‘ঠিক আছে, যাবেন, বেশি সময় নেবো না আমি।’
আমার আর হোথর্নের মধ্যে যেন কোনো চালমাত অবস্থা হয়েছে… দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াচ্ছে না হোথর্ন, আমিও চলে যেতে চাইছি না।
‘বইটার ব্যাপারে কথা বলতে চাইছি আপনার সঙ্গে,’ বললাম আমি।
মনস্থির করতে আরও কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল হোথর্নের। তারপর সরে দাঁড়াল, পুরোপুরি খুলে দিল দরজাটা। ‘ভিতরে আসুন!’ এমনভাবে বলল, যেন এতক্ষণে খুশি হয়েছে আমাকে দেখে।
হোথর্নের ফ্ল্যাটটা বেশ বড়… দুই হাজার বর্গফুটের মতো। মেইন রুমগুলো ভেঙে বেশ বড় একটা লিভিংরুম তৈরি করা হয়েছে। রান্নাঘর আর স্টাডিরুমে যাওয়ার আলাদা আলাদা দরজা আছে। জানালা দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি নদীটা। ফ্ল্যাটের ছাদ খুবই নিচু, জানালাগুলোও সরু সরু। কেমন একটা ধূসর ভাব আছে আশপাশের সব কিছুতে। পায়ের নিচের কার্পেটটা একেবারে নতুন। লিভিংরুমের কোনো দেয়ালেই ঝুলছে না কোনো পেইন্টিং। বলতে গেলে কোথাও কোনো আসবাব নেই… শুধু আছে একটা সোফা, একটা টেবিল আর দুটো চেয়ার। আর আছে দুটো শেল্ফ। স্টাডিরুমের ডেস্কে একটা না, বরং দু’- দুটো কম্পিউটার দেখা যাচ্ছে। সেগুলোর সঙ্গে তারের জটের মাধ্যমে যুক্ত আছে কিছু হার্ডওয়্যার।
একধারের একটা টেবিলের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বেশ কিছু বই। আলবেয়ার কামু’র দ্য আউটসাইডার নজরে পড়ল সবার আগে। বইগুলোর পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে কিছু ম্যাগাযিন… সংখ্যায় পঞ্চাশের মতো হবে… এয়ারফিক্স মডেল ওয়ার্ল্ড, মডেল ইঞ্জিনিয়ার, মেরিন মডেলিং ইন্টারন্যাশনাল। তার মানে ঐতিহাসিক জিনিসপত্রে হোথর্নের যতটা না আগ্রহ, তার চেয়ে বেশি আগ্রহ ওসব জিনিস বানানোতে। এদিক-ওদিক তাকানোমাত্র বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা। ডজন ডজন প্লেন, ট্রেন, নৌকা, ট্যাঙ্ক, জিপ দেখতে পাচ্ছি। সেগুলোর কোনোটা ঠাঁই পেয়েছে শেল্ফে, কোনোটা আবার নিথর দাঁড়িয়ে আছে কার্পেটের উপর। কোনোটা ঝুলছে তার থেকে, কোনোটা আবার অর্ধেক বানিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে টেবিলের উপর। আমি যখন বেল বাজালাম, তখন একটা ব্যাটলট্যাঙ্ক জোড়া লাগাচ্ছিল হোথর্ন। হয়তো সে-কারণেই দরজা খুলতে দেরি হয়েছিল ওর।
আমি যে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি এসব, খেয়াল করল হোথর্ন। বলল, ‘এসব আমার শখ।’
‘মডেল মেকিং।’
‘হুঁ।’ একটা চেয়ারের পিঠের উপর দেখতে পাচ্ছি হোথর্নের কোটটা। কাজ করার আগে ওটা খুলে রেখেছিল সে। তুলে নিয়ে জিনিসটা গায়ে দিল।
হোথর্নের শখ পুরোপুরি অন্যরকম। যা-যা বানিয়েছে সে, নিখুঁতভাবে বানিয়েছে। খুব যত্ন নিয়ে বানিয়েছে, সাংঘাতিক ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়েছে। প্রতিটা জিনিস বানানোর পর চমৎকারভাবে রঙ করেছে সবগুলো। এই কাজের পেছনে শত শত ঘণ্টা পার করে দিয়েছে।
কম্পিউটার দেখতে পেয়েছি ওর ফ্ল্যাটে, কিন্তু কোথাও কোনো টেলিভিশন দেখতে পাচ্ছি না।
‘এটা কী?’ বিশেষ একটা ট্যাঙ্ক মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে আমার।
‘চিফটিয়ান ট্যাঙ্ক… ব্রিটিশ। ষাটের দশকে নেটো-তে সরবরাহ করা হয়েছিল এসব ট্যাঙ্ক।’
‘জটিল ব্যাপারস্যাপার। কতদিন ধরে করছেন এসব?’
