুশোচনাবোধ নিয়ে হয়তো চলে আসতাম আমি। কিন্তু চলে আসার উদ্দেশ্যে যেইমাত্র ঘুরেছি, একটা শেল্ফের উপর রাখা ফ্রেমে বাঁধাই একটা ছবিতে দৃষ্টি আটকে গেল আমার।
রূপালি চুলের এক মহিলাকে দেখা যাচ্ছে ওই ছবিতে। ছোট একটা ছেলের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে সে। কাউকে বলে দিতে হলো না… সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম, ওটা হোথর্নের স্ত্রী আর ওর ছেলের ছবি।
স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, তারপরও এই ছবি রেখে দিয়েছে হোথর্ন। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় টের পেলাম, ছবির ওই মহিলাকে চিনি আমি। আগে কোথাও দেখেছি আমি তাকে।
সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল কোথায় দেখেছি আমি ওই মহিলাকে।
‘বেজন্মা কোথাকার!’ চেঁচিয়ে উঠলাম হোথর্নের উদ্দেশে।
‘কী?’
‘ওই ছবি আপনার স্ত্রীর?’
‘হ্যাঁ।’
‘তার সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার।
‘না… মনে হয় না।’
‘হে-অন-ওয়াই… সব মনে পড়ে গেছে আমার, ‘সাহিত্য বিষয়ক একটা উৎসব চলছিল সেখানে। আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ার দু’দিন পর। আমার উপর গুরুতর অভিযোগ এনেছিল ওই মহিলা… বলেছিল, আমার বেশিরভাগ বইয়ের কাহিনি নাকি অবাস্তব আর অপ্রাসঙ্গিক। তার সেই কথা শুনেই আমি…’ থেমে গেলাম। ‘আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে আপনার স্ত্রীকে লাগিয়েছিলেন আমার পেছনে!’
‘আপনি এসব কী বলছেন, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
শিশুসুলভ নিষ্পাপ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে হোথর্ন, কিন্তু এসবে গলছি না আমি। একটা লোক এত সহজে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানাল কী করে আমাকে?
মিসেস ডায়ানা ক্যুপার তাঁর স্বামীর ছবি রেখেছিলেন নিজের কাছে। হোথর্ন নিজে আমাকে বলেছে, ওই দু’জনের মধ্যে যদি ছাড়াছাড়িই হয়ে যাবে, তা হলে স্বামীর ছবি নিজের কাছে কেন রাখবেন মিসেস ক্যুপার?
হোথর্ন আর তার স্ত্রীর মধ্যেও যদি ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়ে থাকবে, তা হলে ওই মহিলার ছবি কেন নিজের কাছে রাখবে সে? তার মানে আমাকে মিথ্যা কথা বলেছে সে।
মাথায় রক্ত উঠে গেল আমার। ‘মিথ্যা কথা বলবেন না আমার সঙ্গে!’ চেঁচিয়ে উঠলাম। ‘আপনিই পাঠিয়েছিলেন আপনার স্ত্রীকে। কী করতে যাচ্ছিলেন আপনি, সে-ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা ছিল আপনার।’
‘টনি…’
‘ওটা আমার নাম না! আমি অ্যান্টনি। কেউ আমাকে টনি বলে ডাকে না। ..বই লিখবো, না? পুরো ব্যাপারটা ভুলে যেতে পারেন আপনি। আইডিয়াটা সাংঘাতিক খারাপ ছিল, আরেকটু হলে মরতে বসেছিলাম আমি। আপনার কথা শোনাটাই উচিত হয়নি আমার। এই বই লিখবো না আমি!’
ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এলাম।
লিফটের কাছেও গেলাম না। সিঁড়ি বেয়ে নামলাম বারো তলা থেকে এক তলায়। তারপর হাজির হলাম তাজা বাতাসে। ব্ল্যাকফ্লায়ার্স ব্রিজ অর্ধেক পার হওয়ার আগে থামলাম না।
পকেট থেকে বের করলাম আমার মোবাইল ফোনটা।
আমার এজেন্টকে ফোন করবো এখন। বলবো, চুক্তি শেষ। এখনও ওরিয়ন বুকসের জন্য দুটো বই লেখার কথা আছে আমার, জানিয়ে দেবো সে-দুটোর কাজ শুরু করতে যাচ্ছি আমি। ফয়েল’স ওয়ারের নতুন একটা সিরিযও আছে আমার হাতে। মোদ্দাকথা কাজের কোনো অভাব নেই আমার।
তারপরও…
আমি যদি সব ছেড়েছুঁড়ে চলে যাই এভাবে, হোথর্ন হয়তো গিয়ে হাজির হবে অন্য কোনো লেখকের কাছে। ফলে কী হবে? নিজের বইয়ে আমি হতাম মুখ্য একটা চরিত্র, অন্যের বইয়ে পরিণত হবো গৌণ কোনো চরিত্রে। ব্যাপারটা মোটেও ভালো কিছু হবে না আমার জন্য। অন্য কেউ তার বইয়ে যা খুশি তা-ই লিখতে পারে আমাকে নিয়ে। এমনকী আমাকে আস্ত একটা আহাম্মকও বানিয়ে দিতে পারে।
অপরপক্ষে আমি যদি লিখি বইটা, নিয়ন্ত্রণ থাকবে আমার হাতে। হোথর্ন স্বীকার করেছে অন্য কোনো লেখকের কাছে যায়নি সে। কাজেই এই কাহিনি এখন পর্যন্ত আমার। ওদিকে হিলডা কোনো একজন প্রকাশকের সঙ্গে কথাও বলে ফেলেছে। তার মানে আমার অর্ধেক কাজ হয়ে গেছে।
মোবাইল ফোনটা এখনও হাতে ধরে রেখেছি আমি।
স্পিড ডায়ালের উপর ঘুরপাক খাচ্ছে আমার বুড়ো আঙুল।
যতক্ষণে গিয়ে পৌঁছালাম নদীর অন্য তীরে, ততক্ষণে জানা হয়ে গেছে আমার, কী করতে চলেছি।
***
৫. ক্ষতবিক্ষত একজন মানুষ
‘যদি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতাম, তা হলে সাবধান থাকার চেষ্টা করতাম… কী বুঝিয়েছে লোকটা?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘চার্লি মিডোস আসলে একটা বেকুব,’ বলল হোথর্ন। ‘ওর কথার মানে বুঝবার চেষ্টা করে লাভ নেই।