দ্বিধা ফুটল হোথর্নের চেহারায়। এখনও নিজের ব্যাপারে কিছু বলতে চায় না আমাকে। এখনও গুটিয়ে রাখতে চায় নিজেকে। কিন্তু শেষপর্যন্ত মুখ খুলল। ‘অনেক বছর। ছোটবেলা থেকেই এসব আমার শখ।’
‘ভাই-বোন কেউ ছিল আপনার?’
‘একটা সৎ ভাই ছিল। জমি আর বাড়ির দালাল হিসেবে কাজ করছে সে এখন।’
তার মানে কোত্থেকে এই ফ্ল্যাটের সন্ধান পেল হোথর্ন, বোঝা গেল। বললাম, ‘তা হলে এই ফ্ল্যাটেই থাকেন আপনি।’
‘আপাতত। মানে… পাকাপাকি কোনো কিছু না।’
‘কী বলতে চাইছেন? আপনি এই ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার?’
‘এই ফ্ল্যাটের বর্তমান মালিক থাকে সিঙ্গাপুরে। এখানে কখনও থাকেনি তারা। তবে তারা চায়, এখানে যেন কেউ থাকে… যেন একেবারে খালি পড়ে না- থাকে এই ফ্ল্যাট।
‘তার মানে আপনার সৎ ভাই এই জায়গার সন্ধান দিয়েছে আপনাকে?’
‘ঠিক।’ টেবিলের উপর এক প্যাকেট সিগারেট আছে, ছোঁ মেরে ওটা তুলে নিল হোথর্ন। কিন্তু খেয়াল করলাম, ঘরের ভিতরে কোথাও সিগারেটের গন্ধ নেই। তার মানে যখন ধোঁয়া গেলে, ফ্ল্যাটের বাইরে গিয়ে করে কাজটা। ‘আপনি বলেছিলেন বইটার ব্যাপারে কী যেন কথা আছে।’
‘আমার মনে হয় উপযুক্ত একটা নাম পেয়ে গেছি আমি এই বইয়ের।
‘কেন? ‘হোথর্ন ইনভেস্টিগেটস’ কী সমস্যা করল?’
‘ওই নাম নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে আমাদের মধ্যে।’
‘তা হলে?’
‘আজ সকালে আমার নোটগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম। আপনার সঙ্গে যখন প্রথমবার দেখা হলো… মানে, ক্লার্কেনওয়েলের কথা বলছি… আপনি যখন বইটা লেখার কথা বললেন আমাকে, সেদিন একটা কথা বলেছিলেন… দ্য ওয়ার্ড ইয মার্ডার ‘
‘তো?’
‘আমার ধারণা দ্য ওয়ার্ড ইয মার্ডার-ই এই বইয়ের সবচেয়ে ভালো নাম হতে পারে। যত যা-ই হোক আমি একজন লেখক, আর আপনি একজন গোয়েন্দা। কাজেই ….
কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল হোথর্ন, তারপর কাঁধ ঝাঁকাল অনিশ্চিত ভঙ্গিতে। ‘ঠিক আছে, কাজ চলে যাবে মনে হচ্ছে।’
‘আপনি মনে হয় খুব একটা আশ্বস্ত হননি আমার কথায়।’
‘আসলে… নামটা আহামরি কিছু-একটা মনে হচ্ছে না আমার। আর এই বইও এমন কিছু না, যেটা নিয়ে সাগরসৈকতে গিয়ে আরাম করে শুয়ে পড়া যাবে।
